#দেওয়ান_সাহেব ( পর্বঃ ১০)
#ট্রাজেডি_জাস্টিস
#লেখনিতে_রুপান্জলি
দিনটা শুক্রবার।
লোকে বলে বিবাহের রং নাকি লাল, অথচ সেই লাল রংটাকে ফুটিয়ে তুলতে বোধহয় হলুদের আয়োজন বরই প্রয়োজন। এই যে বনশ্রীর স্নিগ্ধ শরীরে বিবাহের রং ফুটাতে কতই না তোরজোর চালিয়েছেন আশেপাশের মহিলাগণ। গতকাল হলুদ মাখানোর পর সকালেও মাখানো হলো। তবুও যেনো খানিক খামতি পড়ে গিয়েছিল, ফলস্বরূপ দুপুরের পরপর আরও একবার হলুদ মাখানো হলো বনশ্রীর সম্পূর্ণ শরীরে। গাড়ো করে মাখানোর ফলে মেয়েটার দুধ ফর্সা মুখখানিতে হলুদ আভা বিরাজমান। দেখতে কী যে সুন্দর লাগছে, তা ব্যাখ্যা করার নয়। সচরাচর দেওয়ান বাড়ির ছেলে-মেয়েরা অসুন্দর হয় না, বরং তাদের সৌন্দর্যের তুলনা করতে গেলে উল্টো নিজের ভাবনার সাথে হিমশিম খেতে হয়। কারণ ইতিপূর্বে দেওয়ান বাড়ির কোনো পুরুষই শ্যামলা গড়ন কিংবা চেহারায় খুঁত আছে এমন মেয়েকে বিবাহ করেনি। তারা পরম যাচাই-বাছাই করে নিখুঁত রূপের অধিকারিণীকেই নিজের জীবনসঙ্গী রূপে গ্রহণ করেছেন। ফলস্বরূপ দেওয়ান বংশের প্রতিটি বাচ্চাই অসম্ভব রূপের অধিকারী হয়ে জন্ম নিয়েছে। তারপরেও কিভাবে কিভাবে যেনো বনশ্রী একটু বেশিই সুন্দর। মেয়েটার চেহারা, হাসি, চঞ্চলতা বড়ই মনোমুগ্ধকর। একবার তাকালে কেমন তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছা করে।
,,, সময়টা বিকালের মধ্যপ্রান্তে। বরযাত্রী কিছুক্ষণের মাঝেই চলে আসবে। বিয়ে পড়ানো হবে সন্ধ্যার পরপর। ইতিমধ্যে মাস্টার বাড়ি হতে বন্যকে সাজানোর জন্য শাড়ি, চুড়ি, গহনা সবই পাঠানো হয়েছে। সেসব নিয়ে এসেছে কাশেম। আপাতত তাকে আপ্যায়ন করতে ব্যস্ত দেওয়ান বাড়ির দুই কর্ত্রী। রেজওয়ান জানিয়েছে, বিয়ের পরের দিন সকালে বউ নিয়ে যাওয়ার নিয়ম থাকলেও বাড়ি কাছে হওয়ার দরুন সে রাতেই বউ নিয়ে ফিরবে। শ্বশুর বাড়িতে আপাতত রাত্রিযাপন করতে চায় না সে। সুতরাং বিয়ের তোরজোড়টা যেনো মাগরিবের পরপরই করা হয়। বিষয়টা জানতে পেরে বনশ্রীর সেকি রাগ, রাগের তোপে টানা দশ মিনিট সময় নিয়ে রেজওয়ানকে বকাঝকা করলো। বকেও যখন রাগ কমলো না, তখন ঘটা করে কাঁদতে বসলো। সেই কান্নাকাটির অন্ত নেই, কাঁদছে তো কেঁদেই যাচ্ছে। শুরুতে নিবেদিতা আর রুপান্মিতা আদুরে কথাবার্তা বলে কান্না থামানোর প্রয়াস চালালেও, যখন দেখলো তাদের আদুরে কথাবার্তায় কাজ হচ্ছে না, তৎক্ষণাৎ আফনানকে পাঠিয়ে মেঘ আপাকে ডেকে এনেছে। বর্তমানে বনশ্রীর সামনে বসে আছে মেঘশ্রী। আপাকে মুখের সামনে অমন রাগী রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে বনশ্রী এবার কান্নার তোপ কমালো, সাথে বিরবির করে রেজওয়ানকে দুটো গালিও ছুড়লো। গালি ছুড়তে গিয়ে আবারও মনে পড়ে গেল, খাইষ্টার বাচ্চা আজকেই তাকে বাড়িছাড়া করবে। খানিক বাদেই নিজের বাড়িটা তার বাপের বাড়ি হয়ে যাবে। চাইলেই বাড়িতে পা রাখতে পারবে না, অনুমতির আশায় খাইষ্টার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। যদি খাইষ্টার মত হয়, অনুমতি পায়, তবেই না পা রাখতে পারবে বাপের বাড়িতে। সেসব ভেবে আরও ফুঁপিয়ে উঠলো মেয়েটা। এই পর্যায়ে ভীষণ বিরক্ত হলো মেঘশ্রী। কিছুটা ধমকের স্বরেই আওড়ালো— কী ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদতে বসলি? বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকে দেখছি, এই কারণ, ঐ কারণ ধরে ধরে কেঁদেই যাচ্ছিস, এবার একটু ক্ষান্ত হো বোন। একটু পর বরযাত্রী আসবে, সাজতে হবে না?
,,, মেঘশ্রীর কথা ফুরাবার আগেই ঘরে ঢুকলেন বিনু ফুপু। বনশ্রীর ঘরে তখন পাড়ার মহিলা, মেয়ে-বউদের ভিড়, তারা কনে সাজানো দেখতে এসেছে। মহিলাদের ভিড় হওয়ায় বিছানার একপাশে গুটিশুটি মেরে বসে আছে রুপান্মিতা। নিবেদিতা গিয়েছে কাব্যশ্রীকে ডাকতে। এদিকে ঘরে ঢোকার বেলায় মেঘশ্রীর পুরো কথাটাই বিনু ফুপুর শ্রবণ নালিতে পৌঁছেছে। মহিলা পান চিবুতে চিবুতে কেমন তিক্ত বাক্য আওড়ালেন— তুই বাপের বাড়ি ছাড়নের দুঃখ কেমনে বুজবি? থাকোস তো বাপের বিড়ায়, বুইড়া হইয়াও দিনের পর দিন আমার ভাইয়েগো টাহা ধ্বংস করতাছোত।
,,, অন্যদিন ফুপুর কথার বিপরীতে কথা না বললেও, আজ কেমন করে যেনো অকারণেই মেঘশ্রীর মুখ থেকে বেরিয়ে গেলো— ফুপু!! আপনার ভাই কিন্তু আমার আব্বা। আমি আমার আব্বার টাই খাচ্ছি।
,,, মেঘশ্রীর উত্তরে ফোসফোস করে উঠলেন বিনু ফুপু। কিছু বলতে নেবে, তার আগেই কথা কেড়ে নিলো পাশের বাড়ির কাকুলির মা— মাগো মা, মাইয়া দেহি ফুপুর মুখে মুখে কতা কয়, আর কইবো না কেন? বয়স কম হইছে? ভিত্তে ভিত্তে পাইক্কা পুরা ঝুনা ঝুনা হইয়া গেছে।
,,, এরূপ বাজে কথা কর্ণকূহরে পৌঁছাতেই চোখ জোড়া খিচে বন্ধ করে নিলো মেঘশ্রী। নীরবে একটা শক্তপোক্ত ঢোক গিলে কান্না আটকে নিজেকে সামলে নেওয়ার প্রয়াস চালালো। এই পর্যায়ে রুপান্মিতার চোখ-মুখের রং বদলালো, রাগ হলো ভীষণ, তবে কারোর সাথে বাজে ব্যবহার করার স্বভাব না থাকায় নরম স্বরেই বললো— চাচি!! আপনি ওনাদের মাঝে কথা বলছেন কেনো? ফুপু নাহয় নিজের মানুষ, আপনি তো আর নিজের না।
,,, একটা কোন পাড়ার না কোন পাড়ার মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে ফোঁসফোঁস করে উঠলেন কাকলির মা। দাঁতে দাঁত খিচে যেইনা কিছু বলতে নেবে, তৎক্ষণাৎ মাস্টার বাড়ি থেকে বিয়ের উপাদান হিসেবে আসা নতুন জুতাখানা উড়ে এসে ছিটকে পড়লো কাকলির মায়ের কাঁধের উপর। আর একটুর জন্য মুখে পড়তে গিয়েও পড়েনি, মহিলা সরে গিয়ে মুখটাকে বাঁচিয়ে নিয়েছে। নরম জুতায় তেমন আঘাত না পেলেও বড্ডো সম্মানে লাগলো কাকলির মায়ের। পাশে দাঁড়ানো অনেকেই ফিক করে হেসে দিয়েছে, হাসছে রুপান্মিতাও। আবার কিছু কিছু কুটনা মহিলারা ক্ষেপেছে বনশ্রীর উপর। তাতে বনশ্রীর ভাবাবেগ নেই। মেয়েটা বিছানার উপর দাঁড়িয়ে এক নাগাড়ে ফোঁসফোঁস করে যাচ্ছে। এরূপ কাণ্ডে ফুঁপিয়ে উঠলেন কাকলির মা। বিনু ফুপুর কাছে নালিশ করে বললো— ও বুবু, দেখছেন নি আমনের ভাতিজি কী কাণ্ড করলো, আমার মুখো জুতা ছুইড়া মারছে।
,,, পাশ থেকে আরও একজন মহিলা বলে উঠলো— এই জুতা তো তরে মারেনাই কাকুলির মা। মারছে বুবুর মুখে। বুবুরে কিছু কইতে পারেনা বইলাই তরে জুতা ছুইড়া মারছে।
,,,, এমনিতেই মেঘশ্রীর মুখের উপর বলা কথাটা মেনে নিতে পারেনি বিনু ফুপু, এখন পরপর এতোগুলা ঘটনা আর মহিলার বলা শেষ কথাটা শুনে ফুঁসে উঠলেন তিনি। রেগে মেগে একাকার হয়ে বনশ্রীর উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বললেন— হাড়ে বজ্জাত ছেড়ি!! খারা, তর বাপের লারো কথাখান পারতাছি আমি। কতো বড়ো সাহস আমার লগে গলা উচু করে, মুখে জুতা ছুইড়া মারে। ছোট ভাইজান, বড়ো ভাইজান।
,,, বলতে বলতে রেগে মেগে বাহিরের পথে হাঁটা দিলো বিনু ফুপু। এমন একখানা ভাব, যেনো আজ হেস্তনেস্ত একটা করেই ছাড়বে, তাতে বনশ্রীর থোরাই কিছু আসে যায়। সে নিজেও রাগে ফোঁসফোস করছে, ফুপুকে বাপের হুমকি দিতে দেখে এবার সেও চিৎকার করে বললো— যাও, বলো গিয়ে। দেখবো তোমার ভাই কী করে আমায়। আজ তো বাড়ি থেকে বের হবই, যাওয়ার আগে দুই-চারটা খুন করে রেখে যাবো। কী পেয়েছো আপাকে? যা খুশি তাই না? তোমরা কামাই করে খাওয়াও? আমার আপা চাকরি করে। মাস শেষে এতো এতো টাকা পায়। ঐ টাকায় তোমাদের মতো দু, তিনটে সংসার এমনি পেলে পুষে নিয়ে যেতে পারবে সে, অন্যের উপর নির্ভরশীল হতে হবে না। (কাকুলির মায়ের দিকে নজর যেতেই,) এই ঢেপসি মুখি এই। ঢেমনা পোকার বাচ্চা। তুই এখনো দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? আমার বিয়েতে তর দাওয়াত নেই। এই!! এটাকে বের কর, নয়তো বিয়ে বাতিল। বিয়ে-সাদি করবো না আজ।
,,, বনশ্রীর ফের চিৎকারে কেঁপে উঠলেন কাকুলির মা, কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। এদিকে কাকুলির মায়ের পক্ষে যারা ছিলো, তারাও এ কথা ও কথা বলে বলে ঘর থেকে প্রস্থান নিতে থাকলো। তাদের বলা প্রতিটি কথাই মেঘশ্রীর কর্ণকূহরে পৌঁছেছে। তবে, সব কথার মাঝে কানে লেগেছে এই কথাটা।
,, লোকে বলে না? অতি বড়ো ঘরনি না পায় ঘর, অতি বড়ো সুন্দরী না পায় বর। এর হয়েছে সেই দশা। শুধু মুখে বললেই দোষ। তেড়ে মেরে মারতে আসে।
,,, মহিলাটির কথাটা সহ্য হলো না বনশ্রীর। সে ঝুঁকে গিয়ে বাকি জুতাটা তুলতে নেবে, তার আগেই বনশ্রীর হাতখানা খামচে ধরলো মেঘশ্রী। কেমন কাতর চোখে তাকিয়ে নরম স্বরে আওড়ালো— শান্ত হো বোন, শান্ত হো। সবার সাথে মুখ লাগাতে নেই, একটু শান্ত হো।
,,, তেতে উঠলো বনশ্রী, সে যেনো আজ পুরোপুরি ধৈর্য ছাড়া হয়েছে। কেমন অশান্ত হয়ে আপার থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে উল্টো আপার হাত ধরে চেঁচিয়ে উঠলো— কি শান্ত হবো? কি পেয়েছো তুমি? সবাই এতো কথা বলে অথচ তুমি কিছু বলো না কেনো? তোমার ইচ্ছা হলে বিয়ে বসবে, নয়তো বসবে না। সেটা তোমার ইচ্ছা, আর সেই বিষয়ে যদি কেউ বলতে আসে, তাহলে একেবারে তার গলার মাঝবরাবর রাম দা পুঁতে দিবে। কণ্ঠনালি কাটা পড়লে এমনি জবান বন্ধ হয়ে যাবে।
,,,, বনশ্রীর কথায় কেমন থমথমে হয়ে গেলো পরিবেশ, ঘরে উপস্থিত থাকা প্রতিটি মানুষ নিশ্চুপ। অনেকেই টুকটাক ভয় পেয়েছে বোধহয়, সবসময় যেই মেয়েটার আচার-আচরণে সর্বদা সকলের হাসি পায়, সেই মেয়েটার কণ্ঠের এই তেজ, হিংস্রাত্মক কথাগুলো সহজেই মেনে নেওয়ার নয়। বনশ্রী এখনো রাগে ফোঁসফোঁস করছে, দৃষ্টিতে ধ্বংস করে ফেলার মতো তেজ। যেনো এখনি কাকলির মাকে হাতের কাছে পেলে ছিঁড়ে খুবলে শেষ করে দিবে। বনশ্রীর অবস্থা দেখে সবাই চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকলেও ফিক করে হেসে ফেললো মেঘশ্রী। বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে তাড়া দিয়ে বললো— হয়েছে, থাম, এখনি তর বর চলে আসবে, সাজতে হবে না? এই রূপ!! শাড়িটা মেলে ধরো, আমি ওকে ব্লাউজ-পেডিকোট পড়াচ্ছি।
,,, রুপান্মিতা মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানালো। শাড়িটা মেলে ধরতেই ঘরের ভিতর ছুটে এলো আফনান। ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকে রুপান্মিতার উদ্দেশ্যে বললো— রুপ আপা!! নিবেদিতা আপা বলেছে তোমাকে যেতে। দুলাভাইয়ের জন্য ঝাল-মিষ্টি, লবণ দেওয়া শরবত, হলুদের শরবত বানাতে।
,,, আফনানের ডাক শুনে হুরমুরিয়ে উঠে দাঁড়ালো রুপান্মিতা। বিয়ে বাড়িতে বউয়ের বান্ধবীদের অন্যতম আনন্দ করার মাধ্যম হচ্ছে এটা। এই আনন্দটুকু বাদ পড়লে হবে? অগত্যা ভিড় ঠেলে বের হলো ঘর থেকে। তবে ঘর থেকে বের হতেই এক অদ্ভুত চিন্তায় মস্তিষ্কটা হিম হয়ে এলো। চট করেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো দেওয়ান বাড়ির দক্ষিণ দিকে। আরবিদের ঘরের পরবর্তী অংশ থেকে দিনের আলো কমে এসেছে। ওদিকটায় কি দিনের আলো পৌঁছায় না? নাকি চারদিক থেকে দিনের আলো আসা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে? ভেবে পেলো না রুপান্মিতা। তার মধ্যেই রুপার হাত টেনে ধরলো আফনান, টানতে টানতে বললো— আপা, দাঁড়িয়ে আছো কেনো? চলো দ্রুত।
*********&
,,, সময়টা বেলা তিনটা নাগাদ। মিতালিদের বাড়ির সামনের মাটির রাস্তায় একটা গরুর গাড়ি এসে থামলো, গাড়ির ভিতর দুজন বয়স্ক মতো লোক। লোক দুটো অচেনা। লোক দুটোর পিছনে মিতালির মা, মহিলার পরনে বোরখা থাকলেও মুখখানি খোলা, ফলস্বরূপ সহজেই ধরতে পারা যায় এটা মিতালির সৎ মা। মহিলাটির কোলে ছোট ছেলে আর গা ঘেঁষে বসে আছে ছোট মেয়েটা। তারপরই পুরোপুরি বোরখায় আবৃত একটি মেয়ের অবয়ব দেখা গেলো। শুরুতেই গাড়ির ভিতর থেকে দুজন পুরুষ নেমে এলো, পরপর মিতালির মা নামলো। একজন পুরুষ বড়ই তোষামোদ করে মিতালির সৎ বোনটাকে কোলে নিলো, বিনিময়ে হাসলেন মিতালির মা কিন্তু ছোট্ট মেয়েটি কেমন ভয়ে তটস্থ হয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। ছোট বোনের চিৎকার শুনে হন্তদন্ত পায়ে গাড়ি থেকে নামলো মিতালি। টেনে-টুনে লোকটার থেকে নিজের বোনকে ছাড়িয়ে নিলো। মিতালির কাণ্ডে লোকটা কেমন বিশ্রী হাসলো, পরপরই ধীরে ধীরে নিচু স্বরে কী যেনো বললো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মিতালি মুখের মুখোস সরিয়ে লোকটার মুখে থুতু ছুড়ে মারলো, তৎক্ষণাৎ মিতালির চুল টেনে ধরলো মিতালির মা। ব্যথা পেলেও কাঁদলো না মিতালি, চুপচাপ হেঁটে গেলো সৎ মায়ের পিছু পিছু। মিতালি না কাঁদলেও তার ছোট বোনটা এবার গলা ফাটিয়ে কেঁদে উঠলো। এতে ভাবাবেগ নেই মিতালির মায়ের। মহিলা ওর চুল ধরে টানতে টানতে মাটির রাস্তা থেকে নামিয়ে চকের দিকে হাঁটা দিলো। মিতালিরও ভাবাবেগ নেই। সে বোনকে কোলের মাঝে আগলে রেখে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে মায়ের পিছু নিলো। ওদিকে ওরা চলে যেতেই লোক দুটো সিগারেট ধরিয়ে গরুর গাড়িতে উঠে বসলো। এরপর আর কিছুই দেখা যায়নি।
,,, কথাটুকু বলেই মাথা নত করে নিলো অতুল। কাব্যশ্রীর চোখ জোড়া কেমন ছলছল করে উঠলো, সে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে অতুল ভাইয়ের পানে। বর্তমানে দেওয়ান বাড়ির খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে কাব্যশ্রী, আর তার সামনে মুখ ছোট করে দাঁড়িয়ে আছে অতুল। সেদিন মিতালির কোনো খোঁজ পাওয়া না গেলেও বিষয়টা নিয়ে থেমে থাকেনি কাব্যশ্রী, অতুলকে বলেছে যেনো সর্বক্ষণ মিতালিদের বাড়িতে নজর রাখে। অতুল ছেলেটা বেশ বাধ্য, সেই সাথে ভালো মন-মানসিকতার। ছেলেটা এই দুটো দিনে শুধু খাওয়া, ঘুমের সময়টা বাদে সকাল থেকে রাত্রি ১০টা পর্যন্ত সেই মাটির রাস্তায় নজর রেখেছে। শুধু মাত্র কাব্যশ্রীর কথা রাখার জন্য। অতুলের নজর রাখাটা বৃথা যায়নি, কাব্যশ্রীর কথারও খেলাপ হয়নি, ছেলেটা সত্যিই মিতালির খোঁজ এনেছে, তবে এই খোঁজে মন ভরলো না কাব্যশ্রীর। তার ঠেলে কান্না পেলো, আর সেই কান্নার বেগ বাড়ার আগেই অতুলকে কিছু না বলে একপ্রকার হন্তদন্ত পায়ে ছুটে গেলো আরবিদ দেওয়ানের ঘরে।
,,, আরবিদ তখন বাজারে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলো। সে সত্যিই বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবে না, বিয়ের কথাবার্তা, হলুদে যেমন থাকেনি, বিয়েতেও থাকবে না। তার এসব আনুষ্ঠানিকতা পছন্দ নয়। আরবিদ সদ্যই গায়ে পাঞ্জাবীটা জড়িয়েছে, তখনই ধরাম করে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলো কাব্যশ্রী। সেই দরজা খোলার শব্দে চোখ তুলে তাকালো আরবিদ। কিশোরীর পরনে আরবিদের দেওয়া বেগুনি পাড়ের হালকা বেগুনি শাড়ি, ব্লাউজখানা সাদা রঙা, সাহেবি ব্লাউজ, গলার এদিকটায় সুন্দর করে শার্টের মতো কলার করা, শাড়িখানা কাঁধে ভাঁজ করে কোমরে বিচা বেঁধে দিয়েছে মেঘশ্রী। চুলগুলো সোজা সিঁথি করে দুপাশ থেকে চুল নিয়ে মাঝখানে ক্লিপ দিয়ে আটকে রাখা, আর বাকি চুল অবাধে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে পিঠ জুড়ে, যার দৈর্ঘ্য ছুঁয়েছে হাঁটুর কাছ পর্যন্ত। চোখে গাড়ো কাজল, ঠোঁটে লাল রঞ্জক, কানে গলায় দামি মুক্তার মালা, হাতে রিনঝিন শব্দ তোলা কাচ ও মতির চুড়ি। পায়ে আলতা, শাড়ির ফলে নূপুর জোড়ার দেখার যো নেই। আরবিদ এক ঝলক দেখলো তা, পরক্ষণেই অনুভব করলো কিশোরীর চোখে নোনা জল বিরাজ করছে, সহসা ভ্রু গুটালো মানব। গায়ে আতর মাখতে মাখতে শুধালো— কি হয়েছে? কাঁদছো কেনো হঠাৎ? কেউ কিছু বলেছে?
,,, কাব্যশ্রী দুহাতে গাল মুছে পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো আরবিদের নিকট। নাক টেনে আকুল স্বরে আবদার করলো।— আমি একটু পশ্চিম পাড়ায় যেতে চাই দেওয়ান সাহেব, আপনি সাথে যাকে খুশি পাঠান। আমার সমস্যা নেই, শুধু দারোয়ান কাকাকে বলুন আমাকে যেতে দিতে। উনি আপনার অনুমতি ব্যতীত আমাকে কোত্থাও যেতে দেয় না।
,,, আরবিদের কুঁচকানো ভ্রু জোড়া এবার শিথিল হলো, আতর মাখা শেষ হতেই আতরের শিশিটা দর্পণের সামনে রাখতে রাখতে শুধালো— নিচে গিয়েছিলে?
,,,, কাব্যশ্রীর কথার বিপরীতে বলা রুক্ষ মানবের প্রশ্নে ভরকে গেলো কাব্যশ্রী। সে কি বললো? আর লোকটা কি বললো? পরক্ষণেই ভাবলো দেওয়ান সাহেব হয়তো জানতে চাচ্ছে সে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলো কিনা? বিষয়টা বুঝতেই কাব্য দ্রুত দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললো— না, না, এখনো আমি আপনার অবাধ্য হয়ে বাহিরে যাওয়ার চেষ্টা করিনি, এমনকি নিচেও যাইনি, শুধু খোলা বারান্দায় গিয়েছি।
,,, আরবিদ দেওয়ান উত্তরটা কতোটুকু গ্রহণ করেছে জানা নেই। সে সেসব ধ্যান না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করলো— দুপুরে খেয়েছো?
,,, আরবিদের একেকটা প্রশ্নে এবার সত্যিই বোকা বনে যাচ্ছে কাব্য, সে যে একটা কথা বললো সেটা কি উনি গ্রহণ করেনি? কাব্যর উত্তর না পেয়ে আলনা থেকে শাল নিতে নিতে ধমকে উঠলো মানব— কি সমস্যা? উত্তর দিচ্ছো না যে?
,,, আকস্মিক ধমকে কেঁপে উঠলো কাব্য, মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর করলো— খেয়েছি একটু আগে।
,,, এরপর অনেকটা সময় কাটলো, মানুষটা নিশ্চুপ। কিছুক্ষণ কাব্যর দিকে তাকিয়ে থেকে বিছানার তলা থেকে কি যেনো নিয়ে পকেটে পুরলেন। পরপর ভাবনাবিহীন কণ্ঠে আওড়ালেন— বেশ করেছো নিচে যাওনি, আর যেতে হবেও না, আমি আসার আগ পর্যন্ত এই ঘরেই থাকো। আলমিরাতে বই আছে, ইচ্ছা হলে পড়তে পারো।
,,, বলেই গায়ে শাল জড়াতে জড়াতে বেরিয়ে গেলো মানব, যাওয়ার আগে খট করে বাহির থেকে দরজাটা বন্ধ করে চলে গেলো। আরবিদের এহেন কাণ্ডে থতমত খেয়ে গেলো কাব্যশ্রী। লোকটা তার কথা কানে তোলা তো দূরে, তাকে বন্দিনী করে রেখে গেলো? এটা কেমন ব্যবহার? লোকটা কি অবুঝ? এরকম অবুঝ আচরণ করার মানে কি? কাব্যশ্রী খুব ভালো করে অনুভব করে দেখলো, এই বিয়েতে আরবিদ যেমন নিজে উপস্থিত থাকেনি, তেমনি করে কোনো না কোনোভাবে তার উপস্থিতিটাও আটকে দিয়েছে। এর কারণ কি? কাব্যশ্রীর কেমন গোলমেলে লাগছে সব।
**********
,,, ৬টা নাগাদ বরযাত্রীর পা পড়লো দেওয়ান বাড়ির দোরগোড়ায়। বরযাত্রী বলতে আহামরি কেউ আসেনি, যদিও আসার কথাও না। রেজওয়ানের তো তেমন কেউ নেই, শুধু কাশেম, মোকশেদ আর আকবর ছাড়া। কাশেমটা বিয়ে করেনি, তার বয়স ৪০, মোকশেদ ও আকবরের বউ আছে, তবে তাদেরকে দাওয়াত করেনি রেজওয়ান। ছেলেটা মহিলা মানুষ পছন্দ করে না, তারা স্বভাবে কূটনা হয় বলে। মহিলা মানুষ যে কতোখানি তেঁদড়, তার প্রমাণ মিললো দেওয়ান বাড়িতে পা দেওয়ার সাথে সাথে। প্রবেশ পথে বড়ো করে ফিতা বেঁধে রেখেছে মেয়েরা। তা দেখে চরম বিরক্ত হলো রেজওয়ান। কিছু বলতে নেবে, তৎক্ষণাৎ মিষ্টি আর শরবত হাতে এগিয়ে এলো নিবেদিতা, রুপান্মিতা, শোনালি আর প্রতিবেশী দুইজন ভাবি। রেজওয়ান স্যার যেহেতু নিবেদিতা আর রুপান্মিতার শিক্ষক, তাই তারা কিছু বললো না, তবে একজন ভাবি এগিয়ে আসতে আসতে বলে বসলো— এমনে এমনে তো বউ নিতে পারতেন না দুলাভাই, আগে টাহা দেন, তারপর বউ নেন।
,,, মেয়েটির কথায় ভ্রু গুটালো রেজওয়ান, ফ্যাসফ্যাসে গলায় আওড়ালো— তাহলে বউ নিয়ে আসেন, টাকা রেডি করতেছি।
,,, রেজওয়ানের কথায় থতমত খেয়ে গেলো ভাবি, বোকা কণ্ঠে আওড়ালো— এটা কেমন কথা? আগে বিয়ে হবে, তারপর না বউ নিবেন।
,, সাথে সাথে উত্তর করলো রেজওয়ান— তাহলে আপনাদের টাকা দিবো কেনো, সরুন, জায়গা দিন।
,,, রেজওয়ান বললেও সরলো না কেউ, ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। পাত্তা দিলো না রেজওয়ান, প্রবেশ পথের গুষ্টির তুষ্টি করে ঘুরে গিয়ে গেইটের পাশ দিয়ে ভিতরে চলে গেলো। এদিকে মুনিবের কাণ্ডে বোকা বনে গেলো মোকশেদ, আকবর আর কাশেম। ভাবিরা সহ, সোনালি, রুপান্মিতা সবার মন খারাপ হয়ে গেলো। নিবেদিতা পারছে না কেঁদে দিতে, মেয়েটা কেমন কাঁদো কাঁদো স্বরে দাঁতে দাঁত চেপে বললো— আপা শুধু শুধু এটাকে খাইষ্টা বলে? কিপ্টা, খাইষ্টা দুলাভাই। এটাকে আমি দুলাভাই মানবো না, এখনি বন্যর কাছে বিচার দিবো।
বলতে বলতে হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে ভিতরের দিকে ছুট দিলো। আজ সে বন্যর কাছে নালিশ ঠুকবেই ঠুকবে, একটা বড়ো ঝগড়া বাধিয়ে ছাড়বে আজ। নিবেদিতা চলে যেতেই ভাবিরাও নিজেদের মতো চলে গেলো। সোলালিও চলে গেলো নিজের মতো, একা পড়ে রইলো রুপা। কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে সেও তপ্ত নিশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেলো ভিতরের দিকে। সদর দরজার কাছাকাছি পৌঁছাতেই চট করেই সামনে এসে দাঁড়ালো আরহান, পরনে দামি আকাশি রঙা পাঞ্জাবী আর সাদা পায়জামা। পাঞ্জাবীর হাতা গোটানো, ডান হাতে সিলভার রঙা ঘড়ি, বড্ডো সুন্দর লাগছে মানবকে। তবে তা দেখার সময় নেই রুপান্মিতার। সে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলো, তবে পারলো না। আরহান চট করেই তার সামনে এসে দাঁড়ালো। রুপান্মিতা আবারও পাশ কাটাতে চাইলো, তৎক্ষণাৎ ফের সামনে এসে দাঁড়ালো আরহান। বড্ডো বিরক্ত হলো রুপান্মিতা, ধমকে শুধালো— কি যন্ত্রণা? জ্বালাচ্ছেন কেনো এভাবে?
,,, উত্তর দিলো না আরহান, উল্টো বুকে হাত বেঁধে সামনে দাঁড়ানো মেয়েটার আগা-গোড়া পরখ করে নিলো। পরনে খয়েরি রঙা তাতের শাড়ি, গলায় রুপার চেইন, কানে কিছু নেই, চুলগুলো ছেড়ে রাখা, চোখে গাড়ো কাজল, ঠোঁটে রঞ্জক। এই সাজগুলো মানিয়েছে মেয়েটাকে। উত্তর না পেয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে রুপা, আরহান অল্প ঝুঁকে আস্তে করে শুধালো— কি? রেজওয়ান ভাই টাকা দেয়নি?
,,, রুপান্মিতার সোজা জবাব— আপনার বোন জামাই আস্তো একটা কিপ্টা।
,,, ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো আরহান, নিজের দিকে ইশারা করে বড়াইয়ের স্বরে আওড়ালো— বোনের জামাই কিপ্টা হলেও বোনের ভাইটার কিন্তু মন বড়ো। তুমি চাইলে আমাকে মিষ্টি খাওয়াতে পারো, আমি টাকা দিতে প্রস্তুত।
,,, আরহানের কথায় রুপান্মিতার রাগ হওয়ার কথা থাকলেও মেয়েটা রাগলো না, অকারণেই ঠোঁট টিপে হাসলো। পরপর স্বাভাবিক কণ্ঠে আওড়ালো— ওহ, মিষ্টি খাবেন? আচ্ছা!! খান না, নিন, যতো খুশি খান।
,,, আরহানের ঠোঁটে হাসির ঝিলিক ফুটে উঠলো। মুখটা হা করে বল্লো— নিজ হাতে খাইয়ে দাও, তাহলেই টাকা পাবে।
,,, টাকা পাওয়ার গুষ্টির তুষ্টি। রুপান্মিতার মনে অন্য ভাবনা, সে ঠোঁট টিপে মিটিমিটি হাসলো। এই প্রথম আরহানের কথায় সায় জানালো রুপা, চট করেই হাতে থাকা মিষ্টির প্লেট থেকে একটা কালোজাম তুলে আরহানের মুখে পুড়ে দিলো। বোকা আরহানটা খুশি খুশি মনে তা চিবুতে লাগলো, আচমকা চিবুতে চিবুতে থেমে গেলো যুবক। তীব্র ঝালে মুখটা জ্বলে উঠলো যেনো। মুহূর্তেই খুক খুক করে কেশে উঠলো বেচারা, থু থু করে মুখের মিষ্টিটা ফেলে লম্বা লম্বা শ্বাস নিতে নিতে সামনে তাকাতেই দেখলো সামনে কেউ নেই, ফকিরের মেয়ে হাওয়া। দাঁতে দাঁত চাপলো মানব, ফকিরের মেয়ের কতো বড়ো সাহস তাকে বোকা বানায়। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না বেচারা, পরক্ষণেই আবারও চোখ-মুখ খিচে কাশতে শুরু করলো। আকস্মিক পিছন থেকে ডেকে উঠলো মেহরাব, হাতে মিষ্টির প্লেট, এগুলো ভালো মিষ্টি। যাওয়ার পথে রুপান্মিতাই ধরিয়ে দিয়েছে তার হাতে। মেহরাব ছুটে এসে আরহানের দিকে এগিয়ে দিতেই আরহান গ্রহণ করলো তা। পরপর চারখানা মিষ্টি খেয়ে শান্ত হলো মানব, পরক্ষণেই বিরবিরালো— ফকিরের মেয়ে রুপকুমারি!! খেসারত দিতে হবে তোমায়।
***********
,,,, সময়টা ৭টা বেজে ২৫ মিনিট। কিছুক্ষণের মাঝেই রেজওয়ান ও বনশ্রীর বিবাহের কাজ অনুষ্ঠিত হবে। হুজুর সাহেব এসে বসার ঘরটায় আসন পেতে বসেছেন মাত্রই। হুজুর সাহেবের সাথে বসেছেন মাহমুদুল দেওয়ান, অপর পাশে মাহবুবুর দেওয়ান। মাহমুদুল দেওয়ানের মুখটা খানিক ভার, থমথমে। বনশ্রীর বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকে স্ত্রীর সাথে মনোমালিন্য চলছে। এমন নয় যে বনশ্রীর বিয়েতে রাহিমা বেগম খুশি না, বরং সবচেয়ে আনন্দিত সে নিজেই, কিন্তু বড়ো মেয়েটা যে অবিবাহিত। ওদিকে আরবিদটা বেপরোয়া, এতো অনুরোধ করেও বিয়েতে আটকে রাখা যায়নি। সে নিয়ে খানিক আগে আরও এক দফা ঝগড়া হয়েছে। দেওয়ান বংশের পুরুষগণ ত্যাজি হলেও সংসার জীবনে অশান্তি হলে তার প্রভাব কিছুটা তাদের উপরেও পড়ে। সেসব নিয়েই আপাতত গম্ভীর তিনি। এদিকে মাহবুবুর দেওয়ানের চোখে-মুখে রাগ, খানিক বাদে বাদে লম্বা নিশ্বাস নিয়ে নিজেকে সংযত করছেন। নির্ঘাত ভাইজান এই বিয়েটা ঠিক করেছেন, নয়তো এই ছেলেকে এখনই জুতো পিটা করতেন তিনি। কতো বড়ো বেয়াদব ছেলে, এসে থেকে একটাবার উনাকে সালামও করেনি, সম্মান করা তো দূর। ওদিকে শ্বশুরের রাগের ধার ধারছে না রেজওয়ান। হাতে থাকা কাটা ঘড়িটার দিকে নজর বুলিয়ে খেক করে উঠলো— আর কতোক্ষণ বসায় রাখবেন? আমাকে আপনাদের মতো বেকার মনে হয়? এই কাজি!! (কাজির দিকে তাকিয়ে) বিয়ে পড়ান।
,,, রেজওয়ানের এহেন তাড়া দেখে উপস্থিত ছোট-বড়ো অনেকেই হেসে উঠলো, তবে তাতে ভাবাবেগ নেই রেজওয়ানের। এদিকে মাহবুবুর দেওয়ান রেগে-মেগে রাগী দৃষ্টিতে বড়ো ভাইয়ের দিকে তাকালেন, সহসা থমথমে খেয়ে গেলেন মাহমুদুল দেওয়ান। ছেলেটা তাকে এমন বারবার বিপদে ফেলে দেয় কেনো? সেটাই বুঝে পান না ভদ্রলোক। তিনি উঠে গিয়ে রেজওয়ানের পাশে বসলেন। কণ্ঠ খাদে নামিয়ে অত্যন্ত নিচু স্বরে আওড়ালেন— হারামজাদা!! তর মতো এমনে বেহুশ হয়? একটু শবুর কর। মানসম্মান বাঁচিয়ে রাখ কিছু, মাস্টার বাড়ির পোলা তুই।
,,, রেজওয়ানের এলো গেলো না, সে আবার অতো ফিসফিস করে কথা বলতে পারে না। অগত্যা সবাইকে শুনিয়েই বললো— সময় যাচ্ছে তো যাচ্ছেই, আপনেগো কোনো খেয়ালই পাচ্ছি না। একটু পর এশার আজান দিয়ে দিবে, তখন আবার বলবেন নামাজ পড়ে এসে তারপর বিয়ে পড়াবো। ওটা হচ্ছে না। আজানের আগে বিষয়টা শেষ করেন, আমি নামাজ পড়ে বউ নিয়ে ফিরবো।
,,, মাহবুবুর দেওয়ান শুধু মনে মনে দাঁত কিরমিরালেন। ওদিকে বসার ঘরের পাশের ঘরটায় বসিয়ে রাখা বনশ্রী লোকটার সব আজগুবি কথাগুলো শান্ত মেজাজে হজম করছে। নেহাতই আজ সে বউ, নয়তো উঠে গিয়ে একদফা ঝগড়া করে ফিরতো। কী নির্লজ্জ!! কী নির্লজ্জ!! এভাবে কেউ নিজের বিয়ের কথা বলে? ছিহ!! এই পর্যায়ে এসে বনশ্রীরও মনে হলো বিয়েটা তাড়াতাড়ি হওয়া প্রয়োজন। বিয়ের পর লোকটার বাড়ি ফিরেই লোকটাকে ধরবে সে, এমন এমন কথা শুনিয়ে দিবে যে একেবারে কথার বদ হজম হয়ে যাবে। ওদিকে তার সাথে বসে থাকা রুপান্মিতা, নিবেদিতা, সোনালি, পাড়ার আরও মেয়েরা কেমন খিলখিল করে হেসে মজা উড়াচ্ছে। এরমধ্যে ওপাশ থেকে ধেয়ে এলো মাহমুদুল দেওয়ানের গম্ভীর কন্ঠ— কাজি সাহেব!! বিয়ে পড়ান।
,,,, মাহমুদুল দেওয়ানের নির্দেশ পেতেই পরিবেশ শান্ত হলো কিছুটা, রেজওয়ানের কপালে পরা বিরক্তিকর ভাঁজটাও শিথিল হয়ে এলো নিমিষেই। কাজি এবার খাতা-কলম খুলে ঘটঘট করে যা যা প্রয়োজন লিখতে শুরু করলেন। এরমধ্যে কাশেমের দিকে নজর স্থির করলো রেজওয়ান, এই দৃষ্টির মানে বুঝেছে কাশেম। অগত্যা লুঙ্গির প্যাচ থেকে দুই বিঘা জমির দলিলখানা বের করে রেজওয়ানের দিকে এগিয়ে দিলো। রেজওয়ান দলিলখানা নিয়ে মাহমুদুল দেওয়ানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো— আপনেগো মেয়ের দেনমোহর। দেখে বুঝে নেন।
,,, মাহমুদুল দেওয়ান নিলেন তা, পরখ করে ছোট ভাইয়ের দিকে এগিয়ে দিলেন। বড্ডো অনীহা নিয়ে কাগজখানা গ্রহণ করে লাইনের পর লাইন পরখ করে একজন মহিলাকে ডেকে বনশ্রীর টিকট পাঠিয়ে দিলেন মাহবুবুর দেওয়ান। এর মধ্যে কাজি সাহেব কাগজপত্র ঠিকঠাক করে উঠে দাঁড়ালেন। রেজওয়ান ও বনশ্রীর বিয়ের প্রধান সাক্ষী হবেন মেম্বার সারাফাত হোসেন, অর্থাৎ মেহরাবের বাবা। রেজওয়ান অবশ্য এসব প্রধান সাক্ষী-টাক্ষীর ধার ধারতে চায়নি, কারণ ইসলামে এমন কোনো বিধান নেই, বরং উকিল বাপের বিষয়টা গ্রহনযোগ্য নয় কিন্তু সামাজিক দিক থেকে এটা দেওয়া প্রয়োজন ছিলো, বিধায় মাহমুদুল দেওয়ান নিজেই সারাফাত হোসেনকে মেয়ের বিয়ের সাক্ষী হওয়ার জন্য প্রস্তাব রেখেছিলেন। সেই প্রস্তাব সসম্মানে গ্রহণ করেছেন ভদ্রলোক। বর্তমানে সারাফাত হোসেন সহ, কাজি, মাহমুদুল দেওয়ান, আরও জন কয়েক মুরব্বি মিলে বনশ্রীকে বসিয়ে রাখা ঘরটার দিকে হাঁটা দিলেন।
কাজি আসছে বিয়ে পড়াতে, বিষয়টা কর্ণকূহরে পৌঁছাতেই বিছানায় তালপাতার পাটি বিছানো হলো, তার মাঝখানটায় বসানো হলো বনশ্রীকে, তার দুপাশে বসলো নিবেদিতা ও রুপান্মিতা। বনশ্রী বারবার এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাব্যশ্রীর খোঁজ চালাচ্ছে, কিন্তু মেয়েটার দেখা নেই। সে মাথা নামিয়ে নিবেদিতার কাছে কাব্যর খোঁজ জানতে চাইতেই নিবেদিতা জানালো, কাব্যকে ভাইজান নিজের ঘরে আটকে বাহির থেকে তালা মেরে গিয়েছে। সেই কথা শুনে চরম বিরক্ত হলো বনশ্রী। ভাইজানের মতিগতি সে বুঝতে পারে না। মেয়েটাকে সহ্যও করতে পারে না, আবার তার প্রতি অধিকার দেখানোর বেলায় ১৬ আনাই নিজের মর্জি চালাবে। আর তার বাবা-মাগুলোও আস্ত বলদ, এই কাঠখোট্টা পুরুষের তরেই মেয়ের নির্বাসন স্থির করে রেখেছে। বনশ্রীর ভাবনার ঘোর কাটিয়ে তাকে আড়াল করতে দুজন মহিলা মিলে সামনে বড়ো একখানা শাড়ি মেলে ধরলো। ততক্ষণে কাজি সহ সকলেই পৌঁছালেন সেখানে। আরহান, মেহরাব সহ দু-চারজন ছেলে-পুলে মিলে সাত-আটটি চেয়ার পেতে দিতেই সেখানে আসন পেতে বসলেন সকলে। মিনিট খানিক নীরবতা চলার পর কাজি সাহেব দুবার গলা খাঁকারি দিয়ে বনশ্রীর উদ্দেশ্য বললেন—
,,, ১ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া ২ বিঘা জমি উসুল দিয়া জনাব সাক্ষর মাস্টারের একমাত্র পুত্র জনাব রেজওয়ান মাস্টারের সঙ্গে মাহবুবুর দেওয়ানের জ্যৈষ্ঠ কন্যা বনশ্রী দেওয়ানের বিবাহের আবেদন রাখা হচ্ছে। বনশ্রী দেওয়ান! আপনি কি সেই আবেদন মঞ্জুর করছেন? করে থাকলে মন থেকে কবুল করুন।
,,, এই পর্যায়ে অকারণেই কান্না পেলো বনশ্রীর, চোখ থেকে টুপটুপ করে পানি পড়তে লাগলো। এদিকে নিবেদিতা আর রুপান্মিতা তাকে খোঁচাচ্ছে যেনো সে কিছুতেই কবুল না বলে। আগে ওপাশ থেকে টাকা দিবে, তারপর কবুল বলার হলে বলতে বলছে। বনশ্রী কি তা মানলো? জানা নেই, তবে মেয়েটার কান্নার বেগ বেড়েছে। এর মধ্যে আবারও ওপাশ থেকে কবুল বলার তাড়া দেওয়া হলো, বনশ্রী কবুল বলছে না। নিবেদিতা এবার উঁচু গলায় টাকার আবেদন জানালো। বিষয়টা যেহেতু হয়েই তাকে, তাই আর দ্বিমত করলেন না সারাফাত হোসেন। শুরুতেই একশত টাকা এগিয়ে দিলেন। এতেই যেনো সন্তুষ্ট হয়েছে সকলে। টাকা পেতেই নিমকহারামের মতো ঘোল পাল্টে নিলো নিবেদিতা আর রুপান্মিতা। এতক্ষণ মানা করলেও বর্তমানে উল্টো বনশ্রীকে কবুল বলার জন্য একের পর এক তাড়া দিতে লাগলো। বনশ্রীর তাতেও ভাবাবেগ নেই, সে এখনো নিজের মতো কাঁদতে ব্যস্ত। ওদিকে ধৈর্য হারালো রেজওয়ান, এখনো কাজি সাহেব কবুল নিয়ে তার নিকট কেনো এলো না? অধৈর্য হয়ে উঠে দাঁড়ালো সে, মুহূর্তেই হইচই পড়ে গেলো বসার ঘরটায়। পাত্তা দিলো না রেজওয়ান। বনশ্রীকে রাখা ঘরটার দিকে এগুতে নিতেই চট করে মেয়ে জামাইয়ের হাত চেপে ধরলেন মাহবুবুর দেওয়ান। দাঁতে দাঁত চেপে বললেন— তুই যদি এখন নির্লজ্জের মতো আমার মেয়ের কাছে গিয়েছিস, আল্লাহর কসম বাপ। তরে আমি সত্যি সত্যিই জুতা পিটা করবো। বস এখানে, চুপটি করে বস।
,,, বলেই টেনে-টুনে পাশে বসালেন। দাঁতে দাঁত চাপলো রেজওয়ান। কপালে তিনখানা ভাঁজ ফেলে উচ্চ শব্দে আওড়ালো— আপনার মেয়ের কপালে মাইর আছে, না মারলে এটা সোজা হবে না। সামান্য কবুল করতে এতো সময় লাগে?
,,, রেজওয়ানের কথাটা ঘর থেকে স্পষ্টই শুনলো বনশ্রী, কান্না ভুলে ক্ষেপে উঠলো, বিরবির করে রেজওয়ানের বাপ, দাদা, চৌদ্দ গুষ্টি তুলে বকে নিলো। এদিকে এখনো পর্দার বাহির হতে কবুল করার আবেদন জানাচ্ছে কাজি সাহেব। এই পর্যায়ে আর থেমে থাকলো না বনশ্রী, দাঁতে দাঁত চেপে নিচু স্বরে আওড়ালো— কবুল করছি।
,,, তা শুনে কাজি সাহেব আরও একবার আওড়ালেন— মা জান, আরও একবার মন থেকে রেজওয়ানকে স্বামী হিসেবে কবুল করুন।
,,, স্বামী? ইহকাল পরকালের সঙ্গী? ওপাশের লোকটা বুঝি বনশ্রীর সর্বক্ষণের সঙ্গী হবে? ভাবতেই কেমন স্থির হয়ে পড়লো বনশ্রী। এই পর্যায়ে তার রাগগুলো কর্পূরের ন্যায় মিলিয়ে গেলো, মেয়েটা কেমন আবেশে বুঁদ হলো। মনটাকে রেজওয়ানের প্রতি স্থির করে আওড়ালো— কবুল করছি।
,,, শেষ পর্যায়ে কাজি সাহেবের কণ্ঠ দৃঢ় হলো। বাক্যে কেমন চাপ প্রয়োগ করে আওড়ালেন— মনে কোনো রূপ দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকলে তা কাটিয়ে আরও একবার রেজওয়ানকে স্বামী হিসেবে কবুল করুন।
,,, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব? লোকটা যে খিটখিটে, মুখে দু-চার আনার মধু নেই, আবার দেখতেও তেমন একটা সুন্দর নয়। বনশ্রী তো লোকটাকে স্বামী হিসেবে পছন্দ করেনি, এখনো করা উচিত নয়, তবুও কেনো যেনো সেই উচিত কাজটা করতে পারলো না বনশ্রী। আগের বার লোকটাকে মন থেকে কবুল করেছে না? এখন সেই সকল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব এমনি মিটে গেলো, রইলো না তা। অতঃপর, নিজেকে সত্যি সত্যি একটা খিটখিটে লোকের নামে উৎসর্গ করে বনশ্রী আওড়ালো— কবুল করছি।
,,, মুহূর্তে সকলে আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করে উঠে দাঁড়ালেন। কাজি আবার অন্য জায়গায় বিয়ে পড়াতে যাবেন, তাই তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেলেন বনশ্রীকে রাখা ঘরটা থেকে। রেজওয়ান তখনো স্থির হয়ে বসতে পারছে না, বারবার উঠে দাঁড়াতে চাইছে। মাহবুবুর দেওয়ান একপ্রকার ধরে বেঁধে রেখেছে ছেলেটাকে। হঠাৎ আলহামদুলিল্লাহ আওড়াতে আওড়াতে এগিয়ে আসা কাজি সাহেব ও মুরুব্বিদের দেখে এবার স্থির হয়ে বসলো রেজওয়ান। সেই সাথে সকলে এগিয়ে এসে জায়গা দখল করে নিলো বসার ঘরটায়। পরিবেশ কিছুটা শান্ত হতেই কাজি সাহেব আবারও আওড়ালেন।
,,, ১ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া ২ বিঘা জমি উসুল দিয়া জনাব সাক্ষর মাস্টারের একমাত্র পুত্র জনাব রেজওয়ান মাস্টারের সঙ্গে মাহবুবুর দেওয়ানের জ্যৈষ্ঠ কন্যা বনশ্রী দেওয়ানের বিবাহের আবেদন রাখা হচ্ছে। রেজওয়ান করিম, আপনি কি সেই আবেদন মঞ্জুর করছেন? করলে মন থেকে কবুল করুন।
,,, রেজওয়ানের অতো ভনিতা করতে ভালো লাগে না, তাই সে চট করেই উচ্চ শব্দে বলে বসলো— সর্বনাশের আম্মাকে শতো বার কবুল।
,,,, রেজওয়ানের কথা শুনে ঘরময় হাসির জোয়ার বয়ে গেলো, অথচ দাঁতে দাঁত চাপলো বনশ্রী। মেয়েটা কবুল বলে কাঁদতে বসেছিলো, কাঁদার মাঝে লোকটার এরূপ কবুল করা শুনে কান্না থামিয়ে দিলো সে। একটা মানুষ কতোটা বদ হলে এসব কথা বলতে পারে। তার কি বাচ্চা আছে? পয়দা করেছেন তিনি? এখন না করুক। ভবিষ্যতে যখন উনার একটা ছেলে হবে, তখন ঠিকই বনশ্রী তার নাম সর্বনাশ রাখবে। আর সেদিনই এই ডাকটা ফিরিয়ে দিবে উনাকে। ডাকবে, খাইষ্টার ঘরের খাইষ্টা, সর্বনাশের আব্বা।
,,,,, চলবে
কেমন হয়েছে সুন্দর করে বড়ো করে কমেন্ট করবা ওকে? ☺️☺️☺️☺️ আর বেশি বেশি রিয়্যাক্ট ও করবা। গতো দুই পর্বের কমেন্টের রিপ্লাই দেওয়া হয়নি, আজ কালকের মধ্যে পেয়ে যাবে। ইনশাআল্লাহ!!