সেই রাতের ঘটনার পর আর দেখা হয় নি আবেশের ঐ নারীর সাথে। সে তার স্বাভাবিক ছাত্রজীবনে চলছে। অনলাইন গেইম-বন্ধুবান্ধব-ভার্সিটি। তার আবার নতুন এক বন্ধু জুটেছে। মাহিম। বন্ধু বললে বোধহয় ভুল হবে। জুনিয়র। আবেশ নিজেই তো ফ্রেশার ভার্সিটির। ফ্রেশম্যান'র জুনিয়র অর্থাৎ কলেজে সেকেন্ড ইয়ার। মাহিম। যে এবার এইচএসসি দেবে।
ভার্সিটির স্বাভাবিক একটা দিন কেটেছে আবেশের। কিন্তু রাতটা একটু ঝামেলা হয়। রাতে, খেলা লীগ অব লেজেন্ডস্ এর টিম ফাইটে টানটান উত্তেজনা ছিল। আবেশের টিমের বিপরীত টিম'র স্কিল খুব ভালো ছিল। আবেশ খেলে মজা পেয়েছে। কিন্তু সমস্যা হয় ঐ টিম'র হেড এর সাথে। প্রথম দুটো রাউন্ড স্বাভাবিক ছিল যখন আবেশ হারছিল। আবেশের টিমে আবেশের সর্বোচ্চ র্যাংক– গোল্ড। আর ঐ টিম হেড'র প্লাটিনাম। উষ্কানো হচ্ছিল আবেশকে। স্বাভাবিক।
কেউ জন্ম থেকেই কিছু শিখে আসে না। তাকে পৃথিবীতে আসার পর তার চারপাশ পর্যবেক্ষন করতে হয়। যে যতটা ভালো পর্যবেক্ষন করে, তা থেকে নিজের মধ্যে প্রতিফলন করাতে পারবে, সেই টিকবে এই যুদ্ধে । আবেশ মানে এই নিয়ম।
আবেশ শুধু ডিকোড করেছে তাদের স্ট্র্যাটেজি, সাথে তার নিজের মাল-মশলা মিশিয়ে তাদের ফোর্সড ব্যাড ফাইট গুলো নিজের অ্যাডভানটেজে কাজে লাগিয়েছে; নিজের ম্যাক্রো স্ট্রং করেছে। আর পরপর জিতে গেছে রাউন্ডগুলো, ফলস্বরুপ গোল্ড থেকে প্লাটিনামে উত্তীর্ণ হয়ে যায় ঐ রাতেই।
তখনই কথাবার্তা অন্যদিকে যেতে থাকে খেলার মাঝখানেই যখন আবেশের টিম ২-৩ রাউন্ড পরপর জিততে থাকে। দেশ, জায়গা, জীবনধারন নিয়ে বিভিন্ন উষ্কানি ছোড়াছুড়ি করা হয় । একপর্যায়ে এইসব বেটিং এ গিয়ে থামে। বেটিং হয় ডিজাইনের ওপর। যে হারবে তার এতোদিনের একটু একটু করে গড়া পুরো এলওএল আইডি ডিলিট করা হবে। রাজি হয় দুই পক্ষই।
আর এর মাধ্যমে আবেশের ক্যারেক্টার ডিজাইন যাত্রার শুরু।
আবেশকে বলা ডিজাইন সে ঠিকি করে যা আজ রাতে শো করার কথা ছিল। টিম ফাইটের ঘটনা গতকাল রাতের। ঝামেলা করা হয় আজ রাতে, যখন আবেশর ডিজাইন থাকলেও ওপারের ডিজাইনের খোঁজ না থাকে। যেহেতু এটা ছিল অনলাইন বেট। তাই যদি কেউ শর্ত পূরন না করে ধরা বাধার কেউ নেই। কিন্তু আবেশের ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা। সে এসব নদী অনেক আগেই পার করেছে। যা-তা বলে, খেলায় গো মেরে, এখন বেট'এ যদি পার পেয়ে যাবে ভেবে থাকে আবেশের থেকে, তাহলে সেটা অত্যন্ত বাজে ভাবনা। আবেশ ঐ আইডি ট্র্যাক্ করে সূচারুভাবে, এলওএল এর অত্যাধিক নিরাপত্তায় পূর্ণ ফায়ারওয়াল ভাঙে। তারপর নিজে ঐ প্লাটিনামের আইডি ডিলেট করে আসে। সোজা কথায় হায়ার লেভেল হ্যাকিং!
এইসব ঘটনা শেষ হয় ভোর চারটায়। মুড'টাই নষ্ট। এখন সুইমিং করাটা জরুরি তার জন্য। তার একটা বিষয় ভালোলাগে না এই বিল্ডিং'র তা হলো সুইমিংপুল নেই। বাবাকে বলা যাবে না। আবার কোন জায়গায় মুভ করাবে ঠিক নেই। সে এই ভোর চারটায় তার অ্যানফিল্ড নিয়ে ছোটে বসুন্ধরা সিটি কমপ্লেক্স এর উদ্দেশ্যে।
এই সময় বসুন্ধরা সিটি বন্ধ থাকার কথা। কিন্তু বাপের টাকাওয়ালা ছেলের জন্য তা সমস্যা না। সে এই ভোরে বসুন্ধরা সিটির অলিম্পিক সাইজের পুলের পুরো পানি পরিবর্তন করায়, গরম না, কনকনে ঠান্ডা পানি দিয়ে। তারপর আরামে সুইমিং করে পনেরো বিশ মিনিট। এক পর্যায়ে পানির ওপর চিৎ হয়ে ভেসে থাকে। এভাবে থাকাটা শান্তি দেয়— ও্! ও্! পা! কারো পা!!- আবেশ পানির মধ্যে হুড়মুড়িয়ে ওঠে, কিছুটা পানি মুখে চলে যায়। সে ওই পা ধরে টান মারে— চিল্লায়ে উঠে। সাথেসাথে চিল্লায়ে উঠে পা'টা। মানে পায়ের দেহটা। এক ছেলে। টান দেওয়ায় পানির মধ্যে হাবুডুবু খেতে খেতে ভেসে ওঠে ,
" আরে! আরে! পা ধইরা টানতেছেন ক্যা?" মুখ দিয়ে বুদবুদের সাথে কথা আসে, "আপনাকে আগেই দেখেছি তো যখন ঢুকেছেন।"
আবেশ উঠে আসে। বিরবির করে, ভোর চারটায় ও শান্তি নাই।
পেছন থেকে আওয়াজ আসে, "আপনি অনেক ভালো সুইমিং করেএন। একটা রেস হয়ে যাক্।"
আবেশ থেমে দাড়ায়, ভ্রু উচু করে ঘাড় ঘুরায়, "পুঁচকের দম আছে তোও?? "
"২-৩ বছরের ছোট পুঁচকে হয় না, রেস করেন। বুঝা যাবে।" ছেলেটা এগিয়ে আসে পানির মধ্যে।
আবেশ আবার পানিতে নামে। দুজন স্টার্টিং পয়েন্টে আসে।
রেস স্টার্ট— ছেলেটা লিড নেয়। পানি দ্রুতবেগে সাতরে চলেছে। মাঝামাঝি চলে আসে। পরপরই অনুভব করে পাশেরজন ওকে ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছে— পা ধরে টান দেয়। আবেশের পা ছেলেটা পেছন থেকে ধরে টান দেয়। আবেশ এগোতে পারে না। আবেশও উল্টে ঘুরে যায়। সুইমিং রেখে দুইজনের পানির মধ্যে হাতাহাতি লেগে যায়। একপর্যায়ে আবেশ ঐ ছেলের গলায় শক্ত বাহুপেশী দিয়ে আটকে ধরে টানতে টানতে পুলের সাইডে নিয়ে আসে। ঐ ছেলের মুখে এবার হাওয়া ঢুকে, "শালা, ছাড়! ছাড় কইতাছি।"
পুঁচকের আস্পর্ধায় আবেশের হাতের বাধন শক্ত হয়,"উচ্চারণ কর, 'ভাই, ক্ষমা করেন ভুল হয়ে গেছে' "।
ছেলেটার দম আটকে আসছে, কোনো পথ নাই, সে
বলে , " শালা! ক্ষমার মাইরে বাপ!"
আবেশ থম মেরে যায় এক সেকেন্ড, এই ছেলের আজাইরা সাহসে। সুযোগ নেয় ছেলেটা। আবেশের মূহুর্তে সজোড়ে কনুই দিয়ে তেরছা লাগে পেটে। সড়ে আসতে বাধ্য হয় সে।
বয়সে ছোট আর শরীরে চিকনা হলে কি হবে উচ্চতায় তো সমান ছেলেটা। সে যায়ে আবেশের ঘাড় পেছন থেকে পেচিয়ে ধরে এক হাতের বাহুতে।
আর আবেশ আজবভাবে তা প্রতিরোধ করে— সুরসুরির দিয়ে। বিরক্তি নিয়ে বলে, "কি মামা? তোর তো দেখছি প্রচুর তেজ!"
ছেলেটা সুরসুরি তে ছিটকে সড়ে যায়, "তোর কম নাকি?"
"এহ্হে! আবার তুই তুকারি! এহ্ই, দেইখাই বুঝা যায়, তোর থেইকা দুই-তিন বছরের বড় আমি" আবেশের বিরক্তি চাঙ্গে উঠে গেছে।
কিন্তু মনে হয় না ছেলেটার চিন্তার কোনো পরিবর্তন হয়েছে। সে ভদ্রের মতো বলে, "তো কি হইছে? আর কেন যেন তুই'টাই তোর সাথে বেশী কম্ফোর্টেবল" ছেলেটা হঠাৎ কৌতুহলী হয়, "এইখানে এখন, কিভাবে তুই?"
"এমনেই।" আবেশ বাথরোব পড়ে হাটা ধরে। কানারে পথ দেখায়ে লাভ নাই। কিন্তু সেই কানা তার পিছু আর ছাড়ে না। আর ঐভাবেই কানার অর্থাৎ মাহিমের তুই তুকারি চলতে থাকে, যা আজও চলে আসছে।
আবেশের ভার্সিটির প্রথম ইয়ারটা সবই ঠিকঠাক ছিল, শুধু একদিক দিয়ে একটু আজব লাগে। তার কাছে মনে হতো কেউ তার ওপর নজর রাখছে, তার পিছু করছে। কিন্তু সে কখনো এর কোনো ধরনের কোনো প্রমাণ পায় নি। হাঁটতে হাঁটতে মনে হতো আশেপাশের কিছু মানুষ তার ওপর আজবভাবে তাকাচ্ছে। সে জিজ্ঞেসাবাদ করেও কিছু পায় নি। কারন যাদের তার সন্দেহ হতো, তারা যা বলতো তার সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকতো। যেমন একদিন, সে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় মনে হচ্ছিল এক চা'ওয়ালা বারবার তার দিকে চোরা চোখে তাকাচ্ছে। কিন্তু সে সরাসরি তাকানো অবস্থায় ধরতে পারে নি ঐ লোককে। আর ঐ চা'ওয়ালাকে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে। ঐ চা'ওয়ালা নাকি দুই দশকের কাছাকাছি ঐ একই জায়গায় চা বিক্রি করছে। সে আশেপাশে খোঁজও নিয়েছে। কথা সত্য। এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে তার সাথে । তার ভার্সিটি থেকে শুরু করে যাওয়া-আসার রাস্তা সব জায়গায়। একপর্যায়ে তো তার মনে হয় সাইকোলজিকাল কোনো প্রবলেম হয়ে গেল নাকি??
এমনিভাবে চলছিল তার ফার্স্ট ইয়ার। তখন বছর শেষের পর্যায়ে। মাহিম বলেছে কার রেসিং করবে। অনলাইন ভিডিও গেইম। সে বাসায় অপেক্ষা করছে। আবেশের বাসায়। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। আবেশ তার জন্য বরাদ্দকৃত জায়গায় বাইকটা পার্ক করে। এরপর লিফট এ উপরে উঠে আসে। সারাসরি ফ্ল্যাটের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে।
মাহিমের লিভিং রুমে সোফায় থাকার কথা ছিল। কোথায় গেছে? আবেশ ডাইনিং এ জগ থেকে পানি ঢালে। কিন্তু পানি খাওয়ার সবুর আর পায় না— শব্দে চোখ তুলে তাকায়। চারপাশ থেকে পাঁচ-ছয় জন সিভিল ড্রেস পরা লোক বের হয়। আবেশ অবশ্যই চেনে না তাদের। চোখ বুজে আবেশ। কেন? সারাদিনের ধখল কি কম হইছিল? এখনই এদের আসতে হলো! উইকেন্ড'এ আসতে পারতি।
আবেশের ক্লান্ত আওয়াজ," মাহিম আপনাদের কাছে?" আবেশ ভেবেছিল গেইম খেলে ক্লান্তি দুর করবে, হলো না।
ওপাশ থেকে প্রশ্নের উত্তরে কোনো আওয়াজ নেই।
আবেশ মাথা ঝাঁকায়, "আমার কেন জানি মন টানতেছে, আপনারা আমার ট্র্যাকিং এর সাথে জরিত"— মুহূর্তেই পেছনে লক-আপ পড়াতে আসা ব্যক্তির মাথা মঁচকায়, লোকটার গলায় বাহু পেঁচায়, নিমিষেই শরীর উল্টো ঘুরিয়ে সামনে ফেলায়। পরপরই পাশের ব্যক্তিটা দৌড়ে এলে হাতের কাচের জগটা সজোড়ে তার মাথায় ভাঙে, হাতে কাচের ধারালো অংশ দিয়ে পরপর আচড় কাটে ঐ ব্যাক্তির পিঠে– মুহূর্তেই অংশটা ঘুড়িয়ে একদম কণ্ঠনালি বরাবর তাক করে। সাথেসাথে ঘিরে দাড়ানো চারজন হ্যান্ড-গান বের করে সোজা তাক করে আবেশের দিকে। আবেশের সোজা দাড়ানো একজন কমান্ডো স্টাইলে আদেশ করে," পুট ডাউন ইয়োর ওএপান্" । আবেশ এতটা আচমকা ঘটনা ঘটায়, যে তাদের মস্তিষ্কগুলো প্রসেস করার সময় পায় নি। সত্যি বলতে তারা প্রত্যাশাও করেনি কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড ছাড়া, একজন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট এর কাছ থেকে এসব।
গলায় কাচ ঠেকানো ব্যক্তি তটস্থ দাড়িয়ে, একদম নড়চড় নেই, ঘাম বেয়ে পড়ছে কপালের পাশ দিয়ে। আবেশের কাচ ধরা হাত থেকে গড়িয়ে কব্জি দিয়ে টুপটুপ করে র/ক্ত পড়ছে। তার নিজের না, ঐ লোকটার। তাদের ঘিরে দাড়িয়ে চারজন লোক। চোখ আতঙ্কিত। তারা আশা করে নি এমন কিছু করতে পারবে কোনো ভার্সিটি– 'বুয়েটে' পড়াকু একটা ছেলে। তাদের অবশ্য আসার আগে সব বলে দেওয়া হয়েছিল। সতর্ক করা হয়েছিল। তারা গুরুত্ব দেয় নি। একটা ভার্সিটির ছেলে কিভাবে ট্রেইনড্ অফিসারের সাথে পেড়ে ওঠবে।
আবেশের কোনো ভয় নেই। সে বাঁকা হাসে। "এবার বলুন কোত্থেকে, কি কারনে এখানে এসেছেন আর মাহিম কোথায়? "
ঘটনার দ্রুততম আকস্মিকতায় উল্টে ফেলানো লোকটা এতক্ষনে উঠে দাড়ায়, হুমকি দেয়, "সোজা জেলে ভরব কিন্তু ছেলে, কাদের ওপর হামলা করেছিস জানিস?? "
আবেশ হাসে, "তাহলে আপনাদের সবার জানটা আমার হাতে নিয়ে নিই, তখন জেলে ভরার যথোপযুক্ত কারন পাবেন।" হাসি মিলিয়ে মুখ শক্ত হয় আবেশের,
"আপনারা যেই হোন, জনসাধারনের বাসায় এভাবে ঢুকে হয়রানি সন্ত্রাসীদের মধ্যেই পড়ে"। পরক্ষণেই আবেশের অবুঝ চেহেরা, "আর আমি কিভাবে জানবো আপনারা কে? একজন সাধারন জীব হিসেবে নিজেকে বাচাতে যা করা দরকার আমি সেটাই করেছি।"
উপস্থিত মানুষ গুলো স্তম্ভিত হয় আবেশের এমন হুটহাট মুখভঙ্গির পরিবর্তনে। এবার তাদের বিশ্বাস হচ্ছে ছেলেটার বিষয়ে বলা একেকটা সতর্কবাণী।
সামনের আদেশ করা লোকটা কোথাও কল দেয়, কল রিসিভ হয়, লাউড স্পিকারে দেয়। মেয়েলি, তীক্ষ্ণ-কোমল কণ্ঠো "আবেশ?"
আবেশের এক ভ্রু উপরে উঠে যায়। সে চিনতে পারে কণ্ঠোটা, আওয়াজ করে "বলুন, শুনছি।"
" তোমার বাসায় যারা আছে, তারা সোলজার! কি করেছ তুমি তাদের সাথে? "
আবেশ এবার দুই এ দুই এ চার মিলাতে পারে, জবাব দেয়, "কিছুনা! আপনার ট্র্যাকিং'র খাতিরে আমার ঝালিয়ে নেওয়া স্কিলের একটু প্র্যকটিস হয়ে গেল।"
অনুপমা সন্তুষ্ট নীরব হাসে, "আমি একটা লোকেশন পাঠিয়ে দিচ্ছি। আসতে পারবে?"
আবেশ ক্লান্ত, "আপনার এই সোলজার দের সাথে?"
সামনের ওই অফিসারটা আবেশের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকায়।
অনুপমা হাসে, "তোমার যেভাবে সাচ্ছন্দ্য হয়, আসো।"
আবেশের কাচের নিচে থাকা লোকটা আওয়াজ করে, "এবার তো ছাড়া যায় নাকি? "
আবেশ ছেড়ে দেয়।
সামনের ঐ অফিসারের কাছ থেকে লোকেশন নিয়ে তাদের ফ্ল্যাট থেকে বিদায় করে। তারপর সেও তার বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।
লম্বা সরু করিডোর। আলো কম। কেমন আবছায়া থমথমে এখানকার বাতাস। আবেশ'র এমন জায়গা বিরক্তিকর লাগে। সে সামনে এগিয়ে যায়, আলসেমির সাথে চুলগুলো পিছনে ঠেলে।
বিশাল প্রশস্ত রুম; গ্রে আর ব্ল্যাক্ এর মিশ্রণে। হালকা হলুদ লাইট ডীম করা। তেমন কিছু নেই রুমটাতে একটা বড় ধরনের ক্লাসী সোফা ছাড়া। যেটার কেন্দ্রে বসা মোহমাধুরী ছড়ানো অনুপমা, পড়নে নীল মসলিনের শাড়ি, লম্বা ব্রাউন বেণী, সরু আঙুলের সাহায্যে আইপ্যাডে স্লাইড করে যাচ্ছে কিছুক্ষণ পরপর। তার পাশেই দাম্ভিকতার সাথে বসা, গাড় সবুজের ইউনিফর্ম পরিধানকারী একজন। যার ইউনিফর্মের সোনালী– স্বর্ণের ব্যাজগুলো তার উচ্চতর পদবি'র কথা বলছে। হাতে একটা ম্যাগাজিন ধরা। পেছনে দুইজন সৈনিক সটান দাড়িয়ে। পাশের সিঙ্গেল সোফায় আরও একজন বসে। আবেশ কিছুটা এগিয়ে যায়। মাহিম! সিঙ্গেল সোফাটায় মাহিম বসে আছে!? একদম স্বাভাবিকভাবে, যেন সে এদেরই একজন!
মাহিম ঘাড় ঘুরায়। আবেশ দাড়িয়ে পেছনে। মুখভঙ্গি একদম শান্ত-স্বাভাবিক তার। কিন্তু দৃষ্টি জোড়া সোজা মাহিমের চোখ বরাবর।
মাহিম চোখ সরিয়ে নেয়। সে জানতো সে ঘাবড়াবে না একদম। কিন্তু এখন আবেশ'কে এভাবে দাড়িয়ে থাকতে দেখে অস্বস্তি হচ্ছে। যা যদিও তার মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই। এটা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ গোয়েন্দা সংস্থ'র স্পাই হিসেবে খুবই সাধারণ কিন্তু শক্তিশালী একটি বৈশিষ্ট্য— যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে শান্ত রাখা। অনুভূতি মুখাবয়ব-শরীর পর্যন্ত না আসা।
আবেশ এক মুহূর্ত স্তম্ভিত, অবাক হয়– পরপরই মুখভঙ্গি স্বাভাবিক, ঠোঁটে তিরস্কারের বাঁকা হাসি ফোটে। তবে একটা বিষয়ে সে মাহিমের প্রতি ইমপ্রেসড্ হয়– কিভাবে পুরো বারোটা মাসের প্রতিটা দিন সে তার সামনে নাটক করে গেছে, আর সে ধরতে পর্যন্ত পারে নি। আবেশকে খেয়াল করার- আবেশকে ভাবার সুযোগ অবধি দেয় নি একবার, সে মিথ্যা বলছে কি না! এই বোধহয় প্রথমবার আবেশের সন্দেহের দ্বার কেউ এত সহজে মারিয়ে গেল। শাবাস!
অনুপমা আবেশের দিকে তাকায় প্যাড রেখে। বসতে ইশারা করে।
আবেশ বসে। প্রচুর বিরক্তি তার স্বরে, " তো বলেন, একচুয়েলি কি কারনে আপনারা আমার লাইফে এমন হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন?? "
মাহিম তো আবেশের চোখে চোখ রাখতেই ভুলে গেছে। সে কোনো রকমে পার করছে সময়টা।
সামনের প্রখর ব্যক্তিসত্তা ম্যাগাজিনটা টেবিলে রাখে, দৃঢ়-স্থির কণ্ঠ, ঠোঁটে কূট হাসির রেখা, "আজকালকার ছেলেদের রক্ত কি সবসময়ই গরম?"
আবেশ টেবিলে রাখা জগ থেকে সরাসরি পানি গলায় ঢালে। অন্যের গ্লাস তার রুচিতে ধরে না। আর তখন ঐসব সৈনিকদের ঝামেলায় সে পানিটাও পান করতে পারে নি।
ব্যক্তিটি অদ্ভুৎ বাঁকা হাসে আবেশের খেয়ালিপনায়, যা ওনার চেহেরায় ভয়ঙ্কর লাগে। যেন চেহেরা নীরব আতঙ্ক বহন করছে। কিছু মানুষ থাকে যাদের চেহেরার গুমট গম্ভীরতা, চারপাশের আবহাওয়া ভারি করে তোলে। আর তিনি হলেন তার বাস্তব উদাহরণ।
ওনার দৃঢ়-আধিপত্যপূর্ণ কণ্ঠো'টা আবার শোনা যায়, "তোমাকে নির্বাচন করা হয়েছে, ডিজিএফআই'র একজন স্পাই হিসেবে।"
আবেশের পানি খাওয়া অবস্থাতেই এক ভ্রু উঁচিয়ে আসে। সে উঁচু থেকে জগ নামায়। ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলে যেন সে কিছুই জানে না, "শুরু থেকে বলেন"।
অনুপমা বোঝানোর সুরে বলে, "তোমাকে অবজারভেশনে রাখা হয়েছে, বিভিন্ন টেস্ট করা হয়েছে তোমার ওপর অ্যান্ড ইয়ু'র পাসড্।"
আবেশ বাঁকা হাসে,"আপনি যখন ঐদিন আমার নাম বললেন আই'জ অ্যাশিউর্ড আপনি পুরোপুরি টাল খান নি; রিসেপশনে কথা বলার সময় সজাগ ছিলেন আপনি। ঐ ঘটনার জল ঐখানে থেমে থাকবে না জানতাম কিন্তু এতটুকু গড়িয়ে ডিজিএফআই পর্যন্ত যাবে ভাবি নি" আবেশ মাহিম'কে দেখিয়ে বলে, "তবে ও সবচেয়ে ভালো খেলেছে, আপনার অন্যসব নজরদারি আর এলওএল এর ঐ টিম ফাইট কোনোটাই আমার নজর এড়ায়নি, কিন্তু যখন এর পিছনে কারন খুজতে গিয়েছি খালি হাতে ফিরতে হয়েছে! কিন্তু! মাইরি!! এর নাটকে আমি প্রশ্ন পর্যন্ত করতে পারি নি!গুড জব! মাহেম!!" আবেশ মাহিমের পিঠে শব্দ করে চাপড় দেয়।
সোজা দাড়া'য় বসা মাহিমের চোখের মণি নড়ে ওঠে– আবেশের কথায়!
সামনে গাম্ভীর্য নিয়ে বসে থাকা ব্যক্তিসত্তাটা স্তম্ভিত হয় এলওএল এর ঐ টুর্নামেন্ট আবেশ'র ধরতে পারায়। যা এতটা নিখুঁত ভাবে সাজানো হয়েছে যে আরেকজন খেলোয়াড়ের পক্ষে ধরা সম্ভব নয়, যে ঐ পুরো প্লাটিনামের আইডিটা'ই নকল, আইডিটার ভিত্তি এতটা স্ট্রং করে তৈরি করা হয়েছিল! সমস্যা তো এই জায়গাতেই ছিল। আবেশ কোনো সাধারন গেইমার ছিল না যে শুধু গেইমে ডুবে থাকে; তার কৌতুহলী বিচরণ ডার্ক ওয়েবসহ আরও অনেক জায়গাতেই রয়েছে।
জারিফ আবেশের স্কেল ধরতে পারে এবার সরাসরি দেখে! যা এতদিন শুধু শুনে আসছিলো তার স্পাইদের কাছ থেকে। দৃষ্টি শক্ত করে সে আবেশের ওপর– যেন কোনো কিছু যাচাই করে দেখছে। বুঝতে চাচ্ছে- পড়তে চাচ্ছে তার মুখাবয়ব।
অনুপমার ঠোঁটে সন্তুষ্ট রেখা ফোঁটে, জিজ্ঞেস করে, "এলওএল এর টুর্নামেন্ট ফেক্ বুঝলে কিভাবে? "
"ওয়েল! যে এলওএল এর ফায়ারওয়াল ভাঙতে পারে তার জন্য এটা বিশেষ কিছু নয়।" আবেশের কথায় নির্বিকার ভাব, "ওকেহ্! বিয়িং অ্যা ডিজিঅ্যাফআই স্পাই উল'বি নিউ থ্রিল ফর মি।" আবেশ উৎসুক। তার জন্য নতুন আজব-ভয়ঙ্কর জিনিস বরাবরই নতুন থ্রিল– এসবে কখনো তার না নেই।
আবেশের এতক্ষণে মাথার তার ঠিক হয়," ওয়ান সেকেন্ড! আপনার সাথে তো পরিচিতই হই নি! আপনি বোধহয় আমাকে চেনেন। ফ্যামাস হয়ে গেছি তো আমি! কিন্তু আমি চিনি না আপনাকে।"
ঠোঁটের পাশটা খানিক প্রসারিত হয়, শান্ত-গম্ভির মুখভঙ্গি পাল্টায়,
I'm the Head of CI wing, The Counter Intelligence Wing of DGFI that you're going to work for, COLONEL JARIF HAYDARI.
আবেশ নিচ ঠোঁট উল্টে বাহবা দেয়।
চলবে~
#পর্ব১০
#wrong_profile
#সেয়ারা_তিষিকা
< এই পর্বটা আরও বড় হতো। লিখতে পারিনি আমি। একটু দোয়া করবেন আমার জন্য। আর রেসপন্স করবেন আপনারা, আমি যাতে মনোবল টা ধরে রাখতে পারি>