কলমে: আহমেদ বাঁধন
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
[১১শ খণ্ড]
হেলিকপ্টার এখন ঢাকার বুক চিরে আকাশে ডানা মেলেছে। কিন্তু নূরের ভেতরের রাগ, ক্ষোভ আর জেদ এক ফোঁটাও কমেনি। সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না যে এভাবে জোর করে, ব্ল্যাকমেইল করে তার বিয়ে হয়ে গেল! নূরের স্বপ্ন ছিল
—সে তার মনের মানুষকে ভালোবেসে ধুমধাম করে বিয়ে করবে। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, চোখের পলকে এক ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী তার জীবনের সমস্ত স্বপ্ন ভেঙে গুঁড়ো করে দিল! সে মনে মনে চরম অপমানে আর কষ্টে নীরবে চোখের জল ফেলছে। কিন্তু এখন কেঁদেও বা কী লাভ?
যে তাকে প্রকাশ্য দিবালোকে কিডন্যাপ করে বিয়ে করেছে, সে তো সাধারণ কোনো অপরাধী নয়; সে হলো পুরো বিশ্বের ত্রাস, আন্তর্জাতিক মাফিয়া ডন বাঁধন মির্জা! যার নাম শুনলে বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খায়, যার সামনে মাথা তুলে কথা বলার সাহস খোদ রাষ্ট্রপ্রধানদেরও নেই। নূর এখন এক মহাসর্বনাশের মুখে এসে পড়েছে। এই বদমেজাজী, ভয়ঙ্কর মাফিয়ার সাথে তার কোনোদিন চেনাজানাই ছিল না, অথচ আজ সে তার কপালে জুটে গেল! নূর মনে মনে নিজের কপালকেই দোষ দিতে লাগল।
বাঁধন চুপচাপ নূরের পাশেই বসে আছে। সে নূরের হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় ধরে রেখেছে। আজ যেন বাঁধনের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটা পূরণ হলো। যাকে সে ছোটবেলা থেকে নিজের জান-প্রাণ দিয়ে ভালোবেসে এসেছে, আজ অবশেষে সমস্ত বাধা পেরিয়ে তাকে নিজের করে পেয়েছে। পাওয়ার পথটা একটু কঠিন আর জোরজুলুমের হলেও, দিনশেষে নূর এখন তার বৈধ স্ত্রী! এই চরম প্রাপ্তির আনন্দে বাঁধনের ঠোঁটের কোণে একটা তৃপ্তির বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।
হেলিকপ্টারের তীব্র বাতাসের শব্দের মাঝেই নূর তার অশ্রুসজল চোখে চরম ঘৃণা আর ক্ষোভ নিয়ে বাঁধনের দিকে তাকাল। সে ভারী গলায় চেঁচিয়ে বলল—
— কেন আমার জীবনটা এভাবে ধ্বংস করলেন আপনি?
— আপনার মতো একজন খুনি, রক্তপিপাসু পাপী কেন আমার জীবনের অংশীদার হতে গেল? উত্তর দিন!"
বাঁধনের চোখে-মুখে কোনো অনুশোচনার লেশমাত্র নেই। কারণ সে তার ভালোবাসাকে জয় করেছে। সে নূরের দিকে এক অদ্ভুত মায়াবী কিন্তু গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঠান্ডা মাথায় শান্ত কণ্ঠে জবাব দিল—
— তোমাকে নিজের করে পাওয়ার আশা আমার আজব বা কালকের নয় নূর, অনেক বছর আগের! যে আশা পূরণ করতেই আজ আমার বাংলাদেশে পা রাখা। আজ তোমার বয়স আর আইনি পূর্ণতা হয়েছে, তাই আমার ভালোবাসার জেদটাও পূর্ণতা পেল, জানেমান!"
— কী আবোল-তাবোল বকছেন এসব?
— আমি তো আপনাকে চিনিই না! তাহলে আপনি আমাকে কীভাবে ভালোবাসলেন? কবে থেকে ভালোবাসলেন?"
— সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে ডিয়ার। শুধু সময়ের অপেক্ষা করো... জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ, মাই ডিয়ার জান!"
নূর আর কথা বাড়িয়ে বাঁধনকে রাগাতে চাইল না। কারণ সে ভালো করেই বুঝে গেছে, এই লোকটা একটা চরম সাইকো আর আনপ্রেডিক্টেবল ডেঞ্জারাস মাফিয়া! সে যেকোনো সময় যেকোনো কিছু করে ফেলতে পারে। খোদ দেশের প্রধানমন্ত্রী যার পায়ের নিচে থাকে, তাকে আইনের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। তাই চুপ থাকাটাই এখন বুদ্ধিমানের কাজ।
নূর একটু ইতস্তত করে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
"আমার বাবা-মাকে ছেড়ে দিয়েছেন তো?"
— তাদের নিয়ে চিন্তা করার কোনো দরকার নেই তোমার। তারা নিজেদের বাড়িতে একদম সুরক্ষিত আছে। তাই ওসব চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে শুধু আমাকে নিয়ে চিন্তা করো!"
নূর আর কোনো কথা না বলে চুপচাপ জানালার বাইরে মেঘের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ ওড়ার পর হেলিকপ্টারটি কেরানীগঞ্জের এক বিশাল ও আলিশান রাজপ্রাসাদের হেলিপ্যাডে ল্যান্ড করল। প্রাসাদটি এত বড় আর সুন্দর যে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। চারপাশে রাজকীয় বাগান, সুইমিং পুল আর কড়া সিকিউরিটি গার্ডে ঘেরা এক দুর্ভেদ্য দুর্গ।
হেলিকপ্টার থামতেই বাঁধন নূরের হাতটা আবার শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় নিল। নূরের এই স্পর্শ মোটেও পছন্দ হচ্ছিল না, কিন্তু এই মরণ কামড় দেওয়া মাফিয়ার সামনে কোনো জোরাজোরি খাটবে না ভেবে সে চুপ করে রইল। বাঁধন আর দেরি না করে নূরকে এক ঝটকায় আবার পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। তারপর ধীর পায়ে রাজপ্রাসাদের প্রধান ফটকের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
ফটকের ওপরে তাকাতেই নূরের চোখ আটকে গেল।
রাজকীয় তোরণের ওপর সোনার অক্ষরে খোদাই করে লেখা
—"NUR PALACE" (নূর প্যালেস)!
নিজের নামে এই সুবিশাল রাজপ্রাসাদের নামকরণ দেখে নূর মনে মনে চরম চমকে উঠল! সে বড় বড় চোখ করে বাঁধনের মুখের দিকে তাকাল, কিন্তু মুখ ফুটে কোনো শব্দ বের করতে পারল না। বাঁধন তাকে সোজা ভেতরে নিয়ে গিয়ে ড্রয়িংরুমের নরম সোফায় বসিয়ে দিল এবং বলল,
"তুমি এখানে বোসো, আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।"
{ কিছুক্ষণ পর }
বেশ কিছুক্ষণ পর বাঁধন ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িংরুমে ফিরে এল। তার পরনে কেবল একটা সাদা টাওয়েল, যা তার সুগঠিত ও পেশীবহুল সিক্স-প্যাক বডিকে উন্মুক্ত করে রেখেছে। চুলগুলো থেকে এখনো পানির ফোঁটা ঝরছে। সে নূরের সামনেই থাকা বড় ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াতে লাগল।
নূর সোফায় বসে আপন মনে ভাবছিল, কিন্তু সামনে তাকাতেই বাঁধনের এই অর্ধনগ্ন কিলার লুক দেখে সে থতমত খেয়ে গেল। ছেলেটা দেখতে আসলেই অসম্ভব সুদর্শন ও পৌরুষদীপ্ত, কিন্তু নূর নিজের মনকে শক্ত করে বোঝাল—'খবরদার নূর! ও একজন কুখ্যাত মাফিয়া, ওর ডজন ডজন খুনের মামলা আছে।
এই অপরাধীর প্রেমে কোনো অবস্থাতেই পড়া যাবে না!' সে দ্রুত নিজের চোখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে কর্কশ গলায় বলল—
"অসভ্য নাকি আপনি?
— লজ্জা-শরম বলতে কি আপনার কিচ্ছু নেই? সামনে একটা পরনারী বসে আছে, আর আপনি এভাবে আলগা গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন!"
বাঁধন চিরুনিটা টেবিলের ওপর রেখে আয়নায় নিজের চুলের স্টাইলটা একবার দেখে নিল। তারপর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে শয়তানি হাসি ফুটিয়ে ধীর পায়ে নূরের একদম কাছে এসে দাঁড়াল।
বাঁধন ঝুঁকে পড়ে নূরের মুখের খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"কেন?
— লজ্জা পাচ্ছ বুঝি ম্যাডাম?
— অবশ্য পাওয়ারই কথা। জার্মানির অর্ধেকের বেশি হাই-সোসাইটির মেয়েরা আমার এই লুক দেখার জন্য পাগল হয়ে যেত, সেখানে তুমি তো এখন আমার লিগাল ওয়াইফ!"
নূর সোফার পেছনের দিকে সরে গিয়ে কড়া গলায় বলল,
"নিজেকে কি খুব বিশ্বসুন্দরী... থুড়ি, বিশ্বপুরুষ মনে করেন নাকি? আমার মতো মেয়ের এত ফালতু সময় নেই যে আপনার মতো একজন মাফিয়াকে দেখে ক্রাশ খাবো! ওই টাইপের সস্তা মেয়ে আমাকে ভাববেন না,
ওকে?"
— তাই নাকি?
— তাহলে তুমি ঠিক কী টাইপের মেয়ে, ম্যাডাম?" বাঁধন নূরের আরও কাছে এসে সোফার দুই পাশে হাত দিয়ে তাকে লক করে ফেলল।
"দেখুন! একদম গায়ে পড়ার চেষ্টা করবেন না! আমি কিন্তু একজন সিআইডি অফিসার। সুযোগ পেলে আপনাকে সোজা কড়া থেরাপি দিয়ে জেলে চালান করে দেব! আমার থেকে দূরে থাকুন!"
— আমি তো অলরেডি তোমার মনের জেলখানায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে আটকে গেছি জান! সো, বাইরের জেলের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই।"
— তবুও এমন করবেন না প্লিজ..."
নূর এবার অসহায় চোখে চাইল।
"ওকে,
এখন তোমাকে আর ডিস্টার্ব করব না। যা হওয়ার তা তো রাতেই হবে! তাই একটু মেন্টালি প্রিপেয়ার্ড থেকো ম্যাডাম। আর মনে রেখো—এখন থেকে আমি কিন্তু তোমার পার্সোনাল প্রপার্টি!"
এই বলে বাঁধন চোখ টিপে হেসে নিজের ড্রেসিংরুমের দিকে চলে গেল ড্রেস চেঞ্জ করতে। নূর সোফায় বসে রাগে নিজের দাঁত কিড়মিড় করতে লাগল।
— সন্ধ্যা প্রায় শেষ হওয়ার পর —
ঢাকার একটি অন্ধকার, নির্জন পার্কের বেঞ্চে একা বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে রিশাদ। তার মনটা আজ ভীষণ খারাপ, বুকটা এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে কেঁপে উঠছে। সকাল থেকে সে নূরকে অনবরত ফোন করে যাচ্ছে, কিন্তু নূরের ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে। নূরের বাসায় খোঁজ নিয়েও কোনো হদিস মেলেনি। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, নিজের বুকে গুলি ঠেকিয়ে যে নূরকে সে নিজের করে পেয়েছিল, আজ তাকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে রিশাদ চরম ভেঙে পড়েছে।
রিশাদ একটা দীর্ঘ নিস্তব্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য বাতাসের উদ্দেশ্যে বলতে লাগল—
"ভালোবাসা আসলেই এক নির্মম খেলা নূর! কেউ পেয়েও হারিয়ে ফেলে, আবার কেউ না পেয়েও সারাজীবন ভালোবেসে যায়। আমি তো তোমাকে পেয়েও আজ আবার হারিয়ে ফেললাম! ভাগ্যের কী নিষ্ঠুর পরিহাস দেখো—আজ সকাল থেকে তুমি নিখোঁজ, আর আমি এখানে মরে যাচ্ছি। তুমি কেমন আছো, কোথায় আছো... আমি কীভাবে জানব? তুমি তো আমার আকাশের সেই মিষ্টি শুকতারা, তোমাকে ভুলে থাকা যে আমার পক্ষে অসম্ভব জান!"
রিশাদ কাঁপাকাঁপা হাতে পকেট থেকে তার মোবাইল ফোনটি বের করে আবারও নূরের নাম্বারে ডায়াল করল। কিন্তু ওপাশ থেকে সেই একই যান্ত্রিক নারী কণ্ঠ ভেসে এল—
"আপনার ডায়ালকৃত মোবাইল নম্বরটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে। অনুগ্রহ করে কিছুক্ষণ পর আবার চেষ্টা করুন..."
এক বুক হতাশা আর কান্না চেপে রিশাদ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। ভালোবাসার মানুষটি এভাবে হঠাৎ কোথায় হারিয়ে গেল, তা রিশাদের ভাবনার বাইরে। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে বসে থাকতে পারল না। চোখের কোণের জলটা মুছে নিয়ে, একরাশ কষ্ট ও একাকীত্ব বুকে চেপে সে ধীর পায়ে নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। কিন্তু সে জানত না, তার ভালোবাসার শুকতারা আজ এক মাফিয়ার প্রাসাদে চিরতরে বন্দি হয়ে গেছে!