#অবাধ্য_মন_পাখি
#পর্ব_১১
#লেখনিতে_খাদিজা_পারভিন
সকাল দশটার দিকে দরজায় কলিং বেল পড়লে রহিমা গিয়ে দরজা খোলে।দরজা খোলার পর নিশা কে যখন দেখতে পায় মাথা, হাতে ব্যান্ডেজ করা জোরে একটা চিৎকার দেয়, "বড় আম্মা" বলে।
নিশার এমন অবস্থা দেখে রহিমার কান্না পাচ্ছে।
"চুপ কর শ্যাওড়া গাছের পেত্নি।আমি কি মরে গেছি নাকি ? মরা কান্না শুরু করবে মনে হয়।সরে যা সামনে থেকে।"
রহিমা ঝড়ের গতিতে সামনে থেকে সরে যায়।নিশা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেটৈ ভিতরে প্রবেশ করে। রহিমা ইচ্ছা করছিলো নিশা কে ধরতে কিন্তু ভয়ে পারছিলো না।চন্দন আর বাঁধন ঘরের ভিতরে আসে না কারন জাহানারাকে দেখলে তাদের ভয় লাগে। একবার এসেছিল, জাহানারার তাদেরকে শরবত খেতে দেয়। তখন অসাবধানতাবশত একটা গ্লাস চন্দনের হাত থেকে পড়ে ভেঙে যায়।
জাহানারা শাস্তি স্বরূপ তাদের একশ বার কান করে উঠবস করায়।
কপালে সাদা ব্যান্ডেজ, গালে কালশিটে, ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ নিয়ে নিশা আস্তে আস্তে হেটে যাচ্ছে।জাহানারা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে একবার শুধু মেয়ের দিকে তাকালেন। তার চোখেমুখে বিন্দুমাত্র বিচলিত হয়ে ওঠার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। এগিয়ে গিয়ে মেয়েকে ধরলেন, নিশা মাকে দেখে একটু মুচকি হাসি দিলো তাকে জাপটে ধরলো,"গুড মর্নিং ডার্লিং"
জামিলা রান্নাঘর থেকে খাবারের বাটি হাতে নিয়ে বেরিয়ে এসে নিশার অবয়বটা কিছুক্ষন দেখল। তারপর আবার নিজের কাজে চলে গেলো।
নিশার ক্ষতবিক্ষত হয়ে ফেরাটা অনেক স্বাভাবিক তাই কেউ আর এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না।
জাহানারা বেগম অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিশার হাত ধরে টেনে তাকে তার শোবার ঘরে নিয়ে গেলেন। বিছানায় বসিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "রাত থেকে তো মনে হয় মার ছাড়া আর কিছু পড়ে নাই।কিছু খাবি এখন? কিছু খেতে ইচ্ছে করছে বল বানিয়ে আনছি।"
নিশা বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে একটা ভেংচি কাটল। তারপর গম্ভীর মুখে বলল,
"মা, বেশি কিছু না। আমার জন্য একটু 'আস্ত তিমির ফ্রাই উইথ ডাইনোসরের ডিমের ওমলেট' বানিয়ে দাও তো।
ওহ আর সাথে ডেসার্ট হিসেবে এক বাটি 'ভাজা মশার লেজ' দিলেও চলবে।"
জাহানারা বেগম মেয়ের এই আজব খাবারের মেনু শুনে একটুও অবাক হলেন না শুধু তাকিয়ে আছে তার দিকে। একটা নির্বিকার চাউনি শেষে, কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
খাটের পাশের ছোট্ট টেবিলের উপর একটা আয়না রাখা ছিলো।নিশা হাত বাড়িয়ে আয়নাটা নিয়ে মুখের সামনে ধরল।নিজের মুখে হাত বুলিয়ে গাইতে শুরু করলো_
"কোন জংলি কুত্তার বাচ্চা আমার কপাল ফাটাইলি।
ও বন্ধু কোন অপরাধে আমার গালে চড় মারিলি।"
আয়নাটা আবার একই জাগায় রেখে নিশা যখন চোখ বুজে একটু জিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই ঘরের দরজায় রহিমার টোকা পড়লো।
"আপা আসবো?"
"আসবি?না আসলে হয় না? আচ্ছা তো এসেই যখন পড়েছিস তো আয়।"
রহিমা ঘরে ঢুকে মাথা নিচু করে বলে," পুলিশ এসেছে।"
এই অবস্থায় পুলিশের কথা শুনে নিশার মেজার একদম মাথায় উঠে গেল," ল্যাওড়া বাল গুলো কে বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দে।"
"একজন এসেছে। শুধু আপনাকে দেখতে আপনি অসুস্থ তাই।"
নিশা অবাক হয়ে, "আ্যা? কে সে?"
"আগে কখনও আসতে দেখিনি।জানি না কে।"
" আমার ঘরে পাঠিয়ে দে।"
"আচ্ছা" বলে রহিমা চলে যায়।
কিছুক্ষন পর দরজায় আবার টোকা পড়ে,"ভিতরে আসবো?"
গলা শুনেই নিশা বুঝতে পারে কে এসেছে।একটা মুছকি হাসি দেয়।
"আরে আসুন, ইন্সপেক্টর।"
আব্রাহাম ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে।
"আচ্ছা,আপনাদের কি আমার উপর নজর রাখা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই?"
আব্রাহাম একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে," আমদের কাজ ক্রিমিনালের গতিবিধির ওপর নজর রাখা।তাই ই তো করছি।আর এখানকার একমাত্র ক্রিমিনাল আপনি যার জন্য অন্য কোনো ক্রিমিনাল থাকতে পারে না।আমরা আপনার উপর কৃতজ্ঞ।"
"থাক ধন্যবাদ দিয়ে আমাকে ছোট করবেন না,"হাসলো নিশা।
আব্রাহাম নিশার রক্ত জমা মুখটার দিকে তাকিয়ে আছে।
"কি করে হলো এইসব?"
"তদন্ত করবেন?"
"অবশ্যই করবো।এটা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।"
নিশা জোরে হেসে ওঠে, হাসি থামছে না তার।
"আপনাদের কি সমস্যা জানেন?
আপনাদের এই দামি চশমাটা আসল অপরাধের সময় কেমন যেন ঘোলা হয়ে যায়, আর অদরকারি জিনিসে এসে একদম হাই-ডেফিনিশন রূপ নেয়।
যেখানে প্রতিদিন খুন, ধর্ষণ হচ্ছে সেখানে আপনাদের আইনের হাত একদম পকেটের ভেতর আরাম করে রাখা।
আর আমার গালের চামড়াটা কোন দিকে ফাটল, কপালে কয়টা সুতোর কাজ হলো—তা দেখার জন্য আপনাদের দায়িত্ববোধ একদম উথলে উঠছে। বাহ্ খুশি হলাম।"
নিশা আব্রাহামের বুটের দিকে তাকিয়ে একটা তাচ্ছিল্যের শ্বাস ফেলে আবার বলল, "যেখানে গিয়ে লাঠি চালানো দরকার, সেখানে আপনারা টেবিলের নিচে আঙুল চালান।আর যেখানে একটু চুপচাপ বসে ফাইল সই করলেই চলে, সেখানে আপনারা ডিরেক্ট জেমস বন্ড সেজে ড্রইংরুমে এসে জেরা শুরু করেন। দেশের আসল রোগটা বাদ দিয়ে আপনারা যেভাবে এই ভাঙা কপালে মলম লাগানোর জন্য ডিউটি পার করছেন,তার জন্য আপনাদের আলাদা করে একটা মেডেল দেওয়া উচিত।"
আব্রাহাম হেসে কিছু বলতে যাবে,ঠিক তখনই নিশার মোবাইলটা বিকট শব্দে বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল 'করিম চাচা'র নাম।
নিশা কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে করিম চাচার কাঁপতি গলা ভেসে এল, "নিশু মা সর্বনাশ হয়ে গেছে মা।এতিমখানার পাশের বড় মাঠে একদল লোক এসে ফ্যাক্টরি বানানোর কাজ শুরু করে দিছে!"
কথাটা শুনতেই নিশার পুরো শরীর রি-রি করে উঠল। ওই মাঠের জায়গাটা নিয়ে একটা দীর্ঘদিনের মামলা চলছে। নিশার বাবা বেঁচে থাকতে এই জায়গাটা এতিমখানার বাচ্চাদের জন্য আগলে রেখেছিলেন।
কিন্তু শহরের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী 'আসাদ রায়হান' ওই মাঠ দখল করে কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি বানাতে চেয়েছিল। বাবার মৃত্যুর পর নিশার ভয়ঙ্কর জেদের কারণে এতদিন রায়হান পরিবার সেখানে হাত দেওয়ার সাহস পায়নি।যত বার চেষ্টা করছে তত বার নিশা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
করিম চাচা ওপাশ থেকে প্রায় কেঁদে ফেলে বললেন, "মা, আজ আসাদ রায়হানের ছেলে,মিস্টার AR নিজে এসেছেন।সে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে আজ ফ্যাক্টরি বানানোর কাজ শুরু করাইয়া দিছে।
সে বলছে আজ কাজ শুরু না করে সে এখান থেকে নড়বে না!"
নিশার মাথায় যেন ৪৪০ ভোল্টের শট লাগল।অসুস্থ শরীর, গায়ে তীব্র জ্বর আর সেলাইয়ের ব্যথা—সব কিছু ভুলে নিশা এক ঝটকায় বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সোজা একটা গালি ছুড়ল,"ওই জানোয়ারদের এত বড় সাহস।আমার বাপের জায়গায় হাত দেয়!"
ইন্সপেক্টর আব্রাহাম ক্রুস চেয়ারে বসে পায়ের ওপর পা তুলে নিশার এই রূপ দেখছিল আর মনে মনে বেশ মজা নিচ্ছিল।
নিশা এক সেকেন্ডও দেরি না করে চন্দনকে ফোন লাগাল। ওপাশ থেকে চন্দন 'হ্যালো বস' বলতেই নিশা গর্জে উঠল, " যতগুলো রামদা, চ্যালা কাঠ আর হকিস্টিক আছে, সব নিয়ে দলবল সহ নিয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে এতিমখানার মাঠে আয়।"
ফোনটা কেটেই নিশা ঝড়ের গতিতে চুল গুলো বড় একটা খোপা করে বেরিয়ে যায়। তার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে আব্রাহাম মুচকি হাসি দিলো।
তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল, "এত দিন জংলি বাঘিনীর তান্ডব লোকমুখে শুনেছি আজ মনে হয় নিজের চোখে দেখার সৌভাগ্য হতে চলেছে।"
এতিমখানার মাঠের এক কোণে একটা চেয়ারে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে মিস্টার AR(অভ্র রায়ান)। পরনে নেভি-ব্লু শার্ট আর ডার্ক ব্লু ডেনিম প্যান্ট। রোদের মধ্যে তার মাথার ওপর এক লোক মস্ত বড় কালো ছাতা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কপালে আর নাকের ওপর কাল রাতের সাদা ব্যান্ডেজটা স্পষ্ট সাদা হয়ে ফুটে আছে। তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ইয়াশ আর সোহান, আর অভ্র অত্যন্ত আয়েশ করে মাঠের কাজ দেখছে।
এর মধ্যে ভীষণ শব্দ করে আসা একটা ট্রাকের শব্দে সবাই সেই দিকে তাকায়।
অনেকগুলো ছেলে আর তার ভিতরে থাকা একটা মেয়েকে রাম দা হাতে প্রথম ট্রাক থেকে নামতে দেখে অভ্রের গা জ্বলতে শুরু করে।
চলবে__