ফন্ট সাইজ:
থিম:
সাঁঝের মায়া

৭০তম পর্ব

লেখক: দুর এ দিলশাদ দুআ

#সাঁঝের_মায়া ___ [ পর্ব ৬৫ - (১ম অংশ) ]

#dure_dilshad_dua_দুর_দিলশাদ্_দুআ

—’ রেহনুমা আরশাদ তিতির এবং ঈশান আরশাদ দেওয়ানে ডিভোর্সের নোটিস এটা । ম্যাডাম, কাইন্ডলি যদি একটু চেক করে নিতেন । ‘

উকিল সাহেবের কথাগুলো যেনো মাথার ওপর দিয়ে গেলো সবার। আচমকা সাত-সকালে এসে এরকম ডি'ভোর্সের নোটিশ, মানে কি! ঈশানের কেসটা নিয়ে এমনিতেই বাড়ির সকলের নাজেহাল অবস্থা। এরমধ্যে একেরপর এক ঝটকা যেনো লেগেই যাচ্ছে। রাহেলা, উকিলের হাত থেকে কাগজটা নিলেন নিজের হাতে। চোখ বুলিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। স্পষ্ট লেখা আছে সব। সন্দেহর অবকাশ নেই কোনো। ঈশান- তিতিরের বিবাহবিচ্ছেদের নোটিশ। বাড়ির সবাই এখানেই উপস্থিত। ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসা। চন্দ্রা দেওয়ানও এসে উপস্থিত হয়েছেন। সোফায় তার কোলের ওপর মাথা রেখে তিতির শুয়ে ছিলো এতক্ষণ। ক'দিন হলোই মেয়েটার মনের ওপর দিয়ে যা যাচ্ছে! শরীর ভেঙে পরেছে একেবারে। উকিলের উচ্চারিত বাক্যখানা কানে আসতেই, চোখেমুখে রাজ্যের বিষ্ময় এনে উঠে বসেছে সে। দূর্বল গলাতেই ডাকলো শাশুড়ী কে।

—’ কিসের কাগজ, মামনী? নিয়ে এসো তো এদিকে। ‘

—’ আমি দেখছি। দাড়া, তেমন কিছু না।’

—’ আমি এখানেই বসা, মামনী। কানে কমও শুনি না। উনি যা বলেছেন, শুনেছি আমি। নিয়ে এসো কাগজখানা। হাতে দাও আমার৷। ‘

রাহেলার নড়াচড়া চোখে পরলো না। রাইসুল দেওয়ান'রা কেউ বাড়িতে নেই। ওনারা গতকালই ঢাকা গিয়েছেন। বাড়িতে পুরুষ বলতে নয়ন একাই আপাতত। সে-ও খাবার টেবিলেই বসা। তিতির এ বারে নিজেই কাঁপা পায়ে উঠে দাঁড়ালো। বিনাবাক্যে শাশুড়ীর হাত থেকে কাগজটা টেনে নিলো নিজের দিকে।৷ মাথা ভনভন করে উঠলো তার। পায়ের ভর ধরে রাখতে পারলো না। সোফায় বসে পরলো ধপ করে। স্পর্শ হরফে লেখা সবটা। নিচে কালো কালিতে সুন্দরমতো ঈশানের সাক্ষর। তিতির থমকে তাকিয়ে থাকে সেদিকটায়। কি হচ্ছে এসব। চোখ বুজে জোরে জোরে শ্বাস টেনে নিলো মেয়েটা। খুব করে চাইছে,এটা একটা দুঃস্বপ্ন হোক। চোখ খোলা মাত্র নিজেকে আবিষ্কার করুন ঈশানের বুকে, নয়তো ঈশানের মাথা চেপে ধরা থাকুক তার নিজের ছটফট করা বুকে। কিছু একটা হোক। তবে সে-সব কিছু হলো না। বাস্তবতায় এই নিষ্ঠুর রুপ সহ্য হচ্ছে না তার। নিজেকে শক্ত করে উকিলের দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বললো,

—’ এ-সব কি? ঈশান আরশাদ এই মূহুর্তে জে'লে। তার দ্বারা এখন এই আবেদন করা সম্ভব নয়। আমি নিজেও করিনি। আজকাল কোর্ট কি ঠিক করে দিচ্ছে নাকি, কার সাথে কে, কতদিন সংসার করবে? ‘

উকিল সাহেব শীতল গলায় বললেন,

— ‘ এটার আবেদন আজ-কাল তো করা হয়নি, ম্যাডাম। গত তারিখে ঈশান আরশাদ দেওয়ান এটার আবেদন করে আসে। গতকাল আমি ওনার সাথে দেখা করতে গেলে, আমাকে এটা নিয়ে আপনার কাছে আসতে বলে। ‘

তিতির রুখে দাঁড়ালো তৎক্ষনাৎ। দৃঢ় গলায় বললো,

—’ আমি বিশ্বাস করি না। ‘

—’ সেটা আপনাদের ব্যাক্তিগত বিষয়। আমার যতটুকু দায়িত্ব সেটা আমি পালন করবো। আর ঈশান আরশাদের একটা চিঠি আছে। আপনার জন্য। যদি…’

—’ এতক্ষণে বলছেন কেনো। কোথায় সেটা? ‘

তিতির বড্ড ব্যাকুল স্বরে শুধালাো কথাটা। উকিল সাহেব নিজের এট্যাসি হাতড়ে সাদা একটা খাম তিতিরের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন। থরথর করে হাত কাঁপছে মেয়েটার। কাগজখানার ভাজ খুললো সে। চিঠিতে তারিখটা চোখে পরলো সবার আগে। রঙিন কালিতে তারিখটা দেওয়া। তারিখটা দেখে বুকটা মুচড়ে উঠলো তার। এটা তো সেই তারিখ! ঈশান যেদিন সব ভুলে গভীরে টেনেছিলো তাকে, আর সে! স্বামীর কাছে সমর্পণ করেছিলো নিজেকে। বিলিয়ে দিয়েছিলো নিজের নারী'ত্ব। সেদিন লেখা চিঠিটা! তা কেনো হবে। ওই কটা দিন একসাথেই তো ছিলো তারা। সাত-পাঁচ ভাবার মাঝেই চিঠিতে নজর বুলালো সে। হাতের লেখাও পরিচিতই। যদিও ঈশানের হাতের লেখা খুব চোখ বুলিয়ে দেখার মতো ঘটনা এর আগে সেরকম ঘটেনি। তিতির নিজের ঝাপ্সা হয়ে আসা চোখটস হাতের উল্টো পিঠে ডলে নিলো, কাট হয়ে আসছে গলা। পানিতে গলা ভিজিয়ে নিতে পারলে বোধহয় শান্তি পেতো। তবে সে-সবেও মন নেই তার। থরথর করে কাঁপতে থাকা হাতেটা একপাশ থেকে নিশি আগলে ধরতেই, জোরে জোরে শ্বাস টেনে কাগজে দৃষ্টি তাক করলো। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা,

“ কাগজটা যেদিন হাতে পাবি, সেদিন সম্ভবত আমি সামনে থাকবনা। এবং থাকবনা বলেই লিখতে হচ্ছে। এরপর আমাদের আর কখনোই দেখা হবে না। আমি চাই না। কিছুটা খারাপ যে লাগছে না, সেটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তবে, বাস্তবতা ভিন্ন। কিছু কিছু মানুষের ওপর কখনো জোর চলে না, সেটা মানিস তো? তোর এতদিনে বুঝে যাওয়া উচিত আমিও তাই। ঈশান আরশাদ এর ওপর জোর খাটিয়ে কিছু করানো অসম্ভব। তবুও, জোর খেটেছে আমার ওপর। দিদার, মা'র, বাবা-র, আমাদের গোটা পরিবারের। কিসের কথা বলছি বুঝে গেছিস হয়তো। আমাদের বিয়ে টা! আমি না তো তোকে কখনো ভালোবেসেছি, না তো বাসবো। তোকে বিয়ের করার একটা বিশাল কারণ ছিলো আমার। ইয়াজ মির্জা অবধি পৌছানো। আরও যদি কারণ বলিস! তাহলে বলবো পরিবারের জোরাজোরি, তোর অহংকার সবকিছুর জন্যই। তোকে নত করার, একপ্রকার জেদ চেপে গিয়েছিলো আমার। তবে হ্যা, এটাও স্বীকার করবো– তোকে হয়তো গভীরে কাছে টানা আমার উচিত হয়নি। তোর সম্মানে আঘাত লাগছে হয়তো। বাট আই হ্যাভ নো রিগ্রেট ফর দ্যাট। বিয়ে করেছিলাম, সুতরাং আমাদের মধ্যে যা হয়েছে স্বাভাবিক। বিয়ে হয়, একসাথে থাকতে হয়, মন উঠে গেলে বিচ্ছেদ ও হয়। সেখানে তুই তো আমার মনে কখনো ছিলিই না। তুই এখন অভিযোগ করবি। করতে পারিস। তবে তোকে সে রাতে একপ্রকার জেদের বশেই কাছে টেনেছিলাম। আত্মসমর্পণ করিয়েছিলাম। আমাদের যাত্রা এ অবধিই ছিলো । লেটার পাঠিয়ে দিয়েছি, সই করে দিস। আমার সাথে দেখা করার চেষ্টা করিস না। আমি চাই না আমাদের আর দেখা হোক। গড ব্লেসড ইউ। '

এটার নিচেও গোটাগোটা ইংরেজি অক্ষরে ঈশানের সাক্ষর। তারিখ সব দেওয়া। নিরবধি ঝরতে থাকা কয়েকটা পানির ফোটা এসে ঠাঁই করো নিলো হিজিবিজি লেখা কাগজটার ওপরে। ওদিকে উকিল সাহেব আরও কিছু কথা লাগাতার আউরিয়ে যাচ্ছেন। ঈশান যে আর ফিরবে না, তিতিরের সাথে দেখা করতে চায়না, নিজের দোষ স্বীকার করেছে। হাবিজাবি আরও অনেক কিছু । তবে সে-সব কিছুই প্রায় আর তিতিরের কর্ণগোচর হচ্ছে না। বাড়ির মানুষের এতো উচ্চস্বরে কথা, আহাজারি কিছুই কানে শুনতে পাচ্ছে না সে। একহাতে ডিভোর্স লেটার অন্য হাতে ঈশানের লেখা চিঠিটা মুখের সামনে ধরে স্থির দৃষ্টিতে তাকালো। চোখ ঘোলা হয়ে এসেছে বারংবার। কান্নার তোড়ে লেখাগুলো আর চোখেই পরছে না। তিতিরের মাথায় শুধু ঘুরছে উকিল সাহেব আর এই চিঠির দু একটা লাইন। ঈশান তাকে কখনো ভালোবাসেনি! পরিবার জোর করে বিয়ে দেওয়ায় জেদের বসে এতদিন একসাথে ছিলো, দিদার জন্য অনবরত ভালোবাসার নাটক করে গিয়েছে! এমনকি তারা যে বৃষ্টিমুখর রাতে ঘ'নিষ্ঠ হয়েছে, তার পরের দিন তাকে জ্বরের ঘোরে ফেলে রেখে ঈশান আদতে ডি ভোর্স লেটার এর আবেদন করতে গিয়েছিলো। তিতির ধীরেসুস্থে সোফার ওপর বসলো। অপলক কাগজজোড়ার দিকে তাকিয়ে থেকে মনে মনে নিঃশব্দ আর্তনাদ করে উঠলো–

—’ রাতভর আমাকে আ'দর এঁকে, পরের দিনই ডি'ভোর্স লেটার বানিয়ে ফেললেন? শুধু দে'হের চাহিদায় কাছে এসেছিলেন? জোর করে বিয়েটা হয়েছিলো, সেই জেদে? ছিহ্, এতো ঘৃনা নিয়ে, অতোটা গভীরে কিভাবে ছুঁ'লেন আমায়? কি করে আমার এত বড় সর্বনাশ করলেন নিজের পৌ রষ্যত্ব ফলাতে। দিনের পর দিন, বি ছানায় নিয়েছেন । স্ত্রী হিসেবে তাহলে কখনো কাছে টানেননি আমাকে, রক্ষি'তা হিসেবে টেনেছেন। ‘

নিঃশব্দ আ'র্তনাদ গুলো কর্ণগোচর হলো না কারোরই। তবে ভিতরে ভিতরে মেয়েটা যে ঠিক কতটা ভেঙেচুরে গিয়েছে, এই কাগজগুলো হাতে নেওয়া মাত্র– তা বুঝতে বিন্দুমাত্র দেরি হওয়ার কথা নয় কারোরই। নিশি এগিয়ে গিয়ে উকিল সাহেবের সাথে কথা বলার ফাঁকে রাহেলা এগিয়ে এলেন শাশুড়ীর দিকে। হাঁটু ভেঙে তার সামনে বসো নিচু কন্ঠে বললেন,

—’ এরপরেও আমাকে শান্ত থাকতে বলবেন, মা? চুপ থাকতে বলবেন? এটা কি পে'টে ধরেছি আমি? ওর সব কৃতকর্মের ফল আজীবন অন্যরা ভোগ করবে কেনো? ‘

বৃদ্ধার মুখ বরফ শীতল। হাত দুখানা হুইল চেয়ারের চাকার ওপর শক্ত করে চেপে রাখা। শীডল গলাতে বললো,

—’ ছেলেকে অস্বীকার করবে তাহলে? ‘

—’ ওর বাবার মতো সেটা বলতে পারিনি বলেই তো, আজকে ওর জন্য আমার মেয়েটার চোখের পানি পরছে। ‘

—’ ঈশানের সাথে কথা হয়েছে তোমার? ‘

—’ এখনো অবধি নয়।’

—’ তাহলে আগেই হতাশ হচ্ছো কেনো? ‘

—’ কথা হয়নি বলেই তো হতাশ হচ্ছি। ওর সম্পর্কে একের পর এক, যা এলিগেশন সবাই দেখাচ্ছে। শুধু তিতির বলে সে-সব সহ্য করছে। আর কেউ করবে? করতো?’

—’ আমার নাতনি কে আমি চিনি,বউমা।’

—’ আর নাতিটাকে? ওকে কতটা?’

বৃদ্ধা অনুভূতিহীন দৃষ্টিতে তাকালো ছেলের বউয়ের দিকে। একনজর তিতিরকে দেখে,তারপর বললো,

—’ তিতির কে সামলাও গিয়ে। ‘

ঝরঝর করে কেঁদে যাচ্ছে তিতির। কাগজগুলো হাতের মুঠোতে চেপে চোখ বুঁজে আছে। গতদিনের দূর্বলতা এখনো কাটেনি। তার ওপর ধাক্কা তো কমছেই না। অসহায় দৃষ্টি আরেকদফা হাতের কাগজের ওপর দিতেই কিছু একটা নজরে আটকালো তিতিরের। চোখের ভুল কিংবা মনের ভুল, এসব ভাবাভাবির মধ্যেও থমকালো। অশ্রুসিক্ত চোখজোড়া জ্বলজ্বল করে উঠলো। দৃষ্টি বুলালো ঈশানের নামের সইয়ের ওপর। হুবহু এক হাতের লেখা, এক সাক্ষর, সে-সবে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু… সময় নিয়ে তাকিয়ে থেকে আচমকা বাঁকা হাসলো তিতির। ভালোমতো নজর বুলালো কাগজে। অতঃপর আচমকাই প্রশ্ন ছুড়লো উকিল সাহেব কে লক্ষ করে। শান্ত গলায় বললো,

—’ কাগজগুলো কি আজকেই সাক্ষর করে দিতে হবে? ‘

নিশির সাথে কথা বলছিলো লোকটা। তিতিরের দিকে এগিয়ে এসে বললো,

—’ ঈশান আরশাদ দেওয়ানের কেস যেদিন কোর্টে উঠবে, তার আগে জমা দিলেই হবে। ওইদিন কাগজটা কোর্টে শো করবো।’

—’ ঠিক আছে। আপনি আজকে আসুন। আমি যোগাযোগ করবো আপনার সাথে। সোমবারের আগেই। ‘

—’ সই করে কাগজটা পাঠিয়ে দিলেই হবে ম্যাডাম। আমার ঠিকানাটা…’

হাত উঁচিয়ে লোকটাকে থামিয়ে দিলো তিতির। শান্ত গলায় বললো,

—’ সই করবো তা কখন বললাম! সিদ্ধান্ত জানাবো বলেছি। আজকে আসুন। ‘

উকিল সাহেব কে একপ্রকার অপমান করেই বিদায় করে দেওয়া হলো। না তো তাকে বসতে বলা হলো, না তো সকালের নাস্তার আপ্যায়ন।

তবে তিতিরকে নিয়ে, বাকিরা হতভম্ব। কেউ কিছু বলার আগেই, তিতিরের মুখোমুখি হলো নয়ন। মুখ অন্ধকার করে,গম্ভীর গলাতে বলে উঠলো,

—’ এতো কিছুর পরও ভেবে দেখবো বলার মানে কি, মণি? ‘

তিতির সরু চোখে তাকালো। নিশি তেঁতো গলায় বলে উঠলো,

—’ এটা কি কথা ছোট ভাইয়া! ভেবে দেখার কিছু নেই?’

—’ নাহ। ভাইয়ার কাজকর্মগুলোর দায় কেনো তিতির নেবে। এসব কি হচ্ছে। ‘

রাহেলা গম্ভীর মুখে নয়নকে উদ্দেশ্য করে বললো,

—’ তোমাদের ভাইকে এইটুকু চিনেছো, নয়ন? ‘

নিজেকে সামলালো ছেলেটা। মুখের আদল নরম হলো।

—’ না, বড় মামনী। সেটা নয়। আগের সব ঠিক ছিলো। মানলাম, কিন্তু আজকে? ডি'ভোর্স লেটার? তাও তারিখ দেখেছো? আজকের তৈরি নয় কাগজটা। আরও আগের। এসব ভাই আগে থেকেই তৈরি করে রেখেছিলো। চিঠি তেও লিখেছে জোর করে বিয়েটা দেওয়ায়…’

তিতির মুখোমুখিই ছিলো। কথা শেষ করতে দিলো না। বাক্যমাঝেই আঁটকে দিলো ছেলেটাকে।

—’ নয়ন ভাই, ডি'ভোর্স লেটার টা আমার জন্য। আমাকে ভাবতে দেওয়া উচিত। নয় কি? ‘

—’ মণি, আমি তো…’

—’ আমার ভালো চান। তাই তো?’

—’ কোনো সন্দেহ আছে? ‘

—’ নাহ নেই। তবে শুনে রাখুন, আমার ভালো আপনার ভাইয়ের নামের সাথে লেখা আছে। ওনাকে ছেড়ে ভালো থাকা টা আমার আর হবে না। আগের বিষয় অন্য রকম। এখন হিসেব পাল্টেছে। বিয়ে ছেলেখেলা নয়। চাইলেই কবুল বললাম, চাইলেই বিচ্ছেদ। এমনটা হয় না। আমি এক পুরুষের স্পর্শে বিশ্বাসী। কঠিন ভাবে বিশ্বাসী। একবার নিজেকে যার কাছে বিলিয়েছি, সে বাদে আর কারোর কথা কল্পনাতেও আনা সম্ভব নয় আমার। ‘

—’ নারীঘটিত বিষয়টা?’

—’ আমি বিশ্বাস করি না। আর কতবার বলবো সেটা? ‘

—’ আজকের ডি'ভোর্স লেটার আর চিঠি? ‘

—’ আমার নজরে দেখলে, হয়তো চোখে পরতো অনেক কিছুই। আমার নজরে দেখেননি। তাই চোখেও পরেনি।’

নয়ন বিরক্ত হলো বোধহয়। কেমন একটা গম্ভীর কন্ঠে বললো,

—’ তোর নজর যে ভালোবাসায় অন্ধ হয়নি। তার কি মানে? ‘

বাঁকা হাসলো তিতির। হাতের কাগজটা ফাইলের মধ্যে গুঁজতে গুঁজতে বললো,

—’ আবেগে গা ভাসানোর মতো মেয়ে আমি কোনো যুগেই ছিলাম না, নয়ন ভাই। আমি আমার আদরের মানুষদের কাছে যেমন ন্যাকা,আহ্লাদী হতে পারি। সঠিক সময় মন শক্ত করে বিপদ সামলাতেও জানি। আর রইলো বাকি একটা ঠুনকো কাগজের কথা? এটা নিশ্চয় খোদার তরফ থেকে ওহি নয়…ওহি হলে না হয় চোখ বুজে বিশ্বাস করা যেতো, মানা যেতো। তা যেহেতু নয়। আর এই উকিলকে কি বিশ্বাস? আমি মানুষটার মুখোমুখি হতে পারলাম না এখনো, আর এই চিঠি দেখে ডি'ভোর্স লেটারে সই করে দেবো! আশ্চর্য চিন্তা আপনাদের!’

নয়ন আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তিতিরের এতো কঠিন রুপ সে কক্ষনো দেখেনি। বলাবাহুল্য বাড়ির সবারও একই অবস্থা। তিতির নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে রাহেলার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো,

—’ কাল আমরা ঢাকা যাবো, মামনী। ড্রাইভার আংকেল থাকলে আমি একাই যেতে পারবো। কিন্তু তাতে তোমার ছেলে রেগে যাবে। আমার সাথে কে যাবে, সঙ্গে চলো। ঘরে গেলাম আমি এখন। ‘

*

—’ ম্যাডাম ডিভোর্স লেটার পেয়েছে, স্যার। ‘

কথাটা বলা মাত্রই অমিত খেয়াল করলে, কথাটা না বললেও চলতো। ছোটখাটো কামড়ার গোটা একটা দেয়াল জুড়ে ছোট্ট ছোট্ট মনিটর সেট করা। বর্তমানে জুম করা রয়েছে ঈশান আরশাদের বেডরুমটা। ফাঁকা ঘর, ফ্যান চলছে শো শো করে।। ঈশান কাট কাট স্বরে জিজ্ঞেস করলো,

—’ সই করেছে? ‘

পুরাই অমূলক প্রশ্ন। ঈশান নিজেই দেখতে পারছে সই করেছে কি-না। উল্টো অমিতেরই জানার কথা নয় বিষয়টা। অমিত তবুও ক্ষেপাতে চাইলো না ঈশানকে। বিনয়ের সাথে জবাব দিলো,

—’ সেটা তো এখনো খবর পাইনি। আপনি কেনো যোগাযোগ করছেন না। ‘

ঈশান রকিং চেয়ারটায় গা এলিয়ে আরাম করে বসে। টেবিলের ওপর থেকে ‘ ট্রেজারার ‘ এর প্যাকেট থেকে বের করে একটি সিগারেট। ঠোঁটের কোনে গুঁজে অভ্যস্ত ভঙ্গিতে, লাইটার জ্বালায়। সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে নাকেমুখে ধোঁয়া তুলে বলে,

—’ ইউ নো দ্যা রিজন। সবসময় চাইলেই মানুষ সবকিছু করতে পারে না। দামি কিছু পেতে, সবসময় দামি কিছুই বাজি রাখতে হয়। ‘

অমিত ভ্রু কুচকালো ঈশানের হাতের সিগারেটটি দেখে। মিহি গলায় শুধালো,

—’ সিগারেট ধরলেন কেনো? বাদ দিয়েছিলেন,স্যার। ‘

ঈশান হাতের “ট্রেজারারের” দিকে একনজর দিয়ে মলিন হাসলো, তারপর মনিটরে তাদের শূন্য বেডরুমের দিকে দৃষ্টি তাক করে, কেমন একটা অসহায় কন্ঠে বললো,

—’ এই মূহুর্তে আমার, সিগারেটের রিপ্লেসমেন্ট নেই, অমিত ।কে বলতে পারে, আমি যে খেলায় নেমেছি, সামনেও থাকবে না হয়তো । তিতির ডিভোর্স লেটারে সই করে দিলে, মেয়েটা আমার থেকে চির বিদায় নেবে। কোনো কিছুর বিনিময়েও, সেই মেয়ে আর আমার হবে না। তাহলে, মায়া কাটাতে শিখতে হবে তো নাকি? ‘

অমিত হেসে উঠলো না চাইতেও। দেয়ালের মনিটরের দিকে আগ্রহভরা দৃষ্টি বুলিয়ে বললো,

—’ ডি'ভোর্স টা হবে, স্যার? ‘

—’ কাগজে না হলো, তোমার ম্যাডামের যে রাগ-জেদ। শেষে দেখা যাবে সে-ই আসল কাগজ পাঠিয়ে বসে থাকবে।’

—’ তা হবে কেনো। এই কাগজটা তো আর আপনি পাঠান নি। ম্যাডামও তো বিশ্বাস করেনি। তাহলে?’

—’ এটাই তো সমস্যা। কাজল কে ইয়াজ মির্জার হাত থেকে সেভ করে, বের করতে চাইলে কয়েকটা দিন গা ঢাকা তো দিতেই হতো আমার। তা না হলে এতো কিছু তো ঘটতেই দিতাম না আমি। '

—’ আপনার বাড়ির সবার নাম্বার যে ট্র্যাক করেছে ইয়াজ মির্জা, সেটা কোনোভাবে ম্যাডাম কে জানানো যায় না? আমি লোক পাঠিয়ে ব্যবাস্থা করি? ‘

মলিন হাসলো ঈশান। তার বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষের ফোন, ইন্টারনেট সব বহু আগে হ্যাক করে ফেলা হয়েছে। তার বেশ খাস একজনকে ইয়াজ মির্জা আটকে রেখেছে বিগত কয়েকদিন। মেয়েটার নাম কাজল। যে কি-না কোনো একদিন সাক্ষাৎ মৃ'ত্যুর মুখ থেকে বাঁচিয়ে এনেছিলো দেওয়ান সাহেব কে । ইয়াজ মির্জার মতো লোকের থেকে একটা মেয়েকে, রক্ষা করতে হলে এইটুকুন স্যাক্রিফাইস করতেই হতো ঈশান কে। নিজেকে দূর্বল প্রমান করতেই হতো প্রতিপক্ষের সামনে। নত হতেই হতো। এই কয়েক কদম না পিছিয়ে আসলে, সুযোগ মতো থাবা টা বসাবে কি করে? তাছাড়া এই মূহুর্তে আরও একটা জিনিস দরকার ছিলো। তিতিরের তাকে ভুল বোঝাটা। ইয়াজ মির্জা ধীরে ধীরে ডেস্পারেট হচ্ছে মূলত এই জেদেই। কোনো কিছুর বিনিময়েও সে তিতিরকে ঈশানের প্রতি অবিশ্বাস জন্মাতে পারছে না। ভুলটা একপ্রকার ঈশানেরও ছিলো। কোনোভাবে যদি টের পেতো ইয়াজ মির্জার এই চাল, তাহলে অবশ্যই তিতিরকে এ কিছুটা হলেও জানাতে পারতো। তবে এই মূহুর্তে সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাক করা দেওয়ান বাড়ির দিকে।

ঈশান গম্ভীর সুরে বললো,

—’ লোক পাঠাবে কেনো, অমিত? আমাকেই পাঠাও। বউ ছাড়া এতগুলো দিন। বুঝতে পারছো? সিগারেট কি সাধে ধরলাম? ‘

অমিত বিরবির করে বলে উঠলো,

—’ আমি কি করে বুঝবো এ যন্ত্রনা? আপনার কাজ করতে করতে তো এখনো বিয়েটাই করে উঠতে পারলাম না। ‘

—’ কিছু বললে? ‘

অমিত দাঁতে জিব কাটলো। ডানে বায়ে ঘাড় নাড়তে নাড়তে বললো,

—’ না তো, স্যার। কিচ্ছু বলিনি। ‘

ঈশান দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। হাতের সিগারেটটা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে লাগাতার। অমিত আহত চোখে সেদিকে তাকিয়ে রয়। এতো দামের সিগারেট, মানুষটা খাচ্ছেও না। অযথা পুড়িয়ে ছাঁই করার মানে হয়! অমিত একবুক সাহস করে বলে উঠলো,

—’ স্যার, ম্যাডাম যে মানুষ। কোনোভাবে যদি জানতে পারে, আপনি আবার সিগারেট ধরেছেন– তাহলে… ‘

ঈশান ভ্রু কুঁচকে, ঘাড় বাকিয়ে তাকাতেই মিয়িয়ে গেলো অমিত। কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বললো,

—’ না মানে কি বলুন তো। এমনিতেই এখন যা করছেন, সোজা ডি'ভোর্স লেটার পৌছে গিয়েছে। ম্যাডাম অবিশ্বাস না করলো, কিন্তু রাগ কতটা হয়েছে তার। ভাবতে পারেন? এর মধ্যে এতদিন পর যদি, চু'মু খেতে গিয়ে এতো কড়া সিগারেটের ঘ্রান পায়। জন্ডিস থেকে বিষয়টা সোজা ক্যান্সারে গিয়ে দাঁড়াবে। ‘

ঈশান বিরক্ত মুখে তাকায়। টেবিলের ওপর থেকে “ট্রেজারারের “ প্যাকেট টা অমিতের দিকে ছুঁড়ে দিতে দিতে বললো,

—’ এতো তেল মারছো কেনো? না-ও। সিগারেট টা চাই বললেই পারো। ‘

অমিত ক্যাচ ধরলো তৎক্ষণাৎ। এতো দামি সিগারেটের প্যাকেট আজকে প্রথম ছুঁতে পারলো। বিরবির করে বললো,

—’ তেল না স্যার। আপনি যে সিগারেট খান। এই কম্পানির ঝাড়ুদারের সমানও আমার বেতন না। আপনার হাতের ওই এক প্যাকেটের দাম যত, তা দিয়ে আমার তো গোটা জীবনের সিগারেট হয়ে যাবে।’

—’ শাট আপ। ‘

—’ ব্যাবস্থা করবো, স্যার? ‘

—’ কিসের? ‘

—’ আপনার আর ম্যাডামের দেখা করার। ‘

ঈশান মুখটা তেঁতো করে হাতের সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেললো। বিরক্ত গলায় বললো,

—’ কিভাবে? নিজের বাড়িতে জানালা গলিয়ে ঢুকবো? চোরের মতোন? ‘

অমিত দু কদম পিছিয়ে দাঁড়ালো। ঈশানের হাতের কাছে কোনো পি'স্তল বা কোনো অস্ত্র আছে কি-না, ঘাড় উচিয়ে সেটা পরখ করে বাঁকা গলায় বলে উঠলো,

—’ ক্ষতি কি, স্যার? গিয়ে যদি এহেম এহেম… মানে বা'সর টা করতে পারেন। চোর কেনো! ভিখিরি সেজে গেলেও তো আমি কোনো লস দেখি না। ‘

অমিত কথাটা বলেই হুড়মুড়িয়ে পিছিয়ে গেলো। হাতের সিগারেটের প্যাকেট টা পকেটে গুঁজলো। এরকম বেফাঁস কথা বলে ফেলায়, ঈশান কি আবার প্যাকেট টা কেড়ে নেবে নাকি! তবে সে-সব কিচ্ছু হলো না।।না তো ঈশান রাগলো, না তো কোনো চোটপাট করলো। উল্টো, অমিতকে অবাক করে দিয়ে বড্ড নরম হলো। শক্ত করে রাখা চোয়াল স্বাভাবিক করে বললো,

—’ ভুল বলোনি, অমিত। যাওয়া দরকার। এতদিন যেমন তেমন। আজকে বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছে। বউকে কাছে না পেলে শান্তি পাচ্ছি না। তার মধ্যে আরেকটা ভয় তো মনে ঢুকেই রইলো। রাগের মাথায় মেয়েটা কাগজে সই করে না ফেললে হয়। ‘

—’ স্যার, তাহলে ওটাই হোক। চলুন যাই। ভিখারি সেজে ঢুকবো। বলবো কয়েকদিনের অভুক্ত। আমি খেতে বসবো, ওদিক দিয়ে আপনি আপনার ঘরে যাবেন। বয়স্ক মানুষ সেজে যাবো যখন, খেতে তো ঘন্টাখানেক লাগবেই।

আপনার ঘন্টাখানেক এ হবে না, স্যার??? ‘

ঈশান বিরক্ত মুখে দাঁতে দাঁত পিষলো।।কি সব ছেলেমানুষী পরিকল্পনায় হ্যা হু করে যাচ্ছে। বিরস মুখে ধমকে উঠলো,

—’ এক ঘন্টায় তোমার মাথা হবে হবে, এতদিন পর যাবো। চু”মুতেই তো ঘন্টা পেরিয়ে যাবে! ‘

হা হয়ে এলো অমিতের মুখ। অবিবাহিত, চির ব্যাচেলর সে। চু'মুর সময় ঘন্টা খানেক! আশ্চর্য গলায় কিছু বলতে যাবে, তার আগেই ধমক লাগালো ঈশান। হাতের ইশারায় বেড়িয়ে যেতে বললো রুম থেকে। বউয়ের শোকে কি সব বলে যাচ্ছে! অমিত মুখ চেপে হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই, দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনের স্ক্রিনে চোখ রাখলো ঈশান। মেয়েটা সবে ঘরে এসে ঢুকলো। হাতের ফাইল খানা একপ্রকার ছুঁড়ে দিলো একদিকে। দু'হাতে মুখটা ঢেকে গা এলিয়ে দিলো বিছানায়। ঈশান ভীষন মন দিয়ে দেখে তার ব্যাক্তিগত নারীটিকে। এই কয়দিনে মেয়েটার ওপর দিয়ে যা যাচ্ছে! অমিত নেহাৎ ভুল কিছু বলেনি। খুব করে কাছে দরকার মেয়েটাকে। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা, বুকের এই আগুন টা নেভাতে ওই ক্রন্দনরত রমনীকে লাগবে তার। ঈশান উঠে এগিয়ে গেলো মনিটরের দিকে। হাত ছুঁয়িয়ে দিলো স্ক্রিনে। মুচকি হাসলো। ঝুঁকে গিয়ে ঠোঁট ছোঁয়ালো তিতিরের অবয়বের ওপর। আদুরে গলায় বললো,

---' খুব কষ্ট দিয়ে ফেললাম,তাই না? এতোটা ভালো কবে বেসে ফেললি, তিতির? আমি তো নিজেকে পৃথিবীর সবথেকে ভাগ্যবান পুরুষ বলতে শুরু করেছি। গোটা দুনিয়ার সামনে বুক ফুলিয়ে বলবো, আমার মতো স্ত্রী ভাগ্য আর ক'জনেরর আছে? পারলে দেখাক কেউ! একজন স্বামীর বিরুদ্ধে ধ'র্ষনের অভিযোগ, নারী নি'র্যাতনের অভিযোগ, অন্য নারীর গর্ভে সেই স্বামীর সন্তান। সব শুনেও, প্রমান সহ দেখেও একটা বর্ণ বিশ্বাস করলি না? আজকে ডি'ভোর্স লেটার টা তো মানতে পারতি। সেটা কেনো বিশ্বাস করলি না? আমাকে গোটাটা আত্মস্থ করে ফেলেছিস তুই? আমি আমাকে যতটা না চিনি, তার থেকে গভীরে তুই চিনেছিস, জেনেছিস। সারারাত নামাজে বসে ক্রমাগত আমার বিপদ কেটে যাওয়ার প্রার্থনা করে যাস। এতোটা ভাগ্য নিয়ে আমি দুনিয়াতে এসেছিলাম! খোদা আমার প্রতি এতোটা রহমত নাজিল করেছে! আমি এর প্রতিদান তোকে কি করে দেবো? ঠিক কতটা ভালোবাসা দিলে, তোর ভালোবাসা, বিশ্বাস, ভরসার মূল্য দিতে পারবো? হুম?'

চলবে ইনশাআল্লাহ 🥀

[ আজকের পর্বটা একটু ছোট। মানিয়ে নিন, আমার আসলে মন - শরীর কোনোটাই ভালো নেই। লিখে উঠতে পারি নি। বাকিটা এডিটও করতে পারিনি। রেসপন্স করুন, পরের পর্ব কাল ও দিতে পারি তাহলে]

আর কি বুঝলেন আজকের পর্ব পরে? তিতির কি টের পেলো? আর ঈশানের বিষয়টা? এখনে বলেন, এক ফোঁটাও ক্লিয়ার করি নি🔪

#সাঁঝের_মায়া ___ [ পর্ব ৬৫ ( শেষ অংশ) ]

#dure_dilshad_dua_দুর_এ_দিলশাদ্_দুআ

—’ আজকে আপনাকে ভীষন গভীর ভাবে কাছে পেতে ইচ্ছে হচ্ছে, ঈশান আরশাদ দেওয়ান। বু'কটা পুড়ছে বড্ড, কী করলে, কোথায় গেলে পাবো আপনাকে? আপনার স্পর্শকে অনূভব করতে? কে জবাব দেবে আমাকে? ‘

বদ্ধ কামড়ায় মেঝেতে হাঁটু মুড়ে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কথাগুলো আউরিয়ে যাচ্ছে তিতির। দিনের আলো নেভেনি এখনো, ভরা সন্ধ্যা যাকে বলে আরকি। সকালের ঘটনাটার পর তিতির গোটাটা দিন আর ঘর থেকে বের হয়নি। রাহেলা সহ বাড়ির প্রত্যেকেই ডেকে গিয়েছে কয়েকবার, তারও উত্তর করেনি মেয়েটা । একের পর সবার ডাকাডাকি থেমেছে খানিক আগেই। মেয়েটাকে একটু নিজের মতো থাকতে দেওয়াই উচিত। এইটুকু বয়সে আর কত মানসিক চাপ সহ্য করা যায়।

বাইরে নেড়ি কুকুরের দল, গলা চিড়ে ডাকাডাকি করে যাচ্ছে। বাগানের মালি সম্ভবত লাঠি তাড়া করেছে তাদের। দ্বিগুণ হয়েছে ঘেউ ঘেউ আউয়াজ। সারাদিন খাওয়া, গোসল না হাওয়ার হেতু তে মাথায় অসহ্য যন্ত্রনা করছে। আজকাল ওষুধেও যেনো কাজ হতে চায়না। দূর্বল শরীরের ওপর এতটা অনিয়ম, মোটেই স্বাভাবিক হচ্ছে না। তিতির চোখ মুছে ধীরেসুস্থে উঠে দাঁড়ালো। শূন্য ঘরে চোখ বুলালো। আজ সাতটা দিন হলো ঘরের মালিক, ঘরে নেই। তার ব্যবহৃত সবই নিজেদের জায়গাতেই আছে, শুধু নেই মানুষটা। তিতির চোখ বুজে জোরে জোরে শ্বাস টানে। ঈশানের ব্যাবহারের পারফিউমের ঘ্রান সর্বদা গোটা ঘরে ম ম করে। বিছানা, বালিশ, জামাকাপড় যেখানে স্পর্শ করবে, সবেতে ঈশান ঈশান ঘ্রান। বুকটা হু হু করে উঠলো তার। কিছু না বলে এ কেমন বিদায়! এ কেমন দুরত্ব! অবশ্য না বলে তো নয়! তিতিরের মনে পরলো ওইসময় ঈশান প্রায়সই এরকম উল্টোপাল্টা কথা বলতো, ছেড়ে যাওয়া, দুরত্ব তৈরি হওয়ার ভয় পেতো। কত আবেগঘন মূহুর্ত তৈরি হয়েছে তাদের মধ্য এ নিয়ে।

কাল ঢাকা যাবে সে। রাহেলা, নিশি আর তমা যাবে তার সাথে। বাড়ির কর্তারা সবাই ঢাকাতেই। এখনো ঈশানের সাথেও যোগাযোগ হয়নি আর না তো ওই মামলা করা মেয়েটার সাথে। তিতির কেনো যাওয়ার জেদ করছে আর গিয়ে কি-ই বা করবে জানা নেই তার। কিন্তু এতো ক্রোশ ক্রোশ দুরত্ব মোটেই বরদাস্ত হচ্ছে না তার। একই শহরে থাকলে তা-ও আলাদা একটা শান্তনা মিলবে। দেখা না হোক, স্পর্শ না থাকুক– একই শহরে আছে দুজন, এতটুকুই যথেষ্ট। অন্তত বুকের যন্ত্রনা একটু হলেও কমবে।

তিতির দু'হাতে মাথার এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে ফেললো। গোসল করা উচিত। চোখজোড়া বুজে আসছে মাইগ্রেনের ব্যাথায়। আলমারি খুলে কাপড় বের করতে গিয়েও নাকে এসে বারি খেলো তীব্র পুরুষালি ঘ্রান! তিতিরের শাড়িগুলোও বেশিরভাগই ঈশানের শার্টের ওপাশে রাখা। গোটা আলমিরা জুড়ে তার জিনিসপত্র গুলোই বেশি। একদম ঠেসে ঠেসে রাখা। হিসেব মতে তার নিজের পারফিউমের ঘ্রান পাওয়ার কথা। তা নয়! হচ্ছে পুরো উল্টো। ঈশান অবশ্য তার মতো একই কথা বলতো। সে তিতিরের ঘ্রান পেতো সবেতে! মলিন হেসে ফেললো তিতির। হাত বাড়িয়ে ঈশানের একখানা শার্ট টেনে চেপে ধরলো নিজের বুকে। নাকের কাছে নিয়ে মুখ ডুবালো সেথায়। নেশা ধরে যায় এই পুরুষটার ঘ্রানে। কতদিন ওই বুকে মুখ ডুবানো হয় না! কতদিন ওই অসভ্য পুরুষটাকে নিজের বুকে পিষে ধরা হয়না শরীর ছটফট করে ওঠে মেয়েটার। ঈশানের স্পর্শ পেতে রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিহরন জেগে ওঠে, উত্তাল হয় নারীসত্ত্বা।

আচমকাই শাড়ি পরতে শখ হলো বড্ড, হাত বাড়িয়ে একখানা কালো শাড়ি নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো বাথরুমের দিকে।

*

—’ স্যার, ইায়াজ মির্জা আজ রাতে সিলেটের দিকে রওনা দেবে। আমরা কি করবো? সাজিদ স্যারই বা কি করবে?’

অমিত চিন্তিত মুখে কথাগুলো বলতেই, চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো ঈশান। নিজের এই ব্যাক্তিগত কামড়া থেকে বের হয়ে বললো,

—’ কখন রওনা দেবে? ‘

—’ শেষ রাতে। ‘

—’ হঠাৎ! আমার খোঁজ পেলোই না এখনো, আমার বউয়ের দিকে ছুটছে? ‘

—’ ওর হয়তো সন্দেহ হচ্ছে আপনি সিলেটে? ‘

মাথা নাড়লো ঈশান, গম্ভীর সুরে বললো,

—’ তা হয় না। ও যেভাবে আমাদের গোটা এলাকা স্ক্যান করে রেখেছে, আমি ওখানে গেলে এক ঝটকায় জেনে যেতো। ও যাচ্ছে তিতিরের জন্য। ‘

—’ আমারও তাই মনে হয়। ‘

—’ গতরাতে ও কোথায় ছিলো? ‘

ঠোঁটে ঠোঁট পিষলো অমিত। ইতস্তত করলো যেনো। লোকটা তিতিরের টানে সিলেট যাচ্ছে, কথাটা বলেই ঈশান যেমন কঠিন করেছে মুখটা। এখনকার কথা শুনলে আরেক ধাপ উন্নতি হবে সে রাগের। অমিত ধীর গলায় বললো,

—’ হোটেল কন্টিনেন্টালে। ‘

কথাটা বলেই অমিত খুব করে চাইলো, কি কারণে ছিলো এটা যেনো ঈশান না শুধোয়। তবে সে চিন্তাতেও জল ঢাললো ছেলেটা। অন্যমন্ষ্ক ঈশান তৎক্ষনাৎ প্রশ্ন ছুড়ে দিলো,

—’ আবার কোন ঘট পাকাচ্ছিলো? জানো কিছু? ‘

—’ স্যার জানি। ‘

—’ কি করছিলো? ‘

—’ রাসলীলা। ‘

—’ হোয়্যাট! ‘ ভ্রু কুঁচকে তাকালো ঈশান।

অমিত ঠোঁট টিপে মিহি হেসে, বিরবির করে বললো,

—’ ফূ র্তি করছিলো, স্যার। মেয়েদের নিয়ে । ‘

—’ মেয়েদের! ‘ শব্দটা খানিকটা জোর দিয়েই বললো ঈশান। মুখে কেমন একটা সূক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে উঠলো হয়তো। অমিত বোধহয় খানিকটা হলেও ভরসা পেলো। মাথা ঝাঁকিয়ে বাঁকা গলায় বললো,

—’ চারজন মেয়ে সঙ্গে ছিলো, স্যার। ‘

নাক কুঁচকালো ঈশান। বিতৃষ্ণা মাখা গলায় বললো,

—’ ইশশশ, কম হয়ে গেলো না? ‘

অমিত হতভম্ব। এ লোক বলে কি! চারজন কম হয়ে গেলো? আশ্চর্য গলায় বললো,

—’ চারজন কম লাগে, স্যার? আমি যখন ভাবি একজনকেই কিভাবে সুখে রাখবো, আমার তো চিন্তায় ঘাম ছুটে যায়। ‘

—’ তুমি চিন্তা করছো একজনকে কিভাবে সুখে রাখবে। কিন্তু ইয়াজের কি তাই? ওই মেয়েগুলোকে সুখি করার দায় কি ওর? ইয়াজ মির্জা ওই চারজন কে সুখি করতে গিয়েছিলো কী? ও তো গিয়েছিলো নিজে সুখি হতে। হয়েছে, মিটে গেছে। ‘

যুক্তিসম্মত কথা! অমিত বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে দিয়ে হে হে করে হাসলো। আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

—’ আপনি জানলেন কী করে স্যার? ‘

—’ কমনসেন্স। ‘

—’ আমি বুঝলাম না কেনো তাহলে? ‘

—’ কারণ তোমার ওটা নেই। ‘

অমিত কথা বাড়ায় না, চুপসে দাঁড়িয়ে থাকে। ঈশানও আর অযথা আলাপে যায় না। গম্ভীর হয় মুখটা। শক্ত হয় চোয়াল। শান্ত গলায় আদেশ ছোড়ে,

—’ সাজিদ কে সিলেটের উদ্দেশ্য রওনা হতে বলে দাও। আর আমার বাড়ির চারিদিকে সিভিল ড্রেসে ওর ফোর্সের পাহারা বসিয়ে দিতে বলো, আগের থেকে দ্বিগুণ। নাঈম, নিয়াজ দু'জনকেই একই বিষয়ে সতর্ক করবে। অনিমা কে আমাদের বাড়ি চলে যেতে বলবে। তিতির যেনো কোনোভাবে কালকে ঢাকার দিকে রওনা না দেয়। কেমন? তিতির আমাকে অবিশ্বাস করবে না, সুতরাং ইয়াজ মির্জার এই পরিকল্পনা কাজে লাগবে না। ও ডেস্পারেট হয়ে পরিকল্পনা পরিবর্তন করবেই। ‘

সবেগে মাথা ঝাকালো ছেলেটা।

—’ আর আপনি? ‘

—’ কাজল আর মিতু দু'টো মেয়ের প্রতিই আমি কমবেশি কৃতজ্ঞ। ওদের ম'রতে দেখতে পারি না আমি। আজকেই শেষ হবে সবের। ইয়াজ মির্জা বের হওয়া মাত্র আমি ওদের আমার জিম্মায় নিয়ে আসবো। তুমি আর সাজিদ ওদিকটা সামলাতে পারবে তো? আজ রাতেই আমিও সিলেট যাবো। নো টেনশন।

—’ নিঃসন্দেহে পারবো, স্যার । ‘

—’ বেশ, কাল তাহলে ইয়াজ মির্জার বের হওয়ার অপেক্ষা করো।’

*

মাগরিবের ওয়াক্ত শেষ হয়ে গিয়েছে। মফস্বলের এদিকে রাস্তাঘাটের ভিড়ভাট্টা কমে এসেছে ধীরে ধীরে। কোরবানির হাট লাগে আজকাল প্রায়সই। পনেরো দিন বাদে ঈদ। দিনের বেলা একপ্রকার লোকে লোকারন্য হয়ে থাকে আশপাশটা। বৃষ্টির দেখা নেই বহুদিন হয়ে গেলো। খাঁ খাঁ করা রৌদ্রময় দিনগুলো পেরিয়ে যাচ্ছে এভাবেই। তিতির লম্বা সময় শাওয়ার নিয়ে যখন বের হলো, তখন গোটা ঘরও বেশ অন্ধকার। সন্ধে বাতি জ্বালা হয়নি তখনো। ওইসময় কাঁদতে কাঁদতে কোন ঘোরে শাড়িটা নিয়ে বাথরুমে ঢুকেছে, তার সাথে আর কিচ্ছু সঙ্গে নেয়নি। অগত্যা শুধু পাতলা শাড়িটাই শরীরে পেচিয়ে বের হয়েছে। দরজা লক করাই ছিলো, সুতরাং কেউ হুট হাট ঘরেও আসবে না।

ঈশান গভীর মন দিয়ে কিছু একটার ফাইল উলটাচ্ছিলো। বাঁ হাতের দু আঙুলের ফাঁকে সিগারেট গোঁজা। কপালে ভাজ পরে আছে ক'খানা। সামনের মনিটরের স্ক্রিন ঘুটঘুটে অন্ধকার। বাড়ির বাকিদিকের অংশগুলো আপাতত পজ করে রাখা। আচমকাই তার মনোযোগে বিঘ্ন ঘটলো, যখন চোখের সামনের স্ক্রিনটা আলোকিত হয়ে উঠলো। তাদের বেডরুমের আলোটা সবেই জ্বালা হয়েছে । স্বাভাবিক দৃষ্টিতে ঘাড় বাঁকিয়ে একপলক তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিতেই থমকালো। ফাইলের দিকে নজর রেখেই স্থির হয়ে রইলো কিয়ৎক্ষন। কি দেখলো সেটা মানসপটে আসতেই ঝট করে তাকালো আরেকদফা। হৃদপিন্ড বিট করতে ভুলে গেলো। হৃদ স্পন্দনের হিসেবের গড়মিল হয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ। আনেসথেশিয়ার মতো হাতের ধাক্কায় সরিয়ে ফেললো, টেবিলের ওপরের সব কাগজপত্র গুলো। যেগুলো কি-না দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে তপস্যা করে জোগাড় করা হয়েছিলো, সে-সব। সে-সবে নজর আটকালো না, আর তার।

তিতির ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ানো। কোমড়সম ভেজা চুল গুলো সফেদ তোয়ালেতে মোড়া। আয়নার দিকে ঝুঁকে মুখে কিছু একটা লাগাচ্ছে৷। আপাত দৃষ্টিতে স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু ঈশানের মরুভূমির ন্যায় খড়া পরে থাকা হৃদয়ে সেটা মোটেই স্বাভাবিক লাগলো না। মেয়েটা একটা কালো জরজেটের পাতলা শাড়ি গায়ে জড়িয়েছে। কিন্তু ওই এক শাড়ি বাদে আর কোনো বস্ত্র বা কিছুই চোখে পরলো না ঈশানের। উ' ন্মুক্ত পিঠের অংশ দেখা যাচ্ছে কো মড় পর্যন্ত। ঈশান শব্দ করে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালো। আঙুলে কপাল ঘড়লো। বাঁ হাতটা কোমড়ে রেখে,কপালে আঙুল চেপে অপলক তাকিয়ে রইলো সেদিকে। এটা কি ধরনের শাড়ি পরার স্টাইল। এভাবে কে শাড়ি পরে। আর সব কাপড় কোথায়!

তিতির ধীরেসুস্থে চুল খুললো। হেয়ার ড্রায়ারে সময় নিয়ে শুঁকিয়ে নিলো চুলগুলো । কোমড় সম কেশরাশি আলতো হাতে চিরুনি করে, ব্যাস্ত হলো সাজগোছে। দুমড়েমুচড়ে যাওয়া বুকটা শান্ত হচ্ছে না কিছু তেই। মোটা করে কাজল পরলো চোখে, কমলার কোয়ার মতো পাতলা ঠোঁ ট রাঙালো রক্তলাল লিপস্টিকে। হালকা-পাতলা অর্নামেন্ট, বাদ রাখলো না কোনো কিছুই। আচমকা বোধহয় খেয়াল হলো নিজের শরীরের দিকে তাকাতে। আলমারির দিকে ব্লা উজের খোঁজে যেতে গিয়েই থমকে বসে রইলো। খুলেই ফেলবে এখনই। কি দরকার এতো আয়োজনের। কে দেখবে আজকে তাকে! সর্বশেষ কপালে একখানা ছোট্ট কালো টিপ আঁটকে থমকে তাকিয়ে রইলো আয়নার দিকে। নিজের মুখপানে তাকাতেই মলিন হাসলো সে। কার জন্য সেজেছে সে! কার জন্য তার এই আয়োজন। যে কি-না একবার কিছু না বলে লুকিয়ে গিয়ে বসে আছে!

বেডসাইড টেবিলের ওপর থেকে ঈশানের ফটো ফ্রেম টা হাতে তুলে নিলো সে। হাত ছোঁয়াল সেটার ওপর। ঝুকে এসে ঠোঁট দাবিয়ে চুমু আঁকলো । সহসাই শব্দ করে কেঁদে ফেলল মেয়েটা। ঈশানের ছবিটা কপালে ঠেকিয়ে কান্নায় জড়িয়ে আসা কন্ঠে ব্যাকুল হয়ে বললো,

—’ কোথায় গেলেন আমাকে ছেড়ে ? আপনাকে ছেড়ে একমুহূর্ত থাকতে পারছি না তো আমি । আপনার ও-ই য ন্ত্রণাময় আ দর গুলোকে কঠিন ভাবে মিস করছি আমি। ভেঙেচুরে চাইছি আপনার স্প র্শ। আপনার সঙ্গ। বুকটা খা খা করছে। ফেটে যাচ্ছে। কোথায় আপনি। ঈশাআন…’

মেয়েটার কর্মকাণ্ড গুলো পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে দেখে যাচ্ছে ঈশান। হাতের পুড়ে ছাঁই হয়ে যাওয়া সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পায়ের কদম এগিয়ে নিয়ে গেলো মনিটরের দিকে। মেয়েটা তখনো কেঁদে যাচ্ছেই। এমন ব্যাকুল আর্তনাদ গুলো অশ্রুসিক্ত চোখে শুনে গেলো ছেলেটা।

তিতির উঠে গিয়ে গা এলিয়ে দিলো বিছানায়। পাশ থেকে হাতে তুলে নিলো ঈশানের সফেদ শার্টখানা। ছবি আর শার্টাখানা বুকে জড়িয়ে ক্রমাগত ঝরঝর করে কেঁদেই যাচ্ছে।

—’ এমনিতে তো কাছে আসতে উতলা হয়ে থাকেন। আজকে আসছেন না কেনো? সাজলাম কার জন্য? কাকে দেখাবো আপনি ছাড়া । ছটফট করছি আজকে। আর পারছি না আপনাকে দূরে সরিয়ে রাখতে। আসবেন না? আসবেন না আপনি? একবারের জন্যও বাঁধা দেবো না কিছুতে। যা চাইবেন, যেভাবে চাইবেন…শুধু আপনি কখনো এভাবে দূরে সরে থাকবেন না। কতদিন হলো আপনার শরীরের ওই ঘ্রানটা নিতে পারি না, স্পর্শ করতে পারি না।

আপনি মিথ্যাবাদি, আপনি বলেছিলেন দুনিয়ার সব কঠিন দিক আপনি সামলে নেবেব। আমাকে সে-সব কিচ্ছুর আঁচ লাগতে দেবেন না। সেরকম কিছু ঘটলে যেনো, আমি মুখ লুকাই আপনার বুকে। কই? কই আপনি? কোথায় রইলো আপনার দেওয়া কথা, আর কোথায় আপনি। কার বুকে মুখ লুকাবো? কার কাধে মাথা রাখবো। কে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে, শক্তপোক্ত বুকে মাথাটা চেপে ধরে বলবে–” তিতির আমি আছি তো। “ কোথায় চলে গেলেন ঈশান? ‘

দু'হাতে নিচের মাথার চুলগুলো একপ্রকার খামচে ধরলো ঈশান। তিতির একপ্রকার চিৎকার করে কেঁদে যাচ্ছে, চোখের সমানে হাত উঁচিয়ে ধরে আছে ঈশানের ছবিখানা। থরথর করে কেঁপে উঠলো ঈশানের ভারি শরীরটা। তিতির পাগলের মতো কেঁদে যাচ্ছে। তার ছবিকে ইঙ্গিত করে, তাকে উদ্দেশ্য করে বলে যাচ্ছে কথাগুলো, অথচ সে মেয়েটার অভিযোগ গুলো মিথ্যা করে দিয়ে, বুকে জড়িয়ে নিতে পারছে না। চু' মুর তোড়ে মেয়েটাকে ভরিয়ে দিতে পারছে না। ছটফট করে উঠলো ঈশানের বুকটা। র'ক্তক্ষরণ হচ্ছে বেশ করে। ঈশানের মনে হলো এর থেকে অসহায় মূহুর্ত আর হয় না। ভালোবাসার নারীটি তার সামনে, অথচ সে তাকে স্পর্শ করতে পারছে না। ওই যে, একদিনের সেই স্বপ্নের মতো। একই বিষয় ঘটছে তাদের সাথে।

তিতির আর্তনাদ করে গেলো আরও খানিকটা সময়। এতো এতো মানসিক চাপ, দূর্বলতা…বিরবির করতে করতে ঘুমিয়েও পরলো একটা সময়। পুরোটা সময় স্ক্রিনের সামনে পাথরের মতো বসে, অশ্রু ঝড়িয়ে গেলো তিতিরের অসভ্য, কঠিন পুরুষটি।

রাত বাড়ছে, তিতির ঘুমের ঘোরেই জায়গা করে নিয়েছে ভালোমতো শোয়ার। দরজায় একদফা ডেকে গিয়েছেন রাহেলা, নিশি। দু'বারই ঘুম জড়ানো কন্ঠে তাদের চলে যেতে বলেছে মেয়েটা। সেকেন্ড পেরিয়ে মিনিট, মিনিট পেরিয়ে ঘড়ির কাঁটা ঘুরে এসে ঠেকেছে ঘন্টায়। রাতের খাবারের জন্য অমিত ডাকতে আসার আগেই দরজা বন্ধ করে দিয়ে এসে বসেছে। তিতিরের ঘুমানোর অবস্থা বেশ নাজুক। সে কিছুতেই নিজে ব্যাতিত আর কাউকে স্ত্রীর এই মোহনীয় অবস্থা দেখতে দিতে রাজি নয়।

ঈশান একের পর এক সিগারেট পোড়াচ্ছে। সাত পাঁচ হিসেব করতে ব্যাস্ত তার মন। অমিত কে কয়েকবার হেলিকপ্টার খানা রেডি করতে বলেও করা হয়নি। মনকে দাবিয়ে রাখতে মরিয়া সে। একবার গিয়ে ছুঁয়ে কি দিয়ে আসবে তার বউটাকে? বুকটা শান্ত করে, মেয়েটার কপালে একটা ভেজা চুমু খেয়ে আসবে কি? কিন্তু এতো দিনের পরিকল্পনাটা জলে যেতে দিতে পারে না সে। কিন্তু মন মানছে না সে-সব।

খানিকক্ষণ চোখ বুজে রইলো ছেলেটা। কেমন অস্থির লাগছে, ঘন হচ্ছে শ্বাস প্রশ্বাস। উত্তাল সাগরের ঢেউ গুলো আছড়ে পরছে বুকের বাঁ পাশে। পর মূহুর্তেই মরুভূমির মধ্যে পথ হারানো তৃষ্ণার্ত পথিক মনে হচ্ছে নিজেকে। নিজের সাথে যুদ্ধ চললো কিছু সময়। তারপর সরু চোখে তাকাতেই ঘন হলো নিঃশ্বাস।

এলোমেলো হয়ে আছে তিতির, এলোমেলো তার পরনের শাড়ি, এলোমেলো গোটা বিছানা,গোটা ঘর। ঈশান হা করে শ্বাসকষ্টের রুগীর মতো শ্বাস টানে। ড্রাগ এডিক্টের মতো ড্রয়ার হাতড়ে সিগারেট বের করে আরেকটা। কাঁপা হাতে ধরায় সেটা। ঠোঁটে চেপে ধরে রাখা সি'গারেটে টান দেয় উ'ন্মাদের মতো। তিতির গো ঙাচ্ছে ঘুমের ঘোরে। এতক্ষণের হাসিহাসি মুখের আদল পাল্টে এখব কেমন চিন্তিত দেখাচ্ছে। নড়েচড়ে উঠছে বারবার। যতবার নড়ে উঠছে ততবারই একটু একটু করে এলোমেলো হচ্ছে পরনের কাপড়, এলোমেলো হচ্ছে ঈশান আরশাদ দেওয়ান।

আচমকাই ঘুমের ঘোরে সরে গেলো তার বু' কের ওপরের আঁচলটুকু। মখমলের মতো ফর্শা ত্ব' ক দৃশ্যমান হতেই, দীর্ঘ একটা শ্বাস টেনে এক টানে নিজের শার্টের বোতামগুলো খুলে ফেললো ছেলেটা, চোখবুঁজে গা এলিয়ে দিলো রকিং চেয়ারে...

তিতির ঘুমের মনেই ঈশানের ছবি আর শার্টখানা নিজের বু কের ভা' জে চেপে ধরতেই, এপাশ থেকে অসহায় আর্তনাদ করে উঠলো বেচারা।

---' মা'রবি আমাকে, তিতির? মে" রে ফেলতে চাস? এমনিতেই এই তোকে কষ্ট দেওয়ার অপরাধবোধে ম'রছি প্রতিনিয়ত। এই দুরত্ব, এই দহন, তোর চোখের পানি, জ্বা'লিয়ে, পু'ড়িয়ে মা' রছে আমাকে ।'

তিতির ঘুমের ঘোরেই কেমন ফুঁপিয়ে উঠলো, হাসফাস করলো, সম্ভবত দুঃস্বপ্ন দেখছে। দু'হাতে ঈশানের জিনিসগুলো আঁকড়ে ধরলো, আরও এলোমেলো হলো মেয়েটা। শাড়ি পুরোটা এলোমেলো হয়ে। ঈশান ঘামছে, দরদর করে ঘামছে...

---' শাড়ি পরে আমার জন্য শোক মানাতে হবে? আশ্চর্য! আমার কথা মনে পরলো আর ওমনি শাড়ি পরে নিলি? আমার কথা মনে পরলে শাড়ি পরবি কেনো? আমি কি শাড়ি পরাই? খু লি আমি...তাহলে? হয় একেবারে খুলে ফেল, নয়তো ঢেকে ঢুকে ঘুমা । সি ডিউস করে ঘাম ঝড়িয়ে দিলো ‘

এবার বোধহয় স্বপ্নের ভয়াবহতা বেশিই হয়েছে। তিতিরপাশ ঘুরে শুতে গিয়ে বাকি অঘটন টুকুও সযত্নে ঘটিয়ে ফেললো। ঈশান আরেকদফা হা করে শ্বাস টেবে,কোমড়ের বেল্টখানা আলগা করতে করতে দাঁতে দাঁত পিষে বলে উঠলো,

—’ শি'ট ম্যান। ‘

*

ঘড়ির কাঁটা বোধহয় এসে ঠেকেছে রাত আড়াইটায়। ঈশানের ঘরের দরজায় ঠকঠক করে থমকে দাঁড়িয়ে রইলো অমিত। একটা গুরত্বপূর্ণ তথ্য জানাতে এতোরাতে এসেছে সে। তবে, বাথরুম থেকে পানির শব্দ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে, সম্ভবত শাওয়ার নিচ্ছে ঈশান। তাড়াহুড়ো থাকায়, একপ্রকার গলা উঁচিয়েই ডাকলো ছেলেটা। পানির আওয়াজ বন্ধ হলো। ঈশান বের হলো আরও মিনিট দশেকের মাথায়। মনিটর খানা বন্ধ করে ডাকলো অমিতকে ভিতরো আসতে। অমিত ঢুকলো দ্রুত পায়ে। ভ্রু কুঁচকে শুধালো,

—’ এতো রাতে শাওয়ার নিলেন, স্যার? ‘

বিরক্ত হলো ঈশান। শরীর জ্বালাপোড়া করছে। বিছানায় ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললো,

—’ কি বলতে এসেছো সেটা বলো। আমি কখন শাওয়ার নেবো তা দিয়ে তোমার কাজ কি? ‘

অমিত চুপসে গেলো ধমক খেয়ে, ঈশানের চোখজোড়া অস্বাভাবিক লাল হয়ে আছে। দীর্ঘসময় পানিতে ভেজার ফল আরকি। সে-সব থাকুক, কাজের কথায়ই আসা যাক। অমিত নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,

—’ আপনার বন্ধুদের সবটা বুঝিয়ে দিয়েছি আমি। তিতির ম্যাডামের সাথে যোগাযোগ করারও ব্যাবস্থা করে ফেলেছে নাঈম। ‘

ঈশান তাকালো না। তবে মুখ দেখে স্প ষ্ট বোঝা গেলো গভীর মন দিয়েই শুনছে তার কথা। অমিত গলা খুকখুক করে বললো,

—’ আপনার আরেক বোন। তমা…’

ঈশান ভেবেছিলো তমার কথা। তবে ফোন ট্র্যাকের একই ব্যাপার তমার সাথেও হয়েছে কি-না নিশ্চিত ছিলো না সে। গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,

—’ ওর ফোন? ‘

—’ সেফ। ‘

তৎক্ষনাৎ উঠে বসলো ঈশান। টেবিলের ওপর থেকে নিজের হাতঘড়িটা নিয়ে সময় দেখলো। পোনে তিনটা বাজে। এতোরাতে মোটেই ফোন করা উচিত নয়। তবুও, সে-সব ভাবলে এখন চলবে কেনো। ঈশান ফোন ঘেটে তমার নাম্বার ডায়াল করতে করতে বললো,

—’ সাজিদ রওনা দিয়ে দিয়েছে? ‘

—’ হ্যা, তবে পৌঁছেছে কি-না আপডেট নেই। জানালেই, আমি আপনাকে জানাচ্ছি। ‘

—’ বেশ। শোনো অমিত, ভুলেও ভুল হওয়া যাবে না এবার। ইয়াজ মির্জা, রুষা আর তাহমিদ কায়েসের ওপর শকুনের দৃষ্টি তাক করে রাখবে। ওদের কর্মকাণ্ডের এক সেকেন্ড যেনো আমাদের জানার বাইরে না থাকে। ‘

—’ অবশ্যই স্যার।’

ঈশান ডায়াল করে ফেললো তমার নাম্বারে। ঘুমিয়েছেই হয়তো মেয়েটা। দু-দুবার ডায়াল হয়ে কেটে গেলো ফোনটা। মেয়েটা ঘুমিয়েছিলোই ঘন্টাখানেক আগে। তিনবারের বেলা বেশ বিরক্ত হয়ে উঠে বসলো। আননোন নাম্বার। রিসিভ করেই একটা ধমক দেওয়ার নিয়ত করে কানে ঠেকাতেই, এপাশ থেকে অতি সাবধানি একটা কন্ঠে ডেকে উঠলো ঈশান।

—’ তামু? ‘

তমা উত্তর করার আগেই থমকায়। শ্বাস আটকে আসে, বড় বড় হয়ে আসে চোখজোড়া। ঝড়ের গতিতে তাকায় স্ক্রিনের দিকে। নাহ, আন-নোনই। তবে ডাকটা অতি পরিচিত। যদিও বছরের পর বছর এ নামে তাকে ডাকে না কেউ। তবুও চিনতে দেরি হলো না। বিরবির করে বলে উঠলো,

—’ বড় ভাইয়া? ‘

—’হু, বিরক্ত করলাম? ‘

তমার কান্না পেয়ে গেলো। লাফিয়ে বিছানা থেকে উঠে ছুটে এসে দাঁড়ালো বারান্দায়। তার রুমের এপাশের বারান্দা থেকে দেওয়ান বাড়ির এপাশের তিতিরের রুমটা দেখতে পাওয়া যায়। ঘরের আলো জ্বেলে রাখা এখনো। তমা কান্নামাখা গলায় ডেকে উঠলো,

—’ বাড়ি এসেছো, ভাইয়া? ‘

—’ নাহ, আসিনি। ‘

—’ কোথায় তুমি? কেনো আসছো না? তিতির টা পা'গল হয়ে যাচ্ছে তো। কি সব হচ্ছে এদিকটায়। জানো তুমি? ‘

বোনের আ র্তনাদে মৃদু হাসলো ঈশান। তাকে একদফা শান্তনা দিয়ে শান্ত গলায় বললো,

—’ আমি সব জানি। ‘

তমা ব্যাকুল হয়ে শুধায়,

—’ জে লে ফোন পেলে কোথায়? ‘

ঈশান বোঝে বাড়ির সবাই এখনো জানে না, সে আদৌ জে লে নেই।

—’ আমি জে লে থাকলে তবে তো। সে-সব বাদ। শোন আমি যা বলি। কাল নাকি তোরা ঢাকা আসছিস?’

—’ তিতির চাইছে। ‘

—’ আসবি না। ইভেন বাড়ি থেকে বের হবি না, তিতিরকেও আটকাবি। যা করে সম্ভব। ‘

তমা অসহায় হয়। আতঙ্কিত গলায় বলে,

—’ ওর জেদ জানো তুমি। ‘

—’ জানি। তবুও চেষ্টা করবি। তবে যদি একান্তই সম্ভব না হয়। ডাক্তার তো ওর ওপর মানসিক চাপ দিতে মানা করেছে, তাহলে বলবি আমি ভালো আছি। আমি ফিরবো জলদিই। এ কথাটা যেনো পাঁচকান না হয়। ‘

—’ ঠিক আছে, তা বলবো। কিন্তু। ‘

—’ কোনো কিন্তু না। যা বলছি সেটা মানবি। তিতিরকে ভুলেও বাড়ির বাইরে পা দিতে দিবি না মানে না। এটা অর্ডার। কাল গুরত্বপূর্ণ একটা দিন। বাইরে ভীষন বিপদ হবে। দুনিয়া তছনছ হোক, বা আমি ম রে যাই। বের হতে দিবি না, মানে না। মনে থাকবে? ‘

ঈশানের কথার ধরনে আতঙ্কিতই হলো মেয়েটা। তবে তৎক্ষনাৎ সায় মেলালো ভাইয়ের সাথে। ঈশান এসব নিয়ে ছোটখাটো আরও কিছু জানিয়ে রাখলো মেয়েটাকে। কোনোভাবেই কিছু যেনো আর একজন কাকপক্ষীও টের না পায় সবই বোঝালো সংক্ষিপ্ত ভাবে। ফোন কাটার আগে আচমকাই ডেকে উঠলো ভীষন গম্ভীর গলায়,

—’ তমা?

—’ জ্বী ভাইয়া? ‘

—’ আমি ম'রে গেলেও কালকে তিতির বা বাড়ির তোরা আমার কোনো বোন, বের হবি না। এটা কিন্তু আদেশ আমার? ‘

তমা কান্নামাখা গলায় বললো,

—’ এভাবে বলছো কেনো?’

—’ বোঝাতে চাচ্ছি আমার কথার গুরুত্ব। মনে থাকবে? ‘

—’ থাকবে। ‘

ঈশান ততক্ষণে আবার চালু করেছে মনিটর। তিতির ঘুমাচ্ছে একই ভঙ্গিতে। উ ন্মুক্ত বুকটা আড়াল করে আছে ঈশানেরই শার্ট। বাঁকা হাসলো ঈশান। তারপর তমা তে মনোযোগ দিয়ে বললো,

—’ আর একটা কথা। ‘

—’ বলো। ‘

ঈশান খানিকটা ইতস্ততই করলো বোধহয়। তারপর ভারি গলায় বললো,

—’ নয়নকে এতোটা ভালোবাসিস, এটা তো কখনো বুঝতে দিসনি। আমার বোনগুলো এতো বড় কবে থেকে হয়ে গেলো? এতো টা ম্যাচুয়র কথা কবে থেকে বলতে শিখলি। ‘

তমা হত-বিহবল হলো। ঈশান জানলো কি করে! তবে জিজ্ঞেস করার সময় পেলো না। তার আগেই ঈশান বললো,

—’ একটা মেয়ে হয়ে যতটা এগোনো যায়, এগিয়েছিস। আর না কিন্তু। আমি ফিরলে, বাকিটা আমি বুঝে নেবো। কেমন? ভালোবাসলেই মাথা নোয়াতে নেই। অপর পক্ষের মানুষের মনে কি আছে সেটা না জেনে বেহায়াও হতে নেই। ভালোবাসলে, ভালোবাসা টের পাওয়া যায়, তমা। নয়নের চোখেমুখে আমি সেটা দেখিনি। আশা করি তুইও টের পেয়েছিস সেটা। দু'টো মানুষের দিক থেকে সমান অনূভুতি না থাকলে, সম্পর্ক তৈরি করা খুব জটিল। ভালোবাসা মুখের কথা নয়। আর ভালোবাসাহীন একটা সম্পর্ক, একতরফা বয়ে বেড়ানোও মুখের কথা নয়। সময় দে, নিজেকেও, নয়নকেও। যতটা নিচু করেছে তোকে, আমার বিশ্বাস ততটা নিচু ওকেও হতে হবে। আমি করাবো। সেদিন যদি তোর মনে হয়, হ্যা পুনরায় নিজের মনে ঠাঁই দেওয়া যায়, সেদিন না-হয় দ্বিতীয় বার সুযোগ দিস। তবে সেটা যদি না হয়, ও যদি সেই অনুতপ্ত বোধ থেকে না আসে তোর কাছে, তবে কিন্তু নয়। আবার বলছি, ভালোবাসলেই মাথা নোয়াতে নেই, ভুল মানুষের কাছে তো আরও নয়…’

চলবে ইনশাআল্লাহ 🦋

[ ঈশান বাড়ি যাবে, ওয়েট ওয়েট! তমার সাথে আলাপে বুঝলেন না কিছুই? এতোদিন ধৈর্য ধরেছেন, আর এক দু পর্ব ধরেন না-হয়। কেমন? 🙂

আর ঈশানের কষ্টটা দেখলেন আজকে? বেচারা!😞]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন