ফন্ট সাইজ:
থিম:
হয়তো আমার নয়তো কারো নয়

১ম পর্ব

লেখক: সিমু নোহা

“বামন হয়ে চাঁদ ধরতে চাওয়াটা কি তোর ঠিক হচ্ছে?”

চৌধুরী মঞ্জিলের সুবিশাল ড্রয়িংরুমের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল নেহা আর তার বান্ধবী লামিয়া। চারপাশের আলোঝলমলে পরিবেশের মাঝে হঠাৎ বান্ধবীর মুখ থেকে এমন তাচ্ছিল্যপূর্ণ কথা শুনে নেহার গা-পিত্তি জ্বলে গেল। এক মুহূর্তের জন্য যেন থামকি মারল তার শ্বাস। সে তীক্ষ্ণ ও অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করল লামিয়ার দিকে। সেই চাউনিতে এতটাই তেজ ছিল যে, লামিয়া নিজের অজান্তেই গলার শুকনো ঢোক গিলে একটু পিছিয়ে গেল। অবস্থা সামাল দিতে লামিয়া তোতো করে বলল,

“না মানে... বলছিলাম যে, সায়েম ভাই তোকে আদৌ বিয়ে করবে তো?”

“অবশ্যই করবে!”

নেহার কাটকাট আর দ্বিধাহীন জবাব। গলার স্বরে স্পষ্ট আত্মবিশ্বাস, নাকি জেদ—তা বোঝা দায়।

লামিয়া গালে হাত দিয়ে বিষণ্ণ ভঙ্গিতে দাঁড়াল। কিছুটা চিন্তিত কণ্ঠে বলল,

“করলে তো খুবই ভালো কথা। আর যদি না...”

“চুপ কর!”

হাত তুলে লামিয়াকে মাঝপথেই থামিয়ে দেয় নেহা। তার চোখে এক অন্যরকম আগুন। শক্ত গলায় বলে উঠে,

“সেই ছোটবেলা থেকে সায়েম ভাইকে আমি ভালোবেসে এসেছি। আমার এই নিষ্কলঙ্ক ভালোবাসায় তাকে ধরা দিতেই হবে।”

লামিয়া আর কথা বাড়াল না, মুখে একটা জোরপূর্বক কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে নীরবতা বজায় রাখল।

নেহা কিংবা লামিয়ার কেউই এই চৌধুরী বাড়ির সদস্য নয়। চৌধুরী মঞ্জিলের কর্তা জনাব আসিফ চৌধুরীর বাল্যকালের একমাত্র ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মেয়ে হলো নেহা। আর লামিয়া এসেছে নেহার সাথে বান্ধবী হিসেবে। আসিফ চৌধুরী তার পরম বন্ধুর মেয়েকে নিজের মেয়ের মতোই স্নেহ করেন। সেই সুবাদে চৌধুরী মঞ্জিলে নেহার যাতায়াতটা দীর্ঘদিনের এবং বেশ অনায়াস। বাড়ির সকলেই মেয়েটিকে বেশ পছন্দ করে। তবে সবার মধ্যে ব্যতিক্রম একজন—আসিফ চৌধুরীর একমাত্র বোন সালমা বেগম। নেহার এই বাড়িতে ঘনঘন আসা- যাওয়াটা তিনি চোখের বিষ মনে করেন, একদমই সহ্য করতে পারেন না।

আজ চৌধুরী মঞ্জিলে এত আড়ম্বর আর উৎসবমুখর পরিবেশের মূল কারণ হচ্ছে, ঠিক তিনদিন আগেই চৌধুরী বাড়ির একমাত্র ছেলে, সকলের আদরের আরফান চৌধুরী সায়েম উচ্চশিক্ষা শেষ করে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছে। আর সেই উপলক্ষেই আয়োজিত হয়েছে এই বড়সড় নৈশভোজ।

ছোটবেলা থেকেই সায়েমের প্রতি এক গভীর অনুরাগ লালন করে আসছে নেহা। মনের গহীনে সায়েমের জন্য অনুভূতিগুলো বিশাল এক বৃক্ষে পরিণত হলেও, কখনো তা মুখ ফুটে বলতে পারেনি সে। আজ দীর্ঘদিন পর সায়েমকে দেখার ব্যাকুলতা নিয়েই সে ছুটে এসেছে এই মহলে।

তাদের দুজনের এই ফিসফিসানির মাঝেই ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল। সেখানে এসে দাঁড়ালেন সালমা বেগম। তার পরনে দামী সিল্কের শাড়ি, চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তি। তিনি চোখ দুটো ছোট ছোট করে ওপর থেকে নিচ—নেহা এবং লামিয়াকে ভালো করে পরখ করে নিলেন। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বললেন,

“অনেক তো বড় হয়েছিস নেহা! এবার অন্তত একটু সমঝে চল, যেখানে-সেখানে কথায় কথায় আসা-যাওয়াটা একটু বন্ধ কর।”

সালমা বেগমের বিষাক্ত কথার পেছনের আসল ইঙ্গিতটা নেহা খুব ভালো করেই বুঝতে পারল। তিনি যে তাকে পরোক্ষভাবে এই বাড়িতে আসতে বারণ করছেন এবং তার উপস্থিতিটা যে এখানে অনাকাঙ্ক্ষিত—তা ধরতে নেহার এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। কিন্তু নেহা দমে যাওয়ার মেয়ে নয়। সে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে মিষ্টি কিন্তু ধারালো এক গাল হাসি উপহার দিল। সালমা বেগমের দিকে সোজা তাকিয়ে বলল,

“ফুপি, আপনি তো শুধু আসার কথা বলছেন, আমার তো ইচ্ছে করে একেবারে খুঁটি গেঁথে স্থায়ী হয়ে থেকে যাই!”

নেহার এমন মোক্ষম জবাব শুনে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লামিয়া আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না, মুখ টিপে হেসে ফেলল। নেহার এই দ্ব্যর্থবোধক উত্তরের সোজাসুজি কোনো জবাব খুঁজে পেলেন না সালমা বেগম। রাগে তার মুখটা লাল হয়ে উঠল। কিন্তু এখন ভিড়ের মাঝে কথা বাড়িয়ে নিজের মান কমাতে চাইলেন না। মনে মনে ভাবলেন, উপযুক্ত সময় আর সুযোগ বুঝে এই মেয়েকে ভালো করে ধুয়ে দিতে হবে। তিনি শাড়ির আঁচল দিয়ে কপালে জমে ওঠা রাগ আর বিরক্তির ঘামটুকু সজোরে মুছে নিয়ে হনহন করে সেখান থেকে প্রস্থান করলেন।

সালমা বেগম চলে যেতেই লামিয়া নেহার হাত চেপে ধরল। চোখে-মুখে ভয় আর বিস্ময় মিশিয়ে চাপা স্বরে বলল,

“তোর মাথাটা কি সত্যিই খারাপ হয়ে গেছে নেহা? তুই সালমা ফুপিকে সরাসরি এভাবে মুখে মুখে জবাব দিলি? উনি কিন্তু তোকে ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নন!”

নেহা ঝটকা মেরে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল। মুখে তার হালকা এক চিলতে বিজয়ের হাসি, কিন্তু চোখে রয়ে গেছে সেই জেদি দৃষ্টি। সে দৃঢ় গলায় বলল,

“যাঁরা বিনাকারণে গায়ে পড়ে অপমান করতে আসেন, তাঁদের সম্মান কীভাবে বাঁচাতে হয় তা আমার জানা নেই। তাছাড়া উনি তো ঠিকই বুঝেছেন, আমি এই বাড়ির শুধু অতিথি হয়ে থাকতে আসি না।”

“কিন্তু তোর এই দুঃসাহসটা একটু বেশিই হয়ে যাচ্ছে না?” লামিয়া চিন্তিত মুখে চারপাশটা একবার দেখে নিল। বাড়ির কাজের লোকেরা খাবার সাজাতে ব্যস্ত, আর অতিথিরা যার যার মতো গল্পে মশগুল।

“তুই ভুলে যাচ্ছিস, সায়েম ভাই কিন্তু আগের সায়েম ভাই নেই। বিদেশে এত বছর কাটিয়ে এসেছে, পরিবেশ বদলেছে, মানুষটাও তো বদলে যেতে পারে।”

লামিয়ার কথা শেষ হতে না হতেই হঠাৎ পুরো বাড়ির আলোর রোশনাই যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মেইন গেটের দিকে একটা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। চৌধুরী মঞ্জিলের কর্তা আসিফ চৌধুরী নিজে হাসিমুখে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছেন, আর তাঁর ঠিক পাশেই হেঁটে আসছে এক সুঠামদেহী সুদর্শন পুরুষ। ধূসর রঙের ব্লেজার, নিখুঁত ছাঁটের চুল আর আত্মবিশ্বাসী পদচারণায় পুরো ড্রয়িংরুমের আলো যেন একা কেড়েই নিয়েছে সে।

দীর্ঘ কয়েক বছর পর সায়েমকে দেখে নেহার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। এতক্ষণ ধরে সালমা বেগমের কটূ কথা আর লামিয়ার শঙ্কার জবাব দিতে গিয়ে যে জেদটা তার মুখে ছিল, তা এক নিমিষেই জল হয়ে গেল। জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল নেহা। চোখের পলক ফেলতে যেন ভুলে গেছে সে। সায়েম হাসিমুখে অতিথিদের অভিবাদন গ্রহণ করছে, বাবার পাশে দাঁড়িয়ে মৃদু গলায় কথা বলছে। তার প্রতিটা পদক্ষেপ, প্রতিটা মুচকি হাসিতে নেহা যেন আবার নতুন করে আবিষ্কার করল তার বহু বছরের জমানো ভালোবাসাকে। তখনই লামিয়া নেহার কনুইয়ে একটা ধাক্কা দিল,

“এই! কোথায় হারিয়ে গেলি? ওই দ্যাখ, সায়েম ভাই তো এদিকেই তাকাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে!”

নেহার হৃদস্পন্দন দ্রুত হতে শুরু করল। দূর থেকে সায়েমের দৃষ্টি একবার পুরো ড্রয়িংরুমের অতিথিদের ওপর দিয়ে ঘুরে এসে থামল এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা শাড়ি পরা মেয়েটির ওপর। তবে সেই দৃষ্টি এক সেকেন্ডের বেশি নেহার দিকে স্থায়ী হলো না। পর মুহূর্তেই খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে চোখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকাল সায়েম। তা দেখে নেহার দুটি ভ্রু ঈষৎ কুঁচকে গেল। হৃদয়ের গহীনে এক অদৃশ্য মোচড় অনুভব করল সে, ব্যাপারটা তার মোটেই পছন্দ হলো না। তার তীব্র ইচ্ছা ছিল, সায়েম অন্তত আরও কিছুক্ষণ তার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকুক। এত বছর পর ছেলেটা দেশে ফিরেছে! কিন্তু সে কি নেহাকে আদৌ চিনতে পেরেছে? নাকি অচেনা কেউ ভেবে এড়িয়ে গেল? এই একটিমাত্র প্রশ্ন নেহার ভেতরটাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।

তার ইচ্ছে করছিল এখনই সব লোকলজ্জা ভুলে সায়েমের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, নিজের উপস্থিতি জানান দেয়। কিন্তু মনের অজান্তেই এক অজানা সংকোচে সাহসে কুলোল না।

হঠাৎ নেহা খেয়াল করল, কোলাহল এড়িয়ে সায়েম ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। কেন সে ভিড় ঠেলে চলে যাচ্ছে, তা বুঝতে নেহার এক মুহূর্তও দেরি হলো না। সেই ছোটবেলা থেকেই তো সায়েম কোলাহল একদম পছন্দ করে না, নির্জনতা আর একাকিত্বই তার সবসময় প্রিয়।

সময় গড়িয়ে সন্ধ্যা ছুঁইছুঁই। ধীরে ধীরে চৌধুরী বাড়ি থেকে আমন্ত্রিত অতিথিরা একে একে বিদায় নিচ্ছে। লামিয়াও নেহার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের বাড়ির পথ ধরেছে। নেহা যখন ড্রয়িংরুমের একপাশে দাঁড়িয়ে আনমনে কী যেন ভাবছিল, হঠাৎ পিছন থেকে রোকেয়া বেগম তাকে ডাক দিলেন। রোকেয়া বেগম হলেন আসিফ চৌধুরীর স্ত্রী, অত্যন্ত দয়ালু ও স্নেহময়ী এক নারী। নেহা তাঁর কাছে এগিয়ে এসে মুখে এক চিলতে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,

“বলো, মিষ্টি মা?”

রোকেয়া বেগম পরম মমতায় নেহার মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন,

“খেয়েছিস তুই?”

“হ্যাঁ, মিষ্টি মা, খেয়েছি।”

রোকেয়া বেগম হালকা হেসে বললেন,

“আচ্ছা শোন, এখন একটু কষ্ট করে ওপরে গিয়ে তোর সায়েম ভাইকে ডেকে নিয়ে আয় তো। সবাইকে তো বিদায় দেওয়া শেষ, ওকে বল এখন অন্তত নিচে এসে খেয়ে নিতে।”

রোকেয়া বেগমের এই প্রস্তাবে মুহূর্তের মধ্যেই নেহার থমথমে চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল! সায়েমকে এত কাছ থেকে দেখার এমন সোনালী সুযোগ যে এত সহজে চলে আসবে, তা সে কল্পনাও করেনি। নেহা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ‘হ্যাঁ’ সূচক মাথা নেড়ে একপ্রকার দৌড়ে রওনা হলো সায়েমের ঘরের উদ্দেশ্যে। তার এই চঞ্চলতার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলেন রোকেয়া বেগম। মনে মনে ভাবলেন—এই মেয়েটা সায়েমের নাম শুনলেই কেমন যেন ছটফট করে ওঠে!’

ওপরে এসেই উত্তেজনার বশে কোনো প্রকার দরজায় নক না করেই সোজা সায়েমের ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল নেহা। সায়েম তখন কেবলই ওয়াশরুম থেকে বের হয়েছে। আচমকা ঘরে কাউকে ঢুকে পড়তে দেখে সায়েমের উচ্ছ্বসিত মুখটা মুহূর্তেই বিরক্তিতে ভরে গেল। তবে পরক্ষণেই নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল,

“নেহা না?”

নেহা একগাল হেসে আবেগে আপ্লুত হয়ে বলল,

“হ্যাঁ! সায়েম ভাই, আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন?”

সায়েম হাতের টাওয়েলটা একপাশে রেখে হালকা কণ্ঠে বলল,

“চিনবো না কেন? কত বড় হয়ে গেছিস তুই!”

কথাটা শুনে নেহা মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বিড়বিড় করে স্বগতোক্তির মতো বলল,

“শুধু আমার বড় হওয়াটাই দেখলেন সায়েম ভাই? আর এতদিন ধরে যে আপনার একটুখানি ভালোবাসা পাওয়ার দহনে তিলে তিলে পুড়ছি, সেটা একবারও চোখে পড়ল না?”

সায়েম ঠিকমতো শুনতে না পেয়ে শুধাল,

“কিছু বললি?”

নেহা চমকে উঠে সামলে নিয়ে বলল,

“ন-না, কিছু না! মিষ্টি মা আপনাকে নিচে খেতে ডেকেছেন।”

“আচ্ছা, তুই যা। আমি আসছি।”

নেহার ভীষণ ইচ্ছা করছিল ঘরের উষ্ণতায় সায়েমের পাশে আর কিছুটা সময় কাটাতে, কত শত কথা জমে আছে বুকে! কিন্তু সায়েমের সংক্ষিপ্ত আর দূরত্বের উত্তরে তা আর সম্ভব হলো না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভারাক্রান্ত মনে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে হলো তাকে। নেহা পা বাড়াতেই পিছন থেকে সায়েম বিকট শব্দে সজোরে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিল।

সেই বন্ধ দরজার দিকে থমকে দাঁড়িয়ে একবার তাকাল নেহা। অবহেলার এই ধাক্কায় তার বুকটা কেমন যেন ধক করে উঠল, চোখ দুটো ভিজে আসতে চাইল। তবে সেই কষ্টকে বেশি প্রাধান্য না দিয়ে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে সে একপ্রকার দৌড়েই নিচে নেমে এলো। নিচে এসে রোকেয়া বেগমের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বুকভরা আক্ষেপ আর একরাশ অনুভূতির বোঝা নিয়ে নেহাও নিজের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

.

খাবার টেবিলে আজ যেন এক রাজকীয় আয়োজন। বাহারি সব সুস্বাদু খাবারের মৌ মৌ গন্ধে চারপাশ ম ম করছে। রোকেয়া বেগম নিজ হাতে পরমানন্দে আলাদা করে রান্না করেছেন ছেলে সায়েমের পছন্দের সব খাবার। এতদিন পর ছেলে বিদেশ থেকে ঘরে ফিরেছে, মায়ের মনের আনন্দ আর ধরে না!

ডাইনিং টেবিলে একে একে সবাই এসে আসন গ্রহণ করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওপর থেকে ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এলো সায়েম। পরনে ক্যাজুয়াল পোশাক, চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ হলেও ঘরের আবহে প্রশান্তির ছোঁয়া। সে সোজা গিয়ে বাবা আসিফ চৌধুরীর পাশের খালি চেয়ারটা দখল করে বসল। ছেলেকে পাশে বসতে দেখে আসিফ চৌধুরীর মুখে ফুটে উঠল মৃদু, স্নেহমাখা হাসি। সায়েমও বাবার দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে সেই হাসির প্রত্যুত্তর দিল। পরিবেশটা বেশ মনোরমই ছিল, কিন্তু হঠাৎই আসিফ চৌধুরী কী যেন এক গভীর ভাবনায় ডুবে গেলেন। তারপর সায়েমের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কিন্তু স্নিগ্ধ কণ্ঠে বললেন,

"সায়েম, বাবা... আজ তিন দিন হলো তুমি দেশে ফিরেছ। এবার একটু বাবার বিজনেসে মন দাও। শেষমেশ তো এই পুরো সাম্রাজ্যটা তোমাকেই সামলাতে হবে।"

বাবার এই ব্যবসায়িক আলাপ সায়েমের কোনোকালেই পছন্দ ছিল না। কথাগুলো শুনতেই ভেতরে ভেতরে কিছুটা বিরক্তি জেগে উঠল তার। তবে নিজের অনুভূতি চেপে রেখে যথেষ্ট সংযত কণ্ঠে জবাব দিল,

"বাবা, আমি এখনও তোমার এত বড় বিজনেস সামলানোর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত নই। আমাকে আর কিছুদিন অন্তত সময় দাও।"

আসিফ চৌধুরী একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

"আমার তো বয়স হয়ে যাচ্ছে। আর কত সময় নেবে তুমি? এত বছর বিদেশে কাটিয়ে এলে, আমি কি তোমাকে কোনো কিছুতে বাধা দিয়েছি? এবার অন্তত বাবার কথাটা শোনো।"

সায়েম কী বলবে ভেবে পেল না। তার বয়স যখন তেইশের কাছাকাছি, তখনই সে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছিল বিদেশে। বিদেশে যাওয়ার আগেও আসিফ চৌধুরী নানাভাবে চেষ্টা করেছিলেন সায়েমকে ব্যবসায় নামাতে, কিন্তু সায়েমের অনীহার কারণে তা সম্ভব হয়নি। কিন্তু বিদেশ থেকে ফেরার পর প্রথম সুযোগেই বাবার সেই একই কথার পুনরাবৃত্তি শুনে সায়েম ভেতরে ভেতরে উপলব্ধি করল—এবার হয়তো সত্যিই রক্ষা নেই, শেষ পর্যন্ত বাবার এই বিশাল সাম্রাজ্যের ভার তাকে নিজের কাঁধে তুলে নিতেই হবে।

বাবা-ছেলের এই গম্ভীর আলোচনার মাঝখানে হঠাৎ ফোরন কেটে উঠলেন সালমা বেগম। বেশ চড়া স্বরে বলে উঠলেন,

"সায়েম বাবা, আর দেরি কোরো না। নিজের জিনিস নিজের হাতে যত তাড়াতাড়ি তুলে নেবে, ততই মঙ্গল!"

ফুপির এমন আগ বাড়ানো মন্তব্য শুনে সায়েমের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক ফিচেল, ব্যঙ্গাত্মক হাসি। কিন্তু সালমা বেগম সেখানেই থামলেন না। মুখের বাঁধ ভেঙে হঠাৎই বলে ফেললেন এক চরম অযাচিত কথা,

"তা সায়েম, বিদেশে এতদিন থাকলে... কোনো মেম সাহেবের পাল্লায় পড়ে যাওনি তো আবার?"

কথাটা শোনামাত্রই খাবার টেবিলের পরিবেশ মুহূর্তের মধ্যে থমথমে হয়ে গেল। সালমা বেগমের এমন অসৌজন্যমূলক কথা কারোরই ভালো লাগল না। রোকেয়া বেগম অসন্তোষ প্রকাশ করে কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকালেন। সায়েমের বিরক্তি এবার চরমে পৌঁছাল। সালমা বেগমের পাশে বসেই খাবার খাচ্ছিল তার মেয়ে মিথিলা। মায়ের এমন রুচিহীন কথাবার্তায় সে চরম বিব্রত বোধ করে মাথা নিচু করে রইল। সায়েম নিজেকে সামলে নিয়ে অত্যন্ত শান্ত অথচ দৃপ্ত কণ্ঠে ফুপিকে উদ্দেশ্য করে জবাব দিল,

"বিদেশের কোনো মেম সাহেবের পাল্লায় পড়ে যাওয়ার মতো ছেলে আরফান চৌধুরী সায়েম নয়, ফুপি!"

ছেলের এমন আত্মবিশ্বাসী ও যোগ্য উত্তর শুনে রোকেয়া বেগমের চোখেমুখে ফুটে উঠল পরম তৃপ্তির হাসি। অন্যদিকে, সায়েমের স্পষ্ট জবাবে সালমা বেগম একদম চুপসে গেলেন এবং অপমানে মুখ নিচু করে নিলেন। কয়েক মুহূর্ত আগেই যেখানে কথাকাটাকাটি চলছিল, সেখানে এক নিমিষে নেমে এলো এক নিছক, ভারী নীরবতা।

বিশাল এই চৌধুরী মঞ্জিলে সদস্য বলতে মাত্র এই পাঁচজন। আসিফ চৌধুরী, তাঁর স্ত্রী রোকেয়া বেগম এবং তাঁদের একমাত্র সন্তান আরফান চৌধুরী সায়েম। আর বাকি দুজন—সালমা বেগম ও তাঁর মেয়ে মিথিলা—তারা যেন অনেকটা উড়ে এসে জুড়ে বসার মতোই এই বাড়িতে বসবাস করছে।

অল্প বয়সেই সালমা বেগমের সংসার ভেঙে গিয়েছিল। বোনকে অসহায় অবস্থায় দেখে আসিফ চৌধুরী নিজের বোনকে আশ্রয় দিতে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। সালমা বেগম তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। সেই গর্ভেই জন্ম হয় মিথিলার। সালমা বেগমের আরও একটি পুত্রসন্তান রয়েছে, তবে সে বেশিরভাগ সময় তার বাবার কাছেই থাকে। মেয়েকে নিয়ে সালমা বেগম ভাইয়ের রাজপ্রাসাদসম বাড়িতে নিশ্চিন্তে থাকেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর স্বভাবই এমন—অনর্থক ও উল্টাপাল্টা কথা বলে অহেতুক সবাইকে বিব্রত করে ফেলা যেন তাঁর দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে!

খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সায়েম আর এক মুহূর্তও নিচে রইল না। সোজা নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। সায়েমের ঘরটা বিশাল এবং আলিশান। এ বাড়ির সাধারণ দুই-তিনটা ঘর মিলেও যতটুকু জায়গা হবে, তার এই একটি ঘর তার চেয়েও বেশি জায়গা দখল করে আছে। এতদিন সে বিদেশে থাকলেও ঘরের পরিবেশ দেখলে তা বোঝার কোনো উপায় নেই। ঘরটা একেবারেই পরিপাটি এবং পরিচ্ছন্ন। সায়েম দেশে ছিল না ঠিকই, কিন্তু রোকেয়া বেগম নিয়ম করে প্রতি দুদিন পরপর ছেলের পুরো ঘর ঝাড়পোঁছ করাতেন এবং সাজিয়ে রাখতেন। মায়ের এই সূক্ষ্ম ভালোবাসা আর যত্নের ছোঁয়া ঘরের প্রতিটি কোণায় স্পষ্ট।

ঘরে ঢুকে সায়েম সোজা চলে গেল বারান্দায়। বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই রাতের হিমেল হাওয়া তার মুখ ছুঁয়ে গেল। খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্ত হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সে। সারাদিনের ধকল আর নিচের অস্বস্তিকর আলোচনার পর এই নিস্তব্ধতাটুকু তার ভীষণ প্রয়োজন ছিল। হঠাৎই নীরবতা ভেঙে তার পকেটে থাকা ফোনটা 'টুং' শব্দে বেজে উঠল। সায়েম পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। দেখল ফেসবুকে একটি নতুন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসেছে। অ্যাকাউন্টটি আনলক করা, আর তার প্রোফাইল পিকচারে স্পষ্ট একটি ফুলের ছবি ভেসে উঠছে। সে ছবিটার দিকে খটকা নিয়ে তাকিয়ে দেখার আগেই, কয়েক সেকেন্ডের মাথায় সেই একই আইডি থেকে পরপর দুটি মেসেজ ভেসে উঠল—

"হ্যালো হ্যান্ডসাম।"

"কী করা হচ্ছে?"

সায়েম নোটিফিকেশন বার থেকেই মেসেজ দুটো চোখ বুলিয়ে নিল। মেসেজ দুটি পড়ার সাথে সাথেই তার বিরক্তিতে চোখ-মুখ কুঁচকে গেল। মেজাজটা এক মুহূর্তে আবার বিগড়ে গেল তার। সে আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে, আইডিতে ঢুকে সোজা প্রোফাইলটিকে ব্লক করে দিল। ফোনটা পকেটে পুরে নিয়ে, চরম অসন্তোষ আর বিরক্তি নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলে উঠল,

"নেহা...!"

চলবে…..

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন