সাকিন শেষ পর্যন্ত নিজের সিদ্ধান্ত বদলেছিল।
মাহভীরের নিষেধের কথা তার ভালোভাবেই মনে ছিল। তবুও রাইসার সরল অনুরোধ আর কৃতজ্ঞতার ইচ্ছেটাকে একেবারে ফিরিয়ে দিতে পারেনি।
তাই কিছুক্ষণ পর রাইসা আর মেহাকে সঙ্গে নিয়ে সে এসে দাঁড়াল ঢাকার ব্যস্ততম এলাকার একটি বিশাল ভবনের সামনে।
দশতলা ভবনটি দূর থেকেই চোখে পড়ার মতো। কাঁচে ঘেরা দেয়ালে শহরের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। প্রবেশপথের দুপাশে সাজানো সবুজ গাছ, সামনে প্রশস্ত পাথরের পথ আর নিরাপত্তারক্ষীদের ব্যস্ত চলাচল—সব মিলিয়ে জায়গাটার মধ্যে ছিল এক ধরনের আভিজাত্য।
ভবনের বিশাল প্রবেশপথের ওপরে বড় অক্ষরে লেখা—
HIMI GROUP OF INDUSTRIES
রাইসা কয়েক মুহূর্ত নামটার দিকে তাকিয়ে রইল।
— এইটা উনার কোম্পানি?
সাকিন মাথা নাড়ল।
— হ্যাঁ।
মেহা চারপাশে তাকিয়ে বলল,
— বাহ! এত বড় কোম্পানি!
সাকিন মৃদু হেসে বলল,
— মাহিরের জগৎটাই এমন।
রাইসা কিছু বলল না।
তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা উত্তেজনা। পাঁচ মাস আগে যে মানুষটা তার জীবন বাঁচিয়েছিল, আজ প্রথমবার তার সামনে দাঁড়াবে সে।
সাকিন তাদের নিয়ে ভেতরে ঢুকল।
বিশাল লবি পেরিয়ে তারা লিফটে উঠল। দশতলায় পৌঁছাতেই চারপাশের পরিবেশ আরও শান্ত হয়ে গেল। কাচঘেরা একের পর এক কেবিন, দেয়ালে কোম্পানির অর্জনের স্মারক আর ব্যস্ত কর্মীদের চলাচল।
একটি কেবিনের সামনে এসে সাকিন থামল।
দরজার পাশে লেখা—
MAHVEER CHOWDHURY MAHIR
CEO
সাকিন দরজায় দুবার নক করল।
ভেতর থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল,
— Come in.
সাকিন দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল।
তার পেছনে রাইসা আর মেহা।
মাহভীর তখন নিজের ডেস্কে বসে ফোনে কথা বলছিল।
— হ্যাঁ, মা। বলেছি তো, আজকে সময় পাব না। মিটিংটা কালকে রাখো।
ঠিক তখনই তার চোখ দরজার দিকে গেল।
প্রথমে সাকিন।
তারপর—
রাইসা।
মাহভীরের কথা থেমে গেল।
এক মুহূর্তের জন্য তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শান্তি নেমে এলো।
কিন্তু পরক্ষণেই সেই শান্তি যেন আগুনে বদলে গেল।
তার চোখ কঠিন হয়ে উঠল।
— মা, আমি পরে কথা বলছি।
ফোন কেটে দিয়ে সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তার দৃষ্টি সরাসরি রাইসার ওপর।
— ও এখানে কী করছে?
সাকিন চুপ করে রইল।
রাইসা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
— আমি আসলে...
মাহভীর তাকে থামিয়ে দিল।
— তোমাকে আমি কিছু জিজ্ঞেস করেছি?
রাইসা থেমে গেল।
মেহা এবার বলল,
— উনি শুধু আপনাকে ধন্যবাদ দিতে—
— ধন্যবাদ?
মাহভীর তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
— একটা দুর্ঘটনায় কাউকে সাহায্য করলেই কি সারাজীবন তার কাছে গিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয়?
রাইসার মুখটা মলিন হয়ে গেল।
তবুও সে শান্তভাবে বলল,
— আমি শুধু একবার আপনাকে ধন্যবাদ বলতে চেয়েছিলাম।
— সেটা বলেছ। এবার যেতে পারো।
রাইসা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখে কষ্টটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
— আপনি এভাবে রেগে যাচ্ছেন কেনো?
মাহভীরের মুখ এক মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেল।
কিন্তু সে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করল না।
বরং আরও ঠান্ডা গলায় বললো
সেই কৈইফিরত তোমাকে দবো?
কথাটা রাইসার মনে গিয়ে আঘাত করল।
সে আর কিছু বলল না।
শুধু ধীরে মাথা নিচু করে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
মাহভীরের চোখ এক মুহূর্তের জন্য তার পেছনে গেল।
তারপর সে মুখ ফিরিয়ে নিল।
রাইসা বেরিয়ে যেতেই মেহাও সাকিনের দিকে তাকিয়ে বাইরে চলে গেল।
করিডোরে এসে রাইসা কিছু বলল না।
তার চোখে পানি জমে উঠেছে।
মেহা সঙ্গে সঙ্গে তার পাশে এসে দাঁড়াল।
— এই, মন খারাপ করিস না।
রাইসা ধীরে বলল,
— আমি তো শুধু ধন্যবাদ বলতে গিয়েছিলাম।
— জানি।
— তাহলে উনি আমার সঙ্গে এমন করলেন কেন?
মেহা বিরক্ত হয়ে বলল,
— লোকটাই বজ্জাত। তুই এত ভালো হয়ে তার কাছে ধন্যবাদ দিতে গিয়েছিস—এটাই তোর ভুল হয়েছে।
রাইসা মলিন হেসে বলল,
— হয়তো সত্যিই যাওয়া উচিত হয়নি।
মেহা তার হাত ধরে বলল,
— একদম না। তুই যা করেছিস, ঠিকই করেছিস। কারও জীবন বাঁচালে তাকে ধন্যবাদ দেওয়া অপরাধ না।
রাইসা আর কিছু বলল না।
শুধু একবার পেছনে ফিরে সেই কেবিনের দরজার দিকে তাকাল।
তারপর ধীরে ধীরে মেহার সঙ্গে চলে গেল।
অন্যদিকে কেবিনের ভেতর—
মাহভীর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
দরজা বন্ধ হয়ে গেছে।
তবুও তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে রাইসার সেই কষ্ট পাওয়া মুখটা।
মাহভীর চোখ বন্ধ করল।
কেন যেন কথা শোনানোর পরও তার ভেতরটা শান্ত হলো না।