দুপুরের খটখটে কড়া রোদ যেন আকাশ থেকে আগুন ঢালছে। তপ্ত অ্যাসফল্টের পিচ গলে চটচটে অবস্থা, আর তার ওপর গত আধঘণ্টা ধরে একই জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছে তীব্র ট্রাফিক জ্যাম। সায়েমের ধৈর্যের বাঁধ ততক্ষণে একপ্রকার ভাঙতে শুরু করেছে।
আজ সকালে হঠাৎ করেই আসিফ চৌধুরীর ফোন এসেছিল। সায়েমকে দ্রুত অফিসে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। শুধু তাই নয়, ফোনে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন—আজই তিনি পুরো কোম্পানির যাবতীয় দায়িত্ব সায়েমের কাঁধে তুলে দেবেন। আসিফ চৌধুরীর গলার সেই অটল ভঙ্গির সামনে সায়েম আর দ্বিতীয় কোনো বাক্য ব্যয় করে না করার সুযোগ পায়নি।
প্রচণ্ড জ্যামের ধকলে সায়েমের মেজাজ চড়ে যাচ্ছে। আজ সকালে সে তাড়াঘাড়ো করে তার ভীষণ প্রিয় সুজুকি জিএসএক্সআর ১০০০ সুপারবাইকটি নিয়ে বের হয়েছিল। সাধারণত এই বাইকে চড়লে একটা স্বাধীনতার অনুভূতি পাওয়া যায়, কিন্তু আজকের এই স্থবির ট্রাফিকে বাইকের চারপাশের তপ্ত ইঞ্জিনের উত্তাপ পরিস্থিতিকে আরও অসহনীয় করে তুলেছে। এখন সায়েমের মনে হচ্ছে, বাইক না নিয়ে যদি গাড়ি নিয়ে বের হতো, তবে অন্ততঃ এই প্রাণঘাতী রোদ আর ধুলোবালি থেকে নিস্তার পাওয়া যেত।
অবশেষে দীর্ঘ চল্লিশ মিনিট পর সিগন্যাল খোলে এবং ট্রাফিক কিছুটা সচল হয়। সায়েমের হাতের হালকা দোলায় থ্রোটল গর্জে ওঠে; সুজুকির শক্তিশালী ইঞ্জিন সশব্দে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে সামনের রাজপথ চিরে এগোতে থাকে। মিনিট দশেকের তীব্র রাইড শেষে সে এসে পৌঁছায় একটি বিশালাকার দৃষ্টিনন্দন ভবনের সামনে। বহুতল সেই স্থাপত্যের চূড়ায় গাঢ় অক্ষরে খোদাই করা কোম্পানির নাম—ইথেরিয়া অর্গানিকস।
সায়েম বাইকটি সোজা পার্কিং লটে নিয়ে গিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে স্ট্যান্ড করায়। হেলমেটটি হাতে নিয়ে একটু গুছিয়ে নিয়ে যেমনই সে ভবনের মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে ভেতরে পা রাখে, অমনি তার মাথার ওপর ঝরে পড়ে টাটকা গোলাপের পাপড়ির বৃষ্টি! পুরো অফিসের কর্মকর্তারা আগে থেকেই দুই পাশে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ইথেরিয়া অর্গানিকসের নতুন কর্ণধারকে স্বাগত জানাতে তাদের এই জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। হঠাৎ এমন অভ্যর্থনায় সায়েম খানিকটা চমকে গেলেও নিজের অনুভূতি গোপন রেখে উপস্থিত সকলের প্রতি ঠোঁটের কোণে একটি মৃদু, সৌজন্যমূলক হাসির রেখা ফুটিয়ে তোলে।
ধীর পদক্ষেপে সায়েম গিয়ে কাঁচঘেরা কনফারেন্স রুমে প্রবেশ করে। রুমজুড়ে উপস্থিত বোর্ডের সমস্ত উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও শেয়ারহোল্ডারদের বসার জায়গা। সায়েম সোজা হেঁটে গিয়ে আসিফ চৌধুরীর ঠিক পাশে রাখা নির্দিষ্ট চেয়ারটিতে আসন গ্রহণ করে। রুমের পুরো আবহে এক ধরনের গুরুগম্ভীর নীরবতা নেমে আসে। আসিফ চৌধুরী পোডিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে চারপাশের অভিজ্ঞ মুখের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে স্পষ্ট গলায় ঘোষণা করেন,
"শুভ অপরাহ্ন সবাইকে। আজ থেকে আমাদের কোম্পানি 'ইথেরিয়া অর্গানিকস'-এর নতুন সিইও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করছে আমার ছেলে—আরফান চৌধুরী সায়েম।"
কথাটি শেষ হতেই পুরো রুম তুমুল করতালির রোলে মুখরিত হয়ে ওঠে! কারো মুখে আর আনন্দের সীমা রইল না। আসিফ চৌধুরী যেভাবে বছরের পর বছর ধরে সততা ও একাগ্রতা দিয়ে এই সুগন্ধি সাম্রাজ্যকে দাঁড় করিয়েছেন, ঠিক একইভাবে সায়েমও যে নীতিবান এবং অত্যন্ত যোগ্যতাসম্পন্ন একজন মানুষ—তা উপস্থিত কারোরই অজানা নয়। এমন একজন যোগ্য নেতৃত্বকে শীর্ষে পেয়ে অফিসের প্রতিটি সদস্যের মন এক অপরসীম আনন্দে আপ্লুত হয়ে ওঠে।
সবাই যখন করতালি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছিল, সায়েম তখন টেবিলের ওপর হাত রেখে শান্তভাবে ভাবছিল। এক নিমেষেই তার কাঁধে এসে পড়েছে বিশাল এক সাম্রাজ্যের দায়িত্ব। এই বিশাল ইন্ডাস্ট্রিকে বাবার মতো একই সততার সাথে সঠিক পথে পরিচালনা করতে পারবে তো সে? প্রশ্নটা মনের কোণে এক ঝলক দোলা দিলেও, সায়েম তার নিজের আত্মবিশ্বাসের ওপর আস্থা হারায় না। সে জানে, পথটা কঠিন হলেও নিজের নীতি আর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সে এই কোম্পানিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবে।
কনফারেন্সের দীর্ঘ আলোচনা শেষ করে সায়েম ভবনের বাইরে বেরিয়ে আসে, হঠাৎ তার পকেটে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠে। ফোনটা পকেট থেকে বের করে স্ক্রিনে তাকাতেই আয়ানের একটি মেসেজ ভেসে উঠল। সায়েম একপলক মেসেজটি দেখে নিল—আয়ান তাকে ক্যাফে ইডেনে পৌঁছাতে বলেছে। আর কথা না বাড়িয়ে, সায়েম বাইকটা বের করে ক্যাফে ইডেনের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সে ক্যাফে ইডেনের সামনে এসে পৌঁছায়। বাইকটি এক পাশে স্ট্যান্ড করে রেখে সায়েম যখনই ক্যাফের কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি পরিচিত মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে আসে,
"সায়েম ভাই!"
সায়েম ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। দেখল রাস্তার ওপাশ থেকে একপ্রকার দৌড়াতে দৌড়াতে নেহা এদিকেই আসছে। নেহা এসে থামলো সায়েমের সামনে। একটানা দৌড়ানোর ফলে সে হাঁপাচ্ছে, দু-হাত হাঁটুতে রেখে ঝুঁকে কিছুক্ষণ দম নিল। মুখের ওপর চলে আসা ছোট ছোট চুলগুলো এক হাত দিয়ে পেছনে সরিয়ে নেহা বলল,
"আপনাকে সেই কখন থেকে ডেকে যাচ্ছি! আপনি তো শোনেনই না।"
সায়েম কিছুটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুখে মৃদু হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলল। নেহা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একটু গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করল,
"সায়েম ভাই, আপনি আমাকে ব্লক করেছেন কেন?"
কথাটা শুনে সায়েমের কপালে তিন স্তরের ভাঁজ পড়ে গেল মুহূর্তেই। সে বিস্ময় নিয়ে বলল,
"তোকে ব্লক করেছি? কই, না তো!"
সায়েমের অবাক হওয়া দেখে নেহার হঠাৎ মনে পড়ে গেল আসল বিষয়টা। সে যে আইডি থেকে সায়েমকে মেসেজ দিয়েছিল, সেখানে নিজের নাম ছিল না, তারউপর প্রোফাইলেও একটা ফুলের ছবি দেওয়া ছিল। স্বভাবতই সায়েম অচেনা বা ফেক আইডি মনে করে ব্লক করে দিয়েছে। ভুলটা বুঝতে পেরে নেহা ভেতরে ভেতরে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। দ্রুত কথা ঘুরিয়ে সে জিজ্ঞেস করল,
"তা এখানে কেন এসেছেন?"
কথাটা বলেই নেহা মাথাটা সামান্য কাত করে ক্যাফের কাঁচের দরজা দিয়ে ভেতরে চোখ বোলাল। ভেতরে সায়েমের বন্ধুরা সবাই এক টেবিলে বসে ছিল এবং তাদের চোখ দুটো ছিল ঠিক এদের দিকেই। তাদের এমন কৌতূহলী চাহনি দেখে নেহা কিছুটা লজ্জা পেয়ে গেল। সংকোচে সে সায়েমের পিঠের আড়ালে এসে নিজেকে ঢাকার চেষ্টা করল। নেহাকে এভাবে কাছে সরে আসতে দেখে সায়েম এক ধাপ পিছিয়ে গেল। গলার স্বর কিছুটা কঠোর করে বলল,
"বাড়িতে যা। আমার এখন কাজ আছে।"
নেহার মোটেও ইচ্ছা করছিল না এখন বাড়ি ফিরতে। আরও কিছুক্ষণ সায়েমের আশেপাশে থাকার মন ছিল, কিন্তু সায়েমের গম্ভীর চেহারা দেখে সে আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলে গেল। নেহা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যেতেই সায়েম নিজের এক হাত দিয়ে কপালটা ঘষল। মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ নিয়ে সে ক্যাফের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে।
.
.
আকাশ আপন মনে ছুটে চলছে। প্রকৃতির এটাই যেন একমাত্র চিরন্তন নিয়ম—সে কখনোই কারো জন্য থমকে থাকে না, নিজের আপন গতিতেই নিয়ত সামনে এগিয়ে চলে। নিজের ঘরের বারান্দার গ্রিল শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছে মিহি। বিকেলের মনভুলানো আলোয় মিহির হাঁটু অবধি লম্বা চুলগুলো হাওয়ায় এলোমেলোভাবে উড়ছে। গাছের ডালে ডালে পাখিদের ডানামেলা ওড়াউড়ি আর তাদের মিষ্টি কিচিরমিচির শব্দ শুনতে মিহির বড্ড ভালো লাগছে। তখন পিছন থেকে এসে তিশা আচমকা মিহিকে জড়িয়ে ধরে। হঠাৎ এমন ঘটনায় মিহি খানিকটা হকচকিয়ে গেলেও দ্রুতই নিজেকে সামলে নেয়। পরক্ষণে ঘাড় ঘুরিয়ে তিশার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
"আপু, কিছু বলবে?"
মিহির কথা শুনে তিশা যেন আকাশ থেকে পড়ে! কিছুটা রাগান্বিত কণ্ঠে সে বলে উঠে,
"বড় মা তোকে কিছু বলেনি?"
তিশার কথা শুনেই মিহির ঝটপট মনে পড়ে যায় সকালে মায়ের বলা সেই কথাটি। নিজের ভুল বুঝতে পেরে আনমনেই নিজের কপালে হাত দিয়ে একটা চড় মারে সে। লজ্জিত মুখে বলে,
"ইশ, আমি তো একদম ভুলে গিয়েছিলাম, আপু!"
"এখন আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত গিয়ে রেডি হ। বাসায় ফিরতে দেরি হলে কিন্তু কালকের মতো বড় আব্বু তোকে আবারও বকাবকি করবে," তিশার প্রচ্ছন্ন সতর্কবার্তা।
মিহি একগাল হেসে সায় দিয়ে বলে,
"তুমি নিচে যাও, আমি দশ মিনিটে রেডি হয়ে আসছি।"
মিহির কথা শুনে তিশা ঘর ছেড়ে নিচে নেমে যায়। কথা অনুযায়ী কিছুক্ষণের মধ্যেই সিঁড়ি বেয়ে ধীরপায়ে নিচে নেমে আসে মিহি। পরনে তার মেরুন রঙের একটি থ্রি-পিস, আর হাঁটু অবধি ছড়িয়ে থাকা লম্বা চুলগুলো পিঠের ওপর সুন্দরভাবে মেলানো। সে সময় ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে বেশ মগ্ন হয়ে টিভি দেখছিলেন ইয়াসমিন সুলতানা এবং রিনা আক্তার। মিহির নিচে নামার শব্দ পেয়ে ইয়াসমিন সুলতানা উঠে এসে সোজা মিহির সামনে দাঁড়ান। নিজের চোখের কোণ থেকে আঙুল দিয়ে সামান্য কাজল নিয়ে তিনি আলতো করে মিহির কানের পেছনে লাগিয়ে দেন। ফিসফিস করে বলেন,
"কারো নজর যেন না লাগে আমার মেয়ের ওপর!"
মায়ের এমন কাণ্ড দেখে মিহির মুখে হাসি ফুটলেও চোখদুটো যেন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতায় ভরে ওঠে। পাশ থেকে রিনা আক্তার ইয়াসমিন সুলতানার দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠেন,
"তাই তো বলি, ভাবি! আমাদের মেয়ের জন্য দুদিন পরপর এমন সম্বন্ধ আসে কেন? স্বীকার করতেই হবে, সবারই বেশ ভালো পছন্দ আছে!"
কথাটা শুনে ইয়াসমিন সুলতানা হেসে ওপর-নিচে মাথা নাড়ান। ততক্ষণে তিশাও পুরোপুরি তৈরি হয়ে নিচে নেমে আসে। তারা দুজন ইয়াসমিন সুলতানা এবং রিনা আক্তারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজেদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। আজ বাড়িতে পুরুষদের বলতে গেলে কেউ-ই নেই; মিহির বাবা আর ছোট চাচা দুজনেই বাহিরে। আদি অবশ্য বাড়িতেই আছে, কিন্তু সে নিজের রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে কিসে যে নিমগ্ন হয়ে আছে, তা কে জানে!
.
.
বিকেলের সোনাঝরা আলোতে ধানমন্ডি লেকের সৌন্দর্য যেন কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে। চারপাশের সবুজ আর শান্ত জলের মায়াবী আমেজ মিলে এক অসম্ভব সুন্দর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানী শহরের কোলাহল ছাড়িয়ে একটু স্বস্তির খোঁজে এখানে নিত্যদিনই নানা বয়সের মানুষের আনাগোনা থাকে। অনেকেই আবার শহরের বহু দূরদূরান্ত থেকেও এই লেকের স্নিগ্ধ পরিবেশ উপভোগ করতে ছুটে আসে।
তিশা আর মিহি লেকের পাড় ঘেঁষে ধীরপায়ে হাঁটতে হাঁটতে একসময় একটা কাঠের বেঞ্চিতে এসে বসে। চারপাশ জুড়ে বয়ে চলা মৃদুমন্দ বাতাস তাদের ক্লান্তি ভুলিয়ে মন ভরিয়ে দিচ্ছে। তারা যে বেঞ্চিতে বসেছে, ঠিক তার সামনের দিকটায় একজন ফুচকাওয়ালা দোকান সাজিয়ে ফুচকা বিক্রি করছেন। ফুচকা মিহির অত্যন্ত প্রিয় একটি খাবার। অন্যদিকে তিশা আবার বাইরের এসব খোলামেলা স্ট্রিট ফুড খুব একটা পছন্দ করে না। লোভনীয় ফুচকাগুলোর দিকে তাকাতেই মিহি আর স্থির থাকতে পারল না। তিশার হাত ধরে টেনে সোজা ফুচকার দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল সে। মিহির প্রবল উৎসাহ দেখে আজ যেন হঠাৎ করেই তিশারও একটু ফুচকা খাওয়ার ইচ্ছে জেগে উঠল। যদিও মেয়ে হয়েও তিশা আজ পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারল না যে মেয়েরা ফুচকা এত পছন্দ করে কেন! কত শতবার তো সে-ও ফুচকা খেয়েছে, বিশেষ কোনো আলাদা স্বাদ তো পায়নি। দোকানি ফুচকা বানিয়ে হাতে দিতেই দুজন খাওয়া শুরু করে দেয়। চমৎকার বিকেলের আমেজ আর টক-ঝাল ফুচকার কামড়ে দুটো মেয়ে যেন নিজেদের এক অপূর্ব আনন্দে ভাসিয়ে দিল।
সেসময় তাদের থেকে হাত চার-ছয়েক দূরত্বে দাঁড়িয়ে ছিল আয়ান। অলস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই হঠাৎ মিহির দিকে তার চোখ পড়ে। মিহিকে দেখামাত্রই আয়ান যেন হালকা চমকে ওঠে! চোখের ভুল নাকি সত্যি—তা পরখ করে নেওয়ার জন্য মুহূর্তকাল থমকে দাঁড়াল সে। আর দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গেই পকেট থেকে ফোন বের করে সায়েমের নম্বর ডায়েল করল। ওপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই আয়ান যেন একপ্রকার মন্ত্রমুগ্ধের মতো নিচু স্বরে বলে উঠল,
"দোস্ত, তুই যেই মেয়েটার ডিটেইলস বের করতে বলেছিলি, সেই মেয়েটা এখন ঠিক আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে!"
কথাটা শুনে ওপাশ থেকে সায়েমের কণ্ঠে স্পষ্ট অবাক হওয়ার সুর ফুটল,
"কীভাবে বুঝলি যে এটা ওই মেয়েই? তুই তো তাকে কাল ভালো করে দেখিসওনি!"
আয়ান বেশ দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দিল,
"আমি ধারণা করছি—এটা ওই মেয়েই।"
"তুই এতটা শিওর কীভাবে যে তোর ধারণা সঠিক?"
এবার আয়ান আত্মবিশ্বাসে ভরপুর এক মৃদু হাসি হেসে বলল,
"বন্দুকের গুলি মিস হতে পারে, কিন্তু আয়ানের ধারণা কখনো মিস হতে পারে না!"
আয়ানের এই অতি-আত্মবিশ্বাসী উত্তর শুনে ওপাশ থেকে সায়েম আর বেশি কথা না বাড়িয়ে শুধু একটি সংক্ষিপ্ত শব্দ উচ্চারণ করল,
"আসছি।"
সায়েমের ফোনের অপর প্রান্ত থেকে কেটে দেওয়ার চিরচেনা অভ্যাস মনে পড়তেই আয়ান দ্রুত বলে উঠল,
"শোন শোন! আসছি তো বললি, কিন্তু কোথায় আসবি সেটা না জেনেই ফোন রেখে দিস না ভাই! তোর তো আবার কথায় কথায় ফোন কেটে দেওয়ার স্বভাব রয়েছে, ধানমন্ডি লেকে চলে আয়, আমি এখানেই আছি।"
এবার আর সায়েমকে আগে ফোন কাটার কোনো সুযোগই দিল না আয়ান। নিজের বক্তব্য শেষ করেই ঝটপট সে নিজেই কলটা কেটে দিল! ফোনটা পকেটে রেখে আয়ান একটা দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মনে মনে একধরনের অদ্ভুত বিজয়ের তৃপ্তি পেল সে—কারণ এই প্রথমবার জীবনে সে সায়েমকে আগে ফোন কাটার সুযোগ না দিয়ে নিজে আগে সায়েমের সাথে কথা শেষ করে ফোন কাটতে পেরেছে! নয়তো সায়েমের যে বাজে অভ্যাস, কথা শেষ হওয়ার আগেই অপরপ্রান্তের মানুষকে তোয়াক্কা না করে খট করে ফোন কেটে দেয়!
মিনিট বিশেক পরেই একটা বাইকের বিকট শব্দ তুলে ধানমন্ডি লেকের সামনে এসে থামল সায়েম। কিছুটা দূরে এক প্রকাণ্ড গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে অলস ভঙ্গিতে অপেক্ষা করছিল আয়ান। সায়েমকে বাইক থামাতে দেখেই সে দ্রুতপায়ে তার দিকে এগিয়ে আসে। বাইকের হেলমেট খুলতেই সায়েম অতীব ভারী কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
"কোথায় সে?"
আয়ান আর কোনো ভূমিকা না করে সোজা হাত উঁচিয়ে ইশারায় নির্দিষ্ট দিকটা দেখিয়ে দিল। কিন্তু ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছে। লেকের পাড় থেকে দুটো মেয়ে কেবলই একটা রিকশায় চড়ে বসছে। সায়েম ধীরপায়ে তাদের একটু কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করতে না করতেই রিকশাটি ততক্ষণে রাস্তা ধরে গতি বাড়িয়ে দিল। মেয়েটাকে এত কাছ পেয়েও, হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায় এমন দূরত্বে এসেও শেষ পর্যন্ত দেখা দিতে না পারার এক নিদারুণ যন্ত্রণা গ্রাস করল তাকে। সায়েমের বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যেন এক গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। আয়ান এসে সান্ত্বনার ভঙ্গিতে সায়েমের ঘাড়ে আলতো করে হাত রেখে বলল,
"দেখেছিস? আমার ধারণা কিন্তু একদম ভুল ছিল না। এটাই তো সেই মেয়ে, তাই না?"
সায়েম কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইল, মুখে কোনো টু শব্দও করল না। তার এই পাথুরে নীরবতা দেখে আয়ানের মুখে এক চিলতে দুষ্টুমির হাসি ফুটে উঠল। সে সায়েমকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলল,
"বুঝেছি, বুঝেছি! আমার গম্ভীর বন্ধুটা অবশেষে প্রেমে পড়েছে!"
তবুও সায়েমের চোখে-মুখে কোনো হেলদোল নেই। আগের মতোই নিঃশ্চুপ ও নির্লিপ্ত সে। সায়েমকে এভাবে মনখারাপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আয়ানের মনটাও কিছুটা নরম হলো। সে অভয় দেওয়ার ছলে বলল,
"দোস্ত, তুই একদম চিন্তা করিস না। আমি যেভাবেই হোক, ওই মেয়ের সব ডিটেইলস জোগাড় করে তোকে এনে দেব।"
সায়েম আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াতে চাইল না। সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই আয়ান এক লাফে তার সামনে গিয়ে পথ আটকে দাঁড়াল,
"দাঁড়া, দাঁড়া! আরো কিছু দরকারি কথা ছিল।"
সায়েম চরম বিরক্ত হয়ে মুখ দিয়ে এক অদ্ভুত শব্দ তুলে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
"কী হয়েছে, বল?"
আয়ান কিছুটা ইতস্তত করে বলল,
"না মানে... আবিদরা সবাই বলছিল আমরা যে কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছি, কাল সেখানে সবাই মিলে একবার যাব। তোকে কিন্তু অবশ্যই আমাদের সাথে যেতে হবে!"
কথাটা শুনে সায়েমের একদমই যেতে ইচ্ছে করল না। ওই স্মৃতিঘেরা পুরনো কলেজে যাওয়ার কোনো আগ্রহই তার নেই। কিন্তু শত ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আয়ানকে মানা করতে পারল না সে। আয়ানকে পেছনে ফেলে কিছুটা দূরত্বে হেঁটে যেতে যেতে অনাগ্রহী গলায় বলল,
"কখন যাবি, সময়টা একটু জানিয়ে দিস।"
সায়েমের যাওয়ার ভঙ্গি দেখে আয়ান তার পেছন থেকেই হাঁক ছেড়ে বলল,
"আমরা সবাই কাল সকালে একবারে তোর বাসায় এসে হাজির হব। তুই শুধু সকালে রেডি হয়ে থাকিস, বুঝলি?"
আয়ানের কথার আর কোনো জবাব দিল না সায়েম। নিজের বাইকে চেপে স্টার্ট দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে সেখান থেকে প্রস্থান করল সে।
চলবে…….