ফন্ট সাইজ:
থিম:
ভালোবেসে ঠকে গেছি

২য় পর্ব

লেখক: Nur Nahar
— নূর নাহার —
পার্ট — ২
প্রথম পর্বের শেষের সেই হাসির রেশটা তখনও আয়েশাদের বাড়িতে লেগে আছে। রাকিব, নুসরাত, আসিব আর নাইমা—চারজনেই আয়েশার পাশে বসে গল্প করছিল। কিছুক্ষণ আগেও যে মেয়েটার চোখে পানি ছিল, বন্ধুদের পাগলামিতে সেই চোখেই আবার হাসি ফুটেছে।
কিন্তু রাত তো আর থেমে থাকে না।
একসময় নুসরাত উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
— “চল, অনেক রাত হয়েছে। কালকে আবার কলেজ আছে।”
নাইমা আয়েশার হাতটা চেপে ধরে বলল,
— “মন খারাপ করিস না। আমরা আছি।”
রাকিব মুচকি হেসে বলল,
— “আর শোন, কালকে কলেজে কোনো কান্নাকাটি চলবে না। কান্না করলে জরিমানা।”
আয়েশা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— “জরিমানা কী?”
— “আমাদের সবাইকে ফুচকা খাওয়াতে হবে।”
আয়েশা হেসে বলল,
— “তুই না একটা আস্ত পাগল!”
আসিব সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— “পাগল না হলে তোদের মতো বন্ধুদের সামলানো যায়?”
সবাই হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পর একে একে সবাই নিজেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে চলে গেল।
দরজা বন্ধ করে আয়েশা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
হাসিটা যেন দরজার ওপাশেই রেখে এসেছে।
---
রাত ০৯:৩৩ মিনিট।
বাপ্পি খান বলল,, 
আয়েশা কে খাওয়ার দেও। 
খাওয়ার টেবিলে নাদিয়া খান মেয়ের প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে বললেন,
— “আয়েশা, আরেকটু খা মা।”
আয়েশা মাথা নাড়িয়ে বলল,
— “মা, আমার খিদে নেই।”
আশিক খান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— “খিদে নেই মানে? সারাদিন কান্না করে আবার খিদেও নেই! এভাবে চললে কালকে তোকে তুলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।”
আয়েশা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— “ভাইয়া, তুমি না একদম বিরক্তিকর!”
পাশ থেকে মাইশা হেসে বলল,
— “ওকে বেশি বকো না। আজকে ওর মনটা এমনিতেই খারাপ।”
আশিক কিছুক্ষণ চুপ করে বোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নরম গলায় বলল,
— “শোন আয়েশা, একটা কথা মনে রাখিস। কেউ তোকে ছেড়ে চলে গেছে মানেই তুই হারিসনি। বরং সে এমন একজন মানুষকে হারিয়েছে, যে তাকে সত্যি ভালোবাসত।”
আয়েশার চোখ আবার ভিজে উঠল।
— “ভাইয়া, মানুষ এত সহজে বদলে যায় কেন?”
আশিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— “মানুষ বদলায় না রে। সময়ের সঙ্গে তার আসল চেহারাটা দেখা যায়।”
মাইশা ধীরে ধীরে বলল,
— “আর যে মানুষটা চলে যাওয়ার পরও তোর চোখে পানি আসে, তাকে ভালোবাসাটা ভুল ছিল না। ভুল ছিল মানুষটাকে ঠিকমতো চিনতে না পারা।”
আয়েশা কিছু বলল না।
মায়ের কোলে মাথা রাখল।
নাদিয়া মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
— “কাঁদতে ইচ্ছে করলে কাঁদ মা। মায়ের কাছে চোখের পানি লুকাতে হয় না।”
সেই কথাটুকুই যেন আয়েশার বুকের বাঁধ ভেঙে দিল।
মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে কেঁদে উঠল সে।
কিছু মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া শূন্যতাটা থেকে যায়।
---
রাত গভীর হলো।
সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
আয়েশা জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে আছে। বৃষ্টি তখনও পড়ছে।
টুপটাপ শব্দে চারপাশ ভরে আছে।
হঠাৎ তার মনে হলো—রাহাতকে সে কতটা ভালোবেসেছিল!
মোবাইলটা হাতে নিয়ে পুরোনো ছবিগুলো দেখতে গিয়ে আবার চোখ মুছে ফেলল।
নিজেকেই বলল,
— “আমি তোকে ভুলে যাব রাহাত। হয়তো আজ না, কাল না… কিন্তু একদিন ঠিকই ভুলে যাব।”
তারপর চার লাইনের ছোট্ট গানটা ডায়েরিতে লিখল—
“তুমি গেলে, রাতগুলো শুধু কাঁদে,
স্মৃতিগুলো নীরবে হৃদয় বাঁধে,
ভালোবাসা যদি ভুলই হয়ে থাকে,
তবুও মনটা তোমাকেই কেন ডাকে…”
---
পরদিন সকাল
ভোরের বৃষ্টি থেমে গেছে।
আকাশটা পরিষ্কার। জানালার কাঁচে জমে থাকা পানির ফোঁটাগুলো রোদের আলোয় ঝিকমিক করছে।
আয়েশা ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে রাকিবের নাম।
ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে রাকিবের গলা,
— “ম্যাডাম, ঘুম ভাঙছে নাকি এখনো স্বপ্নে রাহাতের সঙ্গে ঝগড়া করতেছিস?”
আয়েশা বিরক্ত হয়ে বলল,
— “চুপ কর! আর পাঁচ মিনিট পর ফোন করলে ফোনটা ভেঙে ফেলব।”
— “ঠিক আছে, কিন্তু কলেজে না গেলে তোর হাজিরাটা আমি দিয়ে আসব।”
— “তুই আগে নিজের হাজিরা বাঁচা।”
ফোন রেখে আয়েশা তৈরি হয়ে নিল।
সে নোয়াখালী স্কুল অ্যান্ড কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী।
সাদা-নীল পোশাক পরে, চুলগুলো খোলা রেখে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল।
---
কলেজ প্রাঙ্গণ
কলেজে ঢুকতেই রাকিব, নুসরাত, আসিব আর নাইমা তাকে ঘিরে ধরল।
রাকিব বলল,
— “ওহ! আজকে তো দেখি ম্যাডামের মুখে আবার রং ফিরেছে!”
আয়েশা মুচকি হেসে বলল,
— “তোদের জন্যই।”
ঠিক তখনই সামনে থেকে আরিফার কণ্ঠ শোনা গেল,
— “কী ব্যাপার? ব্রেকআপের পরও এত হাসি?”
চারপাশটা হঠাৎ নীরব হয়ে গেল।
রাহাতও কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।
আরিফা ঠোঁটে বাঁকা হাসি এনে বলল,
— “কিছু মানুষ ভাবে প্রেম শেষ হয়ে গেলেই পৃথিবী শেষ। অথচ যার সঙ্গে ব্রেকআপ হয়, সে তো দিব্যি ভালো আছে।”
রাহাত অস্বস্তিতে বলল,
— “আরিফা, চুপ করো।”
আয়েশা এবার শান্ত গলায় বলল,
— “তুমি আমাকে নিয়ে যত খুশি কথা বলো। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—অন্যকে ছোট করে কেউ কখনো বড় হয় না।”
রাকিব এগিয়ে আসতেই আয়েশা হাত তুলে থামিয়ে দিল।
— “না রাকিব। আজকে আমি নিজেই উত্তর দেব।”
আয়েশা আরিফার চোখে চোখ রেখে বলল,
— “রাহাত আমাকে ছেড়ে গেছে, এটা আমার কষ্ট। কিন্তু সে অন্য কাউকে বেছে নিয়েছে বলে আমার মূল্য কমে যায়নি।”
চারপাশে থাকা সবাই চুপ।
রাহাত মাথা নিচু করে ফেলল।
নুসরাত ধীরে বলল,
— “সম্পর্ক ভাঙা নিয়ে মজা করা সহজ। কিন্তু কারও ভাঙা হৃদয়ের শব্দ শোনা খুব কঠিন।”
কথা কাটাকাটি একসময় তীব্র হয়ে উঠল।
বিশাল মাঠের মতো খোলা কলেজ মাঠে সবাই জড়ো হয়ে গেল।
রাহাত হঠাৎ বলল,
— “আয়েশা, অতীত নিয়ে এত নাটক করার কী আছে?”
আয়েশার চোখে পানি চলে এল।
— “নাটক? তুমি আমার বিশ্বাস ভেঙেছ রাহাত। সেই ব্যথাকে নাটক বলার অধিকার তোমার নেই।”
ঠিক তখন রাকিব পকেট থেকে ফোন বের করল।
আশিক খানকে কল দিল।
— “ভাইয়া, আপনি একটু কলেজে আসবেন? সমস্যা হয়েছে।”
কিছুক্ষণ পর একটি গাড়ি এসে থামল।
আশিক খান গাড়ি থেকে নামতেই চারপাশের পরিবেশ বদলে গেল।
তার চোখ সরাসরি রাহাতের দিকে।
আশিক বলল,
— “তুই রাহাত?”
রাহাতের মুখ শুকিয়ে গেল।
— “জি…”
আশিক শান্ত গলায় বলল,
— “আমার বোনকে কাঁদিয়েছিস, সেটা তোর ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু আমার বোনকে নিয়ে আর একটা কথা বলবি না।”
রাহাত চুপ।
আশিক আরও এক ধাপ এগিয়ে বলল,
— “ভালোবাসতে না পারলে চলে যাস। কিন্তু কাউকে ভেঙে দিয়ে তার সম্মান নিয়ে খেলবি—এটা আমি মেনে নেব না।”
আরিফার মুখের হাসিও মিলিয়ে গেল।
আশিক বলল,
"আর যদি আয়েশাকে অপমান করতে দেখি,, তো ভাববি সেদিন তোর জীবনের শেষ দিন।"
"অবশ্য তুই আমার ক্যারেক্টার সম্পর্কে জানোস আর যদি এগুলো দেখি তো জিন্দা লাশ ফেলবো আমি।"
"মাদারি"!
রাহাত আরিফা দু'জনই চুপ হয়ে গেল।
---
আয়েশা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে চোখ মুছে ফেলল।
আশিক বোনের মাথায় হাত রেখে বলল,
— “চল, বাসায় যাবি?”
আয়েশা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
— “না ভাইয়া। আমি ক্লাস করব।”
আশিক কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হেসে বলল,
— “এই তো আমার বোন।”
আয়েশা ধীরে ধীরে বন্ধুদের সঙ্গে ক্লাসের দিকে এগিয়ে গেল।
তার মনে তখন একটা কথাই ঘুরছিল—
“কখনো কখনো ভেঙে যাওয়া মানুষটাকেই নিজের জীবনটা নতুন করে গড়তে হয়।”
আর সেই দিন থেকেই আয়েশা বুঝতে শুরু করল—
রাহাত তার অতীত।
(কিন্তু তার ভবিষ্যৎ এখনো লেখা হয়নি।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন