চৌধুরী বাড়ির সকালটা আজও অন্যসব দিনের মতোই ছিল।
ঘড়ির কাঁটা নিজের নিয়মে এগিয়ে চলেছে, রান্নাঘর থেকে বাসনপত্রের শব্দ ভেসে আসছে, নিচতলার বারান্দায় মিনহাজ চৌধুরী পত্রিকা নিয়ে বসে আছেন।
শুধু একজনের মধ্যে যেন সময় থেমে আছে।
রাইসা।
আগের মতোই সে সবার কাজে হাত লাগায়। সাথী বেগম কিছু বললে হাসিমুখে উত্তর দেয়, মাহা ডাকলে তার পাশে বসে, খাওয়ার সময় সবার সঙ্গে টেবিলে থাকে।
কিন্তু তার কথাগুলো এখন খুব ছোট।
হাসিটাও খুব অল্প।
আর সবচেয়ে বেশি বদলে গেছে তার চোখ।
আগের সেই চঞ্চল চোখ দুটো এখন কেমন শান্ত হয়ে গেছে।
যেন অনেক কথা বলার পর শেষ পর্যন্ত সে বুঝে গেছে—সব কথা বলা যায় না।
মাহা দূর থেকে রাইসাকে দেখছিল।
কয়েকদিন আগেও এই মেয়েটাকে চুপ করানো ছিল অসম্ভব।
আজ তাকে কথা বলানোর জন্যও যেন একটা কারণ লাগে।
মাহার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল।
কিন্তু সে জানে, এই নীরবতার পেছনে কারও অজানা কোনো কারণ নেই।
কারণটা সবাই জানে।
শুধু কেউ মুখে আনতে চায় না।
দুপুরের দিকে মাহভীর অফিসে যাওয়ার জন্য নিচে নামল।
সিঁড়ির কাছে এসে তার চোখ পড়ল রাইসার ওপর।
রাইসা তখন সাথী বেগমের সঙ্গে বসে কিছু একটা গুছিয়ে দিচ্ছিল।
সাথী বেগম মজা করে কী যেন বললেন।
রাইসা হেসে উঠল।
খুব ছোট্ট একটা হাসি।
কিন্তু সেই হাসিটা মাহভীরের চোখে আটকে গেল।
কারণ কয়েক সেকেন্ড পর রাইসার চোখ তার দিকে পড়তেই হাসিটা মিলিয়ে গেল।
মাহভীর থেমে গেল।
আগে হলে এই মেয়েটা তাকে দেখেই কোনো না কোনো কথা বলত।
এখন শুধু চোখ নামিয়ে নেয়।
মাহভীরের ভেতরটা অকারণে খারাপ হয়ে গেল।
সে নিজেকে বোঝাল,
এটাই তো চেয়েছিলাম।
তাহলে এই অস্বস্তিটা কেন?
সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে মাহভীর দেখল রাইসা বারান্দায় বসে আছে।
হাতে বই।
মাহভীর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় থেমে গেল।
— কী পড়ছিস?
রাইসা বই থেকে চোখ তুলে তাকাল।
— উপন্যাস।
— ভালো লাগছে?
— হুম।
আবার নীরবতা।
মাহভীর কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর একটু বিরক্ত গলায় বলল,
— তুই কি এখন শুধু এক-দুই শব্দেই কথা বলিস?
রাইসা শান্তভাবে বইটা বন্ধ করল।
— আপনি তো বেশি কথা পছন্দ করেন না।
কথাটা খুব স্বাভাবিকভাবে বলা।
কোনো অভিযোগ নেই।
কোনো অভিমান দেখানোর চেষ্টাও নেই।
কিন্তু সেই স্বাভাবিক কথাটাই মাহভীরের মনে অদ্ভুত একটা আঘাত করল।
সে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
রাইসা আবার বই খুলে ফেলল।
মাহভীর চলে গেল।
কিন্তু সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে তার মনে শুধু একটা কথাই ঘুরতে লাগল—
“আপনি তো বেশি কথা পছন্দ করেন না।”
হয়তো সত্যিই সে একদিন কথাগুলোকে খুব সহজ ভেবেছিল।
আজ সেই কথাগুলোই যেন ফিরে এসে তাকে প্রশ্ন করছে।
রাতে খাবারের সময় রাইসা খুব অল্প খেল।
সাথী বেগম বললেন,
— আরেকটু খা মা।
রাইসা মাথা নাড়ল।
— না মা, আর পারব না।
মাহভীর এতক্ষণ চুপচাপ ছিল।
হঠাৎ বলল,
— ওকে জোর করো না।
রাইসা চমকে তার দিকে তাকাল।
মাহভীর চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল,
— যতটুকু খেতে ইচ্ছে করছে, ততটুকুই খাক।
সাথী বেগম আর কিছু বললেন না।
রাইসাও কিছু বলল না।
তবে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
এতদিন পর মাহভীর তার দিকে তাকিয়ে কোনো কঠিন কথা বলেনি।
সামান্য একটা কথাই।
তবুও তার কাছে সেটা অচেনা রকমের কোমল লাগল।
রাত বাড়ল।
সবাই নিজেদের ঘরে চলে গেল।
রাইসা নিজের ঘরের জানালার পাশে বসে ছিল।
বাইরে চাঁদের আলো।
কিন্তু তার মাথার ভেতর শুধু একটা নাম—
Himi।
এই নামটা কেন মাহভীরের কোম্পানির সঙ্গে জড়িয়ে আছে?
কেন মাহা নামটা শুনলেই চুপ হয়ে যায়?
কেন পরিবারের কেউ কিছু বলতে চায় না?
আর কেন মাহভীর এই একটা নামের ব্যাপারে এতটা কঠোর?
রাইসা জানে, মাহভীরের জীবনে নিশ্চয়ই এমন কিছু ঘটেছিল যার ছায়া এখনো রয়ে গেছে।
কিন্তু কী?
পরদিন দুপুরে মাহা রাইসার ঘরে এল।
রাইসা বিছানায় বসে বই দেখছিল।
মাহা পাশে বসতেই রাইসা ধীরে বলল,
— মাহা?
— হুম?
— একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— বল।
— Himi কে?
মাহা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— রাইসা, এই প্রশ্নটা আর করিস না।
— কেন?
— আমি বলতে পারব নa
রাইসা নিচের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
— সবাই ওনাকে এত ভয় পায় কেন?
— ভয় না। কিন্তু Himi-র ব্যাপারে ভাইয়া খুব serious।
রাইসা আর কিছু বলল না।
কিছুক্ষণ পর শুধু বলল,
— ঠিক আছে।
কিন্তু তার চোখের কৌতূহল তখনও অটুট।
সন্ধ্যার পর মাহভীরের সঙ্গে সাকিনের ফোনে কথা হচ্ছিল।
রাইসা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কথার মাঝখান থেকে শুধু একটা শব্দ শুনল—
“Himi...”
সে এক মুহূর্ত থেমে গেল।
মাহভীর তাকে দেখতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে অন্যদিকে চলে গেল।
রাইসার মনে হলো, নামটা যেন তাকে প্রতিদিন একটু একটু করে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে।
সেই রাতেই সে শেষ পর্যন্ত সাকিনকে ফোন করল।সাকিন এর নাম্বার রাইসার কাছেই ছিল।সেই মাহার জন্মদিনেই নিয়ে রেখেছিল।
— আসসালামু আলাইকুম
— ওয়ালাইকুম আসালাম
-আমি রাইসা বলছিলাম ভাইয়া।
-হে বল। তা কি খবর?
— একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— করো।
— Himi কে?
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর সাকিন ধীরে বলল,
— রাইসা, এই ব্যাপারে আমি তোমাকে কিছু বলতে পারব না।সরি
— আপনি জানেন?
সাকিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— জানি।
রাইসার বুকটা কেমন করে উঠল।
— তাহলে বলছেন না কেন?
— কারণ মাহভীর নিষেধ করেছে।
রাইসা আর কিছু বলল না।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
— ঠিক আছে। আমি আর জিজ্ঞেস করব না।
সাকিন বুঝতে পারল, কথাটা বলা হলেও রাইসা সত্যিই থামবে না।
সে শুধু বলল,
— মন খারাপ কোরো না।
রাইসা হালকা হেসে উত্তর দিল,
— আমার মন খারাপ না।
ফোন কেটে গেল।
ফোনটা নামানোর পর রাইসা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তারপর জানালার দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,
— একদিন না একদিন জানবই।
রাত প্রায় বারোটা।
মাহভীর নিজের ঘরে বসে ছিল।
ল্যাপটপ খোলা।
কাজ সামনে।
কিন্তু তার মন কাজে নেই।
বারবার রাইসার মুখটা মনে পড়ছে।
সেই মেয়েটা—
যে একসময় তার সামনে দাঁড়িয়ে এক নিঃশ্বাসে দশটা কথা বলত।
যে তার রাগ দেখেও হাসত।
যে অকারণে তাকে বিরক্ত করত।
আজ সেই মেয়েটা তার সামনে দাঁড়িয়েও যেন নিজেকে গুটিয়ে রাখে।
মাহভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
নিজের অজান্তেই মনে হলো—
“আমি কি সত্যিই এতটা কষ্ট দিয়েছি ওকে?”
কিছুক্ষণ পর সে উঠে দাঁড়াল।
রাইসার ঘরের দরজার সামনে এসে থামল।
দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ নয়।
ভেতরে তাকিয়ে দেখল, রাইসা জানালার পাশে বসে আছে।
চোখ দুটো লাল।
মাহভীরের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
সে আস্তে দরজায় নক করল।
রাইসা ঘুরে তাকাল।
— আপনি?
মাহভীর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
— ঘুমাসনি?
— না।
— কেন?
— ঘুম আসছে না।
মাহভীর আরেকটু এগিয়ে এল।
তার গলায় আজ আগের সেই কঠোরতা নেই।
— এখনও Himi-র ব্যাপারে ভাবছিস?
রাইসা অবাক হয়ে তাকাল।সে তহ এই বেপারে মাহির কে কিচু বলেনি।তাহলে?
কয়েক মুহূর্ত পর মাথা নাড়ল।
— হুম।
মাহভীর চোখ নামিয়ে নিল।
তারপর খুব ধীরে বলল,
— কাল রাতে সময় পাবি?
রাইসা কিছু বুঝতে না পেরে তাকিয়ে রইল।
মাহভীর বলল,
— Himi-র কথা জানতে চেয়েছিলি না?
রাইসার চোখে প্রথমবার কয়েকদিন পর সত্যিকারের আলো ফুটে উঠল।
— হ্যাঁ।
মাহভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— তাহলে কাল... আমি তোকে সব বলব।
একটু থেমে আবার বলল,
— আর একটা কথা।
রাইসা তাকাল।
মাহভীরের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে গেল।
— এভাবে চুপ করে থাকিস না।
রাইসা কিছু বলল না।
শুধু তাকিয়ে রইল।
মাহভীর দরজা থেকে সরে গেল।
কিন্তু যাওয়ার আগে একবার পেছনে তাকিয়ে বলল,
— তুই আগের মতো থাকলে... বাড়িটা একটু বেশি স্বাভাবিক লাগে।
কথাটা বলে সে চলে গেল।
আর রাইসা স্থির হয়ে বসে রইল।
কারণ মাহভীর প্রথমবার নিজের অজান্তে স্বীকার করে গেল—
রাইসার হাসি তার কাছে যতটা বিরক্তিকর ছিল, তার নীরবতা তার চেয়েও বেশি অসহ্য।
আর আগামীকাল—
একটা পুরোনো নামের সঙ্গে খুলে যাবে মাহভীরের জীবনের সবচেয়ে গোপন অধ্যায়।
চলবে...