#অবাধ্য_মন_পাখি
#পর্ব_২৯
#writer_খাদিজা_পারভিন
মাঠের মাঝখানে এক বিশাল বৃত্ত তৈরি হয়েছে।অনেক ছাত্র-ছাত্রীর ভিড়ের ঠিক মাঝখানে, উঁচু বেদির ওপর একা বসে আছে নিশা। তার ঠিক সামনে, তপ্ত রোদে মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে আছে সদ্য ন্যাড়া হওয়া তিনজন।
তখনই মাঠের একপাশ দিয়ে ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকল চন্দন আর তার দলবল। নিশার গন্ধ তারা দূর থেকেই পেয়ে যায়। বস কোথাও ঝামেলায় জড়িয়েছে আর তারা সেখানে থাকবে না, তা তো হয় না।
চন্দন এসে নিশার সামনে দাঁড়াতেই নিশা বলল, "চন্দন, যা। তিনটা কলাপাতা নিয়ে আয়।"
বসের মুখের কথা খসার দেরি, কিন্তু তা তামিল হতে এক সেকেন্ডও দেরি হয় না। চন্দন ক্ষিপ্র গতিতে গিয়ে কলেজ প্রাচীরের ওপাশ থেকে তিনটা কলাপাতা কেটে নিয়ে এসে হাজির করল।
"ওদের গায়ের জামা আর প্যান্ট সব খুলে ফেল। তারপর এই কলাপাতাগুলো ওদের কোমরে পরিয়ে দে।"
নিশার এই অকল্পনীয় শাস্তির কথা শুনে ফাহিম জিসানের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।
চন্দন দলবল নিয়ে ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। জোর জবরদস্তি করে, টেনেহিঁচড়ে তিনজনের গায়ের শার্ট আর প্যান্ট খুলে মাঠে ছুড়ে ফেলা হলো। তিনজন আকুল হয়ে নিজেদের আব্রু ঢাকার চেষ্টা করছিল, কিন্তু ড্রামের মতো মোটা চন্দন ও ছেলেদের শক্তির সামনে তাদের সমস্ত প্রতিরোধ খড়কুটোর মতো উড়ে গেল।
কলাপাতা দিয়ে লতা আর দড়ি পেঁচিয়ে তিনজনের কোমরে স্কার্টের মতো করে পরিয়ে দেওয়া হলো।
কাজটা করতে করতে ফাহিমের দিকে নজর যেতেই চন্দন আর নিজের হাসি ধরে রাখতে পারল না। সে ফাহিমের জাঙ্গিয়ার দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে নিশার দিকে ঘুরে বলল, "বস, ফাহিমের জাঙ্গিয়া তো দেখি ছেড়া ওর আবার কষ্ট করে কলাপাতা পরানোর কী দরকার ছিল?"
চন্দনের কথা শুনে নিশা পেছনে মাথা হেলিয়ে এক প্রচণ্ড হাসিতে ফেটে পড়ল। পুরো মাঠের ছাত্র-ছাত্রীরাও তখন ফাহিমের এই দশা দেখে ফিসফিস করে হাসতে শুরু করেছে। নিশা তার হাসি থামিয়ে ফাহিমের দিকে তাকিয়ে বলল, "ছেঁড়া পাশা ভাই পরে এসেছিস কলেজের মেয়েদের বোরকা খুলতে? এত মনোবল পেলি কোথায়?"
নিশার সব কথা ফাহিমের কানের ভেতর তপ্ত সিসার মতো বিঁধছে, লজ্জায় আর অপমানে তার ন্যাড়া মাথাটা আরও নিচু হয়ে গেল।
তিনজনকেই যখন কলাপাতা পরানো শেষ হল, নিশা বেদি থেকে নেমে তাদের সামনে এসে দাঁড়াল। "এবার তোরা প্রত্যেকে এক হাত দিয়ে কোমরের কলাপাতাটা চেপে ধরবি, যাতে ওটা খুলে না যায়। আর অন্য হাত দিয়ে নিজেদের কান ধরবি। এই অবস্থায় এখানে সবার সামনে একশোবার ওঠবস করবি।"
ইজ্জতের যা বাকি ছিল, তাও এবার ধুলোয় মিশে গেল। তিন মাস্তান তখন এক হাত দিয়ে কোমরের পাতা সামলাচ্ছে আর অন্য হাত দিয়ে কান ধরে মাঠের মাঝখানে ওঠবস করছে। পুরো মাঠ জুড়ে তখন শত শত ছাত্র-ছাত্রীর চোখের সামনে তাদের এই চরম লাঞ্ছনার দৃশ্য মঞ্চস্থ হচ্ছে। অনু গুনতে গুনতে যখন একশোবার পূরণ হলো, তখন নিশা হাতের ইশারায় বলল, "এবার এই অবস্থাতেই তোরা সোজা নিজেদের বাড়ি চলে যাবি। রাস্তায় যেন কেউ কলাপাতা না ছাড়ে।" কান ধরে, কলাপাতা সামলে, ন্যাড়া মাথায় তিন লম্পট যখন কুঁজো হয়ে কলেজের গেট দিয়ে বের হয়ে গেল, তখন পুরো মাঠজুড়ে এক অদ্ভুত স্বস্তির বাতাস বয়ে গেল।
সব শেষ হওয়ার পর, মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা অনু অত্যন্ত ভয়ার্ত আর দ্বিধাদ্বন্দ্ব জড়ানো পায়ে নিশার দিকে এগিয়ে এলো। তার শরীর এখনো সামান্য কাঁপছে। ফাহিমকে নিশা যেভাবে পিষে ফেলেছে, তা দেখার পর অনুর মনে এখন নিশার প্রতি এক বিশাল ভয়ের দেয়াল তৈরি হয়েছে। তার কাছে নিশাকে কোনো সাধারণ মানুষ মনে হচ্ছে না।
অনু নিশার সামনে এসে মাথা নিচু করে কাঁপাকাঁপা গলায় শুধু বলল, "ধন্যবাদ, আপু।"
নিশা অনুর এই ভয়ার্ত মুখটার দিকে তাকাল। তার চোখের সেই এতক্ষণের জ্বলন্ত আগুনের শিখাটা মিলিয়ে গিয়ে সেখানে এক স্নেহের আলো ফুটে উঠল।
নিশা এক পা এগিয়ে গিয়ে অনুর খুব কাছে দাঁড়াল। তারপর অত্যন্ত আলতো করে, পরম স্নেহে অনুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। সেই হাতের স্পর্শে ছিল বড় বোনের মতো পরম অভয়।
মাথায় হাত বুলিয়েই নিশা আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না, চন্দনদের সাথে নিয়ে সে মাঠের বাইরের দিকে পা বাড়াল।
নিশা যখন মাত্র এক কদম সামনে বাড়িয়েছে, ঠিক তখনই অনুর বুকের ভেতর থেকে সমস্ত ভয় উধাও হয়ে এক অদ্ভুত শক্তির জন্ম নিল। সে তার গায়ের সবটুকু জোর এক করে, চিৎকার করে উঠল, "নিশা আপু... জিন্দাবাদ।"
অনুর সেই একা একটি কণ্ঠস্বর যেন পুরো মাঠের ছাত্র-ছাত্রীদের মনের ভেতরের সুপ্ত আগুনকে জ্বালিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে সেখানে উপস্থিত সব ছাত্র-ছাত্রী অনুর গলার সাথে গলা মিলিয়ে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে সমস্বরে স্লোগান দিয়ে উঠল, "নিশা আপু জিন্দাবাদ,জিন্দাবাদ,জিন্দাবাদ।"
শত শত মানুষের সেই সম্মিলিত কণ্ঠের জয়ধ্বনি পুরো কলেজ ক্যাম্পাসকে প্রকম্পিত করে তুলল। নিশা মাঠের সীমানার কাছাকাছি পৌঁছে এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। সে একবার পেছন ফিরে তাকাল। তার সেই দীর্ঘ চুলগুলো বাতাসে উড়ছে, ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে মৃদু হাসি। তারপর আর পেছনে না তাকিয়ে, দ্রুত পায়ে কলেজের গেট পেরিয়ে সামনের মেইনরোডের দিকে হেঁটে চলে গেল।
এক অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরের ভেতরে আবছা আলোয় একটা বড় স্ক্রিনের সামনে বসে ছিল একটা ছায়া। হালকা আলোয় শুধু দুটো বাদামি চোখ দেখা যাচ্ছে । এতক্ষণ ধরে সে একটা ভিডিওতে কলেজের ঘটনার পুরো দৃশ্যটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল।
নিশার দেওয়া শাস্তি দেখে তার মনে কোনো আনন্দ হলো না, বরং যখনই ফাহিমের নোংরা হাতটা নিশার হিজাব আর বোরকা স্পর্শ করেছিল, ঠিক তখনই সেই অন্ধকারে থাকা লোকটার পুরো শরীর রাগে কাঁপতে শুরু করেছিল।
তার হাতের মুঠো এতটাই শক্ত হয়ে গেল যে, হাতের চামড়ার নিচে থাকা নীল রগগুলো তীরের মতো ফুলে উঠল। বাদামি চোখ দুটো তখন হিংস্র পশুর মতো জ্বলছে।
সে স্ক্রিনের দিকে চেয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো, "মরতে হবে তোকে,একদম কুকুর-বেড়ালের মতো মরতে হবে।" সে স্ক্রিনে নিশার বোরকা পড়া ছবির ওপর হাত বোলাতে বোলাতে ক্ষিপ্ত বাঘের মতো গর্জে উঠল, "আমার ফায়ার বার্ড একটা বোরকা পরে ছিল, কী সুন্দর, কতটা পবিত্র লাগছিল তাকে।আর তোর, তোর কত বড় সাহস যে তুই আমার ফায়ার বার্ডকে টাচ করেছিস?
তোর ওই হাত দুটো আমি নিজের হাতে কেটে কুত্তা দিয়ে খাওয়াবো।যে আমার সুইটহার্টের দিকে চোখ তুলে তাকাবে, তাকে আমি জ্যান্ত পুড়িয়ে ভস্ম করে দেবো।
ঘরের ভেতরের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে ডাক দিল, "গার্ড।"
ডাক শোনামাত্রই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজন বডিগার্ড এক দৌড়ে ঘরের ভেতরে এসে লাইনে দাঁড়াল। মুখ ঢাকা লোকটা স্ক্রিন থেকে ফাহিমের রক্তাক্ত ও ন্যাড়া মাথার একটা স্থিরচিত্র তাদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আদেশ করল, "এই জারজটাকে তুলে নিয়ে আয়। আজ রাতের মধ্যে ও যেন আমার চোখের সামনে হাজির থাকে। জ্যান্ত হোক বা আধমরা—আই ডোন্ট কেয়ার। জাস্ট ব্রিং হিম টু মি।"
"ইয়েস বস",বলেই গার্ড তিনজন রোবটের মতো মাথা ঝুঁকিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ঘরের ভেতরে তখনো সেই বাদামি চোখের মণি দুটো আগুনের ফুলকির মতো জ্বলছিল।
ঘরে ঢুকেই নিশা ক্লান্তিতে ধপাস করে সোফাটার ওপর বসে পড়ল। নিশার পায়ের আওয়াজ পেয়েই রান্নাঘর থেকে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়াল রহিমা। তার এক গালে এখনো নিশার দুপুরের দেওয়া চড়ের লাল দাগটা সামান্য বসে আছে, কিন্তু চোখেমুখে কৌতূহল।
নিশা সোফায় মাথাটা পেছনে হেলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করেই কর্কশ গলায় বলল, "এক গ্লাস পানি দে, ডেমনি।"
রহিমা এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না, সে দৌড়ে গিয়ে রান্নাঘর থেকে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি এনে নিশার হাতে দিল। পানিটা নিশার হাতে দিয়ে রহিমা সোফার আশেপাশে, মেঝেতে, নিশার হাতের দিকে আড়চোখে তাকাতে তাকাতে কী যেন খোঁজার চেষ্টা করতে লাগল। তার বোরকাটা নিশা পরে গিয়েছিল, সেটা কোথায় গেল,সেটাই সে মনে মনে হাতড়াচ্ছে।
নিশা ঢকঢক করে গ্লাসের অর্ধেকটা পানি খেয়েই রহিমার এই চোরের মতো এদিক-ওদিক তাকানোটা ধরে ফেলল। সে গ্লাসটা মুখ থেকে নামিয়ে চোখ দুটো ছোট ছোট করে, একেবারে বাঘের মতো কোড়া করে রহিমার দিকে তাকাল। নিশার সেই চাউনি দেখেই রহিমা ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে অপ্রস্তুত হয়ে এক গাল বোকা হাসি হাসল।
নিশা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে পাঁচ হাজার টাকা বের করল। টাকাটা রহিমার মুখের সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "ধর।"
রহিমা টাকার পরিমাণ দেখে একেবারে আকাশ থেকে পড়ল। সে চোখ কপালে তুলে অবাক হয়ে বলল, "টাকা কেন আপামণি? আমি টাকা দিয়ে কী করবো?"
নিশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিরক্ত মুখে বলল, "তোর বোরকাটা ছিঁড়ে গেছে। এটা দিয়ে বাজার থেকে ভালো দেখে একটা নতুন বোরকা কিনে নিবি।"
রহিমা একটু ইতস্তত করে হাত দুটো পেছনে নিয়ে বলল, "না আপা, লাগবে না। আপনি বোরকা নিছেন তো কী হইছে, আমার আরেকটা আছে। টাকা লাগব না।"
রহিমার এই ডঙ্গের ভালোমানুষি দেখে নিশার মাথাটা আবার চড়ে গেল। সে চোখ রাঙিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, "তোর কাছে জানতে চেয়েছি আমি? মুখ বুঝে টাকাটা ধরবি, নাকি আমি এখন তোকে গালি দেওয়া শুরু করব?"
নিশার মুখের ভাষার ভাষা রহিমার খুব ভালো করেই জানা আছে। একবার মুখ খুললে যে কী তুবড়ি ছুটবে, আর সেই গালির চোটে যে তার কানের পর্দা ফেটে যাবে তা সে ভালো করেই বোঝে। তাই আর এক মুহূর্তও তর্ক না করে, রহিমা বাধ্য মেয়ের মতো ঝট করে এক টানে টাকাটা নিশার হাত থেকে লুফে নিল।
সোফা ছেড়ে এবার নিজের ঘরের দিকে রওনা দিল নিশা।সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময় সে পেছন ফিরে রহিমাকে বলে গেল, "হাতে প্রচণ্ড ব্যথা করছে। জাহানারা বেগমকে গিয়ে বল, খাবারটা যেন আমার ঘরে এনে নিজের হাতে খাইয়ে দিয়ে যায়। যা।"
এটা বলে সে চলে গেলো ঘরে।
রহিমা জাহানারার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল, জাহানারা বেগম সবেমাত্র আছরের নামাজ শেষ করে মোনাজাত নামিয়েছেন। রহিমা একটু আমতা-আমতা করে বলল, "খালাম্মা, আপামণি বাড়ি ফিরছে। বলল যে হাতে খুব ব্যথা, আপনাক গিয়ে খাবারটা মুখে তুলে খাইয়ে দিতে।"
কথাটা শুনতেই জাহানারা বেগমের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। মায়ের মন তো, যতই রাগ থাকুক মেয়ের কষ্টের কথা শুনলে সব বরফ হয়ে যায়। তিনি বাইরে একটা কঠোর ভাব ধরে রাখলেও, মনে মনে এক চিলতে খুশির আভাস টের পেলেন। রহিমার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় শুধু বললেন, "আচ্ছা।"
তিনি জায়নামাজ গুটিয়ে সোজা রান্নাঘরে গেলেন। খাবারগুলো যত্ন করে একটা থালায় গুছিয়ে নিয়ে, ধীরপায়ে মেয়ের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই নিশার নজর গেল মায়ের হাতের থালার দিকে। মায়ের হাতে খাবার দেখে এক লাফে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর ছোট বাচ্চাদের মতো এক ছুটে মায়ের সামনে এসে মুখটা মস্ত বড় করে হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল।
জাহানারা বেগম এত বড় মেয়ের এই কাণ্ড দেখে মনে মনে হাসলেন, কিন্তু মুখে গম্ভীর ভাবটা বজায় রাখলেন। তিনি খাটের পাশে বসলেন, তারপর থালার ভাতগুলো পরম মমতায় মাখতে শুরু করলেন। নিশা তখনো ঠিক একইভাবে মুখ হাঁ করে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন এক সেকেন্ডের জন্যও মুখ বন্ধ করলে মা তাকে খাওয়ানো বন্ধ করে দেবেন। মেয়ের এই পাগলামি দেখে জাহানারা বেগমের এবার সত্যিই জোরে হাসি পেয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তিনি বহুকষ্টে নিজের ঠোঁটের কোণের হাসিটা চেপে রাখলেন।
তিনি লোকমা তুলে মেয়ের মুখে দিতে লাগলেন। মা আর মেয়ের মাঝখানে কোনো কথা হলো না। ঘরের ভেতরের নীরবতা কেবল নিশার চিবানোর শব্দে ভাঙছিল। নিশা অন্য কোথাও তাকাচ্ছিল না। তার টানা টানা দুটো কালো চোখ এক দৃষ্টিতে মায়ের মুখের দিকে নিবন্ধ ছিল। সে দেখছিল মায়ের কপালের বলিরেখা, মায়ের চোখের সেই স্নেহ, যা সে হাজারো ঝগড়ার আড়ালেও সবসময় খুঁজে বেড়ায়।
থালা যখন শূন্য হলো, ভাত খাওয়া শেষ হতেই জাহানারা বেগম যখন উঠে চলে যাওয়ার জন্য গা ঝাড়া দিলেন, নিশা ছোট বাচ্চাদের মতো এক ঝটকায় একটা ঝাঁপ দিয়ে সোজা মায়ের কোলের ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। মায়ের দুই উরুকে বালিশ বানিয়ে সে শক্ত করে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল।
জাহানারা বেগম মেয়ের এই আকস্মিক আবেগের কোনো প্রতিবাদ করলেন না, তাকে সরিয়েও দিলেন না। তিনি খাটের পাশে রাখা জলের গ্লাস থেকে কিছুটা জল নিয়ে থালার ওপরই হাতটা ধুয়ে নিলেন। তারপর শাড়ির আঁচলটা দিয়ে খসখস করে হাতটা মুছে, খুব আলতো করে নিশার অবিন্যস্ত চুলের ওপর নিজের ডান হাতটা রাখলেন।
মায়ের হাতের পাঁচটা আঙুলের স্পর্শ আর শীতল পরশ নিশার মাথার চুলে লাগামাত্রই নিশার শক্ত করে বন্ধ করে রাখা চোখের কোণ বেয়ে দুটো ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল কান বেয়ে।
জাহানারা বেগম কেবল নীরবে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।
চলবে__