কলমে: আহমেদ বাঁধন
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
[৩৬তম খণ্ড —
পাহাড়ের বুক কাঁপিয়ে আকাশ থেকে নেমে এলো প্রধান শট-কমান্ড ফাইটার হেলিকপ্টারটি। চপারের স্টিল ক্যাবল ধরে এক রাজকীয় অথচ রক্তখেকো ভঙ্গিতে নিচে নেমে এলো স্বয়ং মাফিয়া সম্রাট বাঁধন মির্জা! মাথার রগে তার অনিয়ন্ত্রিত রাগ আর হিংস্রতার তাণ্ডব জ্বলজ্বল করছে।
হেলিকপ্টারের কেবিনের ভেতরে বসা সিআইডি অফিসার নূর আর বৃষ্টি—উভয়েই অ্যালবার্টের সাথে অবস্থান করছিল। বাঁধনকে নিচে নামতে দেখেই নূরের বুকের ভেতরটা ভয়ে কেঁপে উঠল! কারণ সে ভালো করেই জানে, মাফিয়া বাঁধন মির্জার কঠোর হুকুম অমান্য করে, তাকে না জানিয়ে সিআইডি সিক্রেট মিশনে আসার অপরাধে আজ তার কপালে ভীষণ লেভেলের দুর্ভোগ লেখা আছে!
কিন্তু মাফিয়া ডন বাঁধন মির্জাকে তো সবাই চেনে—তার রাগের সামনে দাঁড়ানোর সাহস কারোরই নেই। হেলিকপ্টার থেকে নেমেই বাঁধন সোজা কেবিনের ভেতর ঢুকে হিংস্র বরফের মতো ঠাণ্ডা অথচ গর্জনশীল গলায় নূরকে লক্ষ্য করে চিৎকার করে উঠল—
"ইউ ইডিয়েট ফাকিং লেডি! তোর মাথায় সমস্যা আছে নাকি রে?! তুই আমার অবাধ্য হলি কোন সাহসে?! তোকে আমি হাজারবার বারণ করার পরও তুই আমার কথা না শুনে এই মৃত্যুর মুখে চলে আসিস...!!"
বাঁধনের এই ভয়াল সিংহমার্কা হুংকারে নূরের মুখের সমস্ত সিআইডি তেজ এক মুহূর্তেই হাওয়া হয়ে গেল। সে কান লাল করে চুপ মেরে দাঁড়িয়ে রইল। আসলে বাঁধন যা বলছে, তা তো ১০০% সত্যি! নূর নিজের বেশি চালাকি ও বীরত্ব দেখাতে গিয়েই তো জংলি গুন্ডাদের হাতে আটকা পড়ে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েছিল!
বাঁধন আর কোনো কথার সুযোগ দিল না। এক হেঁচকা টানে নূরকে নিজের বলিষ্ঠ কোলে তুলে সোজা আকাশে উড়তে থাকা মেইন ভিআইপি কমব্যাট হেলিকপ্টারের ভেতর এনে বসাল।
নূর সঙ্গে সঙ্গে বাঁধনের শক্ত অক্টোপাস বাঁধানো বুক থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে লাগল। কিন্তু বাঁধন তো বাঁধন! নূরের এমন অবাধ্য আচরণে সে দাঁতে দাঁত চেপে নূরের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে হিংস্র গলায় বলে উঠল—
"ইডিয়েট! শান্ত হয়ে বসে থাক! না হলে এই হেলিকপ্টারের ভেতরেই কিন্তু তোকে জড়িয়ে ধরে বাসর করে ফেলব...!!"
বাঁধনের মুখের এই কাঁচা আর স্পষ্ট হুমকির কথা শুনে নূরের শরীরের সমস্ত রক্ত একদম থমকে গেল! সে চোখ বড় বড় করে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে রইল।
বাঁধন নূরের সেই ছেঁড়া ও মাখামাখি সুতির জামা পরা রক্তাক্ত শরীরটাকে নিজের শক্ত বুকের সাথে চাদরের মতো জড়িয়ে রাখল। ততক্ষণে পুরো পাহাড়ি আকাশ তোলপাড় করে বাঁধনের সাথে রওনা দিয়েছে স্পেশাল প্রায় ২০ থেকে ৩০টি সামরিক ফাইটার জেট আর গানশিপ হেলিকপ্টার!
বিশাল এই বিমানবহরের গন্তব্য সোজা—
ঢাকার কেরানীগঞ্জের বাঁধন মির্জার নিজস্ব বিলাসবহুল 'নূর প্যালেস'!
গন্তব্যের দিকে চপারগুলো সাঁ সাঁ করে এগিয়ে চলছিল। শহর এলাকার প্রায় ৩০০ ফুট ওপর দিয়ে যখন হেলিকপ্টার বহর উলে যাচ্ছিল, ঠিক তখন ঘটল এক অকল্পনীয় ও শিউরে ওঠার মতো ঘটনা!
নূর তো নূর! সিআইডি মানসিকতার সেই চঞ্চল ও জেদি মেয়ে, সে তো বাঁধনকে এত সহজে তার মাফিয়া স্বামী হিসেবে মেনে নেবে না! বাঁধনের এই শাসনে তার ভেতরের জেদ আরও দ্বিগুণ হয়ে গেল। হুট করেই নূর বাঁধনের হাতের কবজিতে বিষাক্ত কামড় বসিয়ে দিল!
— "আহ!"
বাঁধনের বাঁধন ঢিলে হতেই এক সেকেন্ডের ১০ ভাগের এক ভাগে নূর হেলিকপ্টারের খোলা দরোজা দিয়ে নিচে শহরের ৩০০ ফুট উঁচু শূন্য আকাশে ঝাঁপ দিল!
মাটির দিকে দ্রুত গতিতে পড়ে যেতে থাকা নূরের এই আত্মঘাতী কাণ্ড দেখে বাঁধনের চোখের তারা যেন থমকে গেল! সে কোনো কিছু ভাবার বিন্দুমাত্র সময় না নিয়ে নিজের পিঠে ক্যাবল ছাড়াই সোজা নূরের পেছনে শূন্য আকাশে লাফ দিল!
পাশের হেলিকপ্টার থেকে অ্যালবার্ট, জোসেফ আর সিআইডি বৃষ্টি এই দৃশ্য দেখে বিকট হাহাকার করে চিৎকার করে উঠল—
"ভাই...!!!"
বৃষ্টি কেবিনের হাতল ধরে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল—
"নূর! তুই এই পাগলামি কেন করলি রে!!"
বাতাসের তীব্র গতিতে শূন্যে ভাসতে ভাসতে বাঁধন নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও অসীম সাহসিকতায় বাতাসের বাধা পেরিয়ে শূন্যের মাঝখানেই নূরকে নিজের বুকের মধ্যে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে পেঁচিয়ে নিল!
তবে নিচে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল আর্মি ডিরেক্টরেট ও বাঁধনের পার্সোনাল ট্র্যাকিং স্পেক্স ফোর্স। সিআইডি হেডকোয়ার্টার্স ও প্রধানমন্ত্রী নির্দেশে নিচে দ্রুত এক বিশাল মেগা এয়ার-কুশন ও পুরু সেফটি ক্যানভাস চাদর টানিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
আকাশের ৩০০ ফুট শূন্যতায় ভাসতে ভাসতে নূরকে নিজের বুকের ভেতরের খাঁজে শক্ত করে চেপে ধরে বাঁধন ওর কানের কাছে হিংস্র ও গভীর কন্ঠে গর্জে উঠল—
"তুই হয়তো ভাবছিস এই বাঁধনের হাত থেকে সহজে বেঁচে যাবি?! কিন্তু তা এই জন্মেও সম্ভব না, ফাকিং লেডি! একবার শুধু প্যালেসে পৌঁছাতে দে আমাকে, তারপর তোকে খুব ভালো করে বুঝাব আমার হুকুম অমান্য করে কতটা ভুল করেছিস তুই!"
নূর ভয়ে একফোঁটাও কথা বলল না। শূন্যে ভাসতে ভাসতে তারা দুজন অক্ষত ও আলতোভাবে এসে আছড়ে পড়ল নিচে পেতে রাখা শক্তিশালী এয়ার ব্যাগের ওপর। বাঁধন আর নূরের শরীরের কোথাও বিন্দুমাত্র আঁচড়ও লাগল না! কারণ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, র্যাব, সিআইডি এবং স্পেশাল ট্রাফিক ডিপার্টমেন্টের কমিশনাররা আগেই বাঁধনের সমস্ত সেফটি প্রোটোকল নিশ্চিত করতে পুরো রাজপথের সমস্ত গাড়ি ঘোড়া থামিয়ে রাস্তা একদম ফাঁকা করে রেখেছিল!
অ্যালবার্ট ও জোসেফ আগেই বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে রেখেছিল—যদি তাদের বস বাঁধন মির্জার গায়ের একটা লোমেরও ক্ষতি হয়, তবে পুরো বাংলাদেশকে রক্তে ভাসিয়ে লাশ বানাতে তাদের এক সেকেন্ডও সময় লাগবে না!
নিচে নামামাত্রই সেনাবাহিনী ও সিআইডি চিফরা এগিয়ে এলেন। বাঁধন শূন্য থেকে নেমে লাল বালু ও ধুলা ঝেড়ে সোজা নূরের মুখোমুখি দাঁড়াল। রাগে তার শরীর থরথর করে কাঁপছিল। বাঁধন কোনো কথা না বলে নূরের গালের ওপর সজোরে দুটো থাপ্পড় বসিয়ে দিল!
— ঠাস! ঠাস!
"অবাধ্য হয়েছিস না?! এখন দেখব তোর সিআইডি তেজ কত দূর যায়! চল আমার সাথে... আজ তোকে নূর প্যালেসে নিয়ে গহীন বাসর করে ছাড়ব, এখানেই দাঁড়া!"—অন্ধ রাগে হুংকার দিল বাঁধন।
নূর গালে হাত দিয়ে চোখ ভর্তি জল নিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাঁধন আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে অ্যালবার্টের দিকে তাকিয়ে পশুর মতো গর্জাল—
"অ্যালবার্ট! আমার পাওয়ারফুল স্পোর্টস বাইক বের কর!"
অ্যালবার্ট চকিতে সোজা হয়ে বলল—"ইয়েস স্যার!"
বাঁধন এবার সেনাপ্রধান ও জোসেফের দিকে তাকিয়ে বরফের মতো হিংস্র গলায় হুকুম দিল—
"আমি এখন সোজা প্রধানমন্ত্রীর হেডকোয়ার্টার্সে যাব! পুরো বাংলাদেশকে আজ অফিশিয়ালি জানিয়ে দেব—কার দিকে তারা চোখ তুলে তাকানোর দুঃসাহস করছে! দিস ই্স মাই লাস্ট ওয়ার্নিং টু দিস হোল কান্ট্রি!"
জোসেফ সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে বলল
"জি ভাই!! ইশারা করুন শুধু!"
বাঁধনের এক সিগন্যালে পর মুহূর্তেই আকাশের বুক চিরে তিনটি ব্ল্যাকহক ফাইটার হেলিকপ্টার সোজা রাজপথের ওপর ল্যান্ড করল। তাদের প্রধান গন্তব্য এখন সোজা ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর প্রধান কার্যালয় ও হেডকোয়ার্টার্স!
বাঁধন এক টানে নূরকে বাইক থেকে নামিয়ে হেলিকপ্টারে বসাল। নূর ভেতরে ভেতরে রাগে ও ভয়ে কটমট করছিল, কিন্তু বাঁধনের সেই সংহারী রূপ দেখে টু-শব্দ করারও ক্ষমতা পাচ্ছিল না।
চপারগুলো মুহূর্তের মধ্যে উড়াল দিয়ে ঢাকার আকাশসীমা পার হয়ে সোজা গিয়ে ল্যান্ড করল প্রাইম মিনিস্টার কার্যালয়ের বিশালাকার প্যারেড গ্রাউন্ডের হেলিপ্যাডে!
হেলিকপ্টারের ডানা থামতেই বাঁধন নূরকে নিজের এক হাতে চেপে ধরে ধীর ও রাজকীয় পায়ে হেঁটে ভেতরে প্রবেশ করল। সেখানে হাজার হাজার দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম, সিআইডি চিফ, সেনাপ্রধান ও দেশের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন!
প্রধানমন্ত্রী নিজে বাঁধনকে সামনে এগিয়ে আসতে দেখে বিনীতভাবে মাথা নিচু করে সম্মান জানিয়ে বলে উঠলেন—
"মিস্টার বাঁধন মির্জা! ভাই আপনি এখানে হঠাৎ এভাবে কেন আসলেন?! আমাকে একটা খবর পাঠাতেন, আমি নিজেই আপনার প্যালেসে গিয়ে কথা বলে আসতাম!"
বাঁধন তার চোখের কালান্তক রাগ চেপে প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে একমুহূর্ত থামল। তারপর গম্ভীর ও কর্কশ গলায় জবাব দিল—
"আমি অবশ্যই কোনো বিশেষ কারণ ছাড়া এই সচিবালয়ে পা রাখিনি, মিস্টার প্রাইম মিনিস্টার!"
প্রধানমন্ত্রী বিনীতভাবে মাথা নেড়ে হাত জোড় করে বললেন—
"জি অবশ্যই! আমরা আপনার জন্য কী করতে পারি বলুন স্যার?!"
বাঁধন কোনো কথা বাড়াল না। প্রধানমন্ত্রীকে পাশ কাটিয়ে সে সোজা স্টেজ ও মিডিয়ার বিশাল প্ল্যাটফর্মের দিকে এগিয়ে গেল। স্টেজের ঠিক মাঝখানে থাকা আন্তর্জাতিক ড্যাশের বিশাল সাউন্ড মাইকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল বাঁধন মির্জা!
তার ঠিক এক পাশে ছিল ব্ল্যাক কোট, কলার পরা শার্ট ও প্যান্টে আবৃত হিংস্র রাগে জ্বলতে থাকা মাফিয়া সম্রাট বাঁধন মির্জা... আর তার এক হাতের আয়ত্তে শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরা ছিল ছেঁড়া সিআইডি পোশাক পরা, এলোমেলো চুলে দাঁড়িয়ে থাকা সিআইডি অফিসার নূর!
পেছনে সারিসারি মিডিয়া ক্যামেরা, উচ্চপদস্থ ডিফেন্স অফিসার ও সিআইডি টিম স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত মাথা নিচু করে একপাশে অবস্থান নিলেন।
বাঁধন পুরো দেশের মিডিয়া ও লাইভ সম্প্রচারের মাইকটা নিজের ঠোঁটের কাছে এনে পুরো বাংলাদেশকে কাঁপিয়ে দিয়ে হুংকার ছেড়ে ঘোষণা করল—
"আমি বাঁধন মির্জা... পুরো বাংলাদেশ আজ কান খুলে শুনে রাখ! এই মেয়েটি... এই সিআইডি অফিসার নূর হলো আমার একান্ত নিজস্ব সম্পদ! আমার জান, আমার রানি, আমার বউ! পুরো দেশকে আমি আজ শেষবারের মতো ওয়ার্নিং দিয়ে রাখছি—তাকে ভালো করে চিনে রাখবি সবাই! কারণ, আগামীতে যদি এই নূরের গায়ের একটা আঁচড়ও লাগে বা সে নিখোঁজ হয়... তবে তার জন্য পুরো বাংলাদেশ মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে কয়েক সেকেন্ডও সময় লাগবে না! তাই এই কথাটা সবার মস্তিষ্কে ভালো করে ঢুকিয়ে রাখবি!"
কথাটি শেষ করেই বাঁধন চরম ক্ষোভে ও রাগে স্টেজের সেই মূল্যবান আন্তর্জাতিক সাউন্ড মাইকটা ছুড়ে ফেলে দিল মাটিতে!
— কড়কড়াৎ করে মাইকটি ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেল!
পুরো লাইভ ব্রডকাস্ট আর সেশনের লাখ লাখ মানুষ স্তব্ধ হয়ে গেল। বাঁধনের এই সংহারী বার্তা শুনে আস্ত একটা দেশ যেন বরফের মতো জমে গেল!
আর বাঁধন তার এই ভয়াল ও হিংস্র অবয়ব নিয়ে নূরের হাত ধরে সোজা গাড়ির দিকে টানতে টানতে নিয়ে চলল... এবার তাদের গন্তব্য 'নূর প্যালেস'!