কলমে: আহমেদ বাঁধন
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
[৩য় খণ্ড]
কয়েকদিন ধরেই বাঁধন একটা জিনিস লক্ষ করছে—নূর তাকে অনবরত ইগনোর করে চলছে। বাঁধন নিজে থেকে তার সাথে কথা বলতে গেলেও নূর কেমন যেন একটা উদাসীন আর এড়িয়ে যাওয়ার ভাব দেখায়। আসলে ছোট্ট মেয়েটা তো এত কিছু বোঝে না! তার মনে তীব্র কষ্ট যে, তার ভাইয়া তাকে আর আগের মতো ভালোবাসে না, আর কিছুদিনের মধ্যেই তাকে ছেড়ে বিদেশে চলে যাবে। এই বয়সেই নূরের মনে এক অদ্ভুত জেদ আর অভিমান চেপে বসেছে।
কানাডায় যাওয়ার আর মাত্র তিন-চার দিন বাকি। বাঁধনের মনের ভেতর কেমন যেন একটা খটকা লাগছিল।
সে নিজের ঘরে বসে পড়াশোনা করার সময় হঠাৎ দেখল, তার ঘরের সামনে দিয়ে নূর হেঁটে যাচ্ছে।
বাঁধন তাকে পিছন থেকে ডেকে বলল,
"এই নূর!
এদিকে আয় তো।"
কিন্তু নূরের সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। সে বাঁধনের ডাককে পাত্তাই দিল না। সোজা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল। বাঁধনের সাথে কোনো কথা বলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে যেন তার নেই।
নূরের এই অবহেলার অভ্যাসটা বাঁধন একদমই পছন্দ করতে পারছিল না। সে আর সহ্য করতে না পেরে দ্রুত দৌড়ে গিয়ে সিঁড়িতে নূরের সামনে এসে দাঁড়াল।
নূরের হাতটা চেপে ধরে কিছুটা রাগত স্বরে বলল,
"প্রবলেমটা কী তোর?
ইদানীং আমার সাথে এমন ইগনোর করছিস কেন?"
নূরের কণ্ঠ ছিল একদম শান্ত। ছোট্ট মেয়েটা দুনিয়ার এত চালবাজি না বুঝলেও নিজের অভিমানটা ধরে রেখে হালকা সুরে বলল,
– জি, কিছু বলবেন?"
– জি কিছু বলবেন মানে কী? তুই যে ইদানীং আমাকে এভাবে এড়িয়ে চলছিস, তার কারণটা কী?
– আপনাকে ইগনোর করতে যাব কেন? আর কিসের জন্যই বা করব?
–দেখ নূর, আমার সাথে একদম চালাকি করবি না! তুই খুব ভালো করেই জানিস আমি রেগে গেলে কী করতে পারি। সো আন্ডারস্ট্যান্ড? আমাকে রাগাবি না!
– আপনি আমার কে হন যে আপনাকে রাগাতে যাব?"
– দেখ নূর, আমি জানি তুই কোনো একটা কারণে আমার ওপর রেগে আছিস। তোর মাথায় যদি তেমন কোনো উল্টোপাল্টা চিন্তা থাকে, তবে সেটা এখনই ঝেড়ে ফেল!
– বললাম তো, আপনার সাথে কথা বলার কোনো মাথাব্যথা আমার নেই। তাই আমাকে ডিস্টার্ব করবেন না!
– তুই একটা বাচ্চা মেয়ে! আর আমার সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় জানিস না? আমি তোর..." বাঁধন থামল।
– কী আমার, বলেন?"
– ওইসব তোকে না জানলেও চলবে!" বাঁধন নিজেকে সামলে নিয়ে বলল।
– "ওকে!
আমাকে আর বিরক্ত না করলেই আমি খুশি হব।"
–ওকে,
নেক্সট টাইম!
নূর আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে গটগট করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে নিজের গন্তব্যের দিকে চলে গেল।
বাঁধন সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে নূরের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। সে মনে মনে জানে নূর কোনো কারণে তার ওপর ভীষণ রেগে আছে।
তবে বাঁধন নিজেকে বোঝাল,
"নূর রাগ করেছে করুক, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমার স্বপ্ন অনেক বড়। আমাকে কানাডায় যেতেই হবে, বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতেই হবে। দিস ইজ মাই ওপেন চ্যালেঞ্জ!"
একটু থেমে বাঁধন মুখে একটা রহস্যময় মুচকি হাসি এনে স্বগতোক্তি করল,
–নূর... ইউ আর মাই হার্ট অক্সিজেন, ইউ আর মাই ডিপ্রেশন, ইউ আর মাই লাভ, ইউ আর মাই অবসেশন! ইউ আর মাই
হৃৎপিণ্ড, ইউ আর মাই ফুসফুস অ্যান্ড ইউ আর মাই মন!
–কিন্তু মনে রাখিস, এই বাঁধন কখনো হারতে শেখেনি, শুধু হারাতে শিখেছে। এটাই হলো আমার তরিকা!
–সামনে অনেক কিছু হতে চলেছে, জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ। দ্যাটস মাই ডিফায়েনিং টাইম, অল রাইট!
এই কথা বলে সে এক পা দু পা করে তার ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে মা-বাবার সাথে কথা বলতে গেল। তারপর মন হালকা করতে বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে বাইরে বের হলো।
বাঁধন বাড়ি থেকে বের হওয়া মাত্রই চোরের মতো গুটিগুটি পায়ে তার রুমে একজন প্রবেশ করল। সে আর কেউ নয়—আমাদের ছোট্ট নূর! ঘরে ঢুকেই তার অবুজ মনে একটা দুষ্টু ও জেদি বুদ্ধি খেলে গেল। সে টেবিলের ওপর রাখা কানাডার সেই অফিশিয়াল স্কলারশিপের কাগজটার দিকে তাকাল।
নূর মনে মনে বলল,
"এই পচা কাগজটার জন্যই তো ভাইয়া আমার সাথে খেলে না! আমার সাথে সম্পর্ক নষ্ট করেছে, আমি ভাইয়ার সাথে কথাই বলি না। যখন এই কাগজটাই থাকবে না, তখন ভাইয়া কীভাবে বিদেশে যাবে? আর কখনো আমাকে ছেড়ে যেতেও পারবে না! তখন রোজ আমার সাথে খেলবে... হিহিহি!"
সে খুশিতে মনে মনে এক কাল্পনিক জগৎ তৈরি করে ফেলল,
"তখন ভাইয়ার সাথে আমি অনেক খেলতে পারব, অনেক মজা হবে। ভাইয়া আমাকে আবার আগের মতোই ভালোবাসবে। আমি তো এটাই চাই! এই পচা কাগজটার আজ আমি এমন হাল করব যে ভাইয়া আর কোথাও যেতেই পারবে না!
বাচ্চা মেয়েটা এর ভবিষ্যৎ পরিণতি কী হতে পারে তা কিছুই বোঝে না। সে আর কোনো কথা না ভেবে টেবিলের ওপর থেকে জরুরি নোটিশের কাগজটা হাতে নিল। তারপর পরম আনন্দে কুচু কুচু করে পুরো কাগজটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে মেঝেময় ফেলে দিল!
নিজের মিশন সফল হতে দেখে সে হাততালি দিয়ে হাসতে হাসতে আর নাচতে নাচতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সে জানলই না, সে আজ নিজের ভাইয়ের স্বপ্নকে চিরতরে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে এল!