#পর্ব_৩১
#হৃদয়_প্রনয়সক্তি
#লেখিকা_আরিফা_বিনতে_মায়া
মিষ্টি সকাল —
আকাশে হালকা সোনালী আলো, বাতাসের শিশিরের কোমল গন্ধ। পাখির মিষ্টি কূজন আর নরম রোদে ভেজা পাতার ঝলকানি যেন নতুন দিনের হাসি ছুয়ে যায় মনকে।
তবে কারোর মন অন্ধকার ডেকে আছে।
আদিবা একপাশে বসে আছে মন খারাপ ও মুখ গম্ভীর ভাব নিয়ে।
সকালে ঘুম থেকে ওঠে নিজেকে বিবস্ত্র পেয়ে নিজেই নিজেকে ঘৃনা করতে শুরু করে। পাশে ফ্লোরে নিজের জামা কাপড় পড়ে থাকতে দেখে সেগুলো পড়ে নিল।
তারপর রোহার্ডের দিকে তাকিয়ে রইলে, রোহার্ড ওকে দেখে বলে –
" ভাবার কিছু নেই, যাস্ট একটা এক্সিডেন্টে হয়ে গেছে।
তোমার প্রতি আমার কোন ইনরেস্ট নেই।
আমি যাস্ট তোমাকে ঘৃণা করি। তুমি আমার নখের যোগ্য তা ও না। এটাই তোমার যন্ত্রণা পাওয়ার শাস্তি।
এই বলে শার্ট পড়তে শুরু করে।
তখন আদিবা বলে –
" এই যন্ত্রণা দেওয়ার থেকে একবারে মেরে ফেললে পারেন।
—আসলে জানতো এংড়ি বার্ড, আমি না আমার শত্রুরকে সহজে শেষ করি না।
তাকে একটুও একটু করে শেষ করি যন্ত্রণা দিয়ে।
যাতে মৃত্যু হওয়ার আগে আমার নাম নিয়ে তারপরে মরে " এই বলে বাকা হাসি দিল।
এদিকে আদিবা বোকার মতো রোহার্ডের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, কালকে রাতে এক রূপ আজকে এই কোন রুপ। নিজেই আমার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করে এখন নিজেই বলছে আমার প্রতি তার কোন ইন্টারেস্ট নেই আমাকে ঘৃণা করে। আসলে পুরুষ মানুষ এমন, নিজের চাহিদা যখন মিটে যায়, তখন আর নারীকে কি আর বুঝবে।তবে উনার সাথে আমার তো ডিভোর্স হয়েছে।
এই ভেবে সোজা রোহার্ডের কলার ধরে বলে—
" কেন... কেন রোহার্ড এড্রিয়ান, কেন আমার সতিত্ব কেড়ে নিয়েছিস বল। তোর সাথে তো আমার কোন বৈধতার সম্পর্ক নেই।
তাহলে কেন.... উওর দে....!
রোহার্ডের মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে, তবে কিছু না বলে আদিবার হাত দুটো টেনে ওর গলা চেপে ধরে বলে—
" তোর সাহস কি করে হলো আমার কলার ধরা।
তোর প্রতি আমার কোন ইনরেস্ট নাই শুনিস না কানে। তোকে আমার জীবনের থেকে বেশি ঘৃণা করি।
এটা যাস্ট এক্সিডেন.... যদি কাউকে বলিছিস তো জানে মেরে ফেলবো ।
এই বলে অঞ্জলির পায়ের সামনে ফেলে ওকে বলল—
– এর কোন ডেক কেয়ারা করার দরকার নেই।একে পুরো ক্রিমসন জেলের যে শাস্তি দেওয়া হয়, সব করবে।
আমি শুধু ওর যন্ত্রণা দেখতে চাই।
এই বলে যখনই দরজা দিয়ে যাবে, আদিবার কথা শুনে পা থেমে গেল –
—তাহলে কালকে রাতে কি ছিল বিলিতি বিলাই! সব কি নাটক ছিল, নাকি সব অভিনয়।
আপনি........
— তোদের মত রাস্তার দুই টাকা মেয়েকে এই রোহার্ড এড্রিয়ান বিছানায় নেই আর খরচ করি।
থাক আর কিছু বললাম না, তবে অতিরিক্ত মুখ খুললে আজই তোর জীবনের শেষ দিন হবে।
তাই মুখ বন্ধ...... " হাতে আঙ্গুল দিয়ে চুপ করালো...!
এই বলে ওখান থেকে চলে গেল ফিরে একবার তাকালো না।
আর আদিবা মাটিতে বসে পড়ল, চোখের জল, মাথা ভার।
ঠিক তখনি অঞ্জলি বলল—
" হয়েছে হয়েছে অনেক নাটক, এবার যাও ফ্রেশ হয়ে আমাকে উদ্ধার কর।
অনেক কাজ পড়ে আছে যাও।
এই বলে এক স্যুট জামা মুখের উপর ছুড়ে মেরে সেখান থেকে চলে গেল।
আর আদিবা সেই কাপড় মাটি থেকে উঠিয়ে চোখের জল মুছে নিজেকে পরিপাটি করতে ক্রিমসন জেলে ওয়াশরুমে চলে গেল।আর ঝরনা ছেড়ে নিজের শরীরকে আঘাত করতে করতে বলে —
" এই শরীর, না ওর ছোয়া পাপি।
ও একটা পাপি, আমার সহ্য হচ্ছে না।
কেন এমন করল,??
এই বলে অনবরত নিজের শরীর আঘাত করতে থাকলো। আর রয়েছো তো সাথে আর্তনাদ। আঘাত করতে করতে এক সময় ক্লান্ত হয়ে ওখানে দেওয়ালের সাথে হেলান গাইতে লাগলো
~আমাকে কেন হায়,,
আনালে দোটানায়,,
বানালে এমন বাড়ি ঘর...!
এইটুকু গেয়ে জোরে চিৎকার করে কান্না করতে লাগলো। কোথাও নীরবতাও নেই। দেয়ালে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে হাহাকারের সুর। মনে হয় বাতাসও কাদছে। আর্তনাদ, কারো নিঃশব্দ ক্রন্দন – সব মিশে গেছে এক ভয়ানক শূন্যতায়, যেখানে প্রতিটি শব্দ শুধু ব্যথার ভাষা....
--------------------------------
কিছুক্ষণ পরে মীরা সেখানে উপস্থিত হয়ে বলল—
" আদিবা তোমার সাথে একজন দেখা করতে এসেছে।
আদিবা চোখের পানি মুছে মিরা কে প্রশ্ন করলো
" কে???
– জানি না এসে দেখে নাও কে??
এই বলে তিনি চলে গেলেন।
আর আদিবা উঠে দেখে এলিনা তার সামনে দাড়িয়ে আছে, তারপর চোখ তুলে তাকিয়ে এলিনা কে দেখতে শুরু করে।
তখনই এলিনা অবাক হয়ে আদিবার দিকে তাকায়, আর চোখের দিকে।
আর মনে মনে বলে –
" এটা কি করে সম্ভব??
তাহলে কি আদিবা...... না না এটা হতে পারে না।
এই বলে জেল থেকে চলে যায় আদিবার সাথে কথা না বলে, আর আদিবা পুরো বোকা মনে গেল। ব্যপারটা কি হলে যে, এলিনা ওকে দেখে ইগনোর করে চলে গেল।
তারপর আর কিছু না বলে সেখানে চলে গিয়ে, ক্রিমসন বাগানে.......
----------------------------------
মার্সির্স শহর তখন রাতটা ছিল নীরব, কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরে লুকিয়ে ছিল অজস্র কান্না।
মার্সিস শহরের বাতিগুলো তখন কেবল ঝিমিয়ে জ্বলছে- রাস্তার ধারে পড়ে আছে ছিন্ন পোশাক, কোথাও সাইরেনের শব্দ, কোথাও চিৎকারের প্রতিধ্বনি।
হাটু গেড়ে বসে আছে ভাঙা সেতুর পাশে ব্লাডশেড,
হাত রক্তে মাখা, চোখে জল
মুখে অয্যস আর্তনাদ
" কোথায় তুমি রেড আই, তোমাকে খুজতে খুজতে বড়ই ক্লান্ত আমি...
ফিরে আয়.....একবার শুধু ফিরে আয়! "
ঠিক তখনই গর্জে উঠে বলল–
" তুই নে যা আমার প্রাণ, কিন্তু ফিরিয়ে দে তোর নিঃশ্বাসের স্পর্শটা....!
আমি আছি.....কিন্তু তোকে আমি খুজছি ভুল পথে।
এই বলে সেই সেতুর উপর লুটিয়ে পড়ল,
কি এমন যে এত রক্ত মাখা মাখি, তা রহস্যে ঘেরা থাক।
--------------------------
ক্রিমসন হোল্ডে.......
বিকেলটা ছিল নরম আলোয় ভরা– সূর্যের শেষ রোদ গাছের পাতায় লালচে আভা ছড়াচ্ছিল।
হালকা হাওয়া বইছিল, যেন দিনের ক্লান্তি মুছে দিতে এসেছে।
চারপাশে এক অদ্ভুত শান্ত ভাব, পাখিরা ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে,
আর আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে কমলা আর বেগুনি রঙের মায়া
আর সেই আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল আদিবা, আর বড় নিঃশ্বাস ফেলে যখন নিজের জীবনের হিসেব গুনতে যাবে, ঠিক তখনই মীরা এসে ওর হাত টান দিয়ে উঠালো।
এতে ভয় পেয়ে কিছু বলতে নিলে মীরা চুপ থাকতে বলে হাতের ইশারায়, আর হাত টেনে নিয়ে যেতে লাগলো ক্রিমসন ভেতরে।
আর আদিবাও তার তালে তালে হাটতে লাগলো।
কেউ হয়তো খেয়াল করি নি তাদের দু'জন কে?
মীরা ওকে এক সুরঙ্গের ভেতরে নিয়ে আসে। আর আদিবা ভয় পেতে শুরু করে, তখনই মীরা ওকে বলে –
" আদিবা এখান থেকে পালাও, ওরা তোমায় বাচতে দিবে না।
এই সুরঙ্গ পথই তোমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারবে।
— মানে?
– এত কিছুর বলার সময় নেই আদিবা, ওরা আসার আগে পালাও। না হলে আজই তোমার শেষ দিন।
– কিন্তু তুমি আমায় সাহায্য করতে চাইছো কেন?
মীরা ওর গালে হাত দিয়ে বলে–
" যদি কখনো আমাদের আবারও দেখা হয়, অবশ্যই সব জানতে পারবে, কিন্তু তুমি আমার দায়িত্বে ছিলে, তোমাকে এখন নিজেই নিজেকে প্রেটেক্ট করতে হবে।
আমার এ পযন্ত কাজ শেষ.....
এই বলে আদিবার হাতে কিছু একটা বেধে দিয়ে সুরঙ্গার বাহিরে ধাক্কা মেরে নিজেই সুরঙ্গর পথ বন্ধ করে দেয়।
আর হাত দুটো তুলে আল্লাহ কাছে বলে
" হে আল্লাহ! আমাদের কুইন কিয়ারা কে হেফাজত কর।
আর উনার সকল বিপদ থেকে হেফাজত করার জন্য উনার রক্ষকে অদৃশ্যের মত পাঠিয়ে দাও।
এই বলে নিজের চোখের পানি মুছে যে পথে এসেছিল সে পথে চলে গেল।
আর আদিবা সে বোকার মত তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ
তবে সে বুঝতে পারলো সে স্বাধীন অন্ধকার নরকের থেকে। আর তাকে এখন পালাতে হবে।
তাই কিছু না ভেবে দৌড় শুরু করলো। কারন অন্ধকার হওয়ার আগে নিজের আশ্রয় স্হান খুজতে হবে।
----------------------------------
অন্যদিকে........
এলিনা ও তার মা লায়লা সেন ক্রিমসন জেলে এসেছে কিছুক্ষণ হলো।তবে তারা বিশেষ কক্ষে অপেক্ষা করতে লাগলো আদিবার জন্য।
নিশ্চয়ই মা মেয়ে কোন পরিকল্পনা করে এসেছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে অঞ্জলি এসে তাদেরকে জানালো –
" মেম...মেম! ওই মেয়েটা পালিয়েছে।
এই কথা শুনে এলিনা বলল–
" কি যা তা বলছ, কারোর দুঃসাহস নেই এই হোল্ডের থেকে পালানো।
— বিশ্বাস করুন, কোথাও নাই। পুরা জেলে খুজেছি।
এমনকি বাগানেও নেই।
তবে কালকে গ্যাংষ্টার অর্কিডের লিডারের সাথে সারা রাত ছিল। পরে সকালে গ্যাংষ্টার লিডার নিজেই, আমাদের সামনে ধাক্কা মেরে বলেছিল।
এই মেয়েটাকে যেন কোন প্রকার টেক কেয়ার করতে না
এমনি কি নিজেই ওর গলা টিপে ধরে বেরিয়ে গেছিল।
তাহলে এখন কোথায় গেল।আর জেলের সিসিটিভি নষ্ট হয়ে গেছে সকালে, কারা যেন হ্যাক করে বন্ধ করে দিয়েছে। এখন ঠিক হয় নি।
এগুলো শুনে এলিনা নিজের আসল ফর্মে ফিরে এসে চিৎকার করে বলে —
" তোমরা এতগুলো মানুষ কে কি খাওয়ানোর জন্য এখানে রাখা হয়েছে, বলতে বলতে একটা জ্যান্ত মানুষ হারিয়ে গেছে।
খোজ ওকে, না হলে সবকটা আমার হাতে খুন হবে।
যাও.........
এইরকম ভয়ংকর আওয়াজ শুনে, আর অপেক্ষা করল না অঞ্জলি দৌড়ে পালিয়ে গেল।
আর এলিনা সে চিৎকার করে বলল—
" কোথায় পালাবি তুই কিয়ারা, তোকে যে আমার চাই।
তুই যেখানে থাকিস, বা কেউ তোকে লুকিয়ে রাখে।
সেখানে তোকে আমি নিজের হাতে খুন করবো।
না হলে আমার নাম সেরিনা.....
কারন তুই আমার জীবনের সর্বনাশের অধ্যায়, তোর ওই লাল চোখই হলো আমার সর্বনাসের কারন।
তোকে আমি এবারে বাচতে দিব না, কিছুতেই না।
তুই শেষ হবি আমার হাতে, তোর মৃত্যু আমার হাতে।
যেখানে আমার লোক দেখতে পাবে, সেখানে.......
আর কিছু বললনা ওখানে নিজেই নিজেকে ঠিক রেখে লায়লা সেনের হাতে ব্যাগ ধরিয়ে বের হয়ে গেল।
দেখার পালা কি হয় পরবর্তীতে.............
( এতদিন তোমরা ওকে এলিনা নামে জানতে, তবে ওর আসল পরিচয় কি খুব শীঘ্রই জানতে পারবে, কে এই সেরিনা?
আর অনেকের মনে প্রশ্ন থাকতে পারে কিয়ারা কে?
তাও পরের পর্বে সব জানতে পারবে।
আগেও বলেছি এখন বলছি, আমার গল্পটা অনেক রহস্য আর রোমান্টিক ভরপুর, যদি কারোর ভালো না লাগে এড়িয়ে যেত পারো। আর যাদের বেশি পছন্দ, তারা কমেন্ট বেশি বেশি রেসপন্স করবে।
আর আস্তে আস্তে সব রহস্যের উদ্ঘাটন শেষ করবো।)
চলবে......