#জল_তরঙ্গে—#পর্বঃ৫
#ইরফা_মাহনাজ
____________________
কুঞ্জ চাকরির কারণে ওকে বার বার বিভিন্ন শহরে যেতে হয়। গুঞ্জনের মা লতা অনেক বছর আগেই মারা যায়। তারপর থেকেই দুই ভাইবোনের পথ চলা।
কুঞ্জ খুব সহজ সরল মানুষ। যেভাবেই বুঝাবে ও সেভাবেই বুঝবে। শান্তি প্রিয় কুঞ্জ ঝগড়া ঝামেলা বেশি পছন্দ করে না। যথাসম্ভব এড়িয়ে চলে।
এই সুযোগটাই নেয় তটিনী। বিয়ের প্রথম প্রথম সব ঠিক চললেও পরে শুরু হয় তটিনীর গুঞ্জনকে নিয়ে খোঁচা মূলক বাক্য। গুঞ্জন এখন প্রতিবাদ করতে জানলেও তখন চুপ করে থাকতো।
ভাইয়ের মতো সেও চাইতো না অশান্তি। তাই তটিনীর কাজ গুলোর ব্যাপারে ভাইকে কিছু বলা আর বিচার দেওয়া এরকম কিছুই করতো না সে।
কুঞ্জের বেশির ভাগ সময় কাজের জন্য বাহিরে থাকায় তটিনী বাপের বাড়িই পড়ে থাকে। তটিনীর সাথে কুঞ্জের বিয়ের সাতমাসের মাথায় লতা মারা যায়।
লতা থাকাকালীন যে শাশুড়ির খুব সেবা যত্ন করেছে তেমন নয়। লতা অসুস্থ থাকায় কখন কি হয়ে যায় সেই চিন্তা থেকেই লতার ইচ্ছে অনুযায়ী তটিনী কুঞ্জের বিয়ে হয়।
ডিভোর্স এর পর কুঞ্জ বলেছিলো ওকে বাড়িতে যেতে কিন্তু গুঞ্জন সাফ জানিয়ে দেয় বাকি লড়াই ও নিজের মতো লড়তে চায়। বাকিটা জীবন সে পার করবে নিজের ক্ষমতায়।
জানালার গ্রিলের সাথে মাথা ঠেকিয়ে বাহিরের দিকে আপন মনে চেয়ে আছে। ওদের এই জানালা দিয়ে একটা নীলকণ্ঠ ফুলের গাছ দেখা যায়। পানির মতো নীল রঙের ফুলটা দেখলেই গুঞ্জনের নিজের জীবনের উত্থাল পাতাল "জল তরঙ্গের" ঢেউয়ের কথা গুলো মনে পড়ে।
অন্যমনস্ক অবস্থাতেই থেকে অস্ফুটে আওড়ায়,
--- "মূর্খ সমাজ নারীর ধৈর্য্য কখনো মাপতে যেও না। মাপতে গেলে নিজেরাই অধৈর্য্য হয়ে পড়বে। মানিয়ে নেওয়ার হলে বিচ্ছেদ হতো না।"
একটা ডিভোর্সি নারীর জন্য একটা সমাজ যে কতটা নিষ্ঠুর হয় তা এই ৫ বছরে হাড়ে হাড়ে গুঞ্জন টের পেয়েছে। তাদের এক কথা
"আরেকটু ধৈর্য্য ধরলেই তো হতো।মেয়েদের একটু মানিয়ে নিয়েই সংসার করতে হয় "
**************************
সবুজ রঙের একটা সালোয়ার-কামিজ পড়েছে আলতা। গুঞ্জনের জ্বর একটু পড়েছে। মেয়েটা পুরোপুরি সুস্থ নয়। তবুও এ অবস্থাতেই আলতাকে যেতে হবে।
ওর সৎ মায়ের ফোন এসেছিলো গতদিন। তাকে যেতে বলেছে। এতোদিন পর সৎ মায়ের এমন মিঠা বাক্য হজম করতে কষ্ট হলেও ভালোবাসার কাঙাল আলতা মায়ের মমতার পরশ পেতে যাওয়ার জন্য রাজি হয়ে যায়।
গুঞ্জনও বুঝেছিলো। মেয়েটা কি পরিমান কষ্ট করে সেটা ও নিজে দেখে। এখন যদি পরিবারের সান্নিধ্যে একটু খুশি হয় তো সেই খুশিই সই। আলতা যেতে না যাওয়ার গো ধরলেও গুঞ্জন জোর করেই পাঠায়।
তাকে নিয়ে চিন্তা করতে না বলে। সে ঠিক আছে। বড় বড় ঝড় যেখানে অনায়াসে পাড়ি দিয়েছে সেখানে এই তুচ্ছ জ্বর কিছুই না।
রাঙামাটি যাবে আলতা। গুঞ্জন আর আলতা দুজনেই উত্তরার একটা বাসায় ভাড়া থাকে। সেখান থেকে কমলাপুর রেলস্টেশন যেতে হবে আলতাকে। তারপর চট্টগ্রাম হয়ে রাঙামাটি। যেহেতু রাঙামাটি সরাসরি যাওয়া যায় না তাই ভেঙ্গে ভেঙেই যাওয়া লাগবে।
আলতা সকাল সকাল বাসা থেকে বের হওয়ায় জ্যামে পড়তে হয়নি। ভালোভাবেই স্টেশনে এসে পৌছায়। সাইন বোর্ডে জ্বল জ্বল করছে "কমলাপুর রেল ওয়ে স্টেশন "
সকাল হলেও এখনই স্টেশনে মানুষের ভিড় উপচে পড়ছে। মানুষের মধ্যে হাতে কালো রঙের একটা ব্যাগ নিয়ে ঠেলেঠুলে নিজের বগির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আলতা।
সকাল সকালই ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে গেছে। না তো এখন উৎসব মৌসুম তাও মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখে অবাকই লাগে আলতার। টিকিট গতকাল রাতেই অনলাইনে কেটে রেখেছিলো তাই সমস্যা হয়নি।
না হয় এখন দেখা যেতো দূরে দাড়ানো টিকিট কাউন্টারের সামনে মানুষের ইয়া বড় লাইনের মাঝে আলতা ঠেসে ঠুসে দাড়িয়ে আছে টিকিট কাটার জন্য। মুখ দিয়ে আপনাআপনি তার স্বস্তির নিঃশাস বেরিয়ে আসে।
***************************
চাইলেই গুঞ্জন নিজের ভাইয়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে চলাফেরা করতে পারতো। কুঞ্জ বলেছেও বেশ কয়েকবার। কিন্তু গুঞ্জনই মানা করে দেয়। সে নিজের পায়ে সাবলম্বী হতে চায়।
পার্ট টাইম কাজ করে একলা মানুষ গুঞ্জনের দিনকাল বেশ দিব্যি হেসে খেলে কেটে যায়। রেডিও স্টেশনের জব তার। আর জে হিসেবে গুঞ্জনের বেশ ভালো লাগে।
মানুষের জন্য তথ্য, খবর, গান প্রচার করতে তার আনন্দই লাগে। এই যে বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন চাওয়া-পাওয়া আকাঙ্খা , চয়েস গুলো এগুলো শুনে শুনতে শুনতে কখনো খারাপ লাগে তো কখনো ভালো লাগে।
একেকজন তাদের মনের মানুষকে মনের কথা জানাতে বলে তো কেউ ছেকা খেয়ে দেবদাস হয়ে প্রিয় মানুষটার স্মৃতি বিচরণ করে। তার স্মরণে তার প্রিয় গানটি বাজাতে বলে।
রেডিও স্টেশনে হোস্টিং এর পাশাপাশি গুঞ্জন টিউশনিও করায়। এই জায়গায় জব পাওয়ার আগে থেকে টিউশন করাতো পরে ছেড়ে দিলেও একটা ছেড়ে দিতে পারেনি।
সর্বপ্রথম এই টিউশন টাই নেয় সে। তাছাড়া এটা ওদের কাছেই। উত্তরার সেক্টর -৭ এ। সব মিলিয়ে আর ছাড়া হয়নি। আজকেও পড়াতে এসেছিলো। সামনেই যে স্টুডেন্টের এইচএসসি পরীক্ষা।
জ্বর কমলেও পুরোপুরি সাড়েনি। দুর্বল শরীরে হেঁটে হেঁটেই বাসায় ফিরছে গুঞ্জন। হুট করে চারদিকে অন্ধকার হয়ে গেলো। এই বুঝি ঢলে পড়লো ও। বলতে না বলতেই পিচঢালা রাস্তায় ঢলে পড়ে।
রাস্তায় একটা মেয়েকে হঠাৎ জ্ঞান হারাতে দেখে পাবলিক মুহূর্তেই জমা হয়ে যায়। জটলা পাকিয়ে সেন্সলেস গুঞ্জনের চারপাশে গোল হয়ে দাড়ায়।
হাতের যান্ত্রিক যন্ত্রটি বের করে ভিডিও ধারণ ও ছবি তুলতে থাকলেও কেউ এসে হেল্প করার নেই। এটাই বোধহয় আমাদের দেশের অবস্থা।
এদিকে দীর্ঘদিন বাদে কলেজ ফ্রেন্ড এর সাথে দেখা করতে উত্তরা আসে তরঙ্গ। বাসায় আপাতত তার বিয়ের কার্যক্রম স্থগিত আছে। গতদিন সে সত্যি বলতে নিজের ক্যারেক্টারের বাহিরে চলে গেছিলো।
ওর চরিত্রটা সেসব মানুষের কাতারে পড়ে যারা নিজেদের অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করে কিংবা তারা নিজেদের অনুভূতি বুঝাতে অক্ষম হয়। আর এখানেই অপর পক্ষের মানুষটি ভুল বুঝে।
--- রিডিকিউলাস পিপল!
রাস্তার মাঝে মানুষের জটলা দেখে বিরক্ত হয়েই কথাটি বলে তরঙ্গ। গাড়ির স্টেয়ারিং চেপে রেখে অতপর সিটবেল্ট খুলে ধূপধাপ পা ফেলে গাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় ভিড়ের দিকে।
যতটা বিরক্ত আর রাগ নিয়ে এসেছিলো তা যেনো মুহূর্তেই ভাটা পড়ে সে জায়গায় উদয় হয় অবাকতা। মুখ দিয়ে বের হয়ে যায় একটি শব্দ,
--- গুঞ্জন!
--- আপনার পরিচিত নাকি?
তরঙ্গের পাশে দাড়ানো লোকটা তরঙ্গের মুখে মেয়েটির নাম দেখে জিজ্ঞেস করে। উত্তরে শুধু মাথা নাড়িয়ে হ্যা বুঝায়। লোকটা তখন তরঙ্গকে নিয়ে গুঞ্জনের কাছে যায়।
ঘোর থেকে বেরিয়ে আশেপাশের এই অবস্থা দেখে হুংকার ছাড়ে সকলের উদ্দেশ্য,
--- স্টপ দিস ফুলিশ থিংস। এখানে শুটিং হচ্ছে না যে এভাবে ভিডিও করতে হবে। হেল্প করতে না পারলে লিভ দিস প্লেস।
তরঙ্গের গম্ভীর স্বরের কথায় উপস্থিত ভিডিও ধারণ করা সকলে তাদের ফোন পকেটে ভরলেও সেখান থেকে যায়না। আমরা বাঙালিরা হচ্ছি কৌতূহল প্রজাতির। কাহিনী দেখার জন্য দাড়িয়ে রয়।
তরঙ্গ আর এসব ঘাটাতে গেলো না। এরা যা ইচ্ছে করুক। ও সময় নষ্ট না করে দ্রুত গুঞ্জনকে পাঁজাকোলে করে নিয়ে গেলো নিজের গাড়ির কাছে।
প্যাসেঞ্জার সিটের দরজা খুলে গুঞ্জনকে সেখানে বসায়। তারপর নিজে গিয়ে বসে ড্রাইভিং সিটে। আলতো করে গুঞ্জনের মাথাটা নিজের বাম হাতের সাহায্যে বক্ষে চেপে ডান হাতের দ্বারা স্টেয়ারিং ঘুরায়।
*******************
--- ইয়্যু ইউজলেস বি*চ লেডি।
--- মাইন্ড ইয়্যুর ল্যাঙ্গুয়েজ তরণ।
--- রাখ তোর ল্যাঙ্গুয়েজ। হাহ! ড্যাম গড! আহহহ আ'ম জাস্ট গোয়িং ক্রেজি!
তরণের কথার বিপরীতে ওপাশের রমণী এবার উত্তেজিত হয়ে পড়লো। তন্দ্রা হড়বড় করে বলে উঠলো,
--- ঝগড়া পরেও করা যাবে এখন আমরা কি করবো ব্রো? তরঙ্গ হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাট আই জাস্ট নিড হিম! আমি ভালোবাসি ডুড! আহহহ!
--- তুই আসলেই একটা ইউজলেস। যে করেই হোক তরঙ্গ ভাইকে নিজের আয়ত্তে আন। এখন ফোন রাখ।
বলেই ফোন কেটে দিলো। আছাড় মারতে গিয়েও মারলো না।
--- গুঞ্জন!গুঞ্জন!গুঞ্জন! দিস ফা* লেডি আমাকে পাগল করে দিলো। আবার সব কিছু ভাবতে হবে। আর এই তরঙ্গ ভাই ও একটা যাচ্ছে তাই! এক্স বউয়ের প্রতি ভালোবাসা উতলে পড়ছে।
ট্যুরে যাবে তরণ। মাইন্ড ফ্রেশ করে একটা জব্বর প্ল্যান ভাববে। রাঙামাটি যাচ্ছে ফ্রেন্ডদের সাথে ট্যুরে। আর একটু আগে তন্দ্রা ফোন দিয়ে তরঙ্গের বিয়ে না করার ব্যাপারটা জানাতেই রেগে যায় তরণ।
তরণের ফোন রাখতেই ওর বন্ধু সূর্য ওকে জিজ্ঞেস করে,
--- এনিথিং রং তরণ?
--- নোপ! জাস্ট অ্যা সিলি ফ্যামিলি ইস্যু।
সবাইকে উদ্দেশ্য করে তরণ বলে উঠে,
--- হেভ সাম ফান গাইস। এনজয় দ্যা ট্রেন জার্নি। লেটস গো।
ওদের কথার মাঝেই ভেসে আসে এক মেয়েলি রিনরিনে আওয়াজ।
--- এক্সকিউজ মি? এটা আমার সিট আপনি যদি জায়গা দিতেন আমি গিয়ে বসতাম।
আলতা নিজের সিট খুঁজতে খুঁজতে এসে দেখে সামনাসামনি দুটো সিট। এক পাশে একটা ছেলে একাই বসে আছে। আর ওর সামনে দুজন ছেলে আর একটা মেয়ে বসা।
অদ্ভুদ লাগলো তিন জন ছেলের মধ্যে একটা মেয়েকে দেখে। ও আর এতো কিছু ভাবতে গেলো না। এখন আপাতত বসতে পারলেই হলো।
--- হু আর ইয়্যু?
তরণের ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করা কথাটার বিপরীতে আলতা বলে,
--- আমি এই ট্রেনের একজন যাত্রী।
থতমত খেয়ে গেলো তরণ। ও কিছু বলার আগেই আলতা আবারো বলে উঠলো,
--- আপনি কি বের হবেন? নাকি আমি লোক ডাকবো?
মেয়েটা তাকে হুমকি দিচ্ছে! এই তরণকে? হাউ ডেয়ার সি? রেগে যেই না কিছু বলতে যাবে অমনি পাশে থাকা এক মহিলার ধাক্কায় আলতা গিয়ে বসে পড়ে তরণের কোলের উপর।
পড়ে যাওয়ার ভয়ে তরণের কলার আঁকড়ে ওকে ধরে আলতা আর তরণ ওর ভারসাম্য রক্ষায় ওর কোমর চেপে ওকে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়।
___________
চলবে~