অভিমান থেকে ভালোবাসা
দশম অধ্যায়
অনিচ্ছার বন্ধন
গুজবটা ছড়াতে খুব বেশি সময় লাগল না।
সেদিনের অনুষ্ঠানের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কথাটা এক কান থেকে আরেক কান ঘুরে পৌঁছে গেল দুই পরিবারের কাছে।
যে ঘটনাটা আসলে ছিল একেবারেই সাধারণ, মানুষের মুখে মুখে সেটাই হয়ে গেল অন্যরকম।
চৌধুরী বাড়ির ড্রয়িংরুমে সেদিন পরিবেশটা ছিল অস্বাভাবিকভাবে ভারী।
মিনহাজ চৌধুরী, সাথী চৌধুরী, মাহা আর মাহভীর বসে ছিল।
অন্যদিকে রাইসার বাবা আবু সায়েদ শেখ, মা লিজা শেখ এবং মেহার বাবা-মাও উপস্থিত।
রাইসা মাথা নিচু করে বসে ছিল। তার পাশে মেহা শক্ত করে তার হাত ধরে রেখেছিল।
কিছুটা দূরে প্রিয়া আর স্মৃতি নীরবে বসে ছিল। দুজনের মুখেই দুশ্চিন্তার ছাপ।
অন্যদিকে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল সাকিন। তার সঙ্গে সাকাজ্জাদ আর রহিমও ছিল।
সাকিন মাহভীরকে অনেক বছর ধরে চেনে। তাই বন্ধুর মুখের রাগের আড়ালে থাকা অস্থিরতাটাও সে বুঝতে পারছিল।
মিনহাজ চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— আমরা কেউই চাই না একটা ভুল বোঝাবুঝি এতদূর যাক। কিন্তু কথাটা এখন বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে।
আবু সায়েদ নিচু গলায় বললেন,
— আমরা জানি, আমার মেয়ে এমন কিছু করেনি।
লিজা মেয়ের হাতটা আরও শক্ত করে ধরলেন।
— আমার রাইসাকে আমি চিনি।
মেহা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— আমিও জানি, রাইসা এমন কিছু করেনি।
প্রিয়া মাথা নেড়ে বলল,
— আমরাও ওর সঙ্গে ছিলাম।
স্মৃতি ধীরে বলল,
— ঘটনাটা যেমন বলা হচ্ছে, আসলে তেমন কিছুই হয়নি।
মাহভীর এতক্ষণ চুপ ছিল।
তার চোয়াল শক্ত হয়ে ছিল।
হঠাৎ মিনহাজ চৌধুরী বললেন,
— একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
মাহভীর সঙ্গে সঙ্গে তাকাল।
— কী সিদ্ধান্ত?
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর মিনহাজ বললেন,
— তোমাদের দুজনের বিয়ের কথা আমরা ভাবছি।
মাহভীর যেন কথাটা বিশ্বাসই করতে পারল না।
সে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
— কী?!
সাকিন মাথা নিচু করল। সে আগেই বুঝেছিল, মাহভীর এই কথাটা সহজে নেবে না।
মাহভীর কঠিন গলায় বলল,
— আমি এই বিয়ে করব না।
সাকাজ্জাদ আর রহিম একে অপরের দিকে তাকাল।
মাহভীর আবার বলল,
— দয়া করে কেউ আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন না। আমি পরিষ্কার বলছি—এই বিয়ে আমার পক্ষে সম্ভব না।
তারপর তার দৃষ্টি গিয়ে থামল রাইসার ওপর।
রাইসা মাথা নিচু করেই বসে ছিল।
মাহভীর তিক্ত হেসে বলল,
— কী হলো? এখন চুপ করে আছ কেন? সবাইকে তো খুব ভালোভাবে নিজের পক্ষে দাঁড় করাতে পেরেছিস।
রাইসা অবাক চোখে তাকাল।
— আমি কাউকে কিছু করতে বলিনি।
— অভিনয়টা আমার সামনে করিস না।
— আমি সত্যিই কিছু করিনি।
মাহভীর তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
— বাহ! কী সুন্দর নির্দোষ সাজতে পারিস!
মেহা আর চুপ থাকতে পারল না।
— মাহভীর, আপনি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন।
মাহভীর ঠান্ডা চোখে তাকাল।
— আমি তোমার সঙ্গে কথা বলছি না।
তারপর আবার রাইসার দিকে তাকাল।
— নষ্ট মেয়ে! আমাকে ফাঁসিয়ে বিয়ে করার জন্য এত নাটক করার কী দরকার ছিল?
রাইসার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
স্মৃতি উঠে দাঁড়াতে চাইলে প্রিয়া তার হাত ধরে থামিয়ে দিল।
সাকিন এবার ধীরে বলল,
— মাহির, শান্ত হ।
মাহভীর তাকাল তার দিকে।
— তুইও চুপ থাক, সাকিন।
সাকিন আর কিছু বলল না।
সে জানত, এখন মাহভীরের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই।
মাহভীর আবার রাইসার দিকে তাকিয়ে বলল,
— টাকা চাই? আমার নাম চাই? Chowdhury Group-এর উত্তরাধিকারীর সঙ্গে বিয়ে হলে জীবন বদলে যাবে, তাই না?
রাইসার চোখে পানি জমে উঠল।
সে খুব আস্তে বলল,
— আমার আপনার টাকা-পয়সার কোনো প্রয়োজন নেই।
— তাহলে প্রমাণ কর।
রাইসা থেমে গেল।
— কীভাবে?
মাহভীর ঠান্ডা গলায় বলল,
— আমার জীবন থেকে দূরে গিয়ে।
কথাটা শুনে রাইসার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
মাহভীর আবার বলল,
— একটা কথা মনে রাখিস, আমার জীবনে ঢোকার জন্য যতই চেষ্টা করিস, তুই কখনো আমার জায়গা নিতে পারবি না।
রাইসা বুঝতেই পারছিল না, মাহভীর কোন জায়গার কথা বলছে।
তবু প্রশ্ন করার সাহস হলো না।
মাহভীর তিক্ত স্বরে বলল,
— আমাকে ফাঁসিয়ে নিজের জায়গা বানানোর চেষ্টা করছিস? আমার নামের সঙ্গে নিজের নাম জুড়ে দিলেই কি আমার জীবনটা তোর হয়ে যাবে?
সাথী এবার ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— মাহভীর, যথেষ্ট হয়েছে।
মাহভীর মায়ের দিকে তাকাল।
— মা, তুমি-ও কি আমাকে এই মেয়েকে বিয়ে করতে বলবে?
সাথী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— আমি রাইসাকে অপছন্দ করি না। কিন্তু এই পরিস্থিতি আমি মেনে নিতে পারছি না।
মাহা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— মা, রাইসা তো কোনো দোষ করেনি।
সাথী মেয়ের দিকে তাকালেন।
— মাহা, এখন চুপ থাক।
মাহা চুপ করে গেল।
মিনহাজ দৃঢ় গলায় বললেন,
— একটা মেয়ের সম্মান নিয়ে সমাজে কথা উঠেছে। আমরা বিষয়টা এভাবে শেষ হতে দিতে পারি না।
আবু সায়েদ মাথা নিচু করে বললেন,
— আমরাও মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত।
লিজা মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন,
— আমার মেয়ের কোনো দোষ নেই।
মেহার চোখে পানি এসে গেল।
— খালাম্মু, রাইসা সত্যিই কিছু করেনি।
প্রিয়া ধীরে বলল,
— আমরা সবাই জানি।
স্মৃতিও মাথা নেড়ে বলল,
— ওর ওপর অন্যায় হচ্ছে।
সাকিন এতক্ষণ চুপ করে সব শুনছিল।
সে জানত, মাহভীরের জীবনে একটা অতীত আছে। এমন একটা অতীত, যার নাম উচ্চারণ করতেও মাহভীর পছন্দ করে না।
সাকিন বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বুঝল—
মাহভীর রাইসার ওপর যতটা রাগ দেখাচ্ছে, তার একটা বড় অংশ আসলে নিজের ভেতরের পুরোনো কষ্ট থেকে আসছে।
কিন্তু সে কিছু বলল না।
মিনহাজ এবার শেষ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন,
— এই বিয়ে হবে।
মাহভীর দাঁত চেপে বলল,
— আমি রাজি নই।
— তোমার রাজি-না রাজি শোনার মতো অবস্থায় আমরা নেই।
— বাবা—
— যথেষ্ট হয়েছে, মাহভীর।
মাহভীর চুপ করে গেল।
রাইসা মাথা নিচু করে বসে রইল।
তার পাশে মেহা হাতটা শক্ত করে ধরে ছিল।
মেহা ফিসফিস করে বলল,
— ভয় পাস না। আমি আছি।
রাইসা কোনো উত্তর দিল না।
শুধু চোখের পানি মুছে নিল।
---
কয়েকদিন পর।
চৌধুরী বাড়ি আলোয় ঝলমল করছে।
চারপাশে আত্মীয়স্বজনের ভিড়।
ফুল, আলো আর সাজসজ্জায় পুরো বাড়িটাই যেন অন্যরকম হয়ে উঠেছে।
কিন্তু এই উৎসবের মাঝেও দুজন মানুষের মুখে কোনো আনন্দ নেই।
রাইসা চুপচাপ বসে আছে।
মেহা, প্রিয়া আর স্মৃতি তার পাশে।
মেহা আস্তে বলল,
— ভয় পাচ্ছিস?
রাইসা মাথা নাড়ল।
— জানি না।
প্রিয়া তার হাত ধরল।
— আমরা সবাই আছি।
স্মৃতি চোখ মুছে বলল,
— কাঁদবি না। আজকে তুই কাঁদলে আমরাও কাঁদব।
রাইসা মৃদু হেসে ফেলল।
অন্যদিকে সাকিন, সাকাজ্জাদ আর রহিম মাহভীরের পাশে দাঁড়িয়ে।
সাকাজ্জাদ নিচু গলায় বলল,
— ভাই, শেষবারের মতো বলছি... যা করার ভেবে করিস।
মাহভীর কোনো উত্তর দিল না।
রহিম বলল,
— আমরা তোকে জোর করছি না। কিন্তু এত রাগ নিয়ে একটা সম্পর্ক শুরু করা সহজ হবে না।
মাহভীর ঠান্ডা গলায় বলল,
— সম্পর্ক?
সে তিক্তভাবে হেসে উঠল।
— আমি এই বিয়েকে কোনো সম্পর্কই মনে করি না।
সাকিন চুপচাপ বন্ধুর দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো, সময় একদিন মাহভীরকে নিজের কথার হিসাব নিতেই বাধ্য করবে।
---
নিকাহের সময় সামনে বসে মাহভীর একবারও রাইসার দিকে তাকাল না।
কাজি যখন সম্মতির কথা জিজ্ঞেস করলেন, মাহভীর কিছুক্ষণ নীরব রইল।
ঘরের সবাই নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করল।
তারপর সে নিচু, কঠিন গলায় বলল—
— কবুল।
একবার।
আবার—
— কবুল।
তৃতীয়বার—
— কবুল।
অন্যদিকে রাইসার কাঁপা কণ্ঠে তিনবার উচ্চারিত হলো—
— কবুল।
ঘরের একপাশে মেহা চোখের পানি মুছল।
প্রিয়া আর স্মৃতি একে অপরের হাত ধরে রইল।
মাহা চুপচাপ রাইসার দিকে তাকিয়ে ছিল।
সাথী চৌধুরীর মুখে মিশ্র অনুভূতি।
আর সাকিন শুধু মাহভীরের দিকে তাকিয়ে ছিল।
দুটি শব্দ।
একটি বিয়ে।
আর দুজন মানুষের সম্পূর্ণ ভিন্ন অনুভূতি।
রাইসার চোখে অজানা ভবিষ্যতের ভয়।
মাহভীরের মনে রাগ, অভিমান আর এক অদৃশ্য অতীতের ভার।
সেদিন থেকেই শুরু হলো তাদের নতুন সম্পর্ক।
ভালোবাসা দিয়ে নয়।
অভিমান দিয়ে।
আর কেউ জানত না—
এই অনিচ্ছার বন্ধনই একদিন তাদের দুজনের সবচেয়ে গভীর অনুভূতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
**চলবে...**