ফন্ট সাইজ:
থিম:
দেওয়ান সাহেব

১১তম পর্ব

লেখক: রুপান্জলি

#দেওয়ান_সাহেব ( পর্বঃ ১১)

#লেখনিতে_রুপান্জলি

#ট্রাজেডি_জাস্টিস

,,, বেইমান পুরুষ! আপনি কি জানেন? আজ আমার বোনের বিয়ে ছিল। আমি তাকে নিজ হাতে সাজিয়েছি। সাজানোর বেলায় একটা দারুণ বাক্যের মুখোমুখি হলাম। একজন মহিলা আমার দিকে তাকিয়ে বড়ো কটাক্ষ করে বলেছিল, """অতি বড়ো ঘরনি না পায় ঘর, অতি বড়ো সুন্দরী না পায় বর। "" আমার না একটুখানিও কষ্ট হয়নি, গায়েও লাগেনি, তবে মনে প্রশ্ন জেগেছে। আমি সুন্দর বলেই কি আপনাকে পাইনি? আমি অসুন্দর হয়ে গেলে আপনি ফিরে আসবেন? বলুন না!! ফিরবেন কি? আচ্ছা!! আমি তো ঘরনি নয়, ঘর করতে জানি না। জীবনে একটা কুটুটিও নাড়িনি, তাহলে আমার কেনো ঘর হলো না? আমার কেনো একটা সংসার হলো না? আমার যে সংসার করতে ইচ্ছা করে। আপনাকে পেতে ইচ্ছা হয়। আপনি কি আর আসবেন না? ফিরবেন না আমার কাছে? আপনি কোথায়? আপনি কি খুব ভালো আছেন? আমার কথা কি একটিবারের জন্যও মনে পড়ে না? আপনার জীবনে কি অন্য কেউ এসেছে? আমার যে আর সহ্য হচ্ছে না।

,, আমার যন্ত্রণারা জানে আমি কতোটা অপেক্ষা করছি আর!! আর অপেক্ষারা জানে আমি ঠিক কতোটা দহন যন্ত্রণায় পুড়ছি।

,,, ফিরে এসে আমার যন্ত্রণাগুলোকে তাড়িয়ে দিন না। আমি যে মরতে পারছি না, আবার বাঁচতেও পারছি না।

গুটি গুটি অক্ষরে বাক্যগুলো লিখে অনেকটা সময় নিয়ে সেই লেখার পানে তাকিয়ে রইল মেঘশ্রী। আরও হিজিবিজি কিছু লিখতে ইচ্ছা হলো, তবে শক্তিতে কুলালো না। মেয়েটা কেমন কাতর হয়ে ডায়েরির পাতায় মুখ গুঁজে শব্দ করে ফুঁপিয়ে উঠল। এই সেই ঘর, সেই বসার চেয়ার, টেবিল, সব আগের মতোই আছে, শুধু যার থাকার কথা সে নেই। কেনো নেই? সেদিন তো এভাবেই কেঁদেছিল সে, সেদিন তো কথা দিয়েছিল ফিরবে। তবে? তবে কেনো ফিরল না?

*********

সময়টা ১৯৬২ সাল।

,,, বড়ো ভাইয়ের বন্ধুকে নিজের আশেপাশে ঘুরতে ফিরতে দেখে ভালোবেসে ফেলা কিংবা বন্ধুর বাড়িতে আসা-যাওয়া করতে করতে বন্ধুর বোনকে ভালোবেসে ফেলা বিষয়টা সমাজে খানিক কটু দৃষ্টিতে দেখা হলেও সেই নিষিদ্ধ ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল মেঘশ্রী আর শেহরাজ।

,,, শেহরাজ হোসেন,, মেম্বার সারাফাত হোসেনের জ্যেষ্ঠ পুত্র। অন্যভাবে বলতে গেলে আরবিদ দেওয়ানের সবচেয়ে ভালো এবং একমাত্র বন্ধু। দুজনার জন্মকালও একই সময়ে। যখন বাচ্চারা সদ্য নিজেদের নাম, ঠিকানা বুঝতে শুরু করে, ঠিক সেই সময় থেকে আরবিদ দেওয়ান ও শেহরাজ হোসেনের বন্ধুত্বের শুরু। বিষয়টা এমন নয় যে তারা শুধু আত্মিকভাবেই একে অপরের বন্ধু। বরং তাদের সম্পর্কটা জন্মের পরপরই পারিবারিকভাবে স্থির করা হয়েছিল। বঙ্গাঞ্চলে,, দুটো সম্পর্কবিহীন পরিবারের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক ব্যতীত আত্মীয়তা গড়ে তোলার একটা দারুণ নিয়ম রয়েছে। দুটো পরিবার চাইলেই আনুষ্ঠানিকতার সহিত তাদের ছেলের সাথে ছেলের দোস্ত পাতিয়ে কিংবা মেয়ের সাথে মেয়ের সই পাতিয়ে গাড়ো একটা সম্পর্কে আবদ্ধ হতে পারে। তারই শিকার হয়েছিল আরবিদ দেওয়ান ও শেহরাজ হোসেন। আগে থেকেই মাহমুদুল দেওয়ান ও সারাফাত হোসেনের মাঝে মোটামুটি আকারের একটা ভালো সম্পর্ক থাকায় আরবিদের মা রাহিমা বেগম আর শেহরাজের মা অনুপমা বেগমের মাঝেও বেশ সখ্যতা ছিল। তখন রেজওয়ানের মা নাজরাতেরও আসা-যাওয়া লেগে থাকত দেওয়ান বাড়িতে। আরবিদ তখন সদ্য ১১ মাসে পা দিয়েছে, সেহরাজেরও একই অবস্থা, নাজরাত তখন অন্তঃসত্ত্বা। সেদিন তিন রমণী মিলে কিসব যেন আলোচনা করল আর সেই আলোচনার প্রভাব পড়ল আরবিদ ও সেহরাজের উপর। অগত্যা সেই ১১ মাস বয়স থেকেই পারিবারিকভাবে তাদেরকে একটা সম্পর্কে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। যার ফলস্বরূপ শিশুকাল থেকে শুরু করে যুবক বয়স পর্যন্ত কেউ কারোর পিছু ছাড়েনি, সর্বদা যা করেছে একসাথে করেছে, ভালো-মন্দ কিছু খেলে ভাগাভাগি করে খেয়েছে। শেহরাজের বাড়িটা দেওয়ান বাড়ি থেকে পাঁচ মিনিট দূরত্বে হলেও শেহরাজের মন বেশিক্ষণ বাড়িতে টিকত না। সর্বক্ষণ আরবিদের সাথে দেওয়ান বাড়িতে পড়ে থাকত, একসাথে ঘুরত, স্কুল যেত, পড়ালেখা করত, মাঝে-সাঝে এখানেই ঘুমিয়ে পড়ত। এতে অবশ্য কারোর আপত্তি ছিল না, বরং শেহরাজকে সবাই দেওয়ান বাড়ির আপন ছেলে বলেই মনে করত।

,,, এতোকিছুর ভিড়ে একটা শান্তশিষ্ট মেয়ে যে ধীরে ধীরে হাত-পা মেলে বড়ো হচ্ছিল, তা যেনো কারোর ধ্যানেই ছিল না। তবে অজান্তেই শেহরাজের সকল ধ্যান-জ্ঞান আবদ্ধ ছিল সেই মেয়েটার প্রতি। মেয়েটাও কিছুটা বেপরোয়া। সে স্বভাবে শান্ত হলেও চোখের দৃষ্টি, মনের দোলাচল কখনো শান্ত ছিল না। সারাক্ষণ শেহরাজের নজরে পড়ার চেষ্টা করত,, নিজেকে গুছিয়ে রাখত, ভালোবাসাময় দৃষ্টিতে শেহরাজের পানে তাকিয়ে থাকত। শেহরাজ প্রথমে মেয়েটাকে প্রশ্রয় দিতে চায়নি, দূরে সরানোর চেষ্টা করেছে বহুবার, কিন্তু প্রতিবার ব্যর্থ হয়েছে সে। মেয়েটা যে মায়াবিনী, এটুকু বয়সেই কেমন মায়ায় জড়িয়ে দিলো তাকে। অতঃপর চেয়ে না চেয়েও ভালোবাসাময় একটা পবিত্র সম্পর্কে আবদ্ধ হতে বাধ্য হলো দুটো প্রাণ।

সময় গড়ালো ধীরে ধীরে। আরবিদ ও শেহরাজের উচ্চমাধ্যমিক শেষ হয়ে এবার কলেজে ভর্তি হওয়ার পালা। অথচ নবীনগরে কলেজ নেই,, কলেজে পড়তে হলে সিলেট শহরে গিয়ে পড়তে হবে। তখন সিলেট শহরে সবচেয়ে নামকরা সরকারি কলেজ ছিলো মুরারিচাঁদ কলেজ। সেই সময়ে যদি কেউ স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে নিজেকে অধিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চাইত, তখন তাদের একমাত্র ভরসা ছিল মুরারিচাঁদ কলেজ। অগত্যা পরীক্ষার ফলাফলের পর দুজন ঠিক করল মুরারিচাঁদ কলেজে আবেদন করবে। দুজনার পরীক্ষার ফলাফল ভালো হওয়ায় দুজনেই সেখানে চান্স পেলো। বিষয়টা জানতে পেরে মেঘশ্রীর সে কী কান্না। তার শেহরাজ ভাই আর তাদের বাড়িতে আসবে না, বেলায়-অবেলায় মুখখানির দেখা মিলবে না। আরও কত কি? একই দহনে তখন শেহরাজও পুড়ছিল। একজনকে ঘিরে ভালোবাসা বিষয়টা সহজ হলেও,, সেই একজনকে নিজের জীবনে আটকে রাখা, নিজের করে পাওয়াটা বড্ডো কঠিন। ভালোবাসতে তো আর পরিবার লাগে না, শুধু মনের সম্মতির প্রয়োজন, তবে ভালোবাসার মানুষকে নিজের করে পেতে পারিবারিক অনুমতির বড্ডো প্রয়োজন।

মেঘশ্রীর বর্তমান বয়স চৌদ্দ। যদিও মেয়েটার পড়ালেখা করার বড্ডো শখ, তার নিজস্ব কিছু স্বপ্নও রয়েছে, তার মধ্যে শিক্ষকতার পেশাটা বড্ডো পছন্দ মেঘশ্রীর। সেদিক থেকে মেঘকে এখন বিয়ে দেওয়ার কথা না থাকলেও শেহরাজের ভয় হতে থাকল। যদি কিছু হয়ে যায়? যদি ভালো কোনো পাত্র পেয়ে সত্যি সত্যিই মেঘের বাবা-মা তাকে বিয়ে দিয়ে দেয়? তখন তার কী হবে? সেই আশঙ্কা, ভয় থেকেই ছেলেটা ছুটে গেল বাবা-মায়ের নিকট। নির্লজ্জের মতো জানালো সে দেওয়ান বাড়ির বড়ো মেয়েটাকে ভালোবাসে। এ নিয়ে মোটামুটি আকারের ঝামেলা হয়েছে অনুপমা বেগম ও শেহরাজের মাঝে। হ্যাঁ!! তিনি মানেন বঙ্গাঞ্চলে ১৬,১৭ বছর বয়সে কোনো ছেলের বিবাহ সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়াটা দোষের কিছু নয়, তবুও তিনি নিজের ছেলেকে ঘিরে স্বপ্ন দেখেন। ছেলেকে হায়্যার স্টাডির জন্য বিদেশে পাঠাতে চান। ছেলে যদি এখনই বিয়ে করে নেয়, তাহলে উনার সেই বহুদিনের পুষে রাখা স্বপ্ন কি আদৌ পূরণ হবে? শেহরাজ কথা দিয়েছিল বিয়ের পর আরও মনোযোগ দিয়ে পড়বে সে, মেঘের সাথে দেখাও করবে না, নবীনগরে পা রাখবে না। মানলেন না অনুপমা বেগম। তিনি বড্ডো পাষাণতা বুকে পুষে উত্তর করলেন, মরে গেলেও এখন তিনি শেহরাজের বিয়ে দিবেন না। অগত্যা বাবা-মায়ের কাছে শেষ একটা আরজি রাখলো শেহরাজ। যেনো আনুষ্ঠানিকভাবে মেঘশ্রীর বাবা-মায়ের নিকট তাকে বিয়ে করানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসে। যখন শেহরাজের পড়ালেখার ইতি ঘটবে, বিদেশ থেকে ফিরে আসবে, তখন মেঘশ্রীকে ঘরে তুলবে তারা, এরকমই একটা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আরজি জানায়। বিষয়টাতে রাজি হলেন অনুপমা বেগম। এমনিতেও মেঘশ্রীকে উনাদের বেশ পছন্দ,, মেঘ আর তার পরিবার যদি অপেক্ষা করতে রাজি থাকে, তাহলে উনার কোনো আপত্তি নেই।

,,, এর দুদিনের মাথায় গোটা করে আয়োজন সমেত স্বামী-স্ত্রী পা রাখলেন দেওয়ান বাড়িতে। মাহমুদুল দেওয়ান ও মাহবুবুর দেওয়ানের নিকট মেঘশ্রীকে চাইলেন। আর কত বছর পর বিয়ে করাবেন সেটাও উল্লেখ করলেন। আপত্তি করলো না কেউ। মাহমুদুল দেওয়ানের বড্ডো শখ, তিনি মেয়েকে পড়ালেখা করাবেন,, এত সহজেই বিয়ে-সাদি নিয়ে ভাববেন না। তার উপর মাহবুবুরের মেয়েরাও ছোট। তাই এটুকু অপেক্ষা তারা করতেই পারবে। অগত্যা দুই পরিবারের সম্মতিতে সেদিন মেঘশ্রীকে বিবাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল শেহরাজ। দুজন দুজনার অনামিকা আঙুলে আংটিও পড়িয়েছিল। এর মাস খানিক বাদেই আরবিদ-শেহরাজ গ্রাম ছাড়লো।

,,, শেহরাজের একটা ভাই আছে, নাম মেহরাব। দেখতে পুরোপুরি শেহরাজের মতো, প্রথম দিকে যখন ছেলেটা ছোট ছিল, তখন অতটা বোঝা যায়নি, তবে ছেলেটা যখনই বারোর ঘর পেরিয়ে লম্বা হতে শুরু করলো, চেহারায় টান ধরলো, তখনই বড়ো ভাইয়ের সম্পূর্ণ চেহারার উৎপত্তি ঘটলো তার মুখখানিতে। বয়সের তফাৎ না থাকলে নির্ঘাত লোকে তাদের জমজ বলতো। সেই মেহরাবই ছিল শেহরাজ আর মেঘশ্রীর ভালোবাসার বার্তাবাহক। ছেলেটা সপ্তাহে সপ্তাহে পিয়নের ন্যায় মেঘশ্রীর থেকে চিঠি নিয়ে ডাকঘরে রেখে আসার বেলায় শেহরাজের পাঠানো চিঠি তুলে এনে মেঘশ্রীকে দিতো। বড়ো ভাইয়ের ভয়ে প্রথম দিকে ছেলেটা বিরক্তি নিয়ে কাজগুলো করলেও ধীরে ধীরে তা অভ্যাসে পরিণত হলো। সেই সাথে মেঘের সাথেও একটা দারুণ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হলো ছেলেটার। এভাবেই চিঠি আদান-প্রদানের মাঝে কেটে গেলো আড়াইটা বছর। এর মধ্যে শেহরাজ ও আরবিদের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার অবসান ঘটলো। তারা ফিরে এলো নবীনগরে। সেদিন মেঘটা কী পরিমাণ যে খুশি হয়ে ছিলো, তা অনুধাবন করার নয়। শেহরাজ ফিরে আসতেই মেহরাবের দায়িত্ব ফুরালো। তবে তাতে যেনো একটুও খুশি নয় মেহরাব। ছেলেটা মাঝেসাঝেই দেওয়ান বাড়িতে এসে মেঘশ্রীকে বলতো— মেঘ!! আপনাদের পিয়নের চাকরি করতে করতে অভ্যাস হয়ে গিয়েছে,, আবার কবে সেই চাকরি পাবো?

,,, বিনিময়ে এক রাশ মন খারাপ নিয়ে মেঘশ্রী প্রতিউত্তর করতো। — যেদিন তোমার ভাই আমায় ছেড়ে বিদেশ চলে যাবে, সেদিন।

,,, দেখতে দেখতে সত্যি সত্যিই ঘনিয়ে এলো সেই দিনটা। ছয় মাসের মাথায় ইউ কে থেকে শেহরাজের ভিসা এলো। টিকেট কাটা হলো জুনের আট তারিখে। সেই সংবাদ শুনে মেঘশ্রীর মরো মরো অবস্থা,, ক্ষণে ক্ষণেই কেঁদে উঠছে। দুদিন ধরে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করে না, গোসল করে না, বাহিরে বের হয় না, শেহরাজের সাথে দেখাও করে না। সব মিলিয়ে এক প্রকার নিজেকে ঘরবন্দি করে রেখেছে মেয়েটা। ওদিকে শেহরাজও এই কাজ ওই কাজের চক্করে মেয়েটার সাথে দেখা করতে পারেনি,, আরবিদের থেকে যতোটা জানতে পেরেছে, তা নিয়ে বড্ডো দুঃখে আছে ব্যাচারা। তারও যে মেঘকে রেখে কোথাও যেতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু কী করার? আম্মা যে মানবে না। আম্মা তাকে বিদেশ পড়তে পাঠাবেই, এটা উনার বিয়ের আগেকার স্বপ্ন। আরবিদ কতবার বুঝাতে চেয়েছে,, তার সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে বলেছে, কিন্তু অনুপমা বেগম মানতে নারাজ। তিনি নিজের স্বপ্ন ছেলের মাধ্যমে পূরণ করবেই। অগত্যা হার মানতে বাধ্য হলো শেহরাজ।

,, দিনটা জুনের সাত তারিখ,, সন্ধ্যা নাগাদ দেওয়ান বাড়িতে আগমন ঘটলো শেহরাজের। বাড়িতে পা দিতেই বাড়ির দুই কর্ত্রী মিলে ছেলেটাকে আটকে দিলেন,, বিয়ে হোক বা না হোক একদিন না একদিন তো শেহরাজ এই বাড়ির জামাই হবেই। ফলস্বরূপ ছেলেটাকে ধরে বেঁধে জামাই আদর করতে শুরু করলেন,, কখনো আয়েশা বেগম এটা আনছেন তো আবার কখনো রাহিমা বেগম শেহরাজকে রাতে খেয়ে যাওয়ার আদেশ করছেন। শেহরাজ অবশ্য আপত্তি করেনি, সে দেওয়ান বাড়িতে যতোক্ষণ থাকবে ততক্ষণই তো মেঘশ্রীকে দেখতে পাবে। অগত্যা রাতে খেয়ে যেতে রাজি হলো যুবক। সবার সাথে কথাবার্তা শেষ করে অনুমতি নিয়ে মেঘশ্রীর ঘরে পা দিলো।

,,, ষোড়শী কন্যা তখন মাত্রই বই নিয়ে কাঠের পড়ার টেবিলটায় বসেছে, তবে তাতে তার মন নেই। তার অবাধ্য মনটা পড়ে আছে খুব শীঘ্রই তাকে রেখে পালিয়ে যেতে চাওয়া মানুষটার পানে। পুরো আড়াইটা বছর লোকটা দূরে ছিলো,, তখন মেঘের এতোটা খারাপ লাগেনি। কারণ তার মনে হতো শেহরাজ তার কাছেই আছে, চাইলেই শেহরাজের কাছে যেতে পারবে, তাকে দেখতে পারবে, কিন্তু এখন তো শেহরাজ সিলেট শহরে নয়, বরং বিদেশে থাকবে। তখন তো চাইলে কেনো কেঁদে কেটে মরে গেলেও শেহরাজকে এক পলক দেখা যাবে না। চিঠি আসতে সময় লাগে এক মাস, যেতে সময় লাগে এক মাস। মেঘ যদি এই প্রান্তে থেকে মরেও যায়, শেহরাজের কাছে তার সংবাদ পৌঁছাতে পৌঁছাতে সময় লাগবে ১ মাস। ততোদিনে মেঘশ্রীর লাশ তো পচে গলে শেষ হয়ে যাবে। শেষ দেখাটাও হবে না দুজনার।

,,, বই হাতে পড়ার টেবিলে বসে থাকা মেঘশ্রী যখন আকাশ-কুসুম ভাবনা ভাবতে ভাবতে মনে অভিমান পুষছিলো, তখনই ধীর কদমে ভিতরে ঢুকলো শেহরাজ। নিঃশব্দে দরজাটা ভিজিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে মেঘশ্রীর উল্টো পাশের চেয়ারখানা আলতো করে টান দিয়ে তাতে বসলো। চেয়ার টানার শব্দ হতেই মুখ তুলে তাকালো মেঘশ্রী, চোখে টইটম্বুর করা পানি। ষোড়শীনির পরনে কালো রঙা তাতের শাড়ি,, লম্বা চুলগুলো সোজা সিঁথি করে দুই বেনি করে সামনে এনে রাখা। চোখে গাড়ো কাজল আর সেই কাজল চোখে টইটম্বুর করা পানি। শেহরাজের বুকটা কেমন ধ্বক করে উঠলো। কাঁদলেও বুঝি মানুষকে এতোটা সুন্দর লাগে? শেহরাজ টেবিলে ডান হাতের কনুই ঠেকিয়ে গালে হাত রেখে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলো সম্মুখে বসে থাকা কিশোরীর পানে। শেহরাজকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলো মেঘশ্রী। দুহাতে চোখের পানি মুছতে মুছতে মাথা নিচু করে বইয়ে মনোযোগ দেওয়ার ভান ধরলো। এমন একখানা ভাব, যেনো এখানে কেউ নেই, সম্পূর্ণ ঘরটাতে একমাত্র সে নিজেই উপস্থিত। বিষয়টা অনুধাবন করে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো শেহরাজ। মেঘশ্রীর দিকে অল্প করে ঝুঁকে গিয়ে ফিসফিস করে আওড়ালো— কী পিচ্চি? আরবিদ জানালো, তুই নাকি ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছিস না? কী ব্যাপার, কী হয়েছে? কিসের এতো শোক?

,,, বলতে বলতে আরও খানিক ঝুঁকে এলো যুবক, বাঁকা দৃষ্টিতে তাকালো মেঘশ্রীর পানে, যুবকের কাণ্ডে নাক ফুলালো মেঘ। কান্না আটকানোর প্রয়াস চালিয়ে অন্যদিকে নজর ফিরিয়ে জেদি কণ্ঠে উত্তর করলো— পিচ্চি ডাকবেন না শেহরাজ ভাই। আমার বয়স শোল।

,,, কিশোরীর বলার ভঙ্গিমায় ফিক করে হেসে ফেললো যুবক— ইসস!! ভারি বয়স হয়েছে দেখি।

,,, মেঘশ্রী উত্তর করলো না, মানবের পানে আড়চোখে তাকালো একবার, দেখলো মানবের ঠোঁটে ফোটা সেই অমায়িক হাসিখানা। পরক্ষণেই যখন মনে পড়লো অনেকটা বছর এই হাসি দেখার সৌভাগ্য তার হবে না, তক্ষুনি নজর সরালো। বারবার চোখ ভিজে উঠছে, যতোই মোছার চেষ্টা চালাচ্ছে ততোই পানি গড়াচ্ছে। মেঘশ্রীর খুব বিরক্ত লাগলো। লোকটার সামনে লোকটার জন্যই কেমন নির্লজ্জের মতো কেঁদে যাচ্ছে সে। লোকটা কি তাকে বেহায়া ভাববে না? বুঝে যাবে না? মেঘ যে তার জন্য কষ্ট পাচ্ছে। অগত্যা উদভ্রান্তের ন্যায় দুই হাতে চোখ মোছায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো কিশোরী। শেহরাজ দেখলো তা, অনুভব করতে পারলো সামনে বসা মেয়েটার মনে ঠিক কী পরিমাণ ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তার মনেও যে একই ঝড়, সেই ঝড়ে ভিতরকার সত্তাটা ভেঙে চুরে চূর্ণ চূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। তবে সেই ভাঙন উপরের সত্তাটাকে কাবু করতে পারলো না। শেহরাজ এবার রয়েসয়ে উঠে দাঁড়িয়ে কিশোরীর নরম হাতখানি আলতো করে টেনে ধরলো, অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে আওড়ালো— চল ভাত খাবি।

,,, কথাখানা কানে তোলার প্রয়োজন মনে করলো না কিশোরী,, জেদ দেখিয়ে হাত ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করতে করতে আওড়ালো— হাত ছাড়ুন শেহরাজ ভাই,, আমি খাবো না।

,,, শেহরাজ কি সেই কথা শোনার মানুষ? একদমই না। ছেলেটা মেঘশ্রীর খেয়াল-খুশিকে দু আনার দাম না দিয়ে সহসা কাঠের চেয়ার থেকে টেনে-টুনে দাঁড় করালো। প্রথম দিকে দাঁড়াবে না, দাঁড়াবে না বলে জোর খাটালেও পরবর্তীতে মানবের দানবীয় শক্তির কাছে হার মানতে বাধ্য হলো কিশোরী। এতোটা সময় নিজেকে কোনোরকম সামলে নিলেও যখন আর নিজের মাঝে প্রতিরোধ করার সামর্থ্যটুকু খুঁজে পেলো না, তখনই কেমন ঝরঝর করে শব্দ তুলে কেঁদে দিলো মেয়েটা। এই পর্যায়ে আর সামনের মানুষটা শক্ত থাকতে পারলো না। কেমন বিচলিত হয়ে পড়লো অচিরেই। আগপিছ না ভেবেই দু কদম এগিয়ে আগলে নিলো মেয়েটার দুটো গাল,, নিঃসংকোচে কপালে কপাল ঠেকিয়ে নরম কণ্ঠে ডাকলো—

,,, এই!! কাঁদছো কেনো এভাবে? শুধু তিনটা বছরই তো। এই তিনটা বছর আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারবে না?

,,, তিন বছরের কথা শুনে কেমন অবাক বনে গেলো কিশোরী,, কান্নার তোপ কিছুটা কমে এলো, তবে চোখের পানি ফুরালো না। সে চোখভরা পানি নিয়ে কেমন অবাক কণ্ঠে শুধালো— তিন বছর? কিন্তু চাচি আম্মা যে বললো ছয় বছর লাগবে?

,,, শেহরাজ আলতো হাতে মেঘশ্রীর ভেজা গালটা মুছে দিতে দিতে ভরসাময় কণ্ঠে উত্তর করলো— ওহুম, লাগবে না। আমি তিন বছর পর ফিরে আসবো, তবে এটা কেউ জানে না মেঘ। এটা তোমার আর আমার মধ্যকার গোপন কথা,, তুমি কাউকে জানাবে না, কেমন?

,,, তিনটা বছর কমে আসায় মেঘশ্রীর মনে হলো সে বুঝি স্বর্গ সুখ লাভ করে নিয়েছে। মেয়েটা কেমন বাধ্যের ন্যায় মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানালো, পরপরই আকুল কণ্ঠে শুধালো— আপনি এর মাঝে একবারও আসবেন না? ছয় মাসেও না? এক বছরেও না?

,,, ঠোঁট বাঁকিয়ে ক্ষীণ হাসলো মানব— অনেক দূর তো পাগলি, কিভাবে আসবো?

,,, আবারও শব্দ করে ফুঁপিয়ে উঠলো মেঘশ্রী, ফুঁপাতে ফুঁপাতে ভাঙা কণ্ঠে আওড়ালো— আমি না মরেই যাবো।

,,, এরূপ বাক্যে শেহরাজের বুকটা কেমন ধ্বক করে উঠলো। এই প্রথম, সর্বশক্তি দিয়ে ছোট্ট দেহখানি জড়িয়ে নিলো নিজের সাথে। এদিকে মেঘশ্রী দিকহীন, মেয়েটা ভালোবাসার মানুষের বুকে আশ্রয় পেয়ে কেমন বাচ্চাদের মতো গলা ফাটিয়ে কেঁদে উঠলো। মেঘশ্রীর কান্নায় শেহরাজটাও কেঁদে ফেললো, তবে তার শব্দ হলো না। চোখ দুটো লাল হয়ে পানি জমা হলো। কণ্ঠটাও ভেঙে এসেছে কেমন। সেই ভাঙা কণ্ঠ নিয়েই আলতো স্বরে আওড়ালো— এসব বলতে নেই মেঘ, তোমার কিছু হলে আমি কার জন্য বাঁচবো?

,,, ফের কাঁপা কণ্ঠে উত্তর করলো কিশোরী— য,যদি নতুন কাউকে পেয়ে আমাকে ভুলে যান? ওখানে তো অনেক বিদেশিনী থাকবে,, তাদের পে,,,,

,,, কথা শেষ করতে দিলো না যুবক,, মেঘশ্রীর মাথাটা আরও শক্ত করে পিষে নিলো বুকের সাথে— তুমি বিহীন অন্যথায় নজর স্থির হওয়ার পূর্বে মালাকুল মউত আমায় গ্রহণ করুন।

,,, মানবের এহেন কথার তোপ সহ্য করতে না পেরে মেঘশ্রী তার নরম নরম হাত দুটো দিয়ে খামচে ধরলো পিছনের শার্ট। মুখখানি মানবের বুকে পিষে ফেলার পায়তারা করে থেমে থেমে আওড়ালো— এসব বলছেন কেনো শেহরাজ ভাই? ভয় লাগে আমার।

,,, উত্তর করলো না শেহরাজ,, আলতো করে চুমু খেলো মেঘশ্রীর মাথায়। অনেকটা সময় চুপচাপ অনুভব করলো কিশোরীর হৃদয় কম্পন।

গুনে গুনে বারোটি মিনিট পার হওয়ার পর আকুল স্বরে ডাকলো শেহরাজ— মেঘ!!

,,, হু?

,,, তিন বছর পর আমি ফিরে এলে যদি সবকিছু স্বাভাবিক না থাকে, তোমায় আমি সাথে করে নিয়ে যেতে চাই। পরিবার, পরিজন ছেড়ে আমার সাথে যাবে?

,,, চোখ তুলে মাথা উঁচু করে তাকানোর প্রয়াস চালালো মেঘ, তবে শেহরাজ দিলো না, জোর করে বুকের মাঝে মাথাটা আটকে রাখলো। মেঘশ্রী সেভাবে থেকেই চিন্তিত কণ্ঠে শুধালো— কী হয়েছে শেহরাজ ভাই? এমন কথা বলছেন কেনো? তিন বছর পর কী হবে?

,,, কিছু হয়নি, তুমি শুধু আমার অপেক্ষায় থেকো। অন্য কারোর হয়ে যেও না। যদি এমনও সময় আসে যে তোমার কাছে দুটো বিকল্প রাখা হলো, হয় অন্য কাউকে গ্রহণ করো, নয়তো মরে যাও। তবে,,

,,, শেহরাজের বাক্য ফুরাবার আগেই মেঘশ্রী কান্নাভেজা কণ্ঠে প্রতিউত্তর করলো— মরে যাবো শেহরাজ ভাই, তাও অন্য কারোর হবো না।

,,, হঠাৎ কাঁধে কারোর স্পর্শ পেতেই অতীতের তলহীন স্মৃতি হতে ফিরে এলো মেঘশ্রী। পিছনের মানুষটাকে চিনে মেঘ, ঘটনাটা বহুদিন পরে ঘটলেও ওপাশের মানুষটা কে হতে পারে তার সম্পূর্ণ ধারণা রয়েছে। সে ঘুরে দেখার প্রয়োজন মনে করলো না, বরং চট করেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সামনের মানুষটার বুকে মুখ লুকালো। বুকের কাছের পাঞ্জাবিটা খামচে ধরে শব্দ করে ফুঁপাঁতে ফুঁপাঁতে অস্ফুট স্বরে আওড়ালো— সে কথা রাখেনি ভাইজান,, ফিরেনি,, তিন বছর তো ফুরিয়ে গেলো। ফুরাতে ফুরাতে ১১টি বছর কেটে গেলো। কই? কোথায় সে? আমায় নেবে না? সে কি আর ফিরবে না? বিদেশিনীদের রূপ দেখে আমায় ভুলে গিয়েছে কি? তবে আমি কেনো ভুলতে পারিনা? আমার খুব কষ্ট হচ্ছে ভাইজান, তাকে লাগবে না, অন্তত তার একটা খোঁজ এনে দাও।

,,, বোনের আর্তনাদে বলার মতো উত্তর পেলো না আরবিদ দেওয়ান,, নিজের কঠোর সংযম বেঁধে সান্ত্বনাও দিতে পারলো না, শুধু মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে বোনকে কাঁদার সুযোগ করে দিলো।

**********

রাত তখন ১০টা বেজে ২৬ মিনিট।

,,, খট করে শব্দ তুলে আরবিদ দেওয়ানের ঘরের দরজাখানা খুলে গেলো,, ভারী কদম ফেলে ভিতরে পা রাখলেন মানব,, ঘর অন্ধকার দেখে ভ্রু গুটিয়ে নিলেন সহসা। বিকালে যখন ঘর থেকে বের হয়েছিলো, তখন দিনের আলো ছিলো, এরপর কি ঘরে আলো জ্বালানো হয়নি? ঘরে তো কাব্য ছিলো, ছিলো বলতে কোনো কথা নেই, বরং এখনো রয়েছে, তবে আলো জ্বালানো হয়নি কেনো? কঠোর মানব সন্দেহি দৃষ্টিতে অন্ধকার ঘরময় নজর বুলিয়ে দরজার কাছে রাখা হারিকেনের আলো বাড়ালো। মুহূর্তেই আলোকিত হয়ে উঠলো ঘরের একাংশ। সেই আলোতে স্পষ্ট দেখা গেলো কাব্যশ্রী মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে তাতে মুখ গুঁজে রেখেছে। আরবিদের সন্দেহি চোখ জোড়া এবার শিথিল হয়ে এলো,, কিশোরীর পরনের শাড়ি অগোছালো,, গুছিয়ে রাখা চুলগুলো এলোমেলো, রাগের তোপে তাতে হাত চালিয়েছে নাকি? জানা নেই। আরবিদ দেওয়ান তাতে খুব একটা মন দিলো না, হাতে ভাঁজ করে রাখা শালটা বিছানার কোনায় রেখে দিয়ে গায়ের পাঞ্জাবীটা খুলে শালের উপর রাখলো। পরপর আলমিরা থেকে সাদা ফতুয়া নিয়ে গায়ে জড়ালো। প্রতিটি কাজই উচ্চ শব্দে করেছে আরবিদ, আলমিরা খোলার বেলায়ও শব্দ করে খুলেছে, আবার লাগানোর বেলায় শব্দ করে লাগিয়েছে, তবে এতো শব্দের মাঝেও কাব্যর কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না। এই পর্যায়ে আরবিদ দেওয়ান খানিক অবাক হয়েছে বোধয়, তবে শুরুতেই প্রতিক্রিয়া দেখালো না। কণ্ঠ যতটা সম্ভব নরম করা যায়, সেই প্রয়াস চালিয়ে শুধালো— কী সমস্যা? এভাবে মটকা মেরে বসে আছো কেনো?

,,, ওপাশ থেকে উত্তর এলো না। মেয়েটা এখনো ঠায় পাথর বনে বসে রয়েছে। আরবিদের এবার রাগ হলো। দাঁতে দাঁত পিষে ভারী কদম ফেলে কাব্যর সামনে এসে দাঁড়িয়ে চট করেই ওর বাহু চেপে ধরে ঝটকা মেরে দাঁড় করানোর চেষ্টা করলো, তবে দাঁড়াতে পারলো না কাব্য,, তৎক্ষণাৎ ছোট্ট শরীরটা হেলে পড়লে পিছন দিকে। সেকেন্ড খানিকও পেরোয়নি বোধহয়, আরবিদ দ্বিতীয় ঝটকায় মেয়েটাকে কাছে টেনে নিলো। সহসা কাব্যর জায়গা হলো আরবিদের বুকে,, একদম মুখ থুবড়ে পড়েছে শক্ত-পোক্ত বুকটায়। বিষয়টা নিয়ে কোনো রকম হেলদোল দেখা গেলো না মানবের মাঝে,, সে কাব্যকে বুকের মাঝে টেনে নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। ফলস্বরূপ জ্ঞান না থাকায় আবারও খানিক হেলে পড়লো কাব্য, মাথাটা জায়গা করে নিলো আরবিদের বাহুতে। আরবিদ চোখ বাঁকিয়ে দেখে নিলো তা, পরপরই হাত উঁচিয়ে কাব্যশ্রীর পালস চেক করলো, নাকে আঙুল ঠেকিয়ে নিশ্বাস পরখ করতেই বুঝলো মেয়েটার হুঁশ নেই। সেই সাথে অনুভব করলো কিশোরীর জ্বর এসেছে, তাও যেনো তেনো জ্বর নয়,, জ্বরে একদম গা পুড়ে যাচ্ছে। আরবিদ তপ্ত নিশ্বাস ফেলে কোনো কিছু না ভেবেই কাব্যকে পাঁজা কোলে তুলে নিলো, পরপর শুইয়ে দিলো পালঙ্কের উপর। কণ্ঠ উঁচিয়ে ডাকলো— আম্মা!! আম্মা!! দ্রুত ঘরে আসুন।

,,, আরবিদ ৯টা নাগাদ বাড়িতে ঢুকলেও মেঘের ঘর থেকে বেরিয়েছে কিছুক্ষণ আগে। তা দেখে খাবার হাতে ছেলের ঘরের দিকেই এগিয়ে আসছিলেন রাহিমা বেগম। আকস্মাৎ ছেলের এরূপ ডাক শুনে হন্তদন্ত পায়ে ছুটে এলেন ঘরের ভিতরে। আরবিদ ততোক্ষণে কাব্যকে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে। ঘরে এসে কাব্যর এহেন অবস্থা দেখে বিচলিত হওয়ার পরিবর্তে রেগে গেলেন রাহিমা বেগম। এমনিতেই কয়েকদিন ধরে মন-মেজাজ ভালো যাচ্ছে না, ঘরে গেলেই একটার পর একটা অশান্তি, ঝগড়া, ঝামেলা। তার মধ্যে আরবিদের করা একরোখামি, একদম পছন্দ হলো না রমণীর। তিনি কেমন দাঁতে দাঁত চেপে রুক্ষ কণ্ঠে শুধালেন— শান্তি হয়েছে না তুমি? কেনো করেছো এসব? গায়ের হলুদের দিন থেকে দেখছি। কখনো কাপড় ধোয়াচ্ছো, কখনো ঘরে আটকে রাখছো। কী চাওটা কী তুমি? আরবিদ!!

,,, মায়ের জোরালো প্রশ্নে কাব্যর থেকে নজর সরালো আরবিদ,, মায়ের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি স্থাপন করে বললো— আমি কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই আম্মা,, সময় নষ্ট না করে কী করতে হবে করুন।

,,, তিনিও ছেলের কথায় কর্ণপাত করলেন না, উল্টো দ্বিগুণ রাগ, বিরক্তি নিয়ে আওড়ালেন— আমাকে নাহয় কৈফিয়ত দিবে না, ওর বাবা-মাকে তো দিবে? যাও দিয়ে আসো। এই বিষয় নিয়ে এশা নামাজের পর তোমার বাবা-চাচার মাঝে একটা ঝগড়া হতে গিয়েও হয়নি। মাহবুবুর জানিয়েছে বড়ো মেয়ের বিয়ের রেশ কমলেই ছোট মেয়েকে বিয়ে দিবে সে। কারোর ফায়-ফরমাশ পালনের জন্য অন্তত মেয়ে জন্ম দেয়নি।

,,, আরবিদের যেনো এলো গেলো না,, বিছানার পাশ থেকে পানির গ্লাস নিয়ে তা থেকে একটুখানি পানি নিয়ে হাতটা ভিজিয়ে কাব্যর মুখটা আলতো করে মুছে দিতে দিতে বড্ডো নিষ্ঠুর কণ্ঠে আওড়ালো— ভালো পাত্র পেলে দিবে, সমস্যা কোথায়? আগে বলুন ভালো পাত্র খুঁজে বের করতে।

,,, ছেলের কাণ্ডে প্রায় হতভম্ব হয়ে পড়লেন রাহিমা বেগম। একদিকে কাপড়ের বদলে নিজের হাত ভিজিয়ে মুখ মুছে দিচ্ছে, অপরদিকে বলছে ভালো পাত্র পেলে বিয়ে দিয়ে দিবে? কী শুরু করেছে কী এই ছেলে? রাহিমা বেগম সেই হতভম্বতা ধরে রেখেই কেমন সন্দেহি কণ্ঠে শুধালেন— কাব্যর বিয়ে হয়ে গেলে তোমার কিছু আসে যায় না?

,,, আরবিদ আবারও হাতে পানি নিয়ে কাব্যর মাথার তালুতে ঘষে দিলো, পরপর মুখখানি মুছে দিয়ে এগিয়ে গেলো দর্পণের কাছে। সেখান থেকে মাথা ঠান্ডা হওয়ার তেল এনে মায়ের উদ্দেশ্য বললো— নিচ থেকে একটা বাটি এনে দিন,, পানি পট্টি দিতে হবে।

,,, আরবিদের কণ্ঠে তাড়া, অথচ রমণী উত্তর পেতে মরিয়া। ছেলের আগ্রহ না পেয়ে রাহিমা বেগম ফের শুধালো— বললে না? কাব্যর বিয়ে হলে তোমার কিছু,,,

,,, কথা ফুরাবার আগেই ফের তাড়া দিলো মানব—

---- আম্মা!! আপনি কি ওকে একটু দেখবেন, নাকি আমি ওর মাকে ডাকবো?

,,, রাহিমা বেগমের ভিতরটা ধ্বক করে উঠলো। এমনিতেই এশার নামাজের পর একটা বড়োসড়ো ঝামেলা হতে গিয়েও হয়নি। রেজওয়ান চাচ্ছিলো বনশ্রীকে আজকেই বাড়ি নিয়ে যেতে, অথচ বনশ্রী যেতে রাজি নয়,, মাহবুবুর দেওয়ানও দিতে রাজি নয়। সে নিয়েই এশার নামাজের পর এক দফা তর্কাতর্কি চললো। অবশেষে মাহবুবুর দেওয়ান বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রেজওয়ানকে রাজি করিয়ে পরিবেশ শান্ত করেছেন। আপাতত বনশ্রী আর রেজওয়ান দেওয়ান বাড়িতেই অবস্থান করছে, তবে আলাদা আলাদা কক্ষে। শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পূর্বে দুজনার একই কক্ষে থাকার নিয়ম নেই।

,,, নেহাতই মাহবুবুর দেওয়ান বড়ো ভাইকে সম্মান করে, নয়তো পরপর দুটো মেয়েকেই নিজের ইচ্ছামতো জীবন বেছে দেওয়ার অপরাধে মাহমুদুল দেওয়ানের জেল, ফাঁসি নিশ্চিত ছিলো। একদিকে বন্যটাকে নিজের ইচ্ছায় রেজওয়ানের কাছে বিয়ে দিলেন। রেজওয়ান ছেলেটাকে মাহবুবুর দেওয়ান একদমই পছন্দ করেন না,, আগে থেকেই সাপে-নেউলে সম্পর্ক। ছোটবেলায় ছেলেটা মাহবুবুরকে বেশ জ্বালাতো,, দাদার থেকে শুনে শুনে মাহবুবুরের ছোটবেলায় করা দস্যিপনা নিয়ে খোঁটা দিতো। সেই কারণেই ছেলেটাকে সহ্য হয় না মাহবুবুরের। তার মধ্যে নিজের ছেলেকে ভালো রাখার স্বার্থে ছোট মেয়েটাকেও চেয়ে রেখেছেন। অথচ মেয়েটা দিনের পর দিন শুধু দুঃখ আর অবহেলাই পেয়ে যাচ্ছে। এসবের দায় কার? মাহমুদুল দেওয়ানের না? যদিও খানিক দোষী সে নিজেও।

এই মুহূর্তে মাহবুবুর আর আয়েশা যদি দেখে তাদের মেয়ে কক্ষে বন্দি থাকতে থাকতে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে কিংবা আগেরদিন রাত-বিরেতে কাপড় ধোয়ার ফলে এখন জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে, তাহলে বাড়িতে কুরুক্ষেত্র বাধবে না? এর রেশ ধরে যদি কাব্যকে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে? তখন তাদের ছেলেটার কী হবে? ছেলেটা বুঝুক আর না বুঝুক, মানুক আর না মানুক, কাব্যকে ছাড়া সে এক পাও এগুতে পারবে না। বেঁচে থাকা তো দূর।

আম্মাকে এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিরক্ত হলো আরবিদ। কাব্যর মাথার তালুতে ঠান্ডা তেল ঘষতে ঘষতে ডাকলো— আম্মা!!

,,, ছেলের ডাকে সম্বিত ফিরে পেলেন রমণী। হাতের খাবারটা আরবিদের বরাদ্দকৃত টেবিলে রেখে ছুটে গেলেন নিচের দিকে, ফিরে এলেন মাঝারি আকারের একটা বাটি নিয়ে। আরবিদ তাতে পানি ঢেলে বিছানার কোনা থেকে পাঞ্জাবীটা হাতে নিলো। পরপর সেই পাঞ্জাবীর পকেট থেকে রুমাল বের করে তা ভিজিয়ে, পানি ঝেড়ে কাব্যর কপালে রাখতে রাখতে বললো— আপনি আজকের রাতটা এখানেই থেকে যান আম্মা,, মেঘ কিছুটা বিধ্বস্ত। সে কাব্যর খেয়াল রাখতে পারবে না।

,,, আমি এখানে থাকলে তুমি কোথায় থাকবে?

,,, আপাততঃ আছি এখানেই,, জ্বর কমলে বারান্দায় চলে যাবো।

,,, ছেলের কথায় অবাকের পর অবাক হচ্ছেন রাহিমা বেগম। যেই ছেলে কোনোদিন নিজের খাওয়া-ঘুম নিয়ে একটুখানি ছাড় দেয়নি। এতো পরিমাণ সুচিবায়ী যে অন্য কারোর শরীরের ঘ্রাণ লাগবে বিদায় কাউকে নিজের বিছানার আশপাশেও ঘেঁষতে দেয় না। সেই ছেলে তাকে বিছানায় ঘুমাতে বলছে? আর কাব্যকেও ঘুমাতে দিচ্ছে? সেই সাথে কাব্যর শিয়রে বসে কাব্যর কপালে জলপট্টিও দিচ্ছে? আর কতো অবাক হবেন তিনি? অথচ রাহিমা বেগম জানতেই পারলেন না, কাব্য শুধু আজই নয়, গতোকালকেও আরবিদের বিছানায় শুয়েছিলো, আর সকাল হতেই সেই একই জায়গায় আরবিদ শুয়েছিলো। জানতে পারলে রমণী বোধহয় এতোক্ষণে অবাকের সীমানা পার করে তব্দা খেয়ে পড়ে থাকতো।

এই পর্যায়ে রাহিমা বেগম নিজেকে সামলে বিছানায় উঠে বসলেন,, বিছানায় উঠতে গিয়েও বেশ ভয় পেলেন, কখন কী ভুল হয়ে যায় আর ছেলে সুচিবায়ু রোগের বশবর্তী হয়ে দুটো ধমক দিয়ে বসেন। অন্যদিন হলে হয়তো আরবিদ মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকতো, তবে আজ দৃষ্টি কাব্যতে স্থির। রাহিমা বেগম কাব্যর পাশে বসে পানি দিয়ে নিজের শাড়ির আঁচলখানা ভিজিয়ে কাব্যর হাত-পা মুছতে মুছতে আরবিদের উদ্দেশ্যে শুধালো— খাবার খাবে না?

,,, আরবিদ বোধহয় খানিক আনমনা ছিলো, তাই আনমনেই কাব্যকে ইশারা করে বলে বসলো— ও খায়নি।

,,, রাহিমা বেগমের চোখ জোড়া কেমন ছোট ছোট হয়ে এলো। শুধালেন— ও খায়নি বলে তুমি খাবে না?

,,, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চোখ তুলে তাকালো আরবিদ, চোখে-মুখে অসন্তুষ্ট ভাব ফুটিয়ে বললো— সে কথা কখন বল্লাম?

,,,, রাহিমা বেগম মনে মনে ক্ষীণ হাসলেন, ভ্রু উঁচিয়ে শুধালেন— তাহলে খাবে বলছো?

,,,, কাব্যর মাথায় থাকা রুমালটা আবারও ভিজিয়ে কপালে রাখতে রাখতে বললো— ওহুম, খেতে ইচ্ছা করছে না।

,,, আফসোস!! তোমায় জন্ম দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু তোমার মতিগতি বুঝার মতো জ্ঞান আল্লাহ পাক আমায় দিয়ে দেননি।

,,,,, চলবে।

নোট বার্তাঃ গল্প এখন মাত্র শুরু অথচ তোমরা পরে আছো এন্ডিং নিয়ে। আর কতোবার বললে তোমরা বুঝবে? গল্পে যা খুশি হোক, শেষে হ্যাপি এন্ডিং হবে। আমি কিন্তু ৩৭ পৃষ্ঠায় হ্যাপি এন্ডিং ই দিয়েছি, নায়ক নাইকার কিছু হয়নি। এটাতেও হ্যাপি এন্ডিং হবে। তাই অযথা চিন্তা করো না।

,,, কেমন হয়েছে বলে যাও সকলে। গল্প বিষয়ক বড়ো বড়ো কমেন্ট করবে। আর হ্যাঁ, আমি কমেন্টের রিপ্লাই দিতে পারছি না, দিতে দিতে কেমন হাঁপিয়ে উঠি। চোখ ব্যথা করে, মাথা ব্যথা করে, তাই তোমরা রাগ করো না। তোমাদের যাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থাকবে, আমি তাদের প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই দিবো আর সবার কমেন্ট পড়বো। আমাকে এতো ভালোবাসা দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। আমি তোমাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। তোমাদেরকেও অনেক ভালোবাসা। কমেন্ট করার জন্য আগে থেকেই ধন্যবাদ।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন