#সাঁঝের_মায়া ___ [ পর্ব ৬৪ - (১ম অংশ) ]
#dure_dilshad_dua_দুর_এ_দিলশাদ্_দুআ
—’ দুঃখিত, ম্যাডাম। ধ র্ষন মামলার আসামীর সাথে আমরা এভাবে আপনাদের দেখা করার অনুমতি দিতে পারি না। এটা আমাদের এখতিয়ারের বাহিরে। আপনারা, আপনাদের অ্যাডভোকেটের সাথে যোগাযোগ করুন। তাছাড়া পরিবারের কেউ দেখা করার জন্য এলাউ নয়। ‘
পুলিশের সোজা-সাপটা নিষেধাজ্ঞা নিরব শুনে গেলো তিতির। গতসন্ধ্যায় ঈশানের খবর শোনামাত্রই ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা হয়ে গিয়েছিলো দেওয়ান বাড়ির সবাই। একপ্রকার ঝড়ের গতিতে এসে পৌঁছেছে তারা। কাক ডাকা ভোরে, পা রেখেছে ঢাকার মাটিতে। এখন অবশ্য বেলা হয়েছে বেশ খানিকটা। অফিস আদালত খুলতে শুরু করেছে। ঢাকা শহরের ব্যাস্ত রাস্তায়, কর্মমুখী মানুষদের ব্যাস্ততা বাড়ছে, পিলপিল করে চলতে শুরু করেছে যানবাহন গুলো। এতো সকাল সকাল পৌঁছেও, পুরান ঢাকার এদিকে আসতে চিরাচরিত জ্যামের মুখে বসে থাকতে হয়েছে পাক্কা দেড় ঘন্টা।
রাসেদ দেওয়ান চোখের ইশারা করে থামতে বললো তিতির কে। যা বলার সেই বলবে। পুলিশ কে লক্ষ্য করে বললো,
—’ আমাদের অ্যাডভোকেট আদালতের সমন নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছাবে। আমরা কি কোনো ভাবেই ঈশান আরশাদ দেওয়ানের সাথে দেখা করতে পারবো না?’
—’ নাহ, স্যার। সম্ভবই না। ‘
আরও কিছুক্ষণ আলাপ আলোচনা চললো। কোনোভাবেই ব্যবাস্থা করা গেলো না। যাবে না, এটাও তারা জানতোই। তাদের পারিবারিক উকিল যিনি রাহিয়ান দেওয়ানের ক্লাসমেট, বন্ধু – তিনি এরইমধ্যে রওনা দিয়ে দিয়েছেন। বলাবাহুল্য সে-ও এই বিরক্তিকর জ্যামে আটকা পরে আছেন। বাড়ির সবাইকে নিয়ে কাছেপিঠের একটা খোলা পার্কের দিকে এগিয়ে গেলে দেওয়ান কর্তা। বাড়ির গিন্নি রা আর রিশা, রোশনি, রাফি বাদে, বাকি সবাই এসেছে। তিতির কে সামলাতে নিশি, নূরির আসতেই হতো। নয়ন এক গাঁ জ্বর নিয়েও সঙ্গে এসেছে। বারংবার বলা সত্ত্বেও বাড়িতে রেখে আসা যায় নি।
সুতির একটা সাদামাটা সালোয়ার কামিজ গায়ে জড়ানো তিতিরের। চোখমুখ একরাতের মধ্যে শুঁকিয়ে গিয়েছে। ফর্শা মুখটা কালো দেখাচ্ছে। ডাগর চোখের নিচের অংশ টা পোড়া পোড়া লাগছে। নিশি ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। মেয়েটা অস্বাভাবিক শান্ত হয়ে আছে। সকালের নাস্তা করা হয়নি কারোরই। নাঈম আর নিয়াজ গিয়ে খাবার কিনে নিয়ে এসেছে সবার জন্যই। সে-সবই হালকা পাতলা খেয়ে নিচ্ছে সবাই।
বাড়ির সবার থেকে খানিকটা সরে এলো তিতির। চোখেমুখে পানির ছেটা দেওয়া দরকার। গতরাতে একফোঁটাও ঘুম হয়নি। এমন অবস্থায় ঘুমাতোই বা কি করে! আজকে বেশ গরম পরবে, সকাল থেকেই রোদের তীব্রতা চোখে পরার মতো। তবে পার্কের এদিকটায় বিশাল বিশাল গাছপালার সমারোহ। বেশ শীতল আবহাওয়া। ওড়নার অংশে ভেজা মুখটা মুছে, সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পাশে নূরির অস্তিত্ব টের পেলো সে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। গতকালের পর থেকে অতি স্বাভাবিক যদি কারোর অবস্থা থাকে, সেটা হলো নূরি। বোনের হাত থেকে পানির বোতল খানা আলতো হাতে নিতে নিতে বললো,
—’ এসব কেনো হচ্ছে, বলতে পারিস? ‘
তিতির কোনো ধরনের প্রতিত্তোরই করে না। কারণ প্রশ্নের উত্তর পাবার আশায় নূরি যে কথাটা বলেনি,তা তার মুখাবয়ব দেখেই স্পষ্ট বুঝতে পারা যাচ্ছে। নূরি নিজের মুখে পানি দিলো। নরম গলায় বললো,
—’ আমি যদি বলি এখানে বড় ভাইয়া নেই। তুই কি বিশ্বাস করবি? ‘
—’ মানে? ‘
—’ মানে, জেলের ভিতরে বড় ভাইয়া নেই। এই কারণে পুলিশ আমাদের দেখা করতে দিচ্ছে না।’
অবাক নয়নে তাকিয়ে রইলো মেয়েটা। ঈশান গ্রেফতার হয়েছে, এখানেই রাখা হয়েছে তাকে। এমন খবরই তো পেয়েছিলো তারা। তাছাড়া সকাল থেকে এসে দাঁড়িয়ে আছে। কই পুলিশ তো একবারের জন্যও বললো না, ঈশান ভিতরে নেই। নূরির কথার আগামাথা বোধগম্য হচ্ছে না তার। নরম গলায় শুধালো,
—’ থাকবে না কেনো? ‘
সামান্য একটুখানা হাসলো নূরি। ওদিকে দন্ডায়মান পরিবারের মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললো,
—’ ঈশান আরশাদ দেওয়ানের মতো মানুষকে জে লে নেওয়া সম্ভব! বিষয়টা বাড়াবাড়ি হয়ে গেলো না?’
—’ কি বলছো আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না। তার মতো মানুষ মানে?’
নূরি ফিরে তাকালো বোনের দিকে। মেয়েটার ফর্শা মুখটা এক্কেবারে রাঙা হয়ে আছে। আঁখিজোড়া তে রাজ্যের উদ্বেগ! হবে না-ই বা কেনো, সবার সামনে এরকম স্ট্রং দেখালেও ভিতরে ভিতরে কুঁকড়ে গিয়েছে পুরো।
—’ ভাই জেলে নেই, তিতির। এটা আমি হলফ করে বলতে পারি। আজ নেই, আর না তো এই তিনদিন ছিলো।’
—’ তাহলে? কোথায় সে!’
—’ সেটা তো আমি জানি না। তবে দু'টো বিষয় হতে পারে। ‘
—’ কি?’
—’ যদি আমাদের বিশ্বাস ভুল প্রমানিত হয়, তবে সে হেফাজতে আছে নিজের মতো। অথবা… ‘
—’ অথবা?’
তিতিরের রঙহীন মুখটা আচমকাই রঙ ফিরলো। জিজ্ঞাসু নজরে তাকাতেই নূরি বলে উঠলো,
—’ ইয়াজ মির্জার তোকে চাই আর রুষমিতা মির্জার চাই বড় ভাইয়া কে। হিসেব মেলা এখন। কোথায় থাকতে পারে সে। উহু, কথাটা কোথায় থাকতে পারে না, বলা যায় কোথায় রাখতে পারে বড় ভাইয়াকে।’‘
আশ্চর্য হলো তিতির। নূরির সাথে ইয়াজ বা রুষা কে নিয়ে কখনো আলাপ হয়নি তার সাথে। বিস্মিত গলায় বললো,
—’ ইয়াজ আর রুষমিতা মির্জা! রুষমিতা কে? ‘
—’ রুষা। ‘
রুষার ভালো নাম যে রুষমিতা এটা কি তিতির জানতো না? না-কি জেনেও খেয়াল করেনি কখনো! তবে রুষমিতা নামটা তো তার অতি পরিচিত। যদিও সে যার কথা ভাবছে তার সাথে নাতো তার কখনো দেখা হয়েছে, আর না তো দেখা হওয়ার সম্ভাবনা আজকাল আর আছে। তবে সে-সব মাথা থেকে সরিয়ে হালকা গলায় শুধালো,
—’ ওদের সম্পর্ক কি?’
—’ ভাই বোন ওরা। ‘
থমকায় তিতির। নূরির দিকে গভীর দৃষ্টি তাক করে বলে,
—’ ওরা করছে এসব?’
—’ হতে পারে, যদি না ভাইয়া সত্যিই দোষি হয় ।’
—’ আর প্রমানগুলো কিভাবে, কি!’
—’ নো আইডিয়া। ‘
—’ একটা মানুষের বিরুদ্ধে দিনের পর দিন সাজিয়ে গুছিয়ে, চক্রান্ত করে আসা নেহাৎ মুখের কথা নয়। বিগত তিন-সাড়ে তিন বছর যাবৎ এসব হচ্ছে। আমি ম রে গেলেও এসব প্রমান বিশ্বাস করি না। কিন্তু… ‘
—’ কিন্তু? ‘
—’ খু ন গুলো তো আর মিথ্যা নয়। কেউ একজন তো এগুলো করছেই। তাহলে যে ফাঁসাচ্ছে সে নয় তো? মানে, ইয়াজ মির্জা? ‘
নূরি একপ্রকার অনুভূতিশূন্য মুখ করেই তাকালো। তিতির কথাটা জিজ্ঞেস করেই, নূরির প্রতিত্তোরের অপেক্ষায় আছে হয়তোবা। নূরি এ যাত্রায় মৃদু হাসলো। রোদের তাপে শ্যামবরণ মুখটা বেশ অন্ধকার দেখতে লাগছে। শান্ত সুরে বললো,
—’ সে তো তুই বলতে পারবি। তোর জন্য দেওয়ানা হয়ে এতো কিছু করলো বেচারা। আর শেষে কি-না তুই ওকে রে প কেসে ফাঁসাতে চাচ্ছিস! কতটা সাফার করেছে তোর কাছ অবধি পৌছাতে! মনে প্রতিশোধ চেপে রেখে তোকে ভালোবেসে গিয়েছে। আমাকে পুতুল নাচ নাচিয়েছে, তবু তোর গায়ে একটা আঁচড় ও লাগতে দেয়নি।’
নূরির কথার সুর আজকে এই প্রথমবারের মতো বড্ড অস্বাভাবিক লাগলো। ইয়াজ মির্জার সাথে নূরির প্রেমের সংবাদ অজানা নয় তার। সেই হেতুতে এভাবে বলাটা স্বাভাবিক কি! কিন্তু কিসের প্রতিশোধ!
—’ আমি ইয়াজ মির্জা কে কখনো চোখের দেখাও দেখিনি, ছোটপু। সে কে, কেমন দেখতে, কি তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য, সে-সবে আমার কোনো আগ্রহই নেই। ‘
—’ একটা হাস্যকর বিষয় বলি হ্যা? তুই খেয়াল করেছিস কি-না বিষয়টা। এইযে এতসব যা যা হচ্ছে, সবকিছুর মূল কারণ কিন্তু তুই।
তিতিরের বাচ্চা বাচ্চা মুখের আদলে পরিবর্তন হলো। আহত দৃষ্টিতে তাকালো। নূরির মুখের হাসি মিলিয়েছে ততক্ষণে, কেমন একটা রুক্ষ গলাতে বললো,
—’ বড় ভাইয়ার সাথে শত্রুতা ইয়াজের। প্র তিশোধ নিতে এসেছিলো সে বড় ভাইয়ার সাথে । কিন্তু বেচারা তোকে দেখে আটকে গেলো। তোকে দেখে এতটাই দিওয়ানা হয়ে গেলো যে- তোকে মে রে দেওয়ানদের শাস্তি দেওয়ার পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হলো তার। ভিকটিম কার্ড খেলা হলো আমাকে নিয়ে । তোর জন্য একবুক প্রেম জমাতে জমাতে, আমাকে দিলো এক সমুদ্র যন্ত্রনা। আজ বড় ভাইয়া জে’লে। তোর ধারনা এ-সব ইয়াজ মির্জার পরিকল্পনার অংশ। সেটাও যদি হয়, তার কারণও তুই। তোকে পেতে এতো কাহিনী সবার। তুই সবার দূর্বলতা। তোর জন্য এতো এতো মানুষের জীবন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারছিস? ‘
তিতির হত-বিহবল হয়ে গিয়েছে। এতটা কঠিন কথা, নূরি এ জন্মে কখনো বলেনি তাকে। আজকে, এমন একটা মূহুর্তে, এভাবে এতগুলো কথা শুনিয়ে দেওয়ায়, সম্ভবত নিজের বোধবুদ্ধি কাজ করছে না তার। নূরি বাঁকা গলায় বললো,
— ‘ ছোট ভাইয়া তোকে ভালোবাসে, বিয়ের আগে একটা প্রেম করতি, বিয়ে করলি আরেকজনকে। আমি যাকে ভালোাবসি- সে তোকে ভালোবাসে। যে পুলিশ ভাইয়াকে এরেস্ট করেছে, সে-ও তোর জন্য পাগল। কে জানে সেই, ভাইয়ার ওপর রাগ করে এসব করছে কি-না। মোট কথা আশেপাশে এতো এতো পুরুষমানুষ কে নিয়ে খেলা করে যাচ্ছিস রীতিমতো। কেউ শান্তিতে নেই, তিতির। তোর জন্য সেটা। বুঝতে পারিস নি এখনো? না পারলে ভাব, বোঝ। ইয়াজ মির্জা স্বাভাবিক কোনো লোক নয়। এতো সহজে ছাড়বে আমাদের? আমার জীবনটা তছনছ হয়েই গিয়েছে, তোর জন্য। আমার দুই ভাইয়ের জীবনও তাই। আর কত তিতির! দেওয়ান বাড়ির বড় ছেলে শেষমেশ ধ র্ষন মামলায় জেলে। মানসম্মান কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছিস তুই। ভেবে দেখ…’
নূরি আর দাঁড়ায় না। মুখ ফিরিয়ে দ্রুত পায়ে প্রস্থান করে। এগিয়ে যায় বাড়ির লোকদের দিকে। তিতির বাকরুদ্ধ, চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গিয়েছে যেনো। নূরি এ-সব কি বলে গেলো! তার জন্য সব হচ্ছে! তাকে পেতে সবাই এতো মরিয়া হয়ে, এ ধরনের নোং রা খেলায় নেমেছে! সবার জীবন নষ্ট হওয়ার জন্য সে দায়ী!
নূরি ফোন কানে ঠেকিয়ে ফাঁকা জায়গায় এসে দাড়ালো। ওপাশের মানুষের ভারি নিঃশ্বাস কানে আসতেই, এপাশে ওড়নায় মুখ ঠেকিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো। গমগমে কন্ঠস্বর শোনা গেলো ওপাশের মানুষটির।
—’ ঘটনা গুলো আমি ঘটাইনি, জান। তোমার বোনকে এটা কেনো জোর খাঁটিয়ে বললে না? ‘
ইয়াজের তীক্ষ্ণ কন্ঠস্বরে, এদিক থেকে ঘৃনায় নাকমুখ কুঁচকে এলো নূরির। কান্না আটকে বললো,
—’ কোন ভরসায় বলতাম সেটা?’
—’ কোন ভরসা লাগবে? আমার বে’ডে এসো তাহলে। ভরসা দেই। ‘
—’ আর কি কি করাবে তুমি আমাকে দিয়ে? আমাকে মুক্তি কেনো দিচ্ছো না? এখন তিতিরের ক্ষতি করতে আমাকে ব্যবহার করছো। আমার ছোট বোন ও। কতটা ভালোবাসি আমি ওকে আন্দাজ বছে তোমার?’
মুখে কেমন একটা চুকচুক শব্দ করলো ইয়াজ। বিশ্রী শব্দে হাসলো।
—’ আমিও তো ভালোবাসি তোমার বোনকে। তোমার আন্দাজেরও বাইরে। তোমার বোনটা বড্ড নিঃস্পাপ, জান। ভালোবাসতাম আমি, মাঝখান থেকে একবেলা একটু বেখেয়াল হলাম, আর ছক্কা মে রে বিয়ে করে নিলো ঈশান আরশাদ! এটা কি করে মানি আমি! অসম্ভব। তোমার বোন একমাত্র নারী যার জন্য, ইয়াজ মির্জা নিজের পরিকল্পনা পরিবর্তন করেছে। তোমার ভাই ওকে গভীরে ছুঁয়েছে, জেনেও নিজের ছোঁয়ায় সেই সব মুছতে মরিয়া হচ্ছি। অন্য পুরুষের ছোঁয়া নারীও আমার মনে এখনো রাজ করছে। কতটা ভালোবাসি, ভাবতে পারো। ওকে আমার চাই, জান। ‘
নূরির বিতৃষ্ণায় পেটের ভেতর গুলিয়ে উঠলো। একে তো সারারাতের জার্নি, তার ওপর এতো এতো মানসিক চাপ। আর এই লোকের সাথে কথা বললে এমনিতেই গা গোলায় তার। তেঁতো কন্ঠে বললো,
—’ ভাইয়া কে কোথায় রেখেছো, সেটা বলো। ‘
—’ সে-সব তোমার সাথে আলাপ সম্ভব না, জান। ওটা তোমার বোনের সাথে হিসেব হবে। তোমার ভাই নিজ থেকে তোমার বোনকে ডি ভোর্স দেবে, তোমার বোনও হাসিমুখে স্বামী রেখে আমার বিছানায় আসবে। এই তো আর কয়েক ঘন্টার অপেক্ষা। ‘
—’ ধ র্ষন গুলো তোমার করা, ইয়াজ?’
প্রশ্নটা একপ্রকার ঝোঁকের বশেই করে ফেলেছে নূরি। ইয়াজ অবশ্য স্বাভাবিক ভাবেই নিলো। অশ্লীল হেসে উঠলো। বাঁকা গলায় বললো,
—’ নাহ, জান। যা করার তোমার ভাইয়াই করেছে। ট্রাস্ট মি! প্রমান গুলো দেখোনি? সে নিজ মুখেও স্বীকার করবে, যদি তুমি তিতিরকে আমাার কাছে আনার ব্যাবস্থা না করো। মিতুর সন্তান…ওটা তো তোমার ভাইয়ের। জানতে এটা?’
মিতু! ইয়াজের বাড়ির সেই গৃহকর্মী মেয়েটা। যে অন্তঃসত্ত্বা! দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে দিচ্ছে লোকটা। মিতুকে এর মধ্যে নিয়ে আসলো, তিতির আরও সহ্য করতে পারবে না। মেয়েটা কান্নামাখা গলায় বললো,
—’ আর কিচ্ছু করবে না তুমি। তিতির স্ব-ইচ্ছায় তোমার কাছে যাবে, কথা দিলাম তো আমি।’
ফোনের ওপাশ থেকেই শব্দ করে আড়মোড়া ভাঙ্গার চনমনা শব্দ কানে এলো রমনীর। কম্পিত বুক নিয়ে অপেক্ষা করে ইয়াজের কথাগুলো শোনার জন্য। খানিক আগে তিতিরের সাথে বলা সব কথাই, ফোনের ওপাশ থেকে শুনেছে লোকটা। খানিকটা হলেও, তিতিরের বিরুদ্ধে নিজেকে বিশ্বাস যোগ্য করাতে পেরেছে কি-না কে জানে! ইয়াজ সে-সব কথাতেই গেলো না। উল্টো বললো,
—’ তোমার আদরের বড় ভাইকে জানে, প্রানে ফিরে পেতে চাও তো? তবে সেটাই যেনো হয়। তিতির আমার।’
—’ যদি তিতির নিজ থেকে কখনো তোমার না হয়?’
নূরির বিদ্রুপমাখা কথাগুলো সম্ভবত বেশ গভীরে স্পর্শ করলো ইয়াজের। করবে না-ই বা কেনো! সে নিজেও জানে সেটা।
—’ আমি একা করবো কেনো? তোমরা নিজেরাই সাহায্য করবে আমাকে। তুমি, তিতির, ঈশান, এমনকি দেওয়ান বাড়ির প্রতিটা মানুষ। নিজ হাতে তুলে দেবে তিতিরকে, আমার কাছে। সেদিন বেশি দেরি নেই তো।’
নূরি হু হু করে কেঁদে ওঠে। ঈশান জে লে নেই, সে খবর গতরাতেই সে পেয়েছে। ভাইটা তার বন্দি আছে ইয়াজ মির্জার ডেরায়। ইয়াজের শর্ত অনুযায়ী তিতিরকে পেলে, প্রানে রেহাই দেবে ঈশানকে। ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে, ছোট্ট আদরের বোনটাকে এহেন বিপদের মুখে ফেলে দিতে হচ্ছে তার। তবুও মনের কোনে একটা ক্ষিন আশা, ঈশানকে ফিরিয়ে আনতে পারলে– তিতিরকেও মুক্ত করা সম্ভব ইয়াজের থেকে। খানিক আগে তিতিরের সাথে করা, তার এই দূর্ব্যাবহারে নিজের ওপরই চরম বিষাদ জন্ম নিয়েছে নূরির। আর কত! নিজের বোকামি তে হচ্ছে এসব। সে যদি আজ থেকে তিন বছর আগে ইয়াজ কে চিনতে পারতো, হয়তো আজকে তার পরিবার কে এভাবে নাচাতে পারতো না লোকটা।
*
—’ আপনি আমাকে সহ কোথায় যাবেন? আমি কোত্থাও যাবো না। অসম্ভব। ‘
বদ্ধ সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আতঙ্কিত গলায় কথাগুলো বলে গেলো মিতু। ঈশান হাতের পিস্তলখানা পকেটে গুঁজে বিরক্ত মুখে তাকালো তার দিকে। মেয়ে মানুষ আসলেই ন্যাকা। এই তো সকাল থেকে বাঁচান, বাঁচান করে হেদিয়ে মরছিলো, যেই মূহুর্তে সে সময় এলো, তখনই নাটকের শেষ নেই। যদিও মেয়েটাকে এক তরফা দোষ দেওয়া যায়না। ওর যা মনের অবস্থা, তাতে ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক। ঈশান স্বাভাবিক গলায় বললো,
—’ আমি এখান থেকে বেরিয়ে গেলে তুমি জিন্দা থাকবে বলে মনে করো?’
—’ আমাকে ইয়াজ মির্জা এতো সহজে মা রবে না, ভাইয়া। আপনি চলে যান। আমাকে সঙ্গে নিতে চাইবেন না।’
ঈশান দীর্ঘশ্বাস ফেললো। দরজার ওদিক থেকে সরে এলো। ঘরের কোনায় কোনায় সিসিটিভি। এতক্ষণে হয়তো তার এখান থেকে চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখে সতর্কও হয়ে গিয়েছে ইয়াজ, রুষা। এখানে চলেও আসবে।
—’ তা হয় না, মিতু। তোমাকে এভাবে বিপদে রেখে আমি চলে যেতে পারি না। ‘
—’ আর আমি একজনের জিম্মাদারি কাঁধে তুলে নিয়েছি। সে আমাকে ছাড়া অচল। এতো এতো রাহাজানির মধ্যে সে আমার হাত ধরে ভরসা খোঁজে। আমি তাকে ছেড়ে যেতে পারি না। সে মৃ ত্যুপথচারিনী জীবনের শেষ মূহুর্তে পাশে কাউকে পাবে না। হাহাকার করবে, সেটা আমি হতে দিতে পারি না।’
—’ দেখো, মিতু। আমি আমার পরিকল্পনা মতো চলবো। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আমাকে জেলে যেতে হলেও যাবো। হতে পারে আজ কালের মধ্যে সত্যিই এবার জেলে ঢুকতে হবে আমার। কিন্তু তোমার একটা সুরক্ষা করে না দিয়ে আমি যেতে পারি না।’
মিতু মৃদু হাসলো। ছলছল নয়নজোড়া মুছলো আলতো হাতে। পেটের ওপর হাত বুলিয়ে মিহি সুরে বললো,
—’ আপনাকে জেলের বদলে এ বাড়িতে নিয়ে এসে আমার সাথে রাখা হয়েছিলো, শুধুমাত্র আপনার বিরুদ্ধে আরও কিছু প্রমান জোগাড় করতে। পুলিশ এখন সুন্দর মতো আরেকটি অভিযোগ লিখবে আপনার নামে। কি জানেন? দিনের পর দিন, এই বাড়িতেই আমার ওপর অত্যা চার করে এসেছেন আপনি। সেই অত্যা চারের ফসল এই সন্তানটি। এবং আমি সেটা থানায় অভিযোগ ও জানাবো। আপনার নামে মিথ্যা সাক্ষীও দেবো। পুলিশ এরেস্ট করার সময় আপনি যে পালিয়ে এসে আমার সাথে এই তিনদিন ছিলেন, সেটারও সাক্ষীও আমিই দেবো। এতোকিছু জানার পরও আমাকে কেনো সঙ্গে নিতে চাইছেন? কেনো ইয়াজ মির্জার হাত থেকে বাঁচাতে চাইছেন? আমাকে মে'রে রেখে গেলেই পারেন। কারণ আমি আপনার সঙ্গে কখনো যাবো না, আর যেহেতু যাবো না– শেষমেশ আমি আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবোই। বাধ্য আমি।’
ঈশান তীক্ষ্ণ, সরু চোখে শুনে যায় মেয়েটার কথাগুলো । ঘটনা জড়িয়ে আসছে ক্রমশ। পরিকল্পনা মোতাবেক এক রাতের জন্য হলেও থানায় যেতে হবে তার, তবে তার আগে আরও কিছু ঘেটে যাওয়া বিষয়, গুছিয়ে আনতে হবে। সে যা ভাবছে সেটা তখন হবে, যখন সে সবার আড়ালে যাবে । সবাই জানবে ঈশান আরশাদ পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছে। ঈশান কথা বাড়ায় না আর। শুধু বলে,
—’ টেক কেয়ার । ‘
*
দিনের আলোর তীক্ষ্ণতার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রোদের তীব্রতা। গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন। ঈশানের সাথে শেষপর্যন্ত দেখা করার পারমিশন দেওয়া হয়নি কোর্ট থেকে। কোনোভাবেই ব্যবস্থা করা যায়নি পরিবার এর কারোর সাথে দেখার করার। ঈশানের এডভোকেট আমিনুল সাহেব যখন , তার সাথে দেখা করে বাইরে এলেন, তখন যোহরের আজান পরছে। অস্বাভাবিক গম্ভীর মুখ দেখেই, স্পষ্ট বলে দেওয়া যায় লাভের লাভ সেরকম কিচ্ছু হয়নি। রাইসুল দেওয়ান একপ্রকার ছুটে গেলেন বন্ধুর কাছে। শুধোলেন ছেলের কথা। আমিনুল সাহেব খুবই সন্তর্পণে আউরিয়ে গেলেন, শেখানো বুলিগুলো। জানালেন ঈশান আরশাদ জেল হাজতেই আছে। তদন্ত চলছে পুরোদমে। কেস কোর্টে ওঠার আগ অবধি পরিবার এর সাথে দেখা করার তীব্র নিষেধাজ্ঞা দেওয়া আছে। শুধুমাত্র সে, ঈশানের উকিল হিসেবে দেখা করতে পারবে।
বাংলা হিসেবে বর্ষাকাল চলছে। তবে গরমের পরিমাণ অনুযায়ী সেটা বোঝা দুষ্কর। ঢাকার এদিকে বৃষ্টির ছিটেফোঁটা অবধি নেই। আজকে রবিবার। কেসের ডেট ফেলা হয়েছে সামনে সোমবারে। এ কদিন জেলেই কাটাতে হবে ঈশান কে। দেওয়ান পরিবার শুরুতে এখানেই থাকার পরিকল্পনা করলেও, শেষমেশ সিলেট ফিরে যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাইসুল দেওয়ান আরও লোকজনের সাথে ক্রমাগত যোগাযোগ করে যাচ্ছে, অন্তত একটাবার ছেলের সাথে দেখা করার অনুমতির বিষয়টা নিয়ে। গোটা একটা ছন্নছাড়া, বিধ্বস্ত দিনের সমাপ্তি শেষে যখন রাতের আঁধার নেমেছে, তিতির রা ততক্ষণে ফিরে যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠে পরেছে। গোটা দিন শক্ত থাকলেও, এ বেলা চোখ মেলে তাকাতে পারছে না তিতির। তার পুরানো মাথার যন্ত্রনা আচমকাই আজকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ঈশানের সাথে একটাবার দেখা হবে, এই আশা সম্ভবত ছিলো তার। সেটা না হওয়ায় মানসিক চাপ, বেশ ভালোমতোই জেঁকে বসেছে তাকে।
রাত পেরিয়ে সকাল, সকাল পেরিয়ে আবার সাঁঝবেলা। প্রকৃতির নিয়মে চলছে সব। ঈদের দিন ঘনিয়ে আসছে। মানুষের ব্যাস্ততা বাড়ছে একই গতিতে। দেওয়ান বাড়ির আলো আজকাল জ্বলতে চায়না। বাড়ির ছেলের এরকম দুর্দিনে কোন সুখের খোঁজে ভালো থাকতে চাইবে তারা! ওরকম একটা আদুরে মূহুর্তের পর ঈশান যে এভাবে তার থেকে দূর হয়ে যাবে কল্পনাও করতে পারে না তিতির। সেদিন যূি জানতো এরকম হতে পারে, বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখতো না স্বামীকে? রাখতো তো। বসার ঘরে সবাই মিলে আলাপ আলোচনা চলছে ঈশানের কেসটা নিয়ে। কি থেকে আদতে কি ঘটলো, কোনো কিছুরই হিসেব মিলছে না তাদের। আর না তো সাজিদের সাথে এ কয়দিনে যোগাযোগ হয়েছে। সে-ও নিখোঁজ হয়েছে রীতিমতো। অনিমাও জানাতে পারছে না তার কোনো খোঁজখবর।
ধীরগতিতে চলছে সবকিছু, কাজে কর্মে মন নেই বাড়ির কারোর। কর্তারা অফিসের কাজেও মন দিতে পারছে না। বড় বড় এডভোকেটদের সাথেও যোগাযোগ করে কাজ হচ্ছে না কোনো। সদর দরজার কলিং বেজটা বাজতেই, গৃহকর্মী ছুটে গেলো দরজা খুলতে। ডাকপিয়ন এসেছে। রাহিয়ান দেওয়ান এগিয়ে গিয়ে খামখানা হাতে নিয়ে ভাইদের কাছে ফিরলেন। ঢাকা থেকে এসেছে। থানার ঠিকানা। বড় ভাইয়ের দিকে খামটা বাড়িয়ে ধরতেই, তিনি ডানে বায়ে মাথা না নাকচ করলেন। চশমা আনেননি। সুতরাং ভাইকেই পড়তে বললেন কাগজ খানা। তিতির আর নিশি পাশের ডায়নিং এ বসা। তিতিরকে জোর করে খেতে বসানো হয়েছে। মেয়েটা অবশ্য সেই থেকে নাড়াচাড়া করে যাচ্ছে খাবার থালায়। তবে থানা থেকে চিঠি এসেছে শুনেই নড়েচড়ে বসলো। তিন গিন্নি ও বেরিয়ে এসেছে রান্নাঘর থেকে। রাহেলা শক্ত মুখেই তাকিয়ে রইলেন, চিঠির দিকে।
খচখচ শব্দে কয়েকটা কাগজ বের করে আনলেন খাম থেকে। চোখের চশমা খানা ঠেলে দিয়ে মন দিলেন কাগজের লেখায়। থমকালেন তিনি। কেমন একটা মলিন, অসহায় মুখে তাকালেন ভাইয়ের দিকে। রাইসুল দেওয়ান ভ্রু উঁচিয়ে শুধালো,
—’ পড়তে গিয়ে থেমে গেলি কেনো? কিসের কথা লিখেছে? কিসের কাগজ এগুলো!’
রাসেদ দেওয়ান পাশেই বসা ছিলো। ছোট ভাইয়ের হাত থেকে কাগজ খানা নিয়ে নিজে চোখ বুলাতেও একই রকম অভিব্যাক্তি ফুটে উঠলো,তার চোখেমুখে। বিরবির করে বললো,
—’ ঈশান আমাদের সাথে দেখা করবে না জানিয়েছে। ও চাচ্ছিলো না বলেই, আমাদের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ‘
ওদিক থেকে ফ্যাকাসে মুখ নিয়ে অপলক তাকিয়ে আছে তিতির। থানা, পুলিশের কথা শুনলেই মেয়েটার চোখমুখ আজকাল অন্য রকম দেখায়। রাহেলা এগিয়ে এলেন এদিকটায়। শান্ত গলায় বললেন,
—’ আর? আর কি লিখে পাঠিয়েছে মিথ্যাবাদি গুলো?’
রাসেদ দেওয়ান এর হাতে আরও কয়েকটা কাগজ। ঝুঁকে এলেন সেদিকটায়। তবে চোখের সমস্যার হেতুতে সে-ও স্পষ্ট বুঝতে পারলো না। রাসেদ খানিকটা সময় ইতস্তত করতেই, বড় ভাইয়ের ধমক খেলেন। মস্তিষ্ক ঝুঁকিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
—’ মিতু নামে একটি মেয়ে আজকে ঈশানের নামে মামলা করেছে। দিনের পর দিন আটকে রেখে নির্যা তন এর অভিযোগ তুলেছে। আর…’
হতভম্বতা নিয়েও ধমকে উঠলেন রাইসুল সাহেব। কথাটা শেষ না করেই বারংবার থেমে যাওয়ায় বিরক্ত হচ্ছেবন তিনি। রাসেদ সাহেব মুখ তুলে ভাগিনী কে খেয়াল করলেন। ভাতের প্লেটে হাত রেখে, মেয়েটস পাথর হয়ে বসে আছে। অনূভুতি শূন্য দৃষ্টি তার দিকেই তাক করা। অসহায় দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন তিনি। চাপা গলায় কোনোমতে বললেন,
—’ আর মেয়েটা অন্তঃসত্ত্বা । মেয়েটার দাবি ঈশানের সন্তানের মা হতে যাচ্ছে সে।’
ক্ষনিকের জন্য গোটা বাড়ির মানুষ সম্ভবত শ্বাস নিতেও ভুলে গেলো। সেকেন্ডের মাথায় শুধু শোনা গেলো জোরে শ্বাস টানার শব্দ। তিতিরের দিকে আতঙ্কিত হয়ে ফিরলো সবাই। রাহেলা দৌড়ে গিয়ে আগলে নিলেন পুত্রবধূকে। হাহাকার করে উঠলেন, ব্যাস্ত গলায়। কর্তারাও ছুটে গিয়েছে সেদিকে। নাক দিয়ে রক্তিম তরল গড়িয়ে পরতেই আর্তনাদ করে উঠলো নিশি।
—’ প্যানিক এটাক হচ্ছে, মা। ঘরে নিয়ে চলো ওকে। ওর আগের সেই সমস্যা টা! সর্বনাশ। ‘
নয়ন সিঁড়ির মাথাতেই ছিলো। নূরিও ছুটে এসেছে। সিঁড়ির মাথা থেকেই চিৎকার করে বললো,
—’ বড়পু, ইনজেকশন কিন্তু নেই বাড়িতে।’
নয়ন আর কিচ্ছু শোনার প্রয়োজন বোধ করলো না। না তো অপেক্ষা করলো। টেবিলের ওপর থেকে বাবার গাড়ির চাবি নিয়ে ছুটলো ওষুধগুলো নিয়ে আসতে। রাহিয়ান দেওয়ান সময় নষ্ট করলেন না, ঝট করে চেয়ার থেকে তুলে এনে শুয়িয়ে দিলেন সোফার ওপর। মেয়েটা শ্বাস তো নিতে পারছেই না, না তো নোজ ব্লিডং কমেছে।
*
গভীর হয়েছে রাত। বাইরে ভ্যাপসা গরম পরেছে। বৃষ্টির প্রয়োজন খুব করে। ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে এলাকায়। তিতিরের ঘর থেকে সবাই খানিক আগেই নিজেদের ঘরের দিকে গিয়েছে । এখন শুধু রাহেলা আর নিশি বসে আছে। রাহেলা তেল মালিশ করছে তার মাথায়। জ্বর এসেছে মেয়েটার। নয়ন ইনজেকশন নিয়ে আসার পর, তবেই শান্ত হয়েছে মেয়েটা। জ্ঞান ছিলো না অনেকটা সময়।
মাথায় বিলি কাটতে থাকা হাতটা আচমকা কম্পিত হাতে নিজের হাতের মুঠোয় নিলো তিতির। রাহেলা চমকে ওঠেন, খেয়াল করেননি তিতির এখনো জেগে।
তিতির হাতখানা বুকের মধ্যে চেপে ধরে ফুঁপিয়ে উঠলো। ভাঙা গলায় বললো,
—’ আমি কিন্তু তোমার ছেলেকে ভুল বুঝিনি, মামনী। তোমরা এটা ভাবছো না তো, আমি তাকে ভুল বুঝে এমন অসুস্থ হয়ে পরেছি। একদম তা নয় কিন্তু… ‘
রাহেলা গর্দান ঝুকিয়ে চুমু খেলেন মেয়েটার তপ্ত ললাটে। জ্বর ভীষন। চোখের কার্নিশ গড়িয়ে অনবরত পরছে তপ্ত নোনাজল। নিশি বিছানার পাশেই বসা। ওড়নায় মুখ চাপা দিলো সে-ও।
—’ আমি জানি তো, মা। তুই ভরসা করিস আমার ছেলেকে।’
—’ শুধু ভরসা নয়, মামনী। যতটা ভরসা আমি এই আমাকে করিনা। ততটা তোমার ছেলেকে করি। ধরে বেধে বিয়ে দিলেও, শুরুর দিন থেকে আমি তাকে মনেপ্রাণে গ্রহন করেছি। তাকে আত্মস্থ করে গেছি ক্রমাগত। ঘর করি তার, তার স্পর্শ মাখি। আমি তাকে এতটা ভুল চিনতে পারি না। অসম্ভব। আমার অবচেতন মনও সেই ইঙ্গিত একবারও দেয়নি। ‘
রাহেলা নিজেও কাঁদছে। কি হচ্ছে তার ছেলেমেয়ে দুটোর সাথে। ঈশান কেনোই বা দেখা করতে অস্বীকার করেছে। মেয়েটাকে কেনো কষ্ট দিচ্ছে!
—’ তাহলে? তাহলে এতো হতাশ হচ্ছিস কেনো? কিছু একটা ঘটছে, যেটা আমরা বুঝে উঠতে পারছি না। একটু সময় তো লাগবেই সব ঠিক হতে।’
—’ তোমার ছেলে কষ্ট পাচ্ছে তা, মামনী। এসব মিথ্যা ব্লেম কেনো! আমার জন্য সব হচ্ছে। সব আমার জন্য। আমি ওনাী জীবনে না আসলে…’
আর কথাগুলো বলতেই পারলো না মেয়েটা। শাশুড়ীর পেটে মুখ গুঁজে আর্তনাদ করে গেলো। মেয়েটার করুন চিৎকার, সামলাতে হিমশিম খেলেন তিনি। বুকে জড়িয়ে শান্তনা দিয়ে গেলেন অনবরত। ব্যাকুল হয়ে ডাকলেন খোদাকে।
ঘরজুড়ে মিষ্টি সুরে তেলওয়াতের সুমধুর ধ্বনি শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। নিশির নামাজ পরে গিয়ে তিতিরের বিছানাতেই শুয়েছে খানিক আগে। রাহেলা আর তিতির জায়নামাজে বসা এই মূহুর্তে।
একজন পুরুষের জীবনে সবথেকে গুরত্বপূর্ণ, তিন নারী। মা, বোন, বউ...খোদার কাছে মাথা ঝুকিয়ে তাহাজ্জুদে পরে আর্তনাদ করে যাচ্ছে, সেই পুরুষের জন্য। ঈশান যদি দেখতো এই দৃশ্য খানা। নিজেকে পৃথিবীর সবথেকে ভাগ্যবান পুরুষ মনে করতো কি? নিঃসন্দেহে করতো। অসুস্থ শরীরও টালমাটাল অবস্থা। সময় লাগছে দোয়া কালাম আউরাতেও। এই শরীর নিয়েও দীর্ঘ সময় ইবাদত করে যাচ্ছে মেয়েটা। জীবনের ভালো, মন্দ, এমন করুন পরিস্থিতিতে আর কে আছে, খোদা ছাড়া! কার কাছে সমাধান আছে? নেই, কারোর কাছে নেই।
মোনাজাত তুললো তিতির। চোখের পানি বাঁধ মানছে না তার। আচমকাই খুব শান্তি অনূভব করলো। সে যে সঠিক জায়গায় এসে ফরিয়াদ জানাচ্ছে, সেটা অনূভব করলো মনেপ্রাণে। একমনে খোদাকে ডেকে গেলো ব্যাকুল স্বরে।
—’ বাবা মা কে আমি মনে করার জন্য যেটুকু স্মৃতি দরকার হয়, সেটা আপনি আমাকে কখনো দেননি খোদা। মুখের বুলি শিখে তাদের ডাকা শিখেছি সবে, তখনই কেড়ে নিয়েছো তাদের। একটা পরিবার দিয়েছেন তারপর। এতোটা ভালোবাসা দিয়েছে এরা আমাকে, কখনো কোনো আক্ষেপ নিয়ে আপনার কাছে আসতে হয়নি আমার। আজীবন শুকরিয়া আদায় করে গিয়েছি। আজকে চাইবো আপনার কাছে। ফিরিয়ে দেবেন না, খোদা। আপনি ছাড়া আর কে আছে আমার? অন্তর্যামী আপনি। সহায় হন আমার। আমার স্বামী, আমার ভালোবাসা, ভরসা, আশ্রয়, আমার ইহকাল-পরকালের সঙ্গী। তাকে আপনি আমার থেকে আলাদা করবেন না । আমি আমার মৃ ত্যুর সময়টাও তার সাথে কাটাতে চাই। শেষ নিঃশ্বাস তার বুকে ত্যাগ করতে চাই। এইটুকুই চাওয়া আপনার কাছে। এই সুযোগ টা আমাকে দিন আপনি। আমার জীবনের যেটুকুন পূন্যে আছে, তার সবটুকুর বরকত দিয়ে আপনি ওনাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন। আমাকে একটা সংসার দিন ওনার সাথে। সম্মান, জীবন, মরণ সবের মালিক আপনি। সসম্মানে ওনাকে ফিরিয়ে আনুন। সব বিপদ, অন্ধকার সরিয়ে দিন আমাদের জীবন থেকে। আমি সন্তান চাই খোদা। আমার পরিপূর্ণ সংসার চাই। পরকালেও তার সঙ্গ চাই। আমাকে ফেরাবেন না খোদা। ফেরাবেন না। তাকে ছাড়া মৃ ত্যু কবুল খোদা, মৃ ত্যু কবুল। যদি বাঁচিয়ে রাখেন, তবে সসম্মানে, একান্ত তার করেই বাঁচিয়ে রাখবেন। দু'জনের রুহ থেকে শুরু করে সকল অস্তিত্ব, সবেতে যেনো একান্ত আমাদের দু'জনেরই হক থাকে। এইটুকুন ফরিয়াদ জানাচ্ছি, আপনার কাছে। রহম করুন। '
মেয়েটার তীব্র আর্তনাদ শুনলো নিশি আর রাহেলাও। চার দেয়ালের ভিতরে বারি খেয়ে যাচ্ছে সেই চিৎকার। একজন স্ত্রী তার স্বামীর জন্য ফরিয়াদ জানাচ্ছে খোদার কাছে। নিজের সবটুকু দিয়ে! ভাগ্য করে এমন একজন জীবন সঙ্গীনি পাওয়া যায়। ঈশান আরশাদ দেওয়ান নিঃসন্দেহে দুনিয়ার সবথেকে ভাগ্যবান পুরুষের একজন।
.
.
চলবে ইনশাআল্লাহ 🌼🥀
[🥀 ডিমোটিভেট করবেন না পাখি'রা, আমি আসলে একটু রাইটিং ব্লকে আছি। প্রচুর সময় লাগছে একটা পর্ব লিখতে। তাও মনমতো হচ্ছে না। আজকের পর্বটা আরও বড় করে, অনেক কিছু ক্লিয়ার করে দিতে চেয়েছিলাম। শব্দই খুঁজে পেলাম না। আপনারা রেসপন্স করবেন, গঠনমূলক কমেন্ট করবেন, কেমন? ]
* নূরির বিষয়টা নিয়ে আপনাদের কি ধারনা? স্বার্থপর আসলেও ও? নাকি অন্য ঘটনা?
* মিতু! ওর অংশটুকু পড়ে কিচ্ছুই কি টের পাচ্ছেন না? আগের পর্বগুলোর সাথে ২+২= ৪ করুন তো। মেলে কিছু?
* তিতির সামনেও ভরসা করবে? পারবে করতে? ঈশান কেনো যোগাযোগ করছে না? কেনো নিজেকে দূর্বল দেখাচ্ছে? কেনো ওদের ইশারায় সব হতে দিচ্ছে? গেস?
#সাঁঝের_মায়া ___ [ পর্ব ৬৪ ( শেষ অংশ) ]
#dure_dilshad_dua_দুর_এ_দিলশাদ্_দুআ
নিস্তব্ধতায় ঘেরা চারদিক। ভরা বর্ষাতেও বৃষ্টির দেখা নেই। খাঁ খাঁ করা রোদ্দুরে চোখ ঝলসে যাওয়ার উপক্রম। দেওয়ান বাড়ির মানুষদের নির্ঘুম দিন-রাত কাটে আজকাল। বাড়ির আলো নেভে না গোটা রাতেও। জেগেই কাটায় সবাই একপ্রকার। সামনে সোমবারে ঈশানের কেসটা কোর্টে ওঠার কথা। এদিকে গত পরশু থানা থেকে চিঠি এসেছে, ঈশান নাকি পরিবারের কারোর সাথেই দেখা করতে চায় না। রাইসুল দেওয়ান তার দুই ভাইকে নিয়ে আজকে সকাল সকাল বেড়িয়ে পরেছে ঢাকার উদ্দেশ্য। ঈশানের সাথে আরও একবার দেখা করার চেষ্টা করে, ওই মেয়েটার সন্ধান করবে। যে কি-না, ঈশানের নামে আরেক দফা মামলা ঠুকেছে।
দু'দিন হলো তিতিরের তীব্র জ্বর। প্যানিক অ্যাটাক হচ্ছিলো ঘনঘন। তীব্র মাথা যন্ত্রনায় কাবু হয়ে আছে মেয়েটা। সারারাত ছটফট করে গিয়েছে সেই যন্ত্রনায়। চোখ বুজেছে বেলা এগারো টার দিকে। মেয়েটাকে ঘুমাতে দেখে তবেই, ঘর ছেড়ে নিচে এসেছে দেওয়ান গিন্নি। নিশি আজকাল এ ঘরেই থাকে। এমন অবস্থায় মেয়েটাকে একা রাখা যাবে না মোটেই । সে-ও খানিক আগেই নিজের ঘরে এসেছে শাওয়ার নিতে। তিতির ঘুমাচ্ছে এই ফাঁকে আরকি। দুপুরের খাওয়াদাওয়া শেষে সবাই বোধহয় এখন নিজেদের ঘরেই। কর্তারা কেউ বাড়িতে নেই। ছেলেমেয়ে গুলোও এমন মানসিক অবস্থায় স্কুল, কলেজে যায়নি।
বদ্ধ দরজার এপাশে শ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে রইলো নয়ন। সেদিন মাতাল হয়ে যে কর্মকাণ্ড গুলো করেছে, সেগুলোর জন্য তিতিরের কাছে একটাবারও ক্ষমা অবধি চাইতে পারেনি। সে ভুলেও কখনো চায়নি, তিতির এই সত্যিটা জানতে পারুক। কিন্তু সেদিন কি থেকে কি হয়ে গেলো, আর সে এতবড় একটা ভুল করে ফেললো। তবে কেমন একটা সাহস করে, ভিতরে যেতে পারছে না সে। মেয়েটা জেগে আছে কি-না তাও জানে না। তাকে দেখে এই অবস্থায় কি ভাবে রিঅ্যাক্ট করবে সেটাও একটা কথা। তবে নিচু গলায় দু'বার ডেকেও যখন সাড়া পাওয়া গেলো না ভিতর থেকে, একপ্রকার দরজা ঠেলেই পা বাড়ালো ঘরের দিকে। তিতির ঘুমাচ্ছে। ঘরের জানালা গুলোও বন্ধ করে দেওয়া, পর্দাগুলো টেনে দেওয়া। দিনের আলো ঘরে প্রবেশ করতে পারছে না একফোঁটাও। কমফোর্টার একদম গলা অবধি টেনে রাখা। নয়ন বুঝলো ঘুমে আছে মেয়েটা৷ ইতস্তত করলো খানিকটা। একবার বেড়িয়েও যেতে চাইলো। পরক্ষণেই অজানা এক আকর্ষণে এগিয়ে গেলো ঘরের ভিতর। বিছানার পাশেই রাখা চেয়ারটাতে বসলো শব্দহীন। এসি,ফ্যান দু’টোই বন্ধ। কপালে হাত ছোঁয়াতেই জ্বরের তীব্রতা টের পেলো। অন্ধকার হয়ে এলো মুখটা। কমফোর্টার টা পাশ দিয়ে আরেকটু ভালো মতো টেনে দিয়ে নিজের কোলের ওপর হাত গুটিয়ে বসলো। ঘুমন্ত মুখটার দিকেও আজকে তাকাতে পারছে না। তীব্র অপরাধবোধ হচ্ছে তার। অপরাধি কন্ঠে বললো,
—’ ভালোবাসি তোকে। খুব ভালোবাসি। কিন্তু যেটা চাইনি সেটাই হয়ে গেলো,মণি। সেটাই করে বসলাম। যে কথাটা ঠিক সময়ে তোকে জানাতে পারিনি। কি করে সেটা সেদিন ওভাবে জানিয়ে দিলাম তোকে। তা-ও ওইরকম একটা বাজে ব্যবহার করে। তোকে একপ্রকার অপদস্ত করে…’
দীর্ঘশ্বাস ফেললো ছেলেটা। হাত ছুঁয়িয়ে দিলো মেয়েটার মাথায়। দু'বার হাত বুলিয়ে নরম গলায় বললো,
—’ তুই যখন প্রথম এই বাড়িতে এলি, তখন আমার সাত বছর বয়স। ভীষন ফুটবলের নেশা। বাড়ির বাগানে প্রতিবেশিদের সাথে একটা দিন মা খেলতে না দিলে, আমি কান্নাকাটি করে বাড়ি মাথায় তুলে ফেলতাম। অথচ তোকে বাড়িতে আনা মাত্র আমার সে নেশা ছুটে গেলো। রাতদিন মা, মামনী দের পিছু পিছু ঘুরতাম। তুই যেখানে আমিও সেখানে। সবাই বলতে শুরু করলো নয়নের মণি এটা। নয়ন চোখে হারায় মেয়েটাকে না দেখলে। কালের পরিক্রমায় মনের পরিবর্তন হলো। তুই বড় হতে থাকলি, তোকে এতো যত্ন দেখে আশেপাশের অনেকেই মা'কে বলতো তোর আমার বিয়ে দিতে। মা হেসে উড়িয়ে দিতো। কিন্তু আমার কিশোর মনে সেটা গেঁথে গেলো। তোকে অন্য নজরে দেখা শুরু করলাম। এখন তোর বয়স কত? বিশ পার হচ্ছে, তাই না? অথচ আমি তোর জন্য পাগল হয়ে বসে আছি তুই যখন সবে দশ। ভাবতে পারিস? দশটা বছর, মণি। কম লাগে খুব? অনেকটা সময়। ‘
মেয়েটার মাথার ওপর থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিলো সে। অপলক তাকিয়ে রইলো সেদিকে। মেয়েটা কি নিশ্চিন্তেই না ঘুমাচ্ছে। অথচ ঘুম ভাঙলেই ঈশানের জন্য মুখটা মলিন করে ঘুরবে। নয়ন ব্যাথাতুর হাসলো।
—’ বড় ভাইয়া আমাদের সব কাজিনদের থেকে বরাবরই আলাদা ছিলো। কারোর সাথেই সেরকম মিশতে পারতো না। যত বয়স বাড়লো, বড় বাবার সাথে তার দুরত্ব বাড়লো। পড়াশোনা, ক্যারিয়ার সব নিয়ে এতটা ব্যাস্ত হলো, এতোটা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেলো যে বাড়ির সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো সেই হাই স্কুল জীবন থেকেই। এর কারণ অবশ্য আমাদের পরিবারই। ভাইয়া বেস্ট স্টুডেন্ট ছিলো, বড় স্কুলে পড়তে হলে তখন বোর্ডিং এ থাকতে হতো। সেই যে দুরত্ব। আর মিটলো না। বাড়ি ফিরলেও খেয়াল করতাম, তোকে পছন্দ করতো না। সবার সাথে যেমন তেমন, তোর দিকে কখনো ফিরেও তাকাতে দেখতাম না। একদিন তো থাপ্পড় ও দিয়ে বসলো। তোর সেকি কান্না। মনে পরে? ‘
একপ্রকার শব্দ করেই হেসে ফেললো নয়ন। সেদিন রাইসুল দেওয়ান এর সাথে কিছু একটা নিয়ে ঝামেলা হয়েছিলো ঈশানের। তারপর বাইরে তিতির কি একটা করেছিলো, কি করেনি। সজোরে থাপ্পড় পরলো মেয়েটার গালে। মেয়েটা সে- কি কান্না। সেই দেখে ঈশানের আরও রাগ। সেদিনও নয়নই বুকে জড়িয়ে সরিয়ে এনেছিলো সেখান থেকে। কত আদর আহ্লাদ করে থামিয়েছিলো মেয়েটাকে।
নয়ন পুনরায় বললো,
—’ তোকে আমি ভালোবাসি, মণি। এ কথাটা ওইসময় কেনো বলার কথা মনে হয়নি। বল তো? হতে পারে নিজের প্রতি অতি আত্মবিশ্বাস। তুই যে আমারই হবি, আমারই থাকবি শেষ পর্যন্ত। এটাই ধারনা ছিলো আমার। কেনো হলি না বলতো? আমি তো তোকে কখনো বোনের নজরে দেখিইনি। তাহলে? দিদা, তোকে কেড়ে নিলো আমার কাছ থেকে। নিলো তো নিলো, সোজা বড় ভাইয়ার সাথে বিয়ে! যাকে সেই এতটুকুন থেকে আগলে রাখলাম, বিগত দশটা বছর– মনপ্রান উজার করে ভালোবেসে গেলাম। তাকে নিজের বড় ভাইয়ের বউ হিসেবে কিভাবে মানবো আমি? দশ বছরের ভালোবাসা, তিন মাসে ভোলা যায়? যায়? তুই-ই বল। কিভাবে সম্ভব। চোখের সামনে তুই বড় ভাইয়ার বউ হয়ে ঘুরে বেড়াস, তার জন্য কাঁদিস। তার আদরে মুড়িয়ে থাকিস। আমি কি দোষ করলাম। তুই কেনো আমার হলি না বলতো। ‘
পুরুষালি মশ্রিন গালে নোনাজল গড়িয়ে পরলো। দু'হাতে মুখ ডললো। কান্না আটকালো। শান্ত গলায় বলে গেলো,
—’ ভাইয়ার নামে এতবড় এলিগেশন, তারপরও বিন্দুমাত্র ভরসা হারালি না তুই। তার রুহ সঙ্গী তুই। এত বড় একটা কথা কত সহজে বলে দিলি। এই তিনমাসের বিয়েতে তাকে যদি এতটা চিনে ফেললি , আমাকে কেনো দশটা বছরে চিনলি না। কেনো আমার চোখ পড়তে পারলি না। কেনো পারলি না?
আমি তোকে ভালোবাসতাম,মণি। এখনো বাসি। আমার কি উপায় এখন। জবাব দে। '
আচমকা খট করে দরজাটা বন্ধ হতেই হতচকিত হলো ছেলেটা। বসা ছেড়ে একপ্রকার লাফিয়ে দাঁড়িয়ে পরলো। ঘুরে তাকাতেই দৃষ্টির মিলন ঘটলো আর একটা অশ্রুসজল আঁখিজোড়ায়। নয়ন বিরবির করে ডেকে উঠলো,
—’ তমা ! ‘
তমার হাতে একটা বিশাল টিফিন বাটি। এগিয়ে এসে সেটা তিতিরের মাথার কাছের টেবিলে রাখতে রাখতে চাপা গলায় শুধু বললো,
—’ প্রেমে পরে একা আমিই পাগল হয়ে যাইনি, নয়ন ভাই। আপনিও পাগল হয়ে গিয়েছেন। দিন দুপুরে এরকম ভাইয়ের ঘরে ঢুকে, ভাইয়ের ঘুমন্ত বউয়ের পাশে বসে অনর্গল নিষিদ্ধ সব বাক্য আউরিয়ে যাচ্ছেন। তাও আবার ঘরের দরজা এভাবে হাট করে খুলে রেখে! বাহ্। ‘
নয়ন সত্যিই চমকেছে মেয়েটাকে দেখে। কোন ঘোরে ছিলো সে। সত্যিই তো। সেদিন না-হয় নেশা করে এরকম পাগলামি করেছিলো। কিন্তু আজ? আজ কোন কারণে এরকম পাগলামি করে বসলো সে। সেদিন মা, আজকে তমা! তমার মুখটা অস্বাভাবিক শীতল। নয়ন চাপা গলায় শুধালো,
—’ কখন এসেছো তুমি? ‘
—’ আপনি যখন ঘরে ঢুকলেন,পিছনেই দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। ‘
নয়ন চটলো বেশ করে। ধমকে উঠলো তাকে।
—’ এটা কি ধরনের ব্যবহার, তমা? এতক্ষণ লুকিয়ে লুকিয়ে আমার কথা শুনে যাচ্ছিলে। ছিহ্।’
বাঁকা হাসলো তমা। বাঁকা গলাতেই বললো,
—’ ছিহ্ তো আমার বলা উচিত, নয়ন ভাই। তিতির এখন আর আপনার দশ বছরের সেই অব্যাক্ত ভালোবাসার রমনীটি নেই। সে এখন একজন বিবাহিত নারী। তাও কার সাথে? আপনার বড় ভাইয়ের সাথে। তার ঘুমের সুযোগ নিয়ে এই প্রেমানুভূতি গুলো ব্যাক্ত করে যাচ্ছেন? যা বিগত দশ বছরেও পারেননি? এখন এসব বলতে মরিয়া আপনি, যখন সে আপনার বড় ভাইয়ের সাথে সুখে,শান্তিতে ভালোবেসে সংসার করছে? ওকে এই মানসিক চাপ টা দেওয়া কি খুব দরকার ছিলো?’
—’ আমার বাড়ি এটা। তোমার কাছ থেকে জ্ঞান নিয়ে চলাফেরা করবো আমি? নাকি আমার বউ হয়ে এ বাড়িতে আসার নতুন কোনো মোক্ষম পরিকল্পনা এঁটেছো। যার কারণে এতো কনফিডেন্সের সাথে, গলা উঁচিয়ে কথা বলে যাচ্ছো?’
তমা স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে কিয়ৎক্ষন। নয়ন যখন এ ঘরে ঢোকে, সে-ও পিছনেই ছিলো। পিছু পিছু এসে ঘরে ঢুকবে, তার আগেই নয়নের এমন আবেগঘন কথাবার্তায় থমকে গিয়েছিলো তার পা জোড়া। তার ভালোবাসার মানুষটির, সেই লুকিয়ে রাখা ভালোবাসার নারীটি যে আসলে তিতির। এটা বুঝতে সময় লাগেনি তার মোটেও। তারপরও? এত বড় সত্যি টা মেনে নিতেই তো হিমশিম খাচ্ছিলো মেয়েটা। গলার শব্দ গুলো আঁটকে ছিলো একপ্রকার। ডাকতো আর কি! তমা নিজেকে ধাতস্থ করলো আবার। ঠোঁট কামড়ে শক্ত করলো মনকে। ঠান্ডা গলায় বললো,
—’ ভুল ভাবছেন, নয়ন ভাই। আমি সেরকম কিছুই ভেবে আসিনি। আর ভাবাভাবিরও জায়গা নেই কোনো।’
—’ মানে? ‘
—’ মানে খুব সহজ । আপনার সাথে আমার বোঝাপড়া ফুরালো, নয়ন ভাই। আপনি আমার বোনকে ভালোবাসেন, বছরের পর বছর ধরে বেসে এসেছেন। এতো গভীর একটা সত্যি জানার পর, আমার আর আপনাকে ভালোবাসা সাঁজেনা। ‘
—’ যাক বোধবুদ্ধি হলো অবশেষে।’
তমা মলিন হাসলো। নয়নের মুখপানে তাকিয়ে বললো,
—’ আপনি মানুষ হিসেবে নিজেকে যতটা পারফেক্ট মনে করেন, ততটা নন মোটেই। এমনকি ধারে কাছেও নন। তা কি জানেন? একটা মানুষ কে ভালোবাসেন, দশ বছরেও সেটা জানাতে পারেননি! হাস্যকর নয় কি? এখন অন্যদের দোষ দিচ্ছেন? বড় ভাইয়া, দিদা, আপনার মা এমনকি তিতিরকেও? কোন যুক্তিতে? তারা আপনার মনের ভিতরের লুকায়িত সত্য টা দৈবক্রমে জানতে পারেনি বলে? তিতির, বড় ভাইয়ার দৃষ্টি বোঝে, তখন আপনার টা বোঝেনি বলে?
ানিজের অপারগতা অন্যের ওপর চাপাবেন না। ভালো আপনি বেসেছেন, তিতির নয়। সুতরাং বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব ওর না। বলার দায়িত্ব টা আপনার ছিলো। কথায় কথায় নিজের দুঃখ কষ্টের জন্য, সামনের মানুষটার ওপর আঙুল তোলা খুব সহজ। ওরা বৈধ স্বামী স্ত্রী। ওপরওয়ালার রহমত আছে ওদের ওপর। ওদের সম্পর্কের ওপর। যা আপনি আমি টের পাবো না। যেই শব্দটা আপনি বিগত দশ বছরে বলতে পারেননি, বোঝাতে পারেননি– বড় ভাইয়া সেটা তিনমাসে বলেছে, পদে পদে বুঝিয়েছে। ভালোবাসা এমনি, নয়ন ভাই। আপনার যত্নে তিতির যেটা অনুধাবন করেনি, ভাইয়ার গম্ভীরতায় ও সেটা অনূভব করেছে। কারণ বড় ভাইয়া অনূভব করাতে চেয়েছে। যা আপনি চাননি।
মনে মনে ভালোবেসে চুপ করে থাকাটা পৌ রুষ্যত্ব নয়। দিদা যেদিন ওদের বিয়ের কথাটা বলেছিলো, সেদিন আপনি মুখ খুলতে পারতেন। এই মড়াকান্না গুলো সেদিন জায়গামতো কাঁদতে পারতেন। আপনি তা করেননি। সো কলড গুড বয় হয়ে ছিলেন। তাহলে আজকে কিসের আর্তনাদ? কেনো এতো অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলতে চাচ্ছেন মেয়েটাকে। কেনো এসব? ‘
নয়ন থমকে তাকিয়ে ছিলো এতক্ষণ। দম বন্ধ হয়ে আসছিলো একপ্রকার। তমার কবজি চেপে ধরলো সজোরে। দাঁতে দাঁত পিষে রাগ উগড়ে দিলো,
—’ ভালো, মন্দ এখন তুমি আমাকে শেখাবে?’
—’ একদম নয়। আমি কে শেখানোর। আপনি এমন এক জাতির মধ্যে পরেন, যাদের কখনো কিছু শেখানো যায়না। আপনি নিজেই সেরা। ‘
তমা ঝটকা টানে হাত ছাড়িয়ে নিলো। ছলছল করছে চোখের পানি। বাঁধ মানতে চাচ্ছে না।
—’ আমি আপনাকে ভালোবাসি। নিজের ব্যার্থতা থেকে অন্তত শিক্ষা পেয়ে হলেও, নতুন করে সবটা শুরু করার চেষ্টা করতে পারতেন। ভালোবাসা ভোলা সম্ভব নয় এতো সহজে, কিন্তু যেটা এখন পাপ সেটাকে পাপ মনে করে ভুলতে চাওয়া উচিত। আপনি সেটাও চাচ্ছেন না। চেষ্টাও করছেন না। উল্টো আরও পেঁচিয়ে ফেললেন সব। ‘
—’ তোমাকে আমি সহ্য করতে পারছি না তমা। চলে যাও প্লিজ। আমি যদি বলি আমার এই নতুন করে উন্মাদনার পিছনে তুমি। তাহলে কি বলবে?’
তমা অবাক হয়। ভ্রু উঁচিয়ে শুধায়,
—’ আমি? ‘
—’ তুমি। তুমি যদি নিজের ভালোবাসা ব্যাক্ত না করতে। আমাকে এতোটা প্রেশারাইজ না করতে, আমি কখনোই এতটা ডেস্পারেট হতাম না।’
শব্দ করে হেসে ফেললো তমা।
—’ নিজের দোষ অন্যের ওপর চাপানো একটা বাজে স্বভাব। আপনি যেটা পারেননি দশ বছরে। একই আক্ষেপ আমি আমার ওপর রাখবো কেনো? ভালোবাসা প্রকাশ করে দিতে হয়। আমিও দিয়েছি। সেটা গ্রহন করা বা না করার ওপর আমার জোরজবরদস্তি থাকতে পারে না। আপনি করেন নি। আমি চেষ্টা করেছি। আমার দিক থেকে আক্ষেপ, আফসোস থাকলো না। ‘
—’ তুমি প্লিজ চলে যাও, তমা।’
—’ চলেই তো যাবো। তবে একটা কথা বলুন তো।আমার প্রতি আপনার একটু একটু অনূভুতি জন্মাচ্ছে, তাইতো? আর সেই টা আপনি মানতে নারাজ। ’
চমকে তাকালো নয়ন। সজোরে মাথা নাড়লো ডানে বায়ে। ব্যাস্ত গলায় বললো,
—’ কক্ষনো না। সম্ভব নয়। এত বছরের ভালোবাসা, আমি এই তিনমাসে ভুলে যাবো! আমার ভালোবাসাকে এতোটা ঠুনকো লাগে?’
আরেকদফা হাসলো তমা। শান্ত গলায় বললো,
—’ নয়ন ভাই, আমি মনোবিজ্ঞানের ছাত্রী। আমি যদি বলি, এই বাক্যটাকে আপনি মনে গেঁথে নিয়েছেন। আপনার মস্তিষ্ক যতবার আপনাকে সামনে এগিয়ে যেতে বলবে, ততবার আপনি জোর করে নিজেকে এই এক বাক্য বোঝাবেন। আপনি ভবিষ্যৎ এও তাই করে যাবেন। মনের রোগ এটা আপনার। তবে এটা মানতে হবে। তিতিরকে ভুলতে হবে। যা সম্ভব নয়, তা আগলে বসে থাকলে ক্ষতি আপনারই। সুস্থ স্বাভাবিক জীবন নাতো আপনি কাটাতে পারবেন, না তো তিতির।’
তমা শব্দহীন চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসলো তিতিরের সিউরে। ঠান্ডা গলাতে বললো,
—’ চলে যান এখান থেকে। তিতির উঠে আপনাকে দেখলে ও বড্ড ইতস্তত বোধ করবে। মেয়েটার শরীর এমনিতেই ভালো না। আর শুনুন, ওদের দু'জন কে আলাদা করার কথা চিন্তাতেও আনবেন না। আমাকে আপনি ভালো না-ই বা বাসলেন, আমার এই শেষ আবদার টুকুন রাখবেন। আর ওদের মধ্যে আসবেন না। যেটা সঠিক সময়ে করতে পারেন নি, সেটা এই ভুল সময়ে এসে করবেন না। একই বাড়িতে থাকবেন আপনারা। আগামী দিনগুলোও। এতো ইতস্তততা নিয়ে কাটানো জটিল। তিতির মেয়ে, ওর দিকটা বুঝবেন আশা করি। ঈশান তিতিরকে শান্তিতে থাকতে দেবেন। ‘
*
—’ একটা মেয়ের ব্যবাস্থা করো, জর্ডান। জলদি। বিশ মিনিটের মাথায় একটা মেয়ে চাই আমার। ‘
জর্ডান হাইরোডের ওপর থমকে দাঁড় করালো গাড়িটা। সে ইয়াজ মির্জার এসিস্ট্যান্ট, ড্রাইভার যা-ই বলা হোক না কেনো। শুনশান এই পথের মাঝে মেয়ে কোথা থেকে জোগাড় করবে সে! ব্যাস্ত গলায় বললো,
—’ বস, হোটেলে ফিরতে আর ঘন্টাখানেক লাগবে। ওখানে ব্যাবস্থা করে দিতে বলছি। মেয়ে রেডি রাখতে বলছি। ‘
দাঁত কিড়মিড় করে উঠলো সে। দু'হাতে কপাল চেপে ধরলো। তীক্ষ্ণ কন্ঠে আদেশ ছুড়লো জলদি গাড়ি চালাতে। ঈশান আরশাদ দেওয়ান তার খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছে। মিতুকে দিয়ে থানায় মামলা করার পরও, কিছুতেই তিতিরের মন ঘুরিয়ে ফেলা যাচ্ছে না। আজকে সারাদিন নূরি কেও কলে পায়নি সে। মেয়েটা আজকাল বড্ড বেড়েছে। ভাইয়ের জানেরও পরোয়া করছে না। বাঁকা হাসলো ইয়াজ। ঈশানের বিরুদ্ধে যা প্রমাণ জোগাড় করার সবই করে ফেলেছে। এই জালের ফাঁক গলিয়ে বের হওয়া অসম্ভব একেবারে। সবথেকে বড় কথা ঈশান আরশাদ দেওয়ান নিজে থেকে কো অপারেট করে যাচ্ছে তার সাথে। হয় চূড়ান্ত বোকামি থেকে নয়তো বড়সড় কোনো জাল পাতছে সে। তবে পুলিশের নজরে ঈশানের এই পালিয়ে যাওয়াটাকে, চূড়ান্ত বোকামি হিসেবেই ধরে নিচ্ছে ইয়াজ মির্জা। কফিনের শেষ পেরেকটা পুঁততে আরেকটু সুবিধা হলো তার। ইয়াজ শার্টের বোতাম গুলো আলগা করলো। প্যান্টের বেল্টখানা ঢিলে করতে করতে বললো,
—’ ঈশান আরশাদ দেওয়ান যে সিলেট যায়নি, সে খবর পাক্কা?’
—’ পাক্কা, বস। যায়নি। ‘
—’ আমি যাবো আজ রাতে।’
চমকালো জর্ডান। ঠান্ডা গলায় বললো,
—’ কেনো?’
—’ ঈশান আরশাদের বুকে সুড়সুড়ি দিতে। ওর বউটাকে বুকে চেপে ধরতে । শরীরটা বড্ড ছটফট করছে, জর্ডান। বি ছানায় দরকার তিতির কে। অথচ নিতে হচ্ছে কাদের! এই যন্ত্রনা বোঝো? তারমধ্য এক ন ষ্টা তো আবার পে ট বাঁধিয়ে বসে আছে। রুষার পরিকল্পনা মাফিক চলতে গিয়ে সেটাও খালাস করতে পারছি না। ছ্যাহ্। একটা স্লা টের পেটে মির্জাদের সন্তান! মেয়েটা আস্ত একটা ফা কিং বি’চ! ‘
জর্ডান ব্যাস্ত হাতে জলদি ড্রাইভ করতে থাকে। ঘন্টার পথ আধঘন্টায় পৌছুবে, এমন ভাবসাব তার। ইয়াজ কয়েকটা ফোনকল সেরে নিলো। হোটেল রুমে মেয়ে রেডি রাখতে আদেশ ছুড়লো। ফোনটা পাশে ছুঁড়ে ফেলতে ফেলতে বললো,
—’ একজনে হবে না, জর্ডান। কয়েকটা রেডি রাখতে বল। রাতে আবার আমার পরী টার দর্শনে যাবো। ওকে দেখে হুট করে কন ট্রোল হারালে, বড্ড লোড পরে যাবে আমার তিতির পাখিটার ওপর। আজকের মতো নিজেকে শান্ত করে যাই ওর কাছে। ‘
*
বদ্ধ কামড়ায় মুখোমুখি বসা সাজিদ আর ঈশানের। ঈশানের পিছনের দিকটাতেই গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে অমিত। সে সরে যাবে নাকি এখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে, সেটা বুঝতে পারছে না। মুশকিল আশান করে দিলো ঈশানই। ঠান্ডা গলায় আদেশ ছুড়লো,
—’ অমিত, এসপি সাহেবের জন্য চা, কফির ব্যবাস্থা করো। ‘
অমিত ছুটে বেরিয়ে যেতেই ঈশান, সাজিদ কে উদ্দেশ্য করে বললো,
—’ সরি এসপি সাহেব। আপনার জন্য খারাপ লাগছে। আমাকে এরেস্ট করার সুযোগ আপনাকে দেওয়া হলো না। শুনলাম, আপনাকে নাকি অব্যহতি দেওয়া হয়েছে চাকরি থেকে। সো স্যাড, সো ব্যাড!’
গোটা ঘর থেকে কেমন একটা ভ্যাপসা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কেমন একটা পুরান আমলের একটা বাড়ি। যেমন বাইরে থেকে দেখতে, তেমন ভিতরের অবস্থা! সাজিদকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে চোখ বেঁধে। সদর দরজার কাছে এসে এক মূহুর্তের জন্য চোখ খোলা হয়েছিলো। বিগত কয়েকদিন হলো এখানেই আটকে রাখা হয়েছিলো। কে বা কারা এখানে আটকে রেখেছিলো আজ টের পাচ্ছে। এরা ঈশানের লোকজন। অবিশ্বাস্য সব কারবার। সাজিদ হালকা কন্ঠে বললো,
—’ তুই আপাদমস্তক একজন ফ্র'ড, ঈশান। এসব কি হচ্ছে? কে তুই? ‘
হাসলো ঈশান। হাতের পি স্তল খানা টেবিলে শব্দ করে রেখে প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে উচ্চস্বরে গেয়ে উঠলো,
—’ তুমি দেখছো তাকে, ভাবছো যাকে
সে আসল মানুষ নয়…’
—’ হেয়ালি নয়, ঈশান। সত্যি টা বল।’
—’ আমি গ্রেফতার হয়েছিলাম, জানিস?’
সাজিদ চমকালো। গ্রেফতার হয়েছিলো মানে! গম্ভীর গলায় শুধালো,
—’ তাহলে এখানে কিভাবে?’
—’ পালিয়ে। ‘
—’ তুই পাগল? যে এলিগেশনে এ রেস্ট হয়েছিলি, এমনিতেই সেটা থেকে বেঁচে ফেরা মুসকিল। তার ওপর আবার পালিয়েছিস মানে কি? কার আন্ডারে ছিলি তুই?’
—’ তাহমিদ… তাহমিদ কায়েস।’
—’ ওহ্ গড। ‘
—’ তোর বাড়ির মানুষ? ‘
—’ জানে। সব জানে।’
—’ কি জানে!’
—’ এই, যে আমি রে প কেসের আসামি। ‘
—’ হোয়াট দা হে ল, আর ইউ ডুয়িং, ঈশান? কি খেলা খেলছিস?’
—’ পাশা। ‘
সাজিদ এখন বাঁধন মুক্ত হয়ে বসা। ঝটপট উঠে এসে বন্ধুর পিছনে দাঁড়ালো। চিন্তিত কন্ঠে বললো,
—’ তুই আমাকেও সত্যিটা বলছিস না। এতদিন আমি পুলিশের লোক ছিলাম। আজ তো নেই। আজও কেনো বলছিস না। সবার থেকে লুকিয়ে আর কতদিন। সত্যিটা জানতে চাই আমি। ‘
সেই কথার জবাব তো ছেলেটা দিলোই না। উল্টো আরেকদফা হেঁয়ালির সুর টেনে বললো,
—’ সত্যি? বলি একটা সত্যি। পরশু সকালের মধ্যে, পুলিশ আমাকে এরেস্ট করবে। এবারে প্রপার এরেস্ট যাকে বলে আরকি। এক্কেবারে হাতে হাতকড়া পরিয়ে, কোমড়ে দড়ি বেঁধে, প্রেস মিডিয়া কে জানিয়ে। তবে…’
—’ তবে?’
ভ্রু জোড়া নাচিয়ে ঘুরে তাকালো ঈশান। টেবিল থেকে নিজের পিস্তল খানা হাতে তুলে নিয়ে কপালের এক কোনায় চুলকালো। বাঁকা গলায় বললো,
—’ তবে, তার আগে আরেকজন ভিকটিম হবে। আই মিন আমার নামের রে প কেসের ভিকটিম পাঁচ থেকে ছয়ে পৌছুবে। ‘
স্তম্ভিত হয়ে গেলো সাজিদ। কিছু বলতে যাবে, তার আগেই ঈশান বললো,
—’ তোকে কেনো বললাম বল তো? কারণ তুই তো আর পুলিশের লোক নেই। তাই।’
—’ কি যা তা বকছিস তুই। এলিগেশন গুলো সব মিথ্যা। আমি জানি।’
—’ তুই-ও তিতিরের মতো বোকা বোকা ডায়লগ দিয়ে যাচ্ছিস।’
—’ মানে? ‘
—’ মানে তিতিরও এসবই বলেছে, শুনলাম। এখনো এতো বিশ্বাস।’
—’ ঈশান, তুই একটা বদ্ধ উ ন্মাদ।’
—’ হু, পুলিশের ভাষায়-- হোমিসাইকাল ম্যানিয়াক। ‘
মাথার চুল খামচে ধরলে সাজিদ। বিরক্ত গলায় বললো,
—’ ছয় নাম্বার মা র্ডার টা? ‘
—’ পরশু নিউজে দেখে নিবি। ‘
—’ আমাকে এখানে রেখেছিস কেনো? ‘
—’ তোর বউকে বিধবা দেখতে চাই না তাই। ‘
সাজিদ বাঁকা হাসলো। টেবিলের সাথে হেলান দিতে দিতে বললো,
—’ নিজের বউয়ের জীবন নিয়ে খেলছিস কেনো তাহলে? ‘
—’ কি করবো? ‘
— তুই যদি ঠিক করেই থাকিস, এরকম এলোমেলো, অন্ধকারে জীবন কাটিয়ে দিবি, তাহলে মেয়েটাকে ডিভোর্স দিয়ে দে। আর বাড়ি ফিরিস না। ওর গতি তোর পরিবার করবে। এমনিতেও পরিবার ছেড়ে উধাও হতে তুই খুব ভালোই পারিস। একটা সুস্থ স্বাভাবিক জীবন কাটাতে না দিলে, সে বাঁধনে বেঁধে রেখে লাভ কি! ‘
বুঝদারের মতো মাথা ঝাকালো ঈশান। কপাল কুঁচকে, ভাবুক গলায় বললো,
—’ ডি ভোর্স লেটার আজ রাতের মধ্যে পৌছে যাওয়ার কথা তো। গিয়েছে কি-না, অমিতের থেকে শুনতে হবে।’
আরেকদফা হোঁচট খেলো সাজিদ। সে-তো বললো রাগের মাথায়, ছেলেটা এমন ভাবে উত্তর করলো, তাতে মনে তো হচ্ছে না, মজা করে বলেছে। সাজিদের অসহায় বোধ হচ্ছে রীতিমতো। খানিকক্ষণ বিনাবাক্য ব্যায়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রইলো। অতঃপর ঠান্ডা গলায় বললো,
—’ কাজ গুলো তুই-ই করছিস, ঈশান?’
—’ কোনো সন্দেহ আছে? ‘
—’ থাকা উচিত না? ‘
—’ না তো। পরশু সব জায়গার হেডলাইনেই তো দেখতে পারি। ‘
—’ তিতিরকে জড়ালি কেনো এসবে? ‘
—’ ইচ্ছে হয়েছিলো। ‘
—’ আর এখন? ‘
ঝুঁকে এলো ঈশান। সাজিদের কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বললো,
—’ ইচ্ছে টা অ্যাডিকশনে পরিনত হয়েছে।’
—’ তাহলে ছাড়ছিস কেনো? ঠকাচ্ছিস কেনো?’
—’ ছাড়বো কখন বললাম।’
—’ ডিভোর্স? ‘
—’ তাতে কি।’
সাজিদ দু'হাতে কলার চেপে ধরলো ঈশানের। সজোরে ধাক্কা দিয়ে দেয়ালে মেশালো। দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
—’ তুই আর ফিরবি না ওর জীবনে। ডিভোর্স দিয়ে, জাহা ন্নামে যা তুই। কিন্তু ফেরার ভুল আর করবি না। তুই গোটাটাই একটা ধোঁয়াশা। আর নিরীহ মেয়েটাকে সেখানে বিলীন করিস না।’
—’ ও ইতিমধ্যে আমাতে বিলীন। আমার কাছে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে। ‘
—’ হোক। তবুও, আর ফিরবি না।’
ঈশান শব্দ করে হাসলো। সাজিদ খেয়াল করলো, ছেলেটা যতবার হাসছে,ততবার পি স্তলের ডগায় কপালে ঠেকাচ্ছে। এতো হেঁয়ালিপনায় অসহ্য ঠেকছে তার কাছে। ঈশান সাজিদকে ইশারা করলো পাশের একটা ঘরের দিকে যেতে। সাজিদ না চাইতেও পা বাড়ালো। এক ধাক্কায় দরজাটা খুলতেই বাইরের ভ্যাপসা গন্ধ কাটিয়ে, তীব্র একটা পারফিউমের ঘ্রান নাকে ভেসে এসো। মেয়েলি পারফিউমের সুঘ্রান কি-না বুঝতে পারলো না । সাজিদ দু কদম এগিয়ে এসে ভিতরে তাকাতেই হত-বিহবল হলো। থমকে দাড়ালো, শ্বাস আটকে এলো। হা করে শ্বাস টেনে ঈশানের দিকে তাকাতেই, সে বাঁকা অথচ দৃঢ় কন্ঠে বললো,
—’ কাল সত্যিই কিছু একটা ঘটতে চলেছে এসপি সাহেব। এবং পরশুর নিউজ, মিডিয়ার হেডলাইন যে ঈশান আরশাদ দেওয়ান, সেটা বুঝতে পারলেন তো। হতেই হতো এটা। তাই না? ‘
চলবে ইনশাআল্লাহ 🥀
[ 🥀 তমা - নয়নের অংশ পড়ে কি বুঝলেন? তমা নিজের জায়গায় ঠিকঠাক?
ইয়াজ মির্জা? তিতিরের কাছে আসবে কিন্তু, কি ঘটাবে!🌝
আর ঈশান- সাজিদের অংশটা? আপনাদের দক্ষ পর্যবেক্ষন কি বলে, ঈশান কি বলছে, কি করতে চলেছে। ডিভোর্সের ব্যাপারটা! ছেলেটা এতো হেঁয়ালি করে ক্যান...🙇♀️]
🚫 রেসপন্স তো করেন না ঠিকমতো। রিঅ্যাক্ট,কমেন্টে আপনাদের খুঁজে পাওয়াই দায়। এতোগুলা ফলোয়ার, সবাই ঘুমায়🙇♀️ আজকে দিতে চাইলাম না একবার, পরে ভাবলাম দিয়েই দেই। রেসপন্স করেন, রেসপন্স করেন। না হলে আপনাদের ঈশান -তিতির রে কিন্তু রাগ করে পটল তুলিয়ে দিবো💅🔪