#দেওয়ান_সাহেব ( পর্বঃ ২)
#ট্রাজেডি_জাস্টিজ
#লেখনিতে_রুপান্জলী
,,, তৎকালীন জমিদারি আমলে দেওয়ানরা ছিলো নামকরা জমিদার। সময়টা আনুমানিক ১৭৯৩ সাল, যখন ব্রিটিশদের প্রবর্তিত """পার্মানেন্ট সেটেলমেন্ট """ ব্যবস্থার মাধ্যমে জমিদারি প্রথার সূচনা হয়। এরপর ধীরে ধীরে দেওয়ানদের বংশবিস্তার ঘটে। বংশবিস্তার যত বেড়েছে, ততই সম্পদ ভাগ-বিভাজন হয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় এসে ১৯৭৩ সালে মাহমুদুল দেওয়ান ও মাহবুবুর দেওয়ান, নবীনগড়ে দেওয়ান বাড়ির বর্তমান বংশধর হিসেবে পরিচিত। তারা ব্যতীত তাদের আরও কয়েকটি শাখা-পরিবার রয়েছে, তবে তারা নবীনগড়ে থাকে না। জমিজমা ভাগ হওয়ার পর যে যার মতো ভাগ বুঝে নিয়ে নিজের জমিতে বসবাস করছেন। সেখানেও তারা “দেওয়ান” পদবিতেই পরিচিত। লোকমুখে শোনা গিয়েছিলো, তাদের মধ্যে অনেকেই নাকি মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলো। তারপর তারা ফিরে এসেছে কিনা, সে সম্পর্কে ধারণা নেই তাদের। ইদানীং জমিদারি আমলটা আর নেই। ১৯৫০ সালে """ইস্ট বেঙ্গল স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট """ আইনের মাধ্যমে জমিদারি প্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করা হয়। এই আইনের পরপর সরকার জমিদারদের কাছ থেকে জমিজমার কাগজপত্র নিয়ে নেয় এবং তদন্ত করে যার যতটুকু প্রাপ্য, তাকে সেই অনুযায়ী জমির দলিল ফিরিয়ে দেয়। জমিদারি প্রথা চলে যাওয়ার পরেও দেওয়ানদের বেশ জমিজমা রয়ে যায়। এই জমিজমাই আপাতত দেওয়ানদের আয়ের উৎস। বলতে গেলে, দেওয়ান বাড়ির পুরুষরা খাঁটি কৃষক। সারা বছর কৃষিকাজের মাধ্যমেই তাদের জীবনযাপন সাধিত হয়। বাজারে অবশ্য তিনটে কাঁচামালের দোকান রয়েছে। সেখানেও দেওয়ানরা নিজেদের জমির ফসলাদি বিক্রি করে। জমিজমার পরিমাণ বেশি থাকার দরুন কিছুটা জমি বর্গা হিসেবে গরিব কৃষকদেরও দেওয়া হয়েছে। তারা বরাবরই ফসল ঘরে আনার পর তিন ভাগের এক ভাগ দেওয়ান বাড়িতে এনে জমা দিয়ে যায়। এমন নয় যে, নবীনগড়ে দেওয়ানরাই সবচেয়ে ধনী। মূলত তাদের থেকেও কয়েক ধাপ উপরের শ্রেণির লোকজন নবীনগড়ে বসবাস করে। কিন্তু দিন শেষে ঐ জমিদার পদবিটা! এই পদবির কারণেই দেওয়ানরা নবীনগড়ে সবচেয়ে সম্মানিত। ২৫ বছর আগে যেমন গ্রামের সব সিদ্ধান্ত দেওয়ানরা নিতো, এখনো তাই হয়ে আসছে। এখানে সম্পদ কিংবা রাজত্বের ভার প্রকাশ পায় না। তাদেরকে যতটা দেওয়া হয়, সবটাই সম্মান।
,,, দেওয়ান বাড়ির বর্তমান কর্তা মাহমুদুল দেওয়ান। উনার স্ত্রী রাহিমা বেগম। উনাদের দুই সন্তান। বড়োজন মোহাম্মদ আরবিদ দেওয়ান। ছোটজন মেঘাশ্রী দেওয়ান। আরবিদ একজন ভালো মানের কৃষক এবং ব্যবসায়ী। বাজারের তিনটে দোকানের মাঝে একটি সে সামলালেও বাকি দুটোর হিসেব-নিকেশও তার কাছেই থাকে। সেই সাথে সপ্তাহে দুই দিন রাতের বেলায় সিলেট শহরে কাঁচামাল সাপ্লাই দেওয়ার কাজটাও তার দায়িত্বের মাঝেই পড়ে। সে কৃষক বলে বিষয়টা এমন নয় যে, সে পড়ালেখায় খুব পিছিয়ে। মূলত সে মাস্টার্স পাশ করার পর গ্রামে এসে বাবা ও চাচার সাথে কৃষিকাজে লিপ্ত হয়েছে, আজ চার বছর পেরুতে চললো। মেঘাশ্রী এখন গ্রামের স্কুলে মাস্টারি করে। বয়সটাও তেমনি, বর্তমানে ২৭ চলছে। সে নিয়ে মাহমুদুল দেওয়ানের একমাত্র বোন বিনোদিনীর আক্ষেপের শেষ নেই। পরতে পরতে কথা শোনান। কেনো মেয়ে বিয়েতে রাজি হয় না? অন্যান্য মেয়েদের যেখানে ১০–১৩ বছর বয়সে বিয়ে দেওয়া হয়, ১৬ পেরুলে মেয়েদের কদর থাকে না, সেখানে মেঘাশ্রী কেনো বিয়ে বসবে না? তার বিয়েতে এতো সমস্যা কোথায়?
,,, বিনোদিনী হচ্ছেন মাহমুদুল দেওয়ানের ছোট এবং মাহবুবুর দেওয়ানের বড়ো বোন। বিয়ে হয়েছিলো বাংলাদেশ-ভারত বর্ডারের কাছে। সেই বছর বারো আগে তীব্র বন্যার সময় কলেরা নামক বিষ রোগে বিনোদিনীর স্বামী পরলোক গমন করেন। বর্ডারে তখন জলোচ্ছ্বাসে ভরপুর। থাকার ঠাঁই পাচ্ছিলেন না। আফনান তখন বিনোদিনীর পেটে, সাত মাসের গর্ভাবস্থা। কোলে তিন বছরের নিবেদিতা, হাতে ৮ বছরের আহিয়ান, সাথে বৃদ্ধ শাশুড়ি। কোথায় যাবেন, কী করবেন, ভেবে পাচ্ছিলেন না। বোনের এই দুরবস্থা দেখে দুই ভাই খাবারদাবার নিয়ে নৌকায় চড়ে বর্ডারের কাছে গিয়েছিলেন। ওখানে গিয়ে দেখেন, বোন তার ছেলে সন্তান নিয়ে ঘরের চালের উপর বসে আছে। সেদিন আর কোনো কিছু না ভেবে সাথে করে নিয়ে এলেন বোনকে। সাথে তার সন্তান ও শাশুড়িসহ। দেওয়ান বাড়িতে আসার পর আহিয়ানটার তীব্র জ্বর হলো। তখন বন্যার তোপ নবীনগরেও হানা দিয়েছে। দিনরাত বৃষ্টি, রাস্তাঘাট ডুবে গিয়েছে, পুকুর, নদী, নালার পানি দরজা পর্যন্ত হানা দিয়েছে। বাইরে বেরুনোর রাস্তা ছিলো না। একবেলা বেরুলে আরেক বেলা ফিরতে হতো। সাথে এতো মানুষের খাবার জোগাড় করা নিয়ে তীব্র হিমসিম খেতে হয়েছে মাহমুদুল দেওয়ান আর মাহবুবুর দেওয়ানকে। এই এতোকিছুর মাঝে আহিয়ানটার তেমন করে চিকিৎসা করানো হয়নি। ১২ দিনের মাথায় জ্বরে তরতাজা ছেলেটাও পরলোক গমন করলো। সেই থেকেই বিনোদিনীর মাথায় কিছু সমস্যা হয়েছে। শান্ত মহিলাটি এখন তীব্র খিটখিটে স্বভাবের হয়ে উঠছে। সারাক্ষণ এর এই দোষ, ওর সেই দোষ ধরেই থাকেন।
,,, মাহবুবুর দেওয়ানের স্ত্রী আয়েশা বেগম। তাদের তিন সন্তান। বড়োজন মোহাম্মদ আরহান দেওয়ান। সে এইবার মাস্টার্স পাশ করে এই তো গতকাল গ্রামে ফিরলো। সে বরই ব্যস্ত মানব, তবে তার কোনো কাজ নেই, কাজ করার ইচ্ছাও নেই। আপাতত সে বাবা, চাচা আর বড়ো ভাইয়ের উপর নির্ভরশীল হয়ে বাঁচতে চায়। ভবিষ্যৎ নিয়েও তার কোনো কল্পনা নেই। ভবিষ্যতের ভাবনাটা সে ভবিষ্যতের জন্যই গচ্ছিত রাখতে চায়।
আর মেয়ে দুটো জমজ। বড়োটা বনশ্রী দেওয়ান আর ছোটজন কাব্যশ্রী দেওয়ান। তাদের বয়সের তফাৎ ১৫ দিনের। ওদের জন্ম দিতে গিয়ে বড্ড ফ্যাসাদে পড়েছিলেন আয়েশা বেগম। বন্যটা কোনোরকমে হলেও কাব্যটা যেই অতিরিক্ত পনেরো দিন পেটে ছিলো, ব্যথায় কাতরে কাতরে উঠেছিলেন তিনি। কখনো তীব্র ব্যথায় মরে যেতে চেয়েছেন। মেয়েটা জন্মানোর সময় বড্ড কষ্ট দিয়েছিলো আয়েশা বেগমকে। তবে দিন শেষে এই কাব্যটাই হলো তার বাবা-মায়ের সবচেয়ে প্রিয় সন্তান। বনশ্রী আর কাব্যশ্রী একই বয়সি হলেও বন্য পড়ে ক্লাস এইটে আর কাব্য পড়ে সেভেনে। বন্য খুব সাহসী, স্পষ্টবাদী, আর কাব্য ভীতু। জন্ম থেকেই দুর্বল কিনা? এখনো সেই দুর্বলই রয়েছে। কথা বলার আগে কেঁদে দেয়, অকারণেই শরীর কাঁপতে থাকে, ঠাস ঠুস পড়ে যায়। পড়ে গিয়ে হাত-পায়ে ব্যথা পেয়ে অসুস্থ হয়ে যায়। ভয়ে, জড়তায় মেয়েটা সারাক্ষণ কাবু হয়ে থাকে। এই তো এখনো কাঁপছে। বিনোদিনী ফুপু তার বড়ো আপুকে বকছে, আর সে সেই বকা শুনে কেঁপে কেঁপে উঠছে। কেঁদে দিবে দিবে ভাব। বোনের ছলছল দৃষ্টি দেখে ক্ষীণ হাসলো মেঘাশ্রী। মেয়েটা এতো ভীতু কেনো? কে জানে? মেঘাশ্রীকে হাসতে দেখে আরও রাগলেন বিনোদিনী। মুখে পান ঠুসে সেটা চিবুতে চিবুতে বললেন— মাইয়ার লাজ দেহো, হাসে আবার। এহনো তুই কচি খুকি আছোত? (শব্দ করে) বড়ো ভাবি!! আমি কইয়া দিলাম, এই মাইয়ারে জলদি বিয়া দেন। এক বাচ্চার বাপ পাইলেও রাজি হইয়া যান। হারাডাদিন কান্দে, একটা ব্যাগ ঝুলাইয়া এই পাড়া ঐ পাড়ায় ঘুইরা বেড়ায়। বাজে পুরুষগো নজর যায় না? লোকে কানাঘুষা করে। কয়, এই ডাঙ্গর মাইয়া জামাই ছাড়া থাহে কেমনে? নির্ঘাত আকাম কুকাম করে। এইগুলা হুনতে ভাল্লাগে? বিয়া দেন, নয়তো কাইট্টা গাঙ্গে ভাসান। আকথা-কূকথা হুনতে হুনতে আমার কান পইচা যাইতাছে।
,,, মেঘাশ্রী বিচলিত হলো না। ফুপুর কথা কানেও তুললো না। দিনকে দিন এসব শুনতে শুনতে সে অভ্যস্ত। এখন আর কষ্ট হয় না, খারাপ লাগাও কাজ করে না। এই বেলায় কাব্যটা কেঁদেই দিলো। আপা এসব বাজে কথা কেনো শুনে? আপার বিয়ে বসতে এতো আপত্তি কেনো? আপা কেনো প্রতিবাদ করে না? আম্মা আর বড়ো আম্মাও তো কিছু বলে না। ফুপুকে ভয় পায়। পাছে যদি রাগ করে বাড়ি ছাড়ে, সেই আশঙ্কায়। কাব্যকে কাঁদতে দেখে খেঁক করে উঠলেন বিনোদিনী বেগম— ও তুই কান্দো ক্যা? বড়ো বইনের লাইগা দুঃখ লাগছে? এতো মায়া দেহানের কাম নাই। এই জামানায় মায়ার দাম নাই। (ভাবুক হয়ে) এই ছেরিরেও বিয়া দেওনের কাম। তার আগে বন্যটারে দেওয়া লাগবো। এইবার আর ভুল করমু না। ইসকুলে থাকতে থাকতেই দুইটারে বাড়ি ছাড়া করমু। বড়ো ভাইজান আর ছুডোডায় যা খুশি কউক। আমার কথার হেরফের আমি হইতে দিমুনা।
,,, প্রজাপতি উড়ে গিয়ে বল না,,
আমি নই তার হাতের খেলনা,,
বল না,, লালা লালা লা লালা,,
,,, ঠোঁটে গানের সুর তুলে বেণুনি নাড়াতে নাড়াতে ঘরে ঢুকলো বনশ্রী। শাড়ির আঁচলে করে কী যেনো এনেছে। বসার ঘরে বিনু ফুপুর উপস্থিতি দেখে থমকে দাঁড়ালো। পরক্ষণেই বাহিরের থেকেও দ্বিগুণ লাফিয়ে লাফিয়ে ভিতরে এসে একদম বিনু ফুপুর সামনে এসে দাঁড়ালো। খাবার টেবিলে বসে ভাত খেতে থাকা বড়ো আপার দিকে একবার তাকিয়ে আবার বিনু ফুপুর দিকে তাকিয়ে সাত-আটবার সমানে চোখের পলক ঝাপটে বললো — সকাল সকাল যাত্রাপালা শুরু হয়ে গিয়েছে? ভালো ভালো। এই কাব্য, তুই ফুপাচ্ছিস কেনো? আমার আম্মার ঘরে যে এটা কী হলো! খালি কান্না করে।
প্রজাপতি উড়ে গিয়ে বল না,,,
আমি নই তার হাতের খেলনা,,
হুমুহুম হুমুহু হুহুম,, লা লা লা লাল,,
,,, যেই তোড়ে এসেছে, সেই তোড়েই নাচতে নাচতে সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে চলে গেলো। বনশ্রীর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে খেঁকিয়ে উঠলেন বিনোদিনী বেগম — আরেকজন পাড়া বেড়ায় আইছে। আমার ভাইয়েগো ঘরে একটা মাইয়াও ভালা হয়নাই। সব কয়ডা উচ্ছইন্নে গেছে। নিবেদিতা, ও নিবেদিতা!! ইসকুলে যাবিনা? আজগা যদি ইসকুলে না গেছোত, তাইলে সামনের সপ্তাহে তর বিয়ার ব্যবস্থা করমু।
,,, ডাকতে ডাকতে মুখে চুন পুরে নিলেন। মেঘাশ্রীর খাওয়া শেষ। আজ দ্রুত স্কুলে যেতে হবে। দুদিন আগে ক্লাস সেভেনের ক্লাস টেস্ট নিয়েছিলো। আজ সেগুলো তাড়াহুড়ো করে দেখে ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। সে হাত ধুয়ে অপর চেয়ারে রাখা কাপড়ের কাঁধব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে বাহিরের দিকে হাঁটা দিলো। যাবার আগে মাকে বলেও গেলো না। সে কথা শুনছে, এতে তার কোনো দুঃখ নেই। কিন্তু ছোট ছোট ভাই-বোনদের সামনে এসব বাজে কথা বলায় তার অন্তরে খুব আঘাত লেগেছে। ভাই-বোনগুলো কি তার প্রতি খারাপ ভাবনা পোষণ করবে? যেমনভাবে ফুপু বলেন, তেমন ভাববে কি? এই সমাজে একটা জীবন বিয়ে না করে কাটানো কি খুব অপরাধের? ২৭টা বছর তো চলেই গেলো। গড় আয়ু থেকে বাকি থাকে ৩৩ কিংবা আরও কয়েক বছর কম-বেশি। এটুকু সময় কি একা কাটানো যাবে না? সে তো কোনো পাপ করছে না। গ্রামের আটজন লোককে জিজ্ঞেস করলে, বিয়ে না করা ব্যতীত তার প্রতি অন্য কোনো অভিযোগ পোষণ করতে পারবে না। তাহলে এতো সমালোচনা কেনো? কেনো তার এতো বদনাম?
*****************
,,, বালুর মাঠের এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছে বনশ্রী। তার সাথে কাব্যশ্রী, নিবেদিতা আর আফনান। সামনের রাস্তা দিয়ে রুপান্মিতা আর মিতালি আসবে। রুপা আর বনশ্রী এক ক্লাসে পড়ে। নিবেদিতা, কাব্য আর মিতালি পড়ে এক ক্লাসে। আফনান পড়ে মাদ্রাসায়। আজ সকালে বিচার দেখতে গিয়ে মাদ্রাসায় যেতে দেরি হয়ে গিয়েছে, তাই ওদের সাথে যাচ্ছে। বনশ্রী শাড়ির আঁচল থেকে খুঁজে খুঁজে পাকা একটা তেঁতুল বের করে তিনজনকে দেখিয়ে বললো — এই দেখ, কত্তো পাকা তেঁতুল। খাবি?
,,, নিবেদিতা মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানিয়ে বললো — আমারে একটা দেও না আপা। নুন আনছো?
,,, স্কুলে যেহেতু তারা আলাদা হয়ে যাবে, তাই এখানেই সব ভাগ-বাঁটোয়ারা মিটিয়ে নিতে হবে। অগত্যা বনশ্রী নিজের জন্য বেছে বেছে পাকা তেঁতুলগুলো আলাদা করতে লাগলো। নিবেদিতা সেটা লক্ষ্য করে মুখটা কাঁদো কাঁদো করে বললো — বন্য আপা, তুমি একটা স্বার্থপর মাইয়া। নিজের জন্য সব ভালা গুলা রাইখ্খা আমগোরে কাঁচা গুলা দিতেছো।
,,, বনশ্রী চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে কাঁচা কাঁচা তিনটে তেঁতুল ধরিয়ে দিয়ে বললো — আগে তর শুদ্ধ-অশুদ্ধ ভাষা মিলিয়ে কথা বলাটা বন্ধ কর, তারপর ভালো তেঁতুল খেতে আসিস।
,,, বলতে বলতে আরও তিনটা কাঁচা তেঁতুল নিয়ে কাব্যশ্রীর দিকে এগিয়ে দিলো। কাব্য নাকচ করে বললো — আমি চুরির জিনিস খাবো না আপা। তুমি খাও।
,,, বনশ্রী মুখ বাঁকালো। তেঁতুলগুলো কাব্যর নীল শাড়ির আঁচলে বাঁধতে বাঁধতে বললো — চুরি কিরে? চুরি কি? আমাদের গ্রাম, আমরা যেখান থেকে ইচ্ছা, যা খুশি নিয়ে খাবো। তাতে ঐ মাস্টারের কী?
,,, নিবেদিতা ফোড়ন কেটে বললো — বাড়িঘর মাস্টারের, গাছও মাস্টারের, আর অধিকার দেখাও তুমি। বাহ, বাহ!! রেজওয়ান স্যার জানতে পারলে তোমায় স্কুল থেকে বহিষ্কার করবে। দেইখো!!
,,, বনশ্রী একটা তেঁতুল নিয়ে কামড় বসিয়ে চোখ-মুখ কুঁচকে টকজাতীয় শব্দ করতে করতে বিরক্তিকর কণ্ঠে বললো — কচু করবে। ঐ মাস্টারকে আমি ভয় পাই? উনার দাদুকে একটু-আধটু ভয় পেতাম। ওটাও তো বছর দেড়েক আগে মরেছে। এখন আর আমি কাউকে ভয় পাই না। মনমতো চুরি করি।
,,, ওদের কথোপকথনের মাঝে রুপান্মিতা এগিয়ে এলো, তবে সাথে মিতালি নেই। মেয়েটা ইদানীং ফাঁকিবাজ হয়েছে। বেশ কয়েকদিন ধরেই স্কুল কামাই দিচ্ছে। কবে যে আবার নিয়মিত হবে, কে জানে? রুপান্মিতাকে এগিয়ে আসতে দেখে হাঁটা দিলো বনশ্রী। কাব্য, নিবেদিতা, আফনান আর রুপান্মিতা একসাথে হাঁটতে লাগলো। কিছু সময়ে মিলিত হলো সকলে। রুপাকে পেয়ে বনশ্রী কাব্যকে ভুলে গেলো। ওরা দুই বান্ধবী কথায় মশগুল। নিবেদিতারও একই হাল। আফনান একটু হেঁটেই মাদ্রাসার মোড় ধরে চলে গেলো। সেই প্রতিদিনকার ন্যায় একলা মনে হাঁটছে কাব্য। ক্ষণে ক্ষণে ডাগর ডাগর চোখে তাকাচ্ছে সবার দিকে। মন দিয়ে সবার কথা শুনলেও বিপরীতে কিছু বলছে না। সে সবার সাথে অতো কথা বলতে পারে না। মনে মনে বড্ড ভীতু সে। হাসি-মজাও করতে পারে না। এখান থেকে স্কুলে পৌঁছাতে আরও মিনিট পনেরোর মতো হাঁটতে হবে। তার উপর বান্ধবীরা একসাথে হলে তো কোনো কথাই নেই। বকবক করতে করতে সময় পেরিয়ে যায়, তবু রাস্তা ফুরোয় না। কাব্য একমনে হাঁটতে হাঁটতে সামনে তাকাতেই এক অনাকাঙ্ক্ষিত পুরুষের দেখা পেলো। আরবিদ দেওয়ান আসছে। তার সাথে আরহান দেওয়ান। আরবিদের পরনে লুঙ্গি, পাঞ্জাবি। চোখ-মুখ শক্ত। সোজা রাস্তার দিকে তাকিয়ে হাঁটছেন। আরহানের পরনে পাঞ্জাবি-পায়জামা। হাতে একটি শাল ভাঁজ করা। কাব্য এই শালটা খুব ভালো করে চেনে। এটা দেওয়ান সাহেবের। নিশ্চয়ই রোদ উঠেছে বলে দেওয়ান সাহেবের শালটা হাতে নিয়েছেন ভাইজান? উনাদের পিছনে আরও কিছু ছেলেপুলে রয়েছে। বোধহয় বিচার সেরে এই পথে বাড়ি ফিরছেন। কিন্তু সোজা রাস্তা ছেড়ে এই পথে এলেন কেনো? কোনো কাজ ছিলো কি? থাকুক আর না থাকুক, ওসবে কাব্যর কিছু এসে যায় না। সে শুধু জানে, স্কুলে যাবার আগে একবার দেওয়ান সাহেবকে দেখার ইচ্ছা ছিলো। সেটা এই পর্যায়ে এসে মিটেছে। কাব্য ভেবেছিলো, আজ বোধহয় তার দিনটা খারাপ যাবে। অথচ দেওয়ান সাহেবকে দেখে সে একমুহূর্তেই সারাদিনের আনন্দ একসাথে উপভোগ করে নিচ্ছে।রুপান্মিতা বনশ্রীর সাথে কথা বলতে বলতে সামনে তাকাতেই আরবিদ ভাইজানের সাথে সকালের সেই অচেনা লোকটাকে দেখতে পেলো। আরবিদ ভাইজানের সাথে কী নিয়ে যেনো কথা বলছেন। আলোচনাটা গভীর মনে হচ্ছে। চোখ-মুখে কেমন কাঠিন্যতা বিরাজমান, তবে ঠোঁটে হালকা হাসি। লোকটা কি তবে ভাইজানের পরিচিত? বন্যদের কিছু হয়? আত্মীয়-টাত্মীয় হবে কি? তখনই অচেনা লোকটার সাথে চোখাচোখি হলো রুপার। সকালের সেই শ্যামলা মেয়েটাকে দেখে কিছুটা অবাক হয়েছে আরহান। মেয়েটার পরনে একটি রং জ্বলে যাওয়া পুরনো নীল শাড়ি। দেখে মনে হচ্ছে, এটা বহুদিন যাবৎ ব্যবহার করার ফলে ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে। চোখে সকালের চেয়েও কিছুটা গাঢ় করে কাজল আঁকা। চুলগুলো বেণি করে সামনে এনে রাখা। মেয়েটার চুল দেখে খুব একটা অবাক হয়নি আরহান। হওয়ার কথাও না। মেয়েটার চুলের বেণি কোমর ছুঁই ছুঁই হলেও তার বোনদের চুল বিশাল বড়ো। এতো বড়ো বড়ো চুল দেখার পর মেয়েটার লম্বা চুলগুলোও তার কাছে আহামরি কিছু মনে হলো না। বন্য আর মেয়েটার বয়স, চলন-বলন দেখে আন্দাজ করে বুঝে নিলো, এরা বান্ধবী। সে যেহেতু বহু বছর যাবৎ গ্রামে আসে না, সেহেতু গ্রামের বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদের না চিনাটাই স্বাভাবিক। তবে আরহান বিষয়টা যতটা স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে, রুপা ততটাই কুণ্ঠায় মরে যাচ্ছে। সকালবেলা হ্যাংলার মতো লোকটার শাল নিয়ে এলো। লোকটা কী ভাববে? ভাববে না? রুপা কোনোদিন ভালো কিছু চোখে দেখেনি? সেই সাথে লোকটা তার পারিবারিক কোলাহল সম্পর্কেও জ্ঞাত। রুপার অনেক লজ্জা লাগছে। বলতে ইচ্ছা করছে, "'আপনার শালটা আমার কাছে। আমি ওটা ফিরিয়ে দিতে চাই। ""কিন্তু বলার সাহস পেলো না। রুপার ভাবনার মাঝেই আরবিদ, আরহান আর ছেলেপুলেগুলো তাদের সামনে এসে দাঁড়ালো। বড়ো ভাইজানকে সামনে দেখে বড্ড খুশি হলো বনশ্রী। হাসি হাসি মুখ করে সালাম দিলো।
,,, আরবিদ গম্ভীর মুখে সালাম গ্রহণ করে বললো — স্কুলে যাচ্ছো?
,,, বন্য মাথা ঝাঁকিয়ে বললো — জ্বী ভাইজান!! আপনারা কি বিচার থেকে ফিরছেন? বিচারে কি রায় হলো?
,,, বন্য আপার লাগামহীন কার্যে চোখ বড়ো বড়ো করে তাকালো কাব্যশ্রী। আপা কিনা এই অসম্ভব রাগী লোকটার কাছে প্রশ্ন রাখলো? লোকটা তো এখুনি রেগে যাবেন, আরেকটা রামধমক দিয়ে বন্য আপার খুশি খুশি মুখটা চুপসে দিবেন। বন্য আপার জন্য বড্ড মায়া হলো কাব্যর। মনে মনে দোয়া করলো, যেনো আপাকে উনি কিছু না বলেন। কাব্যর দোয়া কবুল হলো। আরবিদ বন্যকে কিছু বললো না, আবার কথার উত্তরও দিলো না। উল্টো পাঞ্জাবির পকেট থেকে রেশমি কাপড়ের থলি বের করে ১০ টাকার একটি নোট এগিয়ে দিয়ে বললো — নিবেদিতা, রুপাকে নিয়ে টিফিন করো।
,,, বনশ্রী মাথা নাড়ালো। টাকাটা নিয়ে একপাশে সরে গেলো। বাকিরা আগেই সরে গিয়েছিলো। আরবিদ আর আরহান শক্ত কদম ফেলে তাদেরকে এড়িয়ে গেলো। আসার পর থেকে যাবার বেলা পর্যন্ত একটিবারও কাব্যের দিকে তাকায়নি আরবিদ। কাব্যের খুশি খুশি মনটা হুট করেই কেমন মরে-মরে হয়ে গেলো। উনি সবার নাম বললেন, অথচ তার নাম বললেন না। কেনো? তার মানে ঐ টাকায় তার ভাগ নেই? কাব্যর চোখ জ্বালা করলো। নাক টানছে সমানে। পায়ের গতি কিছুটা কমে এলো। বন্যরা আগে আগে হাঁটছে। সে শাড়ির আঁচল টেনে চোখ মুছে পিছন পিছন হেঁটে গেলো। এক ফাঁকে পিছন ফিরে চাইলো লোকটার গমনপথে। লোকটা কেমন শক্ত কদমে এগিয়ে যাচ্ছে, দেখো। অথচ তার বিরহে এক বিরহিণী কতোটা বিরহ সহ্য করছে, তা কি মানবের অজানা? নাতো, অজানা নয়। যেই মানুষটা লোকের চোখ দেখে তাদের মনের কথা বুঝে ফেলতে পারে, সেই লোকটা কি সত্যি কাব্যের কিশোরী মনের ভাবনা বুঝতে পারেনি? দেওয়ান সাহেবের বিরহিণীর মন-কুঠুরিতে তীব্র অভিমান জমা হলো। আজ বন্য আপা সাধলেও এই টাকায় ভাগ বসাবে না সে। লাগবে না ওসব টিফিন-মিফিন। প্রয়োজনে সে আজ খাবারই খাবে না। লোকটা বরাবর তার সাথে এমন করে। তার প্রতি এতো বিতৃষ্ণা কেনো উনার?
******************
,,, আরবিদ আর আরহান যখন বাড়ি ফিরলো, তখন বসার ঘর ভরপুর। বাবা-চাচা বেতের সোফায় বসে আছেন। কাজের লোকেরা মা-চাচিকে সাহায্য করছে। কুসুম ঘর মুছছে। খাওয়ার সময় পেরিয়েছে সেই কখন, তবুও বাড়ির কেউ খাওয়াদাওয়া করেনি। বরাবর ছেলেকে সাথে নিয়ে খেতে খেতে অভ্যাস হয়ে যাওয়ায় এখনো দুই ভাই ছেলের অপেক্ষায় বহমান। বাড়ির পুরুষরা না খাওয়ায় মহিলাগণও অভুক্ত। এখন তো আরহানও ফিরে এসেছে। গতকাল বিকেলেই ফিরলো। রাতে অবসর নেওয়ার ফলে কারোর সাথেই তেমন দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। তার উপর সকাল সকাল গ্রাম দেখতে বেড়িয়েছে ছেলেটা। ফিরেছে ভিজা অবস্থায়। বাড়িতে ফিরে এক দণ্ড বসেনি। জামাকাপড় পাল্টে ছুটে গেলো বিচারকার্যে। সে বহু বছর ধরে বিচার-আচার হতে দেখেনি, তাই বিষয়টা মিস করলো না। মন দিয়ে দেখলো সবটা। বড়ো ভাইজানের বিচারে সে সন্তুষ্ট। এতোটা ভালো বিচার খুব কম বিচারকেরাই করে থাকে।
,,, আরবিদ আর আরহানকে আসতে দেখে হাসলেন দুই ভাই। আরবিদ গম্ভীর মুখে হনহন করে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলো। দেওয়ান বাড়ির দুই কর্তার সাথে তার খুব একটা সাক্ষাৎ নেই। বাবার সাথে নরম স্বরে কথা বলা হয় না, যুগের পর যুগ কেটে গিয়েছে। তাদের সাথে যতটা কথা হয়, সবটাই কাজের খাতিরে। এমনকি সে কারোর সাথে বসে খাবারও খায় না। হয় সবার খাওয়া শেষ হলে খায়, নয়তো নিজের ঘরে খায়। আরবিদের জীবনটা ঘর, ক্ষেত-খামার আর ব্যবসার মাঝেই সীমাবদ্ধ। এর বাহিরে কোনো কিছু নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। বড়ো ছেলেকে হনহন করে চলে যেতে দেখে দুই ভাই চরম অসন্তুষ্ট হলেন। আরহান আবার ভাইয়ের সম্পূর্ণ বিপরীত এবং বরই আল্হাদের। পরিবার, মা-চাচি, বাবা-চাচা, এমনকি বিনু ফুপুর কাছেও বড়ো আদরের সে। অগত্যা মুখশ্রীতে তীব্র ভদ্রতা ঢেলে বাবা-চাচার সামনে দাঁড়িয়ে বললো — আব্বাজান!! আমি খুব ক্লান্ত। আপনারা খেতে বসুন, আমি কিছুক্ষণেই আসছি।
,,, মাহমুদুল দেওয়ান চোখের ইশারায় সায় জানালেও বড়ো ছেলের কাণ্ডে তীব্র অসন্তুষ্ট হয়েছেন দুই ভাই। ছেলেটাকে সব দিক থেকে মানুষ করা গেলেও পারিবারিক বন্ধন সম্পর্কে মানুষ করতে পারেননি।
***********
,,, """ নবীনগর আদর্শ বিদ্যালয় """
১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের শিক্ষার হার ছিলো ২০–২৫%। স্কুল-কলেজ নেই বললেই চলে। যা ছিলো, তাও অনেক দূরবর্তী স্থানে। যার ফলে গ্রামের আদিম সভ্যতার মানুষগুলো তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে চাইতো না। মেয়ে সন্তানদের তো একেবারে আঁচলে গিট দিয়ে রাখার মতো করে বেঁধে রাখা হতো। পড়ালেখার এই অধঃপতন দেখে নবীনগড়ের সকল অর্থবিত্তরা মিলে চারটে টিনের চালার ঘর, অর্ধপাকা সান আর বসার জন্য মাদুর এনে স্কুল তৈরি করেন। পুরো নবীনগড়ে এই একটাই স্কুল। আপাতত কলেজ নেই। তৈরি হওয়ারও সম্ভাবনা নেই। যেখানে মেয়েদের ক্লাস ফাইভ-সিক্সেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়, সেখানে কলেজ তৈরি করার কোনো মানেই হয় না। সেই সাথে এখন দেশের যা হাল, ওসব না ভাবাই শ্রেয়। যাকে দেশ পরিচালনায় বসানো হয়েছে, সে সহ তার সন্তানেরা ভক্ষকের ন্যায় আচরণ করছে। লোকে বলে, সেদিন নাকি দেশে স্বাধীনতা এসেছিলো। কোথায় স্বাধীনতা? কে জানে কোন বাধ্য বেড়াজালে আটকে পড়েছে সে। হয়তো ছাড়া পাচ্ছে না, তাই দেশবাসীকে ধরা দিচ্ছে না।
,,, স্কুলের অর্ধপাকা সিঁড়িতে বসে তেঁতুল খাচ্ছে বনশ্রী। রুপান্মিতা খেতে খেতে ক্লান্ত। দাঁত টক হয়ে গিয়েছে। সে বন্যর প্রতি ভীষণ বিরক্ত। একটা মেয়ে এতো তেঁতুল কী করে খেতে পারে? দাঁত টক হয় না? কদিন পরপর মাস্টার বাড়ি থেকে তেঁতুল চুরি করে আনে আর স্যারের দৌড়ানি খেয়ে আসে। তাও মেয়েটার তেঁতুলের ঝোঁক কমে না। রুপার ভাবনার মাঝে বন্য তেঁতুলে কামড় বসিয়ে বললো — ওমমম!! অসাধারণ!! লবণ আর মরিচ দিয়ে তেঁতুল এত্তো স্বাদ, কী বলবো? রুপা!! আরো নে। আচ্ছা থাক, খেতে হবে না। কাল খাস।
,,, বলতে বলতে আবারও খাওয়ায় মন দিলো। তবে বনশ্রীর তেঁতুল খাওয়ার মাঝে ভাটা ফেলতে রুপান্মিতা শঙ্কিত কণ্ঠে বললো — এই সাবধান!! পিছনে রেজওয়ান স্যার।
,,, বনশ্রী তড়াক করে পিছনে তাকালো। রেজওয়ান স্যারকে কটমট করে তাকিয়ে থাকতে দেখে চোখ-মুখ কুঁচকে নিলো। পরক্ষণেই মুখ ভেংচিয়ে তেঁতুল খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। এই শিক্ষকটাকে তার একটু ও পছন্দ না। দেখলেই রাগ লাগে। অথচ উনার বাড়ির তেঁতুল, আম, জাম, আমড়া, কদবেল বনশ্রীর সবচেয়ে পছন্দের। এটা ভীষণ ভয়ানক ব্যাপার। বড্ড বিপদজনকও। লোকটা চরম খিটখিটে কিনা? সকালেও তেঁতুল চুরির জন্য দৌড়ানি খেয়ে এসেছে বেচারি। লোকটা এতো খারাপ, এতোটাই খারাপ যে, উনি উনার বাড়ির কোনোকিছু বেচবেনও না, কাউকে দেবেনও না, আবার নিজেও খাবেন না। সব কাক-পক্ষীকে খাওয়াবেন। এটা নাকি প্রাণী-প্রীতি। প্রীতি না হাতি! ওসব জানা আছে বনশ্রীর। সে বুঝে না, একটা লোক এত্তো বাজে প্রকৃতির কী করে হতে পারে? আর মুখের কী ছিরি! দেখতেও যে আহামরি সুন্দর, তাও না। গায়ের রং লাল-ফর্সা হলেও চেহারা তেমন আহামরি সুন্দর না। তার উপর সারাক্ষণ কপালে তিনটে ভাঁজ ফেলে রাখে। দেখে মনে হয় এখনই কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে নেওয়ার জন্য তেড়ে আসছেন। ফালতু শিক্ষক!! বনশ্রীর গভীর ভাবনার মাঝেই রেজওয়ান সামনের দিকে হেঁটে ফাইভ, সিক্সের ক্লাস পেরিয়ে এইটের ক্লাসে ঢুকে গেলো। বন্য খেয়াল করেনি সেটা। সে তখনো খাওয়ায় ব্যস্ত। কিছুক্ষণ আগেই টিফিনের ঘণ্টা পড়েছে। ঘণ্টা পড়া সত্ত্বেও সে ক্লাসে যাওয়ার নাম নিচ্ছে না। এই চতুর্থ পিরিয়ডটা বড়ো আপার। আপার ক্লাসে দেরিতে গেলেও কোনো কথা শুনতে হবে না, কারণ এটা তার নিজের আপার ক্লাস। ভেবেই তেঁতুলে লবণ লাগিয়ে আরও একটা কামড় বসালো। বনশ্রীর খেয়াল না থাকলেও রুপান্মিতা বিষয়টা খেয়াল করলো। সে তাড়াহুড়ো করে বনশ্রীর হাত ধরে টানতে টানতে বললো — বন্য!! এই, স্যার তো আমাদের ক্লাসে চলে গেলো। আরে চল দ্রুত। বন্য!!
,,, রুপার কথা বোঝারও ফুরসত পেলো না মেয়েটা। তার আগেই ওর হাত ধরে টেনে ক্লাসের দিকে ছুটে গেলো। মাটির তৈরি বারান্দায় জুতার ধুপধাপ পায়ের শব্দে ফাইভ আর সিক্সের ক্লাসে থাকা সকলে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো। ক্লাস সিক্সের সামনে দিয়ে যাওয়ার বেলায় ভিতরে থাকা স্যার পায়ের শব্দ করার কারণে ধমকে সতর্ক করলেন। সেসব কানে তোলার সময় পেলো না তারা। দৌড়ে গিয়ে নিজেদের ক্লাসের সামনে দাঁড়ালো। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রুপান্মিতা হাঁপাতে হাঁপাতে বললো — আসবো স্যার?
,,, রেজওয়ান কপালে সেই চিরচেনা তিনটে ভাঁজ ফেলে বললো — ঘণ্টা কখন দিয়েছে?
,,, রুপান্মিতা মাথা নত করে নিলো। তবে বনশ্রী মুখের উপর বলে বসলো — স্টিলের প্লেটে চামচ দিয়ে বাড়ি দেওয়ার কারণে আমরা শুনতে পাইনি। সুতরাং আমাদের কোনো দোষ নেই।
,,, বনশ্রীর কথায় ধমকে উঠলো রেজওয়ান — কানে কালা হলে শুনবি কী করে? ভিতরে এসে সবার সামনে কান ধরে দাঁড়া।
,,, রেজওয়ানের কথায় নাক কুঁচকালো বন্য। শিক্ষকদের ব্যবহার এমন? এটাকে কোন বলদে চাকরি দিয়েছে, আল্লাহ মালুম। পুরো স্কুলে উনি একজন শিক্ষক, যে সব স্টুডেন্টকে তুই-তোকারি করে কথা বলেন। বন্যকে নাক-মুখ কুঁচকাতে দেখে ফের ধমকে উঠলো রেজওয়ান — এই মেয়েরা, কথা কানে যাচ্ছে না? এখানে এসে দাঁড়া।
,,, রুপা কোনোরূপ কথা না বলে চুপচাপ ভিতরে ঢুকে কানে ধরে দাঁড়ালো। রেজওয়ান আবারও চোখ পাকাতেই হেলতে দুলতে ভিতরে ঢুকলো বন্য। তার আবার লজ্জা-শরম কম। কম হওয়ারও দশ-বারোটা কারণ রয়েছে। তার মধ্যে প্রধান কারণ হলো, তাকে প্রতিদিনই এরকম কানে ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, বেতের বাড়ি খেতে হয়, ধমকাধমকি শুনতে হয়। তারপরেও সে ঠিক হতে পারে না। এরকমই থেকে যায়। বরং একটু ধমক শুনলে নিজেকে শুধরানোর বদলে আরও বিগড়ে যায়। তাই তার কোনো লজ্জা-শরম নেই। অভ্যাস হয়ে গিয়েছে না? মানুষ তো অভ্যাসের দাস!!
*********
,,, সন্ধ্যা নাগাদ ময়নুলকে দোকানে বসিয়ে বাড়ি ফিরলো আরবিদ। মা-চাচিরা রাতের রান্নার তোড়জোড় করতে ব্যস্ত। রাহিমা বেগম হলরুমে বসে পোকা ধরা চাল ঝাড়ছেন। ইদানীং শুকনো নীম পাতা, ত্যাজপাতা, শুকনো মরুিচ দিয়েও চালের খুব একটা সুবিধা করা যায় না। বছর মাঝামাঝি পেরুতেই চালে পোকা ধরে যায়। নিবেদিতা আর বিনু ফুপু বসে বসে সবজি কাটছে। বন্য বেতের সোফায় পায়ের উপর পা ভাঁজ করে বসে ভাজা চাল চিবুচ্ছে আর ক্ষণে ক্ষণে নিবেদিতাকে কী নিয়ে যেনো রাগাচ্ছে। কলপাড় থেকে একের পর এক চাপের শব্দ আসছে। বোধহয় থালা-বাটি মাজছে কেউ। এছাড়া আপাতত বসার ঘরে কেউ নেই। আরবিদ শক্ত কদমে বাড়ির ভিতর ঢুকে মা-ফুপুকে পেরিয়ে রান্নাঘরের পাশ দিয়ে যেতে নিতেই আকস্মিক ধাক্কা লাগলো কারোর সাথে। মুহূর্তেই স্টিলের থালা-বাসনের টুংটাং শব্দে মুখরিত হলো চারিপাশ। ভীতু, দুর্বল কাব্যটা সেই শব্দে থরথর করে কেঁপে উঠলো। আকস্মিক ধাক্কা লাগলেও পড়ে যায়নি সে। শুধু দুপুরের পর ময়লা হওয়া থালা-বাটিগুলোই ছড়িয়ে পড়েছে এদিক-ওদিক। সেই সাথে আরবিদের সাদা পাঞ্জাবিটাতেও ছিটকে পড়েছে ডাল। ভীতু কাব্য কাঁপতে কাঁপতে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আরবিদের দিকে তাকালো। লোকটার দৃষ্টি নিশ্চল, নির্বিকার। রাগ নেই, শুধু মুখজুড়ে খেলা করছে হতাশার নিশ্বাস। মুহূর্তেই চোখ নামিয়ে নিচের দিকে তাকালো কাব্য। নিজেকে প্রস্তুত করলো একটা বড়োসড়ো ধমক খাওয়ার জন্য। অথচ এখনো আরবিদ নির্বিকার, যেনো কিছুই হয়নি। সে তপ্ত নিশ্বাস ফেলে হাঁক পেরে কলিকে ডাকলো। বড়ো ভাইজানের ডাক শুনে ছুটে এলো কলি। কী হয়েছে জানতে চাইলে আরবিদ দৃঢ় কণ্ঠে আওড়ালো — ঘরে এসে পাঞ্জাবিটা নিয়ে যাস। আগামীকাল আমায় শহরে যেতে হবে। এটা পরেই যাবো।
,,, বলেই কাব্যশ্রীকে উপেক্ষা করে আবারও শক্ত কদমে সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে হাঁটা দিলো। মুহূর্তেই কাব্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন বিনু ফুপু। এতো বড়ো মেয়ে হয়েও কেনো সে কোনো কাজে পারদর্শী না? এরকম চলতে থাকলে বিয়ে দিবেন কী করে? কে বিয়ে করবে এই মেয়েকে? বড়ো বোনের মতো ঘরে বসে বসে পাকবে, নয়তো বাহিরের লোকেরা কথার মাধ্যমে ছিঁড়ে-খুঁড়ে খাবে। এর বাহিরে কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এরকম হাজারটা অকথ্য গালিগালাজ করতে লাগলেন। অথচ কেউ কিছু বললো না। বলার সাহস নেই কারোর। তবে কথায় কথায় মেঘাশ্রীকে তোলার দরুন ভীষণ কষ্ট পেলেন রাহিমা বেগম। বড়ো মেয়েটাকে সেই ১৩ বছর বয়স থেকে বিয়ের কথা বলে যাচ্ছেন। মেয়ে বিয়ে করতে রাজি না। জোর করলে মরে যাওয়ার হুমকি দেয়। আর মরার হুমকি শুনলেই মাহমুদুল দেওয়ান কেমন ভয়ে সিটিয়ে যান। আনমনা হয়ে পড়েন। শরীর খারাপ করতে শুরু করে, যেনো এই আত্মহত্যা কথাটাতে কোনো ভয়ানক ব্যাপার লুকিয়ে আছে, যার সম্মুখীন তিনি ভুলক্রমেও হতে চান না।
,,, ঘরে এসে পরনের শুভ্র লুঙ্গিটা পরিবর্তন করে পুরোনো একখানা লুঙ্গি গায়ে জড়ালো আরবিদ। উপরের অংশে পাঞ্জাবি খুলে পুরোনো একটা ফতুয়া পরেছে। ছয়-সাত দিনের মাঝেই লাউ, কুমড়ো ও সিমগাছের ফলন শুরু হবে। এমতাবস্থায় বাগানে কীটনাশক দেওয়া প্রয়োজন, অন্যথায় ফলন নষ্ট হওয়ার একটা ব্যাপার থাকে। বাগানের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বেশি হওয়ার দরুন সাথে অবশ্য চার-পাঁচজন কর্মচারীও থাকবে। আরবিদ চাইলেই বাড়িতে বসে থেকে লোক লাগিয়ে কাজগুলো করাতে পারে, কিন্তু সে কাউকেই মন থেকে ভরসা করতে পারে না। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কাজ করা আর অন্য কাউকে দিয়ে কাজ করানোর মাঝে বেশ তফাৎ থাকে। আরবিদ ভাবনা রেখে আলমিরা থেকে খুঁজে খুঁজে পুরোনো একটা শাল নিলো। গায়ে জড়াতে নিতেই হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকলো আরহান। তাড়া দিয়ে বললো — ভাইজান!! টাকা দেও।
,,, ভ্রু কুঁচকে নিলো আরবিদ। শুধালো — কিসের?
— কালি কাকাকে যে পঞ্চাশ টাকা দিলাম। ওইটা ফেরত দাও।
— তোকে আমি টাকা দিতে বলেছি?
,,, ভাইয়ের প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেলো আরহান। পরক্ষণেই নিজের মাঝে গম্ভীর ভাবমূর্তি ফুটিয়ে বললো — বলতে হবে কেনো? তুমি টাকা দিবে আর আমি তোমার ভাই হয়ে চুপচাপ বসে থাকবো? কেমন দেখায় না? তাই দিয়েছি। এবার টাকা দাও।
,,,, আরহানের চোখে-মুখে ফুটে ওঠা গম্ভীর ভাবমূর্তি দ্বারা স্পষ্ট, সে কোনো রাজ্য জয় করে নেওয়ার মতো কাজ করেছে। আরবিদ তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো — ভবিষ্যৎ কল্পনা কী? কী করবেন ভাবছেন?
,,, এই পর্যায়ে আরও সিরিয়াস হলো আরহান। গায়ের শালটা আরও সুনিপুণভাবে গায়ে জড়িয়ে গভীর শ্বাস টানলো। যেনো এই মুহূর্তে সে একটা বড়ো মাপের ঘোষণা দিতে যাচ্ছে। সে লম্বা শ্বাস টেনে আওড়ালো
— আপাতত মেহরাবকে নিয়ে নতুন নতুন কিছু বন্ধু বানাবো। তারপর দু-তিন দিনের মাঝে একটা বিশাল বনভোজনের আয়োজন করে আপনাকে দাওয়াত করবো, সাহেব। এর বাহিরে এখনো কিছু ভাবিনি। ( তাড়া দিয়ে ) দেরি হচ্ছে তো, টাকা দাও।
,,, আরবিদ বিরক্তিকর নিঃশ্বাস ফেলে লুঙ্গির প্যাঁচ থেকে রেশমি কাপড়ের থলিটা বের করে টাকা বের করতেই আরহান হাত বাড়িয়ে দুটো পঞ্চাশ টাকার নোট ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত কদমে পালানোর প্রয়াস চালাতে চালাতে বললো — আপনার কাছে আরও পঞ্চাশ টাকা পাওনা রইলো, সাহেব। সময় করে ফিরিয়ে নিবো।
,,,, বলতে বলতে পালিয়ে গেলো ছেলেটা। আরবিদ কপাল কুঁচকে ছেলেটার হাবভাব পরখ করলো। দেওয়ান পরিবারে আরহানের মতো চরিত্র খুব একটা নেই। তাহলে কার স্বভাব পেলো ছেলেটা?
,,,, চলবে,,,
,,,আবারও বলছি গল্প মনোযোগ দিয়ে পড়বে, প্রতিটি লাইন মাথায় গেথে নিবে প্লিজ। আর গল্প বিষায়ক কমেন্ট করবে,