কলমে: আহমেদ বাঁধন
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
[২য় খণ্ড]
আজকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে—বাঁধনের ভাগ্য তাকে কানাডায় নিয়ে যাবে, নাকি মধ্যবিত্তের চার দেওয়ালেই আটকে রাখবে। কম্পিউটারের মাউসে আঙুল রেখেও বাঁধন থমকে আছে, ভয়ে ক্লিক করতে পারছে না। কিন্তু তার ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে বাবা-মা তাকে সাহস দিচ্ছেন। আর সবার পেছনে, দরজার কোণে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট নূর।
সবার মনে এখন একটাই চিন্তা, একটা মাত্র ক্লিক যদি তাদের পক্ষে যায়, তবে এই মধ্যবিত্ত পরিবারের পুরো চেহারাটাই পাল্টে যাবে।
বাবা রিফাতুল জিদান মির্জা ছেলের কাঁধে হাত রেখে বললেন :
, "এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই বাবা। তুই সাহস নিয়ে নোটিশটা চেক কর। আশা করি আল্লাহর রহমতে ভালো কিছুই হবে।"
মা তাসলিমা আক্তারও ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
"হ্যাঁ বাবা, দেখিস ভালো হবে। আল্লাহ কারো পরিশ্রম বৃথা যান না। তোর এতদিনের কষ্টের ফল তুই আজ পাবি, ক্লিক কর বাবা।"
মা-বাবার এত বড় আশ্বাস পেয়ে বাঁধন বুক ভরে একটা শ্বাস নিল। তারপর চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে, কম্পিউটারের স্ক্রিনে থাকা ইমেইল বক্সে ক্লিক করে দিল। একটা মৃদু শব্দ হতেই সে ধীরে ধীরে চোখ খুলল। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে কাঙ্ক্ষিত সেই নোটিশ!
বাঁধন কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে জোরে জোরে মেইলটি পড়তে শুরু করল, যাতে পাশে থাকা বাবা-মাও শুনতে পান—
বিষয়: অফিশিয়াল নোটিফিকেশন: আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ নির্বাচনের ফলাফল।
প্রিয় বাঁধন রায়াদুল মির্জা,
আমরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে, আমাদের অ্যাডমিশন এবং স্কলারশিপ কমিটি আপনার আবেদনটি সফলভাবে মূল্যায়ন করেছে। আপনার একাডেমিক রেকর্ড এবং চূড়ান্ত অ্যাসাইনমেন্ট বিবেচনা করে, আমরা আপনাকে কানাডায় ব্যাচেলর প্রোগ্রামের জন্য ১০০% সম্পূর্ণ অর্থায়িত (Fully Funded) স্কলারশিপ প্রদান করতে পেরে আনন্দিত।
এই স্কলারশিপ আপনার পড়াশোনার সম্পূর্ণ খরচ, থাকা-খাওয়া এবং মাসিক ভাতা বহন করবে। আপনার অফিশিয়াল 'লেটার অফ অ্যাকসেপ্টেন্স' এই ইমেইলের সাথে যুক্ত করা হলো। আগামী ৭ দিনের মধ্যে আপনাকে এটি নিশ্চিত করতে হবে।
এই অসাধারণ সাফল্যের জন্য আপনাকে অভিনন্দন! আমরা কানাডায় আপনাকে স্বাগত জানাতে উন্মুখ হয়ে আছি।
শেষের লাইনটা পড়া মাত্রই বাঁধন খুশিতে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল! আনন্দের অতিশয্যে তার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। দীর্ঘ তিন বছরের হাড়ভাঙা খাটুনি আর ত্যাগ আজ সফল হলো। বাবা-মাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না, ছেলেকে পরম আদরে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
কিন্তু এই আনন্দের জোয়ারে ভেসে গেল না শুধু একজন। সে হলো নূর।
সে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে তার ছোট্ট মনটা নিয়ে ভাবছিল,
"তাহলে ভাইয়া কি সত্যিই আমাকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাবে? আমি কি আর কোনোদিন ভাইয়ার সাথে খেলতে পারব না? ভাইয়া চলে গেলে তো আমি একদম একা হয়ে যাব! কে আমার পুতুলের বিয়েতে বর সাজবে? কে আমাকে বিকেলে ঘুরতে নিয়ে যাবে?"
নূর মনোযোগ দিয়ে তার ভাইয়া আর বাবা-মায়ের কথা শুনছিল। তার অবুঝ মনটা কোনোভাবেই এই বিচ্ছেদ মেনে নিতে পারছিল না।
ওদিকে বাঁধন খুশিতে আত্মহারা হয়ে মা-বাবাকে বলছিল,
"মা! বাবা! তোমাদের সব আশা পূরণ হয়েছে! আমি স্কলারশিপটা পেয়ে গেছি! এবার কানাডা গিয়ে তোমাদের সব স্বপ্ন আমি সত্যি করব। আমাদের আর কোনো অভাব-কষ্ট থাকবে না!"
ছোট্ট নূর দেখল,
সবাই ভাইয়াকে নিয়ে মেতে আছে, তাকে নিয়ে যেন এখন আর কারোর মাথাব্যথা নেই। তার ছোট্ট মনে এক বুক অভিমান এসে জমা হলো।
মা তাসলিমা আক্তার হঠাৎ পেছনে তাকাতেই দেখলেন নূর দূরে দাঁড়িয়ে আছে।
তিনি ইশারায় ডেকে বললেন,
"কীরে নূর মা?
তুই ওখানে ওভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ভেতরে আয়। তোর ভাইয়া কানাডায় যাওয়ার স্কলারশিপ পেয়েছে, তুই বুঝি খুশি হসনি?"
নূর মনের কষ্ট চেপে মুখে একটা জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে বলল,
"হ্যাঁ আম্মু,
আমি অনেক খুশি হয়েছি..."
বাঁধন একছুটে নূরের সামনে গিয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
"দেখ নূর!
তোর ভাইয়া চান্স পেয়ে গেছে! তোর তো লাফানোর কথা, মন খারাপ করে আছিস কেন,
বোন?"
নূর আলতো করে বাঁধনের বুক থেকে নিজেকে সরিয়ে নিল। চোখ নিচু করে বলল,
"না ভাইয়া, আমি তো বললামই অনেক খুশি হয়েছি। আর কই, মন খারাপ তো করিনি!"
বাঁধন নূরের এই আচরণে বেশ অবাক হলো। সে একটু কপাল কুঁচকে বলল,
"তুই তো আগে এমন ছিলি না রে নূর?
তোকে জড়িয়ে ধরলে তুইও আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতি। কিন্তু আজ কেন নিজেকে সরিয়ে নিলি? আমি কি তোকে বকেছি?"
নূর আর কোনো কথা বাড়াল না,
শুধু নিচু স্বরে বলল,
"এমনি..."
তাদের বাবা জিদান মির্জা পরিস্থিতি সামাল দিতে হেসে উঠে বললেন, "অনেক কথা হয়েছে, বাকি কথা পরে হবে। তোদের আর এখন ঝগড়া করতে হবে না। আমি যাচ্ছি মিষ্টি আনতে, আজ পুরো পাড়ার মানুষকে মিষ্টি খাওয়াব! আমার ছেলে স্কলারশিপ পেয়েছে বলে কথা!"
এই বলে বাবা আর এক মুহূর্তও দেরি না করে বাইরে বেরিয়ে গেলেন মিষ্টি কিনতে। আর মা-ও আনন্দের চোখে আঁচল ঠেকিয়ে নিচে চলে গেলেন ছেলের জন্য পছন্দের সব ভালো-মন্দ রান্না করতে।
নূর সেখানে আর দাঁড়িয়ে রইল না। এক বুক তীব্র অভিমান নিয়ে সে নিজের রুমের দিকে রওনা দিল।
আর বাঁধন? সে ভাবল, নূর হয়তো বরাবরের মতোই একটু আধটু দুষ্টুমি বা রাগ করছে, পরে মিষ্টি খাইয়ে রাগ ভাঙিয়ে দিলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু মেধাবী বাঁধন সেদিন বুঝতে পারেনি, নূরের এই ছোট্ট অভিমানী রাগটা পরবর্তীতে তাদের জীবনে এমন এক ভয়াবহ ঝড় এনে দাঁড় করাবে—
যা তাদের পুরো পরিবারের জীবন নিয়েই টানাটানি শুরু করে দেবে!