কলমে: আহমেদ বাঁধন
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
[১২তম খণ্ড]
~~ রাত ১০ : ৩০ টা নাগাদ ~~
বিলাসবহুল বেডরুমের আলিশান বিছানায় বসে নূর কেবলই আফসোস করছে আর নীরবে চোখের জল ফেলছে। নিজেকে তার এখন একজন বিশ্বাসঘাতক মনে হচ্ছে। যে রিশাদ তাকে এতগুলো বছর ধরে পাগলের মতো ভালোবাসলো, যাকে সে নিজের মনের কথা এতদিন পরিষ্কার করে বলতে পারেনি, আজ তার সাথে ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস ঘটে গেল! কপালে জুটলো এক চরম জেদি আর রাগী মাফিয়া ডন। নূর একজন সৎ সিআইডি অফিসার হয়েও দেশের সবচেয়ে বড় ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনালকে বিয়ে করে ফেলল! এটা সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। এখন রিশাদের কী হবে? রিশাদকে সে মুখ দেখাবে কীভাবে?
নূর নিজের মনেই বিড়বিড় করছে আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে,
"হে আল্লাহ! আমার সাথে এটা কী হলো? আমি একজন মাফিয়াকে বিয়ে করে ফেললাম? যে সিআইডি অফিসার নূর কোনোদিন অপরাধীদের সামনে এক ফোঁটা চোখের জল ফেলেনি, আজ এক জঘন্য অপরাধী তাকে এভাবে কাঁদিয়ে ছাড়ল! আমি তো ভালোবাসতাম রিশাদকে, আর কপালে জুটলো এই খুনি! আমি কোনোমতেই এই দানবকে আমার স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারব না। আমি একে কোনোদিন বিশ্বাস করব না!"
নূরের এই কান্নাকাটির মাঝেই হুট করে বেডরুমের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল সেই সুদর্শন পুরুষ। বাঁধনের চোখে কোনো ক্লান্তির ছাপ নেই, বরং তার ধারালো চোখে এক অদ্ভুত মাদকতা ও নেশা জড়ানো চাউনি। একটা ক্যাজুয়াল ড্রেস পরে সে নূরের দিকে এগিয়ে এসে তার সেই গম্ভীর ও নেশাখোর কণ্ঠে বলে উঠল—
"তুমি কাঁদছ কেন নূর?
— এখন কান্না থামাও! ইউ আর মাই অনলি লিগ্যাল ওয়াইফ অ্যান্ড মাই প্রপার্টি! তোমার এই সুন্দর চোখে কান্না মোটেও মানায় না ডিয়ার। তুমি হলে আমার এই পাষাণ হৃদয়ের একমাত্র স্পন্দন, আমার কিউট বেবি!"
নূর তার কথার কোনো পাত্তাই দিল না। একজন সাহসী সিআইডি অফিসার হয়েও সে আজ বড্ড অসহায়। সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেদে চলল। জোরজুলুম করে করা এই বিয়ে সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না, তার মনে এখন বাঁধনের প্রতি শুধু রাগ আর তীব্র ঘৃণা। বাঁধন নূরের এই অবাধ্যতা দেখে এবার কিছুটা কড়া গলায় চিল্লিয়ে বলে উঠল,
"স্টপ ইউর ক্রাইং!
আই সেড জাস্ট শাট আপ!"
কিন্তু নূরের কান্না থামল না। এরকম পরিস্থিতিতে বাঁধন কী করবে বুঝতে না পেরে সরাসরি নূরের খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল। কান্নায় ভেজা নূরের এই অপরূপ সৌন্দর্য দেখে বাঁধন নিজের ভেতরের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। ছোটবেলা থেকে যাকে পাওয়ার জন্য সে পুরো দুনিয়ার বুকে ত্রাস সৃষ্টি করেছে, আজ তাকে এত কাছে পেয়ে বাঁধনের ভেতরের সমস্ত ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। নিজেকে আর সামলাতে না পেরে সে নূরকে শক্ত করে চেপে ধরল।
নূর নিজেকে ছাড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু একজন পেশীবহুল শক্তিশালী পুরুষের শক্তির সামনে একজন নারীর শারীরিক শক্তি কোনোভাবেই পেরে উঠল না। বাঁধন নূরের দুটি হাত এক হাত দিয়ে শক্ত করে মাথার ওপরে লক করে দিল এবং নিজের ভালোবাসার সমস্ত জেদ ও অধিকার নূরের ঠোঁটে আর গলায় সঁপে দিতে লাগল। নূরের ছটফটানি আস্তে আস্তে কমে এল, সে যেন বাঁধনের এই তীব্র ভালোবাসার ঝড়ে আধমরা হয়ে পড়ল। ঠিক তখনই বাঁধন পকেট থেকে রিমোটের সুইচ টিপে ঘরের সব লাইট অফ করে দিল। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝেই বাঁধন নূরের গায়ের পোশাকগুলো একে একে সরিয়ে দিল।
টেবিল থেকে একটি ডেইরি মিল্ক চকলেট বের করে বাঁধন তার কিছুটা অংশ নূরের ঠোঁটে আর মুখে ছুঁইয়ে দিল, আর বাকিটা নিজের মুখে নিয়ে নূরের অধরে সমর্পণ করল। অন্ধকার ঘরের ভেতরে তৈরি হলো এক তীব্র ও গভীর ভালোবাসার মহাকাব্য। সমস্ত অধিকার আদায় শেষে বাঁধন এক বুক তৃপ্তি নিয়ে নূরের বুকের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল।
— সকাল ১১ : ৩০ টা —
পরদিন সকালে নূরের চোখ খুলল। চোখ মেলা মাত্রই সে নিজের শরীরের ওপর এক বিশাল ভারী কিছুর উপস্থিতি অনুভব করল। সে দেখল, একটা শক্ত পুরুষালী শরীর তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। নূর নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু বাঁধনের সেই লোহার মতো শক্ত বাঁধন আলগা করা অসম্ভব। সে চোখ ভালো করে মেলে দেখতে পেল—
— তার নিজের শরীর সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এবং তার পাশে শুয়ে থাকা বাঁধনও সম্পূর্ণ দিগম্বর অবস্থায় ঘুমাচ্ছে!
এই অবস্থা দেখে লজ্জায়, অপমানে আর রাগে নূরের গা রি রি করে উঠল। বাঁধনের প্রতি তার ঘৃণার মাত্রা আরও হাজার গুণ বেড়ে গেল। সে আর সহ্য করতে না পেরে বাঁধনকে গায়ের জোরে একটা ধাক্কা দিয়ে বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করল। কিন্তু নূর অতিরিক্ত নাড়াচাড়া আর ধাক্কাধাক্কি করায় আচমকা দুজনেই খাট থেকে সোজা নিচে মেঝেতে আছড়ে পড়ল!
হুট করে ঘুমন্ত অবস্থায় খাট থেকে নিচে পড়ে যাওয়ায় বাঁধন ভীষণ চমকে গেল। সে ধড়ফড় করে উঠে বসে নিজের মাথা চুলকাতে চুলকাতে চরম রাগী স্বভাবে চিল্লিয়ে উঠল—
"মাথায় কি তোমার কোনো সমস্যা আছে, নাকি ছোটবেলা থেকেই মেন্টাল কেস তুমি? দেখছ না একটা মানুষ শান্তিতে ঘুমাচ্ছে! তুমি এমন পাগলের মতো ধাক্কা মেরে আমাকে খাট থেকে ফেলে দিলে কেন?"
নূর মেঝের চাদরটা দিয়ে নিজের শরীর কোনোমতে ঢেকে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
"একদম বেশ করেছি!
— আপনি গত রাতে আমার সাথে যা করেছেন, কোন অধিকারে করেছেন শুনি? আমি আপনাকে কোনো অধিকার দিয়েছি? আমি আপনাকে ঘৃণা করি! চরম ঘৃণা করি!"
বাঁধনের মুখ থেকে রাগের ভাবটা নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। সে মেঝে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নূরের মুখোমুখি হয়ে শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
"তুমি আমাকে ঘৃণা করতেই পারো নূর, সেটা তোমার চয়েস। কিন্তু আমি তোমাকে আমার নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। তুমি হলে আমার 'হার্টবিট'। যাকে ঘৃণা করা আমার পক্ষে এই জন্মে অন্তত সম্ভব নয়। তুমি আমাকে ঘৃণা করলেও আমার কোনো প্রবলেম নেই, কারণ দিনশেষে তুমি শুধুই আমার!"
— আমি আপনাকে কোনোদিন আমার স্বামী হিসেবে মানব না! আপনার মতো একজন ঘৃণিত কাপুরুষকে আমি সারাজীবন ঘৃণা করে যাব। আপনি গত রাতে আমার সম্মতি ছাড়া আমার শরীর স্পর্শ করেছেন! আমি আপনাকে কোনো পারমিশন দিইনি!"
বাঁধন এবার নূরের খুব কাছে এসে তার থুতনিটা চেপে ধরে বলল,
— অধিকার জিনিসটা আমাকে শেখাতে এসো না নূর! আমি যদি চাই, তবে তোমার এই অবাধ্য রূপটা যেকোনো সময় কেড়ে নিতে পারি। অধিকার কার সবচেয়ে বেশি, তা গত রাতেই প্রমাণ হয়ে গেছে। আমার জীবনের প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে শুধু তোমার অধিকার, আর তোমার ওপর শুধু আমার! দ্যাটস ক্রিস্টাল ক্লিয়ার, ওয়ান্স অ্যান্ড ফর অল!"
এই বলে বাঁধন আর কথা না বাড়িয়ে বিছানা থেকে একটা পাতলা সিল্কের চাদর টেনে নিয়ে নূরের শরীরে জড়িয়ে দিল এবং বলল
, "এখন বেশি কথা না বাড়িয়ে যাও, জলদি ফ্রেশ হয়ে নাও।"
— যাব না!
— কী করবেন আপনি আমার?
— অতিরিক্ত তর্ক করা আমার একদম পছন্দ নয় নূর। যা বলছি সোজা কথায় তাই করো। যাও, ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসো। একটু পর আমরা সবাই একসাথে লাঞ্চ করব।"
"বললাম তো আমি যাব না! আপনার যাওয়ার ইচ্ছা থাকলে আপনি যান, আই জাস্ট ডোন্ট কেয়ার!"
বাঁধন এবার আর মুখে কিছু না বলে আচমকা নূরকে চাদরসহ এক ঝটকায় পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। বাঁধনের এই আকস্মিক অ্যাকশনে নূর পুরো থতমত খেয়ে গেল। সে বাঁধনের শক্ত বুক আর কাঁধে নিজের হাত দিয়ে কিল-ঘুষি মারতে লাগল, ছটফট করে নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল। কিন্তু বাঁধনের সেই পারফেক্ট জিম বডির শক্তির সামনে নূরের সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো। সে নূরকে কোলে নিয়েই ওয়াশরুমের দিকে হাঁটতে লাগল।
নূর চিৎকার করে বলল,
"ছাড়ুন বলছি! অসভ্য লোক একটা, আমাকে নিচে নামান!"
— সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকা করতেই হয় নূর। চলো, একসাথে ফ্রেশ হয়ে আসি। তোমাকে এভাবে কোলে তুলে না নিলে তুমি তো সোজা কথার মানুষ নও!"
বাঁধন নূরের কোনো চিৎকার বা মারধরে কান না দিয়ে তাকে নিয়ে সরাসরি বিশাল ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। সেখানে জোরপূর্বক নূরকে শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে নিজের সাথে গোসল করিয়ে দিল। দুজনেই ফ্রেশ হয়ে কাপল ড্রেস পরে দুপুরের দিকে প্রাসাদের বিশাল ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল খাবার খাওয়ার জন্য...।