কলমে: আহমেদ বাঁধন
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
[৪৪তম খণ্ড —
রাতের অন্ধকার কেটে ভোরের মিষ্টি আলো ফুটতেই মাফিয়া সম্রাট বাঁধন মির্জার ঘুম ভেঙে গেল। সে আনমনে ভেবেছিল
—তার বাহুডোরে হয়তো তার পরম আদরের বউ নূর শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে। ঘুমে কাদা হয়ে থাকা বাঁধন হাত বাড়িয়ে পাশে থাকা আকৃতিটাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু কিছুক্ষণ যেতেই বাঁধনের মনে হলো—
ব্যাপারটা কেমন যেন অস্বাভাবিক! যাকে জড়িয়ে ধরেছে, তার কোনো নড়াচড়া নেই, শ্বাসপ্রশ্বাসের কোনো স্পন্দনও অনুভূত হচ্ছে না!
এক ঝটকায় চোখ খুলল বাঁধন মির্জা! আর চোখ খোলা মাত্রই তার চোখের মনি দুটো রাগে ও আতঙ্কে স্থির হয়ে গেল! সে যাকে এতক্ষণ পরম মমতায় জড়িয়ে ধরে ছিল, সেটা আর কেউ নয়—
একখানা নিছক কোলবালিশ! আর তার রাজকন্যা, তার প্রাণের বউ নূর উধাও!
মুহূর্তের মধ্যে মাফিয়া বাঁধন মির্জার মাথার রগগুলো ফুলে উঠল। রক্তচক্ষু নিয়ে সে কোলবালিশটির দিকে তাকাল। রাগের চরম পরাকাষ্ঠায় উঠে এক সজোর ঘুসি বসিয়ে দিল বালিশটার বুকে! এক ঘুসিতেই বালিশের ভেতর থেকে পেঁজা তুলো শুভ্র বরফের মতো চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল। ঘরের ভেতরে বাঘের মতো হুংকার দিয়ে উঠল বাঁধন—
"নূর! ফাকিং লেডি! কোথায় তুই?! একদম আমার মেজাজ খারাপ করবি না! এনসার মি, তুই কই গেছিস?!"
সারা ঘরের থমথমে নীরবতা ছাড়া আর কোনো উত্তর এলো না। বাঁধন তড়িঘড়ি করে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ওয়াশরুমের দরজা এক ঝটকায় খুলে দেখল—
ফাঁকা! এরপর পৈশাচিক গতিতে পুরো ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজল, কিন্তু নূরের কোনো চিহ্ন নেই! এবার বাঁধনের মাথার মেজাজ চরম লেভেলে পৌঁছে গেল। সে রাগের চোটে সামনের বিশাল ড্রেসিং টেবিলে সজোরে নিজের ডান হাত দিয়ে এক মারাত্মক ঘুষি মারল! কাঁচের ড্রেসিং টেবিলটি ঝনঝন শব্দে চুরমার হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল!
এত সকালে ওপরের তলায় এমন তছনছ আর কাঁচ ভাঙার বিকট শব্দ শুনে নিচ থেকে দৌড়ে ওপরে এলেন রাবেয়া বেগম আর জিদান মির্জা। তাদের ওপরে আসার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু তাণ্ডবের শব্দে না এসে পারলেন না। রুমে ঢুকে ভেতরের অবস্থা দেখে তাদের চোখ কপালে উঠল! ঘরের চারদিকে তুলো উড়ছে, কাঁচের টুকরো ছিটিয়ে আছে, আর বাঁধনের ডান হাতের কড়া থেকে রক্ত গড়িয়ে মেঝেতে পড়ছে!
পুত্রের হাত থেকে লাল রক্ত ঝরতে দেখে রাবেয়া বেগমের মায়ের কলিজাটা হুহু করে উঠল। নিজের অজান্তেই তিনি ক্ষতের তোয়াক্কা না করে ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে বাঁধনের দিকে দৌড়ে এলেন হাতটা ব্যান্ডেজ করে দিতে। কিন্তু বাঁধন এক ঝটকায় তার মায়ের হাতটা সরিয়ে দিল! সে আগ্নেয়গিরির মতো ফুঁসে উঠে গম্ভীর ও ক্ষিপ্ত গলায় বলল—
"আপনাদের সাথে আমি এতক্ষণ ভালো ব্যবহার করছিলাম! আমার মুখ খারাপ করতে বাধ্য করবেন না! কোথায় আমার বউ?! আমার বউ নূর কোথায়?!"
জিদান মির্জা আর রাবেয়া বেগম একে অপরের দিকে আতঙ্কিত চোখে তাকালেন। এবার তারাও সত্যি ভয় পেয়ে গেলেন, কারণ বাঁধন মির্জার এই মারাত্মক চেহারা তারা আগে কখনো দেখেননি! বাঁধন নিজের রাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গর্জন করে উঠল—
"কোন কুত্তার বাচ্চা আমার বউকে সরালো?! নূর, তুই ফাকিং লেডি! আমার অনুমতি ছাড়া এখান থেকে পালানোর সাহস তুই পেলি কোথায়?! তোকে যদি আমি এবার সামনে পাই, তবে তোকে একেবারে মাটির সাথে মিশিয়ে ফেলব!"
জিদান মির্জা বাঁধনের এমন হুংকার শুনে ভয় পেলেও গলার স্বর কিছুটা শক্ত করে বললেন—
"এই ছেলে, তোমার সমস্যাটা কী?! সকালে উঠেই পুরো ঘর ভাঙচুর করছ! মেয়েটা কোথায় গেছে, আমরা কীভাবে বলব?!"
বাঁধনের রক্ত গরম হয়ে উঠেছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে চোখের মনি নাচিয়ে বলল—
"কোথায় গেছে বলবেন আপনারা! যেভাবে হোক আমার বউকে আমার চাই! নাও, আই ওয়ান্ট হার ব্যাক টু গেট!"
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাবেয়া বেগম কান্নায় ভেঙে পড়লেন। কারণ, কাল রাতে সবাই একসাথেই খাওয়া-দাওয়া করে যার যার রুমে ঘুমোতে গেল। কিন্তু মাঝরাতে কীভাবে নূরের মতো একটি মেয়ে উধাও হয়ে গেল, তা কারও মাথায় ঢুকছে না!
বাঁধনের পিছে শত্রুর অভাব নেই, কিন্তু বাঁধনের চোখ ফাঁকি দিয়ে তার বউকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সাহস কার হতে পারে?! বাঁধন নিজের ওপর তীব্র ঘৃণা বোধ করল। তার উপস্থিতিতে তার বউকে কেউ নিয়ে গেল?! নিজের শাশুড়ির কান্নার আওয়াজ শুনে বাঁধনের বিরক্তি আরও বেড়ে গেল। সে বিকট শব্দে ধমকে উঠল—
"স্টপ দ্য মাউথ! একবারে চুপ থাকুন!"
রাবেয়া বেগম ও জিদান মির্জা ভয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। বাঁধন পকেট থেকে এনক্রিপ্টেড স্যাটেলাইট ফোন বের করে তার বিশ্বস্ত রাইট হ্যান্ড অ্যালবার্ট জোসেফকে কল দিল—
"অ্যালবার্ট জোসেফ! কাম টু দ্য পয়েন্ট নাও! আমার বউ কিডন্যাপ হয়েছে! কোন শুয়োরের বাচ্চা এই কাজ করল, এখনই বের কর!"
ওপাশ থেকে অ্যালবার্ট অত্যন্ত ভয়ে ভীতিভরা গলায় বলল—
"জি... জি ভাই! আমরা রাতে একটা গোপন খবর পেয়েছিলাম যে অপোজিশন গ্যাং একটি মুভমেন্ট করছে... কিন্তু আপনাকে তখন ডিস্টার্ব করা ঠিক হবে না ভেবে জানাইনি... আই অ্যাম রিয়েলি সরি ভাই!"
অ্যালবার্টের কথা শোনামাত্র বাঁধনের চোখের মনি দুটো হিংস্র পশুর মতো লাল হয়ে উঠল! সে ফোনের স্পিকারে সিংহ গর্জন করে উঠল—
"কুত্তার বাচ্চা! তুই জানতিস আর আমাকে বলিসনি?! তোর এত বড় সাহস?! তোকে আমি নিজের হাতে গুলি করে মারব এখন!"
অ্যালবার্ট ফোনেই কাঁচুমাচু হয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল—
"ক্ষমা করে দিন ভাই! এবারের মতো মাফ করে দিন! আমরা অলরেডি সার্চ ট্র্যাকিং চালু করে দিয়েছি!"
বাঁধনের মাথা তখন আর কোনো ক্ষমার সীমানায় নেই। সে ফোনে শেষ হুংকার দিয়ে বলল—
"আমার কোনো অজুহাত চাই না! আগামী এক ঘণ্টার মধ্যে নূরকে আমার সামনে হাজির করবি! তা না হলে শুধু সেই কিডন্যাপার নয়—পুরো বাংলাদেশকে আমি নিমিষে ছাই আর ধ্বংস করে দেব! এই বাঁধন মির্জা কখনো নিজের প্রতিশ্রুতি থেকে পেছায় না! আমার বউকে না পেলে পুরো বিশ্বের বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ ঘোষণা করব! আজ সবাই দেখবেএকটি ক্ষিপ্ত হায়না কতটা ভয়ংকর আর পৈশাচিক হতে পারে!"
কথাটি বলেই বাঁধন ফোনটা আছাড় মেরে ভেঙে ফেলল। এরপর কালবিলম্ব না করে সে বাড়ির ছাদে গিয়ে তার ব্যক্তিগত ব্ল্যাক-হক প্রাইভেট হেলিকপ্টারে গিয়ে বসল। মুহূর্তের মধ্যে হেলিকপ্টারের প্রোপেলার ঘুরতে লাগল এবং তা ঢাকার আকাশে উড়াল দিল।
উড়ন্ত হেলিকপ্টারের দরজায় দাঁড়িয়ে নিচে পুরো বাংলাদেশের দিকে রক্তচক্ষু মেলে তাকিয়ে বাঁধন বিবিড় করে পৈশাচিক হেসে বলল—
"তুই আমার ইমোশন নিয়ে খেলছিস, নূর?! ফাকিং লেডি! তোকে শুধু একবার হাতের মুঠোয় পাই... তারপর তোর সাথে আমি কী করি, তা তুই নিজেও কল্পনা করতে পারবি না!"
এদিকে, বাংলাদেশ থেকে বহু দূরে—কানাডার এক বিখ্যাত ইউনিভার্সিটির সুদৃশ্য ক্যাম্পাসে বিষাদগ্রস্ত মনে হেঁটে বেড়াচ্ছে রিশাদ। পরনে ধবধবে সাদা শার্ট আর জিন্স প্যান্ট। তাকে দেখতে চমৎকার হ্যান্ডসাম ও রাজপুত্রের মতো লাগছে। কিন্তু নূরের বিচ্ছেদের বেদনায় তার ভেতরের মনটা একেবারে ভেঙে চুরমার হয়ে আছে। সে হাজার চেষ্টা করেও নূরকে মন থেকে মুছে ফেলতে পারছে না, অথচ সে জানে—নূর এখন অন্য কারোর বিবাহিত স্ত্রী!
রিশাদ ক্যাম্পাসের একটি কাঠের বেঞ্চে নিঃশব্দে এসে বসল। ঠিক তখনই তার পাশে এসে বসল এক অপূর্ব সুন্দরী তরুণী। কিন্তু রিশাদ সেদিকে কোনো খেয়ালই করল না।
মেয়েটির নাম তনিয়া। তনিয়াও বাংলাদেশ থেকে পড়াশোনা করতে এসেছে। সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলে পার্কে রিশাদের ওই করুণ গান আর কান্নার রূপ দেখেই তনিয়ার মন রিশাদের প্রেমে মজে গিয়েছিল! তাই রিশাদের কাছাকাছি আসার জন্যই সে এই ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। তনিয়া রিশাদকে একটু হাসিখুশি করার জন্য চঞ্চল গলায় জিজ্ঞেস করল—
"জি, কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?"
রিশাদ না তাকিয়েই বিরক্তিভরা গলায় বলল—
"জি, বলুন। আপনি শুধু শুধু আমাকে এভাবে ডিস্টার্ব করছেন কেন?"
তনিয়া মিষ্টি করে হেসে বলল—
"আরেহ্! একটু পরিচয় হলে কি কোনো সমস্যা হয়, নাকি দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে?!"
রিশাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলল—
"আমার নাম রিশাদ। আর কিছু?"
তনিয়া তো এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল! সে তার হরিণের মতো সুন্দর চোখ দুটি বড় বড় করে বলল—
"বাহ্! সুন্দর নাম তো! আমার নাম তনিয়া!"
কিন্তু রিশাদ তনিয়ার দিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে চুপচাপ প্রফেসর ক্লাসে এসে কী বলছেন, তা শুনছিল। তনিয়া রিশাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে বারবার রিশাদের শার্টের হাতা টেনে এটা-ওটা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করতে লাগল। তাদের এই অনবরত ফিসফিসানিতে ক্লাসের কড়া প্রফেসর চরম বিরক্ত হয়ে গেলেন! তিনি চশমার ওপর দিয়ে রিশাদের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় হাঁক দিলেন—
"হেই ইউ! দাঁড়াও! ওয়াট ইজ ইউর নাম?!"
রিশাদ কপালে হাত দিয়ে মনে মনে ভাবল—যেই ভয়টা পাচ্ছিলাম, সেটাই হলো! এই মেয়েটার চক্করে পড়ে আজ প্রথম দিনেই প্রফেসরের ধমক খেতে হচ্ছে! সে দাঁড়িয়ে বিনীত গলায় বলল—
"আই অ্যাম রিশাদ, স্যার।"
প্রফেসর রগী স্বরে আদেশ দিলেন—
"গেট আউট ফ্রম মাই ক্লাস রাইট নাউ! তুমি আর তোমার পাশের ওই মেয়েটা এখনই ক্লাস থেকে বের হয়ে যাও! এখানে প্রেম করার জায়গা নয়, পড়াশোনা করতে আসছ!"
কথাটি শুনে রিশাদ ক্ষমা চাইতে যাবে, কিন্তু তনিয়া কোনো সুযোগ না দিয়ে এক ঝটকায় রিশাদের হাত ধরে হাসতে হাসতে ক্লাসরুম থেকে টেনে বাইরে নিয়ে এল! করিডোরে এসে রিশাদ রাগে ফুঁসে উঠে তনিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল—
"আপনার সমস্যাটা কী বলুন তো?! আপনার এই ছিটগ্রস্ত আচরণের জন্য আজ আমাকে প্রথম দিনেই ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া হলো!"
তনিয়া নিজের কানে হাত দিয়ে দুষ্টুমি করে জিভ কেটে বলল—
"যা হয়েছে বেশ হয়েছে! বুড়ো প্রফেসরের ওই বোরিং লেকচার শুনলে তো আপনি এমনিতেই পাগল হয়ে যেতেন!"
রিশাদ চোখ বড় বড় করে বলল—
"আপনি আসলে চানটা কী, বলুন তো?!"
তনিয়া মনে মনে এক চিলতে বাঁকা হাসি হেসে ভাবল—
'চাই তো আপনাকে! আমার মন তো ইতিমধ্যেই আপনার ওই মায়াবী চোখের প্রেমে বন্দি হয়ে গেছে! এবার আপনাকেই আমার মনের ঘরের স্থায়ী বাসিন্দা বানাব!'
তনিয়াকে মনে মনে বিড়বিড় করতে দেখে রিশাদ কড়া গলায় বলল—
"এই! মনে মনে কী বিড়বিড় করছেন?! যা বলার সরাসরি বলুন!"
তনিয়া তার ডান হাতটি বাড়িয়ে দিয়ে একগাল মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে বলল—
"আমরা কি ফ্রেন্ড হতে পারি?! ফ্রেন্ডশিপ করবেন আমার সাথে?!"
রিশাদ কিছুক্ষণ তনিয়ার সেই নিষ্পাপ, মিষ্টি চেহারার দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার চোখে কেমন যেন একটা অদ্ভুত মায়া আছে, যা রিশাদের পাথর হয়ে যাওয়া মনটাকে কিছুটা হলেও নাড়া দেয়। রিশাদ আর না করতে পারল না। সে হাত বাড়িয়ে তনিয়ার সাথে করমর্দন করে বলল—
"ওকে... ফ্রেন্ডস!"
তনিয়া খুশিতে প্রায় লাফিয়ে উঠে বলল—
"থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ, রিশাদ!"