ফন্ট সাইজ:
থিম:
হয়তো আমার নয়তো কারো নয়

৫ম পর্ব

লেখক: সিমু নোহা
সকালের স্নিগ্ধ আলোয় সাওয়ার শেষ করে ওয়াশরুম থেকে বের হলো সায়েম। আজ ওর অবয়বে এক অন্যরকম উদ্দীপ্ত ভাব। আজ সে ফিরছে তার সেই পুরনো আঙিনায়, যেখানে একসময় কেটেছে ওদের ইন্টারমিডিয়েটের সোনালী দিনগুলো। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সায়েম। নিজেকে শেষবারের মতো পরখ করে নেওয়ার জন্য চুলগুলো একটু গুছিয়ে নিল। আজ ও পছন্দ করেছে কুচকুচে কালো রঙের একটি শার্ট, আর সাথে পরেছে ম্যাচিং করা ব্ল্যাক ফরমাল প্যান্ট। পোশাকটা খুব সাধারণ হতে পারে, কিন্তু অল-ব্ল্যাক এই লুকে ওর সুঠাম দেহ আর ঘন চাপদাড়িওয়ালা মুখটায় এক অদ্ভুত পুরুষালী মাদকতা ফুটে উঠেছে। সায়েমের ড্রেসিং সেন্স বরাবরই নিখুঁত আর আকর্ষণীয়, তবে আজ যেন সেই রুচিশীলতা একটু বেশিই মারাত্মক লাগছে।
খোলা দরজায় সামান্য টোকা দিয়ে ঘরে ঢুকল আবিদ। আয়নায় সায়েমের নিজেকে পরখ করার দৃশ্যটা দেখে হালকা একটু টিপ্পনী কেটে বলল,
"কিরে, শেষ হলো তোর? নাকি আয়না দেখেই দিনটা পার করে দিবি?"
সায়েম আয়নার দিকে তাকিয়েই হাসল। শার্টের কলারটা একটু ঠিক করতে করতে ঘাড় না ঘুরিয়েই জবাব দিল,
"হয়েছে। তুই নিচে যা, আমি আসছি।"
আবিদ সায়েমের ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে নেমে দেখল ড্রয়িংরুমে অন্যরকম এক উৎসব মুখর পরিবেশ। রাইসা, রিয়ান আর আয়ান মিলে সায়েমের মায়ের সাথে জম্পেশ গল্পে মেতেছে, আর সেই সাথে সকালের সুস্বাদু নাস্তায় হাত দিয়েছে। আড্ডা আর হাসাহাসির মাঝখানে আবিদও কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা ওদের দলে গিয়ে যোগ দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সায়েম সিঁড়ি বেয়ে ধীরপায়ে নিচে নেমে এলো। বন্ধুদের এভাবে একদম নিশ্চিন্ত হয়ে পেটপূজো করতে দেখে ও কিছুটা কৃত্রিম গম্ভীর মুখে তাড়া দিল,
"অনেক তো গিললি সবাই! এবার একটু হাত চালাবি? নাকি এখানেই বসে থাকার ইচ্ছে আছে? বের হতে হবে তো নাকি!"
ছেলেকে এভাবে অহেতুক অস্থির হতে দেখে রোকেয়া বেগম না হেসে পারলেন না। তিনি মৃদু হেসে বললেন,
"তুই নিজে তো মুখে কিছু দিলিই না, আর ওদেরও শান্তিতে খেতে দিচ্ছিস না! এত কিসের তাড়া তোর বল তো, বাবা?"
সায়েম মায়ের কাছে এগিয়ে এসে একটু আদর মাখানো কণ্ঠে বোঝাল,
"মা, তুমি তো জানোই ওখান থেকে ফিরে আমাকে সোজা অফিসে যেতে হবে। বেশি লেট করা যাবে না।”
কথাটা বলে সায়েম মায়ের কপালে একটা ভালোবাসার চুমু এঁকে দিল। মায়ের কাছ থেকে দোয়া নিয়ে পুরো বন্ধুদের দলটা একসাথে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলো। বাইরে এসে রাইসা, আবিদ আর রিয়ান দ্রুত গাড়িতে গিয়ে চেপে বসল। আর সায়েম এগিয়ে গেল তার বাইকের দিকে। বাইক স্টার্ট দিতেই সেটার গর্জন চারপাশের পরিবেশ কাঁপিয়ে তুলল। পেছনে আয়ান উঠে বসতেই সায়েম থ্রটল চেপে ধরে তাদের সেই চিরচেনা পুরনো গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
.
.
ক্যামব্রিয়ান কলেজের সদর দরজার সামনে এসে থামল একটি নীল রঙের গাড়ি। গাড়ির দরজা খুলে ধীরপায়ে নেমে এলো মিহি। চার চাকার এই খাঁচা সদৃশ বন্দিদশায় চড়ে প্রতিদিন কলেজে আসাটা ওর বিন্দুমাত্র পছন্দ নয়। কিন্তু বাবার কড়া শাসন—নিরাপত্তার খাতিরে গাড়ি ছাড়া এক পা-ও বাইরে রাখা কঠোরভাবে বারণ। তাই একদম অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন এই আভিজাত্যের ভারাটুকু নিরুপায় হয়ে বয়ে বেড়াতে হয় তাকে। আদি তাকে নামিয়ে দিয়ে চলে যায়। ধীরপায়ে কলেজের বিশাল চত্বরে পা রাখতেই পেছন থেকে একটা প্রিয় কণ্ঠের ডাক ভেসে এলো,
"মিহি! একটু দাঁড়া না..."
ঝট করে পেছনে ফিরতেই মিহির চমৎকার ঠোঁটের কোণে ঝলমলে একটি হাসি ফুটে উঠল। ওর জীবনের একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড রিয়া হন্তদন্ত হয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে এগিয়ে আসছে। কাছে এসেই রিয়া একটু গাল ফুলিয়ে অভিমানের সুরে বলল,
"কালকে কলেজে আসিসনি কেন বল তো? তোকে ছাড়া এই পুরো ক্যাম্পাসটা আমার কাছে পুরো মরুভূমি মনে হয়!"
মিহি রিয়ার হাত জড়িয়ে ধরে অনুতপ্ত গলায় বলল,
"আরে রাগ করিস না প্লিজ! পরশু রাতে বাড়ি ফিরতে কতটা লেট হয়েছিল তোর মনে নেই? তার ওপর আবার বৃষ্টিতে ভিজে একাকার অবস্থা। সকালে শরীরটাও খুব ম্যাজম্যাজ করছিল দেখে বাবা আর একদম ডাকতেই দেয়নি।"
কথাটা শুনে রিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর অতি আপনজনদের মতো মিহির কপালে হাত দিয়ে গায়ে কোনো জ্বর আছে কি না তা পরখ করে বলল,
"এজন্যই তোকে একা রেখে আমি বাড়ি ফিরতে চাইনি, তুই তো জোর করে পাঠিয়ে দিলি। তবে সামনে কিন্তু পরীক্ষা, এখন আর হুটহাট কলেজ কামাই দিস না একদম!"
"আই প্রমিস! আর একটা দিনও মিস করব না।" মিহি দুই আঙুলে নিজের কান ধরে নিষ্পাপ একটা ভঙ্গি করে প্রতিশ্রুতি দিল।
ওদের চমৎকার আড্ডার মাঝে অনাহূত আগমন ঘটল কলেজের সিনিয়র রাকিব ভাইয়ের। দূর থেকেই মিহিকে দেখতে পেয়েছিল সে, তাই মূলত ওর সাথে একটু কথা বলার অজুহাতে তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসেছে। চোখেমুখে একরাশ কৌতুহলী ভাব নিয়ে সে শুধাল,
"কেমন আছো মিহি?"
"ভালো আছি রাকিব ভাই। আপনি কেমন আছেন?" মিহি চিরাচরিত ভদ্রতার খাতিরে একটু হেসে উত্তর দিল।
"আমি ভালো। কাল ক্লাসে দেখলাম না যে তোমায়? সব ঠিক আছে তো?"
"আসলে কাল শরীরটা একটু খারাপ ছিল, তাই আর আসা হয়নি।"
মিহির মুখে শরীর খারাপের কথা শুনতেই রাকিবের কপালে চিন্তার তিন স্তরের গভীর ভাঁজ পড়ে গেল। ব্যস্ত হয়ে সে বলল,
"শরীর খারাপ মানে? কী হয়েছিল তোমার? এখন ঠিক আছ তো?"
"আরে তেমন কিছু না, এখন আমি ফিট।”
মিহির আশ্বাসে রাকিব যেন শেষমেশ বুক ভরে শ্বাস নিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ওর ভেতরে এক অদ্ভুত অজানা ভালো লাগা দোলা দিয়ে গেল। মনে মনে গভীর অনুভূতি নিয়ে সে আওড়াল,
‘সবসময় নিজের খেয়াল রেখো পরি। সঠিক সময়টা আসুক, তোমার জীবনের সব দেখভালের দায়িত্ব নাহয় আমি সানন্দে নিজের কাঁধে তুলে নেব।’
তবে মনের এই গোপন প্রচ্ছন্ন ভাবনা গোপন রেখে মুখে সে শুধু এটুকুই বলল,
"সাবধানে থেকো।"
"জি আচ্ছা। আমাদের ক্লাসের সময় হয়ে যাচ্ছে, এখন আসি তাহলে।"
কথাটি বলেই মিহি আর রিয়া ক্লাসরুমের দিকে পা বাড়াল। আর রাকিব মন্ত্রমুগ্ধের মতো নিশ্চল হয়ে মিহির হেঁটে চলে যাওয়ার পথের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।
.
কিছুক্ষণের মাঝেই সায়েমসহ সবাই এসে পৌঁছায় একটি পরিচিত কলেজের সামনে। গাড়ি থেকে একে একে নেমে তারা মেইন গেট পেরিয়ে পা বাড়ায় কলেজের ভেতরে। ভেতরের চারপাশটায় সবাই একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। দেখতে দেখতে কতগুলো বছর কেটে গেল, কিন্তু এই ক্যাম্পাসের প্রতিটা ইটে যেন আজও জমা হয়ে আছে তাদের সোনালী কৈশোর আর দুরন্ত শৈশবের অজস্র স্মৃতি! হঠাৎ রাইসার নজর যায় সামনের দিকে। তাদের দিকেই হেঁটে আসছেন এক মধ্যবয়সী মহিলা। তাকে দেখেই রাইসার মুখে ফুটে ওঠে চেনা আনন্দের হাসি। সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে তার সামনে দাঁড়ায়,
"আসসালামু আলাইকুম ম্যাম, কেমন আছেন?"
এই কলেজেরই বাংলা বিভাগের জনপ্রিয় শিক্ষিকা নওশীন ম্যাডাম হঠাৎ একঝাঁক পুরনো মুখকে হুট করে সামনে দেখে একটু থমকে যান, চোখে-মুখে স্পষ্ট বিস্ময়। কিন্তু পরক্ষণেই তাদের চিনতে পেরে ওনার চেহারায় ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত ভালোলাগার দ্যুতি।
"আরে, তোমরা! আমি তো ভালো আছি, তোমরা সবাই কেমন আছো?"
"আমরাও খুব ভালো আছি, ম্যাম।" রাইসা সানন্দে জবাব দেয়।
নওশীন ম্যাডাম তাদের সবাইকে একবার আপাদমস্তক দেখে নেন। আক্ষেপ আর আনন্দের এক মিশ্র সুরে তিনি বলে ওঠেন, 
"এতগুলো বছর পর তোমরা যে আবার এই কলেজের আঙিনায় পা রাখবে, তা আমি ভাবতেও পারিনি! সত্যি, তোমাদের দেখে খুব খুশি হলাম।"
ম্যাডামের কথা শুনে সবার ঠোঁটেই ফুটে ওঠে একগাল চওড়া হাসি। তবে এই সব কিছুর মাঝেই সায়েম ছিল যেন একদম অন্য এক জগতে। চারপাশের কোলাহল, পুরনো স্মৃতির জটলা—কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারছে না। সে কোনো এক গভীর ভাবনায় পুরোপুরি মগ্ন। নওশীন ম্যাডাম তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 
"প্রিন্সিপাল স্যার আজ ওনার অফিস রুমেই আছেন। যাও, তোমরা গিয়ে ওনার সাথে দেখা করে নাও।"
আয়ান ম্যাডামের কথার উত্তরে বলে,
"হ্যাঁ ম্যাডাম, অবশ্যই দেখা করব। তবে তার আগে পুরো কলেজটা একটু ঘুরে দেখতে চাই। এতদিন পর এলাম, চারপাশে তো অনেক পরিবর্তনই চোখে পড়ছে!"
নওশীন ম্যাডাম তাদের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি একটি হাসি উপহার দিয়ে নিজের গন্তব্যে চলে যান। ম্যাডাম চলে যাওয়ার পর রাইসার চোখ পড়ে সায়েমের দিকে। ছেলেটা এখনও ঠাঁই দাঁড়িয়ে একমনে কী যেন ভেবে চলেছে। রাইসা এসে সায়েমের বাহুতে কষে একটা চিমটি কাটে। হুট করে চিমটি খেয়ে সায়েমের ধ্যান এক ঝটকায় ভেঙে যায়। সে চমকে উঠে বলে, 
"আরে!"
রাইসা বাঁকা হেসে জিজ্ঞেস করে, 
"কিরে, অত কী ভাবছিস?"
"ক কই, কিছু না তো!" সায়েম একেবারেই সংক্ষেপে অগোছালো একটা জবাব দেয়।
তা দেখে রাইসা নাটুকে ভঙ্গিতে ড্রামাটিক ভাবে চোখ দুটো ঘুরিয়ে নিয়ে বলে, 
"হায়রে মনমোহিনী! কোথায় তুমি? অন্তত একবার এসে আমার এই বিরহী বন্ধুকে দেখা দিয়ে যাও তো! বেচারা যে তোমার প্রেমে একেবারে হাবুডুবু খাচ্ছে, অথচ মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে!"
রাইসার এমন অদ্ভুত যুক্তি শুনে সায়েম না হেসে আর থাকতে পারে না। গম্ভীর ভাবটা এক পলকে মিলিয়ে গিয়ে তার মুখে ফুটে ওঠে একরাশ স্নিগ্ধ ও সুন্দর হাসি।
কলেজের চারিদিক ঘুরে দেখার কাজটা অবশেষে শেষ হলো সায়েম আর তার দলের। ক্লান্তি মেটাতে তারা সবাই এসে বসল কলেজের ক্যান্টিনে। সবার মাঝে আড্ডার পারদ তখন তুঙ্গে। ঠিক এমন সময়েই আড্ডার আমেজ কাটিয়ে আবিদের চোখ গিয়ে পড়ল পাশের একটা টেবিলের ওপর। কিছুক্ষণ সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আবিদ। পরক্ষণেই সায়েমকে নিজের হাত দিয়ে কষে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলে উঠল, 
"সায়েম, তোর ডান দিকে একটু তাকা তো!"
আবিদের কথা অনুযায়ী সেদিকে তাকাতেই সায়েমের চোখ দুটো আনন্দে জলজল করে উঠে। সেখানে শান্ত হয়ে বসে খাবার খাচ্ছিল দুইজন মেয়ে। সায়েম নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না! অবশেষে আবারও সেই মেয়েটার দেখা পেল সে। মনে মনে সংকল্প করল, আজ আর যাই হোক, এই সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না। আবিদ মৃদু হেসে সায়েমের দিকে ঘুরে বলল,
"মেয়েটা কি লক্ষ্মী মেয়ের মতো খাচ্ছে দেখ!"
সায়েম তখন ভীষণ দ্বিধাদ্বন্দ্বে। মনের ভেতর ঝড়ের গতিতে নানান প্রশ্ন আছড়ে পড়ছে—এখন তার কী করা উচিত? সে কি নিজে গিয়ে মেয়েটার সাথে কথা বলবে? কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হলো, তার মতো একজন শক্তপোক্ত গড়নের পুরুষ যদি নিজে থেকে আগ বাড়িয়ে গিয়ে কথা বলে, ব্যাপারটা যদি মেয়েটা পছন্দ না করে? যদি সে অন্য কিছু ভেবে বসে? সায়েমের মনের উথালপাথাল অবস্থা বুঝে আয়ান তাগাদা দিয়ে বলল, 
"দোস্ত, এত ভেবে লাভ নেই। তুই গিয়ে মেয়েটার সাথে কথা বল!"
সায়েমের নিজেরও প্রবল ইচ্ছে করছিল ছুটে গিয়ে কথা বলতে। কিন্তু তখন রাইসা গম্ভীর ভঙ্গিতে তাদের দিকে ঘুরে বলে উঠল, 
"সায়েমের এখন যাওয়ার কোনো দরকার নেই। আমি নিজে গিয়ে কথা বলে আসছি। সায়েম গেলে মেয়েটা খারাপ ভাবতে পারে।"
রাইসা যেহেতু মেয়ে, সেহেতু আরেকটা মেয়ের মন-মানসিকতা ও সাইকোলজি সে ভালো বুঝতে পারবে—কথাটা যুক্তিযুক্ত মনে হওয়াতে বাকি সবাইও সায় দিল। রাইসা চেয়ার ছেড়ে উঠে সোজা গিয়ে দাঁড়াল মিহিদের টেবিলের সামনে। টান মেরে একটা খালি চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়ল তাদের সামনেই। হঠাৎ একজন অপরিচিত মেয়েকে এভাবে এসে বসতে দেখে রিয়া আর মিহি অবাক হয়ে দুজন দুজনের মুখের দিকে তাকাল। রাইসা অমায়িক হাসিতে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, 
"হাই, আমি রাইসা। তোমার নাম কি?"
কথাটা সরাসরি মিহির উদ্দেশ্যে বলা। মিহিও মৃদু হেসে হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করে বলল,
"আমি মিহি।"
"তোমরা দুজন বুঝি ফ্রেন্ড?" 
রাইসার প্রশ্নে মিহি শুধু উপর-নিচ মাথা নেড়ে সায় দিল।
রাইসা একটু সংকোচ প্রকাশ করে জিজ্ঞেস করল, 
"আচ্ছা, আমি যে এভাবে আগ বাড়িয়ে তোমাদের সাথে কথা বলতে এসেছি, তোমরা কিছু মনে করোনি তো আবার?"
মিহি বিনয়ের সাথে উত্তর দিল, 
"না না আপু, কিছু মনে করব কেন!"
মিহির এমন ব্যবহারে রাইসা যেন একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সহজ হয়ে বলল, 
"আসলে দূর থেকে তোমাকে দেখেই খুব ভালো লেগে গেল, তাই ভাবলাম একটু কথা বলে আসি। তা তোমরা কোন ইয়ারে পড়ো?"
"সেকেন্ড ইয়ার," এবার রিয়া জবাব দিল।
রাইসা বাকিদের দিকে নির্দেশ করে বলল, 
"আমরাও এই কলেজেই ইন্টারমিডিয়েট শেষ করেছি। ওই যে দেখো, আমার সব বন্ধুরা বসে আছে।"
কথাটা বলেই রাইসা হাত তুলে সায়েমদের টেবিলের দিকে ইঙ্গিত করল। রাইসার ইশারায় মিহি যখন সেদিকে তাকাল, তখন সায়েম ছাড়া বাকি সবাই মিহির দিকেই কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে ছিল। সায়েম তখন ফোনে কোনো এক জরুরি কলে ব্যস্ত ছিল। তাদের এই সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতার মাঝেই হঠাৎ কোথা থেকে যেন রাকিব এসে হাজির হলো। সে মিহি আর রিয়াকে ক্যান্টিন থেকে ডেকে বাইরে নিয়ে গেল।
মিহিরা চলে যেতেই রাইসা বেশ একটা ভাব নিয়ে এসে নিজের বন্ধুদের টেবিলে বসল। কিন্তু মিহিকে অন্য একটা অজানা ছেলের সাথে হেঁটে যেতে দেখে সায়েমের কপাল কুঁচকে গেল, মুখের মেঘলা ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল তার। আয়ান সায়েমের এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনটা ধরে ফেলে সান্ত্বনার সুরে বলল, 
"আহা দোস্ত, অত ভাবিস না! ওটা ওর ভাইও তো হতে পারে।"
সায়েম অবশ্য কোনো জবাব দিল না, চুপচাপ গম্ভীর হয়ে রইল। রাইসা নিজের হাত নেড়ে বেশ বাহাদুরি দেখিয়ে বলল, 
"দেখলি সায়েম, তোর মনমোহিনীর সাথে কেমন ভাব জমিয়ে কথা বলে আসলাম! এটাকে বলে রিয়েল লেডিস পাওয়ার, বুঝলি?"
সায়েম তখনও যেন এক ঘোরের মধ্যে ছিল। সে ভাবতেই পারেনি যে আজ কলেজে এসে হঠাৎ করে তার হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া সেই অধরা মেয়েটার সাথে এভাবে দেখা হয়ে যাবে। পুরো ব্যাপারটা তার কাছে একদম মিরাকেলের মতো মনে হচ্ছে। অথচ আজ এই কলেজে আসার ব্যাপারে তার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না! বন্ধুদের কথাতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও এসেছে। কিন্তু এখানে এসে যে তার জীবনের এত বড় একটা চমৎকার অভিজ্ঞতা হয়ে যাবে, তা সায়েমের দূরতম কল্পনাতেও আসেনি।
চলবে……

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন