চৌধুরী বাড়ির সুবিশাল রান্নাঘরে দুপুরের রান্নার তুমুল তোড়জোড় চলছে। হাঁড়ি-পাতিলের ঠুং-ঠাং শব্দ আর মসলার সুবাসে চারপাশটা বেশ গমগম করছে। রোকেয়া বেগম অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা তদারকি করছিলেন। তাঁর পাশে বাধ্যগত হাতে সাহায্য করে যাচ্ছে বাড়ির বহু বছরের পুরনো কাজের লোক রহিম মিয়া। সবজি কাটা থেকে শুরু করে মসলা বাটা—রহিম মিয়ার হাতের কাজ যেমন দ্রুত, তেমনই নিখুঁত।
অন্যদিকে বাড়ির ড্রয়িং রুমে রাজত্ব করছিল এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। রাজকীয় ঝাড়বাতি আর দামি সোফায় সাজানো ঘরের এক কোণে বসে অলস ভঙ্গিতে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিচ্ছিলেন সালমা বেগম ও মিথিলা। অসময়ে চায়ের এমন আসর বসানো কেবল এই মা-মেয়ের পক্ষেই সম্ভব। চড়া রোদ আর শহরের প্যাচপ্যাচে গরমের মধ্যে কেনাকাটা শেষ করে তারা কিছুক্ষণ আগেই ঘরে ফিরেছেন। তাই ড্রয়িং রুমের সেন্ট্রাল এসির কনকনে বাতাসের আরামে বসে ধোঁয়া ওঠা স্পেশাল চায়ের স্বাদ নিতে নিতে নিজেদের ক্লান্তি দূর করছিলেন।
ঠিক তখনই মার্বেলের রাজকীয় সিঁড়ি বেয়ে ড্রয়িং রুমের দিকে নেমে এলো সায়েম। ধীর অথচ দৃঢ় তার পদচারণা। কুচকুচে কালো রঙের ফিটিং শার্ট আর ছাই রঙের শার্প ফরমাল প্যান্টে তাকে অসম্ভব সুদর্শন দেখাচ্ছে। ফর্সা ত্বক, আনুমানিক ছয় ফুট লম্বা সুঠাম সায়েমের তীক্ষ্ণ রাজকীয় শারীরিক গঠন যে কারও নজর মুহূর্তের মধ্যে কেড়ে নিতে বাধ্য। ঢাকার বিশিষ্ট ও প্রভাবশালী শিল্পপতি আসিফ চৌধুরীর একমাত্র সন্তান সে। তার হাঁটাচলা থেকে শুরু করে কথা বলার ভঙ্গিতেও যেন বংশগত এক আভিজাত্য স্পষ্ট ফুটে ওঠে।
ফুফু আর ফুফাতো বোনকে এভাবে আড্ডার মেজাজে বসে থাকতে দেখে সায়েমের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে ধীরপায়ে তাদের দিকে এগিয়ে গেল। সালমা বেগম সায়েমকে দেখে রীতিমতো উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন,
"আরে সায়েম বাবা, পাশে এসে বসো।"
সায়েম আলতো হেসে ফুফুর পাশে বসে সোফায় আরাম করে হেলান দিল। তারপর স্বভাবসুলভ নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
"ফুফু, এতক্ষণ কোথায় ছিলে তোমরা? বাড়িতে তো দেখলাম না।”
সায়েমের প্রশ্নের জবাবে সালমা বেগম নিজের পাশে চুপচাপ বসে থাকা মিথিলার দিকে একঝলক তাকিয়ে ঈষৎ অনুযোগের সুরে বললেন,
"আর বলো না বাবা! মিথিলা আজ সকাল সকাল মার্কেটে যাওয়ার জন্য বায়না ধরে বসল। আমাকে কি আর শান্তিতে থাকতে দেয়? বাধ্য হয়ে ওর সাথেই ছুটতে হলো।"
মায়ের মুখে এই বানিয়ে বলা কথা শুনে মিথিলার চোখ জোড়া এক মুহূর্তের জন্য কপালে উঠল। সে মনে মনে প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে ভাবল,'যা বাবা আমি আবার কখন বায়না ধরলাম! মা-ই তো সকালে ঘুম থেকে টেনে তুলে জোর করে নিয়ে গেল!' কিন্তু মুখে সে টু শব্দটিও করল না, শুধু গাল ফুলিয়ে চায়ের পেয়ালায় চামচ নাড়তে শুরু করে। সায়েম হালকা টিপ্পনি কাটার ভঙ্গিতে মিথিলার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে শুধাল,
"কী রে মিথিলা, এত সকালে শপিংয়ে গিয়ে কী কী কেনাকাটা করলি?"
মিথিলা কিছুটা ইতস্তত করে তোতলাতে তোতলাতে জবাব দিল,
"ইয়ে... মানে ভাইয়া, তেমন কিছু না। একটা পারফিউম আর দুটো নরমাল টি-শার্ট এনেছি।"
সায়েম এবার বেশ মজার গলায় বলল,
"বলিস কী! এত কেনাকাটা করলি, আর তোর ভাইয়ার জন্য কিছুই আনলি না? খালি হাতে ফিরলি?"
মিথিলা নিজের চুলে হাত বুলিয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল,
"আমরা তো লেডিস শপে গিয়েছিলাম ভাইয়া... ছেলেদের কিছু ছিল না তো।"
সায়েম বেশ শব্দ করে হেসে উঠল,
"আরেহ সমস্যা নেই, আমি তো একটু মজা করছিলাম।"
তবে পরক্ষণেই সায়েম কিছুটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে ঘাড় ঘুরিয়ে সালমা বেগমের দিকে তাকায়। তার চোখে সামান্য কৌতূহল ফুটে উঠল,
"ফুফু, এত সকালে শপিংয়ে যাওয়ার রহস্যটা কী? মানুষ তো এত সকালে মার্কেটের দিকে পা-ও বাড়ায় না।"
সালমা বেগম চায়ের শেষ কাপে একটা শান্ত চুমুক দিয়ে বেশ তৃপ্তির হাসি হেসে বললেন,
“সকাল সকাল মার্কেট করার মজাই আলাদা! রাস্তায় জ্যাম থাকে না, দোকানে ভিড়-ভাট্টা থাকে না। একদম শান্তিতে, ধীরেসুস্থে জিনিসপত্র বেছে কেনাকাটা করা যায়।"
ফুফুর এমন যুক্তি শুনে সায়েম না হেসে পারল না। সে মাথা নেড়ে ফুফুর কথায় সায় দিল। তারপর কবজির ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ কী যেন মনে পড়তেই দাঁড়িয়ে পড়ল,
"ঠিক বলেছ ফুফু। আচ্ছা, আমার উপরে একটু দরকারি কাজ আছে, আমি ঘরে যাচ্ছি।"
কথাটি শেষ করেই সায়েম নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ায়।
.
সময় গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে শহরের বুকে। বাইরে মেঘের আনাগোনা। সায়েম নিজের ঘরের আরামদায়ক সোফায় বসে একটা গল্পের বইয়ে মগ্ন ছিল। বরাবরই সে একটু রোমান্টিক বই পড়তে ভালোবাসে। বইয়ের পাতায় ডুবে থাকার মাঝেই হঠাৎ তার ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠে। স্ক্রিনে একটা অচেনা নাম্বার দেখে সায়েম ভাবে, এই অসময়ে কে ফোন করল? কলটা রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে এক ঝাঁক অভিযোগের সুর ভেসে এলো।
"কিরে সায়েম! শুনলাম তুই নাকি তিন দিন হয়েছে দেশে ফিরেছিস, কিন্তু আমাদের একবার জানানোর প্রয়োজনও মনে করলি না? এই কয়েক বছরে একবারে পর করে দিলি? তার ওপর এটাও শুনলাম যে আঙ্কেল নাকি তোর জন্য কালকে তোদের বাড়িতে এত বড়সড় একটা অনুষ্ঠান রেখেছিল, সেখানেও আমাদের আসতে বললি না! ছি বন্ধু ছি, তুই এতটা স্বার্থপর হয়ে গেলি কীভাবে?"
একটানা কথাগুলো বলে কিছুটা হাঁপাতে হাঁপাতে থামল সায়েমের ছোটবেলার বন্ধু আয়ান। বহু বছর পর দেশে ফিরেও সায়েমের এই চুপচাপ থাকাটা আয়ানের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন। তাই আয়ানের এমন অগ্নিশর্মা রূপ আর রাগ করাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। ওপাশের তীব্র আক্ষেপের জবাবে সায়েম অবশ্য বিন্দুমাত্র রেগে গেল না। বন্ধুদের এই চেনা রাগ ভাঙানোর ধরণটাও তার বেশ ভালোই জানা আছে। সে কথার মাঝেই ফিচেল একটা হাসি দিয়ে বলল,
"দোস্ত, তুই আগে এক গ্লাস পানি খা। এভাবে না থেমে কথা বলতে গিয়ে শ্বাস আটকে মরে যাবি তো!"
আয়ানের রাগ তাতে কমলো তো নাই-ই, বরং দ্বিগুণ হয়ে উঠলো। গলায় ঝাঁজ বজায় রেখে উত্তর দিল,
"আমি মরে যাই তাতে তোর কী রে? আমাদের নিয়ে তোর কোনো চিন্তাভাবনা আছে নাকি আদৌ?"
এবার সায়েমের ভেতরের কৌতুক ভাবটা কিছুটা মিটে এলো। কণ্ঠে কিছুটা অপরাধবোধ আর আন্তরিকতার সুর মিশিয়ে সে বলল,
“বিশ্বাস কর দোস্ত, বাবা যে বাড়িতে এত বড় একটা আয়োজন করবে, এটা আমার একটুও জানা ছিল না। হুট করে এসে বলল রেডি হয়ে নিচে নামতে। আমি নিচে গিয়ে দেখি মানুষের মেলা, একদম একঝাঁক অচেনা-জানা মানুষে বাড়ি ভর্তি! তোদেরকে যে একটা ফোন করে বলব, সেই সুযোগটাই আমি পাইনি।
অবশেষে আয়ান সায়েমের আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারল। তার মনে যে একটু ভুল বোঝাবুঝি জমতে শুরু করেছিল, তা এক মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। সে অনুধাবন করতে পারল, সায়েম এমন ছেলে একেবারেই নয় যে ইচ্ছে করে তার প্রিয় বন্ধুদের এড়িয়ে যাবে। নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো বিশেষ কারণ ছিল, যা সায়েম আগে থেকে গুছিয়ে উঠতে পারেনি। সায়েমের মন ও বন্ধুদের প্রতি তার ভালোবাসার ওপর আয়ানের এই বিশ্বাসটুকুই ছিল সবচেয়ে সত্য।
“আচ্ছা, সব কথার এক কথা, আগে এটা বল— তুই নাম্বার চেঞ্জ করেছিস কেন?"
প্রশ্নটা শুনে আয়ান মুহূর্তের জন্য একটু থতমত খেয়ে গেল। তার রাগ এক লহমায় যেন শিথিল হয়ে এলো। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
"সামনাসামনি দেখা কর, সবকিছু তখন বলব।
“আচ্ছা কোথায় আসবো বল।”
সায়েমের এহেন কথায় আয়ানের মুখে আবারও রাগ ফুটে উঠল। হালকা খোঁচা মেরে বলল,
"কেন? আমরা সবসময় কোথায় দেখা করি তুই জানিস না?"
"আচ্ছা, আমি বিশ মিনিটের মধ্যে ওখানে আসছি, তুই সবাইকে আসতে বলে দিস।"
কথাটা বলেই আর বাড়তি কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে সায়েম ফোনটা কেটে দিল। হাতের মোবাইল ফোনটা বিছানার ওপর রেখে সে আলমারির ভারী পাল্লা দুটি খুলে দাঁড়াল। আলমারির ড্রয়ার ঘেঁটে বের করে নিল একটি অফ-হোয়াইট রঙের সুতি টি-শার্ট আর গাঢ় কালো রঙের মানানসই জিন্স প্যান্ট। পোশাক জোড়া দ্রুত গায়ে গলিয়ে নিয়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। নিজের হালকা চাপদাড়িতে আলতো হাত বুলিয়ে একটু নেড়েচেড়ে দেখল, তারপর ড্রেসিং টেবিল থেকে তার প্রিয় 'ডার্ক স্মেল' পারফিউমের বোতলটা তুলে নিয়ে স্প্রে করল। এক নিমিষেই চমৎকার, পুরুষালী আর সতেজ এক সুবাসে আচ্ছন্ন হয়ে গেল পুরো ঘরটা।
প্রস্তুতি শেষ করে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে চটজলদি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো সে। ছেলের পায়ের শব্দ পেয়ে নিজের ঘর থেকে তড়িঘড়ি বেরিয়ে এলেন রোকেয়া বেগম। সায়েমকে একেবারে বাইরে যাওয়ার সাজে সুসজ্জিত দেখে তিনি কিছুটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন,
"এই সন্ধ্যাবেলায় কোথায় যাচ্ছিস বাবা? বাইরে তো মেঘের ডাক শুনছি, চারপাশ কেমন থমথমে হয়ে আসছে।"
সায়েম মায়ের পাশে গিয়ে কাঁধে হাত রাখল। মুখে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে বলল,
"বন্ধুরা সবাই আসছে, মা। আয়ান ফোন করে তো রাগারাগি করছিল! কত দিন ধরে ওদের কারো সাথে দেখা হয় না। তাই ভাবলাম একটু দেখা করে আসি।
রোকেয়া বেগম পরম স্নেহে ছেলের কপালে হাত ছুঁইয়ে দোয়া করার ভঙ্গিতে বললেন,
"আচ্ছা যা বাবা, তবে তাড়াতাড়ি চলে আসিস, বৃষ্টি আসবে মনে হচ্ছে।”
মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সায়েম সোজা গ্যারেজে গেল। নিজের প্রিয় বাইকটা বের করে স্টার্ট দিতেই চারপাশের আবহাওয়া যেন আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। আকাশের মুখ মারাত্মক ভার হয়ে এসেছে, মেঘের ঘনঘটা চারপাশটা প্রায় অন্ধকার করে তুলেছে। মনে হচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রলয়ঙ্করী এক ঝড় আছড়ে পড়বে পুরো ঢাকা শহরের বুকে।
ধুলো উড়িয়ে চলা মাতাল ঝড়ো হাওয়ার মাঝেই রফিক মামার টিনের চালের মোড়ের দোকানে সায়েমের বন্ধু মহলের চিরাচরিত আড্ডা জমে উঠল। রাইসা, আবিদ, রিয়ান আর আয়ান—সবাই সায়েমকে মাঝখানে বসিয়ে যেন কয়েক বছরের জমানো সব কথা, স্মৃতি আর অভিজ্ঞতা এক নিমেষেই উগরে দিতে চাইছে। গরম চা আর আড্ডার মশকরায় চারপাশটা জমজমাট হয়ে উঠেছে। এমন সময় হঠাৎ রিয়ান সায়েমের দিকে বাঁকা চোখে তাকাল। কনুই দিয়ে হালকা একটা গুঁতো মেরে মিটিমিটি হেসে জিজ্ঞেস করল,
"তা সায়েম সাহেব, ইউকে-তে গিয়ে কোনো মেমসাহেবের মন-টন জয় করতে পারলি, নাকি সেই আগের মতোই আজও সিঙ্গেল হয়েই দিন কাটাচ্ছিস?"
রিয়ানের এমন সরাসরি আর রসাত্মক প্রশ্নে সায়েম ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে কিছুটা উদাসীনভাবে হাসল। তারপর দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে কাব্যিক গলায় বলল,
"এখনো কোনো নারী আমার মন কাড়তে পারেনি। যতোদিন না কেউ এই আমাকে পুরোপুরি তার মায়ায় ফেলতে পারছে, তার আগে এই হৃদয়ে অন্য কারো বিন্দুমাত্র প্রবেশাধিকার নেই।"
সায়েমের এমন মারপ্যাঁচহীন অথচ গাম্ভীর্যপূর্ণ কথা শুনে সবাই একসাথে হো হো করে হেসে উঠল। আয়ান ওর পিঠ সজোরে চাপড়ে দিয়ে বলল,
"বাদ দে তো ভাই! এ জীবনে তোর মনে যে কেউ জায়গা করতে পারবে, তা আমার অন্তত মনে হয় না।"
ওদের হাসাহাসির মাঝেই সায়েমের হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল। সে হাসির রেশ টেনেই আয়ানের দিকে তাকিয়ে একটু গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
"কিরে নাম্বার চেন্জ করেছিস কেন বললি না তো।”
আয়ান ভেবেছিল সায়েম হয়তোবা আর এই কথাটা জিজ্ঞেস করবে না। তবে সায়েম, আয়ানকে ভুল প্রমাণিত করে দিল। আয়ানের মুখের হাসির রেখা নিমেষেই মিলিয়ে গেল। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে কিছুটা বিরক্তি আর অস্বস্তি নিয়ে গড়গড় করে বলল,
"আরে বলিস না! যে মেয়েটার সাথে রিলেশন করেছিলাম, তার সাথে ব্রেকআপ করে ফেলেছি। কিন্তু ব্রেকআপের পরও মেয়েটা থামছিল না। আমাকে বারবার ফোন দিয়ে ডিস্টার্ব করতো, প্যানপ্যান করতো। ব্লক করে দিলেও নতুন নতুন নাম্বার দিয়ে কল দিত। তাই আর না পেরে ওই সিম বাদ দিয়ে নতুন সিম নিয়ে নিলাম।"
আয়ানের এত সহজে বলা কথাটা শুনে সায়েমের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। তার ভেতরে এক ধরণের ক্ষোভ জমে উঠল। সায়েম আয়ানের দিকে একটু চেপে বসে তীব্র অসন্তোষের সুরে বলল,
"সামান্য কারণে সিম চেন্জ করে ফেললি? আর তা ছাড়া তুই তো ভালো করেই জানতি মেয়েটা তোকে কতটা ভালোবাসতো! একটা মানুষ ভালোবাসলে একটু বোঝাপড়ার চেষ্টা করতে হয়, তুই এক ধাক্কায় তাকে এভাবে পর করে দিলি?"
আয়ান বিরক্ত হয়ে হাত নেড়ে উত্তর দিল,
"আরে ধুর! তুই দূর থেকে কিছু না জেনে জ্ঞান দিস না তো! মেয়েটা একদম ভালো ছিল না। সারাক্ষণ সন্দেহ আর অহেতুক ক্যাচাল করত। ভালো ছিল না বলেই তো সম্পর্কের এই হাল হয়েছে!"
ওদের এই তর্কাতর্কির মাঝেই হঠাৎ করে আকাশের বুক চিরে এক তীব্র চকমকে বিদ্যুৎ চমকে উঠল! আর তার ঠিক পরপরই বিকট শব্দে কড়কড় করে মেঘ গর্জে উঠে শুরু হলো ঝড়ের আসল তাণ্ডব। চারদিকে সাঁ সাঁ করে মারাত্মক বেগে ঝড়ো হাওয়া বইতে লাগল। রফিক মামার দোকানের টিনের চালটা বাতাসে বিকট শব্দ করে কাঁপছে, যেন এখনই উড়ে চলে যাবে বহুদূরে। রাস্তাঘাটের ধুলোবালি আর শুকনো পাতা উড়ে এসে চারপাশ একাকার করে তুলছে। ঝড়ের এমন ভয়ঙ্কর রূপ দেখে সায়েম ও তার বন্ধুরা আর এক মুহূর্তও দোকানে বসে থাকা নিরাপদ মনে করল না। সায়েম সঙ্গে সঙ্গে রিয়ানের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,
"রিয়ান! চারপাশের অবস্থা সুবিধার না, তুই রাইসাকে নিয়ে জলদি যা! ওকে সাবধানে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আয়। আমি আয়ান আর আবিদকে নিয়ে রওনা দিচ্ছি।"
সায়েমের তাড়া পেয়ে রিয়ান আর সময় নষ্ট করল না। রাইসাকে পেছনে বসিয়ে ঝড়ের তোড়ের মাঝেই বাইক স্টার্ট দিয়ে চলে গেল। আয়ান আর আবিদও দ্রুত নিজেদের বাইকের দিকে এগিয়ে গেল। সায়েমও যখন নিজের বাইকের চাবি বের করে স্টার্ট দিতে যাবে, ঠিক তখনই তার দৃষ্টি আটকে গেল রাস্তার ঠিক উল্টো দিকে থাকা একটা বিশাল নারকেল গাছের নিচে।
ঝড়ের এই তীব্র তাণ্ডব আর ঝাপটা থেকে বাঁচতে সেখানে আশ্রয় নিয়েছে এক অপরিচিতা রমণী। ঠিক তার মাথার ওপর সোডিয়ামের একটা ল্যাম্পপোস্ট ছিল। সেই হলদেটে আলো সরাসরি এসে পড়েছে মেয়েটির ওপর, যার ফলে ঝড়ের কালো অন্ধকারের মাঝেও তার রূপ-লাবণ্য ও মুখমণ্ডল অতি স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠছে। পরনে তার গাঢ় নীল রঙের চমৎকার একটা হাফ সিল্কের শাড়ি। বাতাস আর বৃষ্টির ছাঁটে মেয়েটির মায়াবী শরীরটা যেন প্রকৃতির সাথে একাকার হয়ে যাচ্ছে। তার গায়ের ফর্সা রঙ, চোখে এক অদ্ভুত ব্যাকুলতা ও মায়াবী কোমলতা। উচ্চতা খুব বেশি হলে পাঁচফুট দুই কিংবা তিন ইঞ্চি হবে।
এক দৃষ্টিতে সেই নীল শাড়ি পরা মেয়েটির দিকে কিছুক্ষণ অপলক নয়নে তাকিয়ে রইল সায়েম। তার বুকের ভেতরের স্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য একেবারে থমকে গেল। গত কয়েক বছরে বিদেশের কত রূপসী, আভিজাত্যময় নারী দেখেছে সে, কিন্তু কারো রূপ তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। অথচ আজ এই ঝড়ের রাতে অচেনা মেয়েটার ভেজা মুখের অদ্ভুত মায়া সায়েমের বুকের ভেতর তোলপাড় সৃষ্টি করল। সে নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,
"এটা কি সাধারণ কোনো নারী... নাকি রূপকথার কোনো পরী?"
সায়েমের আচমকা এভাবে দাঁড়িয়ে পড়া আর বিড়বিড় করাটা পাশে থাকা আয়ানের নজর এড়াতে পারল না। আয়ান কাছে এসে সায়েমের কাঁধ ধরে জোরে ঝাঁকি দিয়ে বলল,
"কিরে! বাড়ি যাবি না? বৃষ্টি তো নেমে গেল, আর তুই এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজছিস!"
সায়েমের যেন এতক্ষণে বাস্তব দুনিয়ায় ঘোর কাটল। সে ঝাপসা চোখে রাস্তার ওপাশের মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল,
"উমম... হ্যাঁ যাবো। তবে তার আগে চল একটু দেখে আসি, মেয়েটা এই ঝড়ের মাঝে একা একা ওখানে দাঁড়িয়ে কী করছে। কোনো বিপদে পড়ল কি না কে জানে!" কথাটি বলেই সায়েম লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গেল রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই রহস্যময়ী রমণীর দিকে।
সায়েম মেয়েটির কাছে গিয়ে কিছুটা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াল, যাতে মেয়েটি ভয় না পায় বা অস্বস্তিতে না পড়ে। তারপর কণ্ঠে সবটুকু ভদ্রতা ঢেলে নরম গলায় বলল,
"এই মেয়ে, এত রাতে এই দুর্যোগপূর্ণ ঝড়ের মাঝে একা এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? চারদিকের পরিস্থিতি কিন্তু ভালো না।"
হঠাৎ সামনে এতগুলো লম্বা-চওড়া অচেনা ছেলেকে এসে দাঁড়াতে দেখে মেয়েটি ভীষণ চমকে উঠল। তার হরিণের মতো দুটি চোখে ভয়ার্ত এক স্পষ্ট আভাস ভেসে উঠল। সে ছেলেদের দিকে সরাসরি চোখ তুলে না তাকিয়ে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল। হাতের শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে চেপে ধরে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
"আমি বান্ধবীর সাথে ঘুরতে বের হয়েছিলাম। ওকে চলে যেতে বলে আমি আমার ভাইয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। ও আমাকে নিতে আসার কথা ছিল, কিন্তু হঠাৎ করে এত বড় ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে বুঝতে পারিনি।"
মেয়েটির ভেজা, ভয়ার্ত কণ্ঠস্বর সায়েমের বুকের গহীনে অদ্ভুত এক আলতো দোল দিয়ে গেল। সে অত্যন্ত পরম আশ্বাসের সুরে বলল,
"অনেক রাত হয়ে গেছে আর আজকের এই ঝড় সহজে থামবে বলে মনে হচ্ছে না। তুমি চাইলে আমি তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে পারি।"
সায়েমের এই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্তাবে মেয়েটি কিছুটা ইতস্তত করল। তারপর না-সূচক মাথা নেড়ে বিনীতভাবে বলল,
"লাগবে না... অনেক ধন্যবাদ। আমার ভাইয়া এখনই এসে পড়বে, ও ইতিমধ্যে রওনা হয়ে গেছে।"
ওদের এই কথা চলার মাঝেই হঠাৎ একটা নীল রঙের গাড়ি তীব্র হেডলাইটের আলো ফেলে দ্রুত গতিতে এসে ঠিক তাদের সামনে থামল। গাড়ির পরিচিত হর্ন বাজতেই মেয়েটি যেন দম বন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে বেঁচে গেল। সে সায়েমদের দিকে আর এক পলকও না তাকিয়ে, কোনো কথা না বলে দ্রুত পায়ে হেঁটে গিয়ে গাড়ির পেছনের সিটে উঠে বসল।
গাড়িটি মুহূর্তের মধ্যে স্টার্ট নিয়ে আঁধার আর বৃষ্টির ধূসর রাস্তায় মিলিয়ে গেল। আর সায়েম? সে যেন এক কাঠের জীবন্ত পুতুলের মতো নিষ্পলক চোখে দাঁড়িয়ে রইল। গাড়িটি যতক্ষণ না পুরোপুরি রাস্তার মোড়ে হারিয়ে গেল, সায়েম অপলক দৃষ্টিতে সেদিকেই তাকিয়ে থাকল। তার মনের গহীনে তখন এক অজানা তোলপাড়, এক অদ্ভুত অনুভূতি বাসা বেঁধেছে—যা সে নিজেই কোনো শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারছে না।
হঠাৎ আয়ান সায়েমের পিঠে আলতো চাপ দিয়ে বলে উঠল,
"কোথায় হারিয়ে গেলি তুই? গাড়ি তো চলে গেছে, এবার চল আমাদেরও বাড়ি ফিরতে হবে, নয়তো এই ঝড়ে মাঝরাস্তায় আটকে পড়ব!"
আয়ানের ডাকে সায়েম একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপালে এসে পড়া ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে পেছনে ঠেলে দিল। তারপর হৃদয়ের ভেতর অজানা এক অদ্ভুত অনুভূতি চেপে আলতো হেসে বলল,
"হ্যাঁ চল।"
(চলবে.)......