কলমে: আহমেদ বাঁধন
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
[৪৩তম খণ্ড —
ইউরোপের অন্যতম আধুনিক শহর জার্মানি। শহরের ব্যস্ততম রাস্তার একপাশে বিলাসবহুল এক প্রাইভেট হাসপাতালের সুসজ্জিত চেম্বারে বসে আছে নীলিমা—না, এখন আর তাকে নীলিমা বলা চলে না! ছোটবেলা থেকেই সে বাঁধনকে নিজের মনের গভীর থেকে পছন্দ করে আসছে। কিন্তু বাঁধন সব সময়ই তাকে এড়িয়ে চলেছে, বিন্দুমাত্র পাত্তা দেয়নি। কারণ, মাফিয়া সম্রাট বাঁধন মির্জার পাথরের মতো কঠিন অন্তরে জায়গা পাওয়ার মতো একজনই রাজকন্যা ছিল, সে হলো নূর! নূরকে ছাড়া বাঁধনের দুনিয়ায় দ্বিতীয় কোনো নারীর স্থান নেই।
কিন্তু বাঁধনের এই অবহেলা ও প্রত্যাখ্যান নীলিমার হৃদয়ে এক ভয়ংকর হিংসা ও প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। সেই প্রতিশোধের নেশায় সে বছরের পর বছর জার্মানিতে কাটিয়ে দিয়েছে। এতদিন বাঁধন যাকে নীলিমা হিসেবে দেখে এসেছে, তার পেছনে লুকিয়ে ছিল এক বিশাল গোপন রহস্য, যা একমাত্র নীলিমার বাবা ছাড়া আর কেউ জানে না! ছোটবেলায় এক মারাত্মক দুর্ঘটনায় তার চেহারা ফেস সার্জারি করে বদলে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু এবার সেই কৃত্রিম রূপ তুলে ফেলার সময় এসেছে। ডাক্তারের করিডোরে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা গলায় নীলিমা আদেশ দিল—
"ডাক্তার সাহেব! এবার সময় হয়েছে আমার আগের চেহারা সরিয়ে আসল রূপ ফিরিয়ে আনার! চেঞ্জ মাই ফেস!"
দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ ফেস সার্জারি সফলভাবে সম্পন্ন হলো। কৃত্রিম রূপের আড়াল ঠেলে বেরিয়ে এলো তার আসল রূপ—
মাহি চৌধুরী! এক চরম অহংকারী, রূপসী ও মারাত্মক চতুর নারী! মাহির এই আসল চেহারা এতটাই সৌন্দর্যে ভরপুর যে যেকোনো পুরুষ এক পলক দেখলেই তার প্রেমে হাবুডুবু খেতে বাধ্য!
ডাক্তার তার সামনে আয়না ধরে বেশ গর্বের সাথে বললেন—
"দেখুন ম্যাডাম! এবার আপনার আসল চেহারা কেমন লাগছে?"
মাহি আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের নিখুঁত ফর্সা মুখ, টানা টানা চোখ আর তীক্ষ্ণ ঠোঁটের দিকে দেখে এক বিষাক্ত বাঁকা হাসি হাসল। সে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে হিসহিস করে বলে উঠল—
"মাফিয়া বাঁধন মির্জা! তুই আমাকে রিজেক্ট করেছিস, অপমান করে ধাক্কা মেরে বের করে দিয়েছিলি! এবার তুই দেখবি—
এই মাহি চৌধুরী তার সৌন্দর্য আর চাতুরী দিয়ে তোকে কীভাবে ছাই করে দেয়! তোকে আমার প্রেমের জালে পাগল করব, আর তোর পরম আদরের বউ নূরকে আমি নিজ হাতে শেষ করব!"
মাহি ডাক্তারের পাওনা মিটিয়ে কটকট শব্দে হিল জুতো বাজিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে এল। বাইরে পার্কিং করা ছিল তার স্পোর্টস বাইক। নিজের আসল রূপের অহংকারে মাহি যখন বাইকের দিকে এগোচ্ছিল, রাস্তার পথচারী হাজারো তরুণ তার রূপ দেখে যেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে থমকে দাঁড়াল! মাহি বাইক স্টার্ট দিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেওয়ার প্রস্তুতি নিল—এক নতুন রক্তের খেলা শুরু করতে!
অন্যদিকে, ঢাকার বুকে নূরের বাপের বাড়িতে রাতের নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। বাঁধন সারাদিন তার শ্বশুর-শাশুড়িকে যে পরিমাণে জ্বালিয়েছে, তা ভেবে নিজের রুমের ভেতর একাই মুচকি হাসছিল। তবে রাত গভীরে নূরকে কাছে পেয়ে বাঁধনের মাফিয়া হৃদয়ে জমা থাকা সমস্ত রোমান্টিকতা যেন বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো উপচে পড়ল!
সে ঘুমন্ত নূরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার গালে ও ঠোঁটে আদুরে কিস করতে লাগল। কিন্তু বাঁধনের এই অনবরত রোমান্টিক আক্রমণে নূরের ঘুমের বারোটা বেজে গেল! নূর এমনিতেই সারাদিনের ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন, তার ওপর এই লোকটার অত্যাচার! নূর ঘুম ভেঙে চরম রাগে ও কটমট চোখে বাঁধনের দিকে তাকাল। সে আর নিজের সিআইডি মেজাজ ধরে রাখতে না পেরে গর্জে উঠল—
"শয়তান কোথাকার! থাপ্পড় মেরে সোজা করে দেব! রে শালা, আমাকে একটু শান্তিতে ঘুমাতে দিবি নাকি দিবি না?!"
বাঁধনের চতুর চোখ দুটো এবার বিস্ময়ে রাজহাঁসের মতো বড় বড় হয়ে গেল! যে মেয়েটি তাকে 'আপনি' ছাড়া কথা বলার সাহস পায় না, সে আজ তাকে সরাসরি 'তুই' আর 'শালা' বলে গালি দিচ্ছে?! বাঁধন ভেতরে ভেতরে একটু ঘাবড়ে গেলেও মুখে রাগী ভাব এনে বলল—
"তুই কাকে 'তুই' বলছিস রে বউ?!"
নূর রাগে কিলবিল করতে করতে চিল্লিয়ে উঠল—
"তোর কি কানে সমস্যা নাকি?! তোকে বলছি শয়তান মাফিয়া! তোকে দেখে কি আমার ভালোবাসার মুড মনে হচ্ছে, নাকি ঘুম আসছে না?! সরে বস আমার ওপর থেকে!"
বাঁধন এবার সত্যিই বেশ খানিকটা পিছু হটে গেল। সে বিছানায় একটু পিছিয়ে বসে দুই হাত তুলে ভীতিভরা কায়দায় বলল—
"ওরে বাবা রে! বউ, তোর শরীর মনে হয় নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই! তোকে নিশ্চিত কোনো শয়তানি জিনে ধরেছে! সিআইডি অফিসারকে জিনে ধরলে তো মহা বিপদ! তুই আমাকে তুই করে বলছিস, গালি দিচ্ছিস! এখন আমি আমার এই কিউট গোলুমোলু বউটার সাথে একটু মিষ্টি রোমান্স করতে গেলেও তো পাপ হয়ে যাবে! জিনের সাথে তো আর বাসর করা যায় না!"
নূরের মেজাজ এবার একদম সপ্তমে চড়ে গেল! সারাদিনের জ্বালাতনের পর মাঝরাতে লোকটার এই রসিকতা সহ্য করার ক্ষমতা তার নেই! সে বালিশটা টেনে নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
"তুই চুপ থাকবি নাকি তোকে সারাজীবনের মতো ঘুম পাড়িয়ে দেব শালা?!"
বাঁধন এবার ভয় আর ভীতু সরে বলে উঠলো,,,
,,, বউরে বউ তোকে জিনে আসর করলে আমার কি হবে,,,
কিন্তু নূরের কোন সারা শব্দ নেই সেখানে ঘুমিয়ে পড়েছে এ শয়তান মাফিয়ার সাথে কথা বলার কোন ইচ্ছা নেই
বাঁধন নিজের বাঁকা হাসিটা গোপন করে নূরের এই বিরক্তি খুব উপভোগ করল। সে বুঝতে পারল নূর সত্যিই ভীষণ ক্লান্ত। বাঁধন আর কথা না বাড়িয়ে, পাশ ফিরে শুয়ে থাকা নূরকে পেছন থেকে আলতো অথচ শক্ত বাঁধনে নিজের বুকজুড়ে জড়িয়ে ধরল। নূরের সুবাস নিতে নিতে সে ঘুমের দেশে তলিয়ে যেতে লাগল।
তবে নূরের পাশে শুয়ে শুয়ে বাঁধনের মনে হচ্ছিল—
সারাদিন সে নিজের জন্মদাত্রী মা-বাবাকে যে কষ্ট আর যন্ত্রণা দিয়েছে, তা কি সত্যিই সঠিক ছিল? এই রক্তচোষা মাফিয়ার চোখের কোণে একফোঁটা নোনা জল এসে জমল। দুনিয়া যাকে দেখে থরথর করে কাঁপে, সেই বাঁধন মির্জার চোখের জল দেখার ভাগ্য আজও কারও হয়নি!
কানাডায় তখন এক বিষাদময় বিকেল। কনকনে ঠান্ডা হিমেল বাতাসের মাঝে এক নির্জন পার্কে কাঠের বেঞ্চে একা বসে আছে রিশাদ। নূরের হারিয়ে যাওয়া আর বাঁধন মির্জার সাথে নূরের বিয়ের খবরটা রিশাদের বুকটাকে এক নিমেষে ছাই করে দিয়েছে। ভালোবাসার মানুষটা আজ অন্য কারও অর্ধাঙ্গিনী!
রিশাদ কোল ঘেঁষে রাখা গিটারটা হাতে নিল। বিষাদগ্রস্ত চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে সুর তুলে নিজের ভাঙা গলায় গাইতে লাগল—
"সে ছিল আমারই...!!
সে হলো ফেরারি...!!
হারালো বহুদূরে...!!
চিতারি মত যে...!!
বুকেরই ক্ষত যে...!!
কেবলই জলে পুড়ে...!!
সে ছিল আমারই...!!
সে হলো ফেরারি...!!"
গানটি গাইতে গাইতে রিশাদের চোখের কোণ বেয়ে ঝরঝর করে জল পড়তে লাগল। ঠিক তখনই যেন রিশাদের মনের কান্নার সাথে সুর মিলিয়ে আকাশ চিরে টিপটিপ করে বৃষ্টি নামতে লাগল! রিশাদ বৃষ্টির পানিতে নিজের চোখের জল ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করল।
কিন্তু রিশাদ খেয়ালই করেনি—
তার এই নিখাদ ভালোবাসা আর বিষাদময় গানের সুর শুনে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মেয়ে থমকে গেছে! ফর্সা গায়ের রঙ, টানা টানা হরিণের মতো চোখ আর স্নিগ্ধ চেহারার সেই মেয়েটিও একজন বাংলাদেশী, যে কানাডায় পড়তে এসেছে। রিশাদের এই বুকভাঙা কান্না আর আকুতি দেখে মেয়েটির হৃদয়ে এক অদ্ভুত ভালো লাগা ও ভালোবাসার জোয়ার খেলে গেল! মেয়েটি রিশাদকে এক নজর দেখে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে সেখান থেকে হেঁটে চলে গেল।
আর রিশাদ সেই জনমানবহীন পার্কে বৃষ্টির নিচে দাঁড়িয়ে দু-হাত তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে আকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলতে লাগল—
" হে আল্লাহ! দুনিয়ায় কাউকে নিজের চেয়ে বেশি ভালোবাসা কি খুব বড় অপরাধ?! যদি অপরাধ না হয়, তবে কেন আমার সাথেই এমনটা হলো?! আমি তো নূরের সাথে একটা ছোট্ট, সুন্দর সংসার চেয়েছিলাম... একটা মিষ্টি জীবন চেয়েছিলাম! কিন্তু পাওয়ার আগেই তো সব শেষ হয়ে গেল! আল্লাহ, তুমি তো আমার হৃদয়ের এই হাহাকার দেখতে পাচ্ছ... তুমি ছাড়া যে আমার আর কেউ নেই!"
রিশাদ কান্নায় ভেঙে পড়ে সেই ভিজে যাওয়া কাঠের বেঞ্চেই বসে রইল, আর তার অশ্রুধারা মিশে যেতে লাগল ঝরে পড়া বৃষ্টির ফোঁটার সাথে...