কয়েকটা দিন কেটে গেছে।
রাইসা যেন নিজের চারপাশে অদৃশ্য এক দেওয়াল তুলে নিয়েছে।
সে কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছে না, কিন্তু আগের মতো আপনও হচ্ছে না। প্রয়োজনের কথা বলে, প্রয়োজন শেষ হলে চুপচাপ নিজের ঘরে চলে যায়।
মাহার সঙ্গে আগের মতো হাসাহাসি নেই।
মেহা, প্রিয়া কিংবা স্মৃতির সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডা নেই।
আর মাহভীর?
তার সঙ্গে তো প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি শব্দও নয়।
মাহভীর প্রথমে বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয়নি।
বরং মনে মনে ভেবেছিল,
এটাই তো চেয়েছিলাম।
কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, রাইসার এই বদলে যাওয়া আচরণটা তার চোখে তত বেশি পড়ছে।
একদিন বিকেলে মাহভীর অফিসে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি দিয়ে নামছিল।
রাইসা তখন নিচে দাঁড়িয়ে মাহার সঙ্গে কথা বলছিল।
মাহা কিছু একটা বলতেই রাইসা মৃদু হেসে উঠল।
মাহভীরের পা থেমে গেল।
হাসিটা খুব সামান্য।
কিন্তু তার চোখে পড়ল—রাইসা তার দিকে একবারও তাকাল না।
তারপর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মাহার এক পরিচিত ছেলের সঙ্গে রাইসা সৌজন্যবশত দু-একটা কথা বলল।
ব্যস।
মাহভীরের মনে সঙ্গে সঙ্গে অন্য একটা অর্থ তৈরি হয়ে গেল।
*আমাকে হাসি দিয়ে কাছে টানতে পারেনি, তাই এখন আমাকে এড়িয়ে অন্য ছেলেদের মনোযোগ পাওয়ার চেষ্টা করছে।*
তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
সে আর কিছু না বলে বেরিয়ে গেল।
---
সেদিন সন্ধ্যায় মাহা আর রাইসা তার ঘরে বসে ছিল।
মাহা একটা পুরোনো business document গোছাচ্ছিল।
রাইসার চোখ হঠাৎ একটা ফাইলের ওপর আটকে গেল।
ফাইলের ওপরে লেখা—
HIMI GROUP OF INDUSTRIES
রাইসার ভ্রু কুঁচকে গেল।
এই নামটা সে আগে দেখেছে।
হঠাৎ মনে পড়ল—কয়েকদিন আগে মাহভীর অফিসে যাওয়ার সময় company এর এই নামটা দেখেছিল।
সে জানে, Himi Group of Industries মাহভীরের নিজের প্রতিষ্ঠান।
আর Chowdhury Group of Industries তাদের পরিবারের business।
তবু একটা প্রশ্ন তার মাথায় ঘুরতে লাগল।
রাইসা ফাইলটার দিকে তাকিয়ে বলল,
— মাহা?
— হুম?
— একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
— কর।
— তোমাদের ভাইয়ার নিজের company-র নাম Himi Group কেন?হিমি কে?এটা তোহ কোনো মেয়ের নাম।
মাহার হাত থেমে গেল।
রাইসা সেটা খেয়াল করল।
— কী হলো?
— কিছু না।
— তাহলে বল না।
মাহা ফাইলটা বন্ধ করে রাখল।
— জানি না।
রাইসা অবাক হলো।
— তুই জানিস না?
— না।
— কিন্তু এটা তো ভাইয়ার নিজের company। তাহলে নামটা কার?
মাহা এবার চুপ করে গেল।
রাইসার কৌতূহল আরও বাড়ল।
— Himi কে?
মাহা এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল।
— রাইসা, এই ব্যাপারে আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করিস না।
— কেন?
— কারণ... আমি বলতে পারব না।
— ওনি নিষেধ করেছে?
মাহা উত্তর দিল না।
সেই নীরবতাই যেন উত্তর হয়ে গেল।
রাইসা ধীরে বলল,
— এতটা serious ব্যাপার?
মাহা নিচু গলায় বলল,
— তুই শুধু এই বিষয়টা ছেড়ে দে।
রাইসা আর প্রশ্ন করল না।
কিন্তু তার কৌতূহল একটুও কমল না।
বরং মনে হলো, একটা নামের আড়ালে নিশ্চয়ই অনেক পুরোনো গল্প লুকিয়ে আছে।
---
রাতের দিকে মাহভীর বাড়ি ফিরল।
রাইসা তখন করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিল।
মাহভীর তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ থেমে গেল।
— কী করছিস?
রাইসা শান্ত গলায় বলল,
— কিছু না।
— সারাদিন তো কিছুই করিস না।
রাইসা চুপ।
মাহভীরের বিরক্তি বাড়ল।
— আগে এত কথা বলতিস। এখন মুখে তালা পড়েছে কেন?এখন কি বুঝে গেছিস যে আমাকে পাওয়া অসম্ভব?
রাইসা ধীরে বলল,
— আপনি তো চেয়েছিলেন আমি আপনাকে বিরক্ত না করি।
মাহভীর তাচ্ছিল্যের হাসি দিল।
— হ্যাঁ। কিন্তু এখন বুঝছি, তোর নীরবতার পেছনেও অন্য হিসাব আছে।
রাইসা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— কী হিসাব?
— আমাকে দিয়ে যখন আর নিজের ইচ্ছেমতো কিছু করাতে পারছিস না, তখন এখন অন্য ছেলেদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিস?
রাইসার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
— আপনি কী বলছেন?
— যা দেখছি তাই বলছি।
— আপনি ভুল বুঝছেন।
— আমি ভুল বুঝছি?
মাহভীরের কণ্ঠ আরও কঠিন হয়ে উঠল।
— এতদিন আমাকে হাসি দিয়ে, কথা বলে, অকারণে জ্বালিয়ে কাছে টানার চেষ্টা করেছিস। কাজ হয়নি। এখন আবার অন্যদিকে মনোযোগ দিচ্ছিস।
রাইসা কষ্ট পেলেও শান্ত রইল।
— আমি কারও মনোযোগ পাওয়ার চেষ্টা করছি না।
— অবশ্যই বলবি না।
— সত্যিই না।
মাহভীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
— তোর ওপর বিশ্বাস করার মতো কোনো কারণ তুই আমাকে দিসনি।
কথাটা রাইসার বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে বিঁধল।
তবুও সে কোনো প্রতিবাদ করল না।
শুধু আস্তে বলল,
— ঠিক আছে।
মাহভীর যেন আরও রেগে গেল।
— এই ‘ঠিক আছে’ বলা বন্ধ কর। সব কথায় এমন নির্লিপ্ত হয়ে থাকিস কেন?
রাইসা তার দিকে তাকাল।
চোখে কষ্ট ছিল, কিন্তু গলায় কোনো অভিযোগ নেই।
— কারণ এখন আমি বুঝে গেছি, আপনাকে কিছু বোঝানোর কোনো লাভ নেই।
মাহভীর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
রাইসা পাশ কাটিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
দরজা বন্ধ করার আগে একবারও পেছনে তাকাল না।
মাহভীর করিডোরে দাঁড়িয়ে রইল।
তার রাগ কমেনি।
বরং নিজের মনেই একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল—
রাইসা যদি তাকে এড়িয়ে অন্য কারও attention খুঁজে থাকে, তাহলে সে নিজেও আর কখনো তাকে গুরুত্ব দেবে না।
কিন্তু সে জানত না—
রাইসার জীবনে অন্য কোনো ছেলে আসেনি।
রাইসার মনে তখন শুধু একটা নাম ঘুরছে।
Himi।
আর সেই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাহভীরের জীবনের এমন এক সত্য, যার মুখোমুখি হলে এই ভুল বোঝাবুঝির সব হিসাব বদলে যাবে।
চলবে...