কলমে: আহমেদ বাঁধন
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
[৪৮তম খণ্ড —
আকাশে তখন এক নিঝুম, নীরব দর্শকের মতো চেপে বসে আছে এক বিষাক্ত আঁধার। আর সেই আঁধারের বুক চিরে এজিনাল আইল্যান্ডের গোডাউনে চলছে মাফিয়া বাঁধন মির্জার এক অবিশ্বাস্য ও রাজকীয় তাণ্ডব!
নূর, অ্যালবার্ট, জোসেফ—সবাই চরম বিস্ময় ও আঁতকে ওঠা চোখে সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে রইল। ঘরের মেঝেতে রক্তাক্ত ও অজ্ঞান অবস্থায় লুটিয়ে পড়ে আছে নীলিমা। আর তার বুকের ওপর এক পা শক্ত করে চেপে ধরে, অন্য পা উঁচিয়ে এক প্রকাণ্ড রাজকীয় কাঠের সিংহাসনে শয়তানের মতো হিংস্র ভঙ্গিতে বসে আছে স্বয়ং মাফিয়া সম্রাট বাঁধন মির্জা!
বাঁধনের চোখ দুটো পৈশাচিক রাগে টকটকে লাল হয়ে আছে। তার ভেতরের রাগ আর ইগো যেন সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে! মুখে চুরুট চেপে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সে শান্ত করার চেষ্টা করছে নিজের ভেতরের ক্ষোভকে।
ইতিমধ্যেই গুহার বাইরে থেকে সিআইডি টিম নিয়ে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেছে বাঁধনের বন্ধু—সিআইডি অফিসার সাদিক! যার সাথে বাঁধনের সচরাচর কোনো দেখাই হয় না, সাদিক ততক্ষণে এসে গোডাউনের লোকাল সব ভাড়াটে গুন্ডাদের হাতকড়া পরিয়ে ঘিরে ফেলেছে।
বাঁধন হাতের চুরুটের শেষ অংশটুকু নিচে ফেলে বুট দিয়ে পিষে মারল। তারপর বরফের মতো চরম থমথমে ও কড়া গলায় হুকুম দিল—
"অ্যালবার্ট! আমার মেশিনগানটা দে!
– আজকে নীলিমার রক্তে এই দ্বীপের মাটিকে ভাসাব!"
বাঁধনের কথা শুনেই দৌড়ে গেল অ্যালবার্ট। নিমেষের মধ্যে বাঁধনের হাতে তুলে দিল এক ভয়ংকর, মিলিটারী গ্রেডের হাতাওয়ালা বিশাল এক মেশিনগান—
যার ভেতরে হাজার খানেক গুলি লোড করা থাকে! অস্ত্রটির ওজন সাধারণ মানুষের পক্ষে তোলা অসম্ভব, কিন্তু ছয়টি প্যাক বিশিষ্ট পারফেক্ট সুঠাম দেহের অধিকারী সুদর্শন মাফিয়া বাঁধন মির্জার কাছে ওটা যেন স্রেফ একটা পানির বোতল!
বাঁধন চোখের পলকে গানটি লোড করে নীলিমার মাথার দিকে তাক করতে গেল—
ঠিক সেই মুহূর্তে সিআইডি অফিসার সাদিক এক প্রকার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দৌড়ে এলো! সাদিক বাঁধনের সামনে হাত তুলে অনুনয়ভরা গলায় বলে উঠল—
"প্লিজ বাঁধন! আমার অনুরোধটা রাখ! তুই ওকে গুলি করিস না... ও একজন অপরাধী, ওর বিচার আইন করবে!"
কিন্তু বাঁধন মির্জা কি কারো তোয়াক্কা করে নাকি?! সে সাদিকের কথায় বিন্দুমাত্র কান না দিয়ে ট্রিগারে চাপ দিতে যাবে, ঠিক তখনই সাদিক আচমকা হাত বাড়িয়ে বাঁধনের হাত থেকে সোজা সেই প্রকাণ্ড মেশিনগানটি কেড়ে নিল!
মুহূর্তের মধ্যে পুরো গোডাউনের বাতাস থমকে গেল! চারপাশের পুলিশ, সিআইডি আর পাহারাদারদের কলিজা যেন শুকিয়ে ছাই হয়ে গেল! পুরো বিশ্বে এমন একজন প্রধানমন্ত্রী বা মিলিটারি জেনারেলের সাধ্য নেই, যে মাফিয়া বাঁধন মির্জার হাত থেকে কেড়ে তো দূরের কথা, ছুয়ে দেখার সাহস করবে!
অ্যালবার্ট ও জোসেফ ভয়ে চোখ বড় বড় করে মাথা নিচু করে ফেলল। কারণ তারা ভালো করেই জানে—
বাঁধন মির্জার হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নেওয়া মানে নিজের ডেথ ওয়ারেন্ট নিজ হাতে সই করা! এখন কী হবে, তা ভেবেই সবাই থরথর করে কাঁপতে লাগল। নূরও দরজার পাশে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল—
কী করতে যাচ্ছে বাঁধন?!
বাঁধনের মাথার রগগুলো তপ্ত তেলের মতো ফুটে উঠল। রাগের পারদ আসমান ছাড়িয়ে এক চরম সীমানায় পৌঁছে গেল! সে চরম হিংস্র চোখে সাদিকের দিকে তাকিয়ে হুংকার দিয়ে উঠল—
"কুত্তার বাচ্চা! তোর সমস্যা কী?! এই নর্দমার কীট আমার জানের ওপর হাত দিয়েছিল, আর তুই তাকে বাঁচানোর কথা বলিস?! হোয়াট দ্য ফাক!"
সাদিক নিজের প্রাণ হাতে নিয়ে ধীর কিন্তু শক্ত গলায় বলল—
"নূরের ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে বলেই ওকে আমরা আইনের কঠিনতম শাস্তি দেব! কিন্তু তুই আইন নিজের হাতে তুলিস না বাঁধন, প্লিজ!"
বাঁধন তার ঠোঁটের কোণে এক মারাত্মক বিষাক্ত ও পৈশাচিক বাঁকা হাসি ফুটিয়ে কড়া গলায় বলল—
"তুই জানিস সাদিক, তুই কার সাথে কী আচরণ করলি?! কার হাত থেকে তুই জিনিস নেওয়ার দুঃসাহস দেখাচ্ছিস?! স্বয়ং প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে দেশের স্টেট হেড পর্যন্ত যাকে ছোঁয়ার সাহস পায় না... তুই তার সাথে পাঙ্গা দিলি?!"
সাদিক এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচু গলায় বলল—
"আমি খুব ভালো করেই জানি তুই কে! তুই সেই মাফিয়া, যার নাম শুনলে পুরো বিশ্ব কেঁপে ওঠে! তুই চাইলে এখনই আমাকে মেরে এক সেকেন্ডে লাশ বানিয়ে দিতে পারিস... তোর কাছে সেই পাওয়ার আছে!"
বাঁধন তার রক্তচক্ষু দিয়ে সাদিকের দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সাদিকের চোখে ভয় আছে ঠিকই, কিন্তু বন্ধুকে অন্যায় থেকে রোখার এক অদ্ভুত জেদও আছে।
সাদিক আর বাঁধনের ছোটবেলায় অনেক গভীর বন্ধুত্ব ছিল, কিন্তু এক অজ্ঞাত ঘটনার পর দুজনের পথ আলাদা হয়ে যায়। সাদিক পুলিশে যোগ দেয়, আর বাঁধন অন্ধকার মাফিয়া দুনিয়ার সম্রাট হয়ে ওঠে। তা সত্ত্বেও বাঁধন আজও ভেতর থেকে সাদিককে এক প্রকার মর্যাদা দেয়।
বাঁধন এক দীর্ঘ ও বরফশীতল বাঁকা হাসি দিয়ে বলল—
"ওকে! তাও রেডি থাকিস..."
সাদিক কিছুটা অবাক হয়ে বাঁধনের দিকে তাকাল। কারণ সে বুঝতে পেরেছে—
বাঁধন মির্জা তার অনুরোধটি রেখেছে! যে লোক পুরো পৃথিবীর কারও কথা শোনে না, সেই বাঁধন আজ সিআইডি অফিসার সাদিকের অনুরোধ মেনে নীলিমাকে গুলি করল না
বাঁধন এক ঝটকায় মুখ ঘুরিয়ে কড়া গলায় বলল—
"নিয়ে যা এই নর্দমার ময়লাকে আমার চোখের সামনে থেকে!"
সবাই যেন স্বস্তির শ্বাস ফেলল! সিআইডি সাদিক পরম কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়ে হালকা হেসে বলল—
"থ্যাংক ইউ বাঁধন! তুই আগের মতোই আছিস... আমি ভেবেছিলাম তুই হয়তো আমাকে পুরো ভুলেই গেছিস, বন্ধুত্বের কোনো মূল্য দিবি না। কিন্তু আজ প্রমাণ করলি তুই আমায় ভুলে যাসনি!"
বাঁধন শুধু এক রহস্যময় ও কড়া বাঁকা হাসি দিল, কোনো উত্তর দিল না।
সাদিক নূরের দিকে তাকিয়ে চিন্তিত গলায় বলল—
"নূর খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে। ওকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যা বাঁধন!"
সাদিক সিআইডি অফিসার আলিয়াকে ডেকে বলল নীলিমাকে তুলে নিয়ে গাড়িতে তুলতে। আলিয়া রাগে গজ গজ করতে করতে নীলিমাকে ওঠাতে গিয়ে বলল—
"তুই আমার বান্ধবী নূরকে টর্চার করেছিস তুই শয়তান মেয়ে?! এবার তোর কী অবস্থা করি দেখিস আইনের জালে আটকে!"
আলিয়া আর সাদিক টিম নিয়ে নীলিমা ও বাকি গুন্ডাদের ধরে নিয়ে রওনা হয়ে গেল।
এদিকে বাঁধন ধীর পায়ে নূরের কাছে এগিয়ে গেল। নূর ভীষণ দুর্বল, চোখ দুটো কপালে ওঠার মতো অবস্থা। বাঁধন নিজের কোটটি খুলে নূরের শরীরে জড়িয়ে দিল এবং তাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। নূর কোনো প্রতিবাদ করার শক্তি পেল না, শান্ত হয়ে বাঁধনের বুকে মুখ লুকিয়ে রইল।
তারা গোডাউন থেকে বের হয়ে নিজের ভিআইপি হেলিকপ্টারের দিকে হাঁটতে লাগল। কিন্তু যাওয়ার আগে বাঁধন এক মারাত্মক কাজ করে বসল!
নিজের পকেটে থাকা এক বিশেষ রিমোট কন্ট্রোল বের করে পাসওয়ার্ড প্রেস করল বাঁধন। এজিনাল আইল্যান্ডের গোডাউনে আগে থেকেই পুতে রাখা হাজার হাজার কেজি ল্যান্ডমাইন আর সি-ফোর এক্সপ্লোসিভ নিমেষের মধ্যে বিকট শব্দে ফেটে উঠল!
"বোওওওম! ধা-ধা-ধাম!"
এক মুহূর্তের মধ্যে পুরো গোডাউন ছাই ও আগুনের শিখায় পরিণত হলো! গোপন আইল্যান্ড গোপনে রাখাই বাঁধন মির্জার নীতি, কোনো ক্লু বা প্রমাণ সে পেছনে ফেলে যায় না!
হেলিকপ্টার ঢাকার উদ্দেশ্যে উড়াল দিল। আকাশের বুকে প্রপেলারের বিকট শব্দের মাঝে বাঁধন কোল থেকে নূরকে নামিয়ে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখল। নূরের শরীর মারাত্মক ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে, সারাদিনের অনাহার আর মানসিক টর্চারে সে প্রায় আধমরা। বাঁধন নূরের মাথায় চুমু খেয়ে গম্ভীর গলায় অ্যালবার্টকে কপ্টারের স্পিড বাড়াতে বলল।
কয়েক মিনিটের মধ্যে ঢাকার অন্যতম সর্বাধুনিক ভিআইপি প্রাইভেট হাসপাতালের ছাদের ওপর এসে ল্যান্ড করল বাঁধন মির্জার কপ্টার!
কপ্টার নামতেই হাসপাতালের পরিচালক থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের এক বিশাল দল ভয়ে দৌড়ে এলো। মাফিয়া বাঁধন মির্জার হাসপাতালে আগমন মানেই এক চরম আতঙ্ক! মুহূর্তের মধ্যে পুরো হাসপাতাল থেকে সাধারণ রোগীদের খালি করে ফেলা হলো। কারণ বাঁধন মির্জার রাজত্ব শুধু এক দেশে সীমাবদ্ধ নয়—
তার নামের দাপটে পুরো বিশ্ব তোলপাড় হয়ে যায়! কল্পনা হোক বা বাস্তব, মাফিয়া বাঁধন মির্জা মানেই এক বিভীষিকার নাম!
বাঁধন রক্তচক্ষু নিয়ে হাসপাতালের প্রধান সার্জনকে ধমকে উঠে বাঘের মতো হুংকার দিল—
"আই জাস্ট নিড মাই ওয়াইফ ফুললি কিউরড! যদি আমার নূরের ১% কোনো প্রবলেম হয়, তবে তোকে আর তোর পুরো হাসপাতালকে আমি মাটির সাথে মিশিয়ে দেব!"
প্রধান ডাক্তার ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাাঁপতে তোতলাতে লাগল—
"জি... জি... ভাই! আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি!"
এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে ডাক্তারদের পুরো স্পেশালিস্ট টিম দ্রুত নূরকে ভিআইপি কেবিন ও ইমার্জেন্সি ইউনিটে নিয়ে গেল। বাঁধনের ভয়ে তারা কাল্পনিক এক অপারেশনের নাটক সাজাতে লাগল, অথচ নূরের বড় কোনো শারীরিক ক্ষতি হয়নি, কেবল দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা আর মানসিক চাপে সে অজ্ঞান ও দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তবুও ডাক্তাররা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে নূরের চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে চার-পাঁচ ঘণ্টা পার করে দিল!
বাইরে করিডোরে পায়চারি করতে করতে বাঁধনের ধৈর্যের বাঁধ এবার ভেঙে গেল! বাঁধন মির্জার কোনো কিছুর প্রতি ধৈর্য একদম কম, বিশেষ করে নূরের ব্যাপারে তো সে ১ সেকেন্ডও অপেক্ষা করতে পারে না!
সে রাগে উন্মাদ হয়ে ইমার্জেন্সি রুমের দরজায় এক বিকট লাথি মেরে ভেতরে ঢুকল!
"কুত্তার বাচ্চা ফাকিং ডাক্তার! তোকে কি আমি এখানেই শ্যুট করে মেরে ফেলব?! এত ফাকিং টাইম কিসে লাগে তোদের?!"
ভেতরে থাকা ডাক্তারদের আত্মা যেন শুকিয়ে উবে গেল! প্রধান ডাক্তার কোনোমতে বুক থেকে ঢোক গিলে কাঁপাকাঁপা স্বরে হাত জোড় করে বলল—
"ভাই... ম্যাডামকে স্যালাইন দেওয়া হয়েছে। ওনার শরীরে তীব্র পুষ্টির অভাব ছিল। আপাতত উনি ঘুমাচ্ছেন... আশা করি ইনশাল্লাহ জলদি সুস্থ হয়ে যাবেন!"
বাঁধন তার চোখের পৈশাচিক আভা ফুটিয়ে গম্ভীরে জিজ্ঞেস করল—
"আর যদি না হয়?! তবে তোর কী হবে জানিস?!"
ডাক্তার ঢোক গিলে কপালে ঘাম মুছে বলল—
"ভাই... জীবন আর সুস্থতা তো আল্লাহর হাতে! আমরা তো সামান্য একটা উসিলা মাত্র..."
বাঁধন আর কোনো কথা বলল না। সে জানে, অতিরিক্ত কথা বলা তার স্বভাব নয়। সে ডাক্তারদের ইশারায় রুম থেকে বের হয়ে যেতে বলল। ডাক্তাররা যেন মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে ফেরার আনন্দে এক দৌড়ে রুম ছেড়ে পালিয়ে বাঁচল!
কেবিনের ভেতর এখন কেবল দুজন—
অজ্ঞান নূর, আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মাফিয়া বাঁধন মির্জা।
বাঁধন ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে নূরের বেডের পাশে রাখা চামড়ার নরম চেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসল। নূরের নিষ্পাপ, মায়াবী আর ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে রইল একদৃষ্টে।
নূরের দিকে তাকাতেই বাঁধনের স্মৃতিপটে ভেসে উঠল বহু বছর আগের এক পুরোনো কাল্পনিক দৃশ্য...
তখন বাঁধনের বয়স মাত্র দশ কি বারো বছর। আর নূরের বয়স মাত্র দুই-তিন বছর। নূরের জন্মের পর বাঁধন কতটা যে খুশি হয়েছিল, তা কেবল সেই জানে! ছোটবেলা থেকেই বাঁধন নূরকে নিজের প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত এবং তাকেই নিজের জীবনসঙ্গিনী করার স্বপ্ন দেখত। বাধন রায়াদুল মির্জা নামে ছিল এক সাধারণ ছেলে যার স্বপ্ন ছিল কানাডার শিক্ষিত হয়ে তার মা-বাবাকে নিয়ে সুখে সংসার থাকবে সাথে সাথে কি হয়ে গেল এখন সে কি। সাম্রাজ্যের সম্রাট ‘মাফিয়া বাঁধন মির্জা’! পুরো বিশ্ব তাকে এক নামে চেনে। কঠোর, গম্ভীর, আর এক কথার মানুষ বাঁধন মির্জা কখনো কোনো নারীর দিকে চোখ তুলে তাকায়নি, কেবল তার এই চ্যাটারবক্স ইঁদুরের বাচ্চাটা ছাড়া!
বাঁধন নূরের কপালে পড়ে থাকা চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিয়ে পরম মায়ায় ফিসফিস করে বিড়বিড় করে উঠল—
"আমার ইঁদুরের বাচ্চা! জীবনের শেষ প্রান্তেও যদি আমি দাঁড়াই, তবে আল্লাহর কাছে শুধু তোকেই চাইব! তুই ছাড়া আমার এই সাম্রাজ্য, এই ক্ষমতা, এই রাজত্ব সব অর্থহীন... তুই ছাড়া আমার জীবনে আর কাউকেই প্রয়োজন নেই! এই সমাজ, এই নিয়ম কোনো কিছুর পরোয়া আমি করি না! প্রয়োজন হলে পুরো দুনিয়ার বিরুদ্ধে গিয়েও তোকে আমার নিজের করে রাখব! এই মাফিয়া বাঁধন মির্জা তোকে কথা দিল—তোর জায়গা এই বাঁধনের হৃদয়ে ছাড়া দ্বিতীয় কাউকে দেওয়া হবে না। তুই আমার একমাত্র জান, আমার অন্ধকারের আলো, আমার বিউটি কুইন!"
কথা বলতে বলতে সময় গড়িয়ে যেতে লাগল। দেখতে দেখতে দুপুর থেকে গড়িয়ে বিকাল, আর বিকাল গড়িয়ে ভিআইপি হাসপাতালের জানালায় সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার নেমে এলো।
ঠিক সেই মুহূর্তে... কেবিনের বেডে থাকা নূরের চোখের পাতা দুটো আস্তে আস্তে কেঁপে উঠল!
নূর ধীরে ধীরে চোখ মেলল। মাথাটা বড্ড ভারী লাগছে। সে চোখ মেলে দেখতে পেল পাশে এক সুঠাম দেহের সুদর্শন পুরুষ বসে আছে—
যার চোখ দুটো লালচে এবং মুখশ্রী মারাত্মক গম্ভীর!
নূর সোজা হয়ে বসার চেষ্টা করতেই বাঁধন দ্রুত এগিয়ে গিয়ে নূরের পিঠে হাত দিয়ে তাকে ধরে বসতে সাহায্য করল। বাঁধন অত্যন্ত মায়াবী ও নরম গলায় বলল—
"এখন কেমন লাগছে, নূর?!"
কিন্তু নূরের প্রতিক্রিয়া দেখে বাঁধনের ভেতরের রক্ত যেন নিমেষে বরফ হয়ে জমাট বেঁধে গেল!
নূর বাঁধনের দিকে এক অজানা, অচেনা ও অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল—
যেন সে কোনো এক এলিয়েন বা সম্পূর্ণ অচেনা মানুষকে দেখছে! নূরের চোখে কোনো ভয় বা ভালোবাসার ছায়া নেই, কেবল এক বিশাল শূন্যতা!
নূর হাত দুটি সরিয়ে নিয়ে অত্যন্ত ঠাণ্ডা ও অচেনা গলায় বলে উঠল—
"জি... আলহামদুলিল্লাহ! কিন্তু... আপনি কে?!"
"আপনি কে?!"—এই দুটি শব্দ শোনামাত্র
মাফিয়া বাঁধন মির্জার বিশ্বকাঁপানো চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য যেন কপালে উঠে গেল!
বাঁধনের পায়ের তল থেকে মাটি ছিটকে বেরিয়ে গেল!
এ কী শুনল সে?! নূর তাকে চিনতে পারছে না?!
আসলে বাঁধন মির্জার মনে হঠাৎ মনে পড়ে গেল এক ভয়াবহ সত্য—নূরের যখন আট-নয় বছর বয়স, তখন এক বড় দুর্ঘটনায় তার মাথায় তীব্র আঘাত লেগেছিল। সেই আঘাতের ফলে নূরের জীবনের আগের সব পুরোনো স্মৃতি মুছে গিয়েছিল, যার কারণে সে ছোটবেলার প্রিয় 'বাঁধন ভাইয়া' নামের অস্তিত্বটাকেই মন থেকে ভুলে গিয়েছিল! আজ সাভারের গোডাউনে নীলিমার গুন্ডার মাথায় ভারী আঘাতের ফলে নূরের স্মৃতিশক্তি আবারও মারাত্মক এক ওলটপালট ও ট্রমার শিকার হয়েছে!
নূর তাকে চিনতে পারছে না! নিজের অস্তিত্বকে এভাবে নূরের স্মৃতি থেকে মুছে যেতে দেখে মাফিয়া বাঁধন মির্জার ভেতরের সিংহটা উন্মাদ হয়ে উঠল! সে কেবিনের ভেতর এক বাঘের মতো বিকট গর্জন করে চিৎকার দিয়ে উঠল—
"কুত্তার বাচ্চা ডাক্তার! তোরা কোথায় ফাকিং মাদারফাকাররা?! কাম হিয়ার রাইট নাউ!!"