ফন্ট সাইজ:
থিম:
কাজল্লাতার মেঘ

৫ম পর্ব

লেখক: Rahmatunnesa

কাজললতার মেঘ ☁️

লেখিকা: রহমাতুন্নেছা
পর্ব ৫
পরের দিন সকালে রোজকার মতো ঘড়ির কাঁটায় চোখ পড়ার আগেই ঘুম ভেঙে গেল সবার। শীতের সকাল তখন তার সর্বগ্রাসী রূপ নিয়ে চারপাশটা গ্রাস করে আছে। হাড়কাঁপানো ঠান্ডা বাতাসে ঘরের ভেতরটাও যেন জমে যাওয়ার উপক্রম! বাইরে ঘন কুয়াশার চাদরে পুরো পৃথিবীটা এমনভাবে ঢেকে গেছে যে কয়েক হাত দূরের কিছু আর দেখার উপায় নেই। গাছের কচি পাতা থেকে শিশির ভেজা পানি টপ টপ করে ঝরে পড়ার শব্দ চারপাশের নিস্তব্ধতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কী এক অপরূপ মুগ্ধতা ছড়ানো শান্ত সকাল! সাদা কুয়াশার এই চাদর ভেদ করে যেন মনে হয় মহান সৃষ্টিকর্তা নিজের হাতে পুরো পৃথিবীকে এক অদ্ভুত মায়ায় লুকিয়ে রেখেছেন।
এমনই এক স্নিগ্ধ ও পবিত্র সকালে প্রতিদিনের মতো মা ও মেয়ে অজু সেরে দাঁড়িয়ে গেলেন জায়নামাজে। ফজর ওয়াক্তের নামাজ আদায় শেষে ফাতেমা বেগম আর জান্নাতুল পবিত্র কোরআন শরিফ হাতে নিয়ে পাশাপাশি বসে গেলেন।
চারপাশের পিনপতন নীরবতার মাঝে ঝিরঝিরে কুয়াশাঘেরা সকালে মা-মেয়ের কণ্ঠে কোরআনের তিলাওয়াত ঘরের পরিবেশটাকে যেন জান্নাতের টুকরো বানিয়ে দিলো। কিছু সময় তিলাওয়াত করার পর কোরআনের পাতার ওপর থেকে চোখ তুলে জান্নাতুল আনমনে বাইরে ঘন কুয়াশার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বড় একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল—
"আচ্ছা মা, বাইরে কুয়াশার এই রূপটা কী সুন্দর না? আল্লাহ তাআলা কত সুন্দর করেই না এই দুনিয়াটা সৃষ্টি করেছেন! আচ্ছা মা, আমি তো ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি—আল্লাহর হুকুম ছাড়া নাকি গাছের পাতাও নড়ে না। তাই না?"
মেয়ের মুখে এমন সুন্দর প্রশ্ন শুনে ফাতেমা বেগম কোরআন শরিফটা বুকে জড়িয়ে রেখে মৃদু হেসে বললেন, 
"হ্যাঁ রে সোনা, একদম ঠিক শুনেছিস। এই বিশাল মহাবিশ্বের অণু-পরমাণু থেকে শুরু করে গাছের একটা পাতাও তাঁর হুকুম ছাড়া নড়ার ক্ষমতা রাখে না।"
জান্নাতুল একটু কুঁচকে গিয়ে আরও গভীর কৌতূহলে জিজ্ঞেস করল, "তাহলে মা, মানুষ যখন কোনো চুরি করে, মিথ্যা বলে বা কোনো খারাপ কাজ করে, তখন কি সেগুলোর পেছনেও আল্লাহর হুকুম থাকে? এগুলো কি আল্লাহর নির্দেশেই হয়?"
মায়ের মুখে এক চিলতে মায়াবী হাসি ফুটে উঠল। তিনি পরম স্নেহে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, "আরে পাগলি মেয়ে! আল্লাহ তাআলা মানুষকে জ্ঞান এবং বিবেক দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। 
তিনি মানুষকে দুটো পথ চিনিয়ে দিয়েছেন—একটি হলো সঠিক বা হেদায়াতের পথ, অন্যটি হলো ভুলের বা গোমরাহীর পথ। কোরআন শরিফে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন—'আমি তো তাকে পথ দেখিয়ে দিয়েছি, এখন সে হয় কৃতজ্ঞ হয়, 
না হয় অকৃতজ্ঞ হয়।' 
(সুরা দাহর, আয়াত ৩)। 
আল্লাহ তাআলা মানুষকে ভালো-মন্দ বেছে নেওয়ার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি বা এখতিয়ার দিয়েছেন। এখন তুই যদি ভালো পথ ছেড়ে দিয়ে জেনেশুনে ভুলের পথে পা বাড়াস, তবে সেটার দায় তো তোর নিজেরই, তাই না?"
জান্নাতুল এবার একটু নাছোড়বান্দা হয়ে বলল, "কিন্তু মা, আমরা তো আল্লাহরই বান্দা, তাই না? আমরা তো অতশত বুঝি না। কোনটা ভুল আর কোনটা ঠিক, সেটা কি আল্লাহ তালা আমাদের আলাদা করে চেনার কোনো রাস্তা রাখেননি? বুঝবো কি করে মা আমরা গুনাহের পথে যাচ্ছি নাকি ভালো পথে যাচ্ছে"
ফাতেমা বেগম কোরআন শরিফটি নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে মেয়ের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বোঝানোর সুরে বললেন, "অবশ্যই রেখেছেন রে মা! আল্লাহ তাআলা প্রতিটি মানুষের ভেতরে একটা অভ্যন্তরীণ বিচারক বসিয়ে দিয়েছেন, যাকে আমরা বিবেক বলি। তুই নিজেই খেয়াল করে দেখিস কখনো—তুই যখনই জীবনে কোনো ভুল বা খারাপ কাজ করতে যাবি, তোর বুকের ভেতরটা কেমন যেন দুলে উঠবে, হাড়কাঁপানো অস্বস্তি কাজ করবে, বুক ধড়ফড় করবে এবং মন তোর বারবার সায় দেবে না যে কাজটা তুই করিস। ঠিক তখনই তুই বুঝে যাবি যে তুই ভুল পথে পা দিচ্ছিস! আর এর বিপরীতটা হলো—যখন তুই কোনো ভালো কাজ করবি, তখন তোর মনটা অদ্ভুত এক শান্তিতে ভরে যাবে, যা দুনিয়ার অন্য কোথাও খুঁজলেও পাবি না। ওই শান্তিটাই হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির ইশারা।"
মায়ের এই সুন্দর ও গভীর কথামালার মাঝে সকালের আলো আরেকটু উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
ততক্ষণে ঘরের অন্য প্রান্ত থেকে বড় ভাই আরিফ কাজের উদ্দেশ্যে তৈরি হয়ে উঠোনে এসে দাঁড়াল। বাইরে তখনো হালকা কুয়াশা ঝরছে। কাজের তাড়া থাকায় সে আর দেরি না করে জুতো পরতে শুরু করল।
ছেলের যাওয়ার সময় মা ফাতেমা বেগম উঠে গিয়ে আরিফের মাথায় হাত রাখলেন। স্নেহের পরশ বুলিয়ে তিনবার ফুঁ দিয়ে বললেন, 
"আল্লাহর নাম নিয়ে যা বাবা, সব বিপদ থেকে তোকে যেন আমার আল্লাহ হেফাজত করেন!"
—মায়ের এই তিনবার ফুঁ দিয়ে দোয়া করার মাঝে লুকিয়ে থাকে এক মায়ের বুকভাঙ্গা দুশ্চিন্তা আর অকৃত্রিম ভালোবাসা। আরিফ মায়ের কপালে হাত ছুঁইয়ে মুচকি হেসে কাজের পথে বেরিয়ে গেল।
মাটির ঘরের এই ছোট্ট উঠোন, কুয়াশাভেজা সকাল আর মা-মেয়ের এই না বলা কথার মিতালী জীবনটার গভীর এক অন্যরকম সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলল।
ছেলেটির মাথায় ফুঁ দিয়ে মা ফাতেমা বেগম যখন ঘরের ভেতর ফিরে এলেন, তখন জান্নাতুল কৌতূহলী চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "মা, তুমি কি পড়ে ভাইয়ার মাথায় তিনবার ফুঁ দিলে? প্রতিদিন কি কোনো নির্দিষ্ট দোয়া পড়ে ফুঁ দিতে হয়? এটা আসলে কীসের দোয়া, এর আমলটা কী আর পবিত্র কোরআনে কি এটার কোনো আয়াত আছে?"
মা মুচকি হেসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, "আরে পাগলি মেয়ে, এটা কোনো কঠিন জাদুমন্ত্র নয়। এটা হলো আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শেখানো একটি সুন্নতি আমল। যখন ঘরের কোনো প্রিয় মানুষ বা সন্তান কাজের উদ্দেশ্যে বাইরে যায়, তখন তার হিফাজতের জন্য এই দোয়াটি পড়ে ফুঁ দেওয়া হয়।"
জান্নাতুল আরও আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল, "তাহলে মা, এটা কোন আয়াতে আছে আর এর ব্যাখ্যাটাই বা কী?"
মা কোরআন শরিফের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে বললেন, "পবিত্র কোরআনের সুরা ইউসুফের ৬৪ নম্বর আয়াতে হজরত ইয়াকুব (আ.) যখন তাঁর সন্তানদের মিসরে পাঠাচ্ছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন—'আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ রক্ষক এবং তিনি সব দয়ালুদের চেয়ে দয়ালু।' (فَاللَّهُ خَيْرٌ حَافِظاً ۖ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ)। আর হাদিসে বর্ণিত আছে, প্রিয় নবী (সা.) বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বা কাউকে বিদায় দেওয়ার সময় আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এই দোয়া পাঠ করতেন। এর মূল কাজ বা উপকারিতা হলো—এটি আল্লাহর রহমতের একটা অদৃশ্য চাদর তৈরি করে, যা মানুষকে যেকোনো দুর্ঘটনা, বিপদ-আপদ আর বদনজর থেকে রক্ষা করে।"
মা একটু থেমে আবার জিজ্ঞেস করলেন, "আচ্ছা রে জানু, তোর কি মনে আছে প্রতিদিন ঘর থেকে বের হওয়ার সময় কোন দোয়াটা পড়তে হয়?"
জান্নাতুল দাঁত কেলিয়ে একগাল হেসে বলল, "হ্যাঁ মা, আমার একদম মনে আছে! 
বিসমিল্লাহ তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।"
মা খুশি হয়ে বললেন, "মাশাআল্লাহ! এবার এই দোয়ার অর্থ ও ফজিলতটাও একটু শোন। এর অর্থ হলো—'আল্লাহর নামে শুরু করলাম, আল্লাহর ওপরই ভরসা করলাম, আর পাপ থেকে বাঁচার শক্তি কিংবা নেক কাজ করার ক্ষমতা আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কারো নেই।' তুই যখন ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এই দোয়া পড়বি, তখন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন—'তোমার জন্য হেদায়েত যথেষ্ট হলো, তোমার সুরক্ষাই আমার দায়িত্ব হলো এবং সমস্ত বিপদ তোমার থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হলো!' শয়তান পর্যন্ত তখন তোর থেকে দূরে সরে যায়।"
,,,সুবহানাল্লাহ,,
(যে গল্পটি পড়ছো আল্লাহতালার সুন্দর এই নিয়মের জন্য হলেও সবাই একবার সুবহানাল্লাহ বলে যাবা)?
মায়ের সাথে এই সুন্দর দ্বীনি আলোচনার রেশ কাটতে না কাটতেই দরজার বাইরে থেকে চেনা কোলাহল ভেসে এল। জান্নাতের বান্ধবীরা তাকে ডাকতে চলে এসেছে—রিয়া, মিম আর প্রিয়া।
দরজায় এসে রিয়া চিল্লায়ে উঠল, "কিরে জানু! আজ এত লেট করছিস কেন বল তো? আমরা কখন থেকে গেটে দাঁড়িয়ে আছি!"
জান্নাতুল বোরকা ঠিক করতে করতে বাইরে এসে বলল, "আরে ভাই, একটু গুছিয়ে বের হতে হয় তো! তোরা এত ব্যস্ত হচ্ছিস কেন?"
পথে নামার পর প্রিয়া তার স্বভাবসুলভ দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে উঠল, "দোস্ত জানু! জানিস, আমার আজকের দিনটা অন্যরকম! আমার ওই নতুন বয়ফ্রেন্ডটার সাথে আজকে কথা বলব তো, তাই একটু টেনশনে আছি!"
মিম চোখ গোল গোল করে জিজ্ঞেস করল, "থামা তো! ভাই তোর এই বয়ফ্রেন্ডের লিস্ট তো আর শেষ হয় না! বল তো, এটা কত নাম্বার প্রেমিক তোর?"
প্রিয়া একটু লজ্জা পাওয়ার ভান করে নির্লজ্জের মতো হেসে বলল, "আরে ভাই, এটা মনে হয় দশ নাম্বার হতে পারে!"
রিয়া তখন খিলখিল করে হেসে বলে উঠল, "দশ নাম্বার? ধুর মিয়া! তুই এক এক করে কয়টা চালাস বল তো? 
প্রিয়া,,,আমি তো একসাথে ১০ টা চালাই! এলাকার সবাই আমাকে চেনে বুঝলি, একেকটার নাম দিয়েছি একেকটা কোড নম্বর!"
মিম,, ভাই তুই কি রেকর্ড করতে চাস, 
প্রিয়া, আমি ভাবছি আমি বারোটা প্রেম করবো, এখনো দুটো বাখি আছে
মিম, পরে সবাই তোকে বারোভাতারী বলবে তাই তো,
প্রিয়া, হ্যাঁরে ভাই, 🤧 😁 জীবনে তো কিছু করতে পারব না , এইজন্য এই রাস্তায় নেমেছি ভাই কিছুতো করতে হবে না। তোদের মত তো আমি আর ভদ্র না এ জন্য তো কিছু একটা করতে হবে। তোদের মান-সম্মান তো রাখতে হবে,
জান্নাতুল,,,, আস্তাগফিরুল্লাহ বিডি, কি বলিস এগুলো তুই, ভাই আমি এতক্ষন মায়ের কাছ থেকে, কত সুন্দর সুন্দর কথা শুনে আসলাম ভাবলাম হয়তো আমার সোআপ কামাই হইছে,
 বাট তোদের সাথে এসে আমার সব শেষ,
প্রতিদিন ভাবি ভাল হয়ে যাব কিন্তু তোদের জ্বালায় আর হলো না, 
বান্ধবীদের এমন ফাজলামো আর প্রেমের খতিয়ান শুনে রাস্তার মাঝখানেই চারজনে মিলে এমন জোরে হাসতে শুরু করল যে আশপাশের মানুষ তাদের দিকে অবাক হয়ে তাকাতে লাগল। হাসতে হাসতে তারা চারজন মিলে ইস্কুলের রাস্তার দিকে এগোতে লাগল।
কিন্তু হাসাহাসি করতে করতে কিছুটা পথ এগোতেই তাদের আনন্দটা যেন একমুহূর্তে উবে গেল! একটু সামনে তাকাতেই তারা দেখতে পেল—আরে! এ কার মুখোমুখি তারা!
সে তো সেই ইমন মোড়ল! মানে, সেই 'কবি সাহেব'!
জান্নাতুল থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তার চোখ দুটো চড়কগাছ! সে মনে মনে ভাবল, "ভাই, আমি কি কোনো স্বপ্ন দেখছি, নাকি বাস্তবেই এই ছেলেটা আমার সামনে এসে হাজির হলো? 
ইমন এমনভাব নিয়ে তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে লাগল, যেন সে জান্নাতুলকে জীবনেও দেখেনি! তার সেই চরম লেভেলের ইগ্নোর করার স্টাইল আর মুখে সেই গম্ভীর অ্যাটিটিউড দেখে জান্নাতুলের বান্ধবীরা তো পুরোপুরি অবাক।
মিম ফিসফিস করে বলল, "ভাই, এই ছেলের এত অ্যাটিটিউড কেন রে? দেখলে তো কেমন এড়িয়ে গেল!"
প্রিয়া তক্ষণাৎ জবাব দিল, "আরে বাদ দে না! তুই আবার এই ছেলের দিকে নজর দিস না, ও তো অলরেডি ওই বারোভাতারি. একজন বানাবো.. 
মিম, রিয়া একসাথে প্রিয়া দিকে তাকানো,
কি কি কি 
ধুর! ভাবছিলাম যে ওই বারোভাতারি রেকর্ডে ১১ নম্বর বানাবো! বিশ্বাস কর ভাই ছেলেটাকে আমার খুব ভালো লাগছে"
রিয়া মিম নিজেদের কপালে চড় মারল একসাথে, 
হতাশ হয়ে বলল, এ বলে কি?
জান্নাতুলের মাথার ভেতর তখন রাগে আগুন জ্বলছে। সে মনে মনে ভাবল, "এই ব্যাটার নাম যেন কী? হ্যাঁ, ইমন মোড়ল! এত ভাব কেন রে ভাই তোর? একটু দেখলেই তো মনে হয় চুলগুলো ছিঁড়ে ফেলি! এই ছেলের এত অ্যাটিটিউড কিচ্ছুতেই মেনে নেওয়া যায় না!"
সে যখন মনে মনে ফুঁসছে আর আনমনে বিড়বিড় করে হাঁটছে, ঠিক তখনই ঘটে গেল আসল ঘটনা!
জান্নাতুলের বান্ধবীরা তখন নিজেদের মধ্যে অন্যমনস্ক হয়ে কথা বলছিল, আর জান্নাতুল নিচের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করতে করতে হাঁটছিল। আর এই সুযোগটাই নিয়েছিল ইমন! সে একটু ঘুরপথে গিয়ে ঠিক জান্নাতুলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছিল, কিন্তু জান্নাতুলের নিজের কোনো হুঁশই ছিল না!
ফলস্বরূপ—ধড়াম! আবার সেই ধাক্কা!
জান্নাতুলের শরীরটা টলমল করে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হতেই রিয়া দ্রুত তাকে টেনে ধরে সামলে নিল। জান্নাতুল তো এমনিতেই ওই ইমন নামের ছেলেটার ওপর রাগি মেজাজে ছিল, তার ওপর আবার সামনে থেকে এই ধাক্কা! সে রেগে আগুন হয়ে গালি দেওয়ার জন্য মুখ খুলতেই ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখল—সামনে আর কেউ নয়, স্বয়ং সেই ইমন!
জান্নাতুলের বান্ধবীরা একবার পেছনে তাকাল, আবার সামনে তাকাল! তাদের মাথায় তখন কোনো বুদ্ধি কাজ করছে না
—"একটু আগেই তো ছেলেটাকে অনেক দূরে দেখলাম, আবার চোখের পলকে ঠিক আমাদের সামনে চলে এলো কীভাবে? আমরা কি সবাই মিলে কোনো ভুল দেখছি নাকি?"
রিয়া যে জান্নাতুলকে ধরে রেখেছিল, সে তো বিস্ময়ে একদম পাথরের মূর্তি হয়ে গেছে! সে জান্নাতুলকে যে সোজা করে তুলবে, সেই কথাটাই যেন ভুলে গেছে!
আর ইমন? সে যেন কিছুই হয়নি এমন একটা ভাব নিয়ে, একদম ঝাড়ি মারার ভঙ্গিতে পকেটে হাত গুঁজে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সুরে বলে উঠল—
"মিস, আপনার কি চোখ দুটো অন্ধ হয়ে গেছে?
কীভাবে রাস্তা দিয়ে চলেন, একটু দেখে চলবেন না তো?
সব জায়গায় এমন কাজল মেকআপের জাদু খাটবে না,
ধাক্কা খাওয়ার শখ হলে বলতেন, এভাবে রাস্তা বন্ধ করে রাখতেন না!"
ইমনের মুখে এই কবিতার ছন্দের মতো খোঁচা দেওয়া কথাগুলো শুনে জান্নাতুলের রাগ যেন সাতশো ডিগ্রিতে পৌঁছে গেল! তার কবিতার সুরটা শুনতে বেশ মিষ্টি লাগলেও, তার ওই চরম অহংকারী অ্যাটিটিউডটা জান্নাতের গিলে খাওয়া একদম অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল।
জান্নাতুল হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে ভাবল, "এই ছেলেটা কি আস্ত একটা ভূত নাকি? একটু আগে কোথায় ছিল, আর এখন হুট করে সামনে এসে হাজির হলো কীভাবে? মাথার খুলি চিবিয়ে খেতে ইচ্ছে করছে লোকটার!"
বান্ধবীরা ভয়ে ভয়ে ফিসফিস করতে লাগল, "ভাই, এই ছেলেটা মানুষ তো? নাকি কোনো জিন-ভূতের আছর আছে এর ওপর?"
বকবক করতে করতে আর রাগে কাঁপতে কাঁপতে তারা ওখান থেকে ইস্কুলের দিকে দ্রুত পা বাড়াল।
ওদিকে কী হয়েছিল জানেন?
আসলে আসল রহস্যটা হলো—ইমন যখন দূর থেকে দেখল জান্নাতুল তার বান্ধবীদের সাথে কথা বলতে বলতে আনমনে নিচের দিকে তাকিয়ে হেঁটে আসছে এবং বিড়বিড় করছে, তখন সে বোকামি না করে চতুরের মতো শর্টকাট রাস্তা দিয়ে ঘুরে গিয়ে ঠিক তাদের ঠিক সামনে গিয়ে হাজির হয়েছিল। বান্ধবীরা তখন নিজেদের গল্পে ব্যস্ত ছিল, আর কাজললতার তো নিজের হুশই ছিল না! আর এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছিল আমাদের ইমন মশাই। কিন্তু দোষটা পুরোটাই সে চাপিয়ে দিল অবুঝ কাজললতার ওপর!
ইমন সেখান থেকে দৌড়ে গিয়ে ঠিক লুকিয়ে থাকা তার চার বন্ধুর সামনে গিয়ে পৌঁছাল। সে তখন হাঁপাচ্ছে!
তার অবস্থা দেখে রাফসান, সজল, ফাহিম আর তুষার হো হো করে হেসে উঠল!
সজল পেটে হাত দিয়ে হাসতে হাসতে বলল, "কিরে দোস্ত ইমন! কী অবস্থা তোর? মনে হচ্ছে ম্যারাথন দৌড় দিয়ে এলি! তুই না একটু আগে ওর সামনে মারাত্মক লেভেলের অ্যাটিটিউড নিয়ে কথা বললি? আর এখন আমাদের সামনে এসে এমন হাঁপাচ্ছিস কেন?"
ফাহিম দাঁত কেলিয়ে বলল, "হা হা হা! তোর ওই অ্যাটিটিউড তো বেশিক্ষণ টিকল না রে ভাই! এই তোর কাজললতা যদি দেখত যে তার ওই 'কবি সাহেব' তাকে দেখে ভয়ে কীভাবে দৌড়ে পালিয়ে এসেছে, তাহলে তো তোর খবরই হয়ে যেত!"
ইমন তখন লজ্জায় নিজের কোঁকড়ানো চুলগুলো হাত দিয়ে চুলকাতে চুলকাতে একটা মুচকি হাসি দিল। সত্যি বলতে, সে তার এই কাজললতাকে বড্ড বেশি ভয় পায়! সে যতই বাইরে শক্ত ভাব দেখাক না কেন, কাজললতার সামনে গেলেই তার বুকটা ধুপধুপ করতে শুরু করে।
রাফসান তখন গম্ভীর মুখে হাত জোড় করে বলে উঠল, "দোস্ত ইমন! তোর এই প্রেমের করুণ দশা দেখে আমাদের চোখের জল আর ধরে রাখা যাচ্ছে না! তোর এই ভীরু আত্মার মাগফিরাতের জন্য সবাই একবার হাত তুলি—বলি আমিন!"
বলেই ওরা চারজন একসাথে হাত তুলে মোনাজাত ধরার ভান করল!
ইমন রেগে গিয়ে তাদের দিকে তেড়ে গেল, "দূর হহারামজাদারা! তোদের এই ফাতরামি আর মোনাজাতের চক্করেই তো আমার বারোটা বাজছে!"
চারপাশের মফস্বল শহরের এই হালকা কুয়াশাঘেরা সকালে দুই কিশোর-কিশোরীর এই লুকোচুরি খেলা আর বন্ধুদের দুষ্টুমি ভরা আড্ডা গল্পটাকে আরও জমজমাট করে তুলল।
চলবে...,,,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন