নতুন বাড়িতে সকালদের ওঠার আজ দ্বিতীয় দিন।
নিচতলার ফ্ল্যাটটা মোটামুটি গোছানো হয়ে গেছে। গতকাল সারাদিনের ব্যস্ততার পর আজ বাড়িটাকে একটু শান্তই মনে হচ্ছে।
আব্বাস শেখ সকাল সকাল নিজের ব্যবসার কাজে ব্যস্ত। ছোটখাটো প্যান্টের ব্যবসা হলেও সেটা নিয়ে তার ব্যস্ততার শেষ নেই। সংসার চালাতে হলে তো কাজ করতেই হবে।
আর সালেহা শেখ ব্যস্ত রান্নাঘরের কাজে। নতুন বাড়িতে এসেও সংসারের কাজ থেমে থাকার নয়।
তবে সকালকে আজ বাসায় পাওয়া যাচ্ছে না।
সকালও যে কিছু করে না, এমনটা মোটেও নয়। তার নিজের একটা ছোটখাটো গেঞ্জির ব্যবসা আছে। ব্যবসাটা খুব বড় কিছু নয়, একেবারেই সামান্য পরিসরে। কিন্তু নিজের একটা কাজ আছে, নিজের একটা আয় আছে। আর সেই কাজটাকেই ধীরে ধীরে বড় করার ইচ্ছাও আছে তার।
আজ সকাল ফোন করে জানিয়েছে, সে গেঞ্জির গাট্টি নিয়ে আসছে।
কিছুক্ষণ পর একটা রিকশা এসে বাড়িটার সামনে থামল।
রিকশায় বসে ছিল সকাল। তার হাতে গেঞ্জির বড় একটা গাট্টি।
রিকশা থেকে নামতে যাবে, ঠিক তখনই হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোরী রমণীর দিকে।
রমণীটির গায়ে স্কুলের পোশাক। নীল আর সাদা রঙের পোশাকটাতে তাকে বেশ মানিয়েছে।
গায়ের রং খুব বেশি ফর্সা নয়, বরং একটু চাপা। মুখে কেমন যেন একটা স্নিগ্ধতা আর মায়া মিশে আছে।
সকাল কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।
“মাশাআল্লাহ।”
কথাটা কখন যে তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, সে নিজেও বুঝতে পারল না।
কেন বলল? কেনই বা এতক্ষণ তাকিয়ে আছে?
সেটাও যেন তার নিজের কাছেই পরিষ্কার নয়।
তবে একটা বিষয় বুঝতে তার বাকি রইল না।
এই মেয়েটাকে সে আগে দেখেছে।
আজ পাখির গণিত পরীক্ষা। একজন দায়িত্বশীল শিক্ষার্থীর মতোই সময়মতো স্কুলের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল সে। কিন্তু বাসা থেকে বের হওয়ার পরপরই যে এমন একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, সেটা পাখি নিজেও জানত না।
বাড়ি থেকে বের হয়েই হঠাৎ সামনে রিকশাটা দেখে পাখি একটু থমকে গেল।
তারপর রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল।
চোখ তুলে তাকানোর সাহস তার আছে, অধিকারও আছে। কিন্তু সেই অধিকারটুকু পাখির বাবা-মা তাকে আজ পর্যন্ত খুব একটা দেননি।
কারও সঙ্গে অপ্রয়োজনে কথা বলা তো দূরের কথা, অপরিচিত কোনো ছেলের দিকে তাকানোও তার কাছে অস্বস্তিকর একটা ব্যাপার।
আর সেই অস্বস্তিটা সকালের চোখ এড়াল না।
সে বুঝতে পারল, মেয়েটা অস্বস্তিতে পড়েছে।
তাই রিকশাওয়ালা মামাকে বলল,
“মামা, একটু সাইড চেপে যান।”
রিকশাওয়ালা সাইডে চলে গেলেন।
পাখিও আর দাঁড়িয়ে থাকল না। এক মুহূর্তও নষ্ট না করে স্কুলের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিল।
দৌড়াচ্ছিল না, আবার ধীরেও হাঁটছিল না। যেন যত দ্রুত সম্ভব জায়গাটা পেরিয়ে যেতে চায়।
সকাল চুপচাপ তাকিয়ে রইল।
কেন জানি তার মনে হলো, যাওয়ার আগে মেয়েটা একবার তার দিকে ফিরে তাকাবে।
আর কাকতালীয়ভাবেই সেটাই হলো।
রাস্তার মানুষের ভিড়ে মিশে যাওয়ার ঠিক আগে পাখি এক ঝটকায় পিছনে তাকাল।
মাত্র এক মুহূর্ত।
সকালের সঙ্গে চোখাচোখি হলো।
তারপরই চোখ সরিয়ে নিয়ে মানুষের ভিড়ে হারিয়ে গেল পাখি।
সকালও কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে রিকশাওয়ালা মামার গলা শোনা গেল,
“ভাইজান, আপনার বিবি নাকি? মানে আমাদের ভাবিজান?”
সকাল ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে রিকশাওয়ালা মামার দিকে তাকাল।
তার মুখ দেখে বোঝাই যাচ্ছে, লোকটা সুযোগ বুঝে তার অসহায় মুহূর্তের মজাটা লুটছে।
সকাল ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ভাবিজান মানে শুধু ভাবি? জানটা বাদ দিয়ে দিয়েন?”
কথাটা শুনে রিকশাওয়ালা মামা একেবারে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন।
আর সকালের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল কেমন যেন এক শয়তানি হাসি।
রিকশাওয়ালা মামা মনে মনে বোধহয় তখনই ঠিক করে ফেললেন, এই ছেলের সঙ্গে বেশি কথা বলা যাবে না।