#দো_দিলে_জাহান
#পর্বঃ২৬
#বর্ষা
৮৪.
প্রামাণ্য সব দেখেও যেন ঘাপলাটা পুরোপুরি ধরা যাচ্ছে না।মুবাস্সির আদনান যে সেই ব্যক্তি নন তার ঠিকঠাক প্রামাণ্য নেই।আছে তবে তার উত্তর কি আদৌও মিলবে?এই লোক মাত্র একবছর যাবৎ পাগলা গারদে ছিলো।তার আগে?তার আগে আগে কোথায় ছিলো মুবাস্সির আদনান!
-"তীব্র তুমি তোমার সোর্স কাজে লাগাও।আমিও দেখছি কি করা যায়। কিন্তু সবার আগে বড়দা ভাইকে যে সতর্ক করতে হবে"(মেহের)
-"তোর জামাই আমাকে সেই প্রথম দিনেই সতর্ক করেছিলো। হয়তো আবেগে আপ্লুত হয়েছিলাম। তবে আমারও মনে হয় তিনি আমার পাপা নন।হতেই পারেন না"(মাহিন)
এই অসময়ে মাহিনকে ছাদে দেখে চমকায় মেহের।রাত অনেক গভীর।আজকের রাতটা অনেকের জন্যই কান্নার রাত।বাড়ির মেয়ের ঘরের ছেলে মরেছে।মায়া বেগম হয়তো বাবার কোলে মাথা রেখে বিড়বিড় করছেন আর কাঁদছেন।আর নূরিয়া হয়তো স্বামীর জন্য ফুটে ফুটে কাঁদছে।
-"বড়দা ভাই তুমি যদি জানতেই তাহলে তালুকদার বাড়ি ছাড়লে কেন?"(মেহের)
-"বোকা মেয়ে।এখানে থাকলে যে আমার পুরো পরিবারের ক্ষতি করতো ওই লোক।এখন তো শুধু আমার। মারিয়াম এতদিন বাবার বাড়ি ছিলো।সারিমের বিয়ের সময় আসলেও ওই বাড়ি এখনো ওকে নেইনি। এই বাড়িতেই আছে"(মাহিন)
-"দোস্ত আমার জন্য রিস্ক নিলি!চিন্তা করিস না তোর কিছু হবে না।ওই লোক তোর একটা চুলও ছিঁড়তে পারবে না।আমার লোক নজর রাখছে"(তীব্র)
-"তীব্র কেন এমন করলে?লোকটাকে প্রথমদিনই গোডাউনে নিয়ে মারলে হয়তো সব উগলে দিতো।এখন তো বড়দা ভাইয়ের জীবন সংকটে পড়বে"(মেহের)
-"জানো তো মেহের তুমি সবসময় আমার সিদ্ধান্তে সন্দেহ করো।আমি মাহিনের বন্ধু।ওর বিপদ হবে এমন কাজ করার আগে শতবার চিন্তা করেই করেছি"(তীব্র)
তীব্র মন খারাপ করে চলে যেতে নেয়।মেহেরেরও খারাপ লাগে অনেক।সত্যিই এতো এতো চিন্তা করতে গিয়ে সে বারবার কোনো না কোনো ভাবে তীব্রর মনে ঘা দেয়।তীব্রও তো মানুষ।কত সহ্য করতে পারবে।এতদিন তো মন খারাপ হলে বলতেও পারতো না।এখন পারছে এই অনেক।মেহের ইশারায় মাহিনকে নিজের অসহায়ত্ব বুঝিয়ে তীব্রকে সামলাতে বলে।মাহিন আগে থেকেই মেহেরের দিকে তাকিয়ে ছিলো তাই ইশারা বুঝি না সূচক মাথা নাড়িয়ে তীব্রর আগেই হনহনিয়ে বেরিয়ে যায়।যাওয়ার আগে ছাদের দরজাও লাগিয়ে যায় বাইরে থেকে।
-"মাহিন দরজা খুলে দে।ওই মাহিন"(তীব্র)
দরজায় সজোরে লাথি মারে তীব্র।না,এই আজও কারো কান অব্দি পৌঁছাবে না।তিনতলা পুরোটা ফাঁকা। দ্বিতীয়তলায় তো ফাঁকা। নিচতলায় আজ সবাই।আজ কি ঘুমানোর দিন নাকি!
-"তীব্র উত্তেজিত হয়ো না"(মেহের)
তীব্র কথা বলে না। অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে।রাগ কমানোর চেষ্টা করে।সে চায়না তার রাগ দেখে তার প্রিয়তমা কষ্ট পাক।সে সত্যিই চায় না এমনটা করতে।
-"তীব্র?"(মেহের)
-"কিছুক্ষণ নিরবতার আনন্দ নেই চলো"(তীব্র)
তীব্র নিজের রাগকে দমন করে মেহেরকে নিয়ে দোলনায় বসে।আকাশে মেঘ করেছে।সারা আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢেকে আছে।হয়তো ঝুম বৃষ্টি নামবে।দোলনার ওপর সুন্দর ছাউনি আছে।মাহিন যদি দরজা নাও খোলে তবুও ওরা বেশ এখানে রাত কাটাতে পারবে।
৮৫.
ভোরবেলা নূরিয়াকে ছাদে নিয়ে এসেছে তৃষ্ণা।একটু সতেজ হাওয়া পেলে ভালো লাগবে মেয়েটার।আর হাঁটাহাঁটি করলে শরীরটা নেতিয়ে পড়বে না।তবে বিশ্রামেরও প্রয়োজন শতভাগ।কালরাতে ঘুমায়নি কেউই।
নূরিয়ার চোখ আটকে গেছে দোলনায় ঘুমন্ত দুই পবিত্র প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ প্রেমিক-প্রেমিকার দিকে।তীব্র আর মেহের এখানেই ছিলো সারাটা রাত।শেষরাতের দিকে ঘুমিয়েছে।নূরিয়ার বুকের ভেতরে খুব করে জ্বালা হচ্ছে।তার সব ধ্বংস করে দিতে ইচ্ছে করছে।মন বলছে আমি ভালোবাসা না পেলে অন্যকেউ ভালোবাসা কেন পাবে!
তৃষ্ণা নূরিয়াকে হঠাৎ করে রাগতে দেখে ওর চোখ সইসই তাকায়।দুইজনকে একসাথে দেখে একটু হাসে।তবে অবাক হয় নূরিয়ার রেগে যাওয়া নিয়ে।পরে ভাবে হয়তো তূর্যয়কে হারিয়ে অন্য কাউকে তার ভালোবাসার মানুষটার এতো নিকটে দেখে ওর হিংসা হচ্ছে।তাই রাগ দেখাচ্ছে।
-"নূরিয়া সকাল তো ভালোই হয়েছে।চলো তোমায় দোতলায় রেখে আমি নিচে যাবো।রান্না বান্না করতে হবে।চলো"(তৃষ্ণা)
নূরিয়া ঠিট হয়ে দাঁড়িয়ে।মন চাচ্ছে হয়তো ছুটে গিয়ে ওদের আলাদা করার।তবে তা সম্ভব না।তাই নূরিয়া একাই নিচের দিকে যেতে নেয়। পিছুপিছু তৃষ্ণাও বেরিয়ে আসে। তৃষ্ণা জানে আর কিছুক্ষণ সেখানে থাকলে হয়তো নূরিয়া আরো হাইপার হয়ে যেতো।তাই নিয়ে আসা।হাইপার হওয়ার থেকে বারান্দায় বসে থাকুক তাও ঢের।
৮৬.
প্রায় অনেকগুলো দিন পর প্রিয় স্ত্রীর সাথে থাকছে মাহিন। এইযে এক ছাদের নিচে আছে এতেই মন যেন ওকে বলছে তোরই তো বউ, তোর কাছেই থাকবে;পালাবে নাকি।মারিয়াম রান্নাঘরে তৃষ্ণার সাথে কাজ করছে।আর কিছু নিয়ে আলোচনা করছে। তখনই রান্নাঘরে কেউ আসে।মায়া বেগম এসেছেন।ওদের দুইজনকে রান্না করতে দেখেই ক্ষেপে চিৎকার চেঁচামেচি করতে শুরু করেছেন। উন্মাদ হয়ে পড়েছেন তিনি।
-"আব্বা ,আব্বা আমার পোলা মরছে দুইদিনও হয়নাই এখনো।আর তোমরা ভোজ বানাও,ভোজ! আমার পোলার মৃত্যুর খাবার খাওয়ার এতো শখ!"
কি আজগুবি কথা বলছেন হয়তো মায়া বেগম নিজেও জানেন না। তানিয়া সকাল সকাল স্বামী নিয়ে হাঁটতে গিয়েছিলো।বাসায় ফিরেই চিৎকার চেঁচামেচি শুনে বিরক্ত হয় সে।কন্ঠ তার বড্ড চেনা।তার মা ছাড়া এভাবে কেউ চিৎকার করে না।
রান্নাঘরের দিক থেকে আওয়াজ পেয়ে সেদিকে এগিয়ে যায় সে।মারিয়াম আর তৃষ্ণার ওপর যে রাগ দেখাচ্ছেন কেন তা তানিয়া অল্প হলেও বুঝেছে। নিজের মাকে কি সে চিনবে না নাকি!তবুও আবারো সে তার মা'কে জিজ্ঞেস করে,
-"কি হইছে?"
-"তানিয়ারে আমার মৃত পোলার মৃত্যুর দুইদিনও হইলো না।আর এরা রান্না বান্না করে খাওয়া-দাওয়া করবো রে"(মায়া বেগম)
তানিয়া বিরক্ত হয় মায়ের মিথ্যা বলার ধরন দেখে।তবে সে এও জানে একজন মায়ের কাছে সন্তান কি!সে নিজের সন্তানদের ওপর দিয়ে এখন সব উপলব্ধি করে।তাইতো অন্যের কষ্ট বুঝতে পারে আগের তুলনায় অনেক বেশি।
-"মা তোমার হয়তো তূর্যয়ের জন্য কষ্ট হচ্ছে।তবে ওদের যে হচ্ছে না এমন না কিন্তু।তুমি তূর্যয়ের মা তাই তোমার কষ্ট সবার থেকে বেশিই হবে।আর তুমি এই বিষয়টা জানো।একারণে ওদের সাথে খারাপ আচরণ করছো না। বরং নূরিয়াকে এ বাড়িতে থাকতে দেওয়ার কারণে বলছো।আচ্ছা মা তুমি কি চাও তোমার ছেলের মতো তার শেষ চিহ্নও তোমার থেকে দূরে চলে যাক!"(তানিয়া)
-"শেষ চিহ্ন!মানে?"(মায়া বেগম)
-"মা নূরিয়া প্রেগন্যান্ট।তোমার ছেলের বাচ্চা ওর পেটে বড় হচ্ছে।ও মা হতে চলেছে"(তানিয়া)
মায়া বেগমের কথাটা শুনতে দেরি হলেও ছুটে যেতে দেরি হয়নি।যদিও তিনি নূরিয়াকে প্রথম থেকেই অপছন্দ করতেন,তবুও ছেলের শেষ সম্বলের কথা চিন্তা করে ছুটেছেন।
৮৭.
মাহিন ঘুম থেকে উঠেই দেখে মারিয়াম পাশে নেই।বেলা অনেক হয়েছে।চটপট উঠে পড়তে ওয়াশ রুম থেকে পানির শব্দ পায়।বুঝে যায় মারিয়াম হয়তো ওয়াশরুমে।মাহিন বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়।ওয়াশরুমে দরজা খোলার শব্দে সেদিকে চাইতেই যেন মোহনীয়তা গ্রাস করে তাকে।নারীর ভেজা চুল যখন গালে লেপ্টে থাকে তখন নাকি পুরুষের মাদকতার পরিমাণ বেড়ে যায় অনেকখানি।
মাহিনকে বিছানায় না দেখে এদিক ওদিক তাকাতেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে। অস্বস্তিরা ঘিরে ধরে তাকে। স্বামী-স্ত্রীর স্বাভাবিক সম্পর্ক এখনো তাদের নয় তাই হয়তো এই অস্বস্তি!
-"মারিয়াম আজ হসপিটালে একসাথে যাবো। অপেক্ষা করো"(মাহিন)
মাহিন ওয়াশরুমে ঢুকতেই যেন ঢোক গেলে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয় মারিয়াম।আর মাহিন সে তো ওয়াশরুমে ঢুকে বড় বড় শ্বাস ফেলছে।কি করতে যাচ্ছিলো সে ভেবেই লজ্জা লাগে তার।এরকম করবে সে ভাবেনি।এই কথা সত্যিই ঠিক ''পুরুষের ব্যক্তিত্ব ধ্বংসে নারীর অবস্থান সর্ব শিখরে তবে সেই নারী স্ত্রী হলে দুইজনের সম্মতিতে ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে দৃঢ়ভাবে।''
৮৮.
মুবাস্সির আদনান কোথাও থেকে এসেছেন মাত্র। ড্রয়িংরুমে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে সচেতন হয়ে নেন।যদিও বাড়ির চাবিটা ওনার কাছে!মুবাস্সির আদনান দেখতে পান বৃদ্ধ করে এক লোক বসে আছে সেখানে।মুখে তার অদ্ভুত রহস্যে ঘেরা হাসি ফুটে ওঠে।
-"এমপি সাহেবের হঠাৎ করে আমার কথা মনে পড়লো কিভাবে"(মুবাস্সির আদনান)
-"তোমার দলের লোক আমার ছেলেরে হত্যা করছে আর তুমি কি করো মিয়া!"(বৃদ্ধ লোক)
-"আরে আরে হাইপার হচ্ছেন কেন!আর আমার কিসের দল?আমি এই দলবলে নেই বাবা।শুধু শুধু ফাসাবেন না যেন"(মুবাস্সির আদনান)
-"জাবির..."(বৃদ্ধ লোক)
-"চিৎকার করবেন না এমপি।আমার পরিচয় যেন মুখ দিয়ে না বের হয়।প্লাস্টার সার্জারি করিনি ধরা পড়ার জন্য। নিজের মুখ বন্ধ রাখুন"(মুবাস্সির আদনান)
মুখ থমথমে হয়ে যায় বৃদ্ধের। হঠাৎ করে উনি কাঁপতে লাগেন।বসে পড়েন সোফাতে।এতো রিস্ক নিয়ে এখানে আসার মানেটা কি?কিছুই না।যার কাছে সাহায্যের জন্য আসা সেই তো বরং হুমকি ধামকি দিচ্ছে।
-"আহা এমপি মুখোশ সরিয়ে বসো। নিজের মুখোশ উৎযাপন করলেও তোমাদের ক্ষেত্রে আমি বিরক্ত হই।"
মুখ থেকে নকল দাঁড়ি আর চোখের কালো চশমা খুলতেই ওই বৃদ্ধ লোককে চেনা চেনা লাগে।।এ যে আমাদের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের এমপি।যার ছেলেকে কিছুদিন আগেই নির্মমভাবে খুন করেছিলো তীব্র। কারণ?কারণ ছিলো নারীর প্রতি অবিচার। তাদের জীবন ধ্বংস করে বিনোদন নেওয়া,পাচার করা, কুঠিবাড়ি চালানো প্রভৃতি।এমপি জুয়েল রানা।জঘন্য একজন মানুষ।উপরে যত ভালো ভিতরে তার চেয়েও শতগুণ খারাপ।
চলবে কি?
আসসালামুয়ালাইকুম ভাইয়া-আপুরা। পড়াশোনা নিয়ে সিরিয়াস হতে হচ্ছে।এখন অনেক চাপ এসে পড়েছে। সামনে সময় অনেক অল্প। একদিনে গল্প লেখাটা সম্পূর্ণ করা সম্ভব হচ্ছে না।তাই দুইদিন পরপর ইনশাআল্লাহ গল্প আসবে নিয়মিতভাবে। ভুল-ত্রুটিগুলো মার্জনার দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইলো।হ্যাপি রিডিং
গল্পটি সম্পর্কে রিভিউ, আলোচনা, সমালোচনা করুন আমাদের গ্রুপে। গ্রুপ লিংক নিচে দেওয়া হলোঃ
https://facebook.com/groups/holde.khamer.valobasa/