ফন্ট সাইজ:
থিম:
মাফিয়া বাঁধন দ্যা সিআইডি অফিসার

৩৫তম পর্ব

লেখক: Ahmed Badhon
​কলমে: আহমেদ বাঁধন
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
​[৩৫তম খণ্ড —
​গায়ের তীব্র খচখচে অস্বস্তি আর লাল বালুর গা চুলকানি ভাবটায় ঘুমটা হালকা ভেঙে গেল নূরের। ঘুম ঘুম চোখের অলসতা কাটাতে না পেরে সে কপাল কুঁচকে উঠল। নিজেকে ঠিক কোথায় আবিষ্কার করছে—তা প্রথম কয়েক সেকেন্ড নূরের সিআইডি মস্তিষ্কও ধরে উঠতে পারছিল না। চারপাশে এক ভীতিজনক নিস্তব্ধ অন্ধকার, বাতাসে পচা পাতা আর ভেজা মাটির তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ!
​এক সেকেন্ডও আর দেরি করল না নূর। মনের ভেতরের অচেনা আতঙ্কে সে তড়িৎ গতিতে সোজা হয়ে উঠে বসার চেষ্টা করল। কিন্তু উঠে বসতে গিয়েই এক অদ্ভুত বিপদে পড়ল! সে অনুভব করল, সে নাকি কোনো এক নরম অথচ ফাঁপা মাটির তলে আস্তে আস্তে নিচের দিকে দেবে যাচ্ছে!
​নূর সঙ্গে সঙ্গে নিজের নড়াচড়া বন্ধ করে সাবধান হলো। কোঁকড়ানো খোলা চুলগুলো মুখের ওপর থেকে সরিয়ে আশপাশে ভালো করে তাকাতেই বুঝতে পারল—পাহাড়ি খাদ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার পর তারা আসলে পাহাড়ের পেটে থাকা এক বিশাল মচমচে শুকনো পাতার স্তর ও ঝুলন্ত লতাপাতার প্রাকৃতিক আস্তানায় এসে আটকে পড়েছে! পাতার এই পুরু স্তরটাই তাদের ৫০ ফুট ওপর থেকে নিচে আছড়ে পড়া থেকে অলৌকিকভাবে বাঁচিয়ে দিয়েছে।
​নূর নিজের শরীর থেকে শুকনো পাতার স্তরগুলো সরাতে সরাতে হঠাৎ কানে এল মানুষের তীব্র কোলাহল আর মাথার ঠিক ওপরে বিকট গর্জনে অনবরত চক্কর দিতে থাকা সারিসারি ফাইটার হেলিকপ্টারের 'গন গন' শব্দ!
​এত মানুষের আনাগোনা আর আকাশে চপার ওড়ার আওয়াজ কিসের?! নূর নিজেকে ধাতস্থ করে ভাবল—সে যদি কোনোমতে বেঁচে থাকে, তবে তার বান্ধবী বৃষ্টিও তো তার আশেপাশে কোথাও থাকার কথা!
​নূর অন্ধকারের ভেতর হাত ছড়িয়ে বৃষ্টিকে খুঁজতে লাগল। অস্থির গলায় কয়েকবার 'বৃষ্টি বৃষ্টি' বলে ডেকে উঠতেই শুকনো পাতার স্তূপের নিচে কিছু একটা নড়ে উঠতে দেখল। নূর তড়িঘড়ি করে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির সিআইডি ড্রেসের হাতাটা ধরে সজোরে টান দিল। কিন্তু হায়! নূরের সেই হেঁচকা টানে বৃষ্টি উপরে ওঠার বদলে উল্টো মাটির গহীনে আরও বেশি দেবে যেতে লাগল!
​"নূর! আমারে টানিস না... আমি তো আরও তলে চইলা যাইতেছি রে!"—
অন্ধকারের ভেতর থেকে বৃষ্টির কাঁপাকাঁপা ভয়ার্ত কণ্ঠ ভেসে এল।
​পরিস্থিতি মুশকিল টের পেয়ে এবার নূর ও বৃষ্টি দুজনে পরস্পরের হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। নিজেদের সমস্ত জোর খাটিয়ে অবশেষে সেই পচা পাতার স্তর থেকে দুজন বাইরে বেরিয়ে এলো।
​পাহাড়ের খাঁজে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে দুটি বান্ধবী এখনও অক্ষত অবস্থায় বেঁচে আছে—এই আনন্দে নূরের মনে এক বাঁধভাঙা উছ্বাস জেগে উঠল। নূরের মনে হাজারো ভয়ের মাঝেও এক অদ্ভুত স্বস্তি কাজ করায় সে আবেগের তোড়ে জড়িয়ে ধরল বৃষ্টিকে। কিন্তু হঠাৎ নূরের এই বাঁধভাঙা জড়িয়ে ধরা দেখে বৃষ্টি চোখ বড় বড় করে নূরের বুক থেকে নিজেকে এক ধাক্কায় ছাড়িয়ে নিয়ে বিষাক্ত চোখে বলে উঠল—
​"এই এই খবিশ ছামরি, যাউড়া ছেরি! ছাড় আমারে! মানে... ছাড় বলছি ছাড়! আমি তো তোর সতীন না যে আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করছিস?! আমরা যে এখনো সত্যি সত্যি বেঁচে আছি, সেটাই তো আমি শিওর হতে পারছি না!"
​নূরের উচ্চস্বরে চিৎকারে বৃষ্টি তৎক্ষণাৎ নূরকে ছেড়ে দিতেই বুঝতে পারল—নড়াচড়া একটু বেশি করলেই আবার খাদের নিচে গড়িয়ে যাওয়ার পথ তৈরি হবে। দুজন পাশে তাকাল, কিন্তু ওপরে ওঠার মতো শক্ত কোনো পাথরের সাপোর্ট খুঁজে পেল না।
​ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের মাথার ওপরে খাদের খাঁজে তীব্র বাতাস তোলপাড় করে সোজা নেমে এলো একটি বিশেষ ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টার!
​হেলিকপ্টারটি নিখুঁতভাবে তাদের সামনে ল্যান্ড করার মতো পজিশনে শূন্যে থমকে দাঁড়াল। সত্যিই সত্যি নূরদের খোঁজ পেয়েছে বাঁধনের সিকিউরিটি টিম!
​হেলিকপ্টারের স্বয়ংক্রিয় দরোজা খুলে সেখান থেকে নিপুণ দক্ষতায় নিচে লাফিয়ে পড়লেন মাফিয়া বাঁধন মির্জার প্রধান সিকিউরিটি হেড—
অ্যালবার্ট!
​আসলে বাঁধন নিজে আকাশের ওপরে থাকা মেইন গানশিপ চপারের ভেতর ছিল। নিচে সুনির্দিষ্ট সিগন্যাল পাওয়ার পর সে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে অ্যালবার্টকে সোজা উইঞ্চ ক্যাবল দিয়ে খাঁজে নামার নির্দেশ দিয়েছিল।
​অ্যালবার্ট অত্যন্ত দ্রুততায় নূর আর বৃষ্টিকে ধরে টেনে তুলে হেলিকপ্টারের নিরাপদ কেবিনের ভেতরে বসাল।
​উঁচু পাহাড়ের তীব্র রোদে নূর আর বৃষ্টি নিজেদের শরীরের দিকে তাকাতেই চমকে উঠল। দুজনেই নিজেদের অবস্থা দেখে ভূত দেখার মতো আঁতকে উঠল! দুজনের শরীরেই পাহাড়ের লাল বালু, পচা লতাপাতা আর কাদা মাখামাখি হয়ে এক বিদঘুটে দশা। গায়ের সিআইডি ইউনিফর্মের নানা জায়গায় ডালপালার আঁচড়ে ছিঁড়ে ফালাফালা হয়ে গেছে, সেখান থেকে শুকনো ও তাজা রক্ত বের হয়ে আছে। গাছের ডালে আটকে জামার পেছনের অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত!
​নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে নূরের মেজাজ চড়ে গেল। সে সমস্ত ঝাল ঝাড়ল পাশে বসা বৃষ্টির ওপর—
​"তুই আমারে খাইয়া লা রে শয়তান ছেরি! তোর জন্যই তো মরতে মরতে বাঁচলাম! তোর মতো খামখেয়ালি সিআইডি অফিসারের কারণে আমরা এভাবে জংলিদের মুখে ফেঁসে গেলাম!"
​বৃষ্টি নিজের ছেঁড়া ড্রেসের করুণ দশা সামলাতে সামলাতে ডুকরে কেঁদে ওঠার ভঙ্গি করল। অ্যালবার্ট তাদের এই করুণ দশা দেখে বিনীতভাবে একটা বিশুদ্ধ পানির বোতল বাড়িয়ে দিয়ে নূর ও বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল—
"আপনারা ঠিক আছেন তো, মিস?"
​নূর ঢোক গিলে পানির বোতলটা হাতে নিয়ে ক্যাপ্টেনের দিকে তাকিয়ে দ্বিধামিশ্রিত গলায় প্রশ্ন করল—
"জি... কে আপনি? আপনি আমাদের কীভাবে খুঁজে পেলেন?!"
​অ্যালবার্ট বিনীত ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে অত্যন্ত গম্ভীর ও নরম গলায় বলল—
"আমি হলাম বাঁধন স্যারের পার্সোনাল রাইট-হ্যান্ড লোক—
অ্যালবার্ট।"
​'বাঁধন স্যারের লোক'—শব্দটা কানে যাওয়া মাত্রই নূরের মুখের ভেতরের সব পানি যেন জমে বরফ হয়ে গেল!
​নূরের গায়ের পশম মুহূর্তের মধ্যে খাড়া হয়ে উঠল। ভয়ে তার হাত-পা হিম হয়ে আসতে লাগল। মাফিয়া ডন বাঁধন মির্জার নাম শোনামাত্রই নূরের সমস্ত সিআইডি বীরত্ব আর সাহসিকতা এক সেকেন্ডে ধুলোয় মিশে গেল! কারণ সে ভালো করেই জানে, সে বাঁধনের কড়া হুকুম অমান্য করে, তাকে না জানিয়ে গোপনে এই বিপজ্জনক মিশনে এসেছিল।
​বাঁধন যদি জানতে পারে সে কতটা অবাধ্য হয়েছে, তবে সেই রক্তখেকো মাফিয়া তার কী হাল করবে—তা ভেবেই নূরের বুক ধড়ফড় করতে লাগল!
​ঠিক সেই মুহূর্তে পাহাড়ের চারপাশের বাতাস কাঁপিয়ে সোজা বাঁধনের প্রধান শট-কমান্ড ফাইটার হেলিকপ্টারটি তাদের চপারের একদম ওপরে এসে অবস্থান নিল!
​উপরের হেলিকপ্টারের উন্মুক্ত দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা বাঁধনের সেই রক্তবর্ণ চোখ, দাঁতে দাঁত চেপে থাকা হিংস্র ফেস আর থমথমে ভয়াল অবয়ব আবছা নজরে আসতেই নূরের মাথা ঝিমঝিম করে উঠল।
​বাঁধনের নাম মনে হতেই একদিকে নূরের মনে যেমন জেদ আর অভিমানের আগুন জ্বলছিল, অন্যদিকে বাঁধনের এই ভয়াল রূপ দেখে তার আত্মা শুকিয়ে যাচ্ছিল! বাঁধন এখন হেলিকপ্টারের ওপর থেকে ক্যাবল ধরে সোজা নিচে নেমে আসছে... আর নূর ভেতরে ভেতরে কাঁপতে কাঁপতে ভাবতে লাগল—আজ সে কীভাবে এই রক্তখেকো মাফিয়া বাঁধন মির্জার মুখোমুখি হবে?!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন