ফন্ট সাইজ:
থিম:
অবাধ্য মন পাখি

২৮তম পর্ব

লেখক: খাদিজা পারভিন

#অবাধ্য_মন_পাখি

#পর্ব_২৮

#writer_খাদিজা_পারভিন

শত্রুর বাড়িতে কাজের লোক সেজে ফাইল চুরি করতে এসে ধরা খেয়েছে নিশা।আর তার শত্রু অভ্র রায়ান সব কিছু আগে থেকেই জানতো তাই ইচ্ছে মতো খাটিয়েছে তাকে এই গুলো ভাবতেই নিশার রাগ আর কষ্ট দুটোই একসাথে হচ্ছে।

কি করবে বা কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না।নিশার এইটা ভেবে বেশি রাগ হচ্ছে যে অভ্র সেই জমিতে আর যাবে না হুদাই এত কষ্ট করলো।

নিশা মল্লিক নাকি অভ্র রায়ানের জুতা পরিষ্কার করেছে।

নিশা আর এক সেকেন্ডও সেই ঘরে দাঁড়াল না। রাগে-ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে, ফাইলটা দূরে ছুড়ে মেরে হনহন করে অভ্রের বাড়ি থেকে বেরিয়ে চলে গেল।

যাওয়ার পথে কম্পাউন্ডের ভেতর দেখা হয়ে গেল ইশান আর সোহানের সাথে।

ইশান শাড়ি পরা, ঘোমটা খোলা নিশাকে দেখে পুরো হা হয়ে গেল। নিশার সেই মোহনীয় রূপ আর রাগী চেহারার দিকে সে পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইল। নিশা তখন রাগে অন্ধ, সামনে কে দাঁড়িয়ে আছে দেখার সময় নেই। সে এক ঝটকায় নিজের হাত দিয়ে ইশানের বুকে ধাক্কা মেরে তাকে রাস্তা থেকে সরিয়ে হনহন করে গেট পেরিয়ে চলে গেল।

নিশা চলে যাওয়ার পর নিশা ইশানের বুকের ঠিক যেই জায়গাটায় হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়েছিল, ইশান ডান হাত দিয়ে বারবার সেই জায়গায় হাত বোলাতে লাগল। তার চোখ তখনো গেটের দিকে, যেখানে নিশার শাড়ির আঁচল শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল। সে যেন এক পরীর দেশে চলে গেছে।

সোহান ইশানের এই হাঁ করা মুখের দশা দেখে তার শার্টের কলার ধরে টেনে হিঁচড়ে বাড়ির ভেতরে নিয়ে আসতে লাগল।

ইশান তখনো ঘোরের মধ্যে বিড়বিড় করছে, "স্পর্শ... পবিত্র স্পর্শ..."

ভেতরে আসার সময় সোহান তার সেই চাট করা জায়গাটা একটু ধরতে যেতেই ইশান এক লাফে পিছিয়ে গেল। নিজের দুই হাত দিয়ে বুকটা আড়াল করে চিৎকার করে বলল, "খবরদার সোহান,এই জায়গায় ভুলেও হাত দিবি না, এইখানে স্বয়ং অপ্সরা ছোঁয়া দিয়ে গেছে। এই শার্ট আমি আর কোনোদিন ধুয়ে দিব না, এই জায়গা কাউকে ছুঁতেও দেব না।"

ইশানের অবস্থা দেখে সোহান কপালে হাত দিয়ে বলল, "চল ভেতরে চল।"

দুই বন্ধু মিলে ড্রয়িংরুমে আসতেই দেখল অভ্র সোফায় বসে শান্ত মনে কফি খাচ্ছে।

ইশান আর সোহান অভ্র কে দেখে তার পাশে গিয়ে বসলো।

"নিশা মল্লিক কোথা থেকে আসলো?" সোহান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো।

অভ্র কফিতে একটা চুমুক দিয়ে অত্যন্ত নির্বিকার গলায় বলল, "রঙ্গিলাই নিশা মল্লিক"

"কীহ্?" সোহান চেঁচিয়ে উঠলো।"তুই জানিস আগে থেকেই?

অভ্র শান্ত গলায় যোগ করল, " প্রথম দিন থেকেই জানতাম ও নিশা মল্লিক। তাই ইচ্ছা করে এতদিন ওকে দিয়ে ঘর মুছালাম আর আমার জুতো পালিশ করালাম।"

এই কথা শোনা মাত্রই ইশানের দুনিয়া যেন ওলটপালট হয়ে গেল। অভ্র আগে থেকেই সব জানত, অথচ ইশানকে একটা বারও জানায়নি? নিশা তার এত কাছে ছিল, অথচ সে তাকে শুধু কাজের মেয়ে ভেবে পাত্তা দেয়নি?

ইশান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ড্রয়িংরুমের মেঝেতে ধপ করে বসে পড়ে দুই হাতে মুখ ঢেকে হু হু করে ছোট বাচ্চাদের মতো কান্না শুরু করে দিল!

সোহান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, "তোর আবার কি হলো? কাঁদছিস কেন?"

ইশান কান্নার চোটে নাক টানতে টানতে ভাঙা গলায় বলল, "অভ্র... তুই একটা পাষাণ। তুই একটা জল্লাদ। এত বড় একটা সত্য তুই আমার কাছে লুকিয়ে রাখলি? আমি আমার স্বপ্নের রানিকে সামনে পেয়েও একটু মন ভরে দেখতে পারলাম না।

ওরে আমার পরী,ও আমার পাখি।

ও আমার বুকটা ছুঁয়ে দিয়ে চলে গেল, আর আমি কিছুই করতে পারলাম না।খোদা, তুমি আমারে তুলে নাও।"

ইশানের এই ন্যাকা কান্না দেখে অভ্র কফির কাপটা টেবিলে রেখে কপাল চাপড়াল, আর সোহান ইশানের পিঠে ধপাধপ কয়েকটা কিল মেরে বলল, "উঠ শালার পোলা।"

কিন্তু ইশান তখনো নিশার দেওয়া সেই হাতের স্পর্শের জায়গায় হাত বোলাচ্ছে আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেই চলেছে।

অনেক দিন পর নিজের বাড়ির সামনে দাঁড়াল নিশা। ভেতরে ঢুকতে ঠিক ভয় পাচ্ছে না, তবে একটু দ্বিধাবোধ তো আছেই। ভেতরে পা রাখলেই কি আবার জাহানারা বেগম ঝাড়ু নিয়ে তেড়ে আসবেন?

ভাবতেই নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল সে। আল্লাহর দুনিয়ায় ওই জাহানারা বেগম ছাড়া এই নিশা মল্লিক আর কাউকে ভয় পায় না।

তখনই নিশার ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে একটা অপরিচিত নম্বর। রিসিভ করে কানে তুলতেই ওপাশ থেকে একটা মেয়ের ভয়ার্ত কণ্ঠ ভেসে এল:

"আপু... আসসালামুয়ালাইকুম।আপু আমি পর্দা করি।

"ভালো কথা বেশি করে করো। কিন্তু সমস্যা কোথায়?"

"আপনি তো অনেক দিন কলেজে আসেন না।আপনি যেই দিন কলেজে আসেন আমরা খুব শান্তিতে থাকি‌। কিন্তু কয়েকদিন আগে আমাদের কলেজে নতুন একটা ছেলে এসেছে। অনেক দিন ধরে সে সব মেয়েদের র‍্যাগ দেয়, উত্যক্ত করে।গতকাল সে আমাকে সরাসরি হুমকি দিয়েছে, আমি যদি আজ কলেজে যাই, সে নাকি সবার সামনে আমার বোরকা খুলে ফেলবে।আপু, আমি অনেক কষ্টে আপনার নম্বরটা জোগাড় করেছি। আমাকে একটু সাহায্য করুন, প্লিজ।"

কথাগুলো শোনামাত্রই নিশার রগচটা মাথাটা মুহূর্তের মধ্যে গরম হয়ে গেল। চোখের দৃষ্টিতে নেমে এল তীব্র ক্ষোভ, চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল তার। এত বড় সাহস? রাগ ও চরম আক্রোশে নিশার পুরো শরীর কাঁপতে লাগল। সে মেয়েটিকে শুধু এটুকুই বলল:

"গেটের বাইরে আমার জন্য অপেক্ষা কর।"

কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই খট করে ফোনটা কেটে দিল নিশা।

ঝড়ের বেগে ঘরের ভেতরে ঢুকল নিশা। হাতে থাকা ব্যাগটা সোফায় ছুড়ে মারলো।সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল কাজের রহিমা। নিশা তাকে দেখেই আদেশ সুরে বলল, "রহিমা, তোর একটা বোরকা দে তো আমাকে।"

এতদিন পর নিশাকে হঠাৎ বাড়িতে দেখে রহিমা তো খুশিতে আত্মহারা। সে আহ্লাদ করে বাড়ির সবাইকে ডাকতে যাবে—"ও খালাম্মা, আপামণি আইছে।"

কথাটা শেষ করার আগেই ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিল রহিমার গালে।

চোখ রাঙিয়ে বলল, "যা বলছি ঠিক তাই কর,ফালতু কথা না বলে বোরকা নিয়ে আয়"

রহিমা গালে হাত দিয়ে ভয়ে ভয়ে আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। দৌড়ে গিয়ে নিজের একটা বোরকা এনে নিশার হাতে দিল।

ঝটপট বোরকাটা গায়ে জড়িয়ে নিল নিশা। শুধু চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে।আর কোনো দিকে না তাকিয়ে, সোজা কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

কলেজের মেইন গেটের সামনে থমকে দাঁড়িয়ে ছিল অনু। ভেতরে ঢোকার সাহস তার হচ্ছিল না। চারপাশের পরিচিত পরিবেশটাই আজ তার কাছে এক চরম আতঙ্কের নগরী মনে হচ্ছে। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডের ধকধকানিটা সে নিজেই শুনতে পাচ্ছিল। দুই হাতে বোরকার কাপড়টা শক্ত করে চেপে ধরে সে কেবল কাঁপছিল, আর ঠিক তখনই তার পাশে এসে দাঁড়াল নিশা।

পুরো শরীর কালো বোরকায় ঢাকা, শুধু চোখের অংশটুকু খোলা। কিন্তু সেই দুটো চোখের দিকে তাকাতেই অনুর শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। সাধারণ চোখ নয়, ও যেন জীবন্ত দুটো জ্বলন্ত অঙ্গার, যা থেকে অবিরাম ক্রোধের স্ফুলিঙ্গ ঝরে পড়ছে। অনু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, "আপু, আপনি নিশা আপু?"

সে কোনো কথার উত্তর না দিয়ে শুধু দুটি শব্দ উচ্চারণ করল, "ভেতরে যা।"

অনুর আর কিছু বলার সাহস হলো না। মাথা নিচু করে সে ভেতরের দিকে পা বাড়াল। আর তার ঠিক কয়েক কদম পেছনে, নিঃশব্দে, এগিয়ে চলল নিশা।

কলেজ ক্যাম্পাসের ঠিক মাঝখানের একটা আমা গাছতলায় আড্ডা জমিয়েছে ফাহিম আর তার দুই বন্ধু। তাদের চোখে-মুখে এক উল্লাস। অনূকে দূর থেকে হেঁটে আসতে দেখেই ফাহিমের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।

সে একটা শিস দিয়ে, হাতের দুই আঙ্গুলে ইশারা করে অনুকে ডাকল," সামনে আয়।"

অনু নিরূপায় হরিণীর মতো কাঁপতে কাঁপতে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ফাহিম এক লাফে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নোংরা দৃষ্টি দিয়ে অনুকে আপাদমস্তক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। অনুর মনে হচ্ছে কোনো ক্ষুধার্ত জানোয়ারের সামনে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

"কি মাল রে তুই!পুরাই জোস ইচ্ছা করছে এখনই,," অপমানে, লজ্জায় আর ভয়ে অনুর চোখ ফেটে জল চলে এল। সে কেবল ডুকরে কেঁদে ওঠার অপেক্ষায় ছিল।

ফাহিম তার বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে হাসি হাসল, যেন কোনো মস্ত বড় যুদ্ধ জয় করেছে। হাতটা বাড়িয়ে দিল অনুর হিজাবের দিকে। ঠিক যখনই তার আঙুলগুলো কাপড়ের সীমানা স্পর্শ করতে যাবে, তখনই অনু আর নিজের ভয় চেপে রাখতে পারল না। পুরো ক্যাম্পাস কাঁপিয়ে সে চিৎকার করে উঠল, "নিশা আপু"

সাথে সাথেই কালবৈশাখী ঝড়ের মতো অনুর পেছনে দেখা গেলো নিশা কে।

অনুর চিৎকারে আশপাশে থাকা সবাই সেখানে চলে আসলো।

ফাহিম এটাই চাইচিলো আজ একজনকে সবার সামনে হেনস্থা করতে পারলে সবাই তাকে ভয় পাবে।

ফাহিম প্রথমে নিশার জলন্ত চোখ দেখে একটু চমকে গেলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল। সে নিশাকে চেনে না। বোরকা পরা এই নারীকে দেখে তার মনে ভয়ের লেশমাত্র জাগল না।

উল্টো ফাহিম হাসিতে ফেটে পড়ল। হাসতে হাসতে প্রায় লুটোপুটি খেয়ে ফাহিম বলল, "ওরে বাবা রে। তোর বোনকে নিয়ে এসেছিস ? তা ভালোই করেছিস। এক টিকিটে দুই ছবি।আচ্ছা, তাহলে তোরটা পরে হবে, আগে তোর এই বোনের বোরকাটাই খোলা যাক।"

নিশা কোনো কথা বলল না।তার মুখে কোনো আর্তি নেই। সে অত্যন্ত শান্তভাবে, এক হাত দিয়ে অনুকে আগলে ধরে আলতো ধাক্কায় একপাশে সরিয়ে দিল। অনু এক কোণায় গিয়ে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল, তার পুরো শরীর তখনো থরথর করে কাঁপছে।

ফাহিম এক পা এগিয়ে এসে সজোরে নিশার হিজাব ধরে টান দিল। তীব্র টানে নিশার মাথার হিজাব আর নেকাব এক নিমেষে খুলে মাটিতে পড়ে গেল। সেই আকস্মিক টানের ধাক্কায় নিশার চুলের খোপাটাও আলগা হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে পিঠ ছাপানো ঘন কালো চুলের রাশি বাতাসে ডানা মেলল, ছড়িয়ে পড়ল তার মুখের চারপাশে।

হিজাব সরে যেতেই নিশার যে রূপ প্রকাশ পেল, তা দেখে ফাহিম মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। রাগে লাল হয়ে থাকা নিশার ফর্সা মুখমণ্ডল তখন লালচে আভা ধারণ করেছে, টানা টানা দুটো চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে, আর বাতাসে তার অবিন্যস্ত চুলগুলো উড়ছে।

নিশার মোহনীয় রূপ দেখে ফাহিম থমকে গেল, তার চোখের পলক পড়া বন্ধ হয়ে গেল।

ফাহিম নিশার গায়ের বোরকাটাও টেনে খুলে ছুড়ে ফেলে দিল। নিশা স্থির দাঁড়িয়ে রইল। সে বাধা দিল না, কোনো চিৎকার করল না, এমনকি নিজের শরীর আড়াল করার কোনো চেষ্টাও করল না। তার এই পাথরের মতো শান্ত থাকাটাই ছিল ঝড়ের আগের স্তব্ধতা।

ফাহিম এবার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অনুকে শুনিয়ে, নিশার দিকে তাকিয়ে বলল, "তোর বোন মালটা তো সেই রে।একদম খাঁটি জিনিস।"

"এবার তোকে দেখবো।"

কথাটা বলেই ফাহিম হাত বাড়াল অনুর দিকে, তাকে স্পর্শ করার জন্য। ফাহিমের আঙুল যখনই অনুর গায়ের কাছে পৌঁছাল, ঠিক তখনই বাতাসের গতিতে নিশার ডান হাতটা এগিয়ে গেল। বজ্রের মতো শক্ত মুঠিতে সে ফাহিমের বাড়িয়ে দেওয়া নোংরা হাতটা মাঝপথেই খপ করে ধরে ফেলল। নিশার হাতের বাঁধন এতটাই শক্ত ছিল যে ফাহিমের মুখের নোংরা হাসিটা এক সেকেন্ডের মধ্যে মিলিয়ে গেল, আর তার জায়গায় ফুটে উঠল এক তীব্র যন্ত্রণার রেখা।

ফাহিম কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিশা তার পুরো শরীরের শক্তি দিয়ে ফাহিমের হাতটা উল্টো দিকে এক প্রচণ্ড মোচড় দিল। হাড় ভাঙার শব্দ যেন বাতাসে প্রতিধ্বনিত হলো আর ফাহিম যন্ত্রণায় এক চিৎকার দিয়ে ওঠার চেষ্টা করল।

কিন্তু তার কণ্ঠনালি দিয়ে সেই চিৎকার পুরোপুরি বের হওয়ার আগেই নিশার ডান হাতটা বিদ্যুতের গতিতে বাতাসে আছড়ে পড়ল। নিশা এক পলক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অনুর দিকে তাকিয়ে শান্ত সুরে বললো", কাউন্ট কর।"

নিশার হাতের তালু যখন প্রথমবার ফাহিমের বাঁ গালে আছড়ে পড়ল, তখন মনে হলো মাঠের ওপর যেন একটা বজ্রপাত হলো। অনু ভয়ার্ত ও কাঁপাকাঁপা গলায় গুনতে শুরু করল, "এক..."। নিশার হাত থামল না পেন্ডুলামের মতো অবিরাম গতিতে চলতে লাগল। "দুই... তিন... চার..." অনুর কণ্ঠস্বর কাঁপছে, আর ফাহিমের চোখের সামনে তখন গোটা দুনিয়াটা চড়কবাগানের মতো ঘুরছে।

ফাহিমের সাথে থাকা দুইজন এই বীভৎস তাণ্ডব দেখে এতটাই স্তম্ভিত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে যে, তাদের পা দুটো মাটিতে যেন পেরেক দিয়ে গেঁথে গেছে। ফাহিমকে বাঁচানোর দূর কথা, নিজেদের জান বাঁচিয়ে পালানোর শক্তিটুকুও তারা হারিয়ে ফেলেছে।

ক্যাম্পাসের বাতাস তখন কেবল নিশার হাতের চটাচট চড়ের শব্দ আর অনুর ভয়ার্ত গোঙানির মতো গণনায় ভারী হয়ে উঠেছে। "পঞ্চাশ... একশো..." অনুর গুনতি বাড়ছে, আর ফাহিমের মুখের রূপ ততক্ষণে পাল্টে গেছে। থাপ্পড়ের চোটে ফাহিমের নাক ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে এসেছে, ঠোঁটের কোণ কেটে কালচে রক্তে তার চিবুক ভিজে যাচ্ছে। সে হাত তুলে নিশাকে থামানোর চেষ্টা করার শক্তিটুকুও পাচ্ছিল না, নিশার হাতের প্রতিটি থাপ্পর মনে হচ্ছিল কোনো ধারালো দায়ের কোপ।

পুরো ক্যাম্পাস চত্বরে তখন শুধু ঠাস ঠাস শব্দ প্রতিফলিত হচ্ছে। অনু ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কোনোমতে চোখ বন্ধ করে সংখ্যাগুলো আউড়ে যাচ্ছে, "একশো আশি... একশো নব্বই... একশো নিরানব্বই..." আর ঠিক যখনই অনুর মুখ থেকে বের হলো "দুইশো।", ঠিক তখনই এক নিশার হাতটা মাঝপথেই থেমে গেল।

সে ফাহিমের অবশ হয়ে যাওয়া হাতটা ঝটকা দিয়ে ছেড়ে দিল এবং সাথে সাথে মনে হলো একটা ভয়ংকর ঝড় থেকে পরিবেশ স্তব্ধ হয়ে গেল।

হাত ছাড়তেই ফাহিম আর নিজের শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারল না, তার চারপাশের আস্ত দুনিয়াটা তখন টলমল করছে, মাথার ভেতর ঝিঁঝিঁ পোকার তীব্র আওয়াজ হচ্ছে। সে একটা ভরা বস্তার মতো ধপাস করে মাঠের ধুলোমাটির ওপর বসে পড়ল।

তার মাথাটা ভনভন করে ঘুরছে, চারপাশের আলো-ছায়া সব ঝাপসা ঠেকছে। কী থেকে কী হয়ে গেল, সে মাথাটা জোরে জোরে ঝাঁকি দিয়ে বাস্তবতায় ফেরার চেষ্টা করছে, বোঝার চেষ্টা করছে তার সাথে ঘটে যাওয়া এই অবিশ্বাস্য দুঃস্বপ্নটা আদেও সত্যি কিনা, কিন্তু তার অসাড় হয়ে যাওয়া মগজ আর কোনো সংকেত দিচ্ছিল না।

ফাহিমের এই অবস্থার মাঝেই নিশা ধীরস্থিরভাবে এগিয়ে গেল সেই গাছতলার দিকে, ।

সে তার পরনের শাড়িটা সামান্য গুছিয়ে নিয়ে গাছের তলার বাঁধানো বেদিতে এক পায়ের ওপর আর এক পা তুলে দিয়ে হেলান দিল। মাটিতে বসে থাকা ফাহিম তখনো পুরোপুরি হিতাহিত জ্ঞান ফিরে পায়নি। সে বোকার মতো হা করে, চোখ দুটো কোনোমতে মেলে রক্তমাখা মুখে নিশার দিকে তাকিয়ে রইল। তার নাক থেকে অবিরাম রক্ত ঝরছে, কেটে যাওয়া ঠোঁটের কোণ দিয়ে লালা আর রক্তের মিশ্রণ মাটিতে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে পড়ছে, কিন্তু সেদিকে ফাহিমের কোনো খেয়াল নেই। সে কেবল বিস্ফারিত চোখে দেখছে তার সামনে বসে থাকা নিশা মল্লিক কে।

ফাহিমের সাথে থাকা জিসান আর শুভ এতক্ষণ পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। এবার যখন নিশার জ্বলন্ত চোখ দুটো ফাহিমের ওপর থেকে সরে সরাসরি তাদের মুখের ওপর এসে স্থির হলো, তখন তাদের কলিজা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।

এক সেকেন্ডও দেরি না করে তারা দুজনে হামাগুড়ি দিয়ে এসে ধপাস করে নিশার পায়ের ওপর আছড়ে পড়ল। নিশার জুতোর চামড়া আঁকড়ে ধরে তারা হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল, "আপু,আমাদের মাফ করে দেন,আমাদের অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে। আমরা ফাহিমের কথায় এসব করেছি আপু, আমাদের ছেড়ে দেন।"

এতক্ষণ ধরে পাথরের মতো থাকা নিশা এবার হঠাৎ করেই হেসে উঠল। পুরো ফাঁকা ক্যাম্পাস জুড়ে নিশার সেই জোরালো হাসির শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। সেই হাসি শুনে নিশার পায়ে পড়ে থাকা ওই দুই ছেলের মনে হলো তাদের প্রাণটা বুঝি এখনই গলা দিয়ে বেরিয়ে যাবে।

ভয়ে তাদের বুকের ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ, আতঙ্কের চোটে তারা গলার ভেতরের ঢোক গিলতে ভুলে গেল। নিশা হঠাৎ করেই তার হাসি থামিয়ে দিল। চট করে মুখটা আবার আগের মতো কঠিন করে আইসক্রিমের মতো ঠাণ্ডা গলায় বলল, "ব্লেড নিয়ে আয়।"

নিশার এই আদেশের অবাধ্য হওয়ার সাহস তাদের বিন্দুমাত্র ছিল না। তারা তড়িৎ গতিতে উঠে দাঁড়িয়ে জানের ভয়ে দৌড়ে গেল কলেজের পেছনের দোকানটার দিকে। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে কোথা থেকে যেন কয়েকটা নতুন ব্লেড জোগাড় করে এনে নিশার সামনে কাঁপতে কাঁপতে হাত জোড় করে দাঁড়াল। নিশা ব্লেডগুলোর দিকে এক পলক তাকিয়ে বেদিতে পা নাচাতে নাচাতে বললো, "তোরা তিনজন একে অপরের মাথা টাক করে দে।"

এই অদ্ভুত কথা শুনে ছেলে দুটো একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। মাথা ন্যাড়া করে ক্যাম্পাসে মুখ দেখাবে কী করে? তারা ইতস্তত করে একটু থমকে দাঁড়াল, ব্লেড চালাতে হাত সায় দিচ্ছিল না।

ছেলেদের এই দ্বিধা দেখামাত্রই নিশা আর বসল না। সে বেদি থেকে এক লাফে উঠে দাঁড়াল। নিশার সেই আচমকা উঠে দাঁড়ানো আর চোখের চাউনি দেখেই তাদের পায়ের তলার মাটি সরে গেল।

আর কোনো বাছ-বিচার না করে, ইজ্জতের মায়া ত্যাগ করে তারা তড়িঘড়ি করে ফাহিমের মাথা চেপে ধরল। ফাহিম তখনো আধমরা হয়ে মাটিতে পড়ে ছিল, তার চুলের মুঠি ধরে ব্লেড চালিয়ে খচখচ করে চুল কাটা শুরু হলো। যা হবার চুলের উপর দিয়ে হোক ।এই মেয়ে উঠে দাড়ালে ব্লেড আমাদের গলায় চলবে।

ফাহিমের মাথা ছাঁটা শেষ হতেই তারা একে অপরের মাথায় ব্লেড চালাতে লাগল। ভয়ে হাত কাঁপছিল বলে কারও কারও মাথার চামড়া কেটে রক্তারক্তি কাণ্ড হয়ে গেল, কিন্তু নিশার ভয়ে তারা উফ্ শব্দটা পর্যন্ত করার সাহস পেল না।

অনু এখনো মাঠের এক কোণায় দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে। তার চোখের সামনে যা ঘটছে, তা সে বিশ্বাস করতে পারছে না। কিছুক্ষণ আগের সেই বাঘগুলো এখন নিশার সামনে বিড়ালের মতো নিজেদের মাথা ন্যাড়া করছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনজনের মাথা একেবারে চকচকে টাক হয়ে গেল। তারা মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো নিশার সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রইল, তাদের ন্যাড়া মাথা বেয়ে ঘাম আর রক্ত মিশে নিচে পড়ছে।

নিশা এবার তাদের দিকে কয়েক পা এগিয়ে এলো। সে ফাহিমের রক্তাক্ত মুখের দিকে চেয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "খুব তো শখ, না রে মেয়েদের বোরকা খোলার। আজ তোদের সেই শখ আমি মিটাবো।

এবার তোরা নিজেদের জামা খোল, প্যান্ট খোল।"

নিশার মুখ থেকে এই কথা শুনে তিনজনেই একেবারে জমে গেল। তারা নিজেদের প্যান্ট আঁকড়ে ধরে করুণ চোখে নিশার দিকে তাকাল। কিন্তু নিশা আজ কোনো দয়া দেখানোর মুডে নেই। সে তার ভেতরের সমস্ত আক্রোশ আর শক্তি এক করে পুরো মাঠ কাঁপিয়ে সিংহীর মতো এক প্রচণ্ড চিৎকার দিল—"খোল।"

সেই গগনবিদারী আর ভয়ঙ্কর চিৎকারে গোটা কলেজের মাঠ যেন কেঁপে উঠল।

চলবে__

(গল্প লেখার সময় আমার বার বার মনে হচ্ছিল সমাজে দুই একটা নিলা মল্লিক থাকলে মন্দ হয় না 🫠🫶)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন