ফন্ট সাইজ:
থিম:
শ্রাবণ ধারার রুপকথা

২য় পর্ব

লেখক: অনামিকা তাহসিন রোজা

#শ্রাবণ_ধারার_রূপকথা

#পর্ব_২

#কলমে_অনামিকা_তাহসিন_রোজা

প্রতিদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা শ্রাবণের অভ্যাস। তাই বরাবরের মত আজও ভোরের আলো ফুটতেই তার চোখ মেলতে শুরু করল। কিছুক্ষণ ঘুমের রেশ কাটিয়ে উপুড় হয়ে শুলো সে, এরপর ধীর গতিতে চোখ জোড়া খুলতেই দেখতে পেল এক মনোহর দৃশ্য। জানালার ফাঁক গলে আসা ভোরের ক্ষীণ আলোতে ফুটন্ত এক কিশোরীর মুখশ্রী স্নিগ্ধতার সাথে আলো ছড়াচ্ছে। এক সেকেন্ডের জন্য কিছু বুঝলো না শ্রাবণ। খানিক সময় পরেই তার সবকিছু মনে পড়ল। আর মনে পড়তেই তৎক্ষনাৎ দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো শ্রাবণ। আবারো মনে মনে অসন্তুষ্ট হলো বাবা মায়ের উপর। কি দরকার ছিল এত ছোট একটা মেয়েকে তার সাথে বিয়ে দেয়ার! চোখ বুঁজে এসব চিন্তায় কাহিল হলে আবারো চোখ মেলে তাকালো শ্রাবণ। গভীর দৃষ্টি ফেলল সোফায় কোনোমতে ঘুমোতে থাকা ধারার দিকে। ধারার গালে পড়ে থাকা এক গোছা এলোমেলো চুল, নিঃশ্বাসের সাথে হালকা দোল খাচ্ছে। ঠোঁটজোড়া আধখোলা, নিঃশব্দ নিঃশ্বাস টা টের পাচ্ছে শ্রাবণ। সে আরো দেখলো মেয়েটার চোখ বন্ধ থাকার পরও সেই কাজলে ঘেরা পাপড়িগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে গতরাতের থমথমে নীরবতা।

শ্রাবণ গতরাতে তাদের মধ্যে হওয়া কথোপকথন মনে করল, আর বুঝলো, মেয়েটা অনেক সহজ-সরল। নইলে এক কথাতে সোফাতে শুতে রাজি হবে কেনো? আর শ্রাবণের অদ্ভুত আচরণে অবাক হবেই বা না কেনো? ধারার তো পৃথিবীকে চেনার, জীবনের মানে বুঝার বয়েস তার হয়নি। অথচ এখন সে তার স্ত্রী! কথাটা ভাবতেই বুকের ভেতর কিছু একটা ছটফট করে উঠল শ্রাবণের। এই যে বিয়ে, এই যে রাত, সবকিছুই যেন ধারার ওপর এক নির্মম বোঝা হয়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবুও, মেয়েটির মুখের প্রশান্তি দেখে শ্রাবণ একটু হালকা বোধ করল। মনে হলো, হয়তো মেয়েটা একটু স্বস্তিতে ঘুমাচ্ছে, অন্তত এখন। হয়তো এই মুহূর্তটা তার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ ঘুম। আর সেটা যদি হয়, তবে সে কিছুটা সান্ত্বনা পেতে পারে।

ধারা বেশ জড়োসড়ো হয়ে সোফার দিকে ঘেঁষে ঘুমোচ্ছে, হয়তো আগে কখনো এমন ভাবে এমন জায়গায় ঘুমোয়নি। এক মুহুর্তের জন্য মায়া হলো শ্রাবণের। এভাবে মেয়েটাকে সোফায় ঘুমোতে বলা কি অনুচিত ছিল? তারই বা কী করার! মেয়েটাকে বউ হিসেবে মানতে ইচ্ছে করছে না যে। শ্রাবণ নিঃশব্দে উঠে বসল, খুব ধীরে যেন একটা পাতা নাড়ানোর শব্দও না হয়। তারপর চুপচাপ জানালার কাছে এসে দাঁড়াল। চোখে তখন এক নতুন ভাবনার ছায়া,

—" এই কিশোরী এখন আমার দায়িত্ব..আমি চাইলেও এখন আর নির্বিকার থাকতে পারি না। এখন আমার উচিত হবে তাকে আগলে রাখা, তাকে বড় হতে দেওয়া, সময়ের মতো ধীরে ধীরে। কিন্তু..!"

নরম ভোরের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা শ্রাবণ এই কিন্তুতেই আটকে গেলো। জানালার ধারে দাঁড়িয়ে বাইরের আলোর রেখাটিকে চোখে মেখে নিতে চাইল, ভেতরের ধাঁধাটে ভাবনাগুলোকে স্পষ্ট করান চেষ্টা করল। কিন্তু যতই ভাবছিল, মনের ভেতর ততই গুটিয়ে আসছিল এক অসম্পূর্ণ বাস্তবতা। এই মেয়েটা তার স্ত্রী? তার ঘরে, তার জীবনে? সে তাকে কোথায় দাঁড় করাবো? এই প্রশ্নগুলো ঘূর্ণির মতো তার মাথায় পাক খাচ্ছিল শ্রাবণের। বন্ধুদের মুখ ভেসে উঠল চোখে, তাদের হাসি, ব্যঙ্গ, অবিশ্বাস! তারা নিশ্চয়ই বলবে, তুই কি না এক কিশোরী বিয়ে করে এনেছিস? কোনো মেয়ে ছিল না যে একেবারে স্কুলপড়ুয়া মেয়েটাকেই নিয়ে এলি? শ্রাবণের কপাল কুঁচকে উঠলো। গলা শুকিয়ে গেল। মনে হলো, শরীরের রক্ত যেন গলায় এসে জমাট বেঁধে আছে।

ঘুমন্ত ধারার মুখের দিকে আর একবার তাকাল শ্রাবণ, নিষ্পাপ মুখটা দেখে মায়া আর বিরক্তির মাঝে দুলতে লাগল তার অনুভব। আমি কীভাবে এই মেয়েটাকে পাশে নিয়ে সমাজে দাঁড়াবো? আমার পরিচিত পরিসরে? এটা তো এক অদ্ভুত দৃশ্য হবে! কেবল হাসির খোরাক নয়, একধরনের অসম্মান! নিজেকে অদ্ভুত এক বেদনার মাঝে টেনে আনতে লাগল শ্রাবণ। মনের কোণে রাগ জমছিল, বাবার উপর, এই অবুঝ পরিস্থিতির উপর, এমনকি নিজের উপরও। তার মুখ শক্ত হয়ে এলো, চোয়াল আঁটসাঁট। একরকম আক্রোশে নিজের নিঃশ্বাস টেনে নিল সে।

— " না, এটা ঠিক না। আমি এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে ফেলিনি, এটা আমার বেছে নেওয়া জীবন নয়।"

চোখ সরিয়ে নিয়ে এবার পেছনে তাকাল শ্রাবণ, সোফায় ঘুমিয়ে থাকা মেয়েটার দিকে নয়, বরং তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া এক অসমতাল সম্পর্কের দিকে।

তারপর মনে মনে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলো শ্রাবণ। সিদ্ধান্ত নিল, সে এই মেয়েটার সাথে এক ঘরে স্বামী-স্ত্রীর মতো থাকবে না। না পারবে ভালোবাসতে, না পারবে অধিকার ফলাতে! আলতো করে চোখ বুজে, নীচু স্বরে বিড়বিড় করল শ্রাবণ,

—" মানুষ হিসেবে মায়া দেখানো যাবে, কিন্তু বউ হিসেবে কোনো অনুভূতি আসবে না এই মেয়ের উপর!"

-------------

শ্রাবণের বাবা সামিউল শেখ প্রাইমারী স্কুলের একজন প্রধান শিক্ষক। তিনি নিজের সততা, বিচক্ষণতা, মহানুভবতার কারনে পুরো এলাকায় বেশ সমাদৃত। খুব বেশি বড়লোক না হলেও পুরো পরিবার নিয়ে দু'বেলা মাছ ভাত খাওয়ার মত উপার্জন আছে তার। একমাত্র ছেলে শ্রাবণ ও স্ত্রী সালমা বেগমের সাথে তিনি বেশ ভালোই আরামে আয়েশে দিন কাটান। সারাদিন স্কুলে থেকে বিকালে বাড়ি ফেরেন। এরকমই এক বিকেলে তিনি বাড়ি ফিরে জানতে পারেন, গ্রামে তার মামাতো বোন শিলা ক্যান্সারে মারা গিয়েছেন। ছোট থেকে খেলাধুলা করে একসাথে বড় হয়েছিল তারা। তাই ছোটবেলার সেই খেলার সাথী, সম্পর্কে মামাতো বোনের মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি ছুটে গিয়েছিলেন মোহনপুর গ্রামে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি আরো এক করুণ দৃশ্য দেখলেন। শিলার ভাতিজি ছিল ধারা। মানে শিলা ছিল ধারার ছোট চাচি। আর গ্রামে গিয়েই সামিউল সাহেব ধারাকে দেখে জানতে পারেন মেয়েটাকে তার এই বড় চাচা-চাচি মারাত্মক ভাবে অত্যাচার করে। ফুলের মত স্নিগ্ধ এই মেয়েটাকে দেখে তিনি আবেগে আপ্লূত হন। নিজের কোনো মেয়ে নেই সামিউল সাহেবের। অথচ মনে মনে পুষে রাখা কন্যার বাবা হওয়ার লোভটা আবারো জেগে উঠলো ধারাকে দেখে। তিনি ধারার চাচা-চাচি কে প্রস্তাব দেন যে তিনি ধারার সমস্ত ভরনপোষণের দায়িত্ব নিতে চান। অথচ ধারাকে দিয়ে বাড়ির কাজ করানো তার চাচি নাকোচ করেন। শেষে বাধ্য হয়ে টাকার বিনিময়ে ধারাকে নিয়ে এসেছিলেন সামিউল সাহেব। ধারাও ছোট থেকে অন্যের উপর নির্ভর হয়ে চলে বলে কোনো আপত্তি করেনি। নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছে ভাগ্যের সমুদ্রে। আর শহরে আসার পর শ্রাবণের দেশে আসার খবর শুনেই সামিউল সাহেবের মাথায় দারুণ বুদ্ধি জেগে উঠে। ধারাকে এমনিতেই মেয়ে হিসেবে ভীষণ পছন্দ হয়েছিল তার, তাই ছেলেন বউ বানাতে একবিন্দুও ভাবলেন না। ছেলে দেশে আসার সাথে সাথে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে বিয়ে পড়িয়ে দিলেন।

সবকিছু ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সামিউল সাহেব। তিনি আসলেই জানেন না যে তিনি ঠিক করেছেন কিনা। কিন্তু যা করেছেন ভালোর জন্যই। চোখে আঙুল বুলিয়ে আবার চশমাটা পরে নিলেন তিনি। তার সামনে থাকা জায়নামাজের দিকে তাকিয়ে থাকলেন অনেকক্ষণ। ফজরের নামায পড়া শেষ! তারপর মনটা যেন একটু শান্ত হলো। কিছুটা ধীরতায় নিজেকে বোঝাতে লাগলেন,

—" ভুল হোক বা শুদ্ধ, আমি অন্তত ওকে নরক থেকে উদ্ধার করেছি। ছেলেটা যদি বুঝে, সময়ের সাথে যদি ধারা নিজের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে, তবে এটা হয়তো ঠিক সিদ্ধান্তই হয়ে উঠবে।"

সামিউল সাহেব জানেন, তিনি সমাজের একজন শিক্ষক, শত শিশুর হাতে বই তুলে দিয়েছেন। কিন্তু এই এক মেয়েকে জীবনের সুযোগটা তুলে দিতে চেয়েছেন।

তিনি হঠাৎ খুব দৃঢ় কণ্ঠে নিজেকে বললেন,

—"ভবিষ্যৎ তো কেউ জানে না, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহ যদি নিয়ত ভালো দেখেন, তাহলে ফল কখনো মন্দ হয় না। আজকের অস্বস্তিই হয়তো কালকের আশীর্বাদ হয়ে উঠবে।"

বুকের গভীরে জমে থাকা সংশয়ের মেঘ একটু সরলো যেন। চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন সামিউল সাহেব।

— "দেখা যাক... সময়ই বলবে আমি একজন দায়িত্ববান বাবা ছিলাম, নাকি নিছক এক আবেগপ্রবণ মানুষ। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, ধারার ভাগ্যে এখনো অনেক ভালো কিছু লেখা আছে। শুধু একটু সময় লাগবে!"

সালমা বেগম হাতে চায়ের পাত্রটা নামিয়ে বারান্দার দিকে এলেন। চোখেমুখে কিছুটা ক্লান্তি, কিছুটা চিন্তার রেখা। ফজরের নামাজ পড়ে উঠেই দেখেছেন, স্বামী জায়নামাজে বসে অনেকক্ষণ গম্ভীর হয়ে ছিলেন। ভেবেছিলেন, নামাজ শেষে উঠে যাবেন, কিন্তু তিনি তখনো বসে, চোখে একটা স্থিরতা, যেন ভেতরে কোথাও এক দ্বন্দ্ব চলছে। সামিউল সাহেব আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবনার সাগরে ডুবে ছিলেন ঠিক তখনই সালমা বেগম হালকা গলায় বললেন,

— "ঘুম হলো না বুঝি?"

সামিউল সাহেব ধীরে মুখ ফেরালেন স্ত্রীর দিকে, হালকা হাসি ফুটে উঠলো মুখে।

— " ঘুম তো হয়, কিন্তু মন কি সবসময় ঘুমায়, বলো?"

সালমা পাশে এসে বসলেন, গলার স্বর একটু থমথমে হয়ে উঠল তার, তিনি বেশ চিন্তিত মুখে বলেন,

— " তুমি ভালো করেই জানো, আমি কিছু বলিনি, কখনো তোমার সিদ্ধান্তে বাঁধা দিই না আমি। কিন্তু সত্যি করে বলো তো, এই বিয়ে.. এটা কি আমাদের ছেলের জন্য ঠিক হলো? ও কি আদৌও মেনে নেবে?"

একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে তিনি আবার বললেন,

— " শ্রাবণ এখনো কিছু বলে না মানে এই না যে সে মেনে নিয়েছে। আর মেয়েটা... সে তো ছোট্ট এক কিশোরী! একজন মায়ের চোখে আমি বুঝতে পারি, ও এখনো বোঝেই না সে কী হয়ে গেছে, কোথায় এসে পড়েছে!”

সামিউল সাহেব স্ত্রীর কথাগুলো শুনে চুপ করে গেলেন কিছুক্ষণ। তারপর নিচু স্বরে বললেন,

— " জানি, তোমার ভয়টা অমূলক নয়। আমিও ভাবিনি যে সব এত জটিল হয়ে যাবে। কিন্তু একটা কথা বলো তো, যদি আমি ওকে না আনতাম? ওই বাড়িতে মার খেয়ে, কাজ করে, অবহেলায় মরেও যেত মেয়েটা। আমি ওকে শুধু আশ্রয় দিইনি সালমা, একটা সম্ভাবনা দিয়েছি, নতুন জীবনের সম্ভাবনা। যদি শ্রাবণ একটু বুঝে, যদি সময়টা ওদের দুজনকে গড়ে তোলে, তাহলে এটাকে ভুল বলা যাবে না। ওদের বয়সের পার্থক্য টাও খুব বেশি না। তোমার - আমার মতোই।"

সালমা বেগম নীরবে শুনলেন। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু ঝরল না ঠিকই, কিন্তু ভেতরের ভীতি ও মাতৃত্ব যেন প্রতিটি কথার মাঝে মুখ ফুটে উঠছিল। তিনি ফিসফিস করে বললেন,

— " তা ঠিক বলেছো। বয়সে সমস্যা নেই। কিন্তু আমি শুধু আমার ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি... ওর ভালোটা চাই। ও যদি কখনো আমাদের দোষ দেয়..."

সামিউল সাহেব স্ত্রীর হাত ধরে বললেন,

— " সে যদি কিছু বোঝে, একদিন ঠিক বুঝবে, আমরা ওর ক্ষতি চাইনি। আমি নিজের আত্মজ সন্তানের জন্য যেমন ভাবি, ঠিক তেমনি ধারার জন্যও আমার মন কাঁদে। মেয়েটা আমাদের ঘরের ছায়ায় থাক, বড় হোক, মানুষ হোক,এটাই চেয়েছি আমি। বাকি পথ... আল্লাহ ঠিক করবেন।"

সালমা একটু হালকা হাসলেন, যদিও চিন্তার রেখাগুলো পুরোপুরি মুছে যায়নি। স্বামীর কথায় একটা দৃঢ়তা ছিল, সেই দৃঢ়তায় আবার একটু ভরসা খুঁজলেন তিনি।

— " আচ্ছা, তোমার বিশ্বাস থাকলে আমিও রাখি। কিন্তু আল্লাহ যেন দুজনকেই বুঝ দেয়, একসাথে চলার শক্তি দেয়।"

সামিউল সাহেব মাথা নেড়ে বললেন,

— "অবশ্যই... সময়ই সব প্রশ্নের উত্তর দেবে।"

-------------

ভোরের অন্ধকার মিলিয়ে গিয়ে পুরোপুরি সূর্যের দেখা মিলতেই পিটপিট করে চোখ মেলে তাকালো ধারা। সারারাত এক ফোঁটা না ঘুমিয়ে ক্লান্তিতে রাতের শেষে তার চোখ লেগে এসেছিল, তাই বোধহয় এত দেরিতে ঘুম ভাঙলো তার। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসতেই তার চোখ ছানাবড়া, কিছু্টা চমকে বুকে থুথু দিলো ধারা। আয়হায়! এ কোথায় সে? কার ঘর এটা? চোখ ঘুরিয়ে চারপাশে তাকাতেই তার হৃৎস্পন্দন একটু থেমে যেন আবার নতুন করে শুরু হলো। ক’সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে থাকার পর, হঠাৎই রাতের দৃশ্যপট চোখের সামনে খেলা করতে লাগল। মনে পড়ে গেল — কার ঘর, কেন এখানে, কীভাবে সব কিছু। সবকিছু মনে পড়তেই নিজেকে সামলে সোফায় সোজা হয়ে বসলো ধারা। তার এখন ঠিক কী করা উচিত ভেবে পেলো না। নিজেকে গুছিয়ে সোফার এক কোণে চুপচাপ বসে গেল ধারা। কিন্তু এখন? তার করণীয় কী? এই নীরব সকালে। ভেতরে চলছিল একরাশ চিন্তার ঘূর্ণিপাক।

ধারা যখন আকাশ পাতাল নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন, ঠিক তখনই খট করে বাথরুমের দরজা খোলার আওয়াজ পাওয়া গেলো। ধারা সতর্কতার দৃষ্টিতে তাকাতেই চোখে পড়ল সদ্য গোসল সেড়ে বেরিয়ে আসা এক পুরুষ অবয়ব। প্রথমেই বিছানায় রাখা ফোনটা হাতে নিল সে, তারপর নিস্পৃহ ভঙ্গিতে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে ধীরে ধীরে ঘরের মধ্যে হেঁটে বেড়াতে লাগল। এক হাতে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে শুরু করল শ্রাবণ আর অন্য হাতে মোবাইল ধরে কী যেন দেখছিল। সাদা ট্রাউজার পরা সেই শরীরের উপরে কোনো পোশাক নেই, ভেজা গা থেকে গড়িয়ে পড়ছিল পানির কণা, অদ্ভুত এক ঘোর লাগা দৃশ্য! শরীরজুড়ে জলকণার চিকচিক ছটা। সূর্যের কিরণে ভেজা চুল ও বুক যেন ঝিলমিল করছে। ধারার চোখ আটকে গেল সেই দৃশ্যপটে। ভেতরে কোথাও যেন কিছু কেঁপে উঠলো, এভাবে কোনো পুরুষকে প্রথমবার দেখছে সে। শ্রাবণের ভেজা বুকের দিকে কেনো যেন খুব লজ্জা লাগলো তার। বুকের ভেতর লজ্জা আর অস্বস্তির গুমোট জমে উঠলো। নিঃশ্বাস আটকে গেল। আবিষ্কার করল লোকটা অনেক সুন্দর, মারাত্মক ফর্সা! ঠিক তখনই শ্রাবণ চোখ তুলে তাকাল তার দিকে। এক সেকেন্ডের জন্য চোখে চোখ পড়ে গেল। ধারা যেন হঠাৎ নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।

অথচ বিরাট স্বাভাবিক ভঙ্গিতে শ্রাবণ জিজ্ঞেস করল,

—" কোনো সমস্যা?"

ধারা যেন নিজের নিঃশ্বাস খুঁজে ফিরছে। এই মুহূর্তটা স্বপ্ন না বাস্তব, বোঝার মতোও সময় পেলো না। তবুও নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে জড়ানো কণ্ঠে বলল,

— " জ্বি হ্যাঁ... না মানে, জ্বি না!"

শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে সে এক ঝলকে পুরো ধারাকে পর্যবেক্ষণ করল। আরো বেশি বিরক্ত হলো খানিক! শাড়িটা এলোমেলোভাবে পেঁচিয়ে বসে আছে, তাতে সে যেন আরও ছোট, আরও বেখাপ্পা লাগছে। শাড়ি যদি পড়তেই না পারে, তাহলে পড়ে কী দরকার? মনে মনে বিরক্ত হলো শ্রাবণ। এইযে বাচ্চাদের মত শাড়ি পেঁচিয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে, এসবের মানে হয়? আরেকটা বিষয় ওর চোখে পড়ল, অতিরিক্ত সাজগোজ করেছে পিচ্চিটা। মুখে ফাউন্ডেশনের পুরু আস্তরণ, ঠোঁটে টুকটুকে লিপস্টিক। এমন করে সাজার দরকারটা কী ছিল? আর কাল রাতে ফ্রেশ হয়নি কেনো মেয়েটা?

ভেতরে ক্রমশ জমে উঠা চরম বিরক্তি আর বিতৃষ্ণা নিয়েই মোবাইলটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে শ্রাবণ হঠাৎ বলে উঠল,

— " তোমার কি কোনো সালোয়ার-কামিজ বা গাউন এমন কিছু নেই?"

ধারা এক মুহুর্তের জন্য বুঝলো না। হুট করে এমন প্রশ্ন আশা করেনি যে। এরপর একটু সময় নিয়ে বলল,

—" সালোয়ার কামিজ আছে.. কিন্তু ওগুলো তো পুরোনো!"

দ্বিতীয় বাক্যটাকে গুরুত্ব দিলো না শ্রাবণ, সাথে সাথে খ্যাক করে বলে উঠলো,

—" এই মুহুর্তে বাথরুমে যাও। গোসল করে সালোয়ার কামিজ পড়বে তুমি, আর খবরদার কোনো সাজগোজ করবেনা। কথা বুঝতে পেরেছো?'

ধারা বাধ্যের ন্যায় উপর নিচ মাথা নেড়ে বলল বুঝেছে। শ্রাবণ এবার টি শার্ট পড়ে নিল। ধারা এক পলক সেদিকে তাকিয়ে মিনমিন করে জিজ্ঞেস করল,

—" আমি কি চুড়ি, নুপুরও খুলে ফেলব?"

শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে ধারার হাত ও পায়ের দিকে তাকালো। সরু চোখে তাকিয়ে গভীর বিরক্তিতে আদেশ ছুঁড়ে দিল,

—" হ্যাঁ অবশ্যই। চুড়ি আর নুপুরের শব্দ অসহ্য লাগছে!"

ধারা কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো শ্রাবণের দিকে। তাকে তো বলা হয়েছিল স্বামী রা সাজগোছ পছন্দ করে। এই লোক বুঝি পছন্দ করেনা? কিছু একটা ভেবে হঠাৎই উঠে দাঁড়ালো ধারা। শরীরে এখনো অবশ, মাথায় যেনো হাজারটা প্রশ্ন ঘুরছে,তবুও সে স্থির চোখে তাকালো বাথরুমের দিকে। কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত ভঙ্গিতে ধীরে ধীরে পা বাড়ালো সে। শ্রাবণের গা থেকে আসা বেলী ফুলের গন্ধ, ঘরের ভেজা বাতাস, আর আয়নার সামনে ঝুলতে থাকা তার কয়েকটা টি-শার্ট, সবকিছু মিলিয়ে বাতাসটা ভারী লাগছে তার কাছে। একটু অসস্তি হচ্ছে!

চলবে........

নোট— আজকে গল্প দেয়ার মত মন-মানসিকতা ছিল না। তাও দিলাম। ভালোবাসা রইলো, আগামী পর্বে ৫ হাজার শব্দের বড় পর্ব দিব ইনশাআল্লাহ ❤️

#শ্রাবণ_ধারার_রূপকথা

#পর্ব_৩

#কলমে_অনামিকা_তাহসিন_রোজা

যারা স্বামীর অবাধ্য হয় তারা অনেক অ"ত্যাচারিত হয়, গ্রামে থেকে এসবই ছোট থেকে ধারা দেখে এসেছে। এর উপর বিয়ের আগে চাচির বলা কথাগুলো শুনেও বেশ আতঙ্কে ছিল ধারা। ভেবেছিল তারও অবস্থা খারাপ হবে। তবে এখন পর্যন্ত যে স্বামী নামক পুরুষটা তার সাথে খারাপ ব্যবহার করেনি, এই নিয়ে সন্তুষ্ট ও, সাথে ভীষণ অবাকও। তাই বলে তো অবাধ্য হওয়া যাবেনা। এই কারনে স্বামীর কথা শুনলো ধারা। বাথরুম থেকে গোসল করে সালোয়ার কামিজ পড়ে বেরিয়ে এলো। সব সাজ উঠিয়ে একদম পরিপাটি হয়ে এলো। প্রতিদিন সকাল সকাল গোসল করতেই ধারা পছন্দ করে। তাই আজও বিপরীত কিছু করল না। কিন্তু বাথরুম থেকে বের হতেই ধারা চমকালো। বিছানায় বসে আছেন সালমা বেগম। তাকে দেখে ধারা সহসা মাথা নামিয়ে এগিয়ে এলো। সালমা বেগম তার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। ধারাকে দেখে তিনি বিছানা থেকে উঠলেন, দু-হাত বাড়িয়ে কাছে ডাকলেন ধারাকে,

—" ধারা, এদিকে এসো তো মা!"

ধারা জানে, ইনি তার শ্বাশুড়ি মা। কিন্তু শ্বাশুড়ির ব্যবহার এত ভালো হয়? কি আদর করে ডাকছে। অভিভূত হয়েই এগিয়ে গেলো ধারা। সালমা এবার মেয়েটার দুহাত ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, আদুরে কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

—" রাতে ঘুমোতে কোনো সমস্যা হয়েছে? নতুন পরিবেশ মানিয়ে নিতে পেরেছো তো?"

ধারা এক পাশে মাথা এলিয়ে দিয়ে বলল,

—" জ্বি চেষ্টা করছি, কোনো সমস্যা হয়নি।"

সন্তুষ্ট হলেন সালমা বেগম। দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুরো রুমে তাকিয়ে এবার সন্দিহান কন্ঠে জানতে চাইলেন,

—" রাতে তুমি কোথায় ঘুমিয়েছিলে?"

ধারা এক মুহুর্ত চুপ থাকলো। অত গভীর চিন্তা না করেই তর্জনী তুলে ইশারা করে বলল,

—" ওইযে,,,ওখানটায়।"

ধারার আঙুলের ইশারা অনুসরণ করে পাশে তাকালেন সালমা বেগম, অসহায় মুখে জিজ্ঞেস করলেন,

—" সোফাতে? "

ধারা ধীর গতিতে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝালো। এ পর্যায়ে ভেতরে ভেতরে প্রচুর রেগে গেলেন সালমা বেগম। তার মানে তার আন্দাজই ঠিক হয়েছে। ছেলে তার মোটেই ধারাকে মেনে নিতে পারেনি! রেগে আছে এখনো! কিন্তু তাই বলে মেয়েটাকে সোফায় ঘুমোতে দেবে। এই শিখিয়েছেন তিনি ছেলেকে! তবুও! কি আর করার! সবই এখন সময়ের হাতে ছেড়ে দিতে হবে! দেখা যাক, কী হয়! আবারো ঠোঁট গোল করে শ্বাস ফেলেন সালমা বেগম, ধারার কাঁধে হাত রেখে বললেন,

—" কয়েকটা দিন কষ্ট করো ধারা। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার ছেলেটা একটু চাপা। ওকে বুঝতে একটু সময় লাগবে। কয়েকটা দিন সময় দাও, দেখবে ও ঠিক তোমায় মেনে নেবে।"

ধারা বরাবরের মত মাথা নাড়লো। সালমা বেগম এবার কিছুক্ষণ থেমে কাতর স্বরে বললেন,

—"আচ্ছা, তোমার ঘুমোতে মনে হয় সমস্যা হয়েছে। সোফাতে ঘুমোনো মোটেই কম্ফোর্টেবল না। তুমি কি আমার সাথে ঘুমোতে চাও? অথবা আলাদা রুম? এই ঘরের পাশের রুমটা খালি আছে। আগে আমার ভাগ্নি থাকতো সেই ঘরে। তুমি চাইলে ও ঘরে থাকতে পারো!"

ধারা কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে ভাবলো। তারপর মিনমিন করে বলল,

—" আপনারা যেখানে থাকতে দেবেন, সেখানেই ঘুমোবো।"

বুকটা ধ্বক করে উঠলো সালমা বেগমের। না চাইতেও চোখ ছলছল করে উঠলো তার। মায়া হলো মেয়েটার উপর! ছোট থেকে ঠিক কতটা অত্যাচার করা হলে একটা মেয়ে এমন হয়ে যায়! কথাতেই বোঝা যাচ্ছে কতটা অভ্যস্ত ভয় পেতে, কতটা অভ্যস্ত মাথা নিচু করে থাকতে!

সালমা বেগম এক মুহূর্তের জন্য নিজেকে শক্ত রাখতে পারলেন না। ধারা যে আজ তাদের বাড়িতে বউ হয়ে এসেছে, অথচ মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে এসে আশ্রয় নিয়েছে, তার চেয়েও বড় কথা, এই মেয়েটা ভালোবাসার আশায়, একটুখানি সম্মানের আশায় তার জীবনের সমস্ত ভয় আর দুঃসহ স্মৃতি পিছনে ফেলে রেখে এসেছে।

তিনি আবারো ধারা’র মাথায় হাত রাখলেন, এবার একটু দৃঢ়ভাবে বললেন,

—" এভাবে বলছো কেনো ধারা? ভয় পেয়ো না মা। তুমি তো এ বাড়ির বউ। এ বাড়ির দ্বিতীয় গিন্নি তুমি। আমার পরে তো এ পুরো বাড়ি তুমিই সামলাবে। সংসার টা তোমার ধারা। এভাবে ভয় পেয়ো না, এ বাড়িও এখন তোমার, আমি আর তোমার শ্বশুর যতদিন আছি, কেউ তোমার অমর্যাদা করবে না। তুমি এই ঘরেই থাকবে, এই বাড়ির বউ হয়ে, সম্মান নিয়ে।"

ধারা এবার হালকা একটা হাসি দিল। খুব সূক্ষ্ম সেই হাসি, তবুও সেটাই তার মুখে প্রথম আশার রেখা এঁকে দিলো। একটু সময় নিয়ে মিনমিন করে জানতে চাইলো,

—" আমি আপনাকে কী বলে ডাকব? "

সালমা চোখ সরু করে হাসলেন, ভ্রু উঁচিয়ে জানতে চাইলেন,

—" কী বলে ডাকতে ইচ্ছে করছে?"

মুখ অন্ধকার হলো ধারার। মনে পড়লো ছোটবেলায় ডাকা মা শব্দটা। সেই যে ছোটতে মা ডাকটা হারিয়েছে। আর কখনো ডাকেনি। ঠোঁট কাঁপছে ধারার। বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। ছোটবেলার অস্পষ্ট স্মৃতির মতো একটা কণ্ঠস্বর মনে পড়ছে, মা, সেই ডাকটা যেটা বহু বছর আগে সময়ের নদীতে হারিয়ে গিয়েছিল। সে মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল,

—" আমি কখনো মা বলে ডাকিনি কাওকে। আমি কি আপনাকে মা বলে ডাকতে পারি?"

এক মুহূর্ত যেন থমকে গেলো চারপাশ। গলার স্বরটা এত নরম, এত নাড়িয়ে দেওয়া, যেন বুকের গভীর থেকে উঠে আসা কোন কান্না। সালমা কিছু বললেন না। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ধারার গালটা ছুঁয়ে বললেন,

—"ডেকে ফেলেছো তো! একবার বললে তো আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না, মা। এই ডাক আমি বুকের ভিতর সোনার মতো রেখে দেবো। অবশ্যই ডাকবে।"

ধারা এবার চোখ তুলে তাকালো সালমার দিকে। সেই চোখে ভয়ের ছায়া নেই, আছে কিছুটা আশ্রয়ের আলো। ধরা পড়ে, সে ভীষণ করে চেয়েছে এই মা ডাকের প্রতিদান। সালমা এবার আলতো করে বললেন,

—" এবার বলো তো, কোথায় থাকতে চাও?"

ধারা এবার কিছুক্ষণ গভীর ভাবনায় ডুবে গেলো। গতরাতে সে এটুকু বুঝেছে, লোকটা তাকে অপছন্দ করে হয়তো। আর ধারার উপস্থিতিতে মনে হয় বেশি অসস্তিবোধ করেছে। মানুষটাকে সমস্যায় রাখতে চাইলো না ধারা। ঠোঁট ভিজিয়ে জানালো,

—" অনুমতি দিলে, পাশের ঘরে থাকব। উনি আমাকে হয়তো পছন্দ করেনা। আমার উপস্থিতি উনাকে বিরক্ত করতে পারে।"

সালমা বেগমও বুঝার মত করে মাথা নাড়ালেন। প্রথমে কথাটা শুনে মন খারাপ হলেও ন্যানো সেকেন্ডের মধ্যে চোখ জ্বলজ্বল করল তার। মনে মনে হয়তো ফন্দি আঁটলেন কিছু একটার। চোখ বুঁজে অনেকক্ষণ কিছু একটা ভেবে ফট করে বললেন,

—" ঠিক আছে। তুমি দুপুরের পরই সব জিনিসপত্র নিয়ে পাশের ঘরে যেও। আমি ঘর পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করে দেব।"

ধারা মুচকি হেসে মাথা নাড়াল। ঠিক সেই মুহূর্তেই রুমের দরজার বাইরে থেকে কড়া নাড়ার শব্দ এলো।

—" মা, তুমি কি এখন বের হতে পারো? আমি অফিস যাবো। দেরি হয়ে যাচ্ছে।"

শ্রাবণের কণ্ঠে কিছুটা তাড়া, আর কিছুটা বিরক্তি মেশানো। কারন তার মোটেই অফিসে গিয়ে কোনো কাজ করতে হবেনা। তবুও যেতে হবে। কারন স্বয়ং সামিউল শেখ শ্রাবণকে দেশে আসার সাথে সাথে চাচার বিজনেসে হাত লাগিয়ে দিয়েছে। তাই দেশে থেকে তাকে বিজনেস সামলাতে হবে। শ্রাবণের কন্ঠ পেয়ে সালমা বেগম ধারা’র দিকে তাকিয়ে চোখে ইশারা করলেন, ভয় পেতে নিষেধ করলেন। তারপর দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। খুলেই বললেন,

—"হ্যাঁ যাচ্ছি তো বাপ, একটু অপেক্ষা কর। এত তাড়া কিসের তোর!"

শ্রাবণ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, গলায় ব্যাগ ঝোলানো, হাতে ফোন। মায়ের মুখের ভেতর অদ্ভুত কোমলতা দেখে থমকে গেল সে। ভেতরে চোখ ফেলতেই চোখ পড়লো ধারার সঙ্গে। ধারা এবার মাথা নিচু করলো না। চুপচাপ, শান্ত চোখে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তবে এক মুহুর্তের জন্য সন্তুষ্ট হলো শ্রাবণ। মেয়েটা যে তার কথা শুনে সালোয়ার কামিজ পড়েছে তা দেখে ভালো লাগলো। এইতো! এখন দেখে ঠিকই ষোড়শী মনে হচ্ছে, কত স্নিগ্ধ লাগছে৷ গতরাতে কেনো যে এত সেজেছিল মেয়েটা তা এখনো ভেবে পায়না শ্রাবণ। এদিকে সালমা বেগম দরজা পুরো খুলে ধারাকে বললেন,

—"যাও মা, তোমার শ্বশুড় নিচে আছে। তোমার জন্যই অপেক্ষা করেছে। একটু চা-টা খেয়ে আসো। আমি ওর সঙ্গে কথা বলে নিচে আসছি। আর দুপুরে যেটা বললাম মনে রেখো!"

ধারা মাথা নেড়ে ধীর পায়ে বাইরে চলে গেলো। নিচের দিকে যেতে যেতে ওর বুকের ভিতরটা ধুকধুক করতে লাগলো। যেনো এক অজানা পথের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যার শেষ কোথায় জানে না।

শ্রাবণ তখনো দাঁড়িয়ে, ভ্রু কুঁচকে গুটিগুটি পায়ে চলা ধারার প্রস্থান দেখলো। এরপর মায়ের মুখে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,

—"তুমি এতক্ষণ ওর সঙ্গে কথা বলছিলে?"

সালমা বেগম একটুখানি হেসে বললেন,

—"হ্যাঁ, তো কী করব? বউয়ের সঙ্গে কথা বলা তো খারাপ না, তুই যা শিখে এসেছিস, তার চেয়ে অনেক ভালো শিখে এসেছিস বলে ভাবতাম। আমি কিন্তু ওকে আলাদা ঘরে থাকতে বলেছি। এটা শুধু তোর ওপর না চাপিয়ে, ওর সম্মান বাঁচিয়ে, বুঝলি?"

শ্রাবণ কিছু না বলে নিচে তাকালো। হয়তো তার মায়ের সরল কথাগুলো একটু একটু করে নিজের ভেতরের জমাট বরফ গলিয়ে দিচ্ছে? নাকি না? সালমা বেগম একটু চালাকি করে আবারো বললেন,

—" ইকরার ঘরে ওকে থাকতে বলেছি। তুই নাকি ওকে রাতে সোফাতে ঘুমোতে দিয়েছিস? বিষয়টা খুবই খারাপ। তাই পাশের ঘরে ও থাকবে আজ থেকে, যতদিন না তুই ওকে মেনে নিস!"

শ্রাবণ এবার ভ্রু কুঁচকে বলল,

—" এমনভাবে বলছো, যেন আমি ওই মেয়েকে অন্য ঘরে থাকতে বাঁধা দেব?"

সালমা বেগম কপাল কুঁচকে বললেন,

—" বাঁধা দিবি না?"

শ্রাবণ কাঁধ উঁচিয়ে বলল,

—" অভিয়াসলি নো।"

সালমা বেগম এবার দৃঢ় কন্ঠে ধমক দিলেন,

—" শ্রাবণ! মেয়েটা বউ হয় তোর। বিয়ে করেছিস তুই, ভুলে যাস না!"

শ্রাবণ এবার চোখ বন্ধ করে ধাতস্থ হয়ে বলল,

—" ও একটা বাচ্চা মা। বউ হওয়ার মত বয়স না ওর। তুমি একটা বাচ্চা মেয়েকে আমার ঘরে তুলে দিয়ে যদি সংসার করতে বলো, সেটা তো হয়না মা। সবকিছুর একটা নিয়ম থাকে।"

সালমা বেগম এবার গলা নামিয়ে শান্তভাবে বললেন,

—"শ্রাবণ, আমি জানি তুই এখনো ক্ষুব্ধ। অবাক, বিরক্ত, এমনকি হয়তো রাগান্বিতও। কিন্তু শোন, জীবন সবসময় আমাদের পছন্দমতো চলে না। অনেক সময় অচেনা পথেই আমাদের হেঁটে যেতে হয়। আমি তোকে কোনো কিছু জোর করে করতে বলছি না। আমি শুধু বলছি, ওই মেয়েটাকে মানুষ হিসেবে দেখ। ওর ভয়, ওর অসহায়তা একটু বোঝার চেষ্টা কর। ও এতিম শ্রাবণ। ওর চোখের দিকে একবার তাকিয়ে দেখিস, ও কতটা আতঙ্কিত, কতটা অসহায়। ওকে যদি তুইও এভাবে অবহেলা করিস তাহলে তো....আর তোর বাপ ওকে এ বাড়িতে এনেছে স্বাভাবিক সুখী জীবন দেয়ার জন্য। আর তুই এমন করবি বাবা?"

শ্রাবণ এবার ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর মাথা নিচু করে আস্তে বলল,

—" মা ইমোশোনাল কথা বলোনা। আবেগ দিয়ে জীবন চলেনা। তুমি জানো, আমি প্ল্যান করে কখনো কাউকে কষ্ট দিতে চাই না। কিন্তু মা... আমার তো নিজস্ব কিছু আশা ছিল। পরিকল্পনা ছিল। এখন সব ওলটপালট হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি আমি হ্যান্ডেল করতে পারছি না। আমি ওই মেয়েকে নিয়ে কীভাবে পাবলিক প্লেসে দাঁড়িয়ে বলব যে সে আমার স্ত্রী। আমার বন্ধুরাও হাসাহাসি করবে ওকে দেখে। সমাজে ওকে আমি কীভাবে....! "

সালমা বেগম এবার একটু দূরে সরে গিয়ে শক্ত কণ্ঠে বললেন,

—"সমাজ কী বলবে? তাই নিয়ে ভাবিস? সমাজ তোর পাশে ছিল কবে, যা এখন তোর সম্মান নিয়ে চিন্তা করছে?"

শ্রাবণ হতবাক হয়ে তাকালো মায়ের দিকে। তিনি থামলেন না, কণ্ঠ আরও গম্ভীর হয়ে উঠলো,

—"তুই বলছিস তোর বন্ধুরা হাসবে? ওরা যদি তোকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে জানত, তাহলে হাসতো না, শ্রাবণ। আর তুই তো চিরকাল আলাদা কিছু হতে চাইতিস! আজ তোর সামনে এমন একটা সুযোগ, একটা নিরীহ মেয়েকে, যে এতটা কষ্টের ভেতর দিয়ে এসেছে, তাকে সম্মান দিয়ে তোকে প্রমাণ করতে হবে তুই কেমন মানুষ। আর তুই কী করছিস? তার চোখের ভয় দেখে ঘৃণা করছিস, অবহেলা করছিস!"

শ্রাবণ এবার কিছুটা গলার স্বর উঁচু করেই বলল,

—"কিন্তু মা, আমি তো প্রস্তুত ছিলাম না! আমি তো এমন বউ চাইনি! আমি তো স্বপ্ন দেখেছিলাম এমন কাউকে, যার সাথে আমি চলতে পারব, মানিয়ে নিতে পারব, যার লুক, পোশাক, কথাবার্তা, সব কিছুতেই আমি গর্ব করতে পারব!"

সালমা বেগম এবার চুপ করে গেলেন কিছুক্ষণের জন্য। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,

—"শ্রাবণ, তুই এখন যা বলছিস, সেটাতে আমি দোষ দিচ্ছি না। এই বয়সে এরকম ভাবা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু একটা কথা মনে রাখ, এই মেয়েটাকে তুই গর্বের জায়গায় না রাখলে, কেউ রাখবে না। তোকে গর্ব করতে হবে ওকে তোর মনের মত মানুষ বানিয়ে, ওর পাশে দাঁড়িয়ে, ওর নিজের হয়ে উঠতে সাহায্য করে। এই কাজটাই বড়, শ্রাবণ। আর বিশ্বাস কর, একদিন তুই নিজেই গর্ব করবি, যে তুই এমন একটা মেয়েকে গ্রহণ করেছিলি, যার সামনে একদিন সবাই মাথা নিচু করবে। শুধু সময় দে।"

সালমা বেগম এবার সামনে গিয়ে ছেলের মুখটা নিজের দুহাতে ধরলেন। চোখে চোখ রেখে বললেন,

—"আমি বুঝতে পারছি শ্রাবণ, সবটুকুই বুঝি। কিন্তু এটুকু ভাব না, তোর জন্যই শুধু নয়, ও মেয়েটার জীবনটাও থেমে গেছে। ওকে দয়া নয়, সুযোগ দে শ্রাবণ। সময় দে। শুধু সময়। একটু ধৈর্য্য ধর বাবা। জন্ম,মৃত্যু, বিয়ে সব আল্লাহর হাতে!"

শ্রাবণ মায়ের চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল। আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। ধরা দিচ্ছে নতুন এক সকাল।

—"সময়... হুম, সময়ই বলবে মা,"

শ্রাবণ আস্তে বলল।

সালমা বেগম এবার নিশ্চিন্তভাবে হেসে বললেন,

—"এই তো আমার ছেলে। ঠিক পথটা চিনে নিবি একদিন। আমি জানি, তুই পারবি।"

শ্রাবণ এবার কিছু বলল না। গলা খুশখুশ করছিল, চোখ একটু লালও হয়ে উঠেছে। মাথা নিচু করেই দাঁড়িয়ে রইলো। সালমা বেগম এবার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে শুধু বললেন,

—"আমি ওকে বলেছি পাশের রুমে থাকতে। তুই ওকে কিছু বলিস না, দরকার হলে নিরাসক্ত থাকিস। কিন্তু অবহেলা করিস না, অপমান করিস না। কারণ সেটা শুধু ওর জন্য না, তোর নিজের সম্মান রক্ষার জন্যও।"

সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন সালমা বেগম। আর শ্রাবণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো, নিজের ভেতরে চলা দ্বন্দ্বের গভীরে ডুবে।একটা লড়াই শুরু হয়ে গেছে, শ্রাবণের নিজের সাথে।

-------------

নিচের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসতেই সালমা বেগমের চোখে পড়ে, ড্রয়িংরুমের জানালার পাশে রাখা সেন্টার টেবিলটায় বসে রয়েছে ধারা। তার সামনে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা, আর তার বিপরীতে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন সামিউল শেখ। সালমা বেগম থমকে দাঁড়ান এক মুহূর্ত। তার চিরচেনা কঠোর মুখাবয়বে কৌতূহল আর সামান্য আশ্চর্যের ছায়া খেলে যায়। দেখে কত সুন্দর লাগছে! আজ তার মনে হচ্ছে, বাড়িটা পরিপূর্ণ! মেয়েটাও দেখতে কত মিষ্টি!

সামিউল শেখ মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন,

—" শ্রাবণ কি তোমার সাথে বাজে ব্যবহার করেছে?'

ধারা তৎক্ষনাৎ দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,

—" না না, একদম করেন নি।"

সামিউল শেখ মাথা নেড়ে বললেন,

—" হুম,,ঠিক আছে। ছাগলটা তোমার সাথে বাজে ব্যবহার করলে আমায় বলবে ঠিক আছে? ওর পিঠের চামড়া তুলে নেব আমি!"

ধারা ঠোঁট চেপে হেসে মাথা এলিয়ে বলল,

—" জ্বি আচ্ছা, বাবা।"

ধারার মুখে বাবা ডাক শুনে প্রশান্তিতে বুক ভরে উঠলো সামিউল শেখের। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো। খুব শান্তি লাগছে তার! সালমা বেগম একটু দূরে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্যটাই দেখছিলেন। সামিউল শেখের মুখে প্রশান্তির হাসি, ধারার মুখে প্রথমবারের মতো প্রাণ খুলে বলা "বাবা" ডাক—এই একটুকু শব্দেই যেন ঘরের আঙিনাটা আলোকিত হয়ে উঠলো। এতদিন ধরে শূন্য ছিল কিছু—সেই শূন্যতা হয়তো আজ খানিকটা পূর্ণ। তিনি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। নরম পায়ের শব্দে এগিয়ে এলেন সামনের দিকে। ধারা ও সামিউল দুজনেই তাকিয়ে দেখলো তাকে। ধারা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াতে চাইলো, কিন্তু সালমা বেগম ইশারায় থামিয়ে বললেন,

—"বসে থাকো মা। তোমাদের দেখে ভালো লাগছে।"

তার কণ্ঠে ছিল একরাশ প্রশ্রয়, আর চোখে মায়ার কোমল ছায়া। তারপর হাসিমুখে সামিউল শেখ কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

—" এইযে সাহেব, আজকে দুপুরে কিন্তু তোমাকেই খাবার সার্ভ করতে হবে। তোমার পছন্দের মাছ রান্না করছি।"

সামিউল শেখ মাথা নেড়ে হেসে বললেন,

—"আরে আমি তো ঠিক তাই ভেবেই এসেছি। তবে রান্না তুমি করবে না, আমি নতুন গিন্নির হাতের স্বাদটা একটু চেখে দেখব! তুমি তো জানোই না, ধারা কত অসাধারণ রান্না করতে পারে!"

ধারা একটু অপ্রস্তুত হয়ে তাকালো, চোখ নামিয়ে ফেললো লজ্জায়। সালমা বেগম হেসে বললেন,

—' ও আল্লাহ! তাই নাকি? বেশ! আজ তাহলে ও-ই রান্না করবে। আমি পাশে থাকবো, শুধু গাইড করবো। বলা তো যায়না, ছোট মানুষ! হাত-টাত পুড়িয়ে ফেললে?"

বলেই হাসলেন সালমা। অথচ আবারো মুখে অন্ধকার নেমে এলো ধারার। অবাক হয়ে একবার সালমা বেগম কে দেখল, একবার সামিউল কে দেখল। এনারা কি ফেরেশতা! এমনও মানুষ হয়? তারা ধারার হাত পুড়ে যাওয়া নিয়ে চিন্তিত, অথচ আট বছর বয়স থেকেই তো প্রতিনিয়ত রান্নাঘরে হাত পুড়িয়েছে সে। তখন কেনো কেও তাকে এভাবে আগলে রাখেনি? চাচি কেনো তাকে রান্নাঘরে পাঠাত? তাহলে কি সত্যি বাবা-মা ছাড়া কেওই এমন হয়না। "

এক মুহুর্তের জন্য আবেগ আটকে রাখতে পারলনা ধারা। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। সালমা বেগম সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠলেন।

—"এই কী হলো মা! ধারা! তুমি কাঁদছো কেনো?"

তিনি তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে ধারার পাশে বসলেন, তার দুই গাল দুহাতে ধরে চোখের জল মুছাতে চাইলেন। সামিউল শেখও চেয়ার সরিয়ে উঠে এলেন পাশে, গলার স্বর গম্ভীর হয়ে গেল,

—"কি হয়েছে মা? কেউ কিছু বলেছে তোমায়? কাঁদছো কেনো?"

ধারা তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল, ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,

—" উহু, কেউ কিছু বলেনি! আমি শুধু।। আমি শুধু ভাবছিলাম, এত ভালোবাসা.. এত মায়া আমি কোনোদিন পাইনি...এতদিন পর কেউ আমার হাত পুড়ে যাওয়া নিয়ে চিন্তা করছে.. এটা..এটা আমার কেমন যেন লাগছে.. আমি তো ছোট থেকে প্রতিদিনই হাত পা পুড়িয়ে এসেছি মা। আমার হাতে পায়ে এখনো খুন্তির ছ্যাঁকার দাগ আছে। ওরা কেও কখনো আমাকে আপনাদের মত ভালোবাসেনি কেনো? এতিম বলে সবসময় মারতো আমায়! কেনো মারত! শুধু কি যারা বাবা-মা হয়, তারাই এত ভালোবাসে?"

অসহায় চোখে স্বামীর দিকে তাকালেন সালমা বেগম। সামিউল শেখও চোখে পানি নিয়ে তাকালেন। এ কি জীবন! সালমা বেগম ধারা-কে বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। যেন নিজের হৃদয়ের গভীর থেকে ভেসে আসা সবটুকু মমতা এক মুহূর্তে ঢেলে দিলেন তার বুকের মাঝখানে।

—"না মা, না! কেবল যারা গর্ভে ধারণ করে, তারাই মা হয় না। ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় সম্পর্ক গড়ে তোলে। তুই এখন থেকে দেখবি, এই ঘরেই তোর জন্য এত মায়া জমে থাকবে, যতটা তোর সারা জীবন কেউ দেয়নি।"

সালমার কণ্ঠ কেঁপে উঠছিল। কান্না যেন গলায় দলা পাকিয়ে আসছিল, কিন্তু সে তা গিলে ফেলছিল বারবার, যাতে ধারা শক্ত থাকতে পারে। ধারা তার গাল মায়ের গলায় লুকিয়ে ফেলল, শ্বাস আটকে আটকে বলতে লাগলো,

—"আমি আর কখনো কাঁদতে চাই না মা। আমি শুধু একটু ঠাঁই চাই..একটু ভালোবাসা। আপনি কি আমাকে সত্যি সত্যি মা বলতে দেবেন?"

সালমা আর কিছু বলতে পারলেন না। শুধু মাথা নেড়ে, কপালে চুমু খেলেন ধারার। এক মুহুর্তের জন্য আবিষ্কার করলেন, তার ভাবনামতে মেয়েটা মোটেই বোবা নয়। অনেক কথা বলতে পারে, অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু পরিবেশের জন্য কখনো কথা বলতে পারেনি। সালমা এবার তার চোখের পানি এবার আর আটকাতে পারলো না।

সামিউল শেখ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন এতক্ষণ। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে এগিয়ে এলেন। একটা হাত রাখলেন ধারার মাথায়। নরম কণ্ঠে বললেন,

—"ধারা, তুমি শুধু এইটুকু মনে রাখো, তোমার কষ্টগুলো আজ থেকে ভাগ হয়ে গেছে। এখন তোমার পাশে আমরা আছি। তুমি মোটেই এতিম নও। আমি তোমার বাবা আছি তো!"

ধারার বুকটা আরও গভীরভাবে ভরে উঠলো। তার ভেতরে জমে থাকা বহু বছরের একা থাকার ইতিহাস, দুঃসহ যন্ত্রণার অন্ধকার কুয়োটা যেন আজ একটু আলোর রোদ পেতে শুরু করলো। তার কণ্ঠ থেমে গেল কাঁপতে কাঁপতে।

সালমা বেগম তাকে বুকের মাঝে টেনে নিয়ে বললেন,

—"এখন থেকে কেউ তোকে কষ্ট দিতে পারবে না। এই ঘরটা তোর ঘর, আমরাও তোর আপন।"

ধারার চোখের পানি যেন থামতে চায় না। সে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না। বুক ভরে হেঁচকি দিয়ে কেঁদে ফেললো। সামিউল শেখ এবার গভীর গলায় বললেন,

—"তুই শুধু ভালো থাকিস মা। তোর জীবনের সব হারানো জিনিস আমরা ফেরাতে পারবো না জানি, কিন্তু বিশ্বাস কর, আমরা তোকে আর ভাঙতে দেব না। এখন থেকে তুই ভালোবাসা পাবি। যতটা তুই পাওয়ার কথা ছিল ছোটবেলায়, ততটাই।"

ঘরটা তখন নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছিল কয়েক মুহূর্তের জন্য। শ্রাবণ নিচের সিঁড়ি বেয়ে নামছিল, হাতে দুইটা ফাইল, চোখে অফিস যাওয়ার তাড়া। ও ফাইল গুলো খুঁজতেই এতক্ষণ উপরে ছিল। কিন্তু মাঝপথেই থমকে দাঁড়াল। ড্রয়িংরুমের দিক থেকে ভেসে আসা অস্ফুট কান্নার শব্দ তাকে কেমন যেন কুঁচকে দিল ভেতরে ভেতরে। পা টিপে টিপে এগিয়ে এলো, আর সামনে যা দেখলো, তাতে ভ্রু কুঁচকে গেল তার।

জানালার পাশে ধারা তার মায়ের বুকে মুখ গুঁজে কাঁদছে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। সালমা বেগম একহাতে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন, অন্যহাতে আঁচল দিয়ে চোখ মুছাচ্ছেন। পাশেই সামিউল শেখ স্থির দাঁড়িয়ে, মুখে গম্ভীরতা আর চোখে মায়ার ছায়া।

শ্রাবণ একটু অবাক হলো। এই তো মেয়েটাকে ঠিক দেখেছিল! এখন আবার কাঁদছে কেনো? এক পলক ধারার চোখের দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলল শ্রাবণ। মেয়েটাকে এভাবে দেখে খারাপ লাগছে নাকি তার! সে কণ্ঠে খানিক বিরক্তি মিশিয়ে বলল,

—" ও কাঁদছে কেনো?"

তার গলায় যেন অভ্যস্ত স্বর। অস্বস্তিকর পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য একরকম রোবটিক হয়ে উঠেছে সে। শ্রাবণের কন্ঠে ধারা তখনো মাথা নিচু, চোখ মুছছে চুপচাপ। সালমা বেগম ধীরে মাথা ঘুরিয়ে ছেলের দিকে তাকালেন। শান্ত কণ্ঠে বললেন,

—" তুই ওকে সোফাতে ঘুমোতে দিয়েছিলি তো। ওখানে ঘুমিয়ে ওর পুরো শরীর ব্যথা হয়ে গেছে। তাই কাঁদছে!"

এক মুহুর্তের জন্য মুখ কুঁচকে হতবাক হলো শ্রাবণ। ধারাও কান্না ভুলে ভ্যাবাচেকা খেলো। কীসের ব্যাথা? কোথাকার ব্যাথা! সে তো এমন কিছু বলেনি। অথচ সামিউল শেখ মুচকি হাসলেন, ফট করে ধরে ফেললেন স্ত্রীর চালাকিটা। শ্রাবণ কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বিষয়টা নিয়ে ভাবান্তর হলো, এরপর বিরক্তিতে চ শব্দ করে বলল,

—" মানেহ? কী বাজে কথা বলছো মা? সোফায় ঘুমিয়ে শরীর ব্যাথায় কেও কাঁদে?"

সালমা বেগম আরো খেপলেন,

—" চুপ কর তুই বেয়াদব ছেলে। তোর জন্যই ওর পুরো শরীর ব্যাথা হয়ে গেছে। একটা মেয়েকে, তাও নতুন বউ, ঘুমানোর জায়গা না দিয়ে বসার সোফায় ঠেলে দিলে শরীর ব্যথা তো হবেই! তার উপর ও আবার গায়ে পড়ে তো কিছু চায়নি, বরং মুখ বুঁজে কষ্টটা সয়ে নিয়েছে! এতটুকু সহানুভূতি তোর ভিতর নেই?"

সালমা বেগমের কণ্ঠে রাগের সঙ্গে হতাশার মিশ্র সুর। তিনি নিজের অজান্তেই ঝাঁঝিয়ে উঠলেন। ধারার মুখে ততক্ষণে বিস্ময়ের ছায়া। এসব কী হচ্ছে? কীভাবে হচ্ছে? সে তো এসব কিছু বলেইনি! শ্রাবণ থতমত খেয়ে তাকিয়ে থাকল। ধারা যেন শিউরে উঠল। সে তো কিছু বলেনি, একেবারেই না। তাহলে এ কথাগুলো সালমা বেগম বলছেন কীভাবে? আর তাতেই ধারা বুঝে ফেলল, এই কথাগুলো সালমা বেগম ইচ্ছা করেই বানিয়ে বলছেন, যেন শ্রাবণ একটু গলে, একটু থেমে ভাবে, একটু হলেও নিজের আচরণ নিয়ে লজ্জা পায়।

ধারার বিস্মিত মুখ দেখে সালমা বেগম ভেতরে ভেতরে হাসলেন। তিনি জানেন, সবসময় সত্যি বলে কিছু অর্জন করা যায় না, কিছু মানুষকে গলাতে হলে কল্পনার আগুনে মিথ্যার একটু তেল দিতে হয়। আর আজ, তিনি সেই আগুনটাই জ্বালালেন।

শ্রাবণ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

—"ওকে, ওকে... এত ড্রামাটিক হবার কিছু নেই। আজ থেকে আলাদা ঘরে তো থাকবেই! বিছানাতে শুতে পারবে!"

তার মুখে বিরক্তি, কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত অপরাধবোধ খেলে গেল। ধারা কাঁদছে,এই দৃশ্য তাকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। কিন্তু সে বুঝে উঠতে পারছে না, কেন!

সামিউল শেখ এতক্ষণ চুপচাপ থাকলেও এবার গলা পরিষ্কার করে বললেন,

—"ছাড়ো সালমা, ছেলেটাও তো হুট করে এমন পরিস্থিতিতে পড়ে গেছে। সময় লাগবে বুঝে নিতে। তবে একটা কথা বলি শ্রাবণ, মেয়েটা কিন্তু মন দিয়ে আপন করে নিতে জানে। আজ ওর রান্না খেলে বুঝবি।"

শ্রাবণ বিস্মিত চোখে বাবার দিকে তাকাল। তারপর ধারাকে পর্যবেক্ষণ করে বলল,

—"ও রান্না করবে?"

সালমা বেগম এবার মুখ টিপে হাসলেন,

—"হ্যাঁ, তোর পছন্দের কিছু রান্না হবে আজ। নতুন বউয়ের হাতের। তুই অফিস থেকে ফিরে চেখে দেখিস!"

ধারা মাথা নিচু করে ফেলল, আর শ্রাবণ এবার অবাক চোখে তাকাল একবার তার দিকে। মেয়েটার চোখে এখনো পানি, কিন্তু মুখে সেই পুরনো অসহায়তা,আর আছে একটা টুকটুকে মনের আলগা হাসি। সে যেন বুঝেও কিছু বললো না, ধীরে পা বাড়ালো দরজার দিকে। কিন্তু যাবার আগে থমকে একবার পেছনে ফিরে তাকাল মায়ের চোখে, তারপর বাবার মুখে, শেষমেশ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ধারার দিকে।

ধারার চোখে এখনো পানি, কিন্তু সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল অন্যদিকে। নিজেকে লুকাতে চাইল যেন।

শ্রাবণ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

—"আমি অফিস যাচ্ছি। দেরি হয়ে যাবে।"

তার কণ্ঠে এখন আর আগের কষ্টটুকু ছিল না, কিন্তু পুরোপুরি কোমলতাও নয়—একটা দ্বিধা, একটা অস্বস্তি।

ধারার দৃষ্টি তখন জানালার বাইরে, আলো এসে পড়েছে তার গালে। লোকটা কি তাকে উদ্দেশ্য করে বলল যে অফিস যাচ্ছে। বাইরে এসে শ্রাবণের ঠোঁটের কোণে একটু টান পড়লো, যেটা সে নিজেও বুঝে উঠলো না। এবং ঠিক তখনই ঘরের বাতাসটা একটু হালকা হলো। আর সালমা বেগম ধীরে ধীরে বললেন,

—"বরফ গলতে শুরু করেছে...!"

সামিউল শেখ শুনতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

—" মানে?"

সালমা বেগম বাঁকা হেসে বললেন,

—" তোমার ছেলেকে হাড়ে হাড়ে চিনি আমি। দেখলে না, সামান্য কান্না করতে দেখে কেমন করে থমকে দাঁড়ালো! কবুল শব্দের একটা টান আছে বুঝলে। তোমার ছেলের ওসব ঢঙ বেশিদিন চলবেনা। আমি আরেকটু উসকানি দেব দেখো। যেই ধারা কে আজ আমি পাশের ঘরে শিফট করবো, সেই ধারাকে একদিন তোমার গুনধর ছেলে নিজ হাতে কোলে করে নিজের ঘরে নিয়ে যাবে। কথাটা মিলিয়ে দেখো। তোমাদের বংশ তো! রক্ত চেনা আছে আমার!"

চলবে...........

।।-- গল্পটা কেমন লাগছে, মন্তব্য করে অবশ্যই জানাবেন। আপনাদের রেসপন্স না পেলে লেখার আগ্রহ পাইনা। আজ যদি ৭০০+ রিয়েক্ট ওঠে, তবে কালই পরবর্তী পর্ব পাবেন❤️‍🔥।

#পর্ব_৩

#কলমে_অনামিকা_তাহসিন_রোজা

গল্প ঘর

https://www.facebook.com/share/1AYhCCqwqL/

https://www.facebook.com/share/g/1AufQdkZf8/

এই গল্পের নেক্সট পার্ট এর হাইলাইট নোটিফিকেশন পেতে অবশ্যই কমেন্ট অথবা follow ফলো করে রাখুন..!

গল্প ঘর

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন