ফন্ট সাইজ:
থিম:
Wrong Profile

২৯তম পর্ব

লেখক: সেয়ারা তিষিকা

আধো চাঁদের রুপালী আলোয় দৃশ্যমান দুই মানব-মানবী। মানবীর হাত পিছন থেকে পৌরুষ পৃষ্ঠের বেড় আকড়ে ধরতে চাচ্ছে, নিজ সবটুকু শক্তি দিয়ে। যেন ছেড়ে দিলেই হাড়িয়ে ফেলবে; অথবা নিজেকে লেপ্টে নিতে চাচ্ছে জড়ানো পুরুষ মানবের রুহ্'টার সাথে।

সন্ধ্যার ঝিরিঝিরি বৃষ্টির পর এখন শেষরাতে আকাশ উঁকি দিয়ে বেড়াচ্ছে সাথে তার সঙ্গী আধো চাঁদ। তবে থোকা থোকা কালো বিভৎস আকারের মেঘগুলো এখনো থেকে গিয়ে জানাচ্ছে যে, আকাশের দখলদারিত্ব এখনো তারা ছেড়ে উঠে নি।
" না হওয়া বাসরটা সারতে চাচ্ছ?"
হৃৎকাঁপানো শীতল শব্দগুলোও রাইনিকার ভাবে আলাদা সুরসঞ্চার করতে পারল না এখন। কিংবা বলা চলে এতে রাইনিকার হাতের বাঁধন আরো দৃঢ় হতে চাইল । মোলায়েম কপোলের আধোপাশটাও শক্ত পৃষ্ঠপাশটায় জড়ানো জ্যাকেটে ডুবেছে। বিড়ালছানা যেভাবে দেহের উষ্ণ আবহ নিজের ভিতরে টেনে নিতে চায় রাইনিকাকেও তেমনি মনে হলো।
প্রশ্নটাতে রাইনিকার প্রতিক্রিয়া অস্বীকৃতিসূচক না হওয়া, আবেশের উচ্ছৃঙ্খল হওয়ার জন্য যথেষ্ট। 
কোন ফাঁকে রাইনিকার এক হাত জ্যাকেট থেকে ছাড়িয়ে ওকে ঘুরিয়ে আবেশের সামনে উপস্থিত করল রাইনিকা টের অবধি পায় না, শুধু ওর মনে হলো যেন শরীরে দ্রুতগতির বাতাসের ঝটকা লাগল।
রাইনিকার একহাত আবেশের হাতে, অন্যহাত নিজ স্থিরতা বজায় রাখতে অবচেতন মনেই আবেশের জ্যাকেট খামচে আছে। রাইনিকার ভ্রুযুগল উপরে উঠে চোখেমুখে স্তব্ধতা পরিস্থিতি বুঝেউঠতে।
সেই স্তব্ধতা নিমিষেই প্রতিস্থাপিত হয় বাকরুদ্ধতার দ্বারা। 
রাইনিকার হাতসহ ওর পিছনে নিয়ে পৃষ্ঠচাপে ওকে নিজের দিকে টেনে নিয়েছে আবেশ, একহাতে; অন্যহাতে ওর সরু গ্রীবাদেশের পুরো আয়ত্ত নিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুলে নিয়েছে ওর চিবুকের নিয়ন্ত্রণ, দখলদার ওষ্ঠাধর আবিষ্ট হয়েছে নবঅষ্টাদশীর নাজুক ওষ্ঠদ্বয় হতে ক্রমেই মুখাভ্যন্তরের রসাস্বাদনে।
যতক্ষনে রাইনিকা গতি-প্রকৃতি ঠাহর করতে পারে, রাইনিকার শরীর অবস হয়ে এসেছে, হৃদপিণ্ডের উদ্দাম গতি খেয়ালে আনার সুযোগই হয় না, অনুভূতির সকল স্নায়ুতে যেন জোয়ার আসে; আবেশের আঁজলে জড়ানো রাইনিকার ছোট দেহখান অবস করে ফেলে।
রাইনিকা নিজ শরীরের ভার ছেড়ে দিলে, ওর পৃষ্ঠদেশে আবেশের মুঠোয় থাকা রাইনিকার হাত খসে যায়। আবেশে আবৃত শরীরটুকু নিজ সব শক্তি ছেড়ে দিয়ে আবেশ থেকে সড়ে আসতে নিলেই, রাইনিকার পৃষ্ঠসমান হাত আবার আকড়ে নেয় নিজমালিক বরাবর।
প্রথমানুভূত এই অদ্ভুত অনুভূতির তন্ময়তায় রাইনিকা বারবার ডুবে যাচ্ছে; খেই হারাচ্ছে তাতে।
—তীব্র আলো এসে আছড়ে পড়ে মুদিত দুটো চোখের ওপর।
দ্রুত মস্তিষ্কের কাজে রাইনিকার অনুমান বাবাতে ঠেকলে, রাইনিকা হুট করেই সড়ে গিয়ে আবেশের দুপাশের জ্যাকেট উঁচু করে ভিতরে মুখ গলিয়ে দেয় আড়াল হতে।
আবেশ তাতে একদমই বাঁধা দেয় না, বরঞ্চ ঢোক গিলে নির্লজ্জের মতো। তার চোখ এখনো খুলে নি। সামনে কে তা দেখার কোনো তাড়া তার মধ্যে নেই। উপরন্তু বলা শ্রেয়, সে এখনো সেই অনুভবেই মত্ত।
অমুল্য কোনো রতন পেয়ে ফেলার মতোন তৃপ্তিভরে সেই একই অনুভূতিতে বড় ধরনের একটা শ্বাস টেনে নিয়ে সে তার চোখজোড়া খোলে।
গাড়ির হেডলাইটের তীব্র আলো। আজিজ উদ্যানবাটির এদিকটায় ঝাড়বাতি এমনিতেই কম লাগানো হয়েছিল তারওপরে ইরহান আবার নতুন করে সাজানোর জন্য জায়গায় জায়গায় মরিচবাতিগুলো খুলেও ফেলা হয়েছে।
হেডলাইটের ধাধালো আলো হওয়ায় আবেশ কিছু দেখতে পায় না সামনে, তারওপরে এতক্ষণে অন্ধকারে সয়ে যাওয়া চোখের জন্য তাকানো অসুবিধাজনকই বটে। আবেশ ধমকে উঠে,
"গরু-চোক্ষা এই ছাঁতার-মাথা বন্ধ করেন মিঁয়া!"
লাইট তো বন্ধ হয়ে যায়। ভিতর থেকে শক্ত গড়নের মানব বের হয়ে আসে। চাঁদের আলো-আঁধারির মধ্যে তার মানব চেহারাটা অস্পষ্ট। 
আবেশ ভ্রু কুচকায়। আবেশের চেনা চেনা লাগে এই গম্ভীর ভারী অবয়ব।
"ই্যয়োওওও! জারিফ ব্রো! ভুল রাস্তায় চলে আসছেন মনে হয়। আপনার গরু আই মীন গাড়ি ক্যেম্নে আমার শশুর বাড়িতে ঠেঁকে?"
আবেশের কথায় রাইনিকা জ্যাকেটের ভিতরেই মুখ খানিক উঁচিয়ে ভ্রুকুটি করে। ও আসলেই চেনে না আবেশের আগে পরে। এখন এই জারিফ কে? দেখার জন্য যে মুখটা বের করবে সেই সায় দিল না ভিতরটা। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে দাড়িয়ে ও, ভিতরটা মুহূর্তপূর্ব প্রলয়ের তান্ডবে এখনো কাঁপছে। 
নির্বিকার জারিফ, " এতবড় শশুড়বাড়িতে একটা রুম ভাগ্যে জোটে নি? "
সামনের খসখসে গলার এহেন তিরস্কারমুলক জিজ্ঞাসায় রাইনিকা তড়িতে মুখ ফিরাতে চায়, আবেশ চেপে ধরে বুকের ভিতর, ফিরাতে দেয় না মুখ।
" আমার ভাগ্যে অনেককিছুই জুটছে যা আপনার ভাগ্যে জুটে নাই।"
জারিফ কানে নেয় না আবেশের কথা। অবশ্য জারিফ আবেশের এইসব অনর্থক প্যাচাল কখনোই কানে নেয় না বা জড়ায় না তাতে। জারিফের দরকার কাজ, সুক্ষ্ম-তীক্ষ্ম মাথার কাজ, জারিফের জীবনীশক্তির অর্ধেক এর আশপাশেই ঘুরঘুর করে। বাকি অর্ধেক রিনহা'তে।
জারিফ বলল, "রুমের ব্যবস্থা কর। বউ সামলে বাইরে আয়।"
জারিফ ঘুরে অন্যদিকে চলে যায়। রাইনিকা সাথেসাথে জ্যাকেট থেকে মুখ তুলে, 
"আপনি তখন চেপে ধরলেন কেন? কিছু বলতে কেন দিলেন না?"
প্রতিত্তোরে আবেশ গলার আওয়াজ নিচু করে, 
" you know? you are a mess right now. 
a beautiful mess! "
রাইনিকার খেয়ালে আসে, ওর গাল গরম অনুভূত হচ্ছে অর্থাৎ গাল লাল হয়ে ওঠেছে। আর ঠোঁট ওরকম লাগার কারনও বোধহয় একই, ঠোঁট ফুলে লাল। তারওপর চুল এলোমেলো। রাইনিকার একদন্ড এখানে দাঁড়ানো ইচ্ছা হল না। চোখে চোখ রাখার জন্য ওপরে তুলে তাকানো যাচ্ছে না।
রাইনিকা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে নিজেকে সামনে হাঁটা দেয়। একবারও পিছন ফিরে তাকায় না দেখার জন্য মানুষটাকে। অনেকটা এগিয়ে আসার পর টুক করে পিছন ঘুরে তাকায় আধো-অন্ধকারে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য ব্যাটাছেলেটাকে এখনো দেখা যাচ্ছে কি না। যখনই বুঝতে পারে আর দেখা যাচ্ছে না, ঝেড়ে দৌড় ভিতরের দিকে। 
~~
জারিফ তার রেড ওয়াইন মার্সিডিজ জি-ক্লাস নিয়ে এসেছে। যেটা জি-ওয়াগন হিসেবেও প্রচলিত। সরকারি জীপটা খুব কমই ব্যাবহৃত হয়। উপরের বুক খোলা, বালি রঙা মসৃন ম্যাট ফিনিশ স্যুট জ্যাকেট; সেটার বাম পাশের ওয়েল্ট পকেটে ভেতরের ডার্ক গ্রীন উন্নত মানের পপলিন কটন শার্টের সাথে মিলিয়ে এক টুকরো কাপড় আলগোছে গোঁজা। ডার্ক গ্রীন শার্টের, যা এই চাদের আলোয় এখন গাড় কালো লাগছে, সেটার উপরের দুটো বোতাম আজ নিয়মবিরুদ্ধভাবে খোলা। যেটা কোনোভাবে তার অস্থিরতা প্রকাশ করছে আজকে। এই শার্ট আর স্যুট জ্যাকেটেই বেরিয়ে গিয়েছে; টাই কিংবা ওয়েস্টকোট কোনোটাই নেই। একটু এলোমেলো বলাই যায়। তারপরও গোছানো, মার্জিত, রুচিশীল গাম্ভীর্য ঠিকরে আসছে।
দুটো পকেটে হাত গুজে, তার গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে সে।
আবেশকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। চোখ তার আশেপাশে ঘুরছে নিরুদ্দেশভাবে। জ্যাকেটের দুপাশের পকেটে হাট গলিয়ে এগিয়ে আসছে সে। ঠোঁট গোল করে শিস বাজছে; স্পষ্ট, সুন্দর, অজানা কোনো গানের শিস।
বুঝাই যাচ্ছে জারিফের অস্থিরতার একদম বিপরীত আবেশের মেজাজ। সে এসে জারিফের পাশে গাড়িতে হেলান দেয়।
জারিফ দৃষ্টি সামনে রেখেই বলে, "কাজে ফিরতে হবে। "
 আবেশ হেলান থেকে সোজা দাড়িয়ে যায়, 
" ঝাড়বাতি দেখেন আপনে? বিয়া লাগছে আবেশের। কাজ পোস্টপোনড বিয়ে পর্যন্ত।" ভাবসাবে বুঝা গেল খুব অনড় সে এই সিদ্ধান্তে। 
আবেশ আবার শান্ত হয়ে গাড়িতে হেলান দেয়, তার সিদ্ধান্তের পক্ষে কঠিন যুক্তি দাড় করায়, " তাছাড়াও আমি এখন ছুটিতে। "
" Mission light failed. Kiran escaped. They sent all documents but void."
কিরন পালিয়েছে শোনামাত্র 'কাজে ফিরবে না' সিদ্ধান্তে অনড় আবেশের এক ভ্রু উপর থেকে নিচে নেচে উঠে। মজা-ছল উবে গেল মনে হলো তার অবয়বে মুহূর্তের জন্য।
" দায়িত্বরত অমনিক্স&সিলেক্স এর লাশ পাওয়া গিয়েছে মেলবোর্ন এ। ঘটনাস্থল সাউদার্ন স্টেট পার্কওয়ে, নিউইয়র্ক। কিরনের ব্ল্যাক ভ্যান এন্টার করেছে সেই স্থানে, নট শিও্যর সেখানে কিরন ছিল কি না।" জারিফ বাঁকা হাসে এপর্যায়ে, 
" that moth'erfu'cker sent the cctv footage of it. That fu'cking bas'tard really thinks so high of himself."
আবেশ তার চিরায়ত রুপে ফিরে, বিরক্তির সহিত বলে, "আপনের ক্যান মনে হয় ওই শাউয়োর খুন চুষতে আমি উইঠা-পইড়া লাগমু? বিয়া থুইয়া?"
"মাথা খাইছ না আমার। তোরে নতুন করে আমার চিনতে হবে না।" জারিফ ঘার ঘুরায় আবেশের দিকে, "আসছি যখন তোর বিয়া খায়েই যাই। শশুড়রে বল রুম দিতে। "
আবেশ হেলান ছেড়ে দেয়। ধীরপায়ে ভিতরের দিকে এগিয়ে যায়, " এতো রাইতে আপনেরে রুম দিবো কোত্থেকে? হোটেল পাইছেন নাকি? "
জারিফ এগিয়ে যায় সেই বরাবর। এই চাঁদের মৃদু রুপোলী আলো আর জায়্গায় জায়গায় লাগানো মরিচবাতির হালকা রঙিন আলোতে বাড়ির আশপাশটায় তার সরু তীক্ষ্ণ চোখ বিচরণে ব্যস্ত।  
এইযে জারিফ আর আবেশ বড়ঘরের দিকে এগিয়ে গেল, এরা এখন আবেশের জন্য বরাদ্দ ঘরে যেয়ে কথার জোর আরো একটু খাটাবে। হাতাহাতি-মারামারি হতেও পারে, বলা যায় না। যদি না কোনো কিছু ভেঙে তারা সর্বলোকে জানায়। তারপর এসব করে যদি সবুর পায় তাহলে অবশেষে এক বিছানাতেই দুটো ক্লান্ত শরীর ঘুমিয়ে যাবে।
জারিফ আর আবেশের সম্পর্কটা গোপনীয়তার সুতোয় বাঁধা। যে সুতোর পুরোটা জারিফের। জারিফের নিজ গোপন বলতে কিছু নেই আবেশের কাছে। জারিফের সকল আড়াল আবেশকে জানিয়েছে, সে নিজেই। আবেশ কোনো না কোনোদিন নিজ থেকে জেনে যেতই; এই ভয়ে না আবার। বিশ্বাস স্থাপনের জেরে, সম্পর্কের ভিত মজবুতের জেরে।
মানুষ স্বাভাবিকভাবে বলবে, হুট করে কোনো মজবুত সম্পর্ক স্থাপন হয় না। কিন্তু কথাটা সত্যি নয়। স্থাপন করা যায়। কোনো গোপনীয়তা ছাড়া মানুষ; দুনিয়ায় বিরল, সেই সবচেয়ে গোপন থেকেও গোপনীয় সত্যটা আপনি কারও সামনে যদি অবলীলায় তুলে ধরেন। তাহলে আপনিও যে তুলে ধরতে পারলেন, সেটাও মজবুত ভিতের একটা, আপনি এক ধাপ এগিয়ে মানুষটার ওপর সম্পর্কটার দায়িত্ব ছেড়ে দিলেন। আর সেই মানুষটা যদি সেই গোপনীয়তা রক্ষা করে তাহলে আপনি জিতে গেলেন সঠিক মানুষ নির্বাচন করে।
জারিফ আর আবেশের সম্পর্কটাও এমনই। 
আবেশের গোপনীয়তার কথা বলা হয় নি, কারন তার জীবনে আল্লাহ্ দিলে গোপন বলে কিছু ছিল না ডিজিএফআইয়ের এন্ট্রির আগ পর্যন্ত। সব খুল্লামখোল্লা। তবে তাকে ধরাবাঁধা কঠিন। তাকে বাঘে আনানোও অসম্ভব জিনিসের একটা। তবে সেই অতি বিষয়ে তার আগ্রহ আর কৌতুহল জন্মালে সেটা ভিন্ন বিষয়।
________________
চলবে…
উপন্যাসঃ #wrong_profile 
লেখনিতেঃ #সেয়ারা_তিষিকা 
#পর্ব২৪ (প্রথমাংশ)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন