দ্বিতীয় অধ্যায়
পাঁচ মাস পরে
মাদারীপুরের সেই ঘটনার পর কেটে গেছে পাঁচটা মাস।
সেদিন রাতেই মাহভীর ঢাকায় ফিরে গিয়েছিল। তারপর থেকে নিজের কাজ আর ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল সে। লেক পার্কের সেই সন্ধ্যার কথা খুব একটা মনে করতে চাইত না।
সময় তার নিজের গতিতে এগিয়ে গেছে।
পাঁচ মাস পর—
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ব্যস্ত রাস্তা ধরে পাশাপাশি হাঁটছিল রাইসা আর মেহা।
দুজনের সম্পর্কটা শুধু বন্ধুত্বের ছিল না। মেহা রাইসার খালাতো বোন। ছোটবেলা থেকেই দুজন একসঙ্গে বড় হয়েছে। একই সঙ্গে পড়াশোনা, ঘোরাঘুরি, খাওয়া-দাওয়া—প্রায় সবকিছুতেই তারা একসঙ্গে। রাইসা যেখানে, মেহা সেখানেই। এমনকি বন্ধুদের কাছেও মেহা প্রায়ই মজা করে বলত, রাইসার ছায়া হয়ে থাকাটাই তার সবচেয়ে বড় কাজ।
দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। ক্লাস শেষ করে সেদিন তারা ক্যাম্পাসের বাইরে আসছিল।
রাইসার কাঁধে ব্যাগ। খোলা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। হাতে কয়েকটা বই। পাশে মেহা নিজের ব্যাগটা এক কাঁধে ঝুলিয়ে গল্প করতে করতে হাঁটছিল।
— কাল কিন্তু তুই আমার সঙ্গে লাইব্রেরিতে যাবি।
রাইসা বিরক্ত মুখে তাকাল।
— আবার?
— হ্যাঁ, আবার। তুই একা গেলে পাঁচ মিনিট পরেই হারিয়ে যাবি।
— আমি হারাই?
— হ্যাঁ। আর তারপর আমাকে ফোন করে বলিস, ‘মেহা, আমি কোথায়?’
রাইসা হেসে ফেলল।
— তুই না থাকলে আমার জীবনটা যে কত শান্ত হতো!
— মিথ্যা কথা বলিস না। আমাকে ছাড়া একদিনও চলতে পারবি না।
রাইসা কিছু বলার আগেই মেহার চোখ হঠাৎ রাস্তার ওপারে আটকে গেল।
সে থেমে গেল।
— রাইসা...
— কী?
— ওই লোকটাকে দেখ।
রাইসা থেমে মেহার দৃষ্টির দিকে তাকাল।
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন যুবক ফোনে কথা বলছিল।
মেহার চোখ বড় হয়ে গেল।
— আরে! উনাকে আমি চিনি!
রাইসা অবাক হয়ে তাকাল।
— কে?
— সেদিন লেক পার্কে যে লোকটা ছিল। যে লোকটা ওই মানুষটার সঙ্গে ছিল... যে তোকে বাঁচিয়েছিল।
রাইসার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
মাদারীপুরের সেই রাতটা তার মনে পড়ে গেল।
পানিতে পড়ে যাওয়া।
তারপর আর কিছু মনে নেই।
শুধু পরে মেহার কাছ থেকে শুনেছিল—একজন মানুষ তাকে পানি থেকে তুলে হাসপাতালে পাঠিয়েছিল।
রাইসা সেই মানুষটাকে কখনো ঠিকমতো দেখতেও পারেনি।
কৃতজ্ঞতাটা তাই তার মনের মধ্যে রয়ে গেছে।
সে আর কিছু না বলে মেহার সঙ্গে দ্রুত রাস্তা পার হয়ে সাকিনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
মেহা হাসিমুখে বলল,
— ভাইয়া!
সাকিন ফোনটা নামিয়ে তাকাল।
প্রথমে মেহাকে দেখে অবাক হলো। তারপর তার চোখ গিয়ে থামল রাইসার ওপর।
কয়েক মুহূর্তের জন্য সে চুপ করে রইল।
এই মেয়েটাই।
মাদারীপুর লেক পার্কের সেই মেয়েটা।
সাকিনের মনে সঙ্গে সঙ্গে “ওই মেয়েটার কথা আর কখনো আমার সামনে আনবি না।”
সাকিন দ্রুত নিজের অভিব্যক্তি স্বাভাবিক করে ফেলল।
রাইসা ভদ্রভাবে বলল,
— আপনি কি সেদিন লেক পার্কে ছিলেন?
— ছিলাম।
— তাহলে আপনি কি ওই মানুষটার বন্ধু?
সাকিন একটু থামল।
— হ্যাঁ।
রাইসার চোখে হালকা উচ্ছ্বাস ফুটে উঠল।
— উনি কোথায় থাকেন?
সাকিন বুঝে গেল, প্রশ্নটা কার জন্য।
— কেন?
— আমি উনার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই।
সাকিন সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
— সেটা সম্ভব না।
মেহা অবাক হয়ে বলল,
— কেন ভাইয়া? ও শুধু একবার দেখা করে ধন্যবাদ দিতে চায়।
— তবুও না।
রাইসা এবার নিজেই বলল,
— আমি কোনো সমস্যা করব না। শুধু একবার উনার সঙ্গে দেখা করতে চাই। উনি সেদিন আমার জীবন বাঁচিয়েছেন।
সাকিন কিছুক্ষণ রাইসার দিকে তাকিয়ে রইল।
মেয়েটার মুখে এমন এক সরলতা ছিল, যার সামনে কঠিনভাবে না বলা সহজ হচ্ছিল না।
তবুও সে জানত, মাহভীর তাকে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছে।
কারণটা সাকিন জানে।
কিন্তু সেই কারণ রাইসাকে বলা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
— রাইসা, তুমি কিছু মনে করো না। আমি সত্যিই তোমাকে উনার কাছে নিয়ে যেতে পারব না।
রাইসার মুখটা একটু মলিন হয়ে গেল।
— উনি কি... আমাকে দেখতে চান না?
সাকিন উত্তর দিল না।
মেহা রাইসার কাঁধে হাত রাখল।
— চল, রাইসা।
রাইসা যাওয়ার আগে আরেকবার সাকিনের দিকে তাকাল।
তার চোখে তখনও একটা প্রশ্ন।
কেন মানুষটা তার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে না?
সাকিন তাদের চলে যেতে দেখল।
তারপর নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
মাহভীরকে সে কথা দিয়েছিল।
এই মেয়েটার নামও আর তার সামনে উচ্চারণ করবে না।
কিন্তু আজ ভাগ্য নিজেই মেয়েটাকে তার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
এতকিছুর পরেও সাকিন এর মনটা আজ অবাধ্য হলো সে তরিঘরি করে রাইসা কে ডাকলো রাইসা ও সাথে সাথে দৌড় দিলো প্রশ্ন ছুড়লো -নেবেন ওনার কাছে?
সাকিন সুধু মাথা নেড়ে হ্যা সম্মতি দিলো