#out_of_syllabus
৬.নিহালের ওমন ভয়ংকর রাগ দেখে নাবিল নিজেও ভয়ে তড়িঘড়ি করে নিজের রুমে দৌড়ে এসে দরজাটা খট করে বন্ধ করে দিল। বুকের ভেতর তার তখন তোলপাড় চলছে।হাতে থাকা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাতে দেখল গ্রুপ কল এখনো চলমান।তার মানে অর্না,নিশা সবটাই শুনেছে।নাবিল ক্লান্ত ভঙ্গিতে সোফায় এসে বসে ফোনটা কানের কাছে এনে বলে,
‘তোরা কি জীবিত আছিস নাকি স্ট্যাচু অফ লিবার্টি হয়ে গিয়েছিস?’
নাবিলের গলার আওয়াজ আসতেই ওপাশ থেকে নিশার গলার আওয়াজ ভেসে এল,
‘হ্যালো! নাবিল? তুই নিজে কি বেঁচে আছিস রে ভাই?নাকি তোকেও স্যার এক চড়ে ফ্লোরে বিছিয়ে ফ্লোর ম্যাট বানিয়ে দিয়েছে?’
অর্নার কণ্ঠও তখন বেশ কাঁপছে, তবে তাতে ভয়ের সাথে চরম বিস্ময় মিশে আছে, মনে মনে সে ভেবে চলেছে,‘আল্লাহ,,,রে,,আল্লাহ! নিহাল স্যার তো সত্যি একটা আস্ত ডায়নোসর! চোখের সামনে না দেখেও শুধু সাউন্ড শুনেই আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। ওই উগ্র জেসি মেয়েটার যে এমন করুণ দশা হবে, স্বপ্নেও ভাবিনি!’
তবে মনের ভাবনা মনে রইল।সেটা সে প্রকাশ করল না।আর,নাবিল নিজের ধকধক করতে থাকা বুকে হাত রেখে এক গ্লাস পানি এক নিঃশ্বাসে খেয়ে নিল। তারপর স্পিকারে দিয়ে শুকনো গলায় বলল, ‘তোদের তো আগেই বলেছিলাম! তোরা তো ভাইয়াকে শুধু ক্লাসে গম্ভীর মুখে লেকচার দিতে দেখিস,আর আমি প্রতিদিন এই আগ্নেয়গিরির পাশে বসবাস করি।জেসির গালে যে থাপ্পড়টা পড়ল, ওটার শব্দ শুনে তো আমার নিজের গালই যেন রিঅ্যাকশনে জ্বলে উঠল রে ভাই!’
নাবিলের কথা শুনে অর্না ও নিশার হাত অজান্তেই নিজেদের গালে চলে গেল।তবে সেটা তিনজনের কেউ দেখলো না।তবে,নিশা গালে হাত দিয়ে ড্রামাটিক স্টাইলে বলল,
‘চিন্তা কর অর্না,জেসি আসলে কতটা খারাপ! আজকে জেসি যে পরিমাণ অপমানিত হয়ে ওই বাড়ি থেকে বিতাড়িত হলো, জেসির জায়গায় আমি হলে তো লজ্জায় নদী বা কোনো বিলে গিয়ে ডুব দিতাম!’
অর্না একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘তা ঠিক বলেছিস নিশা। তবে,কি জানিস তো এক কান কাটা যায় গ্রামের বাইরে দিয়ে আর দুই কান কাটা যায় গ্রামের ভিতর দিয়ে একেবারে গর্ব করে।কারণ,এক কান কাটার একটু হলেও যেই মান সম্মান আছে সেটা তো দুই কান কাটা লোকের নেই।যার মান সম্মান নেই তার কি সেই জিনিস হারানোর ভয় আছে?জেসির মতো বেহায়া মেয়েকে একদম উচিত শিক্ষা দিয়েছে। কিন্তু নাবিল, একটা কথা বল তো?’
‘কী কথা?’ নাবিল কৌতূহলী হয়ে শুধাল।
অর্না নিজের ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, ‘তোর ভাইয়ের এই
বাজখাঁই রূপ দেখার পর আমার তো মনে হচ্ছে কেমিস্ট্রি ল্যাবে যাওয়ার কথা ভাবলেই এবার থেকে পেটে ড্রাম পেটাতে শুরু করবে। ভাইরে ভাই, ক্লাসে ভুল করলে তো আমাদের সোজা ল্যাব থেকে থাপ্পড়ে নিচ তলায় পাঠায় দেবে!’
কথাটা শুনে নাবিল আর নিশা ভয় পাওয়ার মধ্যেও নিজেদের হাসি আর চেপে রাখতে পারল না।তিনজনে হেসে উঠল একসাথে।বেশ অনেক্ষণ কথা হওয়াতে এবার বিদায়ের পালা।যার যার পড়াশোনা করার বিষয় আছে।সামনেই প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা।ফোন রাখার পূর্বে নাবিল বলে,
‘শোন,, তোরা যে জেসির বিষয়টা শুনলি সে,,,
কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই অর্না ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে বলে উঠল,
‘আশা নিশা গো এন্ড গেট এ মাইক।এলাকায় অ্যানাউন্স করে আসি।একটি বিশেষ ঘোষণা,জনাব তানজীম রিজওয়ান নিহাল এর শক্ত হাতের পোক্ত চড় খেয়ে কুপোকাত জেসি দ্যা গ্রেট বেহায়া।’
অর্নার এরূপ কথা শুনে এবার হাসির আওয়াজ জোরে হলো। নাবিলকে আর কিছু বলার প্রয়োজন পড়ল না।সে জানে বন্ধু হিসেবে অর্না এবং নিশা দুইজনেই কতটা বিশ্বস্ত।সেই বিশ্বাসের জন্য আজকে তাদের বন্ধুত্ব টিকে আছে।
********
পেরিয়েছে একটি দিন,
সকাল সকাল অর্না কলেজ ড্রেস পরে একেবারে রেডি হয়ে ব্যাগটা হতে করে নিচে নেমে আসে।নিচে নেমে ডাইনিং রুমে আসতে দেখতে পায় তার নতুন ভাবি আনিকা আর তার মা আঞ্জুমান বেগম একসাথে গল্প করছেন আর নাস্তা রেডি করছেন।অর্না সেদিকে এগিয়ে গেলো।যাওয়ার পূর্বে কাঁধে থাকা ব্যাগটা চেয়ারে রাখল।
‘শাশুড়ি বৌমা মিলে কি এত গল্প করছ আমাকেও বলো!’
অর্নার গলার আওয়াজ পেয়ে আঞ্জুমান বেগম ও আনিকা দুইজনে তার দিকে তাকিয়ে পরে।আঞ্জুমান বেগম গ্যাসের চুলা বন্ধ করে বলে,
‘তোর পায়ে ব্যাথা লাগার সম্পূর্ন গল্প করছি।’
অর্না এগিয়ে এসে দাঁড়ালো আনিকার পাশে।আনিকা এবং অনিক গতকাল বাড়ি ফিরেছে।সকাল সকাল আনিকাকে রান্নাঘরে দেখে অর্না দুষ্টামি করে বলে উঠল,
‘আমার কষ্টের গল্প তো বেশি করে করো।আর ভাবি,,আমি কিন্তু তোমার টিপিক্যাল ননদ হবো।এই যেমন বলব,এই বাড়িতে সকাল সকাল ওঠার নিয়ম,এই বাড়িতে এটা চলে না ওটা চলে না।এসব বুঝেছ তো ভাবি।’
কথাটা বলে গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করতে যেয়েও হেসে ফেলে অর্না।তার দ্বারা সিরিয়াস হওয়া কি এই জীবনে হবে! হবেনা হয়ত।সবাই শুধু বলে,’অর্না তোর মতো একটা চিল জীবন প্রয়োজন।’আসলেই তার জীবন চিল জীবন এবং সেই জীবনে সে চিলের মতোই ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়।
অর্নার কথা শুনে আনিকা মিষ্টি হেসে অর্নার দিকে তাকালো।অর্না আনিকাকে দেখে নিজেই যেন একটু চমকে গেল।বিয়ের ভারী মেকাপ,সাজসজ্জার পর আজকে তার সাথে দেখা হলো।সকাল বেলা নব বধূর সদ্য গোসল করা ভেজা চুল,চোখে মুখে স্নিগ্ধতা আর সেই সাথে তার নাকে চিকচিক করতে থাকা হীরের নাকফুলটা, কানে স্বর্ণের দুল,গলায় চেন সবটাতে জানান দিচ্ছে সে এই বাড়ির নব বধূ।আনিকা অর্নার গালে আলতো করে হাত রেখে বলল,
‘টিপিক্যাল ননদিনীর জন্য আমিও টিপিক্যাল ভাবি হয়ে যাব।তখন তোমার ভাইকে বলব দ্রুত তোমার বোনটাকে বিয়ে দিয়ে বিদায় করো।’
আনিকার কথায় অর্না ফিক করে হেসে ওঠে।সেই সাথে হেঁসে ওঠেন আঞ্জুমান বেগম।তিনজনের সমস্বরে মৃদু হাসির আওয়াজ শুনে অর্নার বাবা মশিউর রহমান সাহেব ডাইনিং টেবিলের কাছে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করেন,
‘কি ব্যাপার সকাল সকাল আমার বাড়িতে চাঁদের হাট বসেছে।’
মশিউর রহমান সাহেবের গলার আওয়াজ পেয়ে আঞ্জুমান বেগম চা নিয়ে এগিয়ে গেলেন।সাথে সাথে অনিক নিজেও এসে বসল টেবিলে।অফিস যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে এসেছে বাবা ছেলে।
আঞ্জুমান বেগম সবার সামনে নাস্তার প্লেট আর চায়ের কাপ সাজিয়ে দিতে দিতে টেবিলে বসতে বললেন। মশিউর রহমান সাহেব চেয়ার টেনে বসতেই অনিকও বাবার পাশে এসে বসল।
মশিউর রহমান সাহেবের পারিবারিক ইমপোর্ট-এক্সপোর্টের ব্যবসা। দেশের বাইরে থেকে বিভিন্ন বিলাসী পণ্য আমদানি করা থেকে শুরু করে বিদেশের বাজারে দেশীয় পণ্য রফতানির এই বিশাল কারবার সামলাতে বাবা-ছেলে দুজনকেই প্রতিনিয়ত ব্যস্ত থাকতে হয়। ব্যবসার কাজে শিপিং কন্টেইনার, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স আর বন্দরের কাগজপত্র নিয়েই সিংহভাগ সময় কাটে তাদের। তিন বেলা খাওয়া দাওয়ার এই সময়টাই যা একটু পরিবারের সবাই একসাথে বসার সুযোগ পায়।তবে,অনিক দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মশিউর রহমান সাহেব একটু রিল্যাক্স থাকতে পারেন।তার দুই ছেলে মেয়ে তার গর্ব।তবে,অনিক অর্নার মতো এতটাও চটপটে না।সে শান্ত।অর্নার একেবারে বিপরীত চরিত্র।
আনিকা,আঞ্জুমান বেগম ও অর্না তিনজনে মিলে ডাইনিং টেবিলে সব নাস্তার আইটেম এনে রেখে বসে।
টেবিলে সবটা সবাই গুছিয়ে বসার পর মশিউর রহমান সাহেব চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার আগে অর্নার দিকে তাকালেন। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে নরম ও চিন্তিত গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘অর্না, তোর পায়ের কি অবস্থা এখন? ফোলাটা কি কিছুটা কমেছে, নাকি এখনো হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে?’
বাবার কথা শুনে অর্না নিজের পায়ের দিকে একবার তাকিয়ে একটু হেসে বলল,
‘আগের চেয়ে অনেক ভালো আব্বু। কাল রাতে আম্মু আইস প্যাক দিয়ে আর ভলিনি স্প্রে করে দেওয়াতে ব্যথাটা এখন একদমই কমে গেছে। এখন আর হাঁটতে গিয়ে আগের মতো টান লাগছে না।’
‘এবার থেকে আরও সাবধানে চলাফেরা করবে।লাফালাফি করবে,দুষ্টামি করবে তবে একটু লিমিটের মধ্যে।বড় হয়েছ তো!’
অর্না দ্রুত মাথা দুলিয়ে মিষ্টি হাসি দিয়ে আলহাদি গলায় বলল,
‘ঠিক আছে আব্বু।কোনো চিন্তা করো না।’
অর্নার কথা শুনেই ছেলের দিকে তাকিয়ে মশিউর রহমান সাহেব এবার অফিসের প্রসঙ্গ তুললেন, ‘অনিক, পোর্টে যে নতুন কন্টেইনার আসার কথা ছিল, সেটার কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের কাগজপত্র সব রেডি হয়েছে? আজকের মধ্যেই কিন্তু ডকুমেন্টসগুলো সাবমিট করতে হবে, না হলে পোর্ট ডেমারেজ চার্জ লেগে যাবে।’
আনিকা তখন অনিকের প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছে।আর আঞ্জুমান মশিউর রহমান ও অর্নার প্লেটে।অনিক তার বাবার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, ‘জি আব্বু, কাল বিকেলেই সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের সাথে কথা বলে সব কাগজপত্র ভেরিফাই করে নিয়েছি। সকালে অফিসে পৌঁছেই প্রথমে আইজিএ ট্র্যাকিংটা আপডেট দেখে কাস্টমসে ফাইল ফরোয়ার্ড করে দেব। আপনাকে ওটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।’
ছেলের এমন বিচক্ষণতা ও ব্যবসায়িক দক্ষতা দেখে মশিউর রহমান সাহেবের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল,সেই সাথে গর্বে নিজের বুকটাও ফুলে উঠল। অনিককে খাবার পরিবেশন করে চেয়ারে বসতেই আঞ্জুমান বেগম হাসিমুখে আনিকার প্লেটে গরম পরোটা আর খাবার তুলে দিতে দিতে বললেন,
‘তুমিও খেয়ে নাও মা।’’
অর্নাদের বাড়ির ডাইনিং রুমের পাশে দেয়ালটা সম্পূর্ন গ্লাসের।সেখান দিয়ে সকালের মিষ্টি রোদ এসে পড়েছে ডাইনিং টেবিলে। ধোঁয়া ওঠা চা, কাজের ব্যস্ততা আর ভালোবাসার উষ্ণতায় জমে উঠল পুরো পরিবারের সকালটা।
খাওয়া দাওয়া শেষে মশিউর রহমান সাহেব ও অনিক নিজেদের গাড়িতে করে বেরিয়ে গেলো।আর অর্না বের হলো নিজের স্কুটি নিয়ে।বেরোনোর পূর্বে নিশাকে কল করে বলে দিল সে যেন রাস্তাটায় এসে দাঁড়ায়।
*********
সকালবেলা রাস্তায় কর্মব্যস্ত মানুষের আনাগোনা, আর সেই সাথে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের কিলবিল করা ভিড়—সব মিলিয়ে চারপাশের সড়কটা বেশ জমজমাট ও ব্যস্ত। আজকের এই ব্যস্ত সড়ক ঠেলে বেশ সাবধানে স্কুটি চালিয়ে কলেজে এসে পৌঁছায় অর্না ও নিশা। বিজ্ঞান ভবনের সামনে নিশাকে নামিয়ে দিয়ে অর্না নিজের স্কুটিটা পার্ক করতে গ্যারেজের দিকে এগোয়।
রোজ গ্যারেজে ঢুকলেই নিহাল স্যারের বাইকটা বেশ আলাদাভাবেই নজরে পড়ে। তবে আজকে নিহাল কিংবা নাবিল—কারোর বাইকই সেখানে চোখে পড়ল না।বাইক না দেখে অর্না মনে মনে বেশ খুশি হলো এই ভেবে আজকে হয়ত নিহাল স্যার কলেজে আসেনি।কয়েকদিন সে নিহালের মুখোমুখি হবেনা ভেবেই প্রতিজ্ঞা করেছে।সেখানে দাঁড়িয়ে অর্না আর বেশি কিছু না ভেবে নির্দিষ্ট জায়গায় সুন্দর করে স্কুটিটা রেখে গ্যারেজ থেকে বেরিয়ে এলো।
বিজ্ঞান ভবনের সামনে থেকে নিশাকে সাথে নিয়ে দুজনে একসাথে তিনতলার ক্লাসরুমের দিকে পা বাড়ায়।ক্লাসে পা দিতেই ভেতরে দেখে—নাবিল এক কোনায় একাকী বসে আছে। তার পুরো মনোযোগ হাতের ফোনের পর্দায় নিবদ্ধ! আশপাশে কে এলো বা কে পাশে এসে দাঁড়াল, সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। ফোনের দিকে তাকিয়ে মুখে তার মিটমিটে এক চিলতে হাসি। আঙুলের দ্রুত নড়াচড়া আর সেই মুচকি হাসি দেখেই অর্না ও নিশা স্পষ্ট বুঝে ফেলে—ওপাশে সিনথিয়ার সাথে বেশ জমজমাট আর মিষ্টি কোনো আলাপ চলছে!
দৃশ্যটা দেখেই অর্না আর নিশা একে অপরের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে নীরবে চোখ টিপল। দুইজনের মধ্যে অর্না নিজের ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে নিশাকে একদম চুপ থাকার ইশারা করল। তারপর বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে নিঃশব্দে এগিয়ে বাজপাখির মতো চটজলদি ছোঁ মেরে নাবিলের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিল!
আকস্মিক এমন ঘটনায় নাবিল পুরো হতভম্ব হয়ে গেল! ঘটনার আকস্মিকতা সামলে চমকে উঠে ওপরে তাকাতেই অর্নাকে দেখে ঝটপট সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে উঠল,
‘এই পরের ওড়না, আমার ফোনটা দে! খুব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হচ্ছে এখানে!’
অর্না তো অত সহজে ফোন ছেড়ে দেওয়ার বান্দা নয়। সে নিজের কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে পাশের বেঞ্চে রাখল, তারপর চট করে ক্লাসের সামনের দিকে সরে গেল। নাবিলের ফোনটা চোখের সামনে নাচাতে নাচাতে বাঁকা হেসে বলল,
‘কীসের এত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা, শুনি? আমরাও একটু সেই আলোচনায় যোগদান করি!’
নাবিল অধৈর্য হয়ে তাড়া দিয়ে বলল,
‘অর্না,মেরি বেহেন ফোনটা দিয়ে দে বলছি! তোকে কিন্তু বলছি, দাঁড়া...’
অর্না নাবিলের এই ফাঁকা হুমকিতে একটুও তোয়াক্কা করল না। সে মেসেজগুলো পড়ার জন্য চট করে ফোনটা চোখের সামনে আনতেই নাবিল চটজলদি হাঁক ছেড়ে উঠল,
‘হেই সিরি, লক মাই ফোন!’
আইফোনের স্ক্রিনটা চোখের সামনে হুট করে লক হয়ে যেতে দেখে অর্না একদম অবাক হয়ে যায়। নাবিলের এমন চরম চালাকি দেখে মুহূর্তেই তার মেজাজ বিগড়ে গেল!
‘তুই কিন্তু বড্ড পাজি হয়ে গেছিস,খাল বিল!’
কপট রাগ দেখিয়ে মুখ ভেংচে অর্না চট করে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেল।পিছু পিছু ছুটল নাবিল।
‘দে বলছি আমার ফোন!’— বলে অর্নার পেছন পেছন করিডোরে দৌড়াতে শুরু করে। কিন্তু কিছুটা এগোতেই করিডোরের শেষ মাথায় সিঁড়ি দিয়ে নিহালকে উঠে আসতে দেখে নাবিল হুট করে থেমে যায়।নিহালের চিরচেনা গম্ভীর রূপ দেখে নাবিলের ভেতরের ভীতি জেগে ওঠে।এদিকে অর্না নিজেও ছুটছে সামনে পড়লে আর রক্ষা থাকবেনা।আপাতত অর্নাকে সেফ রাখা প্রয়োজন ভেবেই সে দ্রুত অর্নাকে সতর্ক করার জন্য পেছন থেকে হাঁক ছেড়ে বলল,
‘হেই অর্না, থাম! একদম সামনেই কিন্তু ভাইয়া আসছে। সাবধান!’
নাবিলের মুখ থেকে ‘ভাইয়া’ ডাকটা শোনামাত্রই অর্নার পায়ের গতি এক মুহূর্তে থমকে যায়।ভাইয়া বলতে যে নিহাল স্যার সেটা তো বুঝতে এক সেকেন্ড সময় লাগেনি তার। মুহূর্তের মধ্যে বুকের ভিতরটা ধড়ফড় করে ওঠে, গলার কাছটা শুকিয়ে আসে ভয়ে।গত পরশু নিহাল স্যারের বলা সেই ঠান্ডা, থমথমে কন্ঠের কথাগুলো স্মৃতির পাতা থেকে ভেসে উঠতেই অর্নার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক অজানা আতঙ্কের শিহরণ খেলে যায়!
হুট করেই যেন চারপাশের সবকিছু থমকে গেল। নিহালের গম্ভীর ব্যক্তিত্ব, তার উপস্থিতির এক অদৃশ্য চাপ আর ভেতরের তীব্র আতঙ্ক অর্নাকে যেন ভেতর থেকে একদম স্তব্ধ করে দিল।
মনে মনে সে কঠোর প্রতিজ্ঞা করেছিল যেভাবেই হোক, এই মানুষের সামনে কোনো অবস্থাতেই পড়া যাবে না! তার সাথে কথা বলা তো দূরের কথা, খুব বেশি প্রয়োজন না হলে যেন ছায়াও না মাড়ানো হয়! এমনকি প্রয়োজন হলেও তাকে এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
কিন্তু অর্না সামনে পড়তে না চাইলেই তো আর সমস্যার সমাধান হয়ে যাচ্ছে না! মানুষটাকে এড়িয়ে চলা সম্ভব, কিন্তু তার ক্লাস তো ফাঁকি দেওয়া যাবে না। অর্না চট করে সরে যাওয়ার আগেই নিহাল ততক্ষণে বেশ কাছাকাছি চলে এসেছে। আচমকা চোখ তুলে সামনে তাকাতেই নিহালকে দেখে এক লহমায় অর্নার বুকটা কেঁপে উঠল, পা দুটি থমকে গেল। অন্যান্য দিনের তুলনায় আজকে এই কুচকুচে কালো শার্টে লোকটাকে কেন যেন একটু বেশিই সুদর্শন লাগছে! অর্না পলকহীন চোখে কয়েক মুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে রইল। তবে নিহাল অর্নার দিকে তাকাল না, কারণ সে ফোনে গভীর মনোযোগ দিয়ে কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছে।
নিহাল আরও কাছে এগিয়ে আসার আগেই নাবিল চট করে এসে অর্নার হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে যায় ক্লাসে।
নাবিল অর্নার হাত ধরে দ্রুত পায়ে এগোতে থাকে ক্লাসরুমের দিকে। তবে নিহালের প্রখর দৃষ্টি এড়ানো এত সহজ নয়! ফোন কানে থাকা সত্ত্বেও তার চোখ গিয়ে ঠিকই নিবদ্ধ হলো তাদের ওপর। ফোনে চলতে থাকা আলাপটা দ্রুত শেষ করে হ্যান্ডসেটটা পকেটে পুরে সে গম্ভীর পায়ে ক্লাসে প্রবেশ করল।
নিহাল ক্লাসে ঢুকতেই সমস্ত ছাত্র-ছাত্রী সম্মান জানিয়ে দাঁড়িয়ে সালাম দিল। নিহাল ক্লাসে ঢুকে এক নজরে চোখ বুলিয়ে দেখল—অর্না নিজের নির্দিষ্ট জায়গায় বসে আছে আর নাবিল গিয়ে বসেছে তার নিজের আসনে। ছাত্র-ছাত্রীদের আলাদা সারি, যে যার সারিতে শান্ত হয়ে বসে।
নিহাল সবাইকে বসার অনুমতি দিয়ে গাম্ভীর্যের সাথে নিজের কাজ শুরু করল, ব্যস্ত হয়ে পড়ল লেকচারে।
পুরো ক্লাস চলাকালীন অর্না ভুল করেও একবারের জন্যও নিহালের দিকে চোখ তুলে তাকাল না। সে যেন পুরোটা সময় নিজের দৃষ্টিকে ডেস্কের ওপর থাকা বই,খাতার পেজে আটকে রেখেছিল। বিষয়টিকে নিহালের নজর এড়াল না, তার তীক্ষ্ণ চোখ ঠিকই ধরে ফেলল অর্নার এই অদ্ভুত আচরণ। এমনকি পড়া জিজ্ঞাসা করার সময়ও অর্না নিজের চোখ নিচের দিকে রেখে একপ্রকার নিচু, মৃদু গলায় উত্তর দিল।
অর্নার এই হঠাৎ পরিবর্তন বড্ড স্পষ্ট আর লক্ষণীয়! যা দেখে নাবিল আর নিশা দুজনেই চরম অবাক তো হলোই আর সেই সাথে অবাক হলেন খোদ নিহাল স্যারও!
কয়েকটা ছোট প্রশ্ন লিখে সেগুলোর উত্তর করতে দিয়েই নিহাল পুরো ক্লাসরুম জুড়ে পায়চারি চালালো।সবসময় বেঞ্চের বাইরের কর্নারে বসা অর্না আজকে নিশাকে নিজের জায়গায় দিয়ে সে ভিতরে বসেছে।এসব,সব পরিবর্তন রাতারাতি হওয়ায় নিহাল নিজেই কিছুটা ভাবনায় মশগুল। সকলের লেখা চলতে থাকে।আর নিহাল পরিশেষে অর্নার বেঞ্চের পাশ দিয়ে হেঁটে এসে বসে নিজের চেয়ারে।পুরো ক্লাসে নিজের তীক্ষ্ণ নজর বোলানো সময়ও নিহালের তীব্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অর্নার ওপর আটকালো।পরিবর্তনের পিছনে রহস্যটা নিহালের মস্তিষ্ক ডিকোড করতে পারছেনা কিছুতেই।তবে মনে মনে আওরালো,
‘কি খিচুড়ি পাকাচ্ছেন মিস অর্না!!যেটা পাকাচ্ছেন নিজে খেতে পারবেন তো!’
চলবে,,,
#out_of_syllabus
#লেখনী_রুহিতা
পর্ব -৬ কার্টেসি ছাড়া কপি করা সম্পূর্ন নিষিদ্ধ