#অবাধ্য_মন_পাখি
#পর্ব_১২
#লেখনিতে_খাদিজা_পারভিন
ট্রাকের পেছনের ডালাটা খুলতেই হুড়মুড় করে নামল একদল ছেলে।আর তাদের মাঝখান থেকে, ডান হাতে একটা চকচকে, বিশাল রাম দা নিয়ে সবার আগে নেমে এল একটা মেয়ে,কপাল ব্যান্ডেজ করা,গালটা ফোলা আর কালশিটে পড়া।
তাকে দেখামাত্রই অভ্রের কপালে ব্যান্ডেজের নিচ দিয়ে রগগুলো দপদপ করে উঠল, কাল রাতের দৃশ্যটা মনে পড়তেই তার পুরো গা জ্বলতে শুরু করল।
নিশা এক ঝটকায় হাতের রাম দা-টা নিজের ডান কাঁধের ওপর উঠিয়ে নিল। হিংস্র পদক্ষেপে সে মাঠের দিকে হাঁটতে শুরু করল, আর তার পেছনে রাম দা, হকি স্টিক হাতে চন্দন,বাঁধন আর তারেদ পুরো দলবল এগিয়ে চলছে।
তাদেরকে এই ভয়ংকর রূপে এগিয়ে আসতে দেখে অভ্র, ইয়াশ আর সোহান চেয়ার ছেড়ে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল।
এতক্ষণ ভয়ে এতিমখানার বাচ্চাগুলো ভাঙা দেওয়ালের পেছনে লুকিয়ে ছিলো।বোঝার চেষ্টায় ছিল কি হবে এখানে।
নিশাকে মাঠে পা ফেলা মাত্রই তাদের মধ্যে যেন প্রাণ ফিরে এল। দেওয়ালের আড়াল থেকে লাফাতে লাফাতে চিৎকার করতে লাগল, "নিশা আপু, নিশা আপু,মারো ওগোরে!"
বাচ্চাদের এই তুমুল চিয়ারআপ শুনে অভ্র অবাক হয়ে চারপাশের দিকে তাকাল—"ওরা কারা?আর কার নাম বলছে?কে নিশা!"
এদিকে নিশা একটু কাছে আসতেই সোহানের চোখ গেল তার কাঁধের ওই বিশাল রাম দা-টার দিকে। ওই অস্ত্রের সাইজ দেখে সোহানের কলিজা শুকিয়ে কয়লা হয়ে গেছে। সে কোনো মান-সম্মানের তোয়াক্কা না করে, ডানে-বামে না তাকিয়ে, এক দৌড়ে গিয়ে অভ্রের মার্সিডিজ গাড়িটার পেছনে লুকাল। গাড়ির চাকার আড়াল থেকে শুধু তার ভীতু চোখ দুটো উঁকি দিতে লাগল।
অভ্র তার দিকে এক পলক তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, "শালা মীর জাফর।"
মাঠে কাজ করতে থাকা কনস্ট্রাকশনের কর্মীরা নিশাকে দলবলসহ আসতে দেখেই তাদের একজন চিৎকার করে উঠল," নিশা এসে গেছে দৌড়া সব, নাইলে আজ জান শেষ!"
চোখের পলকে মিক্সচার মেশিন আর ইট-পাথর ফেলে সব কর্মী যে যেদিকে পারল মাঠ ছেড়ে পালাল।তারা প্রথমে কাজ করতে রাজি হয়নি কিন্তু অভ্রের হুমকিতে বাধ্য হয়েছিল।
চারপাশে লোকদের এভাবে পালাতে দেখে অভ্র রাগের চোটে ফুলতে লাগল।নিজের মাথার ওপর ধরে রাখা লোকটার হাত থেকে এক টানে ছাতাটা কেড়ে নিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল সে। তপ্ত রোদ সরাসরি এসে পড়ল তার রাগী মুখে।
নিশা সোজা হেঁটে এসে একদম অভ্রের মুখোমুখি দাঁড়াল। গত রাতে জ্বরের ঘোরে থাকায় অভ্রের মুখ তার মনে নেই কিন্তু তার বাদামি চোখ আর কপালের ব্যান্ডেজর দিকে তাকিয়ে তার সবকিছু বুঝতে বেশি সময় লাগলো না।
কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই, চোখের পলকে কাঁধের রাম দা-টা নামিয়ে তার ধারালো ঠান্ডা দিকটা চেপে ধরল অভ্রের ফর্সা গলার ওপর।
নিশার চোখ দিয়ে তখনো আগুন ঝরছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে মারাত্মক এক গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "জানোয়ারের বাচ্চা,অনেক শখ না ফ্যাক্টরি বানানোর? এই জমির দিকে যদি আর একবার চোখ তুলে তাকিয়েছিস, তবে এই রাম দা দিয়ে এক কোপে তোর এই সুন্দর গলাটা কেটে মাথাটা এই মাঠের মাটির নিচে পুঁতে ফেলব।
আর তোর বাপের কাছে পাঠিয়ে দেবো শুধু তোর ধড়টা!"
গলায় ধারালো অস্ত্রের ঠান্ডা স্পর্শ লাগলেও অভ্র রায়ান এক চুলও পেছাল না। সে তার সেই তপ্ত বাদামি চোখ দুটো দিয়ে নিশার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। একটা হিংস্র হাসি দিয়ে অভ্র পাল্টা জবাব দিল, "হুমকি?তাও এই অভ্র রায়ানকে?
এই সব ফুটানিতে অভ্র রায়ান ভয় পায় না।"
এদিকে দিন দুনিয়ার সব ভুলে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইশান এতক্ষণ হা করে নিশার দিকে তাকিয়ে ছিল। কপালে ব্যান্ডেজ বাঁধা, কপাল কাটা, হাতে রাম দা,গায়ে সাদা শার্ট ,বড় একটা খোপা করা এই এক টুকরো জিবন্ত আগুনের ফুলকিকে দেখে ইয়াশ মারাত্মকভাবে ক্রাশ খেয়ে গেলো।
সে মনে মনে বলল, "উফফ! কী ডেঞ্জারাস বিউটি রে ভাই! ডিরেক্ট কলিজায় হিট করছে!"
নিশা অভ্রের দিক থেকে চোখ না সরিয়েই নিজের দলবলকে উদ্দেশ্য করে চড়া গলায় আদেশ দিল, "চন্দন! এই মাঠের ভেতর যতগুলো ফ্যাক্টরির মালসামাল আছে সব তোদের ট্রাকে বোঝাই কর। তারপর সোজা নিয়ে গিয়ে নদীতে ফেলে দিয়ে আয়। একটা ইটের কণাও যেন এই মাঠে না থাকে।
ঠিক তখনই হুট করে একঝলক তপ্ত বাতাস ধুলোবালি উড়িয়ে তাদের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেল। ধুলোর ঝটকায় নিশার চোখ দুটো অবচেতনভাবেই সেকেন্ডের এক ভগ্নাংশের জন্য বন্ধ হয়ে গেল।ঠিক তখনই বিদ্যুৎগতির চেয়েও ক্ষিপ্রতায় অভ্র নিজের ডান হাত বাড়িয়ে নিশার কবজিটা চেপে ধরে মোচড় দিল, আর বাম হাত দিয়ে নিশার হাত থেকে তড়িৎ বেগে রাম দা-টা কেড়ে নিল। নিশা কিছু বুঝে ওঠার আগেই অভ্র সেই ধারালো রাম দা-র উল্টো পিঠটা সজোরে চেপে ধরল নিশার গলার ওপর।
অভ্র নিশার ওই অবাধ্য হাতটা শক্ত মুঠোয় ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিল। আচমকা সেই তীব্র টানে ভারসাম্য রাখতে না পেরে নিশা ছিটকে এসে আছড়ে পড়ল অভ্রের চওড়া বুকের ওপর। দুজনের মাঝখানের দূরত্ব তখন শূন্য। নিশার উত্তপ্ত নিঃশ্বাস অভ্রের গলায় গিয়ে আছড়ে পড়ছে।
অভ্র নিশার কানের কাছে নিজের মুখটা নামিয়ে আনল। তার সেই নেশাতুর বাদামি চোখে তখন আর কোনো নেশা ছিলো না পুরোটা জুড়ে শুধু ছিল হিংস্রতা।
ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষাক্ত হাসি ফুটিয়ে সে ফিসফিস করে বলল, "কী যেন বলেছিলে মিস ক্ষ্যাপা নেকড়ে? বাতাস বেশি ছিল তো, ঠিকমতো শুনতে পাইনি।একটু আবার বলো না শুনি?"
তাদের এই অতি ঘনিষ্ঠতা আর নিশার গলায় চকচকে অস্ত্রের ছোঁয়া দেখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াশের বুকটা ধক করে উঠল।অভ্র যে কতটা জেদি আর ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা ইয়াশ খুব ভালো করেই জানে। নিশার কোনো ক্ষতি হয়ে যাক, এটা সে কোনোভাবেই চাইছে না।
সে আমতা আমতা করে বলল, "আরে ছাড় ওরে,কি করছিস? যা-ই হোক, একটা মেয়ে মানুষ তো।"
অভ্রের সেই হিংস্র হয়ে ওঠা বাদামি চোখ দিয়ে তাকায় ইশানের দিকে।ইশানের মুখে নিশার জন্য এই আকুলতা দেখে অভ্রের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে," মুখ বন্ধ রাখ, নাইলে তোকেও এই মাঠের মাটিতে পুঁতে দেবো।"
"কেউ মাঠের একটা জিনিসে হাত দিলে আজ এই মেয়ের লাশ ফেলে দিবো।"
সবাই থমকে দাঁড়ায়।
" আমার লাশ পড়ুক তাও আমার দেওয়া আদেশ অমান্য করলে তোদের লাশ আমি ফেলবো।"
ভাঙা দেওয়ালের আড়ালে থাকা এতিমখানার ছোট ছোট বাচ্চাগুলো যখন নিশার গলায় ওই চকচকে ধারালো অস্ত্র দেখলো তারা ভয়ে আতঙ্কে শিউরে উঠল। তাদের সবটুকু সাহস এক নিমেষেই উড়ে গেল। তারা আর দেওয়ালের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারল না।
সাত-আটটা বাচ্চা কান্না করতে করতে দেওয়ালের পাশ থেকে এক দৌড়ে মাঠের মাঝখানে চলে এল।
তারা সোজা গিয়ে অভ্রের দুই পা জড়িয়ে ধরল। ছোট ছোট হাতগুলো দিয়ে অভ্রের ডেনিম প্যান্ট খামচে ধরে, ধুলোবালির মধ্যে হাঁটু গেড়ে বসে তারা অঝোরে কাঁদতে লাগল।
"ছেড়ে দাও আপুকে ছেড়ে দাও!" একটা ছোট ছেলে অভ্রের জুতোয় মাথা ঠেকিয়ে মরণপণ আকুতি করতে লাগল।
নিশার মেজাজ আরো গরম হলো, " শালার ল্যাওড়ার বালগুলো ওঠ। তোদের এই শিখাইলাম এত দিন ধরে?সব গুলোর পাছার ছাল তুলে দিবো ওঠ ঐ শয়তানের পা থেকে।"
নিশার কথার দিকে কারো খেয়াল নেই তাদের লক্ষ্য একটাই নিশা কে ছাড়ানো।
আরেকটা ছোট্ট মেয়ে চোখে পানি নিয়ে অভ্রের দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করে বলল, "আপুকে মেরো না! আমাদের এই দুনিয়ায় নিশা আপু ছাড়া আর কেউ নেই। আপু মরে গেলে আমাদের কে দেখবে? আমাদের আর কেউ নেই।"
বাচ্চাগুলোর এই বুকফাটা কান্না আর আর্তনাদ মাঠে উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু বাতাসকেও ভারী করে তুলল। চন্দন আর তার দলবলও জাঁতাকলে পড়ে গেছে,সামনে এগোলেই নিশার গলায় রাম দা বসে যাবে, আবার পেছনে হঠলে নিশা তাদের মেরে দিবে।
অভ্র রায়ানের বুটের ওপর যখন ওই এতিম বাচ্চাগুলোর চোখের তপ্ত পানি আর ছোট ছোট হাতের স্পর্শ লাগল, তখন তার ভেতরের হিংস্রতার আগুন নিভে গেলো। সে নিশার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থাতেই নিচে কান্নায় ভেঙে পড়া বাচ্চাগুলোর দিকে আড়চোখে তাকাল। তার সুগঠিত বুকের ভেতর কোথাও যেন একটা সূক্ষ্ম মোচড় দিয়ে উঠল।সে নিশা কে ছেড়ে দিলো।রাম দা টা দূরে ছুড়ে ফেলে দিলো।
নিশাও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
অভ্র একবার নিশা আর আরেকবার মায়া ভরা চোখে বাচ্চা গুলোর দিকে তাকিয়ে সোজা হেঁটে গিয়ে গাড়ীতে বসলো।অভ্রের সাথে সাথে সোহান আর ইশানও গাড়িতে উঠে বসলো ।
নিশার দৃষ্টি এখনো অভ্রের দিকে।অভ্র ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা করে চলে যাওয়ার সময় গাড়ির জানালা খুলে নিশা কে উদ্দেশ্য করে মিডিল ফিংগার দেখিয়ে দিলো।
মুহুর্তে নিশার মুখ চোখ আবার লাল হয়ে গেল রাগে।এটা দ্বারা অভ্র তাকে বুঝিয়ে গেল আজ সে নিশার উপর দয়া করেছে।সে আবারও আসবে।
নিশা মাঠের উপর জোরে একটা লাথি মারলো।
"হা করে সব আমার দিকে তাকিয়ে আছিস কেন আবালের দল?মাঠ ক্লিয়ার কর।"
নিশা হেঁটে মাঠ থেকে বেরিয়ে এলেই দেখা মেলে ইন্সপেক্টর আব্রাহামের।
"আরে এই যে এসে গেছে সিনেমার ইন্ডিং পার্ট লাঠি হাতে ভুঁড়িওয়ালা পুলিশ কাকু।"
আব্রাহাম কিছুই বলতে যাবে তার আগেই নিশা ক্ষিপ্র পায়ে চলে যায়।
বেশ কিছুদিন সব ঠিক ঠাকই। একদিন দুপুরে একটা খবর ছড়িয়ে পড়ে গত রাতে বৃদ্ধ নানিকে খুঁটির সাথে বেঁধে দুইজন তার বারো বছরের ছোট্ট নাতনিকে ধর্ষণ করেছে।
নিশা তখন তার দলবল নিয়ে কলেজের আম গাছের তলায় বসে কাচা আম মেখে খাচ্ছিলো।
রাজন ছুটতে ছুটতে এসে নিশা কে খবর দেয়..
চলবে__