ফন্ট সাইজ:
থিম:
দেওয়ান সাহেব

১ম পর্ব

লেখক: রুপান্জলি

,,,,রাতের গভীর নিস্তব্ধতা ছাপিয়ে ভারি কদম ফেলে এগিয়ে চলেছে একদল কালো পোশাকধারী মানব। তাদের প্রতিটি কদমের ওজন ভারি হলেও তার গতির শব্দ বরই নিখুঁত, নিটোল; যেন মাটির ওপর দিয়ে কোনো পিঁপড়ের ঝাঁক এগিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেকের হাতে নানান পদের অস্ত্র। কারোর হাতে রামদা, কারোর হাতে লোহার ফলা, লোহার রড, ছুরি, চাপাতি, কাচি, হাতুড়ি, কুঠার; কারোর হাতে আদিম যুগের ন্যায় সূক্ষ্ম তীরের দেখা মিলেছে। প্রতিটি অস্ত্রের ধারালো অংশ চাঁদের নরম আলোয় তীক্ষ্ণ রূপ ধারণ করেছে। মুহূর্তেই ঝিলিক দিয়ে দিয়ে উঠছে অস্ত্রশস্ত্রগুলো। এই অস্ত্রগুলো বোধহয় একেকটা একেক কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে কোনটা কোন কাজে ব্যবহৃত হয়, ধারণা করা যাচ্ছে না। হাঁটতে হাঁটতে পাহাড়ের বাঁক ধরে কিছুটা গভীরে পৌঁছালো তারা। আরও কিছুটা গভীরে পৌঁছাতেই দেখা মিলল গুহায় প্রবেশ করার জন্য একটা ছোটখাটো সরু পথ। এটা কোনো প্রাকৃতিক গুহা নয়, বড্ড সুনিপুণতার সঙ্গে সময় নিয়ে বানানো হয়েছে গুহাটি। বরই সতর্কতার সহিত প্রতিটি লোক ঢুকে গেল গুহার ভেতরে। পরপর আসন পেতে বসে পড়ল মাটির মেঝেতে। একঝাঁক লোক সুনিপুণভাবে গোল হয়ে বসতেই, যে যার মতো আয়ত্ত করা স্বর্ণ, অলঙ্কার, টাকা-পয়সাগুলো সাজিয়ে রাখল সামনে।

আজ ভালোই জোগাড় হয়েছে। ধরা ও পড়েনি কেউ। এমনভাবে চলতে থাকলে একদিন সব সমস্যা মিটে যাবে, আশা করা যায়। বিষয়টা মাথায় আসতেই সকলের চোখে হাসির ঝিলিক দেখা দিল। তারা সন্তুষ্ট, ভরাট দৃষ্টিতে তাকাল তাদের সর্দারের দিকে। সবার চাহনি দেখে প্রশস্ত হাসল সর্দার। ধীরে ধীরে আয়ত্ত করতে থাকা অলঙ্কার ও টাকা-পয়সাগুলো ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করতে থাকল। ধীরে ধীরে একটা, দুটো, তিনটে, দশটা, আঠারোটা, বত্রিশটা; অবশেষে আটচল্লিশটি বণ্টন করা হলো। আরও দুটো কম হওয়ায় এই পর্যায়ে প্রতিটি ভাগ থেকে কিছু কিছু অলঙ্কার এবং টাকা নিয়ে আরও দুটো ভাগ করে নিল। প্রয়োজনমাফিক পঞ্চাশটা ভাগ হতেই সবার চোখে ফের হাসি ফুটে উঠল। কালো কাপড় দিয়ে মুখ বাঁধা থাকায় কেউ কারোর ঠোঁটের হাসিটুকু দেখতে না পেলেও চোখের প্রশস্ততা দেখে সর্দারের ঠোঁটেও হাসি ফুটল। তার মুখখানিও কালো কাপড়ের আবরণ দিয়ে ঢাকা। যার ফলস্বরূপ দলের লোকেরাও সর্দারের সেই অমায়িক হাসির সাক্ষাৎ পেল না। তবে সর্দারের চোখের সেই প্রশ্রয় আর সাহসটুকু তাদের আবারও নতুন উদ্যমে কাজে লাগার উৎসাহ দিল। ভরসা দিল নতুন উদ্যমে, নতুনভাবে নিজেদের উদ্দেশ্যের পথে হেঁটে যাওয়ার।

********

,,, এই যে মেয়ে! ভোরবেলায় ঘাটে কী করছ? মনে ডর-ভয় নেই?

,,, গম্ভীর, পুরুষালি, ভরাট কণ্ঠে থমকে দাঁড়ালো রূপান্মিতা। সহসা হাত ফসকে কলসিখানা ডুবে গেল নদীর জলে। হকচকিয়ে গেল মেয়েটা। সাথে সাথে ঝুঁকে পানি হাতড়ে কলসি খোঁজার চেষ্টা করল, তবে কলসির কোনো হদিস পেল না। খুঁজে না পেয়ে রাগ নিয়ে পিছনে ঘুরে তাকাতেই সিঁড়ির মাথায় একজন সুঠামদেহী পুরুষকে দেখতে পেল। লোকটার শারীরিক গড়ন বড্ড সুনিপুণ। তলোয়ারের ন্যায় ধারালো চোয়াল, ভ্রুদ্বয় চিলের ডগার ন্যায় তীক্ষ্ণ, আর চোখ দুটোতে যেন বাজপাখির বাস। চাহনিটাই এমন ধারালো। নাকটা টিকালো, নিখুঁত; সেখানে একটুকরো খাঁদ নেই। ঠোঁট দুটো কালচে খয়েরি, তবে দুই ঠোঁটের মাঝখানের জায়গাটুকু গোলাপি আভায় ভরাট। পরনে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি, গায়ে ইটরঙা শাল। বুকে হাত বেঁধে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সূর্যের প্রথম আলোতে মানুষটাকে বড্ড সুন্দর দেখালো। প্রথম দেখাতেই থমকে গেল রূপা। পরবর্তীতে নিজের ভ্রম থেকে দূরে সরে, নিজের স্বভাবের বাইরে গিয়ে হালকা রাগত স্বরে বলল— আপনি আমার কলসি ফেলে দিলেন কেন? অন্যের ক্ষতি করা খুব সহজ, তাই?

,,, মেয়েটার কথায় বড্ড অবাক হলো আরহান। মেয়েটা তাকে দোষারোপ করছে? অথচ সে কিছুই করেনি। সে এমন একজন মানুষ, যে কখনোই কারোর কাছে নিজেকে জাহির করা পছন্দ করে না। তাই মেয়েটার দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে বলল— আমি তোমার কলসি ফেলে দিয়েছি? নাকি তোমার হাত ফসকে পড়ে গিয়েছে?

,,, এবার একটু দমে গেল রূপা। লোকটা তো সত্যিই কলসিটা ফেলে দেয়নি, বরং তার হাত ফসকে পড়ে গিয়েছে। তবুও নিজের দোষ স্বীকার করল না। দোষ স্বীকার করলে যদি লোকটা তাকে সাহায্য না করে? অগত্যা নিজের বেখেয়ালিপনার সব ভার আরহানের ওপর ছেড়ে দিয়ে মিনমিনে স্বরে বলল----- একই তো হলো। আপনি হুট করে কথা না বললে তো আমি ভয় পেতাম না। আর ভয় না পেলে কলসিটা হাত ফসকে পড়েও যেত না। এখন আপনি আমার কলসি উঠিয়ে দিন, নয়তো আমি বাড়ি যাব না।

,,, মেয়েটার যুক্তি শুনে ভ্রু গুটালো আরহান। সামনে দাঁড়ানো শ্যামবর্ণের রমনির কণ্ঠ যতখানি শান্ত, কথায় তার থেকেও বেশি ঝাঁজ রয়েছে। ধরন দেখে বোঝা যাচ্ছে, সে কোনো মতেই ছাড় দেওয়ার পাত্রী নয়। আরহান ভাবল, কিছু সময় পরেই লোকের আনাগোনা বাড়বে। এই মুহূর্তে মেয়েটার সঙ্গে কথা বাড়ানো কিংবা ঝামেলায় যাওয়া কুরুচিপূর্ণ কাজ। লোকে দেখলে বিষয়টা খতিয়ে দেখবে না, বরং উল্টোপাল্টা কথা রটাবে। তখন দেওয়ান বাড়ির সম্মান যাবে। সবদিক বিবেচনা করে আরহান নরম স্বরে বলল— আমি কীভাবে কলসি উঠাব? ওটা তো পানির নিচে চলে গিয়েছে। তুমি চাইলে আমি তোমার কলসির দাম দিয়ে দিতে পারি। বলো, ওটার দাম কত? আমি দিয়ে দিচ্ছি!

,,, বলতে বলতে পাঞ্জাবির পকেট থেকে রেশমি কাপড়ের থলিটা বের করে নিল। আরহানকে টাকা বের করতে দেখে রূপা মন ভার করে বলল— না, না! দাম লাগবে না। দাম দিয়ে আমি কী করব? কলসির বদলে টাকা নিয়ে গেলে আম্মা আমাকে অনেক বকবে। এটা আমার আম্মার অনেক সখের কলসি। ১২টা মুরগি বিক্রি করে তারপর কিনেছে। এটা ফিরিয়ে নিতে না পারলে আম্মা খুব কষ্ট পাবে।

,,, বলতে বলতে মাথা নিচু করে নিল রূপান্মিতা। মেয়েটার কথায় বড্ড ফ্যাসাদে পড়ল আরহান। কিছুক্ষণ ভাবনাচিন্তা করার পর পায়ে পায়ে এগিয়ে সিঁড়িকোঠার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত নেমে এলো। রূপান্মিতার সামনাসামনি দাঁড়িয়ে গায়ের চাদরখানা এগিয়ে দিয়ে বলল— এটা ধরো, একদম ফেলে দেবে না। এটা আমার আম্মা অনেক শখ করে বানিয়েছে। তাও ১৮ ডজন সুতো খরচা করে।

,,, লোকটার কথায় মাথা ঝাঁকালো রূপান্মিতা। সন্তর্পণে আঁকড়ে ধরল চাদরখানা। দেখে বেশ দামি মনে হচ্ছে। লোকটা যে তার কথার বিপরীতে ১৮ ডজন সুতোর কথা বলেছে, সেটা খুব ভালো করেই বুঝতে পারল কিশোরী। তবে কিছু বলল না। বললে হয়তো লোকটা ঝগড়া বাধাবে, তারপর কলসিটা খুঁজে পাওয়াই হবে না। অগত্যা চুপ রইল। আরহান নদীর টলটলে জলের দিকে একবার তাকিয়ে পরপর মেয়েটার পানে তাকালো। সময়টা ভোরের শুরুতে হওয়ায় দূর থেকে ভালো মতো দেখতে পায়নি মেয়েটাকে। এখন সামনাসামনি আসতেই ভালো মতো পর্যবেক্ষণ করল। মেয়েটা প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই শ্যামলা, তবে কালো নয়। শ্যামলা হওয়ার দরুন প্রথমেই নজর আটকে যায় মেয়েটার চোখে। সাদা পর্দায় কালো কুচকুচে মণি, তাতে ঘন পাপড়ি। চোখের কোণে হালকা কাজলের আস্তরণও লক্ষ করল। নাকটা সুচালো, ঠোঁট দুটো হালকা ফ্যাকাশে ধরনের। শ্যামলা হওয়ার দরুন ঠোঁটের রংটাও চোখে লাগার মতো, একটু বেশিই উজ্জ্বল দেখায়। খুবই চিকন গড়ন, মুখটাও চিকন। এর বাইরে কোনো কিছু লক্ষ করার উপায় নেই। কারণ মেয়েটার পরনে ফুলহাতা জামা, মাথায় গোল করে উড়না পেঁচানো। দেখে অত্যন্ত ভদ্র বাড়ির মেয়ে মনে হচ্ছে। আরহানকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে শঙ্কায় হাতে থাকা চাদরখানা খামচে ধরে ঘুরে দাঁড়ালো রূপান্মিতা। সাথে সাথে পানির ঝপঝপ শব্দে মুখরিত হলো চারপাশ। এরপর কিছু মুহূর্তেই পরিবেশটা কেমন শান্ত হয়ে গেল। অনেকটা সময় পেরুনোর পরও যখন পানির শব্দ শোনা গেল না, তখন পানির দিকে ফিরে তাকালো রূপা। নদীর জল শান্ত। মৃদু মৃদু ঢেউ এসে বাড়ি খাচ্ছে ঘাটের সিঁড়িতে। নদী এতোটাই শান্ত, যেন এর নিচে কোনো মানুষেরই অস্তিত্ব নেই। এরূপ অবস্থা দেখে চমকে উঠল রূপান্মিতা। অচেনা লোকটা না তখন নদীতে ঝাঁপ দিল? তাহলে পানি এত শান্ত কেন? লোকটা কি তবে ঝাঁপ দেয়নি? পালিয়েছে? কিন্তু সে তো স্পষ্ট পানিতে পড়ার শব্দ শুনেছে। তাহলে কি লোকটাকে স্রোতে ভাসিয়ে নিল? কিন্তু সেটাও তো টের পেল না। লোকটাকে যদি ভাসিয়েই নিত, তাহলে নিশ্চয়ই লোকটা ওঠার জন্য ছটফট করত। ছটফট করলে তো শুনতে পেত সে। রূপান্মিতা আর ভাবতে পারল না। একটা মানুষ হুট করে এভাবে কী করে উধাও হয়ে যেতে পারে? আচ্ছা! লোকটা কি ভূত-প্রেতজাতীয় কিছু? হতেই পারে। লোকটার সৌন্দর্য তো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। এতটা ফর্সা রং পুরুষ মানুষের হতেই পারে না। অন্তত নবীনগরে এরকম সাদাটে পুরুষ সে কখনোই দেখেনি। ভূত-প্রেতের কথা মাথায় এনেও নিজেকে ধিক্কার জানালো। তার আম্মা সর্বদাই বলে, ভূত-প্রেত বলতে কিছুই হয় না, যা হয় তা হলো জ্বীন। তাহলে কি লোকটা জ্বীন হবে? সন্দেহবশত হাতে থাকা চাদরখানার গন্ধ শুঁকল। আতর আর সুরমার ঘ্রাণে চাদরখানা ম-ম করছে। এত সুন্দর ঘ্রাণ সে কখনোই শোনেনি। মোহে পড়ে চাদরখানা আরেকটু কাছে টেনে নিয়ে তাতে মুখ ডুবালো। তৎক্ষণাৎ ঝপঝপ শব্দ তুলে পানি থেকে বেরিয়ে এলো আরহান। শব্দ শুনে সামনে তাকাতেই লজ্জায় পড়ে গেল মেয়েটা। ইসস! লোকটা দেখে ফেলল? কী ভাববে? ভাববে বোধহয় সে কখনো দামি কোনো কিছু চোখে দেখেনি, তাই উনার চাদরে মুখ ডুবিয়েছে। ওর ভাবনার মাঝেই আরহান পানি থেকে কলসি তুলে বলল ---- এটা তোমার?

,,, রূপান্মিতা মাথা ঝাঁকালো। মানে এটা তারই। উত্তর পেয়ে আরহান কলসিসহ উঠে আসতে চাইলে রূপান্মিতা মিনমিনে স্বরে বলল— আরও একটা সাহায্য করবেন? আসলে ঘাটের পানি ঘোলা হয়ে গিয়েছে তো। একটু যদি সাঁতার কেটে দূর থেকে পানি এনে দিতেন, বড্ড উপকৃত হতাম।

,,, মেয়েটার কথায় বিরক্ত হলো আরহান। কথায় আছে, খেতে দিলে বসতে চায়। মেয়েটার হালচাল তারই প্রমাণ দিচ্ছে, নয়তো আবারও আবদার জুড়ে দিতে পারত না। তৎক্ষণাৎ ঘাটলার ওপর থেকে কারোর পায়ের শব্দ ধেয়ে এলো। হতে পারে কেউ আসছে, তাই আরহান কথা বাড়ালো না। সাঁতার কেটে কিছুটা দূরে গিয়ে কলসি ভরে পানি নিয়ে পাড়ে এলো। রূপান্মিতার কাছাকাছি আসতেই পিছন থেকে ধেয়ে এলো— এই, এইহানে কাডায় রে? সকাল সকাল রং-তামাশা করবার লাগছো।

,,, আরহান সেদিকে তাকালো। ময়নুলকে দেখে একটা তপ্ত শ্বাস ফেলল। নির্ঘাত আব্বাজান তাকে খুঁজে না পেয়ে ময়নুলকে পাঠিয়েছে। আরহান কলসিখানা সিঁড়ির ওপর রাখল। সাথে সাথে সেটা কাঁখে তুলে নিল রূপা। আরহান ময়নুলের উদ্দেশ্যে বলল— ময়নুল, থামো! এটা আমি, অন্য কেউ নয়।

,,, ততক্ষণে আরহানকে দেখে নিয়েছে ময়নুল। তাই বত্রিশ পাটি বের করে হেসে কলসি কাঁখে দাঁড়ানো রূপার দিকে তাকিয়ে বলল— কিগো ফকিরের মাইয়া, এইহানে কি করো? সকাল সকাল পানি নিবার আইছো?

,,, রূপান্মিতা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল— জ্বী, ময়না ভাই। আম্মার শরীরটা বেশি ভালো না, তাই আমি আসলাম।

,,, রূপান্মিতার কথায় ব্যথিত হাসল ময়নুল। আফসোসের স্বরে বলল— তোমার আব্বায় মানুষটা খারাপ। তোমার আম্মারে জীবনে দাম দিল না।

,,, একজন অচেনা লোকের সামনে বাবা-মাকে নিয়ে এসব কথা ভালো লাগল না রূপার। তাই কলসিখানা শক্ত করে ধরে জায়গা থেকে প্রস্থান করতে চাইল। সিঁড়ি পেরিয়ে ময়নুলকে এড়িয়ে যেতেই কানে বাজল— মেয়েটাকে তুমি চিনো, ময়নুল?

,,, ময়নুল বলল— হো, হাসান ফকিরের নাম শুনছেন না? ওহ! আপনে শুনবেন কেমনে? আপনে তো গায়েই ছিলেন না বহু বছর। ছোটবেলায় দেখছেন মনে হয়। ঐ বেডায় দিন-রাইত বউ পিটায়। বউ আর মাইয়ারে তো দেখবারও পারে না। মা-মাইয়ারে দেখলে বহুত মায়া লাগে। কোন আকামে এই নরকে পইড়া আছে, কাডায় জানে? ফকিরে তো সারাদিন-রাইত ছুডো ঘরডার ভিতরে বইসা থাহে। মনে হয় সন্যাস। নারীলোভ নাই। মাইয়াডা কেমনে হইছে, আল্লাহ কইতে পারবো।

,,, আর কিছু শোনার সাহস পেল না রূপা। চোখ জ্বালা করে উঠল। অপমানে গাটা কেমন চমকে দিল বারবার। লোকের কি দোষ? তারা তো মিথ্যা বলে না। যা বলে, ঠিকই বলে। আব্বা তো তাদের মা-মেয়ের দিকে ফিরেও তাকায় না। আরও ডাকতে গেলে খারাপ ব্যবহার করে, আম্মাকে মারধর করে। রূপা বুঝে, আব্বা তার আম্মাকে ভালোবাসেন না। কিন্তু কেন বাসেন না? এরকম প্রশ্ন মনে এলেও সেটা মাটিচাপা দিয়ে দেয়। তাদের মতো গরিবদের আবার ভালোবাসা কী? ওসব তো যাত্রাপালায় দেখা যায়। এমন তো নয় যে শুধু রূপার আব্বাই রূপার আম্মাকে মারে। গ্রামের অনেক পুরুষই তো তাদের বউকে ধরে ধরে মারে, গালিগালাজ করে। তার আব্বাও তো পুরুষ, তাই হয়তো আম্মাকে মারে। নিজের অশান্ত মনকে বুঝ দিয়ে শান্ত করা মেয়েটা খেয়ালই করল না, সে অচেনা লোকের চাদরখানা সাথে করেই নিয়ে যাচ্ছে। নিজেকে অপমানের হাত থেকে বাঁচাতে চেয়ে অন্যের আমানতের খেয়ানত করেছে সে।

***************

,,, পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় ফকফকা একটি খরগোশের পিছনে ছুটে চলেছে এক চঞ্চল কিশোরী। বয়সটা তেমন নয়, সদ্য ১৫-তে পা দিয়েছে। পায়ে আলতা, রুপোর নূপুর; যা চলার সাথে সাথে ঝুনঝুন শব্দ তুলছে। খরগোশের পিছনে ছুটতে ছুটতে হাঁপিয়ে উঠেছে কিশোরী, তবুও ফাজিল খরগোশটাকে নাগালে পাচ্ছে না। ওদিকে বড়ো আম্মার কাছে রান্না চাপিয়ে এসেছে, কখন না জানি তরকারিতে ভাটা পড়ে।

খরগোশটি ছুটতে ছুটতে একপর্যায়ে দোতলার এক কোনার ঘরটায় ঢুকে গেল। হতাশ হলো কিশোরী। এতক্ষণ যেই ভয়টা পেয়েছিল, এখন সেটাই সত্যি করে ছাড়ল বেয়াদব বাচ্চাটা। দেওয়ান সাহেব এমনিতেই তো সারাক্ষণ তার দোষ-ত্রুটি খোঁজেন, তার ওপর খরগোশ নামক প্রাণীটিকে একদমই পছন্দ করেন না। দেখলেই কেমন নাক সিটকান। এখন যদি শুশিকে নিজের ঘরে দেখে, তাহলে চরম চেঁচামেচি করবেন।

শঙ্কা নিয়ে ঘরের আধখোলা সেগুন কাঠের দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে ভেতরে উঁকি দিল কিশোরী। সাথে সাথে চক্ষুদ্বয়ে অবাকতা ছেয়ে গেল। আরবিদ পালঙ্কের ওপর ডান কাত হয়ে শুয়ে আছে, আর বেয়াদব শুশিটা উনার শিয়রের পাশে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে। এখন কী করবে সে? কীভাবে ফিরিয়ে আনবে বাচ্চাটাকে? দাঁত দিয়ে নখ কামড়ে কিছুক্ষণ আরবিদের ঘুমন্ত হাবভাব পর্যবেক্ষণ করল মেয়েটা। পরপর ভেজা বিড়ালের ন্যায় পা টিপে টিপে ঘরের ভেতরে ঢুকল। বিছানার কাছে দাঁড়িয়ে শক্তপোক্ত একটা ঢোক গিলে নিজের মাঝে সাহস জোগাড় করার চেষ্টা করল। অতঃপর আরবিদের অপর পাশে হাত বাড়িয়ে শুশিকে তুলতে নিতেই পায়ে পায়ে বাড়ি খেয়ে ধাম করে পড়ল আরবিদের উন্মুক্ত বুকে। থমকে গেল কিশোরী। কী লাভ হলো এত সতর্ক হয়ে? সেই তো খরগোশসহ সে নিজেও ধরা পড়ে গেল। ভয়ে চোখ-মুখ খিঁচে বন্ধ করে নিল মেয়েটা। মনে মনে আল্লাহর কাছে পানাহ চেয়ে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো। আরবিদের চোখ বন্ধ দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল মেয়েটা। আল্লাহ তবে এই যাত্রায় বাঁচিয়ে দিলেন।

কিশোরী খুবই শান্ত ভঙ্গিতে আরবিদের বুক থেকে মাথাটা তুলে পালঙ্কে সোজা হয়ে বসল। তারপর হাত বাড়িয়ে শুশিকে ধরতে নিলে শুশি আবারও পালানোর চেষ্টা করল। আটকাতে চেয়ে খপ করে শুশিকে ধরে নিল মেয়েটা, যার ফলে অজান্তেই আরবিদের বুকের সাথে তার গলার চেইনের ঘর্ষণ লাগল। সাথে সাথে ব্যথাতুর শব্দ তুলে চোখ মেলে তাকালো আরবিদ। ঘুমন্ত চোখজোড়ায় তখন রাজ্যের বিরক্তি। সদ্য ১৫-তে পা দেওয়া কিশোরীকে নিজের বক্ষভাঁজে পর্যবেক্ষণ করতেই সহসা ভ্রু গুটিয়ে নিল। পরপর মুখটা পাংশুটে করে জিজ্ঞেস করল— তুমি কি ঠিক হবে না, কাব্যশ্রী? সকাল সকাল আমার ঘরে কী করছ? ঠিকঠাক ঘুমাতেও দেবে না? বিরক্তিকর!

,,, আরবিদের আচরণে অবাক হলো না কিশোরী। উনি তার সাথে বরাবরই এমন রূঢ় আচরণ করেন। শুধু তার সাথেই এমন করেন, আর বাকিদের বেলায় সব ঠিকঠাক। অত্যন্ত গম্ভীর স্বভাবের লোক হওয়ায় কারোর সাথেই অপ্রয়োজনীয় কথা বলেন না, আবার খারাপ আচরণও করেন না। স্বাভাবিক থাকেন। অথচ কাব্যশ্রীর বেলায় লোকটা যতটুকু মুখ খোলেন, ততটুকুতেই শুধুই তিক্ততা। বুঝ হওয়ার পর লোকটার মুখে একটুখানি মিষ্টি কথা শোনার ভাগ্য হলো না তার। সারাক্ষণ ধমকা-ধমকি, বিরক্তি প্রকাশের মাধ্যমেই কেটে যাচ্ছে তার দিনকাল। কাব্যশ্রী মুখ মলিন করে শুশিকে নিয়ে আরবিদের বুক থেকে সরে এলো। পরপর নম্র স্বরে বলল— আমার কোনো দোষ নেই, দেওয়ান সাহেব। শুশিটা আপনার রুমে চলে এসেছিল। ভাবলাম, আপনাকে বোধহয় জ্বালাতন করবে, তাই আরকি।

,,, কাব্যশ্রীর কথায় আরবিদের চোখ-মুখের বিরক্তি কমার বদলে ক্ষণিক বাড়ল। সে একবার কাব্যশ্রীর কোলে থাকা শুশি নামক খরগোশটাকে দেখে, আরেকবার নিজের উন্মুক্ত বুকের হওয়া ক্ষতটার দিকে তাকালো। তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল— হুম! জ্বালাতন থেকে রক্ষা করতে এসে নিজেই জ্বালাচ্ছো। দেখো তো বুকে কতখানি ক্ষত হয়েছে। এখনই কক্ষে গিয়ে গলার চেইনটা খুলে ফেলবে। এরপর থেকে যেন গলায় এরকম ধারালো চেইন না দেখি।

,,, আরবিদের এহেন কথায় চোখ পিটপিট করে তাকালো কাব্যশ্রী। দ্বিধান্বিত কণ্ঠে শুধালো— বলছিলাম যে, আমি তো প্রতিদিনই হোঁচট খেয়ে আপনার বুকের ওপর পড়ে যাব না। তাই চেইনটা গলায়ই থাক।

,,, আরবিদ চোখ উঁচিয়ে একবার শাড়ি পরিহিত কিশোরীর দিকে তাকালো। পরপর চোখ বন্ধ করে কপালে হাত রেখে বলল— ঠিক আছে! যাও, আম্মাকে বলবে যেন আমার জন্য এক কাপ চা পাঠায়। কুসুমকে দিয়ে পাঠাতে বলবে, ঠিক আছে? যাও এবার!

,,, আরবিদের কথায় কিশোরীর চোখে-মুখে অভিমান হানা দিল। লোকটা জানেন, চায়ের কাপটা সে নিজেই নিয়ে আসবে, অথচ তাকে সরাসরি মানা না করে কুসুমের কথা টানলেন। এটা কি নীরব অপমান নয়? উনি সবসময়ই তাকে অপমান করেন। কাব্যশ্রীকে এখনো থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চোখ বন্ধ রেখেই আরবিদ ধমকের স্বরে বলল— যাচ্ছো না যে? কিছু বলবে?

,,, আরবিদের ধমকে কেঁপে উঠল কিশোরী। লোকটা তাদের জ্ঞাতিগুষ্টির ভাই-বোনদের সবার বড়ো, তার থেকে গুনে গুনে ১৫ বছরের বড়ো। তবুও লোকটার প্রতি কাব্যশ্রীর এক আকাশ পরিমাণ অভিমান। সেই অভিমানটুকু কণ্ঠে চেপে অভিমানী স্বরে বলল— আমি তো আপনার ঘরে চুরি করতে আসিনি, বড়ো ভাইজান। এরকম ব্যবহার করেন কেন?

,,, এতক্ষণ তো দেওয়ান সাহেব বলে ডাকছিলে, এখন আবার এত সহবত এলো কোথা থেকে? আমি যে সম্পর্কে তোমার বড়ো ভাই হই, সেটা মনে পড়েছে বুঝি?

,,, সবাই তো আপনাকে এই নামেই ডাকে, আমি ডাকলে সমস্যা কোথায়?

,,, ওরা আমাদের গ্রামবাসী, কিন্তু তুমি আমার বোন। বোন হয়ে বড়ো ভাইকে কেউ দেওয়ান সাহেব বলে ডাকে? এরকম সহবত কোথা থেকে শিখেছ?

,,, জানি না!! (মাথা নিচু করে)

,,, জানবে কী করে? তুমি তো বরাবরই বেয়াদব। যাও, আম্মাকে মনে করে চা পাঠাতে বলবে। ভুলে যেও না যেন।

,,, ওদের কথোপকথনের মাঝেই রুমে উঁকি দিল ১২ বছরের আফনান। সে দেওয়ান বাড়ির ছোট সদস্যদের মাঝে একজন। উঁকি দিয়ে কাব্য আপাকে বড়ো ভাইজানের ঘরে দেখে ভেতরে ঢোকার সাহস পেল। সে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে নরম স্বরে বলল— আসসালামু আলাইকুম, বড়ো ভাইজান!

,,, আরবিদ চোখ উঁচিয়ে আফনানের দিকে তাকালো। পরনে পাঞ্জাবি, পায়জামা, মাথায় টুপি। বোঝাই যাচ্ছে মক্তব হতে দৌড়ে এসেছে। হাঁপাচ্ছেও কিছুটা। পাশের টেবিলে থাকা পানির জগের দিকে ইশারা করল আরবিদ। আফনান ইশারা বুঝতে পেরে এগিয়ে গিয়ে সেখান থেকে গ্লাসে পানি নিয়ে কাঠের চেয়ারে বসে পানিটা পান করল। আরবিদ রয়েসয়ে উত্তর করল ---- ওয়ালাইকুম আসসালাম! কিছু বলবে, আফনান?

,,, আফনান সহবতের সাথে মাথা নাড়িয়ে বলল—

বড়ো ভাইজান! বড়ো মামু আপনাকে নিচে ডাকছেন। গতকাল রাতে তালেব তৈমুরের বাড়িতে চুরি হলো না? সে নিয়েই কথা বলবেন। মেঝো ভাইজান তো সকাল সকাল উঠে নদীঘাটে গেলেন। ওখান থেকেই সোজা তালেব তৈমুরের বাড়ি যাবেন। উঠোনেই নাকি শালিস বসবে। আপনি ঘুমাচ্ছেন বলে আপনাকে কেউ ডাকেননি। এখন মামু যেতে বলেছেন। আপনি আসুন, আমি যাই?

,,, এতক্ষণ মাথা নিচু করে বললেও এবার অনুমতির আশায় আরবিদের দিকে তাকালো। আরবিদ চোখের ইশারায় যেতে বললে আফনান চেয়ার ছেড়ে উঠে বাহিরের দিকে হাঁটা দিল। কিছু পথ যেতেই আবার কিছু একটা মনে করে পিছু ফিরে বলল— কাব্য আপা! তোমাকে বড়ো মামি যেতে বলেছেন। বড়ো ভাইজানের জন্য কী যেন রান্না চাপিয়েছিলে? সেটার নাকি রং পাল্টেছে। যা, মসলা দেওয়ার যেন দিয়ে আসো।

,,, বলতে বলতে চলে গেল ছেলেটা। রেখে গেল এক অবোধ কিশোরীকে। কাব্য ভাবতেও পারেনি, ছেলেটি তাকে এভাবে মাঝসমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়ে যাবে। কাব্য অপরাধী মুখ করে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। তৎক্ষণাৎ ভেসে এলো গম্ভীর, ভারি স্বর— রান্নাবান্নায় খুব ঝোঁক দেখছি। সংসার করতে চাও?

,,, চমকে তাকালো কাব্যশ্রী— ম, মানে?

,,, বড়ো হচ্ছো। বিয়ে দিতে হবে না? আমরা চাচ্ছি না অন্য পাঁচটা বাড়ির মেয়েদের মতো আমাদের বাড়ির মেয়েদেরকে তাড়াহুড়ো করে বিয়ে দিতে। অথচ তোমরা আমাদের ইচ্ছার মূল্য না দিয়ে সংসার কিভাবে করতে হয়, তা শিখছো। সমস্যা নেই, নিশ্চিন্তে থাকো। আমি চাচাজানের সাথে কথা বলে পাত্র দেখার ব্যবস্থা করছি।

,,কাব্য উঁচানো চোখটা নামিয়ে নিয়ে নিচু কণ্ঠে বলল—

দুঃখিত, ভাইজান! আপনি আব্বাজানকে বিয়ের বিষয় কিছু বলবেন না। আমি পড়ালেখা ব্যতীত অন্য কোথাও মনোনিবেশ করব না। কথা দিচ্ছি।

,,, ঘর থেকে যাও। আর আসবে না এই ঘরে। আমি বিরক্ত অনুভব করি।

,,, আরবিদের সোজাসাপ্টা কথায় চোখ জ্বালা করে উঠল কাব্যের। শুশিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আর কখনো আসবে না এই ঘরে। এসেও কি লাভ? বারবার অপমানিত হওয়াটা তার বড্ড আত্মসম্মানে লাগে। সে ছোট হতে পারে, তাই বলে কি তার কোনো রাগ হতে নেই? অপমান কি তাকে ছুঁতে পারে না? অবশ্যই পারে।

মন ভার করা অভিমান নিয়ে কক্ষ ত্যাগ করল কিশোরী। অথচ সেসবের কোনো মন নেই ৩০ বছর বয়সী কঠোর মানবের। সে রয়েসয়ে উঠে বসল। পেটানো শরীরটা উন্মুক্ত। বুকের কাছটা এখনো জ্বালা করছে। বিরক্তিকর দৃষ্টিতে আঁচড় লাগা জায়গাটাতে তাকালো আরবিদ। হাত দিয়ে ঘষে জ্বালা নিবারণ করতে চাইল। কিছু সময় পর সফলও হলো। উঠে দাঁড়িয়ে পরনের লুঙ্গিটা ঠিকঠাক করে আলমিরা থেকে পাঞ্জাবি নিয়ে গায়ে চড়ালো। শীত হওয়ার দরুন শালও নিল। দরজা পেরিয়ে করিডর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পিঠ পেঁচিয়ে শাল সামনে আনল। হাঁটতে হাঁটতে চাদরখানা সুনিপুণভাবে জড়িয়ে নিল গায়ে।

******************

১৯৭৩ সাল

সময়টা দেশ স্বাধীন হওয়ার দেড় বছর পর। দেড় বছর আগে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও সুখ মেলেনি দেশবাসীর ভাগ্যে। অভাব-অনটন আর অন্যায়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে হাজারো মানবজীবন। তখন রাজত্বটা রাজার হলেও কর্তব্য আর প্রজাদের দুঃখের ভারটা বোধহয় রাজার ছিল না। গ্রামে গ্রামে তখন অভাবের হাহাকার। তার ওপর রাতবিরাতে চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি লেগেই থাকে। দেশে তখন স্বাধীনতা থাকলেও শান্তির বড়ই অভাব ছিল। কে ভালো মানুষ, কে খারাপ মানুষ— তার ভেদাভেদ করা ছিল ধাঁধার ন্যায় দুরূহ। কাহিনির শুরুটা নবীনগর থেকে।

নবীনগর! সিলেট বিভাগের উত্তর প্রান্তে ৪৫৭৮ একর জমি নিয়ে তৈরি হওয়া একটি শান্ত এলাকা। এলাকাটি যেন প্রকৃতির আপন কোলে লালিত। বিস্তীর্ণ মাঠ, ছায়াঘেরা গাছপালা, নির্মল আকাশ, জায়গায় জায়গায় পাহাড়— এলাকাটাকে গ্রাম কম, পাহাড়ি রাজ্য বলাটাই অধিক সৌন্দর্যপূর্ণ হবে। তবে সৌন্দর্য কখনোই কারোর পেট ভরাতে সক্ষম হতে পারে না। পেট ভরানোর জন্য খাবার চাই, আর খাবার পেতে হলে টাকার প্রয়োজন। তথাকথিত সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলো ব্যতীত নবীনগরের হাজারেরও অধিক মানুষ পিষে যাচ্ছে অভাবের যাঁতাকলে। সেই অভাবেই স্বভাব নষ্ট হলো কালি চরণের। লোকটা হিন্দু। আর্থিকভাবে শূন্য। হাতে গোনা চারটে আনাও তার পকেটে নেই। আগামীকাল তো দূর, আজ সকালবেলা ছেলে-মেয়েকে কী খাওয়াবে, সেটাই জানে না। এই অজানা, এই ব্যর্থতা, বাবা হওয়ার দায়, স্বামীর দায়িত্ব পালন করতে গতকাল তালেব তৈমুরের বাড়িতে চুরি করতে এসেছিল। স্বভাবগত চোর না হওয়ায় বেচারা তালেব তৈমুরের ছেলে সিহাব তৈমুরের হাতে ধরা পড়ল। ধরা পড়ার পর তাকে সারা রাত বেঁধে রাখা হলো। মারধরও করা হলো। অতঃপর সকাল হতেই গ্রামের সম্মানীয় ব্যক্তিদের ডেকে সালিশ বসানো হলো। সালিশে উপস্থিত আছেন দেওয়ান বাড়ির ছোট কর্তা মাহবুবুর দেওয়ান, সঙ্গে তার পুত্র আরহান দেওয়ান। বড় কর্তা মাহমুদুল দেওয়ানের হয়ে বসেছে তার বড় পুত্র আরবিদ দেওয়ান। আপাতত সেই তার বাবার হয়ে বিচারকার্য সম্পন্ন করবে। গাঁয়ের মেম্বার সারাফত হোসেন, তার পুত্র মেহরাব হোসেন, দু-চারজন মাতব্বর, সঙ্গে গ্রামের ছেলে-ছোকরা, বাচ্চা-বুড়োরাও রয়েছে এখানে। তালেব তৈমুরের নালিশের বিপরীতে কালি চরণের কাতর স্বীকারোক্তিতে উপস্থিত অনেকেই ব্যথিত হলো, আবার কেউ কেউ অভাবের তাড়নায় চুরি করতে গিয়েছে বলে নাক সিটকালো। বিচারে বসা সকলেই ভালো-মন্দ মন্তব্য করছেন। সবার এত এত প্রতিক্রিয়ার মাঝেও নির্বিকার চিত্তে বসে আছে আরবিদ দেওয়ান নামক গম্ভীর মানব। তার দৃষ্টি কালি চরণের শরীরে হওয়া ক্ষতগুলোতে স্থির। আরহান বড় ভাইয়ের দিকেই তাকিয়ে ছিল। ভাইয়ার দৃষ্টির মানে বুঝতে পেরে আরহানেরও খুব রাগ হলো। সে গ্রামে নতুন। যখন গ্রাম ছেড়েছিল, তখন তার বয়স ছিল ১১। তাই সবাইকে খুব একটা চেনে না। যাদের চেনে, তাদের শুধু মুখটাই মনে আছে, তেমন কোনো সখ্যতা নেই। আরহানের ভাবনা এবং সকলের মতামতের মাঝে শোনা গেল গম্ভীর মানবের শান্ত স্বর — ওনাকে মারা হলো কেন? আর মারা হলোই যখন, সালিশ বসানো হলো কোন যুক্তিতে? আপনারাই তো বিচার করে দিলেন। এখন আবার কিসের ন্যায় চাইছেন?

,,,, আরবিদের কথায় সবাই ওর দিকে মনোযোগী হলো। আরবিদ ছেলেটা এমন, যার সামান্য কথাতেও গভীর আলোচনা থমকে যায়। কেন যায়? কিসের আশায় সবাই ওকে সব মনোযোগ ঢেলে দেয়? তার উত্তর কেউ জানে না। তবে এটা হয়ে এসেছে আরবিদের যখন ১৪ বছর বয়স, তখন থেকেই। ওই বয়সেই বাবা-চাচার সঙ্গে সালিশে বসত ছেলেটা। টুকটাক মতামতও রাখত, আবার সেই মতামতকে সবাই সম্মানও করত। ধীরে ধীরে আরবিদ বড় হলো। বাবাকে বিচারের জন্য ডাকা হলে, সঙ্গে তারও ডাক পড়ত। একটা সময় মাহমুদুল দেওয়ানের জায়গাটা নিয়ে নিল আরবিদ। এখন গ্রামে সালিশ বসলেই মাহমুদুল দেওয়ান নিশ্চিন্তে ছেলেকে বিচার করতে পাঠিয়ে দেন। আর গ্রামের মানুষও ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে আরবিদকে মান্য করে। আরবিদের ছোট্ট বাক্যটিতে তালেব তৈমুরের ছেলে সিহাব তৈমুর রেগেমেগে বলল — মারমু না তো কী করমু? অহনো যে হেরে বাঁচাই রাখছি, এই তো অনেক। হের সাহস কত বড়, আমার বইনের কাছে যায়।

,,, সিহাবের কথায় আরবিদ কিছু বলল না, চুপ রইল। ওকে চুপ থাকতে দেখে সারাফত হোসেন বললেন — ও তোমার বোনের সঙ্গে কোনোরূপ বাজে আচরণ করেছে?

,,, সিহাব ক্রোধিত নজরে কালি চরণের দিকে তাকাল। দাঁতে দাঁত পিষে বলল — করেনাই। সুযোগ পায়নাই দেইখা করেনাই। আমি নিজের চোখে দেখছি, হেয় আমার বইনের দিকে ঝুঁকছে। এইডা কি এমনে এমনে ওই করছে?

,,, অপমানে মাথা নিচু করে রাখা কালি চরণ মুহূর্তেই ঝরঝর করে কেঁদে দিল। লোকে বলে, পুরুষদের কান্নায় মানায় না। আজ কালি চরণকে দেখে সেই কথাটা প্রমাণ হলো। কালি চরণ তার নামের মতোই কালো। সে যখন জন্ম নিয়েছিল, তখন তার ঠাকুমা তার চেহারায় মা-কালিকে খুঁজে পেয়েছিলেন। তখনই ঠিক করে নেন, তিনি নিজের নাতনিকে মা-কালির চরণে অর্পণ করবেন। সেই থেকেই নামকরণ করেন কালী চরণ। চার দিনের দিনেও এই নামের প্রদীপখানা জ্বলজ্বল করে উঠেছিল। সেই কালো মুখে মেয়েদের মতো কান্না বড্ড বেমানান ঠেকল। প্রত্যেকের দৃষ্টি তখন কালি চরণের মুখে। সে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল— আপনেরা বিশ্বাস করেন, আমি ফাতেমা আম্মারে আমার কল্যাণীর মতোই দেহি। আমি ওর কাছে কোনো বাজে উদ্দেশ্য নিয়া যাই নাই। ওর গলায় একটা রুপার চিগল আছে, ওইডাই নিতে চাইছিলাম খালি। আমি ওরে কিছু করতাম না।

,,, কালি চরণের কথায় ধমকে উঠল সিহাব — সু*য়োরের বাচ্চা, থাম!! আরেকটা কথা কইলে তর জবান সারা জীবনের লাইগা বন্ধ কইরা দিমু।

,,, ধমক শুনে কেঁপে উঠল কালি চরণ। মেহরাব সিহাবের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল — এটা কী ধরনের অসভ্যতা? মুরব্বিদের সামনে তুই ওনার সঙ্গে এমন অভদ্রতা করলি কেন? উনি তো উনার সমস্যাটা তুলে ধরছেন। এখানকার সবাই কালি কাকাকে চেনে। উনি মানুষ হিসেবে খারাপ নন। অভাবে না পড়লে নিশ্চয়ই চুরি করতেন না?

,,, সিহাবও সমান তালে বলল — তো কালি যেইটা করছে, ওইটা ভালো করছে নাকি? তাইলে দে, তর বইন নিরুপমার ঘরে আমি রাতবিরেতে ঢুকি। পরদিন সকালে আবার সসম্মানে ছাইড়া দেইস।

,,,, সিহাবের কথায় হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিল মেহরাব। তেড়ে যেতে নিলে মাহবুবুর দেওয়ান সতর্ক কণ্ঠে বললেন — বাড়াবাড়ি করবে না, সিহাব। আমরা এখানে বিচার করতে এসেছি, ঝগড়া নয়।

,,, এবার মুখ খুললেন তালেব তৈমুর। ভ্রু কুচকে বললেন — কোথায় বিচার করতেছেন? দেখতাছি তো, শুরু থাইকাই কালির পক্ষ নিতাছে আপনার ভাতিজায়।

,,, তালেবের বিপরীতে একজন মুরব্বি বললেন — আমার মতে বড়ো দেওয়ান সাহেব ঠিক কথাই কইছে। ওর কথায় এত তোলপাড় করার মতো কিছু হয়নাই। বিচার করতে যখন ডাকছোত, বিচার দিবি। আমরা হুনমু। যেইটা ঠিক মনে হইবো, সেইটা তগোরে জানামু। তরা মাইন্না নিবি। মানতে না পারলে দেওয়ান বাড়ির পুরুষগো ডাকলি কেন? হেরা কি হেলা-ফেলা করার মানুষ? তর পোলায় আঙ্গোরে ডাইক্কা নিজে মাতব্বরি করে কেন? তর পোলায় দেহি আমার সামনেই কালিরে মারতে যায়। এমন অসভ্য পয়দা করলি কেমনে? তুই নিজে যেমন, পোলাডাও তেমনি বানাইলি।

,,, পয়দা শব্দ শুনে ঠোঁট চেপে হেসে দিল আরহান। ছোট থেকে ঢাকায় থাকার দরুন এর আগে কখনো এসব ভাষা শুনেনি। পরক্ষণেই হাসি থামিয়ে বড়ো ভাইজানের দিকে মনোযোগী হলো। এই প্রথম সালিশ দেখছে সে, সঙ্গে বড়ো ভাইজানের হালচাল। এর আগে বহুবার শুনেছে, বড়ো আব্বার হয়ে নাকি বড়ো ভাইজান বিচার করেন। আজ সেটা দেখার পালা। তার মতে এখানে তালেব চাচাদেরও কোনো দোষ নেই, আবার কালি চরণ কাকারও কোনো দোষ নেই। একজন ভুক্তভোগী, আরেকজন অসহায়। এদের বিচারকার্য কীভাবে সম্পন্ন হবে? সেটাই জানতে চায় সে। মুরব্বির কথায় এবার কিছুটা দমে গেলেন তালেব তৈমুর। চোখের ইশারায় ছেলেকে শান্ত থাকতে বললেন। এই পর্যায়ে মেম্বার সারাফাত হোসেন সকল মাতব্বরদের উদ্দেশ্যে বললেন — আপনারা তো সবই শুনলেন। এখন আপনারা একে একে নিজেদের মতামত দিন। আমি বা আরবিদ সিদ্ধান্ত নিলে তালেব ভাই বলবেন, আমরা কালির পক্ষ নিচ্ছি। বিষয়টা মন্দ দেখাবে।

,,, মেম্বারের বাক্য ফুরাবার সঙ্গে সঙ্গেই সকলে হৈচৈ করে উঠল। তারা আলাদা করে কী মতামত দেবে? মেম্বার আছেন, দেওয়ান বাড়ির ছোট কর্তা, বড়ো দেওয়ান, ছোট দেওয়ান, সবাই তো উপস্থিত আছেন। যা রায় দেওয়ার, তারা মিলেমিশেই দিক। রায় পছন্দ না হলে তখন না হয় তারা মতামত দেবে। সবার মতামতের বাইরে গিয়ে তো আর বিচারকার্য শেষ হয়ে যাচ্ছে না। সবার হুটোপুটি দেখে বড়ই বিরক্ত হলেন তালেব তৈমুর। এদেরকে আনাটাই বরং ভুল হয়েছে। এর চাইতে ভালো ছিল কালিকে বেদম পিটিয়ে খালের পাড়ে ফেলে রাখলে। অযথা এই আনুষ্ঠানিক ভালো মানুষি সেজে কী লাভ হলো? সেই তো উনার বাড়ি বয়ে এসে উনারই বদনাম করে যাচ্ছে সবাই। সবার একই মতামত দেখে অবশেষে হার মানলেন মেম্বার সারাফাত সাহেব। ধীরস্থিরভাবে জাস্টিস দেওয়ার দায়িত্ব তুলে দিলেন দেওয়ান বাড়ির বড়ো সন্তান আরবিদ দেওয়ানের ওপর। আরবিদ প্রথমে মানা করল। মেম্বার-মাতব্বর, ছোট চাচা আছেন, সে না হয় আজ কিছু নাই বলল। কিন্তু আরবিদের কথা মানল না কেউ। ব্যক্তিগতভাবে সারাফাত হোসেন আর মাহমুদুল হোসেনের বেশ ভালো সম্পর্ক রয়েছে পারিবারিকভাবেও তাই, যার ফলস্বরূপ সারাফাত হোসেন আরবিদকে বড়ো ছেলের মতোই দেখেন। অপরদিকে আরবিদের গম্ভীরতা, জীবনের প্রতি একনিষ্ঠতা আর ন্যায়পরায়ণতায় বরাবরই মুগ্ধ তিনি। সুতরাং সর্বসময়ের ন্যায় আরবিদের ওপরই বিচারের ভার ছেড়ে দিলেন। আর মানা করতে পারল না আরবিদ। সবার কথা রাখার স্বার্থে গম্ভীর কণ্ঠেই আওড়ালো— সমাজে প্রচলিত দুটো শব্দ রয়েছে, একটি হলো ন্যায় আর অন্যটি হলো অন্যায়, যা সকলেরই জানা। তবে এর বাইরে গিয়েও আরও একটি শব্দ থেকে যায়, সেটা হচ্ছে ইনসাফ। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, ন্যায় আর ইনসাফের মধ্যে পার্থক্য কী?

উদাহরণস্বরূপ, একজন মা তার ক্ষুধার্ত সন্তানের জন্য দোকান থেকে রুটি চুরি করেছে। এই ক্ষেত্রে সেই মা একজন চোর, এটাই ন্যায়। এক্ষেত্রে সেই মাকে শাস্তি না দেওয়া হলে দোকানদারের প্রতি অন্যায় হয়ে যাবে। এখন আমরা যদি ন্যায়-অন্যায়কে এক পাশে রেখে সেই মাটার পরিস্থিতি কল্পনা করি, ঐ মা আর্থিকভাবে শূন্য ছিল, সন্তান ক্ষুধার্ত ছিল। একজন মায়ের কাছে সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার হচ্ছে, সন্তান খেতে চাওয়ার পরও তাকে খেতে দিতে না পারা। এই ক্ষেত্রে ওই রুটির টুকরোটুকু মাটার প্রয়োজন ছিল। আর আমাদের ইসলাম বলে, যার যা প্রয়োজন, তা তাকে কিছুটা ত্যাগ ও সদয়তার মাধ্যমে হলেও বুঝিয়ে দেওয়াকেই ইনসাফ বলে। আমি মানছি, কালি কাকা অন্যায় করেছে, কিন্তু সেটা স্বেচ্ছায় করতে চাননি, আর না উনার স্বভাব এটা। যা করেছেন, সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য করেছেন। উনার উদ্দেশ্য অসৎ ছিল না। এমতাবস্থায় উনার সঙ্গে ইনসাফ করাটাই সবচেয়ে সৌহার্দ্যপূর্ণ হবে। এবার বাকিটা আপনাদের ইচ্ছা।

,,, আরবিদের কথায় উপস্থিত সকলেই বিগলিত হলো, তবে সন্তুষ্ট হতে পারল না তালেব তৈমুর ও সিহাব তৈমুর। তারা যে লোক হিসেবে বড়ই সাধু পুরুষ, এমনটা ভাবনায় আনাটাও পাপ হবে। তবে আপাতত চুপ রইল। হিসেবটা না হয় পরবর্তীর জন্য তোলা রইল। এই পর্যায়ে মুখ খুললেন সারাফাত হোসেন— কালি যেহেতু ন্যায়ের জন্য অন্যায় করেছে, সেহেতু তাকে শাস্তিস্বরূপ দু দিনের জেল দেওয়া হলো। তাকে হোসেন বাড়ির চিলেকোঠায় আটক করে রাখা হবে। দু দিনে তিন বেলার মধ্যে দুই বেলা খেতে দেওয়া হবে, আর এক বেলা উপোস থাকবে। খাদ্যতালিকায় থাকবে সকালে আলুসিদ্ধ ভাত আর রাতে শুকনো রুটি। আর ইনসাফস্বরূপ একটা দীর্ঘমেয়াদি কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। আপাতত এটুকুই আমার মতামত, বাকিটা আপনারা সবাই মিলে ঠিক করুন।

,,, এই পর্যায়ে সবাই বিচারে সহমত পোষণ করল। কালি চরণের ঠোঁটে কিঞ্চিৎ হাসির রেখা দেখা দিল। এই পর্যায়ে বুঝি ছেলে-মেয়েগুলোকে খাবারের জোগান দিতে পারবেন? আরবিদ এখনো কালি চরণের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, আর আরহান বড়ো ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ওকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু গুটিয়ে তাকালো আরবিদ। মুহূর্তেই প্রশস্ত হাসল আরহান। আরবিদ শান্ত মেজাজে কাঁধ হালকা কাত করে শাসানোর স্বরে বলল — অনেকদিন যাবৎ মনে হচ্ছে কঞ্চির বাড়ি খাওয়া হয় না। বাড়িতে গেলে একটা কঞ্চি নিয়ে আমার ঘরে আসবেন।

,,, মুহূর্তেই থতমত খেয়ে গেল যুবক। চোরা চোখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে অন্যদিকে নজর ফিরালো। এত বড় হওয়ার পরও ভাইয়ের হাতে মার খাওয়ার মতো অপরাধগুলো যে কেন কমতে চায় না, জানা নেই তার। আরহানকে নজর ফিরাতে দেখে আরবিদও নজর ফিরালো। এই পর্যায়ে মাহবুবুর দেওয়ান রয়ে-সয়ে বললেন — তবে এই কথাই থাক। আর কালি! তুমি একবার ফাতেমা আম্মার কাছে ক্ষমা চাইবে। মেয়েটা বোধহয় তোমায় ভুল বুঝেছে।

,,, কালি চরণ মাথা ঝাঁকাল। পরক্ষণেই কেমন কাতর কণ্ঠে আওড়ালো — তয় সাহেব, আমি যদি এইখানে থাকি, তাইলে আমার বউ-বাচ্চারা কী খাইবো? ওগো যদি একটা খাওনের ব্যবস্থা করে দিতেন।

,,, কালির মুখ থেকে কথাটা বেরুতে দেরি, আরবিদ পকেট থেকে টাকা বের করতে দেরি করল না। পঞ্চাশ টাকার একটি নোট এগিয়ে দিতেই আরহান দিল পঞ্চাশ টাকা। মাহবুবুর দেওয়ান দিলেন কিছু। সারাফাত হোসেনসহ আরও কিছু কিছু মানুষ এক-দুই টাকা যা পারল দিল। ভালোই টাকা জমা হয়েছে দেখে বড্ড খুশি হলো কালি চরণ। এই টাকাগুলো নিশ্চয়ই তার বউ-বাচ্চার কাছে যাবে? এতগুলো টাকায় কম করে হলেও তাদের পনেরো-ষোলো দিন তো এমনিই পার হয়ে যাবে। ভেবেই আরও শান্তি পেল লোকটা।

,,,,, চলবে,,,

#দেওয়ান_সাহেব

#থ্রীলার_জাস্টিস_ট্রাজেডি

#লেখনিতে_রুপান্জলি

,,,, চলবে,,,

,,, এটি একটি নব্বই দশকের কাহিনি। এখানে প্রেম-অপ্রেম, বাস্তবতা, থ্রিল— সব একসাথে থাকবে। সেই সঙ্গে অনেক ধরনের চরিত্রও থাকবে। কখনো হাসবেন, কখনো কাঁদবেন, আবার কখনো মায়া হবে, আবার কখনো ঘৃণা। তবে দিন শেষে ভালো কিছুই পাবেন।

সতর্ক বার্তা: সবরকম পরিস্থিতির জন্য তৈরি থাকবেন। একটু রিস্ক নিন। ইনশাআল্লাহ, এটা আপনার পছন্দের গল্প হয়ে উঠবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন