#শ্রাবণ_ধারার_রূপকথা
#শ্রাবণ_ধারার_রূপকথা
#পর্ব_৪
#কলমে_অনামিকা_তাহসিন_রোজা
দুপুরের মধ্যেই ধারার অবস্থান পুরোপুরি বদলে দিলেন সালমা বেগম। সব জিনিসপত্র শ্রাবনের ঘর থেকে সরিয়ে পাশের ঘরে এনে দিলেন। তাদের বাড়িতে কাজ করা বাবু ভাইকে দিয়ে ঘরও পরিষ্কার করে নিলেন। ঘরে ঢুকে অবাক না হয়ে পারল না ধারা। এত সুন্দর করে সাজানো গোছানো দেখে একটু হতবাক হলো বটে। তবে মনে মনে একটু খুশি হলো। আজ সে তাহলে বিছানায় ঘুমোতে পারবে। সালমা বেগম ধারার হাত ধরে টেনে বারান্দার দিকে নিয়ে আসলেন, মুখে বললেন,
—" দেখো বউমা, এই যে বারান্দা। তুমি চাইলে এখানে এসেও সময় কাটাতে পারো। এ বাড়ির সবচেয়ে সুন্দর বারান্দা এটা।"
কথা মিথ্যে নয়। আসলেই খুব সুন্দর! ধারা অবাক হয়ে চারপাশে তাকালো। বারান্দার বাঁ দিকে ঝুলছে রঙবেরঙের হ্যাংগিং পট, যেগুলোর প্রতিটাতে ফুটে আছে বাহারি ফুল, বেগুনী পেটুনিয়া, লাল গোলাপ, জিনিয়া, হলুদ রঙের নাম না জানা ফুল। নিচে সাজানো টবগুলোর ভেতরেও নানান জাতের গাছ, কিছুতে ছোট ছোট লেবু ধরেছে, কিছুতে পুদিনা আর তুলসি। পাশে রাখা ছোট্ট টেবিলে সাদা টেবিলক্লথ, যার ওপর রাখা রয়েছে একটি চায়ের কাপ আর একটি বই।
ধারা একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সেই সবুজে মোড়া কোণার দিকে। মুখে যেন নিজের অজান্তেই একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠলো। এত শান্ত, এত আপন পরিবেশ সে অনেকদিন পর দেখছে। সালমা বেগম ওর দিকে তাকিয়ে আবার বললেন কোমল গলায়,
—"দেখো মা, এখানে বসে বিকেলে চা খাও, বই পড়ো, অথবা চুপচাপ থেকো। কেও তোমায় বিরক্ত করবে না। তুমি এই বাড়ির মানুষ, নিজের বাড়ির মতোই মনে করে থেকো।"
ধারা চোখ নামিয়ে চুপ করে থাকলেও, মনটা ভরে উঠলো মায়ায়। অনেক না বলা অনুভব যেন চোখের কোণে এসে ভিড় করলো। সে ধীরে মাথা নাড়ল, তারপর হালকা গলায় বলল,
—"ধন্যবাদ, মা। এতটা ভাববেন ভাবিনি..আচ্ছা ফুলগাছ গুলো কি আপনার হাতের? "
সালমা বেগম হেসে বললেন,
—" হ্যাঁ ওই আর কি। মাঝে মাঝে শখ করে করতাম। আজকাল আর এসব করা হয়না। সপ্তাহে দুদিন যত্ন নিতে পারি।"
ধারা এবার হুট করেই উৎফুল্লিত হয়ে বলল,
—" মা, আমারও না বাগান করার খুব শখ। গ্রামে কখনো চাচি এসব করতে দেয়নি। আপনি অনুমতি দিলে এই বাগানটা আমি নিজের মত করে সাজাই? একটুও নষ্ট করব না। যত্ন করব!"
বাচ্চাদের মত করে করা আবদার টা শুনে সালমা হেসে কাঁধে হাত রাখলেন,
—" অবশ্যই। এ ঘরটা তোমাকেই তো দিলাম, বারান্দাও তোমার। এসব করার তো সময় নেই আমার। তুমি নিজের মত করেই সাজাও, গোছাও। তোমারই তো সংসার!"
" সংসার!" শব্দটা শুনে বুক ধ্বক করে উঠলো ধারার। সংসার! তার সংসার! কার সাথে? ওই লোকটার সাথে! কিন্তু এটাকে কি সংসার বলে? কি জানি! এর মধ্যেই হুট করে ধারা লক্ষ্য করল শ্রাবণের ঘর টা ঠিক পাশে হওয়ায় এই বারান্দা থেকে শ্রাবণের ঘরের বারান্দা টা ঠিক দূরে নয়। অনেকটা কাছে, এতটাই কাছে যে হাতে হাতে কিছু দেয়া-নেয়াও করা যাবে। বিষয়টা খুব অসাধারণ হলেও ধারার ভয় হলো। লোকটা যদি বারান্দায় আসে, তাহলে তো অবশ্যই তাকে দেখতে পাবে। একদম সামনাসামনি দেখা যাবে। ধারার দৃষ্টি অনুসরণ করে সালমা বেগমও তাকালেন। শ্রাবণের সাদামাটা বারান্দা টা দেখে তিনি হেসে বললেন,
—" আমার ছেলে বারান্দায় কখনো আসেনা বউমা। দেখো, কতটা শূন্য হয়ে পড়ে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কতটা অযত্ন করে। ও তুমি ভেবো না। ও বারান্দাতে এমনিতেও আসেনা, তাই তোমায় দেখতেও পাবেনা। কিছু বলবেও না!"
ধারা মৃদু হাসল, তবু যেন তার চোখে এক অজানা দ্বিধা রয়ে গেল। এই বাড়ির বারান্দায় তার নিজের জন্য জায়গা হলেও, পাশের ঘরের বারান্দা টা, জানালাটা যেন একটা অদৃশ্য দেয়ালের মতো মনে হচ্ছে ওর কাছে। ভেতরে হঠাৎ একটা চুপচাপ শূন্যতা জমে উঠল, সেটা ভয় না লজ্জা, ধারা নিজেও ঠিক বোঝে না। সে চোখ নামিয়ে ধীরে বলল,
—"তবু আমি খুব জোরে কথা বলবো না, মা। যদি অসুবিধা হয় ওনার... মানে, বিরক্ত হন!"
সালমা বেগম এবার মুখের মধ্যে একটা দুষ্টু হাসি এনে বললেন,
—"আহা! এত ভাবার কিছু নেই! ও কিছুই বলবে না। বরং যদি কখনো বলে, তবে আমি আছি না? তখন আমি বুঝে নেব। তুমি নির্ভয়ে তোমার বাগান করো মা, মন খারাপ হলে এখানেই বসে থেকো।"
ধারার মুখে এবার সত্যিকারের একটা হাসি ফুটে উঠল। গলায় এক ফোঁটা কৃতজ্ঞতা লেগে রইল। তার শৈশবের সমস্ত রুক্ষতা যেন একটু একটু করে ঝরে যাচ্ছে সময়ের এই নতুন অধ্যায়ে। তবে নিজের মনেই তখন এক চাপা ভাবনা ঢুকে পড়ে—"এই সংসারে জায়গা পেয়ে গেছি হয়তো, কিন্তু শ্রাবণ নামের মানুষটার সাথে আমার কখনো জায়গা হবে?" সে প্রশ্নের উত্তর তখনো ঝাপসা, কিন্তু বারান্দার ফুলগাছগুলো ঠিকই রোদে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। আর ধারা বুঝে যায়,কোনো সম্পর্কের শিকড় গজানোর আগে প্রয়োজন হয় যত্ন, সময়, আর একটুখানি জায়গা। সেটা সে পেয়েছে। এখন হয়তো শুরুটা এখান থেকেই।
--------------
দুপুরে খেতে এসেছিল শ্রাবণ। ধারা তখন গোসল করছিল, নাহলে দেখত একটা লোক তার রান্না খেয়ে কতটা অভিভূত হয়েছে। না চাইতেও মাছের তরকারিটা খেয়ে মনে মনে বেশ প্রশংসা করেছে শ্রাবণ। এতটুকু মেয়ে হয়ে এত সুন্দর করে কীভাবে রান্না করল ভেবে পেল না শ্রাবণ। তবে সবার আড়ালে সে আরো দু চামচ তরকারি বেশি খেয়েছে। দুপুরে খাওয়ার পর অফিসে ফিরে গেছে সে। তাই ধারার সাথেও আর দেখা হয়নি। এদিকে সালমা বেগম ধারার প্রথম রান্নায় খুশি হয়ে এক জোড়া সোনার চুড়ি উপহার দিয়েছে, যা নিতে নারাজ ছিল ধারা। মোটামুটি জোরজবরদস্তি করেই তাকে দিতে হয়েছে।
রাত আটটায় বাড়ি ফেরার কথা শ্রাবণের। কিন্তু আজ কোনো এক কারনে সে বিকাল চারটার পরেই আবারো বাড়িতে ফিরে এসেছে। বিষয়টা চশমার আড়াল থেকে লক্ষ্য করলেন সামিউল শেখ, তারপর নিজের স্ত্রীর দিকে ইশারা করে কিছু একটা বোঝালেন। যা বোঝার বুঝলেন সালমা বেগম। জগ থেকে ঠান্ডা পানি ঢাললেন তিনি।
শ্রাবণ সোফায় বসে ল্যাপটপের ব্যাগ রাখলো, গায়ের কোটটা খুলে সোফাতে মেলে দিল। ক্লান্তিতে বড় করে শ্বাস নিতেই চোখের সামনে ঠান্ডা পানির গ্লাস দেখতে পেলো। সালমা বেগম চোখ দিয়ে গ্লাসটা নিতে ইশারা করলে শ্রাবণ ঢকঢক করে পানি খেয়ে ফেলে। মুখে "থ্যাংক ইউ মা" বলে। এ পর্যায়ে সালমা সন্দিহান হয়ে জিনিস করেন,
—" ব্যাপার কী শ্রাবণ? তোর তো এখন বাড়িতে ফেরার কথা না। রাত আটটায় ফেরার কথা। এত তাড়াতাড়ি চলে এলি কেনো?"
একটুও অপ্রস্তুত হলো না শ্রাবণ। নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
—" কাজ হয়ে গেছে তাই ফিরেছি। আর ওই অফিসে যে ছোট আব্বু আমাকে কোনো কাজ করতেই দেয়না সেটা খুব ভালো করে তোমরাও জানো। শুধু শুধু থেকে সময় কেনো নষ্ট করব?"
তীক্ষ্ণভাবে ছেলের কথাগুলো শুনলেন সালমা বেগম। তিনি জানেন শ্রাবণ কখনো খুব বেশি কথা বলে না, কিন্তু যা বলে তা ভেবে-চিন্তেই বলে। এবারও তার কথায় যেন একটা চাপা অভিমান লুকানো। পাশে বসে থাকা সামিউল শেখ তখন মুখ গম্ভীর করে বললেন,
—"শুধু চাচার কথা বললি, নিজের দায়িত্বটা বলিস না কেনো? ওটা তো এখন তোকে বুঝতেই হবে।"
শ্রাবণ এবার একটু বিরক্ত গলায় বলল,
—"দায়িত্ব মানে? দায়িত্ব যদি শুধু ছোট আব্বুর কথামতো চুপচাপ বসে থাকা হয়, তাহলে আমি সে দায়িত্ব রাখতে পারব না। আমি অফিসে গিয়ে বসে থাকি, যেন আমি কোনো নিরীহ প্রাণী! কাগজপত্র তো আমাকেই পড়তে হয়, তবুও সিদ্ধান্ত আসে ছোট আব্বুর মুখ থেকে! তাহলে সেখানে আমার থাকার মানে কী? আর তাছাড়া কঠিন কাজগুলো ছোট আব্বু আমাকে করতে দেয়না!"
চুপচাপ বসে থাকা সালমা বেগম এবার একটু নরম স্বরে বললেন,
—"ছোট আব্বুর সঙ্গে কাজ করাটাই তো আসলে শেখা, বাবারে। তুই তাড়াহুড়ো করছিস কেনো? তুই এরপর থেকে পুরো অফিস সামলাবি বলেই এখন শুধু তোকে দেখতে বলছে হয়তো। শিখে রাখ শুধু!"
শ্রাবণ ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,
—"আমি কাজ শিখতে চাই মা। কিন্তু এমনভাবে নয়, যেখানে আমাকে শুধু নামেই রাখা হয়। আজকে একটা কাজ নিয়ে কথা বলতে গিয়েছিলাম, উনি বললেন, ‘তুমি এখনো বুঝবে না শ্রাবণ'। এই ‘বুঝবে না’ কথাটা শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত। আমি তো কোনো স্কুলের ছাত্র না যে উনি আমাকে বোঝাতে থাকবেন আমি ছোট।"
সামিউল শেখ এবার চোখ সরু করে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর শান্ত গলায় বললেন,
—"তুই কি আলাদা কিছু ভেবে রাখছিস শ্রাবণ?"
শ্রাবণের চোখে এবার একটা স্থির আলো দেখা গেল। সে মাথা হেঁট করে বলল,
—"ভেবেছি, আব্বু। কাল থেকে অফিসে যাব। তবে আমি কাজও করব। তুমি ছোট আব্বুকে বলে দেবে যাতে আমার প্রতি অত ভালোবাসা না দেখায়। একটু কাজ করলে আমি শুকিয়ে যাচ্ছিনা। ছোট আব্বু অনেক ভালোবাসে আমায়, তাই তোমাকে দেখাতেই শুধু অফিসে থাকতে বলে। আর নিজের মতো কিছু করার ইচ্ছে আছে আমার। কাজের মর্যাদা চাই। সম্মানের সাথে শিখতে চাই, ছোট করে রাখার মধ্যে শেখা হয় না।"
সালমা বেগম হঠাৎ হো হো করে হেসে ফেললেন,
—"আল্লাহ! আমি তো ভাবছিলাম তুই বুঝি চাকরি ছেড়ে দিবি! এই ছেলে আবার এত হঠাৎ কবে বড় হলো, ভাবলাম হয়তো নিজের ব্যবসা-ট্যবসা নিয়ে কিছু ভাবছিস!"
সামিউল শেখও হেসে ফেললেন এবার। একটু যেন হালকা হলেন। কণ্ঠে প্রশ্রয় মেশানো সুরে বললেন,
—"তুই যদি এসব ভাবিসও, তাতেই বা দোষ কী? আমরা কি তোর শত্রু যে তোকে ছোট রাখতে চাইবো? কিন্তু যে গাছকে বড় করতে হয়, তার আগা ছেঁটে দিতে হয় মাঝে মাঝে। বুঝলি? তোর ছোট আব্বুর অভিজ্ঞতা অনেক, সময় নিয়ে চিন্তা কর।"
শ্রাবণ মাথা নিচু করে শুনছিল। এবার ধীরে মাথা তুলে বলল,
—"আমি বুঝি আব্বু, কিন্তু মাঝে মাঝে আমার কেমন লাগে জানো? মনে হয় আমি যেন শুধু একটা ছায়া, যার কাজ বসে থাকা আর হাসি দেওয়া। অথচ আমি চাই আমারও কিছু হোক, এমন কিছু যেটা আমি নিজে বানিয়েছি, নিজে বুঝি, নিজে কাঁদি বা হই আনন্দিত।"
এই কথা শুনে সালমা বেগম এবার গম্ভীর হলেন। ছেলের দিকেই তাকিয়ে বললেন,
—"তুই যা বললি, সবই ঠিক। কিন্তু একদিন তোর এই ছায়ার ভেতর থেকেও আলো ফুটে উঠবে, মা’র কথা মনে রাখিস। তোর সময় আসবে। কষ্ট কর, তুই পারবি।"
শ্রাবণ হালকা মাথা নাড়ল। মুখে স্পষ্ট গাম্ভীর্য, কিন্তু চোখে ছিলো একটা গভীর আত্মবিশ্বাসের রেখা। শ্রাবণ এবার ব্যাগট্যাগ নিয়ে নিজের ঘরের দিকে যেতে শুরু করল। সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই কিছু একটা মনে পড়ল তার। কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে ডাকলো সালমা বেগম কে,
—" মা, একটু এদিকে এসো তো!"
সালমা এলেন। শ্রাবণ এবার ঠোঁট ভিজিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করল। সালমা ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। হঠাৎ শ্রাবণের এমন অসস্তির কারন বুঝলেন না, নিজ থেকেই জিজ্ঞেস করলেন,
—" কী রে? কী হয়েছে?"
শ্রাবণ এবার নিজের ব্যাগ থেকে একটা শপিং ব্যাগ বের করল। এরপর সালমা বেগমের হাতে ধরিয়ে দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
—" আআ..আসলে, সকালে দেখলাম ও পুরোনো সালোয়ার কামিজ পড়েছে। আর শাড়ি তো সামলাতে পারেনা। তাই এগুলো..নতুন সালোয়ার কামিজ, আর একটা গাউন নিয়ে এলাম। ওকে দিও।"
বলেই বাম হাতে ঘাড় ডললো শ্রাবণ। ভীষণ অপ্রস্তুত সে। ঘেমে গেছে এটুকু কথা বলতে। সামিউল শেখ দূর থেকে মা ছেলের কথা বুঝলেন না। কিন্তু ছেলেকে আমতা আমতা করতে দেখে অবাক হয়ে চশমা ঠেললেন। বাপরে! তার কাঠখোট্টা, নিরামিষ ছেলে আবার লজ্জাও পায়?
সালমা বেগম চোখ সরু করে হাতের শপিং ব্যাগ টা নেড়েচেড়ে দেখলেন। কার জন্য এনেছে, এটা খুব ভালো করে জানার পরেও সরল মুখ করে জিজ্ঞেস করলেন,
—" কার জন্য এনেছিস?'
বিরক্ত হলো শ্রাবণ। তবে বুঝলো না নিজের মায়ের এমন চালাকি। ঠোঁট ভিজিয়ে মিথ্যে রেগে গিয়ে জোর গলায় বলল,
—" মা, তোমার কি দিনদিন বুদ্ধি লোপ পাচ্ছে। তোমার জন্য এসব সালোয়ার কামিজ আনব নাকি? ওর জন্য এনেছি!"
সালমা বেগম মুখ কুঁচকে না বোঝার ভঙ্গিতে বললেন,
—" ও টা কে? ও বলতে কাকে বোঝাচ্ছিস!"
এ পর্যায়ে কুঁচকানো ভ্রু শিথিল হলো শ্রাবণের। সালমা বেগমের চোখের দিকে অসহায় মুখে তাকালো। এক মুহুর্তেই বুঝলো যে, তার মা ইচ্ছে করে এমনটা করছে৷ বিষয়টা বুঝতে পেরে আরো অপ্রস্তুত হলো শ্রাবণ। অথচ গাম্ভীর্য ধরে রাখতে বিরক্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছে বলল,
—" পাশের বাড়ির আন্টির ছোট মেয়েটার জন্য এনেছি। হয়েছে? যাও দিয়ে এসো পাশের বাড়িতে! যতসব নাটক! পুরো পরিবার আমার নাটক করা শিখেছে! "
বলেই একটুও সময় নষ্ট করল না শ্রাবণ। নিজের অসস্থি লুকোতে হনহন করে উপরে উঠে পড়ল। নিজের ঘরে ঢুকেই ঠাস করে দরজা লাগালো৷ ছেলের এহেন কান্ডে ফিক করে হাসলেন সালমা বেগম। হাসতে হাসতেই সামিউল শেখের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বললেন,
—" তোমার ছেলে ভাঙবে তবু, মঁচকাবেনা। দেখেছো, ধারার যে ভালো জামাকাপড় নেই, সেটা ঠিকই খেয়াল করেছে। আসলেই,! ওকে তো সব নতুন শাড়ি দেয়া হয়েছে। কিন্তু বেচারি তো শাড়ি সামলাতে পারেনা।"
সামিউল শেখও অবাক হলেন ছেলের এমন দায়িত্ব দেখে। হাতের পেপারটা উল্টে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন,
—" বাহবা! অবাক করার মত বিষয়! বুদ্ধিসুদ্ধি আছে তাহলে? আমি তো ভেবেছিলাম এখনও ছাগলই রয়ে গেছে। নাহ, তোমার ছেলে এখন ছাগল থেকে গরুতে পরিণত হচ্ছে। উন্নতি হয়েছে বটে। "
------------
ঠাস করে ঘরের দরজা বন্ধ করে হাতের ব্যাগ ল্যাপটপ সব বিছানায় ছুঁড়ে মারল শ্রাবণ। ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ল বিছানায়। তার আসলেই বেশ অসস্তি হচ্ছে। সে কি ইচ্ছে করে এ কাজ করেছে নাকি? সকালে যখন ধারাকে দেখল, তখনই দেখলো মেয়েটার পরনের জামাটা বেশ পুরোনো। আর শাড়ি তো পড়তে পারছেনা। গত রাতেও তো বলল, কিছুই আনেনি গ্রাম থেকে। এই জন্যই তো শ্রাবণ প্রথমবারের মত মা ব্যতিত অন্য কোনো মেয়ের জন্য জামাকাপড় কিনে এনেছে। এতে এত অবাক হওয়ার কি আছে? সত্যি বলতে মায়া হচ্ছিল শ্রাবণের, তাই ও এ কাজ করেছে। তাই বলে যে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে তা তো না। নিজেকে বুঝ দিল শ্রাবণ। প্রতিবারের মত ভাবল তার মা সালমা বেগম দুই লাইন বেশি বুঝে। সবসময় উল্টোপাল্টা চিন্তা ভাবনা!
চোখ বন্ধ করে ঠোঁট গোল করে শ্বাস ছাড়তেই এতক্ষণ পর শ্রাবণ লক্ষ্য করল তার ঘরটা আগের মত হয়ে গেছে। আলমারির সামনে গত রাতে থাকা নীল রঙের ব্যাগটাও নেই। আশেপাশে ওই মেয়েটার চিহ্নও নেই। তার মানে মেয়েটা ইতোমধ্যেই তার ঘর থেকে চলে গেছে। মনে মনে খুশি হলো শ্রাবণ। যাক, এবার একটু শান্তিতে থাকা যাবে। চারপাশ টা ঠিকঠাক দেখে নিয়ে গোসল করার প্রস্তুতি নিল সে।
শ্রাবণ ওয়াশরুমে ঢুকে গেলেও, ঘরের চারপাশের নিঃশব্দতা ঠিক যেন কিছু বলছিল। সেই নীরবতার ফাঁকেই বারান্দা দিয়ে এক ফালি হাওয়া ঢুকে জানালার পর্দা সরিয়ে দিলো। ওর ঘরের ঠিক পাশের বারান্দায় খোলা চুলে দাঁড়িয়ে ছিল ধারা। ছিমছাম, একদম সাদামাটা পোশাকে।
গোসলের জন্য তোয়ালে আর পায়জামা নিয়ে বাথরুমে ঢুকতেই শ্রাবণ হালকা ভ্রু কুঁচকাল। ফ্লোরে পানি জমে আছে খানিকটা, কিন্তু তার মাঝেই একটা অদ্ভুত কিছু চিকচিক করছে। চোখ আটকালো জিনিসটায়। গা থেকে শার্ট খুলে সজোরে একবার ঝাঁকিয়ে পাশের হুকে ঝুলিয়ে রাখল সে। তারপর পানির ধারায় পা ভেজানোর আগেই তার চোখ আটকে গেল সেই ঝিলমিল জিনিসটার উপর। সে নিচু হয়ে দেখল, একটা সোনার চেইন পড়ে আছে বাথরুমের টাইলসে। খুব পাতলা না, আবার খুব ভারীও নয়। চেনটা একপাশে সামান্য ঘষা লেগে আছে, অনেকবার ব্যবহার করা হয়েছে তাহলে। শ্রাবণ হাত বাড়িয়ে তুলল চেইনটা, কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হালকা একটা নিঃশ্বাস ফেলল। সকালে তো ধারা গোসল করেছে এখানে। আর এই বাথরুমে শ্রাবণ ছাড়া এমনিতেই কেও আসেনা। তাহলে চেইন টা ওই মেয়েটারই হবে। হঠাৎই যেন অস্বস্তি আরও বেড়ে গেল শ্রাবণের। এক হাতে চেনটা ধরে দাঁড়িয়ে ভাবল, এখন যদি এটা সালমা বেগমের হাতে দিয়ে ধারাকে ফিরিয়ে দিতে বলে, তাহলে আবারো উল্টোবাল্টা বুঝবে তার আদর্শ মা। তাই নিজ হাতেই ধারাকে এটা ফিরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল শ্রাবণ।
গোসল সেড়ে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গা ঝাড়া দিতেই শ্রাবণের এক মুহূর্তে মনে পড়ে গেল, ওই ব্যাগটায় সেই সালোয়ার কামিজ আর গাউন, ওসব কি মেয়েটাকে দিয়েছে? হুট করে কেমন যেন ধুক করে উঠল তার বুকটা। কী ভাববে মেয়েটা? মা যে এখনই দিয়ে দেবে ওকে, সেটা তো নিশ্চিত। এখন যদি বলে যে আমি এনেছি? তাহলে তো...দীর্ঘশ্বাস ফেলল শ্রাাবণ। যা ভাবে ভাবুক গিয়ে! সে তো এনেছে মায়া হয়েছে তাই।
টি শার্ট গায়ে জড়াতেই শ্রাবণের ঘরের দরজায় টোকা পড়ল।
—"শ্রাবণ, দরজা খোল তো। গোসল হয়েছে? "
সালমা বেগমের কণ্ঠ। শ্রাবণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজা খুলে দাঁড়াল। সালমা বেগমের হাতে এখনও শপিং ব্যাগ টা দেখে ভ্রু কুঁচকালো শ্রাবণ। সালমক হাতের কাপড়ের ব্যাগটা বাড়িয়ে দিলেন,
—"যা, দিয়ে আয়, একবারে নিজেই দিয়ে আয়। ঘরেই আছে ধারা!"
শ্রাবণ কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
—"এত নাটক না করলেও চলতো মা। তুমি দিলে কী সমস্যা? আমি কেনো দিতে যাব?"
সালমা হেসে বললেন,
—"তুই নিজের হাতে দে, ও বুঝুক এটা কে দিয়েছে। আমি দিলে তো বলবেই ‘মা দিয়েছে’। আর তুই দিয়ে দিলে একটুখানি লজ্জা পাবে... বুঝলি? খুশি হবে মেয়েটা! যা!"
শ্রাবণ কপাল চুলকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—"তুমি আসলেই ছায়া কাকিমা থেকে নাট্যকার হয়ে গেছো, জানো? এসব হচ্ছে টা কী মা? আমার কিন্তু আসলেই ভালো লাগছেনা। জোর করে কোনো কিছু হয়না। মেয়েটাকে অসহ্য লাগছে আমার। তুমি ইচ্ছে করে এমন করে কী ভাবছো? আমি মোটেই বউ ভেবে ওর জন্য এসব আনিনি। একটা মানুষ ভেবে মায়া হয়েছে, তাই এনেছি। এটাকে অত বড় করে অতিরিক্ত কিছু ভাবার মানে নেই।"
সালমা বেগম হতাশ হলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—" শ্রাবণ, তুই এমন করিস না...আমার কথাটা..
শ্রাবণ সালমা বেগমের কথা শেষ করতে না দিয়েই বলে উঠলো,
—" তোমার যদি মন চায়, তবে নিজে গিয়ে দিয়ে এসো মা। নইলে দেয়ার দরকার নেই, ফেলে দাও। আমি তবুও এসব আহ্লাদ করতে পারবনা!"
সালমা বেগম চুপচাপ হয়ে গেলেন। ছেলের মুখে এই কড়া সুরে কথা শুনে একটু সময় নিলেন নিজেকে সামলাতে। এক হাতে শপিং ব্যাগটা শক্ত করে চেপে ধরলেন, অন্য হাত দিয়ে শাড়ির আঁচল ঠিক করলেন। শ্রাবণের দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর গলায় খুব নরম একটা দাগ টেনে বললেন,
—"মা হয়ে তোকে কখনো কোনো কিছুতে জোর করিনি শ্রাবণ, আজও করছিনা। শুধু চেয়েছিলাম, তোর একটু সহানুভূতি, একটু নিজের থেকে ভাবা দেখে মেয়েটার মুখে হাসিটা ফুটুক। ও তো কিছু চায়নি আমাদের কাছে। তোর ঘরে এক রাতই থেকেছে, তাও মুখ নামিয়ে। মেয়েটা ভেতরে ভেতরে কতটা চাপে আছে জানিস?"
শ্রাবণ এবার আর চোখে চোখ রাখতে পারল না। মুখ নামিয়ে নীরব হয়ে গেল। তবে বিরক্ত হলো। সালমা ব্যাগটা নিজের বুকের কাছে টেনে নিলেন। ধীরে ধীরে বললেন,
—"তুই যদি না দিতে চাস, আমি দেব। তবে জানিস, কিছু কিছু জিনিস নিজের হাতে না দিলে, তার মূল্য বোঝা যায় না। আমি শুধু চেয়েছিলাম, তুই সেটা বুঝিস। ঠিক আছে, থাক। তুই শান্তিতে থাক। আমি দিয়ে আসছি।"
বলেই সালমা বেগম ধীরে ধীরে চলে গেলেন পাশের ঘরের দিকে। শ্রাবণ দাঁড়িয়ে রইল দরজার ফ্রেমে। তার গলা শুকিয়ে গেল যেন। একটা ভারী অস্বস্তি জমে বসলো বুকের মধ্যে। কিছু একটা বলার ছিল তার, কিন্তু কথাগুলো আটকে গেল গলায়। সে জানে, তার মা তাকে দোষ দিচ্ছে না। কিন্তু কেন জানি আজকের কথাগুলো কেমন বিঁধে গেল তার ভেতরে। সত্যিই তো,জোর করে কেউ কিছু বলেনি। শুধু একটু সদিচ্ছার কথা ছিল। এতটা কঠিন হয়ে গেল কেন তার জন্য? একটু ধীরে ধীরে দরজা বন্ধ করল শ্রাবণ। ফিরে এসে বিছানার ধারে বসে পড়ল। বুকের ভেতরটা হালকা ধকধক করছে। হঠাৎই মনে হলো, যদি ধারা জানে, এসব তার জন্য সে কিছুই করতে চায় না? যদি ভাবে, শ্রাবণ তাকে ঘৃণা করে? শ্রাবণ মোটেই ঘৃণা করেনা মেয়েটাকে। শুধু ভালো লাগছেনা। চোখ বন্ধ করে শ্রাবণ মাথা নিচু করল। কিছু জিনিস আসলেই বলে না বুঝিয়ে দিতে হয়। সে হয়তো ভুল করেছে, হয়তো একটু কঠিন হয়ে গেছে।
শ্রাবণ চোখ খুলল। ঠোঁটে হালকা হাসি এলো। মাথা তুলে ছাদের দিকে তাকিয়ে একটু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। হয়তো এখনই কিছু বলার সময় না। তবে সময় আসছে। আর সেদিন, এই চুপচাপ শ্রাবণ, হয়তো একটু জোরে বলবে, নিজের হাতে দিয়েই বলবে তোমার জন্যই এনেছি।
------------------
শেখ বাড়িতে মাঝে মাঝেই একটু হুলস্থুল লেগে থাকে। তবে প্রতিদিন বিকালে সবাই একসাথে ড্রয়িং রুমে সময় কাটায়। প্রতিদিনের মত আজও বিকালে বাবু নামের সার্ভেন্টটা এসে শ্রাবণকে ডেকে বলল,
—" ছোট সাহেব, বড় সাহেব আপনাকে নিচে ডাকছেন। সবাই একসাথে একটু নাস্তা করবেন। বড় ম্যাডাম সবার জন্য নুডলস বানিয়েছে।! "
শ্রাবণ প্রথমে মনে মনে যেতে চাইলো না, কিন্তু পরক্ষনে কিছু একটা ভেবে বুদ্ধি করে বলল,
—" সবাই তো আছে-ই। আমি না গেলেও হবে। খাব না আমি!"
শ্রাবণের বুদ্ধি কাজে লেগেছে। সাথে সাথে বাবু মাথা নেড়ে বলল,
—" না না সাহেব, সবাই নিচে নেই। শুধু বড় সাহেব আর ম্যাডাম আছে৷ নতুন ম্যাডাম কে তো এখনও ডাকিনি। আপনাকে আগে ডাকতে আসলাম। আপনি তাড়াতাড়ি আসুন, আমি নতুন ম্যাডাম কেও ডেকে নিয়ে আসি!"
বলেই পাশের ঘরে গিয়ে দরজার কড়া নাড়লো বাবু। এদিকে শ্রাবণ এটাই চাইছিল। কৌশলে জেনে নিল ধারা ঘরেই আছে কিনা। সে দ্রুত বিছানা থেকে নেমে ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা সোনার চেইন টা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। নিজের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইলো, অপেক্ষা করল ধারার বের হওয়ার। একটু পরেই খট করে শব্দ হলো ধারার ঘর থেকে।
সোজা হয়ে দাঁড়ালো শ্রাবণ। দেখতে পেলো, আকাশীরঙা ওয়ান পিস পড়ে মাথায় সাদা রঙের একটা ওড়না জড়িয়ে বেরিয়ে এসেছে ধারা। এক মুহুর্তের জন্য থমকালো শ্রাবণ। সে ইচ্ছে করেই আকাশীরঙা এই ওয়ান পিস টা এনেছিল, তার মনেই হয়েছিল ধারার ফর্সা গায়ে এটা সুন্দর লাগবে। কিন্তু তাই বলে এতটা মানানসই হবে, এতটা সুন্দর লাগবে তা ভাবেনি। কতটা স্নিগ্ধ লাগছে মেয়েটাকে! একদম পরীর মত! শ্রাবণের এবার আফসোস হলো, সে কেনো ওই টকটকে লাল রঙের জামাটা নিয়ে এলো না!
ধারা দেখতে পায়নি ডান পাশের ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রাবণ কে। সে নিজের মত করে এগিয়ে যেতে চাইলে শ্রাবণ ফট করে ডেকে উঠে পেছন থেকে,
—" এই শোনো! "
খানিক পরিচিত পুরুষালি কন্ঠটা কানে যেতেই থমকে দাঁড়ালো ধারা। তৎক্ষনাৎ পেছনে ফিরে তাকালে মাথায় থাকা ওড়নাটা সরে যায়, আলগা চুলগুলো গালে এসে পড়ে। এই দৃশ্যটাই একটা পুরুষকে ঘায়েল করার জন্য যথেষ্ট। ধারা পিছনে পুরোপুরি ফিরে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। এক হাতে ওড়না ঠিক করল। জানেনা কেনো যেন, লোকটাকে তার একটু একটু ভয়ই লাগে।
শ্রাবণ নিজে থেকেই এগিয়ে এলো। ধারা সংকুচিত হলো, ভাবল বোধহয় কঠিন কোনো কথা শুনতে হবে। অথচ তাকে অবাক করে দিয়ে শ্রাবণ তার হাতে থাকা চেইনটা মুখের সামনে তুলে ধরে নরম কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
—" এটা কি তোমার?"
ধারা চোখ তুলে তাকাতেই জ্বলজ্বল করে উঠলো তার মুখটা। চোখ বড় করে তাকিয়ে ফট করে শ্রাবনের হাত থেকে চেইনটা নিয়ে অনেক বেশি উৎসুক হয়ে তড়িঘড়ি করে বলতে থাকলো ,
—" হ্যাঁ, হ্যাঁ, জ্বি এটা আমার। জানেন আমি সকাল থেকে পাগলের মত খুঁজছি এটা। আমার মায়ের শেষ স্মৃতি এই চেইন টা। ভেবেছিলাম হারিয়ে ফেলেছি। অনেক কষ্ট হচ্ছিল। আল্লাহর কাছে হাজারো সুকরিয়া! সুকরিয়া মাবুদ! ফিরে পেলাম!"
শ্রাবণের মুখটা একটু নরম হয়ে গেল ধারার কথাগুলো শুনে। তার মুখের উত্তেজনা, চোখের ভিজে ভিজে ছলছলে চাহনি, সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত আবেগ খেলে গেল ভেতরে। চেইনটা এতটা গুরুত্বপূর্ণ? ওর মায়ের শেষ স্মৃতি! এইটুকুন সময়েই মেয়েটা ওর সামনে এতটা মন খোলামেলা হয়ে পড়লো, এতটা স্বাভাবিক! শ্রাবণ একটু চুপ করে রইল। ভালো লাগলো তার! চেইনটা হাতে নিয়ে যেভাবে ধরা দিয়েছিল, যেন কোনো দামি গয়না নয়, বরং সে নিজে কোনো জরুরি দায়িত্ব শেষ করছে, আর সেই দায়িত্ব এখন সম্পন্ন হয়েছে।
ধারার মুখের দিকে না তাকিয়ে হালকা গলায় শ্রাবণ বলল,
—" বোধহয় সকালে গোসল করার সময় খুলে পড়ে গেছে। আমি বাথরুমের ফ্লোরে পেলাম। এখন থেকে ঠিকঠাক করে রেখো, দেখো আবার হারিয়ে ফেলো না। এসব ছোটখাটো জিনিস হারালে খুঁজে পাওয়া মুশকিল!"
ধারা এক মুহূর্ত থেমে হেসে ফেলল। তার হাসিটা ছিলো নিঃশব্দ, একদম চোখ দিয়ে ফুটে উঠল। সে মাথা নিচু করে বলল,
—"জানি না কী করে খসে পড়েছিল..এখন থেকে খেয়াল রাখব। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আপনি না পেলে... আমার হয়তো আর ফিরে পাওয়া হতো না।"
শ্রাবণ একটু নড়েচড়ে নিল নিজের ভেতরের অস্বস্তি সামলাতে। ধারা এর মধ্যেই চেইনটা আবার গলায় পড়ার চেষ্টা করল। শ্রাবনও দাঁড়িয়ে দেখতে থাকলো। দু-তিনবার চেষ্টা করার পরেও চেইনের হুকটা লাগাতে পারছেনা ধারা। বিরক্তিতে কষ্টে মুখ কুঁচকে রেখেছে সে। কি আশ্চর্য! চেইনের হুক লাগছেনা যে!
ধারাকে বারবার চেইন পড়তে ব্যর্থ হতে দেখে গলা খাঁকারি দিয়ে হাত পেতে দিয়ে শ্রাবণ বলল,
—" আমায় দাও!"
ধারা চোখ তুলে তাকালো। বাধ্যের মত এক বাক্যেই শ্রাবণের হাতে দিল চেইনটা। শ্রাবণ এবার চেইনটা হাতের মুঠোয় নিয়ে তৎক্ষনাৎ আদেশ ছুঁড়ে দিল,
—" ওদিকে ফিরে তাকাও।"।
প্রথমে বুঝলোনা ধারা, নিশ্চিত হতে শুধালো,
—" হু? "
শ্রাবণ ঢোক গিলে তাকালো মেয়েটার দিকে। এক মুহুর্তের জন্য চোখে চোখ পড়ল। তবে দ্রুত চোখ সরালো শ্রাবণ, আগের থেকেও গম্ভীর গলায় বলল,
—" পেছনে ঘুরতে বলেছি।"
ধারা মাথা নেড়ে পিছনে ঘুরল। শ্রাবণ এবার এক পা এগিয়ে এলো। ধারার মাথা থেকে ওড়না নামিয়ে দিল। সাথে সাথে দৃশ্যমান হলো খোপা করে রাখা চুলের আড়ালে ফর্সা ঘাড়টা। এক মুহুর্তের জন্য থমকে গিয়ে নিজের উপরেই বিরক্ত হলো শ্রাবণ। মেয়েটা কতটা ছোট, কিন্তু তবুও তাকে এভাবে টানছে কেনো? কীসের এত টান? কখনো তো আগে এমন হয়নি। বিদেশে গিয়ে হাজারো মেয়ে দেখেছে সে! কই! তবুও তো এমন অনুভূতি টের পায়নি। শ্রাবণ নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করল। কিন্তু তার নিঃশ্বাস একটু অগোছালো হয়ে উঠেছে।
ওর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার ফর্সা ঘাড়, আড়ালে থাকা নরম চুলের গন্ধ, বিকালের হালকা আলো, সব মিলিয়ে যেন একটা নীরব অস্বস্তির ঘূর্ণি তৈরী হয়েছে ভেতরে। ধারার হাত থেকে নেয়া চেইনটা সে সাবধানে মেয়েটার গলায় পরিয়ে দিল। হুকটা লাগাতে একটু সময় লাগলো। আঙুল কাঁপল না ঠিকই, কিন্তু মনটা কাঁপছিল। খুব সাবধানে এমন ভাবে পড়ালো যাতে আঙুলের স্পর্শও মেয়েটার শরীরে না লাগে।
ধারাও নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, একটুও না নড়ে। তার মনে হচ্ছিল যেন বাতাসও থেমে গেছে, কিংবা সময় থেমে আছে ঠিক এই মুহূর্তের জন্য। তবে কেনো যেন মন থেকে খুব ভরসা করছিল লোকটাকে। শ্রাবণ শেষবার হাত সরাতে গিয়েও এক মুহূর্ত থেমে গেল। চোখ পড়ল মেয়েটার ঘাড়ে, সেই নরম লাইনটায়, যেটার কোনো নাম হয় না, শুধু অনুভব করা যায়।
সঙ্গে সঙ্গেই নিজের প্রতি বিরক্তিতে দাঁত চেপে হাত সরিয়ে নিল সে। চেইনটা লাগিয়ে নরম গলায় বলল,
—"হয়ে গেছে।"
ধারা ধীরে পেছনে ফিরল। নিচু স্বরে বলল,
—"ধন্যবাদ।"
শ্রাবণ তাকালো এক পলক। ফর্সা গলায় চিকন সোনার চেইনটা কি সুন্দর চিকচিক করছে। এবার পরিপূর্ন হচ্ছে মেয়েটাকে। শ্রাবণ চোখ সরিয়ে নিল, যেন সামান্য দেরি করলেই ধরা পড়ে যাবে তার মনের ভাব। ঠোঁট কাঁমড়ে একটু গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
—"এসো, নিচে যাই। সবাই বসে আছে।"
ধারা মাথা নেড়ে সাড়া দিল। দু’জন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল সিঁড়ির দিকে। সিঁড়ির বাঁকে এসে দুজনেই একসাথে একটু থমকাল। নিচ থেকে ভেসে এলো সালমা বেগমের হাসির শব্দ আর রান্নাঘরের ভাজাভাজা গন্ধ। শ্রাবণ নিশ্চিত দুজনকে একসাথে নামতে দেখে সালমা বেগম একটু হলেও পচাবে শ্রাবণকে। কীভাবে যেন ওর মনের কথাটা ধরে ফেলে ধারা। নিচে তাকিয়ে বলল,
—"আপনি আগে যান। আমি একটু পরেই আসছি।"
শ্রাবণ একবার তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে নেমে গেল নিচে। সস্থি পেলো। ধারা দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ, গলায় হাত বুলিয়ে অনুভব করল সেই চেনটা, যেটা একসময় হারিয়ে গিয়েছিল, আবার কেউ খুঁজে এনে দিয়েছে। শুধু চেইন নয়... ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া অনুভবগুলোও কেউ যেন খুঁজে আনছে আবার... নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে। শ্রাবণ গিয়ে সোফায় ধপ করে বসতেই পা চালালো ধারা। তারা যে একসাথে আসেনি সেটা বোঝানোর ক্ষুদ্র প্রয়াস!
চলবে........
—✨ আমি গতকাল রাতে ভেবেছিলাম এর পরের পর্ব লিখে রাখব, অথচ ফালতু ঘুমের চক্করে লিখতেই পারিনি😭 পরবর্তী পর্ব লিখতে একটু সময় লাগবে।
আর মন্তব্য করতে ভুলবেন না....
#পর্ব_৪
#কলমে_অনামিকা_তাহসিন_রোজ
#শ্রাবণ_ধারার_রূপকথা
#পর্ব_৫
#কলমে_অনামিকা_তাহসিন_রোজা
সালমা বেগম গ্রামের মেয়ে ছিলেন। পড়াশোনা করতে ঢাকায় এসে দেখা হয়েছিল সামিউল শেখের সাথে। বিয়েটা প্রেমের না হলেও সামিউল শেখ মনে মনে সালমা বেগমকে পছন্দ করে একদম বিয়ের প্রস্তাবই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। পরে অনেক ঝুট ঝামেলা পেরিয়ে তাদের সংসার শুরু হয়েছিল। নতুন করে আলাদা এক জীবন শুরু করতে অনেক কষ্ট হয়েছিল সালমা বেগমের। কিন্তু দিন শেষে যখন স্বামী নামক মানুষটার দিকে চোখ তুলে এক পলক তাকাতো, তখনই সব দুঃখ-কষ্ট ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যেত।
এই মুহুর্তে সালমা বেগমের কাছে নিজের ছেলে আর বউমাকে, তাদেরই প্রতিচ্ছবি মনে হচ্ছে। তিনি রান্নাঘর থেকে গম্ভীর হয়ে ম্যাগাজিন পড়তে থাকা শ্রাবণ, আর অপলক দৃষ্টিতে সরল চিত্তে তাকিয়ে থাকা ধারাকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আর যাই হোক না কেনো, একটা মেয়ের দৃষ্টি বোঝেন তিনি। ধারা হয়তো শ্রাবণ কে ভয় পায়, তবে সম্মানও করে। হয়তো শ্রাবণ একটু নরম হলেই ধারা নিজেকে আর গুটিয়ে রাখবেনা। সম্ভব হবেনা! একটা মেয়ের তো আশ্রয় প্রয়োজন! বাবা-মা কে একদম হারালে একটা মেয়ের শেষ আশ্রয় তার স্বামীই হয়, এরপরই হয় সন্তান! আর শ্রাবণের সাথে যে একটা মিষ্টি সংসারে আবদ্ধ হওয়া সম্ভব, ধারাকে দেখেই বুঝেছেন সালমা। না জানি তার ছেলেটার মন কবে একটু গলবে!
সামিউল শেখ ম্যাগাজিন টেবিলে রেখে চোখের চশমা ঠেলে একটু হাঁক ছুঁড়লেন,
—" কই গো গিন্নি? তোমার হাতের স্পেশাল নুডলস টা আনো তাড়াতাড়ি। বৌমা তো এসে গেছে।"
বাবার কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে তাকালো শ্রাবণ। বৌমা এসেছে মানে? কেনো? শুধু ও এসেছে? সে আসেনি? মুখে বিরক্তির রেখা টেনে শ্রাবণ দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
—" বাবা, আমিও এসেছি।"
সামিউল শেখ দু সেকেন্ড চোখের পাতা পিটপিট করলেন। কপালে ভাঁজ ফেলে বুঝতে চাইলেন নিজের একমাত্র গুনধর ছেলের অভিব্যক্তি। ছেলে টা কি ইর্ষা করছে! এরপর আরেকটু জোরে বললেন,
—" ও হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমার সোনায় বাঁধানো যক্ষের ধন ছেলেও এসেছে গিন্নি। আমি তো ধন্য হয়ে গেলাম তোমার একমাত্র আদুরে ছেলেকে এখানে দেখে। তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো।"
সালমা বেগম হেসে বাটি গোছাতে গোছাতে বললেন,
—" আসছি, আসছি! "
এদিকে শ্রাবণ রাগে ফুঁসতে থাকলো। খুবই বাজে একটা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তাকে। বাড়ির সবাই কোনো কারন ছাড়া পিচ্চি মেয়েটাকে নিয়ে লাফালাফি করছে, আর তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে বেশি আদর-সোহাগ করছে। এসবের মানে টা কী? তার আদর্শ বাবা সামিউল শেখ যে ইচ্ছে করে ধারাকে এত আদর করছে, তা খুব ভালোই জানে শ্রাবণ। এ বাড়িতে এখন কেও পাত্তাও দিচ্ছেনা তাকে, তার কোনো দামই নেই। সবাই পিচ্চি একটা মেয়েকে নিয়ে পাগল হয়ে আছে।
বিরক্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছে সামিউল শেখের পাশে বসা তথাকথিত পিচ্চি মেয়েটার দিকেই ভ্রু কুঁচকে তাকালো শ্রাবণ। কিন্তু সহজ সরল গোলগাল চেহারার ধারার মুখ টা দেখে ভ্রু শিথিল হলো তার। মেয়েটা একদম অসহায় মুখ করে মাথা নিচু করে রেখেছে। হাতের আঙুলগুলো কঁচলে শক্ত থাকার চেষ্টা করছে। আশ্চর্য! এত কিসের সংকোচ ওর? একটু আগেই তো শ্রাবণের সাথে কত উৎফুল্লতার সাথে কথা বলল? তবে কি ভুল করে ওমন ভাবে কথা বলেছে?
শ্রাবণের এক মুহুর্তের জন্য ধারাকে দেখে মায়া লাগলো। কত-ই বা বয়স হবে মেয়েটার! ষোলো কি সতেরো! এমনই হবে। এই বয়সে এসেও এতটা সংকোচ, দ্বিধা, ভয়, অসহায়ত্ব কেনো? ছোট থেকে চাচির অত্যাচার সহ্য করেই বোধহয় নিজের দৃঢ় চিত্ত বাজে ভাবে হারিয়ে ফেলেছে মেয়েটা। কিন্তু তার-ই বা কি করার! এখন দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া শ্রাবণ মেয়েটার জন্য কিছু করতে পারবেনা। স্ত্রী হিসেবে তো মানতেই পারবে না! তবে দায়িত্ব গুলো মানার চেষ্টা করবে।
সালমা বেগম খানিক সময় পরই রান্নাঘর থেকে ট্রে হাতে বেরিয়ে এলেন। ট্রের ওপর কয়েকটা সাদা সিরামিক বাটি, তার মধ্যে ধোঁয়া ওঠা নুডলস, সাথে দুটো ছোট পাত্রে সস আর কাঁচা মরিচ ভিনেগারে ভেজানো। তার মুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও চোখে-মুখে একরকম আগ্রহ, এই একসাথে খাওয়ার মুহূর্তটাই তার সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সময় যে।
টেবিলের এক প্রান্তে ট্রে টা নামিয়ে রেখে বড় শ্বাস নিলেন সালমা বেগম, বললেন,
—" এই নুডলস কিন্তু আজকে একটু স্পেশাল, ধারা খাবে বলেই বানালাম। ভেজিটেবল কেটে কেটে হাত ব্যথা হয়ে গেল, তবে ওর মুখে হাসি দেখলেই ঠিক হয়ে যাবে!"
এই কথা বলেই একবার চোরা চোখে ছেলের মুখের দিকে তাকালেন তিনি। শ্রাবণের চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে, ঠোঁট চেপে বসে আছে সে, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, মনে মনে গজগজ করছে। সালমা বেগমও ঠোঁট টিপে হাসলেন। আশ্চর্য! তার ছেলেটা কবে থেকে এমন হিংসুটে হয়ে গেলো। এদিকে ধারা একটু চমকে উঠল। তার মুখে লজ্জা আর বিস্ময়ের মিশ্র প্রতিচ্ছবি। সে ভদ্রভাবে বলল,
—" মা, আমি বেশি খাবনা। অল্প একটু খাই?"
সালমা বেগম চোখ পাঁকিয়ে হেসে বললেন,
—"একটু না, ঠিকঠাক করে খাবি। খেয়ে না ফেললে কিন্তু আমি রাগ করব। আর, খেয়ে বল কেমন হয়েছে।"
তারপর ধারা সামনে এক বাটি এগিয়ে দিলেন।
সামিউল শেখ তখন নুডলস বাটির গন্ধ নিয়ে বললেন,
—"ওফ, গিন্নি! তুমি যদি এখন রেস্টুরেন্টে কাজ করতে তাহলে সে রেস্টুরেন্টে আমি রিটায়ারড জীবন কাটিয়ে দিতাম!"
সালমা হেসে বললেন,
—"তাহলে এখন থেকেই রোজের মেন্যু ঠিক করে ফেলুন, মিস্টার শেখ! আর কেবল ঘ্রাণ নিয়েই প্রশংসা করা বাদ দিন, আগে খেয়ে দেখুন।"
শ্রাবণের রসকষহীন মুখ দেখে এবার সালমা হাসি আটকাতে পারলেন না, জোর করেই একটা বাটি তার সামনে এগিয়ে দিয়ে বললেন,
—" এমন করে মুখ ঝুলিয়ে রেখেছিস কেনো বাপু? তুই কি দিনদিন ছোট বাচ্চা হয়ে যাচ্ছিস? তোর জন্যও তো রেঁধেছি। আজ আর বিরক্ত হবি না। খেয়ে দেখ, সত্যি দারুণ হয়েছে!"
শ্রাবণ মুখে কিছু না বললেও চামচ হাতে নিলো। আড়চোখে ধারাকে দেখলো। মেয়েটা কি যেন ভাবছে। কেনো ওভাবে বাটির দিকে তাকিয়ে আছে? শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েই রইলো। খানিক চুপ থেকে হুট করেই ধারা মিনমিন করে বলে উঠলো,
—" এটা... এটা খুব গরম।"
শ্রাবণ নিজের বাটিতে চামচ চালাতে চালাতেই আরেকটু ভ্রু কুঁচকে তাকালো। সালমা বেগম এবার বললেন,
—" কিছুক্ষণ নাড়তে থাকো মা, ঠান্ডা হয়ে যাবে। আর একটু গরম হলেই খেতে ভালো লাগে।"
ধারা বাধ্য মেয়ের মত মাথা নামালো। আর বাটিটাও কোলের কাছে রেখে অপলক তাকিয়ে রইলো। শ্রাবণ বিরক্ত হচ্ছে, এভাবে কোলের উপর বাটি ধরে রাখলে কি ঠান্ডা হবে? সালমা বেগম এবার হুট করেই কিছু একটা মনে করে পাশের বাসার কোনো এক ভাবির মেয়েকে নিয়ে আলোচনা করা জুড়ে দিলেন স্বামীর সাথে। বেচারা সামিউল শেখও কোনো উপায় না পেয়ে স্ত্রীর পাড়ার কাহিনী শুনতে থাকলেন।
অনেকক্ষণ নিজের বাটিতে চামচ চালিয়ে, ফু দিয়ে সহনীয় পর্যায়ে নুডলস টাকে আনলো শ্রাবণ। এরপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো বাবা, মায়ের দিকে। আপাতত সালমা বেগম বকবক করতেই ব্যস্ত, আর সামিউল শেখও ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে স্ত্রীর দিকেই তাকিয়ে মেকি হেসে কথা শুনছেন।
সুযোগ পেলো শ্রাবণ। আড়চোখে ধারাকে এক পলক দেখে নিয়ে ফট করে ওর কোলের বাটিটা নিজে নিয়ে, নিজের হাতের বাটিটা ধারার কোলে একই জায়গায় দিয়ে দিল। বিষয়টা এত দ্রুত হলো যে কেওই টের পেলো না। কিন্তু আকস্মিক ঘটনায় ধারা হতবিহ্বল হয়ে নির্বাক ভঙ্গিতে চেয়ে থাকলো শ্রাবণের দিকে। কারন সেকেন্ডের মধ্যে মেয়েটার হাতে থাকা বাটিটা ছিনিয়ে নিয়ে নিজের বাটি ধরিয়ে দিয়েছে শ্রাবণ শেখ।
শ্রাবণ এবার ধারার বাটিটা আবারো নিজের বাটির মত করে চামচ দিয়ে নেড়ে ফট করে খেতে শুরু করল। এক চামচ খেয়েই ধারার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকালো। ধারার দৃষ্টি দেখেই বুঝলো মেয়েটা অবাক হয়েছে। তবে অবাক হওয়ার মত কারন খুঁজে পেল না শ্রাবণ। ধারা গরম নুডলস খেতে পারছে না বলেই তো সে নিজের টার সাথে এক্সচেঞ্জ করল, এতে অবাক হয়ে হা হয়ে থাকার মানে কী? শ্রাবণ আবারো আলোচনায় ব্যস্ত নিজের বাবা-মা'র দিকে তাকিয়ে কন্ঠ খাদে নামিয়ে ধারাকে বলল,
—" হা করে তাকিয়ে আছো কেনো? আমাকে দেখে কি নায়ক মনে হচ্ছে?"
ধারা অজান্তেই যন্ত্রের মত উপর নিচ মাথা নাড়ালো, যার অর্থ হ্যাঁ। শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকাতেই ধারা ফটাফট ডানে বায়ে মাথা নাড়ালো, যার অর্থ জোরালোভাবে না। কোনোভাবেই না। এ হতেই পারেনা। শ্রাবণ কিছুটা থতমত খেয়ে আরেকটু সতর্ক কন্ঠে বলল,
—" হা করে না থেকে চুপচাপ খাও। নুডলস ঠান্ডা করেই দিয়েছি। "
ধারা এরপর এক চামচ নুডলস মুখে নিল। আসলেই কিছুটা ঠান্ডা হয়েছে নুডলসটা। খেতেও ভালো লাগছে৷ শ্রাবণও আড়চোখে খেয়াল করল এবার মেয়েটা খেতে পারছে কিনা। কোনো কথা নেই কারো মুখে, নীরবতা নেমে এলো কয়েক মুহূর্তের জন্য।
এদিকে সালমা বেগম নিজের আলোচনার ইতি টেনে বললেন,
—" পাশের বাসার ভাবি এমন নাটক করছে যেন তার মেয়ে খুব ভালো বর পেয়েছে! ছেলেটাকে তো দেখলাম আমি। এক নাম্বারের ছ্যাঁচড়া, দেখেই টিকটকার মনে হচ্ছে। না আছে গুন, না আছে আচার আচরণ। এমন ছেলেকে কেও কীভাবে পছন্দ করে বিয়ে করে, ভেবে পাইনা বাপু! রিলেশন করে বিয়ে করে বোধহয় উদ্ধার করেছে!"
সামিউল শেখ টেনে টেনে বললেন,
—" তোমার নিজের ছেলে বোধহয় খুব ভালো?'
সালমা বেগম হতবাক হয়ে চোখ বড় করে বললেন,
—" অবশ্যই। আমার ছেলে তো হীরের টুকরো। ওই ছ্যাঁচড়ার সাথে তুমি কোন সাহসে আমার ছেলের তুলনা করো হ্যাঁ? আকাশ পাতাল তফাত! আমার ছেলের মত ছেলে হয়না হুহ!"
সামিউল শেখ স্ত্রীর যুক্তিতে হার মানলেন। তারপর হঠাৎ ধারাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
—"আচ্ছা বৌমা, বলো তো তোমার এই শ্বাশুড়ির ছেলে কেমন? মানে বাহ্যিক ভাবে এই গরুকে দেখে তোমার কেমন মনে হয়?"
ধারা চোখ বড় করে শ্রাবণের দিকে তাকাল, শ্রাবণ তখন নিচু গলায় কাশল, বোঝা যাচ্ছিল, এবার রেগে উঠবে। শেষমেশ তার বাপ এই মেয়েটার সামনেও তাকে গরু বলল। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ধারা হেসে ফেলল। এরপর নিজেকে ধাতস্থ করে নরম গলায় বলল,
—" না মানে..আমি কীভাবে বলি? আমি তো..!"
সামিউল শেখ মাঝ পথে থামিয়ে মুখ কুঁচকে বললেন,
—" আহহা! বলোই না। এক পলকে দেখে তোমার কেমন মনে হয়? শুধু বলো -ভালো, নাকি খারাপ? এক শব্দেই জবাব চাই!"
সালমা বেগমও দৃঢ় চিত্তে মাথা নাড়ালেন। তারও জানা চাই। ধারার মনে হলো কেও তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন টা ছুঁড়ে দিয়েছে। চামচ ধরা হাত টাও কাঁপছে এবার। সে ভীত নয়নে তাকালো শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণ মুখ নামিয়ে রেখেছে বাটির দিকে, চামচ ধরা হাতটাও অকারনে নুডলসে চালাচ্ছে। সেও আড়চোখে একবার ধারার দিকে তাকালো। মেয়েটা কি তাকে খারাপ বলবে? যদি ভুল করেও খারাপ বলে, তাহলে নুডলস ঠান্ডা করে দেয়া বাটিটা ফিরিয়ে নেবে বলে সিদ্ধান্ত নিল শ্রাবণ!
সালমা বেগম ভাবলেন ধারা হয়তো খারাপই কিছু বলবে। অথচ সবাইকে অবাক করে দিয়ে ধারা মিনমিন করে বলল,
—" ভালো! উনি ভালো!"
ঘরে এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা! সালমা বেগম আর সামিউল শেখ চোখাচোখি করে হাসলেন। সালমা তো গর্বের সাথে চোখ পাকালেন নিজের স্বামীকে। শ্রাবণ থামলো, চামচ মাঝপথে স্থির। কেনো সে জানেনা, তবে তার মধ্যে ভালো লাগা কাজ করেছে। সস্থির শ্বাস ফেলেছে অজান্তে। ধারার মুখে হালকা একটা সরল হাসি, একটা নির্ভেজাল প্রশংসা যেন, কোনো প্রত্যাশা নেই, কেবল যা দেখেছে তাই বলেছে। শ্রাবণের সাথে এবার চোখে চোখ পড়ল ধারার। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সেই অপলক দৃষ্টির ভেতর যেন কিছু একটা নড়ে উঠলো তার ভেতরে। তারপর সে মুখ ঘুরিয়ে নিল। কিন্তু তার গলায় এবার কোনো বিরক্তি ছিল না। শুধু একটুকরো নরম দীর্ঘশ্বাস!
সালমা বেগম এবার হুট করে ধারার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,
—" আরেহ মাশা-আল্লাহ। আমি তো এতক্ষণ খেয়ালই করিনি। ধারাকে কত সুন্দর লাগছে। হ্যাঁ রে শ্রাবণ, তুই এসব ড্রেস আরো কয়েকটা এনে দিস তো! তোর পছন্দ আছে বলতে হবে।"
নুডলস খেতে থাকা ধারা এবার কেশে উঠলো। শুধু তার-ই নয়, বেচারা শ্রাবণেরও বিষম লেগে বাজে অবস্থা, শোচনীয় পরিস্থিতি! আজব কারবার! আজ কি সবার বিষম লাগার রোগ হলো নাকি! একসাথে দুজনকে বিষম লেগে কাশতে দেখে কোনোমতে হাসি আটকে রাখলেন সামিউল শেখ। শ্রাবণও অবাক হয়েছে ধারাকেও কাশতে দেখে, সে কোনোমতে বুকে হাত দিয়ে পানি খেলো। ধারাও শ্রাবণের দেখাদেখি পানি খেলো। তবে অবাক হয়েছে মেয়েটা, কারন সে আসলেই জানত না যে, শ্রাবণ তার জন্য জামাগুলো কিনে এনেছে। লোকটা তার জন্য জামা কিনেছে! বিষয়টা হুট করে শুনে বুঝে নিতে পারেনি ধারা। কারন ড্রেসগুলো আসলেই খুব সুন্দর!
অবস্থা স্বাভাবিক করতে সামিউল শেখ কিছু একটা মনে করার ভঙ্গিতে বলে উঠলেন,
—" ওহ ভালো কথা, শ্রাবণ শোন, আগামী সাতদিন তোর আর অফিসে যেতে হবেনা।"
কয়েকদিন আগে এই কথা শুনলে শ্রাবণ খুশিতে লুঙ্গি ডান্স দিত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন, এখন বাইরে না গিয়ে বাড়িতে থাকা মানে পিচ্চি মেয়েটার আশেপাশে থাকা। মেয়েটাকে চোখের সামনে দেখলেই অসস্তি হচ্ছে শ্রাবণের। তাই ভ্রু কুঁচকে বলল,
—" কিন্তু কেনো? আমি মোটেই বাড়িতে বসে থাকব না বাবা!"
সামিউল শেখ এক গ্লাস পানি খেয়ে বললেন,
—" কথা টা শেষ করতে দাও। আমি বলেছি অফিসে যাবেনা, কিন্তু বাড়িতে বসে থাকবে তা তো বলিনি বাপ!"
ধারাও এবার উৎসুক হয়ে নুডলস চিবোতে চিবোতে তাকালো সবার দিকে৷ ব্যাপার টা সেও বুঝতে আগ্রহী। শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো,
—" তাহলে?"
সামিউল শেখ এবার সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—" ধারার চাচা করিম সাহেব কল করেছিল। গ্রামে নাকি রীতিনীতি আছে যে বিয়ের পর জামাই গিয়ে সাতদিন শ্বশুর বাড়িতে বউ সহ থেকে আসে৷ তো, তাই কালকে শ্রাবণকে আর বউমাকে মোহনপুর পাঠিয়ে দেব। ধারার ফুফুও নাকি এসেছে। তাই দেখা করে আসুক!"
মাথায় বজ্রপাত পড়ল শ্রাবণের। পাগল নাকি? সে গিয়ে গ্রামে সাতদিন থাকবে? তাও আবার এই মেয়েটার সাথে? কখনোই না? অসম্ভব! শ্রাবণের ভ্যাবাচেকা খাওয়া দৃষ্টি দেখেই সামিউল শেখ যা বুঝার বুঝলেন, তাই কঠোর ভাবে বললেন,
—" শোনো শ্রাবণ, সবকিছুর একটা নিয়ম আছে। বিয়ে যেহেতু হয়েছে, এখন না গেলে মানুষজন খারাপ বলবে। গ্রামের সবাই জামাই-বউকে দেখতে আসবে। এমনিতেও তোমাদের বউভাতের অনুষ্ঠান হয়নি, আর তাছাড়া ধারাও একটু গ্রাম থেকে ঘুরে আসুক, আবার কবে যে যেতে পারে তা তো জানা নেই। "
শ্রাবণ এবার রেগে গিয়ে সজোরে বলল,
—" কিন্তু বাবা, আমি যেতে পারবনা। শুধু ওকেই পাঠিয়ে দাও। আমাকেই কেনো যেতে হবে? ওসব ঝামেলা নিতে পারবনা আমি। আর তাছাড়া গ্রামে থাকতে আমার অসুবিধা হয়, ওমন অজপাড়াগাঁয়ে আমি সাতদিন থাকতে পারবনা!"
ধারা হাতের বাটিটা আবারো কোলে নামিয়ে রাখলো। সামিউল শেখ এবার গম্ভীর হয়ে গেলেন। চশমা খুলে ধীরে ধীরে টেবিলে রাখলেন। চোখের দৃষ্টিটা একেবারে স্থির, ছেলের চোখে চোখ রেখে বললেন,
—"শ্রাবণ, তোমাকে আমি কোনোদিন জোর করিনি। তোমাকে নিজের মত বড় হতে দিয়েছি। সিদ্ধান্ত নিতে দিয়েছি। কিন্তু একটা বয়সে এসে মানুষকে কিছু দায়িত্ব নিতেই হয়। তোমার মা-বাবা জীবিত আছে, তোমার জন্য সব করে, তুমি চাইলে ঘাড় ঘুরিয়ে চলে যেতে পারো। কিন্তু ধারা? ওর তো আর কেউ নেই! আমরা ছাড়া ওর দুনিয়ায় এখন আর কেউ নেই। ওর চাচার বাড়িটাই এখন ওর বাপের বাড়ি হলেও ওখানে আর কখনো থাকবেনা!"
একটু থেমে ধরা গলায় বললেন তিনি,
—"আর তুই তোর বউয়ের সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি যেতে পারিস না? সাতদিন? কিসের এত আপত্তি বল তো? সারাজীবন তো থাকতে বলছি না!"
শ্রাবণ জোরে শ্বাস নিয়ে বলল,
—"বাবা তুমি জানোই না, ওখানে গেলে মানুষজন কত প্রশ্ন করবে! ওর সাথে স্ত্রীর মত আচরণ করতে হবে, আমি নিজেই মানতে পারিনা... একঘেয়েমি লাগে সব! আমি কোথাও আটকে থাকতে পারব না!"
সালমা বেগম এবার হালকা রাগের গলায় বললেন,
—"তুই আটকে থাকবি না বলেই কি মেয়েটা সারাজীবন গুটিয়ে থাকবে? একদিন হলো বিয়ে হয়েছে, একটা মেয়ের স্বাভাবিক হতে একটু সময় লাগে না? শুধু নিজের কথা ভেবে কথা বলিস না শ্রাবণ। "
শ্রাবণ বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালো,
—"আমি ওসব বুঝি না মা! আমি পরিষ্কার বলছি, আমি এই নাটকগুলোতে নেই! যদি যেতে হয়, ও যাক। আমি যাব না।"
এবার সামিউল শেখ ধৈর্য হারিয়ে বেশ গম্ভীর গলায় বললেন,
—"তুই যাবি। কারণ তোর যাওয়া দরকার। এটা শুধু একটা রীতি না, মানুষের মুখ বন্ধ রাখার জন্য না, এই মেয়েটা তোকে নিজের স্বামী বলে মানুক আর না-ই মানুক, সম্মান করছে। তুই তার পাশে দাঁড়াবি না, তাহলে আমাদের মুখ দেখানোর জায়গা থাকবে না। আর গ্রামে যারা আছে, তারা তোকে দেখে ধারার মর্যাদা বুঝবে।"
তিনি এবার নিচু গলায় বললেন,
—"মা-মরা একটা মেয়ে। ওর জীবনটা তোকে দিয়েই নতুন করে শুরু হয়েছে। আর তুই সাতদিনের জন্য ওর পাশে দাঁড়াতে পারবি না?"
এই কথা শুনে শ্রাবণ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। মনে মনে অযুহাত খুঁজলো, তারপর ধীরে ধীরে বলল,
—"বাবা, আমি তো অফিসের কাজ... মানে...মিটিং..!
সালমা বেগম চোখ পাকিয়ে বললেন,
—"অফিসে তো যাচ্ছো না! অফিসই তো বলেছে রেস্ট নাও, তুমি এখন আবার অফিসের অজুহাত দিচ্ছো? তোমার মতো ছেলে কী এমন কাজ করে যে অফিস না গেলে কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাবে? তোমার ছোট আব্বু আছে তো!"
শ্রাবণ এবার গলা চড়িয়ে বলল,
—"আচ্ছা! তো ধরো আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি? তখন কী হবে? ওই গাঁয়ের মধ্যে গেলে সর্দি-জ্বর লেগে যায় আমার!"
সামিউল শেখ ঠাণ্ডা গলায় হেসে বললেন,
—"তা হলে তো একদম যেতেই হবে। ওখানে পাকা ঘর, ফ্যান আছে, খাবার আছে। এখনকার গ্রাম আগের মত না। আর তুই যদি জ্বরেও পড়িস, ধারা তোকে দেখে রাখবে। নতুন বউয়ের একটু অভিজ্ঞতা হোক!"
ধারা এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। মাথা নিচু করে কথাগুলো শুনছিল। মন খারাপ লাগছে ওর! শুধু শুধু তার জন্য একটা মানুষকে এত বিরক্ত হতে হচ্ছে। বিষয়টা খুবই কষ্ট দিচ্ছে ওকে। অজান্তেই কান্না পেলো তার। এ জীবনে সে সারাজীবনই কারো না কারো বোঝা হয়ে থেকেছে। আজও বোঝা হয়ে থাকতে হচ্ছে। তবে এটাও ঠিক, ধারার বাড়িতে যেতে ইচ্ছে করছে। ও বাড়িতে তার ছোট ছোট দুটো চাচাতো ভাই-বোন আছে। ছোটবেলার খেলার সাথী একমাত্র বান্ধবী জান্নাতি আছে। তাদেরকেও দেখতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে ধারার। কিন্তু এই মানুষটাকে বিরক্ত করতে মন চাইলো না।
এবার হঠাৎ করেই ধারা মাথা তুলে একটু দ্বিধাভরা গলায় মিনমিন বলল,
—" আ..বাবা, আমি একাই যেতে পারব। আপনাদের কোনো সমস্যা হলে...শুধু আমায় গাড়িতে উঠিয়ে দিলেই হবে।"
সালমা শেখ শুকনো ঢোক গিললেন। মেয়েটার চোখে স্পষ্ট পানি দেখতে পাচ্ছেন তিনি। নিশ্চয়ই শ্রাবণের ব্যবহারে কষ্ট পেয়েছে। সামিউল শেখ সঙ্গে সঙ্গে গলা চড়িয়ে বললেন,
—"না বউমা, তুমি একা যাবে না। জামাই ছাড়া কেউ মেয়েকে একা পাঠায় না। আর ও শুধু জামাই না, ও তো তোমার স্বামী, অভিভাবক।"
ধারা মাথা নামালো। শ্রাবণ দাঁড়িয়ে থেকে এবার আর কোনো কথা খুঁজে পেল না। অজুহাত ফুরিয়েছে। মুখে বিরক্তি থাকলেও সে বুঝেছে, এইবার আর না বলার সুযোগ নেই। সে একটানা তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ সবার দিকে। তারপর মুখের কোণে ঠোঁট কামড়ে ধীরে গলায় বলল,
—"ঠিক আছে, যাবো...কিন্তু আগে বলে রাখছি, আমি কোনো নাটক করতে পারব না! কথা কম বলবো, কারো সাথে মিশব না!"
সামিউল শেখ হেসে বললেন,
—"তাই-ই করেই এসো। তোর মুখ দেখে কেউ আসবে না। সবাই তো আসবে তোর বউকে দেখতে!"
শ্রাবণ এবার থতমত খেয়ে চুপ করে গেল। ধারার আর ভালো লাগছে না। সত্যি খুব কষ্ট হচ্ছে। এভাবে মানুষটাকে বিরক্ত করতেও মন চাইছে না। মনে মনে চিন্তায় পড়ে গেলো ধারা। চাচি কি লোকটার সাথে ভালো ব্যবহার করবে, ঠিকঠাক আপ্যায়ন করবে তো? ধারার চিন্তা যেন থামতেই চায় না। শ্রাবণের মুখের প্রতিটি ভাঁজ, তার বিরক্ত গলা, চোখ সরিয়ে নেয়া, সবকিছু এত তীক্ষ্ণভাবে গেঁথে গেছে ওর মনে যে, হঠাৎ হঠাৎ বুক ধড়ফড় করে উঠছে। এমন নয় যে সে কিছু আশা করে, একটুও না! বরং এতোটা অপ্রত্যাশা আর অবহেলা দেখে, সেই পুরোনো অনুভূতিগুলো আবার জেগে উঠছে। সবসময়ই তো আমি অপ্রয়োজনীয়, আজও ব্যতিক্রম কী!— ভেতরে একটা কষ্টের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে ধারার।
সালমা বেগম সবই বুঝলেন, একটু পর তিনি ওর পাশেই এসে বসে ওর মাথায় হাত রাখলেন। শান্ত কণ্ঠে কানের কাছে গিয়ে বললেন,
—"মন খারাপ করিস না মা। সব ঠিক হয়ে যাবে। শ্রাবণ রাগী স্বভাবের ছেলে, কিন্তু খারাপ না...সময় লাগবে শুধু। আর তুই তো তোর চাচাতো ভাই-বোনদের দেখতে পাবি, জান্নাতি তোকে দেখে কত খুশি হবে রে! তোকে দেখে ওর মুখে হাসি ফুটবে। একটু আনন্দ করে আসবি!"
ধারা কেবল মাথা ঝাঁকিয়ে "হুম" বলল। গলা দিয়ে কোনো শব্দ এলো না। তখন সামিউল শেখ আবার বললেন,
—"আর তোর সেই চাচিকে নিয়েও চিন্তা করিস না। আমি নিজে কথা বলেছি করিম ভাইয়ের সাথে। ওর মুখ যেন তিতা না হয়, সেটার খেয়াল রাখবে সবাই। আর তুই চিন্তা করিস না, আমি প্রতিদিন ফোন করে তোর খোঁজ নেব।"
ধারা একটু কৃতজ্ঞ চোখে তাকাল। যদিও মনে মনে ভীষন চিন্তায় পড়েছে সে। সালমা বেগম আবার বললেন,
—"আর শোন, তোরা যাওয়ার আগে আমি ধারার জন্য একটা শাড়ি আর একটা হালকা লাল বা গোলাপি কামিজ কিনে আনব। বউমা তো একটু আধটু সেজেগুজে থাকলে গ্রামে সবাই খুশি হবে।"
শ্রাবণ এবার হঠাৎ বলে উঠল,
—"মা, ওই বাড়ি এখনো কি সেই খুপরি ঘরেই? মাটির ঘর? বিদ্যুৎ তো আসে?"
সামিউল শেখ একহাতে চশমা তুলতে তুলতে বললেন,
—"সাত বছর আগের গ্রাম আর এখনকার গ্রাম এক না শ্রাবণ। ঘর পাকা হয়েছে। বিদ্যুৎ আছে। একটা মোটামুটি বাথরুমও বানানো হয়েছে। কষ্ট হবে না। আর তোর সেই ছোটবেলার বন্ধু, সাদিক, ওর সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে!"
শ্রাবণ মুখ ঘুরিয়ে জানালার বাইরে তাকালো। ধরা পড়ে গেছে, তার যুক্তিগুলো একে একে ভেঙে পড়ছে। সব অজুহাত ফুরিয়ে গেছে। সে আর কিছু বলল না। এদিকে ধারা আবার একটু গুটিয়ে গেল নিজের ভেতরে। তাহলে কালই যেতে হবে! চোখ বুজে জান্নাতির মুখটা মনে করার চেষ্টা করল। সেই ছোটবেলার কোলাহল, পুকুর পাড়ে বসে গল্প করা, তালগাছের নিচে পাতা বিছিয়ে খাবার খাওয়া, সব স্মৃতি হঠাৎ খুব কাছের হয়ে উঠল। মনে মনে ভাবল,
শুধু একটাই অনুরোধ আল্লাহর কাছে, কেউ যেন ওনাকে আবার অপমান করতে না পারে। উনাকে আমি কষ্ট দিতে চাই না। তারপর খুব ধীরে নুডলসের শেষ চামচটা মুখে তুলল।
--------------
রাত জাগার অভ্যেস নেই শ্রাবণের। খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে খুব ভোরে উঠতেই বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে সে। তবে কোনো একটা বিশেষ কারনে আজ শ্রাবণ রাত জেগেই ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে। আগামীকাল কে মেয়েটাকে নিয়ে গ্রামে যেতে হবে, ভাবতেই বিরক্ত লাগছে। আবার গ্রামে সাদিক আছে, শ্রাবণের ছোট বেলার বন্ধু। ধারাকে নিয়ে তার সামনেও দাঁড়াতে হবে! এসবের ভাবনাতেই আজ অনেক রাত হলেও চোখের পাতা এক করতে পারেনি শ্রাবণ। একটু পর হঠাৎ করেই শ্রাবণের বদ্ধ দরজায় কড়া নাড়লো কেউ। এত রাতে সালমা বেগম ছাড়া শ্রাবণের ঘরে কেও আসেনা, এটা জানে শ্রাবণ। তাই কোনোকিছু না ভেবেই হাতে ফাইল নিয়ে দেখতে দেখতেই দরজা খুলে দিল। কিন্তু দরজার সামনে দাঁড়ানো ধারাকে দেখে চমক খেলো। হাতে থাকা ফাইলটা ফঁসকে যাচ্ছিল। কোনোমতে নিজেকে সামলে শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে বলল,
—" তুমি?"
ঠোঁট কাঁমড়ে মাথা নিচু করল ধারা। হাতদুটো পেটের কাছে রেখে কচলাতে কচলাতে বলল,
—" একটা কথা ছিল আপনার সাথে!"
চোখ সরু করে তাকালো শ্রাবণ। ধারার চোখে মুখে ভয়, দ্বিধা, আতঙ্ক সবই দেখতে পাচ্ছে ও। আশ্চর্য! এত ভয় পেলে সামনে আসারই দরকার টা কী? আর এত রাতে এখানে আসলোই বা কেনো? ধারাকে দেখে সত্যিই অবাক হয়েছে শ্রাবণ, কিন্তু নিজের অভিব্যক্তি লুকিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
—" ঘরের ভেতরে আসবে?"
নিতান্তই না বললে নয়, বলেই বলেছে শ্রাবণ। ঘরের দরজায় কেও দাঁড়িয়ে থাকলে ভেতরে ঢুকতে বলাটাও একটা সৌজন্যের মধ্যে পড়ে। তবে ধারা দুদিকে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
—" এখানে দাঁড়িয়েই বলি?'
শ্রাবণ হাতে থাকা ফাইলটা বিছানার দিকে ছুঁড়ে মেরে দুহাত বুকে গুঁজে দাঁড়িয়ে বলল,
—" বলো! "
ধারা হুট করেই শ্রাবণের চোখের দিকে তাকালো। ঢোক গিলল শ্রাবণ। মেয়েটা এমন দৃষ্টি দিচ্ছে কেনো? কিছু বোঝাতে চাচ্ছে কি? শ্রাবণ এক মুহুর্তের জন্য আবিষ্কারও করে ফেলল মেয়েটার চোখ দুটো মারাত্মক সুন্দর। যেন আগুনের আঁচ আসছে, এতটাই তীক্ষ্ণ। তাহলে একটু কাজল দিলে মনে হয় আকর্ষনের তোপে আর তাকানোই যাবেনা! শ্রাবণ নিজের ভাবনাতে কেশে উঠলো। ধারা এবার মিষ্টি হেসে বলতে শুরু করল,
—" আমি জানি আপনি গ্রামে যেতে বিরক্ত হচ্ছেন। আমি এটাও জানি আপনি ওখানে গিয়ে থাকতে পারবেন না, কষ্ট হবে আপনার। তাই ভাবছি, আপনি শুধু আমায় গ্রামে পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসলেও পারেন। তারপর আমি সাতদিন পর একা একাই ফিরে আসতে পারব। তাহলে আপনাকে রাতও থাকতে হবেনা, নিয়মও রক্ষা হবে।"
শ্রাবণ স্তব্ধ হয়ে গেল। ধারার এমন সংবেদনশীল প্রস্তাবের জন্য প্রস্তুত ছিল না সে। তার ধারণা ছিল, মেয়েটা নিশ্চয়ই কোনো বায়না নিয়ে এসেছে, হয়তো গ্রামে যাওয়ার সময় নিয়ে কিছু বলবে, কিংবা সালমা বেগমের কথায় প্রভাবিত হয়ে কোনো আবেগী কিছু বলবে। কিন্তু না, ধারা তার ঠিক উল্টোটা করল। মেয়েটা আবারো নিজেকে সরিয়ে রাখল। আবারো নিজের অসুবিধাকে গিলে ফেলে শ্রাবণের স্বস্তিটাকেই বড় করে দেখল।
এক মুহূর্তের জন্য শ্রাবণ তার চোখ সরাতে পারল না ধারার মুখ থেকে। একটা মেয়ের চোখে এতটা নরম, কিন্তু এতটা মাটি হয়ে যাওয়ার মত উদারতা, কিছুটা লজ্জা হলো ওর নিজের ব্যবহারের কথা ভেবে। কিন্তু সে তো নিজের প্রতিজ্ঞায় বাঁধা। এই সম্পর্ক সে মানেনি, মানতে চায়ও না, নিজের মনে এর ব্যত্যয় সে এখনই ঘটতে দিতে চায় না। তবুও এবার কণ্ঠটা আর আগের মতো রুক্ষ হলো না। গলায় একধরনের ক্লান্তি, আর একটুখানি সহানুভূতি মিশিয়ে বলল,
—" তুমি এভাবে বারবার নিজেকে হীন করে দিচ্ছো কেনো? আমি কি তোমায় এ বিষয়ে কিছু বলেছি? তোমারও তো কিছু চাওয়ার থাকতে পারে, কিছু বলার... একটা মানুষ যদি চুপচাপ সব সহ্য করে, তাহলে মানুষ ধরে নেয় তার অনুভবই নেই।"
ধারা চমকে তাকালো শ্রাবণের মুখের দিকে। এই প্রথমবার হয়তো সে শ্রাবণের গলায় কোনো অদ্ভুত উষ্ণতা টের পেল। শ্রাবণ এবার চোখ সরিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—" তুমি গ্রামে যাবে, ইটস ওকে, আমি নিয়ে যাচ্ছি। সাত দিন থাকব। যা নিয়ম, তাই হবে। তোমার জন্য না, আমার পরিবারের জন্য, আমার বাবার জন্য। আর তুমি... এইসব প্রস্তাব আর দিও না। নিজের জায়গাটাকে ছোট করো না। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমি বাবাকে কথা দিয়েছি। মানিয়ে থাকতে পারব! তোমায় রেখে এলে তুমি তো একা ফিরে আসতেও পারবেনা!"
ধারা প্রথম কথা গুলো শুনলেও শেষ কথাটায় উৎফুল্লিত স্বরে বলে উঠলো,
—" না না, আমি পারব!"
ভ্রু কুঁচকালো শ্রাবণ,
—" কী পারবে?"
ধারা মিনমিন করে বলল,
—" একা একা ফিরে আসতে পারব।"
শ্রাবণ কপালে ভাঁজ ফেলে জোরালে কন্ঠে বলল,
—" এখান থেকে মোহনপুর গ্রাম প্রায় একশ কিলোমিটার রাস্তা। বাসে করে এত লম্বা জার্নি একা করতে পারবে, কে বলেছে? জীবনে করেছো?"
ধারা মাথা দু'দিকে নেড়ে না বোঝালো। শ্রাবণ ঠোঁট গোল করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
—" পিচ্চি মানুষ, পিচ্চির মত থাকো। এসব বিষয়ে কথা বলতে হবেনা। আমি যাব, আমি থাকবোও। তুমি কি আমায় এতটা অপদার্থ মনে করো নাকি? আই ক্যান ডু ইট। গিয়ে ব্যাগ গোছাও! সকালের দিকে বের হবো!"
ধারার ঠোঁটে আস্তে আস্তে ফোটে উঠলো একটা অবাক, ধন্য, লাজুক হাসি। সে আস্তে করে বলল,
—" ধন্যবাদ... আমি শুধু এতটুকুই বলার জন্যই এসেছিলাম। আর হ্যাঁ, আপনি কাজ করুন। আমি যাচ্ছি।"
শ্রাবণ এবার ভ্রু কুঁচকে বলল,
—" এতটুকু? এত রাতে এসেছিলে, আর এতটুকুই বলবে?"
ধারা একটু ইতস্তত করে, তারপর নিচু গলায় বলল,
—" এক কাপ চা বানিয়েছিলাম। আপনি তো রাত জেগে আছেন... তাই ভাবলাম...
শ্রাবণের চোখ এবার একটুখানি বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। এইসব কি নিজে থেকে করেছে, নাকি কেও বুদ্ধি দিয়েছে ভেবে পেলো না শ্রাবণ। সে কিছু না বলে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে। তারপর ধীরে গলায় বলল,
—" চা এনেছো?"
ধারা ঠোঁট চেপে মাথা নেড়ে বলল,
—" বাইরে রাখা আছে। চাইলে নিয়ে আসি?"
শ্রাবণ এবার আস্তে করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর বলল—
—" না, থাক। আমি নিজেই আসছি বাইরে।"
শ্রাবণ মোটেই চা খায়না। কফি খেয়ে অভ্যস্ত সে। চা দেখলেই গা গুলিয়ে ওঠে। তবে কেনো যে ধারা চা বানিয়েছে শুনে খেতে চাইলো কে জানে? সে তো চাইলেই বলতে পারত, আমি চা খাইনা। তবুও বলল না। কেনো? এই কেনো-র উত্তর শ্রাবণও খুঁজে পেলো না। তবে বলতে ইচ্ছে করছিল না।
চলবে........