ফন্ট সাইজ:
থিম:
আম পাতা জোড়া জোড়া

১ম পর্ব

লেখক: মেহরিমা আফরিন

#আম_পাতা_জোড়া_জোড়া-০১

লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন 
সুষ্মিতা ছিলেন স্বভাবে ভীষণ শান্ত, কিছুটা আহ্লাদী আর অনেক বেশি ধৈর্যশীল। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে তার মেয়ে এমনটা হলো না। আয়তির চিরায়ত রাগটা সবসময় ওর নাকের ডগায় এসে থেমে থাকতো। রাগের পাশাপাশি একটা অদ্ভুত গাম্ভীর্য ছিলো তার মাঝে। এর কারণেই কিনা জানা নেই, তবে বাড়ির লোকজন তাকে যথেষ্ট সমীহ করে চলতো। 
তাকে সমীহ করতো না কেবল সীমান্ত। সীমান্ত পৃথিবীর প্রথম মানুষ যে আয়তির রাগকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিব্যি নিজের কাজ করে যেতো। আয়তি প্রচণ্ড রকম ঘৃণা করতো ঐ ছেলেকে।
সীমান্ত এই বাড়িতে এসেছিল প্রায় এক যুগ আগে। তখন তার বয়স ছিলো পনেরো। আর এখন সাতাশ। তার মা আজমেরি ছিলেন রাশেদার খালাতো বোনের মেয়ে। স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর আজমেরি ছেলেকে নিয়ে এই বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তখন তার কোলে তার পাঁচ বছরের ছোট মেয়ে অরুণা। অরুণার বেড়ে উঠা পুরোটাই এই বাড়িতে।
অন্যের বাড়িতে আশ্রয়ে থাকা মানুষজন সাধারণ একটু নত হয়ে থাকে, বিনীত হয়ে চলে। কিন্তু সীমান্তর মধ্যে এমন কোনো বৈশিষ্ট্য ছিলো না। সে চলতো নিজের মন মর্জি মতো। এমনকি পড়াশোনাও করলো নিজের খেয়াল খুশি মতো। আয়তির পুরো শরীর দাউ দাউ করে জ্বলতো যখন সে রোজ বিকেলে এলাকার টং দোকানে বসে নিশ্চিন্তে একের পর এক সিগারেট শেষ করতো। অবশ্য তার দোষ কোথায়? সে তো সামান্য এক শাগরেদ মাত্র। মূল হোতা তো ইয়াজিদ চাচ্চু নিজে। বাড়িতে ভবঘুরে জীবনযাপনের সূচনা সে ই প্রথম করেছে। সাংসারিক ঝামেলা হীন ব্যাচলর জীবন, বউয়ের ঘ্যান ঘ্যান-প্যান প্যান মুক্ত আরামের দিন আর খেয়াল খুশি মতো চলার দুর্দান্ত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইয়াজিদ অবিবাহিতই থেকে গেছে।
তার দৃঢ় বিশ্বাস, অবিবাহিত পুরুষ মাত্রই আনন্দিত পুরুষ। ইয়াজিদ সাহেব তার ভবঘুরে জীবনে বেশ আনন্দে ছিলেন।
____
আয়তির ক্লাস শেষ হয় বিকেল তিনটা নাগাদ। এরপর বাড়ি আসতে আসতে প্রায় ঘন্টাখানেক সময় লাগে। বাড়িতে আসার পর সে বেশ লম্বা সময় নিয়ে গোসল সারে। তারপর হয় ল্যাপটপে কোনো কাজ করে, নয়তো বারান্দায় গিয়ে হাঁটাহাঁটি করে।
আজ বিকেলে ইশি এলো তার ঘরে, তাও দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে। ওর ভেজা চোখ দু'টো দেখেই আয়তি কপাল কুঁচকালো।
"কি হয়েছে ইশি? তুমি এমন কাঁদছো কেন?"
ইশি নাক টেনে টেনে কান্না থামালো। চোখ মুছে অসহায় চোখে আয়তির দিকে তাকিয়ে বলল," সীমান্ত ভাইয়া আজ আবার আমার ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে গেছে। তার নাকি বল হারিয়ে গেছে। বল কিনতে টাকা লাগবে।"
বিকেলের ঠান্ডা মেজাজটা সাথে সাথে চটে গেল তার। আলস্য ভরা দুই চোখ দ্বপ দ্বপিয়ে জ্বললো হঠাৎ। আয়তি অগ্নিচোখে সামনে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,
"কিহ! ঐ বেয়াদব আবার তোমার টাকার বক্সে হাত দিয়েছে?"
"হ্যাঁ। আমি মানা করার পরেও টাকা নিয়েছে।"
" ও একটা হতচ্ছাড়া!" আয়তি ফুঁসতে ফুসঁতে প্রতিউত্তর করলো,"আমি আজ ওর থেকে এই টাকা আদায় করেই ছাড়বো। চলো ইশি। আমার সাথে চলো। ঐ বেয়াদবটা কোথায় বলতে পারবে?"
"হ্যাঁ। সামনের কলোনিতে। রোজ ঐখানেই ক্রিকেট খেলে সবাই মিলে।"
"হতচ্ছাড়া কোথাকার!"
ভেজা চুল গুলো কোনোরকমে একটা স্কার্ফে প্যাঁচিয়ে সে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। বাড়ির পরিবেশ আপাতত ঠান্ডা। বিকেলের এই সময়ে সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত থাকে। আয়তি বড় বড় পায়ে নিচে নেমে এলো। তার নাকের ডগা লাফাচ্ছে রীতিমতো। সীমান্তকে সে আগেও দুইবার মানা করেছিল, আঙুল তুলে শাসিয়েছিল,"খবরদার! তুমি ওদের টাকার ব্যাংকে হাত দিবে না। "
তবুও সে প্রতিবার একই কাজ করে। বিশ ত্রিশ টাকার দরকার পড়লেই ওদের ব্যাংক থেকে তুলে নেয়। আয়তি বড় একটা নিঃশ্বাস টেনে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এলো বাড়ি থেকে।
বিকেলের সূর্য লাল হতে শুরু করেছে। আলোতে তেমন তেজ নেই। আদাবর কলোনিতে অপরাহ্নের ক্রিকেট ম্যাচ জমজমাট হতে শুরু করেছে। ছেলে পুলে সব ভিড় করে আছে কলোনির গলিতে। আজ অনেক দিন পর ব্যাট হাতে দেখা গেল মোহাম্মদ সীমান্ত হাবিবকে।
সীমান্তের এক হাতে ভারি কাঠের ব্যাট। মাথার চুল এলোমেলো। পরণে একটা সাদা কালো চ্যাকের শার্ট।চারপাশে অল্প বয়সী ছেলেদের শোরগোল। সীমান্ত এসব চিৎকার চেঁচামেচি তে মনোযোগ দিলো না। তার মনোযোগ সামনে। প্রায় ত্রিশ গজ দূরে দাঁড়িয়ে থাকা লিকলিকে চিকন ছেলেটার হাতের দিকে। 
ছেলেটা হঠাৎ বল হাতে দৌড়ে এগিয়ে এলো। সীমান্ত চোখজোড়া তীক্ষ্ণ করে চেয়ে রইল তার হাতের দিকে। খেলার অতি উত্তেজনাপূর্ন মুহূর্ত চলছে। ব্যাটিংয়ে থাকা দলের অবস্থা খুব করুণ।সীমান্তই পারে দুর্বল এই দলটাকে খাঁদের কিনারা থেকে টেনে তুলতে।
লিকলিকে ছেলেটা বল ছুড়ে মারলো। সীমান্ত হাত ঘুরিয়ে বলটাকে ব্যাটের সাথে স্পর্শ করিয়ে শূন্যে তুলে দিলো।ছোট্ট বলটা বাতাসে উড়ছে। ছেলেরা সব মাথা তুলে তাকিয়ে আছে সেদিকে।
সীমান্ত মোটামুটি নিশ্চিত ছিলো এটা ছক্কা হবে। কিন্তু উপর থেকে নামতে নামতে হঠাৎ একজায়গায় এসে বলটা থেমে গেল। একটা হাত খপ করে এসে সেটাকে নিজের মুঠোয় পুরে নিলো। সীমান্ত ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো সেদিকে।
দেখতে পেল, পান পাতার মতো মুখের রূপবতী একটি মেয়ে তার বল হাতে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দু'টো তার ভীষণ কঠিন। সীমান্ত আপাদমস্তক তাকে দেখলো। মেয়েটাকে সে চিনে। ওর নাম আয়তি।
আয়তি বল হাতেই এগিয়ে এলো। তার চোখ মুখ শক্ত। কাছাকাছি আসতেই সে গলা তুলে জানতে চাইলো,"তুমি আবার ইশির টাকার ব্যাংকে হাত দিয়েছো?"
সীমান্ত নির্বিকার মুখে জবাব দিলো,"হ্যাঁ।"
"কেন? আমি তোমাকে নিষেধ করি নি?"
"তুমি নিষেধ করলেই সেটা আমাকে মানতে হবে? তুমি কে?"
"তাহলে তুমি কে? বাচ্চাদের টাকা নিজের কাজে খরচ করো। তুমি কে শুনি? নির্লজ্জ কোথাকার!"
সীমান্ত বিরক্ত হয়ে বলল,"প্যাঁচাল না বাড়িয়ে বল দাও। দেরি হচ্ছে আমাদের।"
"আমি বল দিবো না।"
"কেন দিবে না?"
"তুমি আগে বলের টাকা আমার হাতে দিবে। তারপর আমি তোমাকে বল দিবো।"
"আমি কোনো টাকা পয়সা দিতে পারবো না।"
"তাহলে বলের আশা ছেড়ে দাও।"
সীমান্ত অধৈর্য হয়ে বলল," রাগ ধরাবে না তো। এমনিতেই মেজাজ গরম। হারার মতো অবস্থা। তার উপর তুমি এসেছো নাটক করতে। দিবো না টাকা। কি করবা করো।"
আয়তি চোয়াল শক্ত করে একনজর তাকালো। তার কঠিন দৃষ্টি সীমান্তকে তেমন বিচলিত করলো না। সে হাত বাড়িয়ে বলটা নিজের আয়ত্তে আনার চেষ্টা করলো। 
সবুজ রঙের বলটা শূন্যে উড়ছে।।সীমান্ত হতভম্ব হয়ে বলটার দিকে তাকিয়ে আছে। উড়তে উড়তে বলটা সামনের বাড়ির প্রাচীর পেরিয়ে ভেতরের জংলার উপর গিয়ে পড়লো। বলটা ছুড়েছে আয়তি।
সীমান্ত রাগে গজরাতে গজরাতে বলল,"এটা কি করলি? বল কেন ফেলে দিলি?"
"খবরদার! তুই তোকারি করবে না। আমার সাথে তোমার তুই তোকারির সম্পর্ক না।"
"করবো। একশোবার করবো। তুই একটা ডাইনি।"
"আর তুই একটা হতচ্ছাড়া। অশিক্ষিত কোথাকার!"
আয়তি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। কথা শেষ করেই সে ঘুরে দাঁড়িয়ে হনহনিয়ে বাড়ির পথ ধরলো। পেছন থেকে সীমান্ত ষাঁড়ের মতো চেঁচিয়ে বলল,"হ। তুই একমাত্র এই দেশে শিক্ষিত। আর বাকি সবাই অশিক্ষিত। এতো শিক্ষিত হলে পাবলিকে চান্স পাসনি কেন? বেয়াদব কোথাকার!"
দাঁতে দাঁত চেপে সেই মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিলো আয়তি। এই রাগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সে বাড়িতে আসার পর তার সবচেয়ে পছন্দের শো পিস টি ভেঙে গুড়ো গুড়ো করে ফেলল।
_____
দোতালার মাঝামাঝি একটা ঘর আছে। ঘরের দরজা দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকে। ঐ ঘরে বাড়ির বড় ছেলে নিনীত থাকে। সে বাড়িতে থাকলেও দরজা বন্ধ করেই বসে থাকে। 
মেহরোজ খুব সচরাচর ঐ ঘরে যায় না। ভেতরে উঁকি দিলেই মদের উটকো গন্ধ নাকে লাগে। দ্বিতীয়বার কনসিভ করার পর এই গন্ধটা আর তার সহ্য হয় না। গা গুলিয়ে বমি আসে। 
আজ আবার ঐ ঘরে যেতে হবে মনে হচ্ছে। মেহরোজ আগেই শ্বাস আটকে নিলো। নিনীতের সাথে তার কিছু জরুরি কথা আছে। কোনোরকমে সেটা শেষ করেই সে বেরিয়ে আসবে। শাড়ির কুঁচি ধরে মেহরোজ ধীর পায়ে এগিয়ে গেল তার ঘরের দিকে।
ঘরের দরজা ভেতর থেকে টেনে রাখা ছিলো। মেহরোজ লক ঘুরাতেই সাথে সাথে সেটা খুলে গেল। ঘরের ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। মেহরোজ পায়ের পাতা তুলে উঁকি দিয়েও কিচ্ছু দেখতে পেল না।
পুরো ঘর রাতের মতো অন্ধকার। বারান্দা থেকে যে সামান্য আলো আসার ব্যবস্থা ছিলো, সেটাও ভারি পর্দা টেনে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। ঘরের সমস্ত বাতি নেভানো। দেয়ালের দিকে চোখ বুলাতে গিয়ে মেহরোজের নাকে আবার সেই গন্ধটা লাগলো। সাথে সাথেই সে আঁচল তুলে নাক চেপে ধরলো। কি বিশ্রী গন্ধটা!
মেহরোজ হালকা গলায় ডাকলো,"নিনীত ভাই! ঘরে আছেন?"
কিংসাইজ বেডের ডান পাশের মেঝেতে একটা সুন্দর কার্পেট বিছানো। সেখানে একটা কালো ছায়ায় মতো দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে খাটের সাথে হেলান দিয়ে কেউ ফ্লোরে বসে আছে। মেহরোজ ডাকতেই ছায়াটা সামান্য নড়ে উঠলো। 
সিরামিকের টাইলসে কাঁচের গ্লাস রাখার শব্দ হলো। মেহরোজ এবার সরাসরি তাকালো ছায়াটার দিকে। করিডোরের সামান্য আলো ঘরের ভেতরে ঢুকে ছায়াটাকে স্পষ্ট করে তুলছে। উটকো গন্ধটা আরো প্রকট হচ্ছে। মেহরোজ দম আটকে দাঁড়িয়ে থাকলো জবাবের অপেক্ষায়।
"কি হয়েছে মেহরোজ?"
অবশেষে জবাব এলো। রাশভারি কণ্ঠটা প্রতিউত্তর করতেই মেহরোজ কিছুটা জোর গলায় বলে উঠলো," নিনীত ভাই! নিকিতার গায়ে তো অনেক জ্বর। আপনি একটু গিয়ে দেখবেন? সেই তখন থেকে ঘুমের মধ্যে আপনাকে খুঁজছে। পাপাই পাপাই করে ডাকছে। একটু আসবেন প্লিজ?"
মেঝের উপর কয়েক ধরণের মদের বোতল ছড়ানো ছিলো। নিনীত সেখান থেকে একটা হাতে তুলে নিলো। মুখ খুলতেই ভোদকার উৎকট গন্ধ পুরো ঘরে ছড়িয়ে গেল। মেহরোজ শক্ত করে নাক চেপে ধরলো। গন্ধটা এতো জঘন্য! 
ঢক ঢক করে অনেকখানি তরল গলাধঃকরণ করলো নিনীত। তারপর ছোট করে একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে দায়সারা গলায় বলল,"তোমাকে তো বলেছি মেহরোজ, এদের কোনো কিছুতে তুমি আর আমাকে ডাকবে না। এদের জ্বর হোক, এরা মরে যাক, তাতে আমার কিছুই যায় আসে না। পারলে দু'টোকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলো। আমি কিছু বলবো না।"
মেহরোজ প্রায় সাথে সাথে দুই পাশে মাথা নেড়ে বলে উঠলো,"নিনীত ভাই! কি বলেন এসব? আপনার মেয়ে হয় ওরা। আল্লাহ না করুক, যদি সত্যিই দোয়া কবুল হয়ে যায়? দয়া করে এসব বলবেন না। প্লিজ।"
নিনীত আরো কিছুটা তরল মুখে নিলো। কয়েক ঢোক গিলে নির্বিকার গলায় বলল,"কবুল হোক। এদের যা খুশি হোক। আমার কি?"
"নিষ্পাপ দু'টো বাচ্চার উপর আপনার এতো রাগ? ওরা কি দোষ করেছে?"
"মেহরোজ! দরজা বন্ধ করে সরো এখান থেকে। আলোতে চোখ জ্বলছে আমার।"
মেহরোজ আহত চোখে কিছুক্ষণ সামনে তাকিয়ে আস্তে করে দরজাটা বন্ধ করে দিলো। পিতৃত্বের এমন অমানবিক নিদর্শন সে আগে কখনো দেখেনি। দীর্ঘশ্বাসে তার বুক ভারি হলো। আহারে! ফুলের মতোন বাচ্চা দুইটা!
____
পৃথিবীর বেহুদা কয়েকটি জিনিসের একটি হলো ইয়াজিদের এলার্ম ঘড়ি। শালা যতোই এলার্ম দিক না কেন, কোনোদিন সময় মতো উঠতে পারে না। আজও তার ব্যক্তিক্রম হলো না। সকাল সাতটা থেকে এলার্ম বাজতে বাজতে নয়টা পর্যন্ত একটানা বেজেই গেলো।
নয়টার পরে ইয়াজিদের ঘুম ভাঙলো। আড়মোড়া ভেঙে আলস্যভরা চোখে টেবিল ক্লকের দিকে তাকাতেই সমস্ত জড়তা কেটে গেল। এক লাফে উঠে বসে ইয়াজিদ চোখ কচলালো। আরো একবার ভালো করে সময় দেখলো। হ্যাঁ, নয়টা পাঁচই দেখাচ্ছে। আজ আবারো লেইট।
গায়ের উপর থেকে কম্ফোর্টার সরিয়ে মাথা চাপড়ালো ইয়াজিদ। আজ অন্তত দ্রুত উঠা দরকার ছিলো। তার এখনের বাইকে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। সেটা আর আগের মতো সাঁই সাঁই করে ছুটতে পারে না। এই বাইকটা দিয়ে আর কাজ চলবে না। এটা পাল্টে নতুন একটা বাইক কিনতে হবে।
শুরুতেই বাইক কিনার কথা বড় ভাইজানকে বলা যাবে না। সিস্টেম করে তারপর বলতে হবে। এই যেমন ইয়াজিদ পরিকল্পনা করেছিল, আজ সকালে সে সাতটায় উঠবে। উঠে হাত মুখ ধুয়ে সোজা বড় ভাইজানের ঘরে যাবে। গিয়ে তার সাথে আড্ডা দিবে, রাজনীতি নিয়ে টুকটাক জ্ঞানের কথা বলবে, জীবন নিয়ে আলোচনা করবে। সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়ার প্রভাবকের মতো বিয়ের প্রসঙ্গটাও যোগ করবে। ভাব এমন করবে যেন যে বিয়ে নিয়ে আগ্রহী, জীবনের ব্যাপারে মনোযোগী।
তারপর.....প্রায় অনেকটা সময় কেটে যাওয়ার পর সে বাইকের কথাটা তুলতো। ইনিয়ে বিনিয়ে বলতো জীবনের সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার জন্য একটা বাইক তার ভীষণ প্রয়োজন। বিয়ে করার পর বউ নিয়ে রাতের রাস্তায় কয়েকটা স্মৃতি যোগ করার জন্য হলেও তার একটা নতুন বাইক প্রয়োজন।
কিন্তু পরিকল্পনা মাফিক কিছুই হয়নি। তার ঘুম ভাঙলো দেরিতে। টেবিল ঘড়িতে সময় দেখার পর মুখখানা আপনাআপনি সংকুচিত হয়ে এলো। নিজেকেই কয়েকটা গালি দিতে ইচ্ছে হলো। ঠোঁট উল্টে এক প্রকার ভৎসনার চোখে নিজের ঘরটা দেখে সে তাড়াতাড়ি নেমে এলো খাট থেকে।
বড় ভাইজান থেকে বাইক আদায়ের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। তাই বলে সারাটা দিন তো আর বেকার কাটানো সম্ভব না। ছেলেরা ফোন দিচ্ছিল কাল রাত থেকে। পাড়ায় একটা সমাবেশ হবে। ইয়াজিদ কে ঐ সমাবেশের দায়িত্ব নিতে হবে। 
ট্রাউজারের পকেটে হাত গুজে গদাইলস্করি চলনে ইয়াজিদ খাবার ঘর পর্যন্ত হেঁটে গেল। কাল রাতে সে দ্রুত বাড়ি ফিরেছিল। এটাও বড় ভাইজানের মন পাওয়ার একটা চাল ছিলো। তার সুনজরে আসার প্রচেষ্টা মাত্র। তারপর প্রায় নয় ঘন্টা ঘুমিয়েছে সে। ইয়াজিদের পিঠসহ ব্যথা করতে লাগলো অতিরিক্ত ঘুমের প্রভাবে।
_____
মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে উঠা সুশ্রী নারী কায়াটির দিকে তাকিয়েই আহিল চওড়া হাসলো। জ্বলজ্বলে চোখে ছবিটির দিকে তাকিয়ে দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে বলল,"ওয়েল। এটা ফুল এন্ড ফাইনাল। আমি একেই বিয়ে করবো।"
সকাল নয়টা পাঁচ।
আয়তি চেয়ার টেনে নাস্তা করতে বসেছে। তাকে আর পনেরো মিনিটের মধ্যে ভার্সিটির জন্য বের হতে হবে। তার সামনের চেয়ারে আহিল বসা। গুনগুন করে গান গাইছে আর ফোন স্ক্রল করছে। ওর সামনের প্লেটে পরোটা ঠান্ডা হচ্ছে। আয়তি গম্ভীর মুখে বলল,"পরোটা খা আহিল। খাবার ঠান্ডা হচ্ছে।"
"আহা! তুই আমার হবু বউ কে দেখ না। কি সুন্দর দেখতে!"
"তুই ইতোমধ্যে পঞ্চাশবার নিজের বউ পাল্টেছিস। আমার কোনো আগ্রহ নেই দেখার।"
"এটা শিওর। কথার নড়চড় হবে না দেখিস।"
আয়তি গ্লাসে পানি ঢাললো। বিড়বিড় করে বলল,"লম্পট কোথাকার!"
আহিল সে কথা গায়ে মাখলো না। আরো একবার উৎফুল্ল চোখে সে ছবিটার দিকে তাকালো। উচ্চতায় বেশ লম্বা, স্লিম ফিগার, ঝরঝরে মসৃণ চুলের একটা মেয়ে। তার নাম নানজীবা। স্যোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার। ইন্সটাগ্রাম চালাতে গিয়েই তার সন্ধান পেয়েছে সে। সাথে এও খবর নিয়েছে, উত্তরার একটা ফ্ল্যাটে পরিবারের সাথে থাকে সে।
ঠিক এমন সময় ইয়াজিদ এলো খাবার ঘরে। হেলেদুলে হেঁটে একটা চেয়ার টেনে বসলো। কুঁচকানো চোখে আহিলের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো,"কিরে! আবার নতুন করে বেডিবাজি শুরু করেছিস নাকি?"
আহিল হাসলো। মাথা নেড়ে বলল,"ইয়ুউউউ! নট বেডি বাজি চাচ্চু। এবার আমি সিরিয়াস।"
"ওরে শালা! তোমার আবার সিরিয়াস।"
আহিল শক্ত মুখে বলল,"সবসময় মজা করবে না। এই মেয়েটাকে আমার পছন্দ হয়েছে। ওর চেহারার মধ্যে একটা বউ বউ ভাব আছে।"
"সেটা তো আগের একশো জনের মধ্যেও ছিলো। নতুন কিছু না।" 
"আগের একশো জন আর সে এক না। ও আলাদা, ও নানজীবা।"
"ওরে বাবা! নামের তো বহুত বাহার দেখছি।"
আহিল ফোন ঘুরিয়ে তাকে ছবিটা দেখালো। ইয়াজিদ সন্দিগ্ধ চোখে জানতে চাইলো," করে কি?"
"স্যোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার।"
"খাইসে আমারে!" ইয়াজিদ হাসতে হাসতে বলল," ভালো জিনিস পছন্দ করছোস। এমন ভাবে পেছন মাইরা যাবে গা যে কিসু টেরও পাইবা না চান্দু।"
চলবে-
(সব জুটির আলাদা আলাদা গল্প হবে। ধৈর্য ধরুন। একটু বড় করেই লিখবো সবাই কে।)
পর্ব কেমন লেগেছে জানাবেন কিন্তু।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন