ফন্ট সাইজ:
থিম:
Wrong Profile

৩০তম পর্ব

লেখক: সেয়ারা তিষিকা

সূয্যি মামার উঠি উঠি ভাব। লালচে পুবদিক তার আগমন নিয়ে সতর্ক করছে। গতকালকের বৃষ্টিতে গাছগাছালির পত্রপল্লব সব নতুনত্ব লাভ করেছে আজ। যেগুলো সকালের সূর্যের আলোতে খানিক চিকচিক করার জন্য লোভাতুর হয়ে আছে।

ইরহানের ব্যাস্ত কাজ চলছে চারদিকে মানুষের সাথে এই সকাল-সকাল। হলুদের প্যান্ডেল সাজাতে সে এদিক-ওদিকে নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছে কর্মরতদের, প্রয়োজনে সে গিয়ে ঠিক করে আসছে।
বাড়ির বাকি ছোটদের খোঁজ এখনো নেই; ঘুমদেশে এখনো এরা। তবে বড়রা এখনি যার যার কাজে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছেন।
~~
ডার্ক ব্রাউন বার্নিশের কাঠের খাটের শুভ্র নরম তুলতুলে বিছানায় আধো গাঢাকা অবস্থায় উপর হয়ে ঘুমিয়ে এক পৌরুষ দেহ। উপর হয়ে শুয়ে দু হাত বালিশের ওপরে উঠে গিয়েছে, পিছনে কাঁধ-পিঠের পেশি তাতে দৃশ্যমান। সূয্যিমামা এখনো না উঠায় রুমের আবছা আলো-অন্ধকারে শিকের জানালার নীলাভ পর্দার রঙ মিশেছে।
পাশে ছোট টেবিলে চার্জে দেওয়া ফোনটা সশব্দে বেজে ওঠে।
-আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি |
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস-
বাতাসকে আর প্রানে বাঁশি বাজাতে দেওয়া হয় না। বালিশে থাকা হাতটা এসে কল রিসিভ করে, পরপরই যতটা জোরে এই রবীন্দ্র সংগীত বাজল তার থেকেও জোরে শব্দ ছুড়ে আসে ফোন থেকে,
" এই শুয়োরের বাচ্চা! তোর বাপ মরছিল তুই যে শশুর বাড়িতেই বিয়া সারতে বসছছ? "
"হুমমমম?"
এমন ঘুম জড়ানো কণ্ঠ যদি সেলিম তার ছেলের ছয়-সাত বছরে শুনতেন তাহলে হয়তো আরো একটু ঘুমাতে দিতেন। কিন্তু এই 'হুমম' এর সুর তার রাগে কেরোসিন ঢালল যেন এই মুহূর্তে।
" শুয়োর! নামাজ হইছে তোর?"
উত্তর আসে না ঘুম জড়ানো যুবক দেহ থেকে। বরংচ খানিক নড়ে-চড়ে ওপাশে মুখ ফিরিয়ে শোয়। বোধহয় এই আলস্য-ঘুম টের পেল ওপাশে থাকা সেলিম। হুংকার ধ্বনি ছুড়ে আসে ফোন থেকে,
"তোর জান হাতে তুলে নিব জানোয়ার! আমি এখন আসলে! "
কাজ হয়। দুম করে উঠে বসে আবেশ,
" রওনা দিসো?"
রাগ নিবারনে সেলিম ওপাশে চোখ বুজে।
সেটা বুঝেই বুজো চোখে আধো ঘুমন্ত অবস্থাতেই আবেশ এপাশে ঠোঁট ছড়িয়ে হেসে মাথা নুইয়ে ফেলে। হাত বাড়িয়ে ফোন টেবিল থেকে এনে কানে ধরে,
"কি করো তুমি এখন?"
উত্তর আসে না।
" এতো অস্থির কেনো? তুমি জানো ওই মাথার বাটি খোলা পাগলরে, না? চিন্তা নাই, ওরে পাঠাই দিছি আমি।"
" মাথানষ্টের সাথে ডিল করতে তুই মাথাঠিক রেখে পারবি না কিন্তু। মাথানষ্টের সাথে মাথানষ্টই পেরে ওঠবে।"
"ওক্কে! কি করো বললা না?"
" হাঁটছি। বাড়ির খোলা সবুজ আইলের পাশে।"
" কি হইল বুইড়া বয়সে? বিয়া করবা নাকি? মাথা এই গরম তো এই ঠান্ডা? "
" বুইড়া তোর বাপ? এখনো তোর আমার সাথে পেরে ওঠার শক্তি হইছে?"
" আর কইয়ো না! পাশের বাড়ির জরিনা খালারে পাগল করছো এইসব কইরা।"
সেলিম পাত্তা দেয় না ছেলের কথায়, আবার গম্ভীর হন তিনি, "নামাজ যাতে বাদ না যায়।" 
আবেশ সম্মতি জানালে ওপাশ থেকে কল কেটে যায়।
~~
আবেশ শার্ট জড়িয়ে বাইরে আসে। এই রুমের পেছন দিকটায়। সেখানে একটা দরজা আছে। যেটা খোলা পেয়ে সে বের হয়েছে। সেটার সামনেই অল্পকিছু জায়গা ঘাসসমেত। যেখানে একটা টেবিল তার দুই পাশে দুটো চেয়ার পাতা।
সেখানে সে জারিফকে আবিষ্কার করে। জারিফ দাবা নিয়ে বসেছে। জারিফ দাবাতে মনোযোগ রেখেই আওয়াজ দেয়,
"বোস।"
আবেশ তার বিপরীতে বসে যায় হেলে দুলে। ঘুমের রেশ কাটাতে ঘাড় চারদিকে আরামের সহিত ঘুড়িয়ে, হাড় ফুটানোর শব্দ করে।
জারিফ তার দান চালতে চালতে বলে, " তো কি চিন্তা করলি? কিভাবে কি আটকাবি? জেন-জি'র প্ল্যানে বিশেষত্ব আলাদা থাকার কথা। "
আবেশ মনোযোগী হয়ে ঝুকে ছিল দাবার কোটের ওপর। জারিফের কথায় একবার মুখ তুলে তাকায়। তারপর আবার ঝুকে সে তার দান দেয়। দানটা চেলেই চেয়ারটায় শরীর পেছনে এলিয়ে দেয়, দুই হাত একসাথে পিছনে নিয়ে বড়সড় একটা টানা দেয় শরীরে, ঘুমের শেষ রেশটা কাটায়।
টানা থেকে সোজা হয়েই বলল, " একটা পরামর্শ দেই? "
আবেশের হঠাৎ এভাবে পরামর্শ দেওয়ার কথা শুনে জারিফ চোখ ছোট ছোট করে ফেলে। পুর্নদৃষ্টি দেয় তার দিকে। কারন হলো এভাবে পরামর্শ দিতে চাওয়াটা নতুন ঠেকল জারিফের কাছে। এমন যেন অনুমতি চাচ্ছে তার মতটা প্রকাশ করার জন্য, যেটা সচারাচর সে করছে না গত চার বছরে। আবেশের মাথার কিছু ছিড়া তার জোড়া লেগেছে বলে জারিফের মনে হলো। যারজন্য আবেশ পূর্নমনোযোগ পায় জারিফের।
" বল্! "
" ফোনটা বার করেন। "
জারিফ আবেশের কথামতো ফোন বের করতে যায় পকেট থেকে।
"চ্যাটজিপিটি'রে কইবেন আপনার এই এই ঘটনা। ছিড়াফাড়া একটা সল্যুউশন দিব আপনারে। "
জারিফের পকেট থেকে ফোন আনতে নেওয়া হাত ওখানেই থেমে যায়। চোয়াল শক্ত করে তাকায় আবেশের দিকে।
আবেশের এতো জোর দিয়ে বলা কথাটায় জারিফের বিশ্বাস হয় না দেখে সে একটু হতাশ হয়। সে তার কথায় জারিফকে বিশ্বাস করানোর জন্য আরো একটু জোর খাটায়,
" আপনের বিশ্বাস হয় না, না? একবার তো বইলা দেখেন। কি কয় খালি ওইডা শুনেন। "
জারিফ রাগ নিয়ন্ত্রণে দৃষ্টি ঘুরায়, বিরক্তিকর শ্বাস ফেলায়।
জারিফের এমন বিপরীত ভাবভঙ্গিতে আবেশ উঠে দাড়ায়। যেখানে নাই গুরুত্ব, সেখান থেকে বজায় রাখো দুরত্ব। সে ঘুমিয়ে এলোমেলো হওয়া চুলে হাত বুলায়, পেছনে ঠেলে কয়েকবারে। খুব তৎপরতার সহিত বলে, 
"আমি এখন ব্যস্ত মানুষ। বিয়ার সময় আমার! এই সময় আপনের সাথে ঘুরঘুর করলে বউ কি ভাবব? চলি।"
এরইমধ্যে বাইরের দড়জায় শব্দ হয়।
দড়জা খোলা তবে ভদ্রতায় ভিতরে না ঢুকে দড়জায় দাড়িয়ে কয়েকবার টোকা দেয়, 
" জামাইবাবা! ও জামাইবাবা!! দেইখা যান তো কেডায় আইছে এইডা?"
ডাক শুনে আবেশ এসে পৌছায় দড়জায়, যদিও সে এমনিতেও বাহিরেই বের হওয়ার জন্য এগিয়ে এসেছিল। তবে দরজার সামনে এসে বাহিরের মানবীকে দেখে সে ভ্রু উঁচায়।
" আপনার সোয়ামীকে খুঁজিতেছেন? তিনি অপরপাশে দাবায় ব্যাস্ত। উপস্থিত হইয়া তাহার দিল-হৃদয়ে জল ঢালুন গিয়ে। তবে এইবার আমাকে এক্সকিউজ করুন।"
নিজের কথাটুকু বলে আবেশ পাশ কাটিয়ে চলে যায়। 
অনুপমা এই ইংরেজি আর বাংলার সাধু-কথ্যর জগাখিচুরি শুনে ছোটো করে শ্বাস ফেলে। তবে ওর আবেশের মুড আজকে তুলনায় বেশীই ফুরফুরে বলে মনে হলো। ও এগিয়ে যায় রুমের ভিতরের দিকে। সাথে ওকে এগিয়ে দিতে আসা মানুষটা বিদায় নেয়।
জারিফের পৌছানোর খবর পুরো বিয়েবাড়ি ছড়িয়েছে বিশেষ করে তার জি-ক্লাস কারের জন্য। আর এখন অনুপমার porsche।
~~
অনুপমার পড়নে শাড়ি। কোটা ডোরিয়া কটনের রুপালী পাড় নীল শাড়ি। আজকের চুল খোঁপায় বাঁধা, কিছুক্ষণ আগেই বেধেছে। ও এগিয়ে যায় রুমের অন্যপাশের খোলা দড়জার দিকে।
(রিনহা থেকে জারিফের বের হওয়ার পর)-
রিয়ানা কফি নিয়ে অনুপমার অফিস রুমে আসলে সেখানে ওকে পায় না। ওকে নিজ রুমে পায় নিজ ব্যগপত্র হাতানো অবস্থায়। রিয়ানা অবাকের সুরে ডাক দেয়, 
"ম্যাএম!"
"বলো।"
" আপনি কি কোনোভাবে জারিফ স্যার এর কাছে যাবেন?"
" হ্যা "
" হঠাৎ? "
" something is not right. রিয়াদ ফোন করেছিল। একটা ফেইলড মিশন নিয়ে বলল কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ছিল জারিফের রিয়েকশন! এভাবে জারিফের অস্থির হওয়া কোনো মিশন নিয়ে অস্বাভাবিক। তারওপরে সে এই মাঝরাতেই কোথাও বেরিয়ে গিয়েছে। যতসম্ভব আবেশের কাছে। এই মিশন নিয়ে আরো একটা খটকা আছে…"
কিছুটা থামে অনুপমা, তারপর যুক্ত করে,
" যার ওপর মিশনটা পরিচালনা করা হচ্ছে!"
রিয়ানা কফির মগটা পাশেই রাখে,
" আবেশ ছুটিতে। শশুড় বাড়ি। বিয়ে হচ্ছে সেখানে। "
" বিয়ে? কিভাবে জানলে? "
" রিয়াদ সেখানেই। "
" গাড়ি বের করো। আমরা সেখানেই যাচ্ছি। "
~~~
( বর্তমান)
অনিভদের বসার ঘর। তুলনায় বড় করে করা হয়েছে তাদের অন্যান্য ঘর থেকে। এই ঘরটায় ফ্লোরে কুশন পাতা হয়েছে বসার জন্য। মেঝে পুরোটা কার্পেট বিছানো। দুইপাশের দুই দেয়ালের সাথে নিচু করে দুটো সোফা পাতা হয়েছে। ঘরটার মাঝখানে কয়েকটা ছোট আয়তনের টেবিল রাখা যাতে খাবার-দাবার বা দরকারি জিনিসগুলো সেখানে রাখা যায়। ঘরটার বাইরেরপাশ পুরোটা কাচের গ্লাস লাগানো যাতে আড্ডার পাশাপাশি বাইরের প্রকৃতিও উপভোগ করা যায়।
এটা ঘরোয়াভাবে আড্ডার জন্যই তৈরি করা হয়েছে। আরো একটা রয়েছে ইনামাদের বড় ছাদের নিচের ছাদটা; যেটা বড় ছাদের সাথে সিড়ি দিয়ে সংযুক্ত। সেটা খোলা আকাশের নিচে বসার জন্য তৈরি।
আপাতত এই সকালে অনিভদের বসার ঘরটাই যথোপযুক্ত আড্ডার জন্য। যেখানে এখন পুরোটা হলুদ ফুলের তৈরি মালা ঝুলিয়ে সাজানো হয়েছে দেয়াল। হলুদ ফুলের জায়গায় জায়গায় সবুজ পাতাও স্থান পেয়েছে। কুশনগুলোও হলুদে পরিবর্তন করা হয়েছে।
ইনামা আসর বসিয়েছে। সবগুলো নিজ নিজ কাহিনি বলছে আর কিছুক্ষণ পর পর হি হি করে হাসছে। ফারহান, ফাইয়াজ, ফাইজাও আজকে বসেছে। অনিভ ফাইয়াজের পাশে বসেছে। একপর্যায়ে সে ফাইয়াজের উরুতে তার মাথা ঠেলে দিয়ে পা পাশে বসা মানুষের পিছনে ছড়িয়ে দিয়েছে। হাতে তার ফোন সে মানুষের আসরে বসে নিশ্চিন্তে গেইম খেলছে। শুধু চোখে চশমাটা লাগানো বাকি।
ইনামার বান্ধবী কয়েকজনও ইতোমধ্যে চলে এসেছে। সেই গতরাতে খবর দিয়েছে। রাইনিকাকে ইনামা ওর পাশে বসিয়েছে, রাত গ্যেয়ি তো বাত গ্যেয়ি। ইনামার কোনোকিছু মনে নেই। ও এমনই।
ইরহান বাইরে কাজে ব্যাস্ত। এই রুম গুছানোর পর ইনামা সবাইকে এখানে ডেকেছে। ইরহান কাজ করার সময় ও একবারও ভিতরে আসে নি।
রুমে এখন ইনামা, অনিজা, অনিশা, রাইনিকা, ফাইজা, ফারহান, ফাইয়াজ, অনিভ আর সাথে তাদের বন্ধুবান্ধব জমিয়ে আড্ডায় মেতেছে। শুধু বড়দের কাজের জন্য ডাক না পড়লেই হয়।
হাসাহাসির মাঝখানেই হঠাৎ নয়না, ইনামার বান্ধবী ইনামাকে প্রশ্ন করে বসে,
" কিরে ইনামা? শুনলাম ইরহান ভাইয়া এসেছে। আর তুই আজকে ঘর থেকে বের হচ্ছিস না। তোর তো ইরহান ভাইয়ার পিছনে ঘুরঘুর করার কথা আর তুই আড্ডা বসিয়েছিস। নাকি বসিয়েছিসই ইরহান ভাইয়ার সামনে না পড়ার জন্য? "
ইনামা চুপ করিয়ে দেয় নয়না কে, " চুপ থাক। মজা কর। আজাইরা জিনিস টানিস না। "
নয়নার বোন নীলা আবার রাইনিকার সেইম ক্লাস, তবে কলেজ এখানেই, রাইনিকার কলেজে যাওয়ার আগে একসাথেই পড়াশোনা করতো এরা। সে এবার রাইনিকাকে জিজ্ঞেস করে, 
" তিন্নি কই রাই? তোর বিয়ে আর তিন্নি নাই? তিন্নি জানে না? "
রাইনিকা অপ্রস্তুত হয়ে পরে, চোখ সড়িয়ে অন্যদিকে ঘুরায়। কিন্তু নীলা রাইনিকার কাধ ঝাঁকিয়ে ওঠে, 
" কি হইল তোর আবার? "
সোফার দিক থেকে ফারহান ডেকে ওঠে, 
"রাই আপুউ!"
রাইনিকা ওইদিকে তাকালে চকিতে চোখ বড়বড় হয় ওর। আবেশ আবার কখন রুমে ঢুকল? এদিকে ফারহান আরেকদফা ডেকে ওঠে,
" এই রাই আপুউ! এদিকে আসো।"
রাইনিকা একবার শুধু ঢোক গিলে, ওইদিকে পা বাড়ায়। সোফায় আবেশ, ফারহান আর ফারহানের একবন্ধু বসেছে ৷ রাইনিকা এসে নিচে কুশন নিয়ে বসে পড়ে, পাশে ফাইজা আর ওর বান্ধবীরা। ফাইয়াজ তার বন্ধুুদের সাথে কথা বলছিল, তখন সে ফারহানের পাশে আবেশকে খেয়াল করে। সে আর ওইদিকে চোখ ফেরায় না।
ইনামা সবার মুড চেঞ্জের জন্য খেলার আইডিয়া দেয়, 
" চলো! নাম্বার গেইম খেলি। আমি আগে থেকেই সব তৈরি করে রেখেছি। " বলেই ও টেবিলের নিচ থেকে একটা বোতল বের করে। বোতলের ওপরে কোনো কভার নেই। সাদা বোতল আর ভিতরের গাড় সবুজ তরল। 
ইনামা বোতলটা টেবিলের মাঝখানে রেখে মিটমিট করে হাসে,
" বলেন তো বন্ধুগন কি এইটা?"
অনিভ সোজা উঠে বসে, এক্সাইটেড হয়ে বলে,
" আমি জানি! নিম পাতার রস! "
ইনামা হেসে সায় দেয়, " একদম! খাটি গাছের পাতার রস। গতকাল রাতেই বানানো হয়েছে। টাটকা টাটকা স্বাদ। তো সিরিয়ালি যেকোনো নাম্বার চুজ করবেন, নাম্বার অনুযায়ী আমাদের কাছে প্রশ্ন আসবে। সেটার একদম সত্য উত্তর দিতে হবে। আর যদি উত্তর না দিতে চান, তাহলে, হি হি হি! বুঝতেই পারছেন। কি পান করতে হবে। তো শুরু করা যাক! কে শুরু করবে? " চারদিকে চোখ বুলিয়ে নয়নাতে ঠেকে, "নয়না কর।"
নয়না রাগী চোখে তাকায় ইনামার দিকে। ইনামা চোখের ইশারায় বোঝায় তোর শাস্তি! নে সামলা! 
নয়না চোখ বন্ধ করে নাম্বার বলে, " 7। 7 কে লাকি বলা হয়। 7 নিব আমি। "
7 এর কাগজ নেয় নয়না। 7 মুছতেই সেখানের লেখা ভাসে, " লাস্ট স্ক্রিনশট দেখাও। "
সেকেন্ডে ঘরের আওয়াজ বাড়ে; সবার উৎসাহে আর হাসিতে। নয়না নিজ ফোন বের করে আগে নিজে দেখে নেয়। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সেটা দেখে তারপরে ফোন সবার দিকে ঘুরায়। 
'মেকআপ প্রোডাক্টে'র ছবি যা সে গতকাল রাতেই নিয়ে ছিল।
এটা দেখে সবাই হতাশ হয়।
কিন্তু পরপর প্রশ্নগুলো সেই হতাশার রেশ থাকতে দেয় না। 
একজন তো পায়, " কার কাছ থেকে 'ভালোবাসি' শুনতে চেয়েছিলে কিন্তু শোনা হয় নি "। প্রশ্নটা আদ্রিতার কাছে আসে, অনিজার ফ্রেন্ড। আদ্রিতা সুন্দর করে উত্তর 
দেয়, " মা "। সাথে সাথে অনিজা চেপে ধরে ওকে।
এসবের মধ্যে রাইনিকা যখন বুদ হয়েছিল আর মুচকি মুচকি হাসছিল তখন খেয়াল করে ওর দুইদিক থেকে কেউ ঘিরে নিয়েছে ওকে। চোখ ঘুরিয়ে সেটাই দেখছিল এরইমাঝে পিছনে ওকে টেনে নেয় কেউ। ও মাথা ওপরে তুলে আবেশকে পায়। যে পরম মনোযোগের সাথে রাইনিকার চুলে হাত পাকাচ্ছে। মাথায় যাতে টান না লাগে সেজন্য সে কিছুটা এগিয়ে নিলো ওকে।
রাইনিকা সেটা দেখে একটা শ্বাস ফেলে আবার খেলায় মনোযোগ দেয়।
এতোক্ষণে আদ্রিতাকে চেপেচুপে সত্যকথা বের করানোতে রাজি করানো গিয়েছে, শেষপর্যন্ত বেচারি তার ক্রাশ; ক্লাসের ফার্স্ট বয় মিলনের নাম নিতে বাধ্য হয়। আর সবাই হাসতে হাসতে পেট ব্যাথার অবস্থা। তবে কেউ এখনো সেই তরল মুখে নেওয়ার সাহস করে নি।
এভাবে ঘুরতে ঘুরতে রাইনিকার কাছে আসে, " নাম্বার 37- "
"রাগের সর্বোচ্চ পর্যায় কি?……… নিজের ক্ষতি! " 
এক উত্তরে পুরো ঘর নিশ্চুপ হয়ে যায়। আবেশের চুলে প্যাচানো হাত থেমেছে। ইনামা বিরক্তির সাথে বলে ওঠে, 
" কিসব! বুঝো না? রাগ করলে তো নিজেরই ক্ষতি। সেটাই বুঝাইতে চাইছে আমার বিয়ে করতে চলা বইন। "
তখনই দড়জায় জোড় টোকা পড়ে। সাথে উচ্চস্বরে ঝাড়ি, 
" এই ইনামা! কি লাগাইলি। দড়জা খোল! জামাই-বউরে ঘরের ভিতর নিয়া বইসা আছছ। কাজ নাই? " 
জামাই এই ঘরে শুনে সবাই অবাক হয়। বর কে এইখানে? রাইনিকার হবু বর এই রুমে? সবাই চোখ এদিক-ওদিক নিয়ে খুজতে থাকে বরকে। সাথে একে-ওকে জিজ্ঞাসা করছে বর কে? ইনামা এদিকে দড়জা খুলে দিয়েছে। আবেশ রাইনিকা চলে যায় রুমের বাইরে।
ইনামাকে তখন জিজ্ঞেস করলে ইনামা আর আবেশকে দেখাতে পারে না।
অনিভের আম্মু তাদের নিতে এসেছে হলুদের জন্য। তিনি আগে আগে হাটছেন। কিছুটা দুরত্ব রেখে পিছনে আবেশ-রাইনিকা।
" কি কি ক্ষতি করেছ নিজের?"
আবেশের প্রশ্নে রাইনিকা হাঁটার মাঝেই মাথা উঁচিয়ে আবেশের দিকে তাকায়, " কি বলছেন এইসব? "
" গতকাল জন্মেছ? "
" কিহ! গতকাল জন্মাব কেনো? " রাইনিকা আবেশের প্রশ্ন হেসে উড়িয়ে দেয়।
তখনি আবেশের ধরে থাকা রাইনিকার কব্জিতে টান— পরক্ষণেই কোমড়ে আবেশের হাত পায়। নিজেকে বদ্ধ কক্ষে আবিষ্কার করে; বাথরুম, অনিভদের। হৃদপিণ্ড যেন থেমে গিয়েছিল সেকেন্ডের জন্য। আর এখন জোড়েজোড়ে বিট করছে। সামনে ওর ওপর ঝুঁকে থাকা আবেশ এক হাত পিছনে দড়জার ওপর রাখা, যেটা মাত্র হয়তোবা বন্ধ করেছে সে, কিন্তু কোনোধরনের শব্দ রাইনিকা পায় নি। জোরে জোরে শ্বাস নিতে আর ফেলতে ফেলতে রাইনিকা উপরে আবেশের শান্ত-কঠিন মুখে তাকায়, বুকে মুঠিতে ঘুষি দেয়,
" কি করছেন বলুন তোহ্?"
আবেশের কাঠিন্য তার চোখে ভাসছে। সে রাইনিকার ঠেস দিয়ে দাড়ানো দরজার মুখোমুখি দাড়িয়ে; একদম ঝুকে রাইনিকার ওপর। খড়খড়ি লাগানো দড়জার ফাঁক গলে আসা সূর্যের আলো আবেশের এক চোখে পড়েছে, কিন্তু তাতে তার চোখের পাতার কোনো টলমলে ভাব নেই, দৃঢ় দৃষ্টি।
চোখের রঙ কেমন চিনাবালির মতো, কিছুটা কালশে অথবা কিছুটা সাদা, অথবা দুটোরই মিশ্রণ। যা সূর্যের আলোয় আরো অদ্ভুত রঙ পেয়েছে। রাইনিকা কখনো খেয়াল করে নি। আজই চোখে পড়েছে। 
রাইনিকার ভাবনা ভাঙে আবেশের মৃদু ঘাড় কাত করায়। তবে তার স্থির দৃষ্টি নড়ে নি।
" কি কি ক্ষতি করেছ দেখাও! "
দুই ভ্রু উঁচিয়ে আসে ওর। রাইনিকা বেক্কল বনে যায়।লোকটা পাগল নাকি? যাতা বলছে? মুখ দিয়ে কথা আসে না, হতভম্ব পুরোটা ওর চোখই বুঝায়।
" কি হলো! শরীরে কি কি করেছ দেখাতে বলেছি। "
" পাগল হয়েছেন আপনি? "
আবেশ কথা বাড়ায় না। খোলা চুলে হাত গলিয়ে দেয়। হঠাৎ এমন ছোয়ায় রাইনিকার কাঁধ জড়ো হয়ে আসে। আবেশ ইতোমধ্যে সব চুল একহাতে উঁচিয়ে ধরে মুখ এগিয়ে নিয়েছে কাঁধের ধারে। পুরুষ মানবটার কঠিন উপস্থিতি রাইনিকার ভিতসহ নাড়িয়ে তোলে।
রাইনিকা আবেশের চুলে ধরা হাতের বাহু খামচে ধরেছে, 
" আবেশ! থামতে বলছি আমি। "
--------------
চলবে~
#wrong_profile 
#সেয়ারা_তিষিকা 
#পর্ব২৪ (শেষাংশ)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন