ফন্ট সাইজ:
থিম:
অন্ধকার শেষে আলোর দেখা

১১তম পর্ব

লেখক: Rahiya sheikh Raisa
বিয়ের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে হতে রাত অনেকটা গড়িয়ে গিয়েছিল।
চৌধুরী বাড়ির দোতলায়, সিঁড়ির শেষ মাথায় থাকা মাহভীরের ঘরটায় নেমে এসেছিল এক অস্বস্তিকর নীরবতা।
রাইসা বিছানার একপাশে বসে ছিল।
লাল শাড়ির আঁচলটা তার কোলে এলিয়ে পড়েছে। হাতভর্তি মেহেদি, গলায় বিয়ের গয়না, কপালে ছোট্ট টিপ—সব মিলিয়ে তাকে সত্যিই নববধূর মতো লাগছিল।
শুধু তার চোখ দুটোতে কোনো বিয়ের আনন্দ ছিল না।
দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই হঠাৎ দরজাটা খুলে গেল।
মাহভীর ঘরে ঢুকল।
রাইসা ধীরে উঠে দাঁড়াল।
— আপনি...
মাহভীর একবার তার দিকে তাকিয়েই মুখ ফিরিয়ে নিল।
তার চোখে বিরক্তি।
— এই সাজগোজ করে আমার ঘরে বসে আছিস কেন?
রাইসা থমকে গেল।
— এটা তো এখন আমারও ঘর...
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই মাহভীর তীক্ষ্ণ হেসে উঠল।
— তোর ঘর?
সে কয়েক পা এগিয়ে এল।
— একটা বিয়ের কাগজে নাম উঠে গেছে বলেই তুই ভাবছিস, এই বাড়ি, এই ঘর, আমার জীবন—সবকিছুর ওপর তোর অধিকার হয়ে গেছে?
রাইসা চুপ করে রইল।
মাহভীরের কণ্ঠ আরও কঠিন হলো।
— সত্যি বল তো, কত টাকার লোভে এতদূর পর্যন্ত নাটক করলি?
রাইসার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
— আমি কোনো নাটক করিনি।
— নষ্ট মেয়ে!
শব্দটা ঘরের নীরবতা ছিন্ন করে বেরিয়ে এল।
রাইসার চোখ মুহূর্তেই ভিজে উঠল।
মাহভীর থামল না।
— টাকার লোভে আমার পরিবারকে ব্যবহার করেছিস।বলতে পারতি কতো চাই দিয়ে দিতাম।  মানুষের সামনে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করেছিস যে শেষ পর্যন্ত আমাকে তোকে বিয়ে করতেই হলো।
— আপনি ভুল ভাবছেন...
— তুই আমাকে বোঝাবি?
রাইসা এবার কাঁপা গলায় বলল,
— আমি আপনার কোনো ক্ষতি করিনি। আমাকে অপমান করার অধিকার আপনার নেই।
মাহভীরের চোখ রাগে জ্বলে উঠল।
— অধিকার?
সে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
— তুই আমার জীবনে ঢুকে পড়েছিস জোর করে, তারপর এখন আমাকে অধিকার শেখাচ্ছিস?
— আমি জোর করে ঢুকিনি!
— চুপ!
রাইসা এবারও থামল না।
— আমিও এই বিয়ে চাইনি।
মাহভীর কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর দাঁত চেপে বলল,
— তাহলে আমার জীবনটা নষ্ট করার আগে ভাবা উচিত ছিল।
রাইসার চোখ থেকে এবার অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
— আমার জন্য আপনার জীবন নষ্ট হয়নি।
— হয়েছে!
মাহভীরের গলা কেঁপে উঠল রাগে।
— তুই আসার পর থেকেই হয়েছে!
রাইসা মাথা তুলে তাকাল।
— তাহলে আমাকে কেন বিয়ে করলেন?
প্রশ্নটা যেন মাহভীরের শেষ ধৈর্যটুকুও কেড়ে নিল।
সে পাশের টেবিলের ওপর রাখা ফুলদানিটা তুলে মেঝেতে ছুড়ে ফেলল।
ঝনঝন শব্দে ফুলদানিটা ভেঙে ছড়িয়ে গেল।
রাইসা ভয় পেয়ে এক পা পিছিয়ে গেল।
মাহভীরের বুক ওঠানামা করছে।
— আমার সঙ্গে তর্ক করার সাহস দেখাস না।
রাইসা চোখের পানি মুছে বলল,
— আমি শুধু নিজের সম্মানের জন্য কথা বলেছি।
মাহভীর আরও ক্ষিপ্ত হয়ে টেবিলের ওপর থাকা কয়েকটা জিনিস মেঝেতে ফেলে দিল।
— তোর সম্মান?
তার কণ্ঠে তীব্র তাচ্ছিল্য।
— যে মেয়ে টাকার জন্য ছেলে পটিয়ে বিয়ে করতে পারে তাকে আবার সম্মান?হাসালি। 
রাইসা এবার আর কিছু বলল না।
তার মনে হলো, আরও একটা কথা বললেই হয়তো তার ভেতরের শেষ শক্তিটুকুও ভেঙে যাবে।
মাহভীর দরজার কাছে গিয়ে থামল।
দরজা খুলে বেরিয়ে যাওয়ার আগে বলল,
— আর আমার সামনে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করিস না। তোর কোনো কথাই আমি বিশ্বাস করি না।
দরজা প্রচণ্ড শব্দে বন্ধ হলো।
রাইসা একা দাঁড়িয়ে রইল।
মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলোর দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো—
কিছু সম্পর্ক ভাঙার শব্দ কাঁচের মতো শোনা যায় না।
তারা ভাঙে নিঃশব্দে—একজন মানুষের বিশ্বাসের ভেতর।
রাইসা ধীরে বিছানায় গিয়ে বসে পড়ল।
তারপর আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
নীরবে কাঁদতে কাঁদতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল, সে নিজেও জানল না।
সকাল ৮টা
সূর্যের আলো জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে এসে পড়েছে।
রাইসার চোখ খুলল ধীরে।
কয়েক মুহূর্ত সে স্থির হয়ে শুয়ে রইল।
তারপর রাতের সবকিছু মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা আবার ভার হয়ে গেল।
সে পাশে তাকাল।
মাহভীর নেই।
সারা রাতেও সে ফেরেনি।
রাইসা ধীরে উঠে বসল।
মেঝেতে এখনও রাতের ভাঙা ফুলদানির কয়েকটা টুকরো পড়ে আছে।
সে সেগুলোর দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর নিজের চোখের পানি মুছে নিচে নেমে গেল।
দোতলা থেকে নিচে নামতেই মাহার সঙ্গে দেখা হলো।
মাহা রাইসার মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝে গেল, রাতটা ভালো কাটেনি।
তবু কিছু জিজ্ঞেস করল না।
শুধু ধীরে বলল,
— ভাবি...
রাইসা থেমে গেল।
— বাইরে আমাকে এভাবে ডাকবে না। কেউ জানে না তো।
মাহা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
— জানি। বাইরে তুমি আমার বন্ধু। কিন্তু বাড়ির ভেতরে তুমি আমার ভাবি।
রাইসার চোখ নরম হয়ে এল।
মাহা তার হাত ধরে বলল,
— চলো, নাশতা করো।
ডাইনিংয়ে সাথী চৌধুরী বসেছিলেন।
রাইসাকে দেখেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
— মা, এসো।
রাইসা একটু ইতস্তত করে কাছে গেল।
সাথী তার মুখের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বললেন,
— ঘুম হয়েছে?
রাইসা মিথ্যা হাসল।
— হ্যাঁ।
সাথী বুঝলেন।ছেলে যে রাতরে বাড়ি ফেরেনি তা তার অজানা নয়।
কিন্তু আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।
শুধু নিজের হাতে তার প্লেটে খাবার তুলে দিয়ে বললেন,
— আগে কিছু খেয়ে নাও। খালি পেটে মন খারাপ আরও বেশি লাগে।
রাইসা চুপচাপ বসে পড়ল।
মাহা পাশে বসে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
সাথী বললেন,
— নতুন জায়গা। সময় লাগবে মানিয়ে নিতে। কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে আমাকে বলবে।
রাইসার গলা ভার হয়ে এল।
— জি, মা।
সেই মুহূর্তে নিজের অজান্তেই তার চোখে পানি চলে এল।
সাথী কিছু না বলে তার মাথায় হাত রাখলেন।
এই বাড়ির একজন মানুষ তাকে সবচেয়ে বেশি আঘাত দিয়েছে।
অথচ সেই মানুষটির মা-ই আজ তার মাথায় মায়ের মতো হাত রাখছেন।
জীবনের হিসাবগুলো কখনো কখনো সত্যিই অদ্ভুত।
ঠিক তখনই রাইসার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে নাম—
মেহু।
রাইসা ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে মেহার উদ্বিগ্ন কণ্ঠ ভেসে এল,
— রাইসা! কেমন আছিস?
রাইসা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
— ভালো আছি।
মেহা সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেল।
— মিথ্যা বলছিস।
রাইসার ঠোঁট কেঁপে উঠল।
— মেহা...
— কী হয়েছে?
রাইসা জানালার বাইরে তাকাল।
সকালের রোদে চৌধুরী বাড়ির উঠানটা ঝলমল করছে।
সে ধীরে বলল,
— কিছু না। পরে তোকে সব বলব।
মেহা নরম গলায় বলল,
— যা-ই হোক, মনে রাখিস—তুই একা না।
রাইসা চোখ বন্ধ করল।
একটা দীর্ঘশ্বাস বুক থেকে বেরিয়ে এল।
হয়তো সে সত্যিই একা নয়।
কিন্তু যে মানুষটার সঙ্গে আজ থেকে তার জীবন ভাগ হওয়ার কথা—
সেই মানুষটাই তো তার পাশে নেই।
আর দূরে কোথাও, রাতভর বাড়ির বাইরে থাকা মাহভীর তখনও জানত না—
তার বলা প্রতিটি নিষ্ঠুর শব্দ রাইসার মনে কতটা গভীর দাগ রেখে গেছে।
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন