ফন্ট সাইজ:
থিম:
ভালোবেসে ঠকে গেছি

৩য় পর্ব

লেখক: Nur Nahar
 নূর নাহার —
পার্ট — ৩
অচেনা সেই মানুষটা,,!
কলেজের গেট দিয়ে আয়েশা ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল।
কিছুক্ষণ আগেও এই গেটের ভেতরেই রাহাতের কথাগুলো তার বুকটা ভেঙে দিয়েছিল। কিন্তু এবার সে পেছনে তাকাল না।
রাকিব, নুসরাত, নাইমা আর আসিব তাকে ঘিরে হাঁটছিল।
রাকিব বলল,
— “চল, আজকে তোকে আমরা ঘুরতে নিয়ে যাব।”
আয়েশা অবাক হয়ে বলল,
— “এখন?”
নুসরাত হেসে বলল,
— “হ্যাঁ, এখনই। সারাদিন ওই একটা ছেলের জন্য মন খারাপ করে বসে থাকবি নাকি?”
আসিব বলল,
— “রাহাত তোকে অপমান করেছে বলে তুই নিজের দিনটা নষ্ট করবি কেন?”
আয়েশা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর মৃদু হেসে বলল,
— “ঠিক আছে। আজকে তোদের সঙ্গেই থাকব।”
আগে বাসায় কল দিয়ে বলে দি।
রাকিব সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— “এই তো! এই হাসিটাই দরকার ছিল।”
আয়েশা চোখ ছোট করে তাকাল।
— “তুই আজকাল আমার হাসি নিয়ে এত চিন্তা করিস কেন?”
রাকিব এক মুহূর্ত থেমে হেসে বলল,
— “কারণ তুই হাসলে আমাদেরও ভালো লাগে।”
কথাটা বলেই সে অন্যদিকে তাকাল।
তার মনের কথাটা সে মুখে আনল না।
আয়েশা জানে না—তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু রাকিব তাকে নীরবে ভালোবাসে।
---
নোয়াখালীর পথে। 
"আয়েশা এবং তার বন্ধুরা"।
চার বন্ধু আয়েশাকে নিয়ে ঘুরতে বের হলো।
কেউ ছবি তুলছে, কেউ ফুচকা খাচ্ছে, কেউ আয়েশাকে হাসানোর চেষ্টা করছে।
রাকিব মোবাইল বের করে বলল,
— “এই আয়েশা, একটা ছবি দে।”
— “ছবি কেন?”
— “তোর মুখে হাসি আছে কি না, প্রমাণ লাগবে।”
আয়েশা হেসে বলল,
— “তুই না একদম পাগল!”
আসিব সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— “ওর চিকিৎসা অনেক আগেই অসম্ভব ঘোষণা করা হয়েছে।”
নুসরাত আর নাইমা হেসে উঠল।
আয়েশাও প্রাণ খুলে হাসল।
তার গালে ছোট্ট টোলটা ফুটে উঠল।
রাকিব কিছুক্ষণ সেই হাসির দিকে তাকিয়ে রইল।
মনে মনে বলল—
“তুই শুধু হাসতে থাকিস আয়েশা। তোর চোখের পানি না হয় আমি দূর থেকেই বুঝে নেব।”
---
অন্যদিকে — ঢাকা
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
পাঁচ বছর পর লন্ডন থেকে দেশে ফিরেছে আরিয়ান চৌধুরী।
আগমন টার্মিনালের দরজা দিয়ে একজন লম্বা যুবক বেরিয়ে এল।
প্রায় ছয় ফুট লম্বা।
কালো শার্ট আর কালো প্যান্টে তাকে বেশ গম্ভীর লাগছে।
চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালের ওপর পড়ে আছে।
ছোট ছোট গভীর চোখ।
চোখে কালো সানগ্লাস। 
মুখে এমন একটা স্থিরতা, যেন আশেপাশের কোনো কিছুই তাকে সহজে প্রভাবিত করতে পারে না।
হাতে দামি ঘড়ি।
হাঁটার ভঙ্গিতে বিদেশি স্টাইলের ছাপ স্পষ্ট।
আর তার শরীর থেকে ভেসে আসছিল Dior Sauvage-এর মৃদু সুগন্ধ।
দূর থেকেই সিয়াম হাত নেড়ে চিৎকার করে উঠল,
— “ওই যে! পাঁচ বছর পর লন্ডনের সাহেব দেশে ফিরছে!”
আরিয়ান থেমে তাকাল।
তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।
সাকিব এগিয়ে এসে বলল,
— “ভাই, পাঁচ বছর পরও দেখছি তোর মুখের গাম্ভীর্য একটুও কমেনি।”
আরিয়ান বলল,
— “তোদের দেখলে গম্ভীর না থেকে উপায় আছে?”
সিয়াম বুক চাপড়ে বলল,
— “এই তো! দেশে ফিরেই বন্ধুকে অপমান!”
সাকিব হেসে বলল,
— “পাঁচ বছর বিদেশে থেকেও লোকটার স্বভাব বদলায়নি।”
আরিয়ান নিজের লাগেজের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তোরা চাইলে আবার পাঠিয়ে দিতে পারিস।”
সিয়াম সঙ্গে সঙ্গে তার কাঁধে হাত রেখে বলল,
— “না বাবা, এবার আর ছাড়ছি না।”
তিনজনই হেসে উঠল।
সিয়াম লাগেজটা হাতে নিয়ে বলল,
— “চল, গাড়ি রেডি।”
গাড়ির কাছে গিয়ে সাকিব জিজ্ঞেস করল,
— “আগে বাসায়?”
আরিয়ান মাথা নাড়িয়ে বলল,
— “না, অফিসে। মিটিং আছে।”
সিয়াম অবাক হয়ে বলল,
— “দেশে ফিরেই অফিস?”
— “মিটিংটা জরুরি।”
সাকিব বলল,
— “তারপর?”
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— “তারপর ফেনী। মা-বাবার অর্থাৎ পরিবারের মানুষের সঙ্গে দেখা করব।”
সিয়ামের মুখটা নরম হয়ে গেল।
— “আঙ্কেল-আন্টি তোকে দেখে অনেক খুশি হবেন।”
আরিয়ান জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
— “আমিও অনেকদিন ধরে সেই সময়টার অপেক্ষা করছি।”
---
গুলশান-২, ঢাকা
বিমানবন্দর থেকে আরিয়ান সরাসরি গুলশান-২-এর তাদের কর্পোরেট অফিসে গেল। 
অফিসের কাঁচের দরজা পেরিয়ে সে সোজা মিটিং রুমে ঢুকে গেল।
কয়েক ঘণ্টা ধরে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক মিটিং চলল।
আরিয়ান খুব শান্তভাবে প্রত্যেকটা বিষয় শুনল, প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত দিল।
মিটিং শেষ হলে সাকিব ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
— “শেষ?”
আরিয়ান ফাইল বন্ধ করে বলল,
— “হ্যাঁ।”
সিয়াম বলল,
— “তাহলে এবার ফেনী?”
আরিয়ান উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
— “চল।”
---
ঢাকা থেকে ফেনীর পথে
সন্ধ্যা ধীরে ধীরে নেমে আসছে।
গাড়ি ফেনীর দিকে ছুটছে।
সিয়াম সামনের সিট থেকে বলল,
— “পাঁচ বছর পর দেশে ফিরে কেমন লাগছে?”
আরিয়ান জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
— “অদ্ভুত।”
সাকিব বলল,
— “খারাপ?”
— “না। নিজের দেশে ফিরলে খারাপ লাগে না।”
সিয়াম বলল,
— “ঢাকাতেই তো বেশিরভাগ সময় থাকবি?”
— “হ্যাঁ। ব্যবসার কাজ ঢাকাতেই বেশি।”
সাকিব বলল,
— “আর ফেনী?”
আরিয়ানের মুখে নরম একটা হাসি ফুটে উঠল।
— “ফেনী আমার পরিবারের কাছে যাওয়ার জায়গা।”
কথাটা শুনে সিয়াম আর সাকিব দুজনই চুপ হয়ে গেল।
---
অন্যদিকে — নোয়াখালী
আয়েশা আর তার বন্ধুরাও ঘোরাঘুরি শেষে ফিরছিল।
আজ অনেকদিন পর আয়েশার মুখে সত্যিকারের হাসি।
রাকিব পাশে বসে বলল,
— “আজকে কিন্তু তুই অনেক হাসছিস।”
আয়েশা মৃদু হেসে বলল,
— “তোরা হাসাচ্ছিস বলেই।”
রাকিব কিছু বলল না।
শুধু চুপচাপ আয়েশার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনের কথাটা সে এখনো বলতে পারেনি।
---
সন্ধ্যা — ফেনীর পথে
আরিয়ানের গাড়ি তখন একটা ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ আরিয়ানের চোখ রাস্তার পাশে থেমে গেল।
কয়েকজন বন্ধু দাঁড়িয়ে আছে।
তাদের মাঝখানে—
একটা মেয়ে।
গোলাপি কামিজ।
চুল খোলা।
মুখে হাসি।
হাসলে গালে ছোট্ট টোল পড়ে।
আয়েশা।
আরিয়ান অজান্তেই কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
কেন জানি মেয়েটার হাসিটা তার চোখে আটকে গেল।
ঠিক তখন আয়েশাও গাড়িটার দিকে তাকাল।
গাড়ির কাঁচের ভেতর থেকে তাদের চোখে চোখ পড়ল।
এক মুহূর্ত।
দুই মুহূর্ত।
তারপর গাড়িটা সামনে চলে গেল।
আয়েশা কিছুক্ষণ গাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল।
নাইমা জিজ্ঞেস করল,
— “কী হলো?”
আয়েশা মাথা নেড়ে বলল,
— “কিছু না।”
রাকিবও গাড়িটার দিকে তাকাল।
অকারণে তার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
অন্যদিকে সিয়াম জিজ্ঞেস করল,
— “কী দেখছিলি?”
আরিয়ান জানালার বাইরে তাকিয়েই বলল,
— “কিছু না।”
সাকিব মুচকি হেসে বলল,
— “কিছু না হলে এতক্ষণ তাকিয়ে ছিলি কেন?”
আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “চুপ কর।”
সিয়াম হেসে উঠল।
— “আহা! পাঁচ বছর পর দেশে ফিরেই কিছু একটা ঘটছে মনে হয়!”
 কি বলস সাকিব।
_ হ্যাঁ ঠিক বলছোস। 
আরিয়ান মাথা নেড়ে বলল,
— “তোরা দুজন শুরু করিস না।”
গাড়ির ভেতর আবার হাসির শব্দ উঠল।
কিন্তু আরিয়ানের চোখের সামনে তখনও সেই মেয়েটার হাসি।
আর আয়েশার মাথায় তখনও সেই অচেনা ছেলেটার গভীর চোখ।
তারা কেউ কারও নাম জানে না।
কেউ কাউকে চেনে না।
তবুও ভাগ্য আজ তাদের প্রথমবার চোখে চোখে পরিচয় করিয়ে দিল।
“কিছু মানুষ জীবনে আসার আগে কোনো শব্দ করে না; শুধু একদিন হঠাৎ চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়। তারপর বুঝতে পারি—আমাদের গল্পটা হয়তো অনেক আগেই লেখা ছিল।”
গাড়ি তখন ফেনীর দিকে ছুটছে।
আরিয়ান যাচ্ছে তার মা-বাবার কাছে।
আয়েশা ফিরছে নিজের বাড়ির পথে।
কিন্তু তারা কেউ জানে না—
"আজকের এই কয়েক সেকেন্ডের দেখা একদিন তাদের দুজনের পুরো জীবন বদলে দেবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন