ফন্ট সাইজ:
থিম:
আম পাতা জোড়া জোড়া

২য় পর্ব

লেখক: মেহরিমা আফরিন

#আম_পাতা_জোড়া_জোড়া-০২

লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন 
নিবেদিতা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল এক হাত গ্রিলে রেখে। দূর থেকে পাখির ডাক কানে আসছে। নিবেদিতার এই শব্দটা খুব ভালো লাগে। সকালে ঘুম থেকে উঠার পর সে প্রায় আধঘন্টার মতো জানালার কাছে দাঁড়ায়, গায়ে ঠান্ডা বাতাস লাগায়।
তখন সকাল দশটা প্রায়। বেলী চপল পায়ে তার ঘরে এসে উঁকি দিলেন। রসাইঘরের ঝামেলা মেটানোর পর এতোক্ষণে তার একটু সময় হয়েছে।
"নিবি!"
নিবেদিতা জানালা থেকে হাত সরালো।
"ছোট দিদুনি! তুমি?"
বেলী ভেতরে এলেন। চারপাশ দেখে বললেন," খেতে আসো নিবি। এখনো তো কিছু খাও নি।"
নিবেদিতা ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। গত দুইদিন ধরে তার মন খারাপ। বিক্ষিপ্ত মন কোনো অযুহাতেই আর আগের মতো স্বাভাবিক হচ্ছে না। নিবেদিতা হালকা স্বরে বলল,"মেহরোজ মাম্মা কোথায়?"
"মেহরোজ হাসপাতালে গেছে নিকিতাকে নিয়ে।"
নিবেদিতার দুই চোখ আরো একবার বিষন্ন দেখালো। নিকিতার দুইদিন ধরে শরীর খারাপ। চাইলেও সে বোনের জন্য কিছু করতে পারে না। অন্ধ হয়ে সে কেবল মানুষের বোঝাই বাড়িয়েছে।
"বোন এখন কেমন আছে? রাতে কি আবার জ্বর এসেছিল?"
"এসেছিল বোধহয়। মেহরোজ দেখলাম খুব সকাল সকাল তাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। মেয়েটারও হয়েছে এক বিপদ। পেটে বাচ্চা নিয়ে এতো দৌড়ঝাপ করতে হচ্ছে।"
নিবেদিতা হালকা করে মাথা নাড়লো। বেলী তাকে খাওয়ালেন, মুখ মুছালেন, তারপর মাথায় কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
বাইরে খুব হালকা করে বাতাস দিচ্ছে। নিবেদিতা বসে আছে তার ঘরে, খাটের উপর। তার ঘর থেকে বেরিয়ে আর তিনটা ঘর পেরোলেই নিনীতের ঘর। ঐ ঘরে ভুল করেও কোনোদিন পা ফেলতে চায় না নিবেদিতা। 
সম্পর্কে নিনীত তার বাবা। মা মরা মেয়েদেরকে পিতা অতি আদরে বড় করে, এমন কথা সর্বজনে প্রমাণিত হলেও নিবেদিতা কিংবা নিকিতার বেলায় এমন কিছুই হলো না।
নিকিতার যখন মাত্র এক বছর বয়স, তখন একটা রোড এক্সিডেন্টে সিয়াশা মারা গেল। একেবারে স্পট ডেড, বাঁচানোর কোনো উপায়ই ছিলো না। এই ঘটনার পর নিনীত পুরোপুরি পাল্টে গেল। তার জীবনযাপন আচার আচরণ সবকিছু একেবারে বদলে যেতে শুরু করলো।
নিবেদিতার শৈশবের দিন গুলো কেটেছিল বাবা মায়ের আদরে, যত্নে, মায়া আর মমতায়। মায়ের মৃত্যুর পর সেই নিবেদিতাই জীবনের সব কূল কিনারা হারিয়ে ফেললো। সে চোখে দেখতে পারতো না বলে বাবা পুতুলের মতো যত্ন করতো তার। সেই নিনীতই সিয়াশার মৃত্যুর পর কোনোদিন একবার কাছেও আসে নি তাদের। উপরন্তু মেয়েদের প্রসঙ্গ সে সহ্যই করতে পারতো না। শুনলেই রেগে যেত, চিৎকার চেঁচামেচি করতো।
নিনীতের জীবন আটকে ছিল ভিন্ন ভিন্ন ব্র্যান্ডের হুইস্কি আর ভোদকার বোতলে। একটা অন্ধকার ঘর, আর পৃথিবীর প্রতি ভয়াবহ বিতৃষ্ণা কে সঙ্গী করে। আর নিবেদিতার জীবন আটকে ছিলো বাবার ঐ পুরাতন আদরে। মাঝেমধ্যে হঠাৎই কল্পনা করতো, তাদের জীবনে একজন মা আসবে। সত্যিকারের মা। যে মা তাদের ভালোবাসবে, আদর দিবে। নিকিতা তো জানেই না মা শব্দের অর্থ কি। 
তিন বছরের ছোট একটা শিশু জন্মদাতা পিতার এমন অবহেলা অনাদরে বড় হোক, নিবেদিতা সেটা চায় না। একটা পরী আসুক তাদের জীবনে, সত্যিই আসুক। পরী যাদুর ছড়ি ঘুরিয়ে বাবাকে বিস্ট থেকে আবার প্রিন্স বানিয়ে দিক। অবিকল নিবেদিতার ছোটবেলায় শোনা স্লিপিং বিউটি গল্পের সেই প্রিন্সের মতো।
______
ইয়াজিদ শার্টের কলার উপরে তুলে ঘরে প্রবেশ করলো। এই ঘরটা রাশেদার। তিনি সচরাচর ঘর থেকে বের হন না। বেশিরভাগ সময় হেলান দিয়ে শুয়ে থাকেন বিছানায়।
তার বছর একাশি। সিরাজুল সাহেব গত হয়েছেন প্রায় পনেরো বছর আগে। এরপর থেকে রাশেদা একা ঘরেই থাকেন। নাসির সাহেব অবশ্য বলেছিলেন, তার দেখাশোনার জন্য একটা মেয়ে রাখার কথা। রাশেদাই রাজি হন নি। এই ঘরে তার বিবাহ জীবনের অনেক স্মৃতি মিশে আছে। সিরাজ সাহেব বাদে এই ঘরে তিনি অন্য কাউকে কল্পনা করতে পারেন না।
ইয়াজিদ ঘরে ঢুকেই ডানে বায়ে তাকালো। রাশেদা আধশোয়া হয়ে তাসবিহ গুনছেন। ঠোঁট দিয়ে বিড়বিড় করে কালেমা পড়ছেন। তার শরীর আরো রোগা দেখাচ্ছে আজ। ইয়াজিদ ঘরে ঢুকতেই তিনি নাক সিটকালেন। বজ্জাতটা আবার এসেছে। নিশ্চয়ই টাকা পয়সার ধান্দা। নয়তো রাশেদার ঘরে তার পা পড়ে না ভুলেও।
ইয়াজিদ খাটে গিয়ে বসলো। রাশেদা চোখ পাঁকিয়ে বললেন," তুই মুখ ধুইয়া আয়। তোর গা থেক্কা খালি বিড়ির গন্ধ বাইর হয়।"
ইয়াজিদ অপমানটা গায়ে মাখলো না। ঘাড় চুলকে নির্দ্বিধায় বলল,"আম্মা টাকা দেও। টাকা শেষ। আপাতত হাজার পাঁচেকই দাও।"
রাশেদা সরোষ চোখে ছেলের দিকে তাকালেন। এই ছেলে তার শেষ বয়সের সম্বল, সিরাজ সাহেবের কলিজার টুকরা, বড় ভাইজানদের জান। জন্মের পর থেকে ওর আদর যত্নে বাড়ির লোকজন কার্পণ্য করে নি। কিন্তু ছেলেকে দেখলেই এখন রাশেদার রাগ উঠে।
সে ঘোষণা দিয়েছে, এই জীবনে কোনোদিন সে বিয়েই করবে না। সারাজীবন এমন করেই থাকবে। রাশেদা অবাক হয়ে বললেন," এ আবার কেমন কথা? বিয়া ছাড়া মানুষ কেমনে থাকে?"
"যেমনে আমি থাকি, ওমনেই থাকে। সবাই তো বিয়া কইরা বাচ্চা ফুটানের ধান্দায় থাকে না আম্মা।"
রাশেদার কপালের দুইপাশ লাফায় ছেলের এসব কথা শুনলে।
"বজ্জাত কোনখানের! মানুষ খালি বাচ্চা ফুডাইতে বিয়া করে? তোর বুড়া বয়সে কে তোর পাশে থাকবো? আমরা সারা জীবন বাইচ্চা থাকমু?"
"তোমাদের বাইচ্চা থাকতে হবে না। আমার অনেক ভাই ব্রাদার আছে। ওরা বাইচ্চা থাকলেই হবে। ওরা থাকবে আমার পাশে।"
"খুব থাকবো। ঘোড়ার আন্ডা থাকবো।"
রাশেদা এই ছেলের সাথে পারতে কথা বাড়ান না। তার হাই প্রেশারের রোগটা ইয়াজিদের জন্মের পরেই দেখা দিয়েছে। খোদা তাকে পরীক্ষা করতে এই ছেলে দিয়েছেন তার পেটে।
রাশেদা কঠিন গলায় বললেন,"কোনো টাকা দিতে পারমু না। তোমার ভাইজানদের গিয়া কও টাকা দিতে। তোমার ব্যাপার ওরা বুঝবো।"
"তোমারে কি আমার ব্যাপার বুঝতে কইসি? খালি কইসি টাকা দিতে। টাকা দাও।"
"টাকা নাই।"
ইয়াজিদ বিরক্তিসূচক শব্দ করলো। মাথার পেছনের দিকটায় হাত বুলাতে বুলাতেই খাট থেকে উঠে গেল। রাশেদার টেবিলের উপর একটা চাবির ছড়া রাখা থাকে। এই ছড়াতে রাশেদা বাদে আর কেউ হাত দেয় না। এমনকি নাসির সাহেবও তার অনুমতি নিয়ে চাবি ধরেন, আলমারির লক খোলেন।
ইয়াজিদ গিয়েই প্রথম চাবির ছড়াটা হাতে নিলো। তারপর নির্দ্বিধায় রাশেদার সাবেকি আমলের কাঠের আলমারির একটা দরজা খুললো। এরপর হাত বাড়িয়ে একটা ছোট পুটলি বের করে সেখান থেকে পাঁচটা হাজার টাকার নোট বের করে হাতে নিলো। রাশেদা চোখ বড় বড় করে তার কাজকর্ম দেখলেন।
ইয়াজিদ আলমারি বন্ধ করে এক নজর মায়ের দিকে তাকিয়ে হালকা গলায় বলল," চাইছিলাম ভালো থাকতে। তুমি আমারে ভালো থাকতে দিলা না আম্মা। তোমার আলমারিতে লাখ খানেক টাকা আছে, আমি জানি। আটাইশ ভরি স্বর্ণও আছে। ঐডাও জানি। এতো মিছা কথা কও কেন? এক পা তো তোমার কবরে। তাও এসব বাজে স্বভাব যায় না।"
রাশেদার আবার কপালের দুইপাশ দ্বপ দ্বপ করতে লাগলো। তিনি জোরে জোরে শ্বাস টেনে বললেন," জানোয়ারের বাচ্চা! তুই আমার ঘর থেক্কা বাইর হ।"
"হইতেছি। আমারও কোনো শখ নাই ঘরে বইসা আপনের আর আপনের জামাইয়ের সংসার জীবনের গল্প শোনার। ঘুইরা ফিরা খালি এক কথা। ধুরু!"
ইয়াজিদ বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। রাশেদা অনেকটা সময় ক্ষুদ্ধ চোখে তার চলে যাওয়ার পথে চেয়ে রইলেন। এই ছেলের জন্মই হয়েছে রাশেদার জীবন লণ্ডভণ্ড করে দিতে। তিন ছেলেকে মানুষ করতে রাশেদার তেমন কোনো কষ্টই হয় নি। কিন্তু একে বড়ো করতে গিয়ে তিনি সেই যে অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়লেন, আর ঠিক মতো উঠতে পারেন না।
ইয়াজিদ অবশ্য এই অপমান হজম করলো না। সে দুই আঙুল নেড়ে প্রতিবাদ করে বলল,"মিছা কথারও একটা লিমিট থাকে আম্মা। তোমার বয়স আশি। তুমি বিছানায় পড়ছো বয়সের দোষে। সবকিছুতে আমারে টানো কেন? আমার কোনো দোষ নাই এখানে।"
হাহ! রাশেদা আক্তারের দিনকাল অনেকটা এমন করেই কাটছিলো।
_____
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দু'টো শাড়ি বুকের উপর ধরে সে কিছুক্ষণ ভাবলো। একটা শাড়ির রং কমলা, অন্য শাড়ির রং একটু অন্যরকম। সমুদ্রের যেই নীল রং হয়, অনেকটা এমন। আজ তার সমুদ্রের মতো নীল রং পরতে ইচ্ছে করছে না। তাই সে কমলা শাড়িটাই বেছে নিল। এলিট শ্রেণীতে এই রঙের আরেকটা নাম আছে-রাস্টিক অরেঞ্জ।
তথাকথিত সেই রাস্টিক অরেঞ্জ শাড়িটা গায়ে জড়িয়েই সে কাঁধের কাছে পিন গুজলো। পিঠ ছাড়ানো মসৃণ চুলগুলো হাত দিয়ে প্যাঁচিয়ে ঢিলেঢালা একটা খোঁপা বাঁধলো মাথায়। তারপর চেয়ারের উপর থেকে ধবধবে সাদা এপ্রোন টা হাতে নিয়ে শেষ একবার তাকালো আয়নার দিকে। কি যেন নেই। তাকে অসম্পূর্ণ দেখাচ্ছে। ওহহ হ্যাঁ, হাতে ঘড়ি নেই। আরেকটা জিনিস নেই। ঠোঁটে তার পছন্দের লিপগ্লস নেই।
ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে একটা চিকন চেইনের ঘড়ি হাতে পরে বেবি পিংক কালারের লিপগ্লসটা ঠোঁটে ঘঁষতে ঘঁষতে ডাক্তার পারমিতা ইবনাত বেরিয়ে পড়লো ক্লিনিকের উদ্দেশ্যে।
যেই ক্লিনিকে পারমিতা রোগী দেখে, তার নাম কিটিপাই কেয়ারিং ম্যাটারনিটি সেন্টার। সে পেশায় একজন পেডিয়াট্রিশিয়ান, সারাদিন বাচ্চা কাচ্চাদের সাথে কাজ কারবার।
পারমিতা বসে দোতালায়, জানালার পাশে একটা কেবিনে। কেবিনের জানালা দিয়ে সামনের বাগান দেখা যায়। বাগানে খুব ছোট ছোট ডেইজি ফুল ফোটে।
আজ পারমিতার কেবিনে এলো বেশ যুবতী বয়সী এক মেয়ে। কোমল চেহারার, মায়াময় মুখের মেয়েটির কোলে একটা ছোট বাচ্চা। বয়স কেমন হবে? আড়াই তিন এমন? এর চেয়ে বেশি না। বাচ্চাটার চেহারা ভীষণ মিষ্টি। গায়ের রং টা মোমের মতো। পুতুল পুতুল চেহারা। পারমিতা আগ্রহভরা চোখে কিছুক্ষণ বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
যুবতী মেয়েটা চেয়ার টেনে বসল। তাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে। পারমিতা একটা পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো তার সামনে। একগাল সৌজন্য হেসে মেয়েটা ঢকঢক করে পুরোটা পানি খেল। হাসি মুখে বলল,"থ্যাংক ইউ।"
পারমিতা আবার বাচ্চাটার দিকে তাকালো। তার পরণে খুব সুন্দর গোলাপি রঙের একটা ফ্রক। ফ্রকের নিচ থেকে গলুমলু দু'টো ফর্সা পা বেরিয়ে আছে। সে গোল গোল চোখে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে ছিলো পারমিতার দিকে।
পারমিতা হাত নাড়লো। আদুরে গলায় বলল,"হাই! কেমন আছো তুমি?"
বাচ্চাটা একটু লজ্জা পেল। মাথা নামিয়ে যুবতী মেয়েটার গা ঘেঁষে আস্তে করে বলল,"ভালু।"
"তো, তোমার কি হয়েছে শুনি?"
বাচ্চাটা এবার মাথা তুললো। গোল গোল চোখে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো, তার কি হয়েছে। 
মেয়েটা স্মিত হেসে বলল," ম্যাম, দুইদিন ধরে খুব জ্বর। কিছু খায় না। একটু পর পর কান্না করে। কাল সারারাত আমি আর আমার শ্বাশুড়ি মিলে কোলে নিয়ে হেঁটেছি। আমি তো আর আগের মতো পারি না।"
মেয়েটা হঠাৎ গলার স্বর নামালো। একটু এগিয়ে এসে আস্তে করে বলল,"আমি কনসিভ করেছি। তিন মাস চলছে। এই অবস্থায় শরীরও আর সায় দেয় না।"
পারমিতা মাথা নাড়লো। হাত বাড়িয়ে একবার বাচ্চাটার মাথায় হাত রাখলো। ডেস্কের একপাশ থেকে একটা পেনলাইট হাতে নিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। এগিয়ে এসে বাচ্চাটার দিকে ঝুঁকে সে তার চোখের মণি আর মুখের ভেতরটা দেখলো ভালো করে।
"ভ্যাক্সিন দেওয়া আছে সব?"
"জি।"
"জ্বর কি রাতে বাড়ে, দিন হলেই ছেড়ে দেয় এমন?"
"না না। সব সময় সমান থাকে।"
"এর মধ্যে কোনো র‍্যাশ ট্যাশ হয়েছে শরীরে?"
"না।"
পারমিতা প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে আড়চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল,"ওর বাবা কোথায়? পরের বার থেকে বাবাকে সাথে নিয়ে আসবেন।"
তার কথা শুনেই মেয়েটা শব্দ করে হেসে উঠলো। চোখ দু'টোতে বিদ্রুপ খেলে গেল আপনাআপানি।
"বাহ! ভালো কথা বললেন। বাপ আসবে ওকে নিয়ে! বাপ তো ধরেও দেখে না একটাবার। আবার নাকি ডাক্তারের কাছে আনবে। হ্যাহহ্! দিবাস্বপ্ন।"
পারমিতা প্রেসক্রিপশন লিখা শেষ করে কাগজটা মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে দিলো। মোটামুটি সব মহিলাদের তাদের বর কে নিয়ে একরকম অভিযোগ। এই বিভাগে কাজ করতে করতে সে মোটামুটি অভ্যস্ত এসবের সাথে।
"আপনার নাম কি?"
"মেহরোজ।"
"আচ্ছা। এই নিন ঔষধ। নিয়ম করে বাবুকে খাওয়াবেন ঠিক আছে?"
"ঠিক আছে।"
মেহরোজ প্রেসক্রিপশন নিয়েই উঠে দাঁড়ালো। বেশ তাড়াহুড়ায় বলল,"আচ্ছা আমি আসি। আমার ছেলে আবার আমাকে না পেলে কান্নাকাটি শুরু করবে।"
"ছেলেও আছে আপনার?"
"জি। অনেক ছোট।"
মেয়েটা তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে পড়লো। পারমিতা খাঁড়া চোখে কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে রইল। কি অদ্ভুত! এতো অল্প বয়সে তিন বাচ্চা! এই যুগে এসে এমন ভেড়ার পালের মতো বাচ্চা নেয় কে?
____
লাঞ্চ ব্রেকে তার সাথে কুমুর দেখা হলো। কুমু তাকে দেখে হাসতে হাসতে বলল,"কি পারমিতা? কি অবস্থা?"
"ভেরি গুড, কুমুদিনি। তোমার অবস্থা কি? লাইসেন্স পাশ করা ঐ ডাক্তার কেই বিয়ে করছো তাহলে?"
কুমু চেয়ার টেনে বসলো। বেশ নিশ্চিন্ত গলায় বলল,"হ্যাঁ। নেক্সট মানথেই বিয়ে।"
"ওহহ, কংগ্রাচুলেশনস।"
কুমু বলল," তোমার কি অবস্থা? বিয়ে শাদি নিয়ে এখনো কোনো চিন্তাভাবনা নেই?"
"উহু, বললাম তো। ক্রাইটেরিয়া ফিল হতে হবে।"
"ক্রাইটেরিয়া কি? সিঙ্গেল ফাদার?" কুমু ভ্রু বাঁকিয়ে জানতে চাইলো।
পারমিতা ঝরঝরে হেসে বলল," ইয়েস! সিঙ্গেল ফাদার। ফাদার অফ আ ডটার।"
"কি অদ্ভুত শখ তোমার! এত্তো সুন্দর পরীর মতো চেহারা নিয়ে ম্যারিড লোকের জন্য বসে আছো।"
পারমিতা বিরক্ত হলো। কপাল কুঁচকে বলল,"নো কুমু। ম্যারিড না। ডিভোর্সড। অথবা বিপত্নীক। ইউ নৌ হোয়াট? আমার সিঙ্গেল ফাদারদের খুবই ভালো লাগে। শুধুমাত্র বাচ্চাদের কথা ভেবে ওরা একা থেকে যায়।।হাউ সুইট! আমি এধরণের ছেলেদের খুব পছন্দ করি। আই লাভ গ্রীন ফ্ল্যাগস।"
কুমু আশাহত চোখে মেয়েটার দিকে তাকায়। তার নাম পারমিতা। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। আনম্যারিড, প্রচণ্ড রূপবতী। তার শখ হয়ে সিঙ্গেল ফাদার বিয়ে করার। যার আগের পক্ষের একটা মেয়ে বাচ্চা থাকবে, যে তার বাচ্চাদের প্রতি খুবই যত্নশীল থাকবে।
পারমিতা উঠে যেতে যেতে বলল," এন্ড ইয়েস। তাকে খুবই হ্যান্ডসাম ড্যাডি হতে হবে। আমার ড্যাডি না। আমার বাচ্চাদের ড্যাডি। হাহাহা।"
চলবে-
[ সবে শুরু হলো গল্প। একদিনে তো সবাইকে আনা সম্ভব না। ধীরে ধীরে প্রয়োজন অনুসারে সবাই আসবে। তবে আপাতত কয়েক পর্বে নিনীতের স্ক্রিনটাইম বেশি থাকবে। আর পুরো গল্পজুড়ে সবচেয়ে বেশি স্ক্রিনটাইম থাকবে ইয়াজিদের। আগেই বলে দিলাম। 
আরেকটা কথা বলি। এই গল্পে মা-বাবা এবং সন্তানের সম্পর্ক, ভাই বোনদের সম্পর্ক, খেই হারানো পিতার সাথে তার দুইটা মিষ্টি ফুলের সম্পর্ক, রাশেদার সাথে তার ছোট পুত্রের সম্পর্ক, সবই থাকবে। এই সম্পর্কগুলোর মধ্যেই, একটা পরিবারের নিত্যদিনের গল্প চলার মধ্যেই একে একে কয়েকটা জুটির বিয়ে হবে, সংসার হবে। এটাই গল্প। খুব বেশি কিছুর আশা করবেন না কেমন? এটা খুব সাধারণ একটা গল্প।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন