কলমে: আহমেদ বাঁধন
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
[৪৫তম খণ্ড —
বিকাল হতে চলল, কিন্তু নূরের কোনো খোঁজই পাওয়া যাচ্ছে না! এদিকে মাফিয়া সম্রাট বাঁধন মির্জার মাথায় যেন রাগের আগুন জ্বলছে! তার বেয়াদব বউটা আবার হারিয়ে গেল?! শয়তান বেডিটাকে এবার যদি হাতের কাছে পায়, বাঁধন একবারে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে!
পুরো বাংলাদেশের মানুষ খালি চিন্তা করছে—এটা কী হচ্ছে কিছুদিন ধরে?! পুলিশ, আর্মি, ডাকাত—সবাই নেমেছে নূরের খোঁজে! তারপর এলো দেশের সেনাবাহিনী! যত ধরনের বড় বড় কর্মকর্তা সিআইডি থেকে নিয়ে বড় বড় সবাই হন্যে হয়ে খুঁজছে নূরকে!
বাঁধন তখন গুলশানের এক রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশ থমথমে। ঠিক তখনই দূর থেকে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে একটা বিশাল মিলিটারী কপ্টার নিয়ে নামল অ্যালবার্ট আর জোসেফ। তারা হেলিকপ্টার থেকে নেমে বাঁধনের সামনে আসল, কিন্তু বাঁধনকে কী বলবে তা তাদের জানা নেই! কারণ অনেক কষ্টে নূরকে খুঁজে পেয়েছিল, কিন্তু আবার সে হারিয়ে গেল! রাগে গজগজ করছে বাঁধন। এবার যদি পায়, বাঁধন যে নূরের কী অবস্থা করবে তা ভেবেই শিউরে উঠছে সবাই!
অ্যালবার্ট এসে মাথা নিচু করে বাঁধনকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল—
"ভাই..."
বাঁধনের চোখগুলো রক্তজবার মতো লাল টকটকে হয়ে আছে। প্রচণ্ড রেগে আছে বাঁধন মির্জা! সহজে এত রাগলে তো পুরো বাংলাদেশ ধ্বংসের পথে পড়ে যাবে! কারও সাহস হচ্ছে না কিছু বলার। বাঁধন বাঘের মতো হুংকার দিয়ে বলে উঠল—
"লিসেন টু মি! নূরকে পেয়েছিস?!"
কী বলবে জানা নেই অ্যালবার্টের, আর জোসেফও তার পাশে থরথর করে কাঁপতে কাাঁপতে দাঁড়িয়ে আছে। বাঁধন এবার তাদের দিকে তাকিয়ে আরো কঠোর ও রাগী স্বভাব নিয়ে বলল—
"টেল মি, জোসেফ!"
বাঁধন এবার রাগে ফায়ার হয়ে গেল! তার মাথা মারাত্মক গরম হয়ে গেছে, কী করবে বুঝতে পারছে না। হাতের কাছে যাকে পাবে তাকেই যেন মেরে ফেলার মতো অবস্থা বাঁধনের! তার মাথায় এখন শুধু একটা চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছে—নূর কোথায়?! তার বেয়াদব বউটা কোথায়?!
জোসেফ মাথা নিচু করে বাঁধনের উদ্দেশ্যে নিচু স্বরে বলে উঠল—
"ভাই... আসলে..."
এবার বাঁধন নিজের পকেট থেকে লোডেড বন্দুকটা বের করে একদম রাগী স্বরে বলে উঠল—
"ঠিকমতো কথা বল, না হলে কিন্তু এখানেই শেষ করে ফেলব তোদের! তোরা তো জানিস আমি কেমন, ভালো করে আর জানার দরকার নেই!"
এবার তো পুরো ভয়ে শেষ জোসেফ আর অ্যালবার্ট! অ্যালবার্ট তখন নিজের ভাইকে উদ্দেশ্য করে কোনোমতে বলে উঠল—
"ভাই! আসলে ম্যাডামের খোঁজ পেয়েছি... কিন্তু ম্যাডামকে কিডন্যাপ করা হয়েছে!"
"ফাকিং কিডন্যাপ?!"
কিডন্যাপের নাম শুনে বাঁধনের রাগ একদম আসমানের ওপরে চলে গেল! মাফিয়া বাঁধন মির্জার মাথা গরম হয়ে রক্ত টগবগ করে ফুটতে লাগল! কার এত বড় স্পর্ধা, কার এত সাহস যে মাফিয়া বাঁধন মির্জার ওয়াইফকে কিডন্যাপ করে?! মৃত্যুর ভয় নেই তাদের জীবনে?! স্বয়ং বাঁধন মির্জার ওয়াইফকে স্পর্শ করার সাহস?!
এসব শুনে বাঁধনের পায়ের তলা থেকে রাগের শিরা-উপশিরা বের হয়ে আসার মতো অবস্থা! আর এটা দেখে অ্যালবার্ট ও জোসেফ দুজনেই ভয়ে কাপাকাপি শুরু করে দিল। কী করবে বুঝতে পারছে না তারা।
বাঁধনের মাথার রগ ফুলে উঠল, সে বিকট হুংকার ছেড়ে চিল্লিয়ে বলল—
"টেল মি, ফাকিং হোয়াট হ্যাপেন্ড টু মি?! কোন জানোয়ার কুত্তার বাচ্চার সাহস হয় যে আমার নূরকে কিডন্যাপ করে?! সে জানে না তার হাজবেন্ড কে?! মৃত্যুর ভয় নেই তাদের?! আজকে তাদের কবর খোঁড়া হবে স্বাদের!"
আবারো মাথা নিচু করে অ্যালবার্ট থারথার করে কাঁপা স্বরে বলে উঠল—
"ভাই... সে একজন মেয়ে!"
বাঁধনের রক্তচক্ষু দিয়ে আগুন ছিটকে বের হচ্ছে। ওটা ছেলে হোক বা মেয়ে—
বাঁধনের কোনো যায় আসে না! যে-ই নূরকে কিডন্যাপ করুক না কেন, সে জানে না সে কার ওপর হাত দিয়েছে! নূর তো বাঁধন মির্জার অক্সিজেন, তার হার্টবিট, তার ইঁদুরের বাচ্চা, তার অস্তিত্ব! মৃত্যুর ভয় নেই ওদের?! বাঁধন আবার হুংকার দিয়ে বলে উঠল—
"আই জাস্ট শ্যুট হার! ইট ডাজেন্ট ম্যাটার শি ইজ আ গার্ল অর নট! আই জাস্ট কিল হার!"
বাঁধনের সেই গর্জন আর হুংকারে পুরো বাংলাদেশ যেন থমকে গেল! থমথমে শব্দে জোসেফ এবার আস্তে করে বলে উঠল—
"ভাই... সে আপনার সাথে দেখা করতে বলছে। আপনার সাথে দেখা করবে নাকি মেয়েটা, না হলে ম্যাডামকে মেরে ফেলবে!"
বাঁধন এবার এক অদ্ভুত হিংস্র ও পৈশাচিক অট্টহাসি হেসে উঠল—
"মেরে ফেলবে?! আমার অক্সিজেনকে মেরে ফেলবে?! এই শব্দটা যেন নেক্সট টাইম আর উচ্চারণ না করবি! তোকে মেরে ফেলব আমি! আর তাদেরকে তো আমি বোঝাব জীবনের মায়াটা কতটুকু!"
বাঁধন আবার অ্যালবার্টকে উদ্দেশ্য করে হুংকার দিল—
"আমাকে নিয়ে চল সেই জায়গায়! আই জাস্ট কিল হার! আই জাস্ট কিল!!"
বাঁধনের কথামতো অ্যালবার্ট আর জোসেফ দ্রুত তাকে নিয়ে নিজস্ব হেলিকপ্টারে উঠে পড়ল। কপ্টার এবার ঢাকার আকাশ চিরে বিশাল গতিতে উড়ে চলল। বাঁধনের মাথায় এখন রক্তের হোলি খেলা চড়ে বসেছে! নূরকে কিডন্যাপ করা হয়েছে—
যে মাফিয়া পুরো বাংলাদেশ তো দূর, পুরো বিশ্ব শাসন করার ক্ষমতা রাখে, তার বউকে কিডন্যাপ?! পুরো বাংলাদেশে অলরেডি অ্যানাউন্স করে দেওয়া হয়েছে যে সে মিসেস বাঁধন মির্জা! তো কোন সাহসে তাদের এত বড় সাহস হয়?!
আকাশের বুকে কপ্টার উড়ছে, বাঁধন রাগে দাঁতে দাঁত চেপে কটমট করছে। সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে চরম আক্রোশে বলে উঠল—
"আই অ্যাম কামিং, মিসেস বাঁধন মির্জা! অ্যান্ড ইউর হাজবেন্ড ইজ কামিং সুন... ভিলেনের এন্ট্রি দেখতে পাবি এখন! প্লিজ ওয়েট ফর মি, মাই হার্ট!"
এই বলে বাঁধন আকাশে হেলিকপ্টার উড়িয়ে নিয়ে চলল এক অজানা ভয়ঙ্কর গন্তব্যের উদ্দেশ্যে—যে গন্তব্যের ঠিকানা হলো মৃত্যু আর কিছু রক্তের তামাশা!
অপরদিকে...
নূরের চোখগুলো একটা অজানা স্যাঁতসেঁতে গোডাউনের ভেতরে ধীরে ধীরে মিলতে লাগল। সে প্রথমে বুঝতে পারছিল না পরিস্থিতিটা আসলে কী! চোখ মেলেই চারপাশটা বোঝার চেষ্টা করল নূর, কিন্তু তার মাথায় কিছুই ঢুকছিল না। সবকিছু যেন মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে!
নূর খেয়াল করল তার হাত দুটো কেমন যেন শক্ত শক্ত আর নড়বড়ে লাগছে। তার শরীরটাও মারাত্মক অসুস্থ ও ক্লান্ত লাগছে। মুখটাও কেমন যেন বন্ধ বন্ধ—
পুরো টেপ মেরে আটকানো! নূর ভালো করে চারপাশটা খেয়াল করে দেখল, সে নির্জন এক প্রকাণ্ড গোডাউনের ভেতর পড়ে আছে। পুরো গোডাউন ফাঁকা, আর সেখানে তার হাত-পা শক্ত করে দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা!
নূর রাতের দৃশ্যটা মনে করার চেষ্টা করল—
রাতে তো সে বাঁধন মির্জার সাথেই তাদের নিজেদের বাড়িতে শুয়েছিল। কিন্তু মাঝরাতে একটু জল খাওয়ার জন্য নিচে নেমেছিল নূর। সে তো সিআইডি অফিসার, নিজেকে সাহসী মনে করে বলেই বাঁধন মির্জাকে ডাকার প্রয়োজন মনে করেনি। কিন্তু জল খেতে নামার মাঝেই হঠাৎ পেছন থেকে কেউ এসে তার মুখে ক্লোরোফর্ম লাগানো কাপড় দিয়ে জাপটে ধরেছিল! লোকটা কোনো পুরুষ ছিল, কারণ সেই শক্তির কাছে নূর পেরে ওঠেনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে সেন্সলেস হয়ে যায়। তারপর আর কিছুই মনে নেই নূরের! জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে সে এখানে আবিষ্কার করল!
নূর আবার ভালো করে চোখ মেলে দেখল আর নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু সবদিক দিয়ে দড়ির জটলা বাধা। সে তার সিআইডি টেকনিক খাটিয়ে কোনোমতে শরীরটা মোচড় দিয়ে হাতটা খোলার চেষ্টা করল। হঠাৎ তার পকেটের পেছন থেকে একটা ছোট ব্লেড জাতীয় জিনিস নিচে ইটের ওপর পড়ে থাকতে দেখল! নূর অনেক কষ্ট করে পা দিয়ে সেটা টেনে এনে হাতের বাঁধনটা কাটা শুরু করল। আস্তে আস্তে অনেক কসরত করার পর হাতের বাঁধনটা কেটে গেল! তারপর সে মুখের টেপটা খুলল।
দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকায় নিজেকে খুব ক্লান্ত অনুভব হচ্ছিল নূরের। কিন্তু নূর উঠে দাঁড়াতেই পেছন থেকে কেউ একজন এসে বিশাল একটা ভারী কিছু দিয়ে তার মাথায় সজোরে বাড়ি মারল!
"আআআহ!"
বাড়ি খাওয়া মাত্রই নূরের মাথা ঝিমঝিম করে ঘুরতে লাগল। ঘুরতে ঘুরতে সে আবার মাটিতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল! তবে পুরো সজ্ঞান হারানোর আগে নূর আবছা দেখতে পেল—একজন মেয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে! মেয়েটাকে সে চেনে না, তবে কোথাও যেন দেখেছে বলে মনে হলো!
জ্ঞান হারানোর কিছুক্ষণ পর আবার যখন চোখ মেলল, নূর দেখল তার হাত-পা আবার আগের মতো শক্ত করে বাঁধা! তবে এবার মুখে টেপ মারা নেই। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অপরিচিত মেয়েটি নূরের মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিল। পানির ছিটায় নূরের চোখ আস্তে আস্তে খুলল।
নূর এবার সোজা হয়ে বসে মারাত্মক রাগী গলায় মেয়েটির উদ্দেশ্যে বলে উঠল—
"তুই কে?! তুই জানিস আমি কে?! আমি একজন অন ডিউটি সিআইডি অফিসার! তুই আমাকে বন্দি করছিস কোন সাহসে?!"
নূরের মুখে এসব কথা শুনে সেই মেয়েটি এক বিকট অট্টহাসি দিয়ে উঠল! নূর তখন ভালো করে খেয়াল করে দেখল, তাদের চারপাশে অনেকগুলো অস্ত্রধারী ভাড়াটে গুন্ডা দাঁড়িয়ে আছে। তারা সবাই মেয়েটার সাথে তাল মিলিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল!
হাসতে হাসতে সেই মেয়েটি বলে উঠল—
"ওহ! সিআইডি অফিসার?! আই অ্যাম রাইট! তো ইউর হাজবেন্ড ইজ এ মাফিয়া?!"
নূরের চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল! এত কিছু এত বিস্তারিত জানল কীভাবে এই মেয়েটা?! নূর চোখ বড় বড় করে মেয়েটির উদ্দেশ্যে বলে উঠল—
"এই মেয়ে! তুই এত কিছু জানলি কেমনে?! ও মাফিয়া হোক আর যা-ই হোক, ওটাকে তো আমি দুচোখে দেখতে পারি না! তাও সে আমার হাজবেন্ড!"
মেয়েটি পাষাণ মার্কা হাসি দিয়ে বলল—
"তোকে আমি খুব জলদি মেরে ফেলব! কারণ তুই আমার জিনিসকে কেড়ে নিয়েছিস!"
এ কথা শুনে নূর মারাত্মক রাগী দৃষ্টিতে তাকাল। কারণ এখন তার মাথা গরম হলেও কিছু করার নেই, সে বন্দি! চারপাশে এত এত গুন্ডা, তাকে ছাড়ানোর মতো কেউ নেই। পুরো অসহায় অনুভব করছে নূর। তাও সে শক্ত গলায় বলল—
"আমাকে ছেড়ে দে বলছি! ও যদি জানতে পারে, তোদের সবাইকে মেরে ফেলতে এক সেকেন্ডও সময় লাগবে না!"
মেয়েটি খুব সুন্দর করে নূরের গালে হাত দিয়ে একটা বিষাক্ত হাসি হেসে বলল—
"ইউ আর এক্সাক্টলি রাইট! কিন্তু তুই তো এটা জানিস না মেয়ে—তোকে ছাড়া তোর হাজবেন্ড একদম অসহায়! তুই যতক্ষণ আমার কাছে বন্দি আছিস, তোর হাজবেন্ড আমার বালটাও ছিঁড়তে পারবে না!"
নূর এবার চরম অসহায়ত্ববোধ করে কেঁদে ফেলার মতো অবস্থায় নিচু স্বরে বলল—
"প্লিজ আমাকে ছেড়ে দাও... উনি জানলে কিন্তু তোমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে!"
মেয়েটি বিশ্রীভাবে হেসে বলল—
"লাইক দিস! এবার লাইনে আসছিস! তোকে এত সহজে ছেড়ে দিলে তো হবে না, কারণ তোর সাথে আমার অনেক দেনাদেনা বাকি আছে! শোন মেয়ে, তোকে ছেড়ে দিতাম যদি তোর হাজবেন্ডের থেকে আরও কিছু জানার ইচ্ছা না থাকত, বুঝছিস?!"
এই বলে মেয়েটি আবার বিকট অট্টহাসি দিতে লাগল! তার সাথে গোডাউনের বাকি গুন্ডারাও সহমত জানিয়ে হাসিতে ফেটে পড়ল।
নূর এখন নিজের অসহায়ত্বের কারণে কিছুই বলতে পারছে না। সে কাঁদছে না, কারণ কান্না করলে নিজেকে দুর্বল মনে হবে। কীভাবে যে কী হয়ে গেল! সে নিজে একজন সিআইডি অফিসার, অথচ সে কিছুই করতে পারছে না! নিজের ওপরই নিজের রাগ হচ্ছে নূরের। নূর নিজেকে পুরো অসহায় মনে করতে লাগল। তবে মনে মনে একটা আশা ধরে রাখল—বাঁধন মির্জা হয়তো এতক্ষণে জেনে ফেলেছে! বাঁধন যদি আসে, সে বাঁচানোর জন্য ১০০ তে ১০০ আসবেই!
[কানাডা — রাত ২:০০ টা]
রাতের তারাভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে এক উদাস ছেলে গভীর মনোযোগ দিয়ে গিটার বাজাচ্ছে। মনের সুখে নিজের ঘরের ব্যালকনিতে বসে সে সুর তুলছে। পেছনে ঘরের ভেতরে ঘুমাচ্ছে তার নতুন দুই বন্ধু। কিন্তু সেই উদাস ছেলেটার চোখে কোনো ঘুম নেই! শুধু আছে এক নিদারুণ হতাশা ভরা দৃষ্টি, আর বুকফাটা কষ্ট!
জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তাকে ঠকাচ্ছে তার ভাগ্য! সেই ভালোবাসার মায়াবী দৃষ্টিটা সে কিছুতেই ভুলতে পারছে না। যাকে ভোলার জন্য সে হাজার মাইল দূরে দেশ ছেড়ে প্রবাসে আসল, তাকেও ভুলতে পারছে না সে!
ব্যালকনিতে বসে রিশাদ এখনো নূরকে ভোলার চেষ্টা করছে। নূর তো এখন অন্য কারও বউ! কিন্তু মন তো তা মানতে চায় না। কত দিন কত রাত নূরের জন্য কান্না করেছে সে! এখন যেন তার চোখের পানিগুলোও শুকিয়ে গেছে। কত রাত কত দিন আল্লাহর কাছে কঁদে কেঁদে নামাজ পড়েছে যে নূরকে যেন সে পেয়ে যায়! কারণ আল্লাহ তো দয়ালু—
আল্লাহ যার সাথে যাকে মিলিয়ে দিয়েছেন, তার সাথেই তাদের জীবন হবে। তাই হাজার মানুষ ধরে রাখলেও তা-ই ঘটবে।
রুমে শুয়ে আছে রিশাদের দুই বন্ধু, যাদের সাথে কানাডায় আসার পর নতুন পরিচয় হয়েছে—
একজনের নাম রাবির, আর অন্যজন রিক। তারা অঘোরে ঘুমোচ্ছে, আর রিশাদ বাইরে ব্যালকনিতে গিটার বাজিয়ে নিজের বুকের জমানো দুঃখগুলো কমানোর চেষ্টা করছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে রিশাদের ফোনটা বেজে উঠল!
একটা আননোন নম্বর থেকে কল এসেছে। সচরাচর আননোন নম্বর ধরে না রিশাদ। কিন্তু কলটি অনবরত বেজেই যাচ্ছে, বেজেই যাচ্ছে! শেষমেশ কিছুটা বিরক্তবোধ নিয়ে রিশাদ ভাবতে লাগল—এত রাতে কে ফোন দিতে পারে?! মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল রাত এখন প্রায় ২:০০ টা বাজতে চলল!
এত রাতে কার ফোন দেওয়ার কথা?! এই ভেবে রিশাদ কলটা রিসিভ করল। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে এক অসম্ভব মিষ্টি, নরম আর কোমল কণ্ঠ ভেসে এলো—
"হাই মিস্টার কান্নাকাটি! কান্নাকাটি কি শেষ হয়েছে?! আর আপনি কিন্তু গিটারটা ভালোই বাজান!"
এ কথা শুনে রিশাদ মারাত্মক অবাক হলো! সে ঝটপট আশপাশটা চেক করে দেখল কেউ তাকে উঁকি মারছে কিনা! নিজের কান্না চেপে সে সেই অপরিচিত মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল—
"জি?! কে বলছেন আপনি?! আর জানলেন কীভাবে আমি ব্যালকনিতে বসে আছি?!"
মেয়েটি ওপাশ থেকে মিষ্টি করে হেসে বলল—
"আমি তো পরী! তাই জানার দরকার নেই, বুঝলেন?! আর এত কান্না করবেন না তো! জীবনের সব মানুষ ভুল করেই শেখে, ভুল থেকে শিখাই উত্তম!"
রিশাদ আবার ভালো করে চারপাশ চেক করল—আশেপাশে কেউ দেখছে কিনা! তার পাশে একটা উঁচু বিল্ডিং আছে, সেদিকে ভালো করে তাকাল, কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। রিশাদ আবার বলল—
"জি, কে বলছেন?! আর এত কিছু আপনি জানলেন কীভাবে?!"
মেয়েটি আবার একটু হেসে আগের চেয়েও কোমল কণ্ঠে বলে উঠল—
"আমি কে জানতে চান?! তাহলে এত কান্না করেন কেন?! আপনাকে কি কান্নাতে মানায়?! সবসময় হাসি-খুশি থাকবেন, তাহলে আপনাকে সুন্দর মানাবে!"
রিশাদ এবার একটু বিরক্তি নিয়ে বলল—
"কে বলুন না, প্লিজ!"
মেয়েটি রহস্যের হাসি হেসে বলে উঠল—
"যেদিন নিজে খুঁজে বের করবেন, সেদিনই পরিচয় পাবেন! এর বেশি না..."
এটুকু বলেই ফোনের ওপাশ থেকে কল কেটে গেল!
রিশাদ স্তম্ভিত হয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বারবার বলতে লাগল—
"হ্যালো?! হ্যালো!! হ্যালো, কে আপনি?! হ্যালো! হ্যালো! হ্যালো!"
কিন্তু ওপার ততক্ষণে পুরো নিস্তব্ধ!
রিশাদ এবার কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়ল। এই মেয়েটি এত কিছু কীভাবে জানে?! একটা মেয়ের কণ্ঠ, অথচ তার ব্যাপারে প্রতিটা খবর রাখে! সে কান্না করছিল না হাসছিল, ব্যালকনিতে বসে গিটার বাজাচ্ছিল—এসব মেয়েটা জানল কেমনে?! তার মানে মেয়েটা আশেপাশেই কোথাও থাকে!
নিজের মনের সন্দেহ আর কৌতূহল সামলাতে না পেরে রিশাদ ভাবল—এই মেয়েটার পরিচয় তাকে জানতেই হবে! সে আর কিছু না ভেবে ঘরে গিয়ে গিটারটা একপাশে রেখে দিল। শার্টটা খুলে সে বন্ধুদের পাশে শুতে চলে গেল। কিন্তু তার মনে এখন একটাই প্রশ্ন—কে এই অজানা পরী?!