কলমে: আহমেদ বাঁধন
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
[৪র্থ খণ্ড]
রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বাঁধন যখন মুখে চওড়া হাসি নিয়ে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিল, তখনো সে জানত না কী ভয়ানক নিয়তি তার জন্য অপেক্ষা করছে। রুমে ঢোকার পরেই মেঝেতে কিছু কাগজের টুকরো তার নজরে এল। কাগজগুলো কেমন যেন চেনা চেনা ঠেকল। সামনে এগিয়ে গিয়ে একটা টুকরো হাতে নিতেই বাঁধনের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল! তার চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল।
তার দীর্ঘ তিন বছরের হাড়ভাঙা খাটুনি, যত্নে গড়া স্বপ্ন, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জেদ আর মা-বাবাকে সুখে রাখার শেষ ভরসা—সব এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে! নিজের জীবনের এমন করুণ পরিণতি সে কোনোদিন কল্পনাও করেনি।
বুকের ভেতর তীব্র ক্ষোভ আর হাহাকার দলা পাকিয়ে এক ভয়ানক রূপ নিল। রাগে, দুঃখে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সে পুরো বাড়ি মাথায় করে চিৎকার করে উঠল—
"নূর! এই নূর! কোথায় তুই? নূর...!!"
বাঁধনের সেই পৈশাচিক চিৎকারে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল। ঘরের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা নূর তার ভাইয়াকে ঘরে ঢুকতে দেখে হাসিমুখে সামনে এসে দাঁড়াল। অত্যন্ত নিষ্পাপ গলায় বলল,
"কী ভাইয়া? এসেছ? চলো এবার খেলতে যাই! আমি তো তোমার জন্য কখন থেকে বসে আছি!"
নূরের মুখে এই কথা শুনে বাঁধনের মাথার রগ দগদগ করে উঠল। যে কাগজের জন্য তার জীবন শেষ, সেই কাগজ ছিঁড়ে মেয়েটা খেলার বায়না করছে! রাগ সামলাতে না পেরে বাঁধন এক ঝটকায় নূরের গায়ের জামার কলার চেপে ধরল। আকস্মিক এই আক্রমণে নূর তীব্র ব্যথায় কঁকিয়ে উঠে বলল,
– প্লিজ ভাইয়া, ছাড়ো! আমার খুব লাগছে, ব্যথা পাচ্ছি!"
বাঁধনের চোখ তখন রাগে রক্তবর্ণ। সে পশুর মতো গর্জে উঠে বলল, "তুই আসলেই একটা অপয়া, একটা জঘন্য মেয়ে!
– তোর সাথে কথা বলাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। এটা তুই কী করলি? আমার পুরো জীবনটা তুই ধ্বংস করে দিলি! সারাক্ষণ শুধু বিরক্ত করে জ্বালিয়ে মারতিস, আর আজ আমার পুরো ভবিষ্যৎটা তুই কেড়ে নিলি! বল, কেন করেছিস এটা? বল!
বাঁধন নূরের হাতটা এত জোরে মুচড়ে ধরল যে, ছোট্ট মেয়েটার চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। যন্ত্রণায় তার মুখ লাল হয়ে গেল। কিন্তু বাঁধন তখন অন্ধ। সে আরও নিষ্ঠুর গলায় বলল,
– তুই একটা আস্ত অভিশাপ! প্রথমে নিজের মাকে খেয়েছিস, আর আজ আমার জীবনটা শেষ করলি!
বাঁধনের মুখের এই চরম অপমানজনক কথাগুলো তিরের মতো গিয়ে বিঁধল নূরের ছোট্ট বুকে। একটা কাগজের টুকরোর জন্য নিজের আপন ভাই তাকে অপয়া বলল?
মায়ের মৃত্যুর দায় তার ঘাড়ে চাপাল? নূরের ভেতরের পৃথিবীটা যেন ওলটপালট হয়ে গেল। সে যন্ত্রণায় শক্ত হয়ে গেল।
ঠিক তখনই, বাঁধন নিজের রাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নূরকে এক তীব্র ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে দিল। নূর সামলাতে না পেরে ছিটকে গিয়ে পড়ার টেবিলের এক কোণে থাকা ধারালো লোহার পিনের ওপর আছড়ে পড়ল। সাথে সাথে তার মাথার পেছনটা কেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে এল। কিন্তু নূরের মুখ থেকে কোনো আর্তনাদ বের হলো না। মাথার যন্ত্রণার চেয়েও ভাইয়ার দেওয়া কথার আঘাত তার মনকে অবশ করে দিয়েছিল। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, জীবনে যাই হয়ে যাক—এই নিষ্ঠুর ছেলের মুখ সে আর কোনোদিন দেখবে না।
ছেলের এমন উন্মত্ত চিৎকার আর নূরের অবস্থা দেখে নিচ থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন মা-বাবা। মা তাসলিমা আক্তার রক্তাক্ত নূরকে দেখেই মেঝেতে বসে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। মেয়ের মাথা থেকে অনবরত রক্ত ঝড়ছে। মা তীব্র ক্ষোভে ও ঘেন্নায় উঠে দাঁড়িয়ে বাঁধনের গালে কষে একটা থাপ্পড় মারলেন!
– এই জানোয়ার! তুই আমার পেটের ছেলে হতে পারিস না! একটা ছোট্ট মেয়ের এই অবস্থা করলি তুই? কী ক্ষতি করেছিল ও তোর?" মা চিৎকার করে উঠলেন।
বাঁধন এতক্ষণে নিজের ভুলের গভীরতা বুঝতে পারল। কিন্তু তার অহংকার আর ক্ষোভের কারণে সে দমে না গিয়ে মাথা নিচু করে বলল,
– মা, ও আমার কানাডার স্কলারশিপের অ্যাসাইনমেন্টটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে!
এবার বাবা রিফাতুল জিদান মির্জা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি রাগে অন্ধ হয়ে বাঁধনের কলার চেপে ধরলেন এবং প্যান্টের বেল্ট খুলে ছেলেকে পশুর মতো পেটাতে লাগলেন।
– কুলাঙ্গার! একটা কাগজের টুকরোর জন্য তুই নিজের ছোট বোনকে এভাবে মারলি?
বেল্টের একের পর এক আঘাতে বাঁধনের পিঠ ফেটে যাচ্ছিল, কিন্তু সে আজ নির্বাক, নিশ্চল। তার চোখ দিয়ে শুধু অনুশোচনার জল ঝরছিল। সে কী থেকে কী করে ফেলল!
মা আরও কয়েকটা চড় মেরে বাবার উদ্দেশ্যে বললেন,
– ওকে আর মেরে লাভ নেই, আগে মেয়েটাকে হাসপাতালে নিয়ে চলো! কখন কী হয়ে যায় বলা যায় না! আর এই কুলাঙ্গার...
মা বাঁধনের দিকে তাকিয়ে বিষাক্ত গলায় বললেন,
– তুই এখনই এই বাড়ি থেকে বের হয়ে যা! আজ থেকে তুই আমার মরা মুখ দেখবি, যদি এই ঘরে আর এক মুহূর্তও থাকিস!
মায়ের মুখের এই অভিশাপ শুনে বাঁধন স্তব্ধ হয়ে গেল। তার আর কোনো কথা বলার ক্ষমতা রইল না। বাবা এক হ্যাঁচকা টানে তাকে দরজার বাইরে এনে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলেন। দরজা লাগানোর আগে শেষবারের মতো বলে গেলেন,
– আজ থেকে জানবি তোর মা-বাবা বলতে ইহজগতে কেউ নেই। তুই আজ থেকে এতিম! আর কখনো এই বাড়ির চৌকাঠ মাড়াবি না!
ধড়াম করে দরজার কপাট বন্ধ হয়ে গেল। এক ঝড়ে বাঁধন তার ক্যারিয়ার, পরিবার এবং আপনজন সব হারিয়ে এক লহমায় রাস্তার ফকির হয়ে গেল।
যাওয়ার আগে বাঁধনের বুকে লাস্ট একটি কথাই, বের হলো তার বাবা-মার সামনে,
– আমি একদিন ফিরব ঠিকই ফিরব কারণ জীবনের সব কিছু ছাড়লেও তাকে ছাড়বো না যখন ফিরব সাথে করে জিনিসটাও নিয়ে যাব দিস ইজ মাই চ্যালেঞ্জ...!!
পরদিন ভোরবেলা। ফজরের আজানের পরপরই হাসপাতালের বেডে নূরের জ্ঞান ফিরল। ডাক্তাররা আগেই জানিয়েছিলেন নূরের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক, মাথায় গভীর চোট পাওয়ার কারণে মারাত্মক কিছু ঘটতে পারে, এমনকি সে পক্ষাঘাতগ্রস্ত প্যারালাইজড হতে পারে। চার-পাঁচ ঘণ্টার টানটান উত্তেজনার পর অবশেষে তার চোখ খোলায় ডাক্তার কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে মা-বাবাকে বললেন,
"আপনারা ভেতরে গিয়ে দেখা করতে পারেন। তবে সাবধান, বেশি কথা বলবেন না। রোগীকে শান্ত রাখতে হবে।
মা-বাবা দ্রুত কেবিনে ঢুকলেন। মা তাসলিমা আক্তার নূরের শিয়রে বসে পরম স্নেহে বললেন,
নূর মা!
এখন কেমন লাগছে তোর?"
নূর শূন্য দৃষ্টিতে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। মায়ের কথা শুনে সে ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাদের দিকে তাকাল।
অত্যন্ত অপরিচিত আর দুর্বল কণ্ঠে বলল,
আপনারা কারা? আর আমিই বা এখানে কেন? কী হয়েছে আমার?"
মেয়ের মুখের এই অদ্ভুত কথা শুনে বাবা-মায়ের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। বাবা জিদান মির্জা নূরের হাত ধরে কেঁদে উঠে বললেন,
"নূর মা!
তুই আমাকে চিনতে পারছিস না? আমি তোর বাবা! ভুলে গেলি আমাদের?
নূর তার মাথায় হাত দিয়ে কিছু একটা মনে করার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। তার চোখে তীব্র বিভ্রান্তি। সে অবুঝের মতো আবারও বলল,
কে আপনারা? আমি কিছু মনে করতে পারছি না...
মা-বাবা আর এক মুহূর্তও দেরি না করে পাগলের মতো ডাক্তারের চেম্বারে ছুটে গেলেন। বাবা ডাক্তারের হাত ধরে আর্তনাদ করে উঠলেন,
ডাক্তার ! আমার মেয়ের একী হলো? সে আমাদের কাউকেই চিনতে পারছে না কেন?
ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে চশমাটা ঠিক করতে করতে বললেন,
"আমি ঠিক এই ভয়টাই পাচ্ছিলাম। মাথায় তীব্র আঘাতের কারণে আপনাদের মেয়ে 'মেমোরি লস' বা আংশিক স্মৃতিভ্রমের শিকার হয়েছে। সে তার জীবনের গত কয়েক বছরের স্মৃতি সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছে। আর জোর করে তাকে কিছু মনে করানোর চেষ্টা একদম করবেন না, এতে তার ব্রেনের ওপর চাপ পড়বে এবং অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে।
ওদিকে হসপিটালের বাইরে, শেষ রাতের কুয়াশায় একা দাঁড়িয়ে ছিল বাঁধন। যে পরিবার তাকে ছুড়ে ফেলেছে, সেই পরিবারের এক সদস্য আজ স্মৃতির পাতা থেকে বাঁধন নামটাই মুছে ফেলেছে। এই চরম শূন্যতাই কি তাকে বদলে দেবে এক ভয়ংকর মাফিয়া ডন কিংবা এক দুর্ধর্ষ সিআইডি অফিসারে?