#অবাধ্য_মন_পাখি
#পর্ব_১০
#লেখনিতে_খাদিজা_পারভিন
সকালে জানালার ফাঁক দিয়ে আসা কড়া সূর্যের আলো সরাসরি নিশার চোখে পড়তেই তার ঘুম ভেঙে গেল।
চোখের মণি দুটো কুঁচকে উঠল যন্ত্রণায়।মুখ দিয়ে শব্দ বের হয়, "উফ্"
তার মাথাটা মনে হচ্ছে যেন কেউ শিল-পাটা দিয়ে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। চোখ বন্ধ করে হাত বাড়িয়ে কপালটা ধরতেই অনুভব করল সেখানে মোটা একটা ব্যান্ডেজ।
চারিদিকে কিসের যেন একটা কড়া গন্ধ—ডিসইনফেক্ট্যান্ট আর ওষুধের,মনে মনে ভাবছে , " আমি কি বেঁচে আছি?"
নিশা ধড়ফড়িয়ে চোখ মেলল। সাদা দেয়াল, মাথার ওপর ড্রিপ স্ট্যান্ডে ঝুলে থাকা স্যালাইনের ব্যাগ, আর তার পাশে চেয়ার টেনে পা তুলে বসে আছে চন্দন শেখ। তার সাথে বাঁধন সহ আরও চার-পাঁচজন।
নিশা আশেপাশে তাকিয়ে দেখে, " নাহ তুই বেঁচে আছিস রে নিশা।"
নিশাকে নড়াচড়া করতে দেখে চন্দন তাড়াতাড়ি পা নামিয়ে সোজা হয়ে বসল।
চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করল, "বস, আপনার জ্ঞান ফিরছে? রাতে আসলে কী হয়েছিল? এমন অবস্থায় কেন পড়েছিলেন রাস্তায়? আর আপনার গালের এই অবস্থা কে করলো? সকালে মিন্টু আপনাকে দেখতে পেয়ে আমাদেকে খবর দেয়।"
"সেখানে কি আর কেউ ছিলো?"
চন্দন জবাব দেয়," না।"
"মা জানে?"
"না।"
নিশা একদৃষ্টে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। কপালে প্রচণ্ড ব্যথা করছে , কিন্তু চন্দনের প্রশ্নের উত্তরে সে তার দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দিল।
খুব শান্ত গলায় বলল, "সবাই মন দিয়ে শুনো কি হয়েছিল, রাতে এক জিনের সাথে দেখা হয়েছিল। জীন বেটা বাইক নিয়ে ঘুরছিল, আমি ভাবলাম কোনো ভূত। তা ভূতকে কি আর এমনিতে ছাড় যায়? শখ করে ওর হেলমেটে নিজের কপালটা দিয়ে গুঁতো মারলাম, ভাবলাম যদি শিং দুটো ভেঙে যায়!"
চন্দন আর তার দলবল হা করে তাকিয়ে রইল। নিশা তাদের দিকে এক পলক তাকিয়ে আবার শুরু করল, "তবে জিনের জাত কি আর সহজে মরে? শয়তানটা গ্লাভস পরা হাতে এমন এক চড় মারল যে আমার গালটা এখন পিজ্জার বেস মনে হচ্ছে।বাঁধন আয়না নিয়ে আয় তো।
জিনের জাতের হাড়গোড়গুলো বড্ড বেশি শক্ত রে চন্দন, আমার তো নিজের পায়ের পাতাটাই ব্যথা হয়ে গেছে। কিন্তু আরেকবার যদি ঐ জিনটাকে পাই খোদার কসম পৃথিবী থেকে গেট আউট করে দিবো।"
বাঁধন নিজের ফোনের ক্যামেরাটা বার করে তার কাছে দেওয়ার সময় ফিসফিস করে বলল, "বস, আপনি কি নেশা করেছিলেন?"
নিশা উত্তর না দিয়ে ফোনটা নিয়ে নিজের মুখটা দেখতে লাগলো, " শালা কি কিউট আমি! মুখে রক্ত জমাট বেঁধেও নায়িকার মতো লাগছে।"
এক ঝটকায় নিজের হাতের স্যালাইনের সূচটা টেনে খুলে ফেলল। রক্তের বিন্দু এক-দুই ফোঁটা চাদরে পড়ল, কিন্তু তার ভ্রুক্ষেপ নেই। সে বেড থেকে নেমে উঠে দাঁড়ালো।
ঠিক তখনই দৌড়ে এল ডিউটি ডাক্তার। হাত উঁচিয়ে বাধা দিয়ে বললেন, "আরে এটা কী করছেন? আপনার মাথায় সেলাই পড়েছে, প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে, আপনাকে ২৪ ঘণ্টা অবজারভেশনে থাকতে হবে!"
নিশা ডাক্তারের দিকে চোখ গরম করে তাকালে,ডাক্তার চুপ হয়ে গেলো। নিশা নিজের চুলে হাত বুলিয়ে অবজ্ঞার হাসি দিয়ে বলল, "ডাক্তার সাহেব,আপনার স্যালাইনের নাকি খালের পানি কে জানে এতে আমার শরীরর শান্ত হবে না। আর তাছাড়া, হসপিটালের এই বাসি গন্ধের চেয়ে ধুলোবালির গন্ধ অনেক ভালো। আপনার এই সূচ-বড়শি আমার শরীরে সহ্য হচ্ছে না,এগুলো বরং আপনি লাগিয়ে বসে থাকুন।
আমি চললাম।বিল যা হয় পাঠিয়ে দিবো।"
ডাক্তার কিছু বলার আগেই নিশা চন্দনের কাঁধে হাত রেখে বেরিয়ে এল করিডোর দিয়ে।
চন্দনের মোটা দেহ থেকে প্রচুর ঘামের গন্ধে আসছে।নিশা নাক ধরলো আর ইশারায় চন্দনকে সরে যেতে বলে।
চন্দন একটু দূরে সরে দাঁড়ালে নিশা নাক ছেড়ে জোরে জোরে শ্বাস নেয়," কি রে হাতি গোসল করিস না কত দিন?শুধু গিলতে থাকলে হবে? গতর ধোয়াও তো লাগবে।
বাঁধনের বাচ্চা হ্যাংলার মতো দাঁড়িয়ে না থেকে আমাকে ধর।" বাঁধন ছুটে এসে নিশার হাত ধরে।
চন্দন একটু লজ্জা পেয়ে বলে," আরে আপনি ভুল বুঝছেন ।ঐ একটু গরম তো তাই আর কি।"জোর করে হাসতে চেষ্টা করে চন্দন।
এদিকে শহরের অন্য প্রান্তে 'অভ্র রায়হান' নিজের ড্রইংরুমের সোফায় পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে। কপালে আর নাকের ওপর একটা চওড়া সাদা ব্যান্ডেজ। চোয়ালের এক পাশে কালশিটে দাগ।
তবে গতকাল রাতে তার সেই নিখুঁত সুন্দর চেহারার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে নিশা।
অভ্রের ঠিক সামনেই সোফায় পা ছড়িয়ে বসে আছে তার খালাতো ভাই ইয়াশ আর সোহান। দুজনের মুখেই এমন এক শয়তানি হাসি,মাঝে মাঝে চোখ বাঁকা করে অভ্রের দিকে তাকাচ্ছে।
গতকাল রাতে তারা সবাই মিলে হাইওয়েতে একটা হেভি বাইক রেসে মেতেছিল। কিন্তু অভ্রের স্পিড সবসময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে। সে স্পোর্টস বাইক নিয়ে এমন গতিতে ছুটেছিল যে ইয়াশ আর সোহান তার থেকে অনেক পেছনে পড়ে যায়।
পরে তারা যখন সেই রাস্তা দিয়ে আসছিল, তখন দূর থেকে হেডলাইটের আলোয় দেখতে পায়—রাস্তার মাঝখানে অভ্র রায়হান একা উপুড় হয়ে পড়ে আছে! হেলমেটটা দূরে ছিটকে পড়েছে আর তার নাক দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে।
তখন তারা ভেবেছিল কোনো বড় অ্যাক্সিডেন্ট।
একটু দূরে পড়ে থাকা একটা মেয়েকে দেখে ইয়াশ দৌড়ে তার কাছে যেতে চাইলে সোহান তাকে নিষেধ করে।
তারপর অভ্রকে সেখান থেকে নিয়ে আসে।কিন্তু এখন আসল সত্যিটা শোনার পর তাদের হাসি আর থামছেই না।
সোহান একটা আপেলে কামড় দিয়ে অবলীলায় বলল, "সত্যি করে বল তো, কাল রাতে তুই কার ডোমেইন হ্যাক করতে গেছিলি? বাইক রেস করতে গিয়ে তুই নাকি একটা মেয়ের হাতে ফ্লাইং কিক আর হেডবাট খেয়ে নাক ফাটিয়ে আসলি। তুই তো রেসের কিং, এখন দেখি তুই 'রিং'-এর মধ্যেও নকআউট!"
ইয়াশ হেসে গড়িয়ে পড়ে বলল, "আরে সোহান ভাই, তুমি বোঝো নাই। আমাদের অভ্র দ্যা গ্রেড তো এতকাল মেয়েদের হৃদয়ে ঝড় তুলত।আর কাল রাতে একটা মেয়ে ডিরেক্ট ওর নাকে ঝড় তুলে দিয়ে গেছে! ভাই রে ভাই, মেয়েটা তোকে জাস্ট ওয়ান-টু-ওয়ান ফাইট দিয়ে ধুলো চাটায় দিল? তাও আবার তোর হেলমেট পরা অবস্থায়?"
বন্ধুদের এই চরম পচনশীল কথা শুনে অভ্রের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। কপালে ব্যান্ডেজের নিচ দিয়ে রগগুলো দপদপ করছে। হাতের মুঠো এতটাই শক্ত করে চেপে ধরেছে যে আঙুলের গাঁটগুলো সাদা হয়ে গেছে। সে তার সেই নেশাতুর বাদামি চোখ দুটো দিয়ে সোহানের দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন এখনই ওকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারবে।
গম্ভীর আর বরফশীতল কণ্ঠে অভ্র বলল, "মুখ বন্ধ কর তোরা নয়তো এমন অবস্থা করবো যে এর পর থেকে আর কথা বলার অবস্থয় থাকবি না। আর হ্যাঁ,ওটা কোনো মেয়ে ছিল না, আস্ত একটা সাইকো ছিল।গায়ে কম হলেও ১০৩ ডিগ্রি জ্বর ছিল।তাই নিয়ে একটা মেয়ে মানুষ ওমন জানোয়ারের মতো মারতে পারে, আমার আইডিয়া ছিল না।"
সোহান এবার আরও এক কাঠি বাড়িয়ে বলল, "আহা রে।মদ-খোর আমাদের অভ্র রায়হান ভাই সাইকো গার্লের চড় খেয়ে কাবু হয়ে গেছে।ভাবা যায়? তুই নাকি আবার ওকে আগে চড় মেরেছিলি? তোকে তো উল্টা সালামি দেওয়া উচিত ছিল, তা না করে মেয়েটা তোকে ইচ্ছে মতো পেটালো?নাহ্ মানা গেলো না।মেয়েটা ঠিক করেনি।"
ইয়াশ মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল, "শোন অভ্র, আমার মনে হয় মেয়েটার সাথে তোর আবার দেখা করা উচিত। থ্যাংক ইউ বলবি, কারণ তোর এই খাড়া নাকটা বড্ড বেশি অহংকারী ছিল, ওটা একটু ভোঁতা হওয়া দরকার ছিল। তা ভাই, মেয়েটার নাম-ঠিকানা কিছু জানিস? নাকি শুধু কিল-ঘুষি-মাথা ফাটানোর স্মৃতিটুকুই নিয়ে এলি?"
"গেট দ্য হেল আউট অফ হেয়ার!"—অভ্র আচমকা সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সজোরে টেবিলটায় একটা লাথি মারল। টেবিলে রাখা কাঁচের গ্লাসগুলো ঝনঝন করে কেঁপে উঠল।
তার রাগ দেখে ইয়াশ আর সোহান মুখ চেপে হাসতে হাসতে ড্রইংরুম থেকে দৌড়ে পালালো। কিন্তু অভ্র আর বসতে পারল না। সে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে নিজের কপাল আর নাকের ব্যান্ডেজটা ছুঁয়ে দেখল। কাল রাতের সেই ঝাপসা হয়ে আসা চাউনি, বাতাসে ওড়া চুল আর বাঘিনীর মতো হিংস্র মেয়েটার চেহারাটা তার মস্তিস্কে আবার ভেসে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে অভ্র মনে মনে বলল, "তুই যেই ই হোস না কেন, অভ্র রায়হানের গায়ে হাত তোলার শোধ তোকে দিতেই হবে!"
চলবে___