কলমে: আহমেদ বাঁধন
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
[৩২তম খণ্ড —
আরিফকে পাহাড়ি জংলি লোকগুলো প্রথমে ভুল ভেবে লাঠিসোঁটা নিয়ে চড়াও হলেও, পরে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে মুহূর্তেই শান্ত হলো। পাহাড়ি লোকগুলোর কাছে আরিফ এক অতি পরিচিত এবং অত্যন্ত ভালো মনের মানুষ হিসেবে সমাদৃত। অন্ধকারে আলো ফেলতেই তারা আরিফকে চিনে ফেলে এবং পরম আস্থায় তাকে জাপটে ধরে জড়িয়ে ধরল।
আরিফকে পেয়ে সেই স্থানীয় লোকগুলোর মধ্য থেকে এক ছোকরা উত্তেজিত হয়ে বলল—
"চিন্তা করবেন না আরিফ ভাই! আমাদের ভাবীর কিছু হবে না! আমরা সবাই আছি, পুরো পাহাড় তন্ন তন্ন করে হলেও ভাবীকে খুঁজে বের করব! শুনলাম ভাবীর সাথে নাকি সিআইডির আরও একটা মেয়ে অফিসার মিসিং আছে..."
'ভাবী' শব্দটা শুনে আরিফ ক্ষণিকের জন্য একটু থমকে গেল। সে ভাবল এরা হয়তো আলিয়ার কথা বলছে, কারণ আলিয়ার সাথেও আরিফের একটা পরিচয় ও সম্পর্কের টান রয়েছে—যদিও সেটা সাধারণ মানুষের কাছে গোপনীয়। আরিফ ভেতরে ভেতরে কিছুটা অবাক হলেও পরিস্থিতি বুঝতে পেরে বলল—
"তোমরা কেউ আমার ফিউচার ওয়াইফকে দেখেছ? আমি তাকেই তো খুঁজে পাচ্ছি না! কোথায় সে?!"
আরিফকে থামিয়ে দিয়ে সেই দলটির মধ্য থেকে 'ডান' নামের এক লোক দ্রুত বলে উঠল—
"আপনি একদম চিন্তা করবেন না আরিফ ভাই! আমরা আপনার ভাবীর জন্যই এখানে এসেছি। আর ঢাকা থেকে ভাইয়াও ব্যাকআপ নিয়ে চলে এসেছে! ইনশাআল্লাহ ভাবীকে আমরা অবশ্যই খুঁজে পাব!"
আরিফ আর কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই হঠাৎ পুরো পাহাড়ি উপত্যকায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে গেল! চারপাশের আকাশে লাল-সবুজ ইমার্জেন্সি সিকনেলিং লাইট জ্বলে উঠল। চট্টগ্রাম পাহাড়ের সীমান্ত এলাকায় যেন কেয়ামত নেমে এসেছে! খবর পেয়ে এক এক করে বাংলাদেশ আর্মি, র্যাব, স্পেশাল কমান্ডো স্কোয়াড থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বস্তরের উচ্চপদস্থ ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা দলে দলে উপস্থিত হতে শুরু করেছে!
সেখানে উপস্থিত সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সিআইডি অফিসাররা পর্যন্ত চোখ ছানাবড়া করে দৃশ্যটি দেখছিল! দুই সাধারণ সিআইডি মেয়ের জন্য কার নির্দেশে পুরো বাংলাদেশের সমস্ত ডিফেন্স আর ভিআইপি ডিপার্টমেন্ট এভাবে মাঠে নেমে আসলো? কার এত ক্ষমতা?!
যে অন্ধকার পাহাড়ে একটু আগেও কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছিল, তা এক পলকে দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। হাজার হাজার সশস্ত্র জোয়ানের ভারী বুটের শব্দে থরথর করে কাঁপতে লাগল পাহাড়ি জমিন। বনের হিংস্র পশুগুলো মানুষের এই নজিরবিহীন সমাগম দেখে ভয়ে গহীন জঙ্গলে আত্মগোপন করল।
ঠিক সেই মুহূর্তে চট্টগ্রামের শান্ত নীল আকাশের বুক চিরে বিকট গর্জনে উড়ে এল নয়-নয়টি ব্ল্যাকহক গানশিপ হেলিকপ্টার!
একসাথে এতগুলো সামরিক হেলিকপ্টারের ল্যান্ডিংয়ের বাতাসে পাহাড়ি গাছপালা দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। শুধু আকাশপথই নয়, চট্টগ্রাম উপকূলীয় জলসীমায় কোস্টগার্ডের সাবমেরিন, স্পিডবোট আর স্পেশাল লঞ্চ প্যাড মোতায়েন করা হয়ে গেছে। পুরো পাহাড়ি এলাকা যেন এক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো!
সবার চোখ গিয়ে আটকালো সবচেয়ে সামনের প্রধান প্রাইভেট হেলিকপ্টারটির ওপর। ল্যান্ড করার সাথে সাথেই তার স্বয়ংসক্রিয় দরোজা খুলে গেল। হাত দুটো রক্তে রাঙানো, চোখে মুখে ভয়াল হিংস্রতা আর দুই হাতে ভারী স্বয়ংক্রিয় মেশিনগান উঁচিয়ে হেলেদুলে নেমে এল আন্ডারওয়ার্ল্ডের সর্বময় অধিপতি—মাফিয়া সম্রাট বাঁধন মির্জা!
বাঁধনের সেই কালান্তক হিংস্র চেহারা দেখে সেখানে উপস্থিত সমস্ত সিকিউরিটি ফোর্সের বড় বড় কম্যান্ডার ও উচ্চপদস্থ অফিসাররা সশ্রদ্ধ ভঙ্গিতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একযোগে স্যালুট ঠুকল!
কিন্তু বাঁধন মির্জার মস্তিষ্কে তখন নূরের রক্তাক্ত চেহারা ছাড়া আর কিছুই জ্বলছিল না। দাঁতে দাঁত চেপে, গলার রগ ফুলিয়ে সিংহ আকৃতির গর্জন ছেড়ে জোসেফ ও অ্যালবার্টের উদ্দেশ্যে বলে উঠল—
"কুত্তার বাচ্চারা! পাস নাউ! যদি আমার নূরকে অক্ষত অবস্থায় না পাই, তবে পুরো বাংলাদেশকে আমি এখানে জ্যান্ত কবরস্থানে রূপান্তর করব! ছোট-বড় যে শয়তানগুলোকে দেখবি, সবকটাকে অ্যারেস্ট করবি—দ্যাটস মাই স্পেশাল অর্ডার! নতুবা নিজ হাতে স্পট ডেথ করবি! যে কোনো মূল্যে হোক আমার নূরকে আমার সামনে চাই! দিস ই্স মাই লাস্ট ওয়ার্নিং অ্যালবার্ট... জোসেফ! গো অ্যান্ড গেট মাই নূর!"
জোসেফ আর অ্যালবার্ট আর এক সেকেন্ডও বিলম্ব না করে আর্মড ফোর্স নিয়ে গহীন জঙ্গলের দিকে রওয়ানা দিল।
ঠিক তখনই বাঁধনের সামনে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে এসে দাঁড়াল সেই সিক্রেট এজেন্ট, যাকে বাঁধন বাংলাদেশে নূরের সুরক্ষার জন্য ছায়ার মতো নিযুক্ত করে রেখেছিল। সে নূরের কোনো বিপদ রুখতে পারেনি। তাকে চোখের সামনে দেখা মাত্রই বাঁধনের ভেতরের দানবটা জেগে উঠল!
— হ্যাঁচকা টান!
বাঁধন এক হাতে লোকটার কলার চেপে ধরে আকাশে তুলে ফেলল! নূরের নিরাপত্তায় গাফিলতি করার অপরাধে বাঁধনের শরীর রাগে রি-রি করছিল। লোকটার গলায়
পিস্তলের নাল ঠেসে ধরে বাঁধন পশুর মতো গর্জে উঠল—
"তোকে আমি কী দায়িত্ব দিয়েছিলাম রে কুত্তার বাচ্চা?! আমার নূরকে আগলে রাখার দায়িত্ব দিয়েছিলাম না?! তুই আমার বউকে বাঁচাতে পারলি না?! তোকে এখন এখানে জ্যান্ত পুঁতে ফেলা উচিত!"
সেখানে উপস্থিত সিআইডি বা সেনাবাহিনীর কারো সাহস হলো না বাঁধন মির্জার হাত থেকে সেই লোকটিকে ছাড়ানোর! বাঁধন লোকটাকে এক আছাড়ে মাটিতে ফেলে দিয়ে থুতু ছিটিয়ে বলল
"নূরকে আগে খুঁজে পাই... তারপর তোকে দেখাবো বাঁধন মির্জা কী জিনিস! এই খাদের ভেতরেই তোকে কুকুর দিয়ে খাওয়াবো!"
কথা শেষ করে বাঁধন ধেয়ে গেল সিআইডির স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন অফিসার সাদিকের দিকে!
সাদিক স্যার তখনো পরিস্থিতির আকস্মিকতায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাঁধন সাদিককে নিজের ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করলেও নূরের বিষয়ে সে যে কাউকেই রেহাই দিতে প্রস্তুত নয়! বাঁধন কোনো কিছু ভাবার সুযোগ না দিয়ে সাদিকের কলার চেপে ধরে সজোরে এক ঘুসি আছড়ে মারল তার গালে!
— ঠাসসস!
আচমকা আঘাতে সাদিক ছিটকে পড়ে ঠোঁট ফেটে রক্ত বের হয়ে এল। সাদিক আঘাত সামলে উঠে দাঁড়িয়ে হতবাক চোখে তাকাল বাঁধনের দিকে। বাঁধন তার শার্টের কলার ধরে ঝাকিয়ে হিংস্র কণ্ঠে চিল চিৎকার করে বলতে লাগল—
"তুই না নূরের নিজের ভাইয়ের মতো লাগিস?! তবে কীভাবে তুই আমার মেয়েটাকে এই ডেঞ্জার জোনে একা আসতে দিলি?! বল আমাকে! নিজের বোনকে যদি আগলে না রাখতে পারিস, তবে কীসের সিআইডি অফিসার তুই?! তুই আমার নূরের নিরাপত্তা দিতে পারিসনি... তোকে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করছে আমার!"
আহত ও বিভ্রান্ত সাদিক নিজের রক্ত মোছতে মোছতে অবাক গলায় বলল—
"আপনার কোথাও ভীষণ ভুল হচ্ছে মিষ্টার! আমি কিছুই বুঝতে পারছি না... আপনি কার কথা বলছেন? আমার ছোট বোন নূরের কথা বলছেন? ও তো একটা সিক্রেট অপারেশনে এসে মিসিং হয়েছে... আপনি কে? আর নূরকে আপনি আপনার বউ বলে কেন দাবি করছেন?!"
সাদিকের এই অবুঝ প্রশ্নে বাঁধনের হাসিতে যেন নরকের আগুন জ্বলে উঠল! সে দাঁতে দাঁত চেপে সাদিকের কানের কাছে মুখ এনে গর্জে উঠল—
"তোর কোনো ধারণা আছে যে তোর বোন নূর এখন কোথায় আর কী অবস্থায় আছে?! তুই যাকে এতক্ষণ সাধারণ মিসিং ভাবছিস, তাকে চট্টগ্রামের একদল নোংরা পাহাড়ি জংলি নেশাখোর তাড়া করে বেড়াচ্ছে! আমার নূরের গায়ে তারা ছুরি চালিয়েছে, রক্ত ঝরিয়েছে! জংলি শয়তানগুলোর কত বড় সাহস যে বাঁধন মির্জার রানি নূরকে আক্রমণ করে?! ওদের একটাকেও আজ আমি এই পাহাড়ে জ্যান্ত রাখব না! সব কটাকে টুকরো টুকরো করে কাটব!"
সাদিকের চোখের সামনে নূরের ওপর ঘটা এই
ভয়াল সত্যটা স্পষ্ট হতেই সে আতঙ্কে শিউরে উঠল!