#অবাধ্য_মন_পাখি
#পর্ব_৩৭
#লেখনিতে_খাদিজা_পারভিন
অভ্রের বীপরিতে বসে হাত দিয়ে নিজের গলায় থাকা চেন ধরে রেখেছে আর সব কিছু ভাবছে।কি থেকে কি হতে পারে।নিশার মাথায় তখন হাজার চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, তখনই তার নজর গেল অভ্রের দিকে।
অভ্র ঘুমানোর ভঙ্গি বদলাতে বদলাতে সোফার একদম শেষ প্রান্তে চলে এসেছে। আর মাত্র আধ ইঞ্চি নড়লেই মেঝের সাথে কোলাকুলি করতে পারবে। বিষয়টা নিশার কাছে বেশ মজার লাগলো।
"আমাকে দিয়ে জুতা পরিষ্কার করিয়েছিলি তাই না? দেখাচ্ছি মজা।"নিশা বসা থেকে উঠে দ্রুত পায়ে রহিমার ঘরে গিয়ে ফোনটা নিয়ে আসলো।
ক্যামেরা অন করে, পারফেক্ট অ্যাঙ্গেল ধরে ভিডিও রেকর্ডিং চালু করল।
তখনই অভ্র এক পাশ ফিরতে গিয়ে সোফা থেকে সোজা ফ্লোরে পড়ে গেল ।সব কিছুই ফোনে রেকর্ড হয়ে গেল। নিশা তো মনে মনে হাসতে হাসতে শেষ। এক মহৎ ঐতিহাসিক ভিডিও ক্লিপ তার সংগ্রহে চলে এসেছে।
ফোন অফ করে নিশা নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু দু-পা গিয়েই আবার থামল। মেঝেতে পড়ে থাকা অভ্রের দিকে একবার তাকাল।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার ফিরে এল। অভ্রের জামার কলার আর কোমর ধরে এক ঝটকায় টেনে আবার সোফার ওপর তুলল।
অভ্রকে ঠিকঠাক সোফায় শুইয়ে দিয়ে নিশা হাঁক ছাড়ল—
"এই রহিমা, খাবার আমার ঘরে দিয়ে আয়।"
এই বলে নিশা ফোনের ভিডিওটা আবার প্লে করে দেখতে দেখতে নিজের ঘরে চলে গেল।"আজ এটা দেখে ভাত খাবো।"
ভোরের কাঁচা রোদ জানালার পর্দা গলে ঘরের ভেতরের আলো-আঁধারির খেলাকে এক নিমেষে উধাও করে দিল। বাতাসে পাখির ডাক আর নতুন ভোরের স্নিগ্তা বিরাজমান চারিদিকে।
চোখ খুলল অভ্র। মাথার রগগুলো যেন কেউ ভেতরের দিকে নিংড়ে মেঝের সাথে থেঁতলে দিচ্ছে। তীক্ষ্ণ বিষব্যথায় তার চোখের কোল লাল হয়ে আছে। হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরে ধড়ফড় করে উঠে বসল সে। ঝাপসা চোখে চারপাশের অপরিচিত ড্রয়িংরুমটা পরখ করতেই তার মস্তিষ্কের কোষগুলো সচল হয়ে উঠতে শুরু করল।
একে একে গত রাতের দৃশ্যগুলো ছবির মতো ভেসে উঠতে লাগল তার চোখের সামনে। বিয়েটা এভাবে হুট করে, সম্পূর্ণ বেসামাল অবস্থায় নিশার সামনে বের করতে চায়নি। একটা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু অতিরিক্ত অ্যালকোহল তার পুরো ছকটাকেই ওলটপালট করে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
নিজের ওপর চরম রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে এলো অভ্রের। সোফার উপর হাত দিয়ে জোরে একটা ঘুসি মারলো,"Damn it! You utter idiot, Avro! What the hell did you just do?"
পকেটে হাত দিয়ে ফোনটা খোঁজার চেষ্টা করল, কিন্তু পকেট খালি। কাল রাতে বেরোনোর সময় ফোনটাই সাথে আনা হয়নি। বিরক্তি আর মাথা ব্যথায় পুরো শরীর তার রিরি করে উঠল।
ওপরের সিঁড়ি দিয়ে ধীর পায়ে নেমে এলো নিশা। তার পরনে কালো শার্ট আর ট্রাউজার। চুল এলোমেলো গালে ব্রাশ, মুখ ভর্তি ফেনিল পেস্ট।
নিশা অভ্রের সামনে এসে দাঁড়াতেই অভ্রের চোখের দৃষ্টি হিংস্র হয়ে উঠল।তার গালে ব্রাল দেখে অভ্র ধরে নিল নিশা বোধহয় আজকেও ওই নোংরা ব্রাশ তার মুখে গুঁজে দিবে।
নিশা এক পা এগোতেই অভ্র সোফা থেকে ঝটকা মেরে দাঁড়িয়ে হাত উঁচিয়ে গর্জে উঠল, "স্টপ।এক পা-ও এগোবে না।"
"আজ যদি ওই নোংরা ব্রাশ আবার আমার মুখে লাগানোর চেষ্টা করেছ, এই নিশা মল্লিকের মেঝেতে নিশা মল্লিককেই জীবন্ত পুঁতে রেখে দেব আমি। মাইন্ড ইট।"
নিশার মুখে কোনো প্রতিক্রিয়াই ফুটল না। নিষ্পলক চোখে অভ্রের দিকে তাকিয়ে রইল।নিশা এগিয়ে আসছে অভ্রের দিকে।তারপর অভ্রকে একপাশে জোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেল ড্রয়িংরুমের কোণের বেসিনটার দিকে।
শব্দ করে কল ছেড়ে ভালো করে মুখ ধুলো নিশা। কুলি করে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে সোজা হেঁটে এলো অভ্রের দিকে।
অভ্রের মুখোমুখি সোফায় বসে সে পায়ের ওপর আরেক পা তুলল।
"হুম, চলুন। এবার আসল কথায় আসি।আপনি বিয়ে কেন করেছেন আমাকে?মতলব কি?"
অভ্র সোফায় একটু হেলান দিয়ে বসল। মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, "আরে ধুর।ওইটা জাস্ট একটু দয়া-দাক্ষিণ্য দেখালাম আরকি।ভাবলাম, মেয়েটা এতদিন আমার বাসায় কাজ করল, বেচারি এখন কঠিন বিপদে পড়েছে।তাই একটু উদ্ধার করলাম। এমনিতেও তোমার মতো লুঙ্গি,শিকল পরা বালছালকে বিয়ে করার কোনো শখ আমার ছিল না।"
'লুঙ্গি পরা বালছাল' শুনতেই রাগে নিশার চোখের মণি দুটো আগ্নেয়গিরি হয়ে উঠলো।
অভ্র আস্তে বললো, " ওয়াও।"তা নিশার কান পর্যন্ত গেলো না।
সোফা থেকে এক ঝটকায় উঠে এসে সে অভ্রের শার্টের কলার দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরল।"কি বললি জানোয়ার?"
অভ্র চোখ দুটো বড় বড় করে, নিজের গলার দিকে তাকিয়ে বলল, "আহা হা।ছাড়ো কী করছ কী? নীতিশাস্ত্রে স্পষ্ট লেখা আছে—স্বামীর গায়ে হাত তুলতে নেই।স্বামী হলো পরম পূজনীয় দেবতা, স্বর্গের চাবিকাঠি।
যেমন ভক্তিভরে কলার ধরে আছো,পরকালে গিয়ে সোজা নরকের ফার্স্ট ক্লাস টিকিট পেয়ে যাবে। ইহকাল তো খেয়ে দিয়েছো পরকালের কথাটা না হয় একটু ভাবো।"
নিশা দাঁতে দাঁত চেপে এক ধাক্কায় অভ্রকে ছেড়ে দিল। কলারটা এক ঝটকায় সোজা করে নিয়ে নিশা দুই হাত বুকের ওপর বাঁধল। রগে এখনো রাগ জ্বলজ্বল করছে, "ফালতু বকবক বন্ধ করে সত্যি কথাটা বলুন। সত্যি করে বলুন, সবটার পেছনে আসলে আছে টা কী?"
এবার অভ্রেরও মেজাজ বিগড়ে গেল। মুখের হাসি এক নিমেষে উধাও হয়ে গেলো। সে সোজা হয়ে বসে ক্ষুব্ধ গলায় বলল, "সত্যি শুনবি? সত্যি হলো, আমার বড় ভুল হয়ে গেছে।তোর মতো অকৃতজ্ঞ মেয়ের জন্য অত ড্রামা করার দরকারই ছিল না। তোর সাথে ওই এঁটোচাটা আব্রাহামের বিয়ে হয়ে গেলেই আসল মজাটা হতো।তখন বুঝতি কার পাল্লায় পড়েছিস।"
নিশা চোখ সরু করে, এক নম্বর ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, "এ্যাঁ? এঁটোচাটা মানে কী?"
অভ্র আবার সোফায় হেলান দিয়ে, নিশার মতো করেই এক পায়ের ওপর আরেক পা চাপিয়ে বসল। তারপর সেও ভুরু নাচিয়ে বলল, "বাহ্,গালির রানি নিশা মল্লিক এখন 'এঁটোচাটা'র মানে চেনে না?
যার থালায় হাজারটা মাছি ঘুরে গেছে, তারে এঁটোচাটা বলব না তো কি পরম পূজনীয় বলব?আর একটা কথা বিয়ে যেহেতু হয়ে গেছে আমার বৌ আমি আমার কাছে রাখবো। জামাকাপড় গুছিয়ে রাখো সন্ধ্যায় এসে নিয়ে যাবো।আর ভুলে ও আমার বাড়িতে আগুন লাগানোর ধান্দা করো না।তাহলে তোমার হাত ধরে নিয়ে ঐ আগুনে দুইজন লাফ দিবো।"
নিশা অভ্রের সাহস দেখে হা হয়ে তাকিয়ে আছে।কি বলবে বুঝতে পারছে না।
এর মধ্যে রহিমা এলো। রহিমার হাতে ফোন দেখে অভ্র বলে তোমার ফোনটা দাও। রহিমা কিছু বুঝে উঠতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, " আ্যা?"
অভ্র চেঁচিয়ে উঠে," ফোন দাও।"
রহিমা তাড়াতাড়ি ফোন এগিয়ে দেয়। রহিমার কাছে থেকে ফোন নিয়ে অভ্র আকাশকে কল করে।ফোন রিসিভ করতেই ,"পাঁচ মিনিটের মধ্যে গাড়ি নিয়ে আয় আর সাথে তোর কাফনের কাপড়।"
আকাশ কিছু বলতে যাওয়ার আগেই ফোন কেটে দেয়।নিশা এখনো বসে আছে একই ভাবে।অভ্র যাওয়ার আগে আবারো বলে যায় "রেডি থেকো।"
তারপর শিশ বাজাতে বাজাতে বেরিয়ে গেলো নিশার বাড়ি থেকে।
এবার নিশা হো হো করে হেসে দিলো। রহিমা লাফিয়ে উঠলো।মনে মনে বলছে " খোদা আগে ছিলো একজন এবার হয়েছে দুইজন আমি মনে হয় কোনো একদিন ভয়ে স্ট্রোক করে মারা যাবো।"
নিশা হাসতে হাসতে নিজের ঘরের দিকে গেলো।
আকাশ এসে গাড়ি থেকে নামতেই অভ্র সোজা গিয়ে তার পশ্চাৎদেশে জোরে একটা লাথি মারে।
"স্যার কি করছেন আমি কি করেছি।"
"সিগারেটে দে।"
আকাশ উঠে একটা সিগারেট আর লাইটার দিলো।অভ্র সিগারেট ধরিয়ে গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিলো।পাশ থেকে আকাশ আবার বলে ওঠে," কোথায় যাচ্ছি আমরা স্যার।"
"মরতে।"
চলবে___
(আজ একটু ব্যাস্ত ছিলাম।বেশি লিখতে পারলাম না।)