বড়ঘর তাদের পাচ ভাইয়ের বউসহ ছেলেমেয়েদের এঁটে ওঠার জন্য যথেষ্ট বড়। আজিজুলের এই বড়ঘর এতটা প্রশস্ত করার পিছনে এইটাই মুল কারন ছিল। যাতে তাদের সবাই এই ঘরে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারে। ভায়েদের জ্যেষ্ঠ আজিজুল। সেই হিসেবে প্রধানও তিনি। তার কথার ওপরে কারও কথা নেই। খুবই সম্মানিত ব্যক্তি। সবাই যদিও এখন যার যার কাজে ব্যাস্ত। আগের মতো একই ছাদের নিচে পাঁচ ভাইয়ের থাকা হয় না। কিন্তু বন্ধন একই আছে। একজনের বিপদে সবাই দৌড়ে আসে। যেকোনো অনুষ্ঠান সবাই একসাথে, হাতে হাতে পালন করে। এবার অনুষ্ঠান যেই ভাইয়েরই হোক না কেন। এক বাড়িতে মজাদার কিছু রান্না করা হলে পাঁচ ভাইয়ের ঘরে দিয়ে আসা স্বাভাবিক বিষয়। মাঝেমধ্যে দিয়ে আসার আগেই সব ছেলেমেয়েরা একযোগে হামলে পড়ে ঐ খাবার আগেই শেষ হয়ে যায়। এই ঘটনা ঘটে বেশীরভাগ শীতের পিঠা বানানোর ক্ষেত্রে। আর ইযায বংশের মেয়েদের একটা আলাদা খ্যাতিই রয়েছে এগ্রাম-ওগ্রামে, তাদের রগচটা স্বভাব ও সৌন্দর্যের জন্য। তাদের দিকে নজর দেওয়া, আগুনে হাত দেওয়ার চিন্তা করা সমান তাদের চাচা-ভাইদের প্রভাব-প্রতিপত্তির দাপটে। যেটার লাইভ রিয়েকশন আবেশ দেখতে চলেছিল একটু আগে।
২৪তম পর্ব
বড়ঘরের জানালা দুইটা প্রধান-দরজার দুইপাশে। তুলনায় লম্বা প্রসস্থ জানালাতে শক্ত-মসৃণ শিক দেওয়া। নীল পর্দা রয়েছে কিন্তু বাঁধা ঝুঁটিতে। খোলা জানালায় গা শিরশির করা বাতাস ঢুকছে। দড়জা দিয়ে তো ঢুকছেই। বাইরের গুরুঁম গুরুঁম ডাক এখন তেমন নেই। বৃষ্টি কমে এসেছে। ডার্ক ব্রাউন বার্নিশের কাঠের কারুকাজের সোফা বড়ঘরের কেন্দ্রে বড় একটা অংশ জুরে গোল করে বসানো হয়েছে। কুশন নীল রঙের। কাঠের কারুকাজের ধরন আগেকার, ব্রিটিশ আমলের বাংলার।
সোফার চারপাশে সব ভাইয়েরা একজায়গায় হয়েছে। বউরাও কাজ ফেলে এসেছে। যদিও এমন আসা-যাওয়া খুব বিরল কিছু নয়। প্রতিদিনই হচ্ছে। আজ শুধু সবাই একসাথে উপস্থিত বড় ভাইয়ের তলবে। ইনামা আজ কলেজে যায় নি পেট ব্যাথার ফাঁকিতে। বরাবরের মতো এই বংশে মেয়েরা তুলনায় বেশী আদুরে। ফলস্বরুপ এতেই ইনামার কাজ হয়েছে। বাকি সবগুলা স্কুলে না যাওয়ার জন্য ইনামাকে উদাহরণ হিসেবে কাজে লাগাতে চাচ্ছে। আর সবচেয়ে বড় কারন আজ স্কুলে না যাওয়ার তা হলো সকাল থেকে বৃষ্টি আজকে। এই বৃষ্টির দিনে কেন স্কুলে যাবে মানুষ? তারপরও জুরাজুরি করেই হোক কয়েকজনকে স্কুলে যাওয়ার জন্য রেডি করানো গিয়েছিল। আর কয়েকটা বিভিন্ন বাহানা ধরছিল না যাওয়ার। এরই মধ্যে আজিজুল চাচুর ডাক পড়লে সব একসাথে বের হয়ে আসে। আর গ্রামে এই ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে কেউ ছাতা বের করার প্রয়োজনীয়তা মনে করে না। এই বৃষ্টি হওয়া আর না হওয়া সমান তাদের জন্য।
এদিকে ফারহান-ফাইয়াজ অর্ধেক কলেজের ড্রেস পড়া অবস্থায় চলে এসেছে। চুল এলোমেলো তাদের। কলেজ ড্রেসের শার্টের সাথের প্যান্ট এখনো পড়া হয় নি। বাসায় পড়া ফাইয়াজের থ্রি-কোয়ার্টার আর ফারহানের জিন্স পড়া অবস্থাতেই এরা হাজির। বৃষ্টির দিনে কলেজে যাওয়া মেয়েদের মজা লাগে কি না জানা নেই। কিন্তু ছেলেদের লাভ আছে। বৃষ্টিতে ফুটবল খেলার একটা আলাদাই মজা। বাড়ি থেকে গেলে মায়ের কথা শুনতে হবে, এমনো হতে পারে যেতে নাও দিতে পারে অথবা নাক উঁচু করে থাকবে। কিন্তু কলেজের বাহানায় গেলে এই ঝামেলা পোহাতে হবে না। তারা সেটারই প্রস্তুতি নিচ্ছিল দুই ভাই একসাথে। ফাইজার পড়াশুনায় ফাঁকি আবার একদমই পছন্দ না। তাই ও যতবৃষ্টিই আসুক না কেন আজ স্কুলে যেতই। তার ওপরে সামনের বছর ওর এসএসসি, এখন স্কুল মিস দিলে ওতো পড়ায় পিছিয়ে যাবে বান্ধবীদের থেকে। কিন্তু অনিজা আর অনিশার এইসব টেনশন নাই। ওদের কথা হলো ইনামা আপু কলেজে যাবে না, আমিও যাব না। ওদের ভাষ্যমতে ইনামা পেট ব্যাথার মিথ্যা অজুহাত দিয়েছে। এজন্য ওদের আম্মু ওদের স্কুলে পাঠাতে বিভিন্নরকম কথা বলছে, বকা দেওয়া এখনো বাকি । কারন মেয়েদের ওপর হাত কখনোই তুলা যাবে না, আফতাবের কড়া নিষেধ আছে। নিজের মেয়েদের তিনি খুব ভালোবাসেন। অনিভ এইফাঁকে বৃষ্টিতে বাইরে বের হওয়ার চেষ্টায় আছে। তাহলে আর স্কুলে যেতে হবে না। এমনই চলছিল এদের আজকের সকাল, যখন হঠাৎ আজিজুল চাচার ডাক পরে।
সিঙ্গেল বড় সোফায় আজিজুল বসে। আরমান, আফজাল, আফতাব একে একে এসে সামনের সোফায় বসেছে। ঘরের বউরা দাড়িয়ে সবাই। আকবর, আজিজুল ভাইয়ের পিছনে সটান দাঁড়িয়ে। ইনামা অন্যপাশে রাইনিকাকে দেখে ওখানে চলে যায়। রাইনিকার সাথে গিয়ে দাড়ায়। এখনো বড়চাচু কথা শুরু করে নি বলে, ও রাইনিকার দিকে তাকায়, ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করে,
" আবেশ ভাইয়া কই?"
রাইনিকা কোনো শব্দ করে না উত্তরে। যেন ও উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনীতা অনুভব করছে না। ভাব এমন যেন শোনেই নি কিছু বলা হয়েছে। কেন এমন ও জানে না। কিন্তু ইনামার আবেশের প্রতি কৌতুহল ওর একদমই ভালো লাগছে না।
~~~
(কিছুক্ষন আগে)
আবেশ ফোনে নাম্বার ডায়াল করতে করতে বড়ঘর থেকে বারান্দার দিকে পা বাড়ায়। আবেশ রাইনিকার রুমের সামনে বারান্দায় দাড়িয়ে। ফোনে নাম্বার তুলে কল দিয়ে কানে তুলে। কল একবার বাজতেই ওপাশ থেকে রিসিভ হয়। আবেশ ডাক দেয়,
"বাবাআ!!"
"এতরস কেনো ডাকে বাবা? কিছু চাই আমার ছেলের? "
আবেশ গলা ঝাড়ে। বাবা কার দেখতে হবে না। খুব চেনে নিজের ছেলেকে। আবেশ আবার ডাক দেয়,
"বাবাআ।"
"এতরস ছাড়িস না। ঝেড়ে ফেল যা ঝাড়ার।"
" তোমার এই ব্যবসার আগে কি পাটের ব্যাবসা ছিল, বাবাআ? বলবে কিন্তু, আজকে এক মাথার বাটি খোলা পাগলের মুখে শুনছি এইটা।...পাটের ব্যাবসা তো স্বাভাবিক হওয়া-"
"আর কিছু থাকলে ব-"
"সেলিম রাওয়াদ!"
"জ্বী! জুনিয়র।"
"বউয়ের কাছে সব ছাইড়া দিমু কইলাম!"
"তুই খালি বাড়িতে আয়! জানোয়ার"
"আসতেছি আমি। তারপরে তোমার একদিন কি তোমার বউয়ের যতদিন লাগে!"
"কি কবি তুই আমার বউরে?"
"হে হে! ঐযে জরিনা খালাম্মা। লাইন যে মারে তোমা-" —টুট টুট করে শব্দ হয় ওপাশ থেকে।
আবেশ নামিয়ে আনে ফোন কান থেকে। ঠোঁটের বড়সড় হাসিটা মিইয়ে আসে। পরবর্তীতে বড় একটা শ্বাস ফেলায় ভেতর থেকে। সে আসলেই জানতে চায় বাবার ব্যবসা নিয়ে। কিন্তু সেলিম রাওয়াদ কখনোই তাকে এই ব্যাবসার আগে-পরে নিয়ে ওর সাথে কথা বলে না। সবসময় এই টপিক উঠলে খুবই সূচারুভাবে অন্যটপিকে যায়, কোনো না কোনো ভাবে এড়িয়ে যায়। বাবার এমন কঠিন অনিচ্ছা একসময় আবেশকেও এই টপিকের প্রতি নিরাসক্ত করে তুলেছিল। আর আজকে এই টপিক এইভাবে কেন উঠাল আজিজুল? আবেশকে এটা ভাবিয়ে তুলছে। আর আজিজুল বাবাকে চেনে?
এসব ভাবতে ভাবতেই সে উপস্থিত হয় বড়ঘরে, রাইনিকার পাশে। কিন্তু মাথা থেকে এসব চিন্তা গিয়েছে কিনা বলা যাচ্ছে না। চোখ সামনে কিন্তু মাথা কি নিয়ে কাজ করছে বলা মুশকিল।
বাড়ির বউরা রাইনিকার পাশে অচেনা কিন্তু সুদর্শন চেহেরার ছেলেকে দেখে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। মাঝেমাঝে ফিসফিস করে একে-অপরকে জিজ্ঞাসাবাদও করছে; কি থাকতে পারে এর আর রাইনিকার মধ্যে। একটু আগে যেভাবে তাদের মেয়ে, রাইনিকাকে পেচিয়ে ধরল!? কিন্তু কেউ জানে না এই বিষয়ে। তাদের বড় ভাসুর তো এতটা খোলামেলা না যে রাইনিকার কোনো ছেলে বন্ধুকে বাসায় আনার অনুমতি দিবে। রাইনিকা ঢাকায় কলেজে পড়তে যাওয়ার পর মাঝখানে তো ওকে বাড়িতে আসতে দেখা যায় নি। তাহলে কি হচ্ছে আসলে? এমন বিভিন্ন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তাদের মাথায়।
এই মুহুর্তে, আযিয বংশের দলবল দলবেঁধে আজিজুলের একপাশে দাঁড়িয়ে, বিপরীতে ঘরের অন্যপাশে রাই'এর সাথে দাড়ানো পৌরুষ মানবকে চোখ পাকায়ে দেখতেছে।শুধু এই দলবলের মধ্যে একজনের, অনিভের লম্বা সুঠামদেহী ঐ ভাইয়াটারে একটু হ্যাটঁকে লেগেছে। সে একবার চুপিচুপি রাই আপুর ঘরের জানালায় উঁকি দিয়েছিল আজ সক্কাল বেলায় জানালা হঠাৎ খোলা পাওয়ায়, তখন এই ভাইয়াটারে শার্টলেস অবস্থায় দেখেছিল গেইম খেলতে, অস্থির লেগেছিল তার গেইম আর ভাইয়ার গেইম খেলার স্টাইলও। বুম! বুম! একসাথে কতগুলোকে উড়াচ্ছিল!! কিন্তু সে বুঝেছিল কোনো ইষ্টুপিষ্টু চলছে রাই আপু আর এই ভাইয়ার মধ্যে নয়তো আপুর ঘরে কিভাবে এই ভাইয়া থাকে? সিক্সে পড়লে কি হয়েছে সেও জানে বিয়ে ছাড়া অচেনা ছেলে-মেয়ে একইঘরে থাকতে পারে না। তখন উঁকি দেওয়ার সময় যদিও ঐ ভাইয়াটা তাকে ধরে ফেলেছিল। কিন্তু সেও পিছুহটে নি। সে তখন দায়িত্বশীল ভাইয়ের মতো বোনের সম্মান রক্ষার্থে ঐ ভাইয়াটাকে আচ্ছা রকম হুমকি-ধামকি দিয়েছিল রাই আপুর থেকে দুরে থাকার জন্য, ঘর থেকে বের হয়ে আসতে বলেছিল একদম খুব রাগের সাথে। এই ভাইয়া তাকে একটা সিক্রেট বলেছিল তখন। কিন্তু সেটা অবিশ্বাস্য! কেউ বিশ্বাস করবে না। অন্তত অনিভ না। তার ভাইয়াটার গেইম খেলাটা সেই লেগেছিল শুধু। নয়তো কে শুনতো ঐসব? যাইহোক অবশেষে এখানে তারা বেট লাগিয়েছে। এবার দেখুক কে জিতে? অবশ্যই অনিভ।
অনিভ দুর থেকে ভ্রু উঁচু করে আবেশকে সেটাই বুঝাচ্ছে। যে আজকে তার আচ্ছা রকম ধুলাই হবে। আবেশ তাচ্ছিল্যে ঠোঁট বাকায় ওখান থেকে। অনিভ এখান থেকে দ্বিগুন হারে মুখ বাঁকায় আবেশের দিকে।
" এদিকে আসো। " হঠাতই আজিজুলের ডাক পড়ে আবেশ-রাইনিকার দিকে।
আবেশ-রাইনিকা এগিয়ে আসলে আজিজুল তাদেরকে তার দুইপাশের দুই খালি সিঙ্গেল সোফাটায় বসতে বলে। আজিজুলের সামনে বসা তিন ভাই; আরমান, আফতাব আর আফজাল আবেশের দিকে সরু চোখে তাকিয়ে। আবেশের তাতে আবার ভ্রুক্ষেপ নেই। সে খুব ভাব নিয়ে বসেছে শশুড়মশাই কিভাবে তাদের বিয়ের অ্যানাউন্সমেন্ট করবে সেটা শুনার জন্য।
আজিজুল পাশে দাড়ান আকবরের দিকে তাকালে, আকবর তাকে প্রসস্থ একটা আই-প্যাড এগিয়ে দেয়। আজিজুল সেটা হাতে নিয়ে সহসা ট্যাপ করছে। ফোন দেওয়ার জন্য হোয়াটসঅ্যাপ এ ডায়াল মোডে আসেন। আবেশের দিকে তাকান। আবেশ বোঝে, ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে হাসে। আবেশ নাম্বার বললে, আজিজুল কল দেন।
~~~
চলবে…
#wrong_profile
#পর্ব২০
#সেয়ারা_তিষিকা
পর্ব সম্পন্ন!
আপনি সফলভাবে ২৪তম পর্ব শেষ করেছেন।
আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?
প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।
Google Play থেকে অ্যাপ নামান